উন্মাদনা পর্ব ২২
কায়নাত খান কবিতা
“এতো ভয় পাস কেন, বোকাচন্দ্র?”
অভীর কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই ভয়েই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় আনন্দীর। পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে তার। মনে হচ্ছিলো, বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক জোরে ধকধক করছে।
কিন্তু ভয়টার মাঝেও মাথার ভিতর আরেকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।অভী তাদের ছাদে এলো কীভাবে?
আর সামনের এই চিলেকোঠার কথা সে জানলোই বা কী করে?এই জায়গাটা বাড়ির একদম নিরিবিলি কোণে। বাইরের মানুষ তো দূরের কথা, খুব পরিচিত কেউ ছাড়া এভাবে খুঁজে পাওয়ার কথাও না।
তাহলে কি অভী আগে থেকেই তাদের বাড়ির সবকিছু জানে?ভাবনাটা মাথায় আসতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় আনন্দীর। আতঙ্কে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসতে থাকে।
অন্ধকারের মধ্যে অভীর শক্ত হাত এখনো তার কোমরে রাখা। যেন সে নিশ্চিত করতে চাইছে, আনন্দী কোনোভাবেই পালাতে না পারে। আর সেই স্পর্শটাই আনন্দীর ভিতরের ভয়কে আরও গভীর করে
অভী ধীরে আনন্দীর কাঁধ থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়। তারপর হঠাৎই তার কাঁধে মুখ ছুঁইয়ে গভীরভাবে চুমু খায়।
আচমকা স্পর্শে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে আনন্দীর। ভয়, অস্বস্তি আর আতঙ্ক একসাথে চেপে বসে তার উপর। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। সে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু অভীর শক্ত ধরে রাখা হাতের কারণে নিজেকে অসহায় লাগতে থাকে তার।
চিলেকোঠার অন্ধকারে আনন্দীর বুকের ধকধক শব্দ যেন আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। ভয়ংকর নীরবতার মাঝেও তার মনে হচ্ছিলো, এই মুহূর্তটা যেন শেষই হচ্ছে না।
অভীর হাত ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতেই আতঙ্কে শক্ত হয়ে যায় আনন্দী। তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক দমবন্ধ করা স্বর,
“বড়ো হয়ে গেছিস, বান্দীর বাচ্চা। এত তাড়াতাড়ি বড়ো হওয়া উচিত হয়নি তোর। আর কয়টা বছর পর না হয় আমার চোখে পড়তি…”
কথাগুলো শুনে ঘৃণা আর ভয় একসাথে চেপে বসে আনন্দীর ভিতর। তবুও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে সে। ঠোঁট কামড়ে ধীরে বলে,
“তখন কী রেহাই দিতেন?”
অভী হালকা হেসে মাথা নাড়ে।
“নাহ… তখন শুধু আরও শক্তি সঞ্চয় করতাম। এখন তো একদিন ধরলে তিন দিন তোর খোজ পাওয়া যায় না”
বলেই বিকটভাবে হেসে ওঠে সে।অভীর সেই হাসিটা আনন্দীর কানে বিষের মতো লাগে। পুরো চিলেকোঠা যেন সেই শব্দে আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে। ভয় আর অপমান মুহূর্তেই রাগে বদলে যায় তার ভিতরে।
হঠাৎই আনন্দী জোরে অভীর পায়ে আঘাত করে। অপ্রস্তুত হয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পিছিয়ে যায় অভী। সুযোগ বুঝে দুই হাতে ধাক্কা দিতেই সে গিয়ে পড়ে পাশে রাখা ভাঙা চৌকির উপর।
দ্রুত পায়ে চিলেকোঠা থেকে বেরিয়ে আসে আনন্দী। ভয় আর আতঙ্কে তার বুকটা ধড়ফড় করছিল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা মেইন দরজার দিকে এগোতে থাকে সে। এখন শুধু নিচে নেমে যেতে পারলেই বাঁচে।
কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই আচমকা পিছন থেকে আবারও তাকে শক্ত করে টেনে ধরে অভী। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে সামলে ওঠার সুযোগই পায় না আনন্দী। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে আবার টেনে নিয়ে যাওয়া হয় সেই অন্ধকার চিলেকোঠার ভিতরে।
আতঙ্কে শরীর কাঁপছিল তার। তবুও চিৎকার করেনি আনন্দী।কারণ তার মাথায় তখন একটাই ভয় কাজ করছিল, আশেপাশের মানুষ যদি কিছু জেনে যায়? যদি সবাই ভুল বোঝে? যদি এই ঘটনা নিয়ে কথা ওঠে?
এই সমাজে প্রশ্নগুলো বেশিরভাগ সময় অপরাধীর দিকে নয়, মেয়েটার দিকেই ছুঁড়ে দেওয়া হয়।সেই ভয়টাই তাকে থামিয়ে দেয়।
আর সেই নীরবতাই ছিল আনন্দীর সবচেয়ে বড় ভুল।
চিলেকোঠার ভিতরে এনে জোরে ভাঙা চৌকির উপর ফেলে দেয় অভী। তীব্র ব্যথায় কেঁপে ওঠে আনন্দী। হাতের পুরোনো ক্ষতটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, তার উপর এই ধাক্কায় ব্যথাটা যেন আরও জ্বলে ওঠে।
মুখ বিকৃত হয়ে আসে তার। কয়েক মুহূর্ত শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল। তবুও নিজেকে সামলে উঠে বসার চেষ্টা করে আনন্দী। চোখেমুখে ভয় স্পষ্ট, কিন্তু সেই ভয় চাপা দিয়ে রাগ মেশানো কণ্ঠে বলে ওঠে,
“কী চাই আপনার?”
চিলেকোঠার আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অভী কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিটা এতটাই অস্বস্তিকর ছিল যে আনন্দীর বুকের ভিতরটা আবার কেঁপে ওঠে। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছিল, অথচ এই ছোট্ট ঘরটার ভিতর দমবন্ধ করা উত্তাপ জমে ছিল।
“ কাপড় খো’লো সোনামণি। কাম আছে।”
অভীর কথা শুনে কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায় আনন্দী। ঠিক তখনই অভী ফোন বের করে স্ক্রিনে একটা ভিডিও চালু করে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি টেনে ধীরে বলে,
“তোর বাপের নাম্বারের লাস্ট ডিজিটটা যেন কী ছিল?”
কথাটা শুনেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে আনন্দীর। মুহূর্তেই বুঝে যায়, আবারও ভয় দেখানো শুরু করেছে অভী।
নিজের উপর হঠাৎ করেই ভীষণ মায়া হয় তার। এই নিয়ে তৃতীয়বার। আর কতবার তাকে এভাবে ভয়, চাপ আর অপমানের ভিতর দিয়ে যেতে হবে?
তার মনে হতে থাকে, মেয়ে হয়ে জন্মানো যেন এক অন্তহীন যুদ্ধ। কখনো সমাজের ভয়, কখনো পরিবারের সম্মানের ভয়, কখনো নিজের নিরাপত্তার ভয়।
চারদিকে নারী অধিকারের কত কথা হয়, কত স্লোগান ওঠে। কিন্তু যখন সত্যিই একটা মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর দরকার হয়, তখন সেই অধিকারগুলো যেন হঠাৎ করেই কোথাও হারিয়ে যায়।
চিলেকোঠার অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে আনন্দীর মনে হচ্ছিলো, সে যেন ভীষণ একা। ভয় আর অসহায়ত্ব ধীরে ধীরে তাকে ভিতর থেকে গিলে খাচ্ছে।
“ সময় নাই বান্দী। জ্বলদী কর।”
অভীর ভয় আর চাপের মুখে অসহায় হয়ে পড়ে আনন্দী। পরিস্থিতিটা থেকে বের হওয়ার জন্য সে চুপচাপ অভীর কথা মেনে নেয়। হাত দুটো কাঁপছিল তার, চোখের কোণে জমে উঠছিল অপমান আর আতঙ্ক।
আনন্দীর এমন নীরবতা দেখে ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠে অভীর। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসে ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলে,
উন্মাদনা পর্ব ২১
“আহ, শান্তি… ভালো মেয়ে তুই। বড়োদের কথা শুনিস। জীবনে উন্নতি করবি।”
কথাগুলো শুনে আনন্দীর বুকের ভিতরটা ঘৃণায় মোচড় দিয়ে ওঠে। এই প্রশংসার আড়ালে যে ভয়ংকর নিয়ন্ত্রণ আর অপমান লুকিয়ে আছে, সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল সে।
আনন্দীর খুব কাছে গিয়ে অভী বলে, “ খাট ভাঙ্গবে না তো? নিচে আয়!”
