Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৩৪

উন্মাদনা পর্ব ৩৪

উন্মাদনা পর্ব ৩৪
কায়নাত খান কবিতা

“ইয়া আলি.. রেহেম আলি..
ইয়া আলি.. ইয়ার পে কুরবা হে সাবভী..!
ইয়া আলি মাদাত আলি.. ইয়া আলি..
এ্যে মেরি জা এ্যে জিন্দেগী, ইশক পে হা..”
গানের তীব্র বীট রাতের নিস্তব্ধতা চিরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই কেঁপে ওঠে পুরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। সাউন্ড বক্সের ভারী শব্দ, বাইকের গর্জন আর মানুষের উন্মাদ চিৎকার মিলেমিশে জায়গাটাকে যেন যুদ্ধ’ক্ষেত্রে পরিণত করে।পরের মুহূর্তেই চারটা বাইক আগুনের গোলার মতো ছুটে যায় সামনে।রাস্তার দু-পাশে দলের ছেলেরা। পাশে অন্ধকার গুদাম, মরিচা ধরা কনটেইনার, ভাঙা ট্রাক আর দূরে নদীর কালো পানি। মাঝে মাঝে ঝিম ধরা
ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ে রাস্তার উপর। আর সেই আলো কেটে চারটা বাইক ছুটে চলতে থাকে মৃত্যুর গতিতে।পুরান ঢাকার এই নাইট রান শুধু রেস না। এটা ক্ষমতার মাপজোক। কে কতটা ভয়ংকর, কে কতটা দখল নিতে পারে সেই ঘোষণা।

তাই চারজন রাইডারের চোখ শুধু রাস্তার উপর ছিল না। ছিল একে অপরের উপর। যেন সামনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না, বরং বহু বছরের শত্রু ছুটছে।
অভী বাইকটা আরও নিচু করে চালাতে থাকে। বাতাসে তার জ্যাকেট উড়তে থাকে পেছনে। চোখের সামনে শুধু রাস্তা না, জুলফিকার ও।এই শহরে একমাত্র মানুষ, যাকে সে কখনো পুরোপুরি হারাতে পারেনি।আর জুলফিকার?সে সম্পূর্ণ স্থির। তার চালনায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে রেস করছে না, হিসাব কষছে। কোন বাঁকে কাকে কাট’বে, কোথায় কার নার্ভ ভাঙ’বে। সব যেন আগেই মাথায় এঁকে রেখেছে।
পেছন থেকে কালু মাস্তান হঠাৎ বাইক ঘুরিয়ে দুইজনের মাঝখানে ঢুকে পড়ে। তার বাইকের সাইলেন্সার থেকে আগুনে’র ফুলকি বের হতে থাকে। লোকটা সবসময় বিশৃঙ্খলায় বিশ্বাসী। সে জানে, দুই হিংস্র জন্তুর মাঝখানে আগু’ন ধরিয়ে দিতে পারলেই খেলাটা জমে যায়।
অন্যদিকে সুফি হাওলাদার সবচেয়ে পিছনে থেকেও সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর লাগছিল তাকে। বয়স তার গতি কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অভিজ্ঞতা ধারালো করেছে চোখ। পুরান ঢাকার পুরোনো রাইডাররা বলে সুফি বাইক চালায় না, রাস্তার নিঃশ্বাস পড়ে।চারটা বাইকের গতি বাড়তেই বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেটের ছেলেগুলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে। কেউ বাজির টাকা উঁচু করে ধরে । কেউ লাইভ করতে থাকে । কেউ আবার শুধু তাকিয়ে আছে শ্বাস আটকে।কিন্তু মজার বিষয় হলো। তাদের চোখেও আলাদা যু’দ্ধ চলছিল।

কৃষ্ণ দাসের লোকেরা চোখ দিয়ে পিষে মার’ছিল চন্দ্র দাসের দলকে। বাতাসি বেগমের ছেলেরা সুযোগ খুঁজছিল কখন দুই দলের সংঘ’র্ষ লাগবে। আর আবুল বাশারের পুরোনো সৈনিকেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, যেন তারা জানে।শেষ হাসি কে হাসবে।এই রেসে বাইকের স্পিডই সব না।এখানে কৌশলই আসল অস্ত্র।পুরো রুটটা এমনভাবে বানানো, যেখানে শুধু দ্রুত চালালেই জেতা যায় না। পুরান ঢাকার সরু রাস্তা, হঠাৎ বাঁক, পুরোনো ড্রেনের ঢাকনা, অন্ধকার গলি।সবকিছু মাথায় রেখে চালাতে হয়।
কোথাও আগে ব্রেক কষতে হয়, যেন বের হওয়ার সময় গতি বেশি পাওয়া যায়। কোথাও ইচ্ছে করে বাইক পিছলে দিতে হয়, যাতে পেছনের লোক ভয় পেয়ে স্পিড কমায়। আবার কোথাও রাস্তার মাঝখানে না গিয়ে একদম দেয়াল ঘেঁষে কাট নিতে হয়, কারণ সেখানেই কয়েক সেকেন্ড বাঁচে।আর সেই কয়েক সেকেন্ডই ঠিক করে দেয়।এক বছরের হাফ গোডাউন কার হাতে যাবে।

অভী আর জুলফিকার তখন একদম পাশাপাশি।দুই বাইকের চাকা প্রায় একে অপরকে ছুঁয়ে যেতে থাকে । দেখে মনে হয় এটা রেস না।দুই শত্রুর বহু বছরের জমে থাকা রক্তক্ষরণের হিসাব।
একবার অভী সামনে যায়। পরের মুহূর্তেই জুলফিকার বাইক কাত করে আবার সমান হয়ে আসে। দুইজনের চোখে তখন একই আগুন।পুরোনো শত্রুতা।যে শত্রুতার শুরু হয়েছিল কিশোর বয়সে।বয়সের সঙ্গে ক্ষম’তা বেড়েছে, নাম বেড়েছে, ভ’য় বেড়েছে।কিন্তু ঘৃণা’টা কমেনি। বরং আরও নিখুঁত হয়েছে।
হঠাৎ অভী বাইকটা জুলফিকারের গা ঘেঁষে নিয়ে যায়।পরের মুহূর্তেই জুলফিকার বুঝে ফেলে চালটা। সে বাইক কাত করে এমনভাবে কাট নেয়, যেন দুই বাইক একে অপরকে ছুঁয়েও আলাদা হয়ে যায়।দুই বাইকের বডি ঘষা খেতেই আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ে রাস্তায়।সেই দৃশ্য দেখে সামনে থাকা কালু মাস্তান বিকৃতভাবে হাসতে থাকে। যেন সে অপেক্ষাই করছিল কখন রেসটা রক্তা’ক্ত হবে।তারপর সে বাইকের গতি কমিয়ে দেয়। অভী এবং জুলফিকার তাকে ওভারটেক করে।সুফি তখনও চুপচাপ।
কারণ পুরোনো খেলোয়াড়রা জানে।রেসের শুরুতে রাগ দেখানো যায়, শেষে না।শেষ বাঁকটাই আসল মৃ:ত্যু।বাতাস তখন আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা সীমা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। বাইকের শব্দে চারপাশের কুকুর পর্যন্ত চমকে পালাচ্ছিল।চারটা বাইক একসাথে উড়তে উড়তে ঢুকে পড়ে সদরঘাটের দিকের পুরোনো বাঁকানো রাস্তায়।

রাস্তার একপাশে অন্ধকার নদী। অন্যপাশে সারি সারি বন্ধ গুদাম।আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অভীর চোখে পড়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ট্রাকটা।রাস্তাটার অর্ধেক জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা।আর বাকি অর্ধেক?সেখানে পাশাপাশি ঢোকার জায়গা নেই চারটা বাইকের। ট্রাকটা হঠাৎ করেই সামনে এসে পড়ে।পুরো রাস্তা প্রায় আটকে যায় মুহূর্তেই।
রাতের ফাঁকা রাস্তায় বিশাল কনটেইনার ট্রাকটা ধীরে ধীরে ঘুরছিল। তার হেডলাইটের সাদা আলো কুয়াশার মতো ধোঁয়া কেটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সামনে থেকে দেখলে মনে হয়, একটা চলন্ত দেয়াল রাস্তার বুক চিরে দাঁড়িয়ে গেছে। মূলত এটা ও রেসেরই অংশ!
জুলফিকার প্রথমে স্পিড কমায়। কালু মাস্তান গা’লি দিয়ে বাইক কাত করে। সুফি অনেক আগেই হিসাব কষে গতি নামিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু অভী।সে ব্রেক চাপে না।বরং আরও নিচু হয়ে বাইকের ট্যাংকের উপর শরীর শুইয়ে দেয়। চোখ দুটো স্থির হয়ে যায় ট্রাকের নিচের ফাঁকা অংশে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই মাথার মধ্যে হিসাব কষে ফেলে সে।ট্রাকের নিচের উচ্চতা। বাইকের ফ্রন্ট সাসপেনশনের লেভেল। চাকার এঙ্গেল। রাস্তার ঢাল সব কিছু ।তারপর আচমকা সে বাইকের সামনের ব্রেক হালকা চেপে শরীরের পুরো ওজন সামনে নামিয়ে দেয়। এতে বাইকের সামনের অংশ নিচু হয়ে আসে। একই সঙ্গে সে হ্যান্ডেল একটু কাত করে বাইকটাকে প্রায় রাস্তার সঙ্গে লেপ্টে ফেলে।পরের মুহূর্তেই অভী ট্রাকের নিচ দিয়ে ঢুকে যায়।চারদিকে চিৎকার পড়ে যায়।বাইকের উপরের অংশ ট্রাকের নিচের লোহার সঙ্গে ঘষা খেতে থাকে। বিস্তার ছড়িয়ে আ’গুনের ফুলকি ছিটকে পড়ে চারদিকে। সাইলেন্সার রাস্তার সঙ্গে ঘষা খেয়ে বিকট শব্দ তুলতে থাকে।যেন একটা মানুষ না, আগুনে মোড়া কোনো দানব লোহার নিচ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে।ট্রাকের অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই বাইকটা ভারসাম্য হারায়।

কারণ ট্রাকের নিচে ঢোকার সময় সে অতিরিক্ত নিচু হয়ে গিয়েছিল। বের হওয়ার মুহূর্তে সামনের চাকা রাস্তার খানাখন্দে আঘাত করে।অভী বাইকসহ ছিটকে পড়ে যায় রাস্তায়।তার শরীর কয়েক হাত গড়িয়ে যায়। ডান হাতের চামড়া উঠে রক্ত বের হতে থাকে। হাঁটু রাস্তার সঙ্গে ঘষা খেয়ে ছিঁড়ে যায় প্রায়। পেটের পাশ কেটে জ্বালা করতে থাকে আগুনের মতো।হেলমেট রাস্তার সঙ্গে আঘাত খেয়ে বিকট শব্দ তোলে।
কয়েক সেকেন্ড পুরো পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে যায় তার কাছে।শুধু কানে ভেসে আসছিল ইঞ্জিনের শব্দ।অভী দাঁত চেপে মাটিতে পড়ে থাকে। তারপর নিজের র’ক্তা’ক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় নিজেকেই গালি দেয়।
“ফা’কিং ট্রাক!…”

তার বুক দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে। কিন্তু চোখে ভয় ছিল না। বরং অদ্ভুত এক রাগ।ঠিক তখনই সে মাথা তুলে দেখে, ট্রাকের জন্য বাকিরা আটকে গেছে।জুলফিকার বাইক ঘুরিয়ে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে। কালু গতি কমিয়ে দিয়েছে। সুফি হিসাব কষছে।অভীর ঠোঁট ধীরে ধীরে বাঁকা হয়ে ওঠে।
“ মাদারবোর্ড রা এতো পিছে! …”
সে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়। পেটের ব্যথা’য় শরীর কেঁপে ওঠে, তবু থামে না। রক্তাক্ত হাত দিয়েই বাইকটা টেনে তোলে।হ্যান্ডেল বাঁকা। সাইড বডি ভাঙা। সাইলেন্সার ঘষা খেয়ে প্রায় ছিঁড়ে গেছে।তবু বাইক স্টার্ট নেয়।পরের মুহূর্তেই আবার ছুটে যায় অভী।এবার আগের চেয়েও ভয়ংকর গতিতে।রাস্তার বাতাস যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল তার বাইকের গতিতে। চোখের সামনে তখন শুধু শেষ লাইন।দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন চিৎকার শুরু করে দেয়।

“চাঁদ ভাই!চাঁদ ভাই আইতাছে!”
কৃষ্ণ দাসের ঠোঁটেও ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে। সে বুঝে গিয়েছিল।রেস তার ছেলেই জিতছে।অভী তখন প্রায় ফিনিশ লাইনের সামনে।ঠিক সেই মুহূর্তে,ডান পাশ থেকে বজ্রপাতের মতো শব্দ তুলে আরেকটা বাইক সমান হয়ে আসে জুলফিকার।
কখন যে সে আবার এতটা কাছাকাছি চলে এসেছে, কেউ বুঝতেই পারেনি।অভী তাকায়।জুলফিকারও তাকায় তার দিকে।দুইজনের চোখে তখন একই জিনিস, জেদ।বহু বছরের ঘৃণা।আর একে অপরকে হারানোর নেশা।পরের মুহূর্তেই দুটো বাইক একসাথে দড়ি ছিঁড়ে ওপারে চলে যায়।পুরো জায়গা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।কেউ বুঝতে পারে না। কে আগে গেছে।তারপর চারদিক ফেটে পড়ে চিৎকারে।
“চাঁদ ভাই জিতছে!”
“প্রিন্স ব্রো আগে গেছে!”
“মিথ্যা কথা!”
“চোখ দিয়া দেখছস?!”

দুই দলের লোকজন একে অপরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কারও হাতে রড। কারও কোমরে অ’স্ত্র। চোখে চোখ পড়তেই মনে হচ্ছিল, এখনই র’ক্ত পড়ে যাবে।কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।তার হাতে জ্ব’লন্ত সি’গার। চোখে ভয়ংকর রাগ।অন্যদিকে চন্দ্র দাসও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল না। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে। চোখ সরু হয়ে গেছে।এই দুই মানুষের শত্রুতার শুরু আজকের না।
“রেস জিতছে আমার চাঁদ!”
সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্র দাস ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,
“আগে দড়ি পার হইছে প্রিন্স। চোখ ঠিক কইরা দেখেন!”
“ হরি রে হরি! মানুষরে দিলা চোখ। দিলা না বুদ্ধি।”
“ এতোদিন তো জানতাম চোখ দিয়েই দেখে। আপনি আবার ব্রেন দিয়া দেখা শুরু করলেন না-কি দাদা ভাই?”

পরিস্থিতি মুহূর্তেই গরম হয়ে ওঠে।দুই দলের লোকজন একে অপরকে উসকাতে থাকে। পুরোনো রাগ যেন আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।সি’সফায়ার চলছে বলেই কেউ অ’স্ত্র বের করে না। না-হলে সেই রাতেই কেরানীগঞ্জের রাস্তা র’ক্তে ভেসে যেত।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আবুল বাশার লাঠিতে ভর দিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। চোখে সুরমা, মাথায় টুপি, গলায় তাজবিহ। তার উপস্থিতি এখনও এমন, মানুষ অজান্তেই চুপ হয়ে যায়।তিনি ধীরে ধীরে চারপাশে তাকিয়ে বলেন,
“রায় খান সাহেব দেগা! কাল।”
এক কথাতেই আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায় জায়গাটা।কেউ প্রতিবাদ করে না।কারণ পুরান ঢাকার অন্ধকার দুনিয়ায় এখনও একটা নাম আতঙ্কের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়।খান সাহেব।লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছে, কেউ ঠিক জানে না। কিন্তু তার এক কথায় গুদাম বদলায়, এলাকা বদলায়, এমনকি মানুষও হারিয়ে যায়।
“ফেসলা খান সাহেব দেগা। কাল! আপাতত তুৃম লোগ তামাশা মাত কারো। যে যার বাড়ি যাও। ঠিক হে?”

“বাশার মিয়া ভাই! আপনে কইতাছেন তাই যাইতাছি। নাহলে আদায় আমি ও করবার পারি!”
কৃষ্ণ দাসের গলায় তখন চাপা আ’গুন। বয়স বাড়লেও লোকটার চোখের দৃষ্টি আজও ধারালো। গলায় মোটা স্বর্ণের চেইন, আঙুলভর্তি আংটি, সিগা’রের ধোঁ’য়ায় ঢাকা মুখ।তবু তাকে দেখলেই বোঝা যায়, পুরান ঢাকার অন্ধকার গলিগুলো একসময় এই লোকটার নাম শুনেই নিস্তব্ধ হয়ে যেত।তার কথা শেষ হতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দ্র দাস ঠান্ডা হেসে মাথা কাত করে তাকায়। সেই হাসির ভেতরে বি’ষ ছিল।
“আদায় আর দুর্নী’তির তফাৎ বোঝার ক্ষমতা ভগবান তো আপনারে দেয় নাই কৃষ্ণ বাবু।”
‘ তোরে তো ঘিলুই দেই নাই!’
মাঝ থেকে রেগে বাশার মিয়া বলে ওঠে,
‘আহহ! আব সব কথা কাল হবে। কই এক বাত নেহি কারে গা। যাও সবাই!’

দু-জনেই নিজেদের রাগ দমিয়ে ফেলে।কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে। তার পাশে অভী দাঁড়িয়ে। মুখে র’ক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, হাতের চামড়া ছি’লে গেছে, পেটের কাছে জ্যাকেট ছিঁড়ে র’ক্ত জমাট বেঁধে আছে। কিন্তু চোখে ক্লান্তি নেই। বরং সেই উন্মাদ আ’গুন আরও তীব্র হয়েছে।
অন্যদিকে চন্দ্র দাসের পাশে দাঁড়িয়ে জুলফিকার। হেলমেট হাতে, নিঃশ্বাস ভারী, তবু মুখ অদ্ভুত শান্ত। যেন কয়েক মিনিট আগে মৃ’ত্যুর সঙ্গে রেস করে এসেছে সে।কেউ নিশ্চিত না।শেষ দড়িটা আগে কে পার হয়েছে।কারণ শেষ মুহূর্তে দুটো বাইক প্রায় একসাথেই ঢুকেছিল ফিনিশ লাইনে।আর সেই কারণেই সমস্যা আরও বড় হয়েছে।পুরান ঢাকার ইতিহাসে এই রেস শুধু রেস না। এটা ক্ষমতার মাপ। আধিপত্যের বিচার। কে এক বছরের জন্য হাফ গোডাউন চালাবে, কার নামে বন্দরে মাল নামবে, কার কথায় রাতের চালান যাবে।সব নির্ভর করে এই এক রাতের উপর।

উসমান সাহেব বেঁচে থাকতে নিয়ম ছিল একটাই। রেসের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না।কিন্তু উসমান সাহেব মা’রা যাওয়ার পর পুরান ঢাকা আর আগের মতো থাকেনি।একসময় কৃষ্ণ দাস আর চন্দ্র দাস একই টেবিলে বসে ব্যবসা করত। একজন হিসাব বুঝত, আরেকজন রাস্তা। একজন মানুষ কিনত, আরেকজন ভয়। উসমান সাহেবের ছায়ার নিচে তারা ছিল একই মুদ্রার দুই পিঠ।কিন্তু ক্ষমতা মানুষকে সবচেয়ে আগে লোভ শেখায়।
উসমান সাহেবের লা’শ বুড়িগঙ্গায় ভেসে ওঠার পর থেকেই পুরান ঢাকা ভাগ হতে শুরু করে। গুদা’ম ভাগ হয়। ঘাট ভাগ হয়। চালান ভাগ হয়। তারপর একসময় ভাগ হয়ে যায় মানুষও।হি’ন্দু সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় কৃষ্ণ দাস আর চন্দ্র দাস। কিন্তু সমস্যা হলো দুজনের কেউই কারো নিচে থাকতে রাজি ছিল না।সেই শত্রুতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।গলি দখল নিয়ে খু’ন হয়।চালান লু’ট হয়।মানুষ নিখোঁ’জ হয়।রাতের পর রাত আগু’ন জ্বলে ওঠে পুরান ঢাকার আকাশে।

আর সেই অন্ধকার সময়েই দুইজন নতুন ছেলের উত্থান হয়।অভী আর জুলফিকার।কৃষ্ণ দাস নিজের মৃত ছেলের নামেই অভীর নাম রাখে চাঁদ। কারণ ছেলেটার মধ্যে সে ভয় দেখেছিল। সেই ভয়, যেটা মানুষকে নেতৃত্ব দেয়।অন্যদিকে চন্দ্র দাস প্রথম দিন থেকেই জুলফিকারের হাঁটা, কথা বলা, চোখের স্থিরতা দেখে তাকে প্রিন্স ডাকা শুরু করে। কারণ জুলফিকারের ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক আলফা স্বভাব। সে চিৎকার করে ভয় দেখাত না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেই মানুষকে থামিয়ে দিতে পারত।তারপর থেকেই শুরু হয় তাদের ভয়ংকর যাত্রা।একজন আগুন।আরেকজন বরফ।

কিন্তু আজকের রাতের মতো এত কাছাকাছি তারা আগে কখনো আসেনি।দুইজন প্রায় মুখোমুখি হয়ে যায়।চারপাশের লোকজনও গরম হয়ে ওঠে। কেউ নিজের দলের নাম ধরে চিৎকার করছে, কেউ উসকানি দিচ্ছে। কয়েকজন তো কোমরে হাত নিয়েও ফেলেছে।ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝখান থেকে তালি দেওয়ার শব্দ ভেসে আসে।সবাই তাকিয়ে দেখে বাতাসি বেগম কোমর দুলাতে দুলাতে সামনে আসছে। চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক, হাতে চুড়ির ঝনঝন শব্দ।সে বিরক্ত মুখে চারপাশে তাকিয়ে বলে,
“আল্লাহ গো আল্লাহ… কী ঝগ’ড়া করে এরা! ইফ! এই বাশার ভাই, আমি গেলাম। চোখের নিচে কালো দাগ পড়বে। হুমম!”

কথা শেষ করে ঠোঁট থেকে পানের পিক ছুড়ে ফেলে সে। তার গুনগুন করে গাইতে গাইতে সামনের দিকে নিজের দল নিয়ে ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকে বাতাসি বেগম
‘ আগু’ন লাগাইলো রে টিংকু.. আ’গুন লাগাই লো…..!’
তার চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে।কারণ সবাই জানে।এখন যদি মা’রামারি শুরু হয়, সি’স ফায়ার ভেঙে যাবে। আর সিস ফায়ার ভাঙা মানে পুরো পুরান ঢাকায় আবার র:ক্তের বন্যা।তাই শেষ পর্যন্ত সবাই চুপ হয়ে যায়।কিন্তু চুপ হতে পারে না অভী আর জুলফিকার।দূর থেকে দাঁড়িয়ে তারা শুধু একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকে।কারণ তারা দুজনই জানে।আজকের রেস শেষ হয়নি।এটা কেবল শুরু।
এক এক করে সবাই নিজেদের গাড়িতে উঠে বসতে শুরু করে। ইন্ডা’স্ট্রিয়াল জোনের বাতাসে তখনও পো’ড়া রাবারের গ’ন্ধ, গরম ইঞ্জি’নের ধোঁয়া আর চাপা উত্তেজনা ভাসছে। রেস শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কারও মুখে শান্তি নেই। কারণ বিজয়ীর নাম এখনো ঝুলে আছে।কৃষ্ণ দাস নিজে এগিয়ে এসে অভীর হাত চেপে ধরে গাড়িতে উঠতে বলে। তার কণ্ঠে বির’ক্তি থাকলেও ভেতরে চিন্তা স্পষ্ট।
“চাঁদ, চল। আগে হাতটা দেখাইতে হইবো।”

অভী কোনো উত্তর দেয় না। তার মাথা তখনো আগু’নের মতো গরম। ডান হাতের চাম’ড়া প্রায় উঠে গেছে। কনুইয়ের পাশ দিয়ে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। টি-শার্টের নিচে পে’টের অংশেও কে’টে গেছে কয়েক জায়গা। কিন্তু যেন ব্য’থা বলে কিছুই অনুভব করছে না সে।কৃষ্ণ দাস আবারও জোর করে টান দেয়।
“ডাক্তারের কাছে যাইতে হইবো।”
অভী ধীরে ধীরে হাত ছাড়িয়ে নেয়। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যেটা দেখে আশপাশের লোকজনও চুপ হয়ে যাবে। তারপর কোনো কথা না বলে সোজা নিজের জীপের দিকে হাঁটতে শুরু করে।নোবেল দৌড়ে পিছন পিছন আসে,
“ভাই! হাত দিয়া তো র’ক্ত পড়তাছে খুব!”
অভী জীপের দরজা খুলতে খুলতেই দাঁত চেপে বলে ওঠে,
“মা’ল দে।”

নোবেল কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। তারপর তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে এক বোতল ম’দ বের করে তার হাতে দেয়।অভী ঢাকনা খুলে এক মুহূর্তও দেরি করে না।সম্পূর্ণ বোতলটাই ঢেলে দেয় নিজের কা’টা হাতে।
পরের মুহূর্তেই তীব্র জ্বা’লায় হাতের রগ ফুলে ওঠে। র’ক্তের সঙ্গে মদ মিশে গড়িয়ে পড়ে নিচে। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
ইতিহাসে হয়তো প্রথম পুরুষ অভীই। যে কি-না হাত কেটে গেলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজের ক্ষতে ম’দ ঢালে।
অভী নিচু গলায় নিজেকেই গা’লি দেয়। তারপর জীপে উঠে বসে দরজায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে।তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“বিলকিসের কাছে যা।”

রাতের পুরান ঢাকা পেছনে ফেলে গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকে শেষ প্রান্তের দিকে। পুরোনো গলি পেরিয়ে, আধো অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে, শেষে গিয়ে থামে এক পুরোনো বাইজি বাড়ির সামনে।
বাইজী বিলকিসের আসর।পুরান ঢাকার অন্ধকার জগতের মানুষদের কাছে জায়গাটা শুধু নাচগানের মাচা না।এটা এক ধরনের আশ্রয়। যেখানে খু’নি এসে গান শোনে, সিন্ডি’কেটের লোকেরা এসে কান্না লুকায়, আর মা’তাল পুরুষেরা নিজের ভাঙা হৃদয় ভুলতে চায়।
বিলকিস বহুদিন ধরেই অভীর অপেক্ষায় ছিল।মাঝে কয়েকদিন নিয়ম করে এসেছিল সে। মাচার উপরে উঠে বিলকিসের সঙ্গে কোমর মিলিয়ে নেচেছে, গান ধরেছে, পুরো আসর মাতিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যায়।বিলকিস অভীর বাড়িতে গিয়েও তাকে পেতো নাহ!
আজ এতদিন পর আবার সেই জীপটা এসে থামতেই বিলকিসের চোখ চকচক করে ওঠে।
মাচার চারপাশ তখন মানুষে ভর্তি। কেউ পান খাচ্ছে, কেউ নেশার ধোঁয়া ছাড়ছে, কেউ শুধু বিলকিসের নাচ দেখছে মুগ্ধ হয়ে মাচার চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অভী গাড়ি থেকে নামতেই বিলকিস সাউন্ড বাড়ানোর জন্য ইশারা করে।পরের মুহূর্তেই ঢোলের তালে তালে গানের সুর ভেসে ওঠে চারদিকে,

“Ra Jamundry raaga man jari
Maayama peru telvanollu levu meestiri…
Kala kalaarla family Mari
Nee gajja kadithe nirdrapodu ninda rathiri..!”
বিলকিস কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করে নিজের দলের মেয়েদের নিয়ে। তার পায়ের নূপুরের শব্দ যেন গানের বিটের সঙ্গে মিশে যায়।
অভী ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসে। রক্তাক্ত হাত। এলোমেলো চুল। চোখে ক্লান্ত আগুন।তারপর মাচার একপাশে উঠে দাঁড়িয়ে গানের সুরেই বলে ওঠে,
“Salulaadi Swapnashundari..Nee adathachoopu maapatela malle pandiri…Raccha raa jukunde oo piri Nee vanka chuste gundelona diri diri diri..!”
ভিড় মুহূর্তেই চিৎকার করে ওঠে।বিলকিস হাসতে হাসতে দৌড়ে আসে তার দিকে। কিন্তু অভী তাকে পাশ কাটিয়ে সুরে সুর মিলিয়ে আরও গেয়ে ওঠে,

“Ee thooniga nadumulonaa thaootaletti thaupaki pelchinave… Thingari chitti maga jaathinatta madathaletti..”
বিলকিস এবার আর নিজেকে আটকাতে পারে না। অভীর সামনে এসে ঘুরে দাঁড়ায়। দুজনের চোখে চোখ আটকে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য।তারপর একসঙ্গে নাচের মুদ্রা অনুসরণ করতে করতে গেয়ে ওঠে।
“Aa kurchini madhatha petti..
Aa kurchini madhatha petti..
Madhatha petti.. madhatha petti..!”
চারপাশের পুরো আসর তখন উন্মাদ হয়ে গেছে। কেউ টাকা ছুড়ছে, কেউ হাত তালি দিচ্ছে, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে দেখছে।অভী আর বিলকিস যেন পুরো জায়গাটাকে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে।ঠিক তখনই অভী হঠাৎ থেমে যায়।তার চোখ ভিড়ের মাঝখানে আটকে যায়। মানুষ ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটা মেয়ে।সাউথ স্টাইলে হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি পরা। কোমরে কোমরবন্ধ। হাতে চুড়ি। মাথা সামান্য কাত করে হাঁটছে।আনন্দী।অভীর বুক ধক করে ওঠে।আনন্দী এগিয়ে এসে একদম তার সামনে দাঁড়ায়। তারপর কলার চেপে নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে গানের সুরেই বলে ওঠে,

“Daanikemo mari daanikemo
Daanikemo mekal estivi..
Mari naakemo sanna biyyyam nookaliativi…”
তারপর অভীকে ধাক্কা দিয়ে ভিড়ের মাঝে ঢুকে যায়।চারপাশের মেয়েদের সঙ্গে নাচতে নাচতে গেয়ে ওঠে,
“Mekualemlo vandalauga mandaluga perigipayee..
Naakcchina nookalemo
Okkapootaki karigipaaye..!
Ada paccharaalla jookalistivi..
Mari naakemo ohukagalla kokalistivi..!”
অভীর চোখ তখন শুধু আনন্দীর উপর।ভিড়ের মাঝেও যেন মেয়েটাকে আলাদা করে জ্বলতে দেখা যায়।অভী হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে আনন্দীর হাত টেনে নিজের বুকের কাছে এনে ফেলে।চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।আনন্দী দুই হাত তুলে জড়িয়ে ধরে অভীর গলা।তারপর খুব কাছে এসে গেয়ে ওঠে,

“Em Rasika Raajuvomaari naa dasu bava neetho
Yepudu inka kirkiri..”
অভীর বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত ঝড় বয়ে যায়।সে ধীরে ধীরে হাত তুলে আনন্দীর গালে ছুঁতে যায়।ঠিক তখনই কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাকে ডাকে বিলকিস।
“অভী!”

উন্মাদনা পর্ব ৩৩

অভী চমকে উঠে চারপাশে তাকায়।গান চলছে।মানুষ নাচছে।বিলকিস তার সামনে দাঁড়িয়ে।কিন্তু আনন্দী নেই।কোথাও নেই।পুরো ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই ভিতরটা শূন্য লাগতে শুরু করে অভীর।সে ধীরে ধীরে মাচা থেকে নেমে বাইরে চলে আসে।রাতের বাতাস বুক ভরে টানতে থাকে।কেন এমন অদ্ভুত লাগছে তার, সে নিজেও বুঝতে পারে না।
তারপর আচমকা বুকের উপর হাত চেপে নিচু গলায় বলে ওঠে,
“বান্দীরে লাগবো রে…
বান্দীরে লাগবো…”

উন্মাদনা পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here