Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ২৭

উন্মাদনা পর্ব ২৭

উন্মাদনা পর্ব ২৭
কায়নাত খান কবিতা

“আমার খাওয়া মা’ল, আমি অন্য কাউরে খাইতে দেই না বোকাচন্দ্র!”
অভীর হাতের বাঁধন ধীরে ধীরে আরও শক্ত হতে থাকে। এতটাই শক্ত, যেন আনন্দীকে নিজের বাহুর ভেতর চেপে গুঁড়িয়ে ফেলতে চায় সে। আনন্দীর নিঃশ্বাস আটকে আসতে থাকে। তার মনে হতে থাকে বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত ভেঙে যাবে।
সে ছটফট করে একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু অভীর বাহুর চাপ থেকে নিজেকে সরানো অসম্ভব হয়ে ওঠে।
অভী তাকে আরও নিজের দিকে টেনে নেয়। তার বুকের সাথে পুরোপুরি চেপে ধরে রাখে। হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে।
অভী এক হাত দিয়ে শক্ত করে আনন্দীকে নিজের বাহুর মধ্যে চেপে ধরে রাখে। অন্য হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে কল রিসিভ করে।তার ঠোঁটে তখন তৃপ্তির হালকা হাসি।

“কাম হইছে?”
ওপাশ থেকে ভেসে আসে উচ্ছ্বসিত গলা,
“জ্বী ভাই! সুন্দর মতো পার হইছে।”
অভীর চোখে মুহূর্তের জন্য তীক্ষ্ণ একটা ঝিলিক দেখা যায়। সে ধীরে ধীরে কল কেটে দেয়।তারপর আবার দৃষ্টি নামায় আনন্দীর দিকে।আনন্দী তখনও তার বুকের সাথে ঠেসে আছে। শরীরটা কাঁপছে ক্ষীণভাবে। চোখের কোণ ভেজা, ঠোঁট ফ্যাকাশে।অভী ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা এনে নিচু স্বরে বলে,
“তুই তো আমার জন্য লক্ষী রে মেয়ে…”
এই প্রথম তার হাতের চাপ একটু আলগা হয়।
কিন্তু পরক্ষণেই অভীর ভ্রু কুঁচকে যায়।আনন্দী নড়ছে না।একদমই না।সে আলতো করে আনন্দীর মুখটা তুলে ধরে।চোখ দুটো বন্ধ।নিঃশ্বাস খুব ধীরে চলছে।
অতিরিক্ত ভয় আর মানসিক চাপে অবশেষে ভেঙে পড়েছে সে। শরীর আর নিতে পারেনি এত কিছু।
জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে অভীর বুকে।
অভী কিছুক্ষণ আনন্দীর নিস্তেজ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে।

“ধুর!”
আনন্দীর গালে হালকা চাপড় দিয়ে তাকে জাগানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না।
অভী বিরক্ত স্বরে বিড়বিড় করে ওঠে,
“মাত্র টাকা পকেটে আসছে, আর এই মাইয়া জ্ঞান হারাইছে! গেলো… গেলো… আমার ইস*মাগ*লিং কইরা আনা টাকাগুলা গেলো!”
কথাগুলো বলতে বলতে সে দাঁত চেপে শ্বাস ছাড়ে। যেন পুরো ঘটনাটা তাকে রাগিয়ে দিচ্ছে।
তারপর নিচু হয়ে আনন্দীর মুখের সামনে হাত নাড়িয়ে দেখে।
“এই! নাটক করস নাকি সত্যি সত্যি অজ্ঞান হইছস?”
কোনো উত্তর আসে না।আনন্দীর ফ্যাকাশে মুখ আর নিস্তেজ শরীর দেখে অভীর বিরক্তির ভেতরেও হালকা অস্বস্তি ফুটে ওঠে। তবে সেটা এক মুহূর্তের বেশি স্থায়ী হয় না। আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,
“আমার টাকার শত্রু। লাগা হসপিটাল”
নিভু নিভু চোখে ধীরে ধীরে তাকায় আনন্দী। প্রথমেই তার চোখে পড়ে সাদা সিলিং। চারপাশে তীব্র ওষুধের গন্ধ। মাথাটা যেন ভারী হয়ে আছে। হাত নড়াতেই বুঝতে পারে হাতে ক্যানোলা লাগানো, স্যালাইন ধীরে ধীরে তার শরীরে প্রবেশ করছে। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর পাশ ফিরতেই দেখতে পায় তার মা চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। চোখ-মুখ ফুলে আছে কান্নায়। একটু দূরে সোফায় বসে আছেন আকরাম শেখ। মাথা নিচু করে বসে আছেন তিনি। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টর রেহমান, দৃষ্টি নিজের ফোনে।
আনন্দী শুকনো ঠোঁট নড়ায়।

“মা…”
খুব ক্ষীণ শব্দ বের হয় তার গলা থেকে। প্রথমবার কেউ শুনতে পায় না। দ্বিতীয়বার ডাকতেই আয়েশা শেখ তড়িঘড়ি করে উঠে বসেন।
“আনন্দী!”
এক মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে ওঠে। পায়ের শব্দে রেহমানও দ্রুত এগিয়ে আসে বিছানার কাছে। সোফায় আধোঘুমে থাকা আকরাম শেখও চমকে উঠে মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ান। আনন্দী কষ্ট করে ঠোঁট ভিজিয় বলে,
“একটু পানি দেবে মা… গলাটা শুকিয়ে গেছে খুব…”
পাশ থেকে দ্রুত গ্লাসে পানি ঢেলে দেয় রেহমান। আকরাম শেখ আর আয়েশা শেখ মিলে ধীরে ধীরে আনন্দীকে উঠিয়ে বসান। তারপর সাবধানে তাকে পানি পান করানো হয়। পানি খেতে খেতেই আয়েশা শেখের চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। আনন্দী ধীরে ধীরে তাকায় বাবার দিকে। তার চোখে তখন জমে রয়েছে অভিমান।

“তোমাকে কল করলাম… ধরলে না যে বাবাই!”
কথা বলতে বলতেই গলা কেঁপে ওঠে তার।
“জানো আমি কোথায় ছিলাম?”
আকরাম শেখের বুকটা যেন ভেতর থেকে চিরে যায়। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। শুধু চোখের পানি নীরবে গড়িয়ে পড়ে। তিনি কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
“কিছু বলিস না মা… আমি সব শুনেছি…”
পাশ থেকে আয়েশা শেখ কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠেন,
“ও… ও তোর সাথে কিছু করেনি তো মা?”
প্রশ্নটা শুনেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। নিঃশ্বাস আটকে আসে তার। কীভাবে বলবে।এই কয়দিন কী হয়েছে তার সাথে? মানুষ শুধু শরীর ছোঁয়ায় নষ্ট হয় না, ভয় মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়। তার মনে হতে থাকে সে আর আগের সেই আনন্দী নেই। কিন্তু এসব কথা কি মুখে আনা যায়? বাবা-মায়ের সামনে বসে কেউ কীভাবে নিজের লাঞ্ছনার কথা বলে?
ঠোঁট কেঁপে ওঠে তার। কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। ঘরটা ভারী নীরব হয়ে যায়। ঠিক তখনই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রেহমান শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,

“না। কিছু হয়নি।”
একটু থেমে আনন্দীর দিকে তাকায় সে।
“ও পবিত্র আছে।”
আনন্দী ধীরে ধীরে তাকায় রেহমানের দিকে। তার চোখে তখন অদ্ভুত ক্লান্তি। রেহমান আবার বলে,
“এখন তোমাকে শক্ত হতে হবে আনন্দী। কেস করতে হবে। নিজের জন্য লড়তে হবে। তুমি সাপোর্ট না করলে আমি একা কিছু করতে পারব না।”
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু তার ভেতরে তখন অন্য ঝড়। হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়। পিরিয়ডের তারিখ পাঁচ দিন আগেই চলে গেছে। এখনো হয়নি। বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ভয় জমতে শুরু করে তার। তাহলে? সে কি মা হতে যাচ্ছে? না! না! এটা কীভাবে সম্ভব? মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে শুরু করে আনন্দীর।
সমাজ,মানুষ,আত্মীয়স্বজন,বাবা-মা, সে কীভাবে মুখ দেখাবে সবাইকে? মাত্র আঠারো বছর বয়সে যেন পুরো পৃথিবীর ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। এত ছোট একটা মন।কত প্রশ্ন সামলাবে? কীভাবে বলবে নিজের ভয়গুলো? ধীরে ধীরে নিজের আঙুল মুঠো করে ফেলে আনন্দী। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। শুধু নিঃশব্দে বসে থাকে। যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকটা বড় হয়ে গেছে সে।

“পুরান”
গ্যারেজের ভেতর একটা পুরোনো কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে টাকার হিসাব করতে থাকে অভী। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে গাড়ির যন্ত্রপাতি, তেলের ক্যান আর মরিচা ধরা লোহার অংশ। গ্যারেজের টিনের চালের নিচে গরমটা যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। বাতাস নেই বললেই চলে। ঘামের কারণে পাতলা সাদা গেঞ্জিটা পুরো শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে তার। নিচে পরনে শুধু মুন্ডু। শক্ত বাহু আর গলার রগগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠছিল ঘামে ভেজা শরীরে।
বরাবরের মতো চুলগুলো উপরে টেনে ছোট ঝুঁটি করে বাঁধা। চোখে কালো চশমা আজ নেই । অভীকে প্রায় কখনোই এই চশমা ছাড়া দেখা যায় না। যেন ওটার আড়ালেই লুকিয়ে রাখে নিজের চোখের আসল ভাষা।
গরমে বিরক্ত হয়ে একটা সিগার ধরায় সে। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছাড়তে ছাড়তে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নোবেলের দিকে না তাকিয়েই বলে,

“জোরে বাতাস কর। আর ফ্যানটা কালকেই ঠিক করাবি।”
পাশে দাঁড়িয়ে হাতে পাখা করা নোবেল মুখ বলে,
“ভাই, একটা এসি লাগায় ফেলেন না।”
কথাটা শুনেই অভী ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় তার দিকে। চোখে বিরক্তিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
ভ্রু কুঁচকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে,
“আজকে এসি লাগাই, আর কালকে পুলিশ রেড মারুক। ভালোই বুদ্ধি শালার ভাই।”
নোবেল মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে। আর অভী বিরক্ত ভঙ্গিতে সিগারের ছাই ঝেড়ে আবার হেলান দিয়ে বসে বসে টাকার হিসাব করতে থাকে।
নোবেল কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অভীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে হাতের পাখাটা নামিয়ে বলে,
“ভাই… একটা কথা কই?”
অভী টেবিলের উপর রাখা টাকার বান্ডিল গুনছিল। গরমে বিরক্ত মুখেই ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“হুম।”
নোবেল গলা নিচু করে বলে,

“আপা মনিরে আজকে এমন জায়গায় নিলেন… কিছুই তো বুঝলাম না।”
কথাটা শুনে অভী কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর টাকার বান্ডিলগুলো পাশে রেখে সিগারে লম্বা টান দেয়। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছাড়তে ছাড়তে বলে,
“ওরে ওইখানে না নিলে আমরা জেলে বসে ডাল-ভাত খাইতাম।”
নোবেল কপাল কুঁচকে তাকায়।
“কিন্তু ভাই… ট্রাক ভর্তি মাল কেমনে পাইলো না? পুলিশ চেক করে ও কিছু পাইলো না।”
অভী এবার আর কোনো উত্তর দেয় না। শুধু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
কারণ আসল খেলাটা একমাত্র সে-ই জানে।
গত রাতেই খবর পেয়েছিল শহরের মেইন রোডে বড় চেকপোস্ট বসবে। পুলিশের কড়া তল্লাশি চলবে রাতভর। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই মাথার ভেতর নতুন প্ল্যান ঘুরতে শুরু করে তার।
সেই রাতেই হঠাৎ সবাইকে বলে সে খিচুড়ি খাবে। তারপর গ্যারেজে এক ট্রাক ভর্তি সবজি আনানো হয়। প্রথমে কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। সবাই ভেবেছিল কোনো ডেলিভারির কাজ হবে হয়তো।অভীর ধান্দার তো অভাব। কখনো কাপড়, কখনো কাঁচা মাল, কখনো সবজি, আর সবার আগে গ্যারেজ।
কিন্তু গভীর রাত নামতেই শুরু হয় আসল কাজ।

গ্যারেজের দরজা বন্ধ করে সবাইকে একে একে বের করে দেয় অভী। শুধু নিজের হাতে কাজ করে সে। কয়েকটা বড় সবজির ভেতর সাবধানে অংশ কেটে ফেলে। তারপর ভেতরে ড্রাগ ঢুকিয়ে আবার নিখুঁতভাবে সিল করে দেয়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই কিছু।
এরপর পুরো ট্রাকজুড়ে উপরিভাগে একদম টাটকা ভালো সবজি সাজিয়ে ফেলে সে। যেন সাধারণ বাজারের মাল ছাড়া আর কিছুই না।প্রায় পুরো রাত কেটে যায় এই কাজ করতে করতে।ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গেলেও থামেনি অভী। গ্যারেজের প্রতিটা কাজ নিজে দাঁড়িয়ে শেষ করেছে। এমনকি ট্রাক সাজানোর কাজটাও কাউকে করতে দেয়নি। কারণ একটা ব্যাপারে সে কখনো আপস করে না,, বিশ্বাস।
কারও উপর বিশ্বাস নেই তার।সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় দ্বিতীয় চাল।
আনন্দীকে নিয়ে সে চলে যায় রেডলাইন এলাকায়। সেখানে গিয়ে পুরো নাটকটা সাজানো হয় নিখুঁতভাবে। কারণ সে জানত, ভয় পেলে আনন্দী প্রথমে কাকে ফোন দেবে। আর রেহমান কী করবে।
আনন্দী আর রেহমানের প্রতিটা কথোপকথন, প্রতিটা আতঙ্ক, প্রতিটা পদক্ষেপ, সবই ছিল তাদের হিসেবের মধ্যে।

উন্মাদনা পর্ব ২৬

পুলিশ যখন রেডলাইন এলাকার দিকে ছুটছিল আনন্দীকে উদ্ধারের জন্য, ঠিক তখনই অন্য রাস্তা দিয়ে নির্ভয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল ট্রাক ভর্তি মাল।
আর পুরো শহর ব্যস্ত ছিল একটা মেয়েকে বাঁচানোর গল্পে।সেই সুযোগেই নিজের সবচেয়ে বড় চালটা খেলে দেয় অভী।
কোনো উত্তর না পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে নোবেল।অভী আড়মোড়া কাটিয়ে বলে,
“ ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে।”

উন্মাদনা পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here