Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৫৩

উন্মাদনা পর্ব ৫৩

উন্মাদনা পর্ব ৫৩
কায়নাত খান কবিতা

“ এই জন্য তো এখনও মই ডলা দেই নাই!”
অভী এবং বাতাসি বেগমের কথোপকথনের আগামাথা কিছুই বুঝতে না পেরে আনন্দী বেশ কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মই ডলা বিষয়টা ঠিক কী, সেটাই যেন তার মাথায় ঢুকছিল না। শব্দ দুটো মনে মনে বার কয়েক আওড়েও কোনো অর্থ খুঁজে পেল না সে। বরং রহস্যটা যতই বোঝার চেষ্টা করছে, ততই যেন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গভীর চিন্তার অতলে ডুবে থাকা আনন্দী হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখেই বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত, অথচ পরিচিত অনুভূতি জেগে উঠতে লাগল তার। এই মুখ সে আগে কোথাও দেখেছে। নিশ্চিত দেখেছে। কিন্তু কোথায়?স্মৃতির অলিগলিতে মরিয়া হয়ে খুঁজেও কিছুতেই মনে করতে পারল না আনন্দী।তার ভাবনার মাঝেই জুলফিকার ঘরে প্রবেশ করে। তার সঙ্গে ছিল চন্দ্রদাসও।
সিন্ডিকেটের নিজস্ব কিছু নিয়ম রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও, বহু পুরোনো সেই নিয়মগুলোর কিছু আজও অটুট। তারই একটি হলো সমঝোতা।

উসমান সাহেবের আমল থেকেই এই রীতি চলে আসছে। সিন্ডিকেটের কোনো সদস্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে, কারও ঘরে নতুন প্রাণের আগমন ঘটলে কিংবা কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে, সবাইকে একত্রিত হতে হয়।সেই মুহূর্তে ব্যক্তিগত বিরোধের কোনো মূল্য থাকে না। পুরোনো শত্রুতা, অভিমান কিংবা রক্তের হিসাবও জায়গা পায় না সেখানে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকে কেবল সিন্ডিকেটের ঐক্য।কারণ, তাদের কাছে সম্পর্কের চেয়েও বড় তাদের বন্ধন, আর ব্যক্তিগত হিসাবের চেয়েও বড় সিন্ডিকেটের নিয়ম। সেই নিয়ম ভাঙার অধিকার কারও নেই।
সমঝোতার অর্থ একটাই, এই সময় কেউ কারও শত্রু হবে না। কোনো সদস্য অন্য কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক আচরণ করতে পারবে না। ব্যক্তিগত বিরোধ, প্রতিশোধ কিংবা পুরোনো রক্তের হিসাব সবকিছুকেই এই সময়ের জন্য পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। নিয়ম ভাঙলে কার্যকর হবে ‘সিসফায়ার’-এর কঠোর বিধান।
সিন্ডিকেটের কাছে সম্পর্কের চেয়েও নিয়ম বড়, আর নিয়মের চেয়েও বড় তাদের অস্তিত্ব। সেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই বছরের পর বছর ধরে তারা এই নিয়ম মেনে এসেছে।

চন্দ্রদাস ঘরের ভেতর পা রাখতেই অভী এগিয়ে যায়। স্বাভাবিক সৌজন্যে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে তাকে ভেতরে আসার ইঙ্গিত করে। অভীর আচরণে বাড়তি কোনো আন্তরিকতা নেই, আবার অশ্রদ্ধাও নেই। কেবল প্রয়োজনের সীমারেখায় বাঁধা এক নির্লিপ্ত সৌজন্য।অভী মুসলিম। তাই চন্দ্রদাসকে দেখে নমস্কার কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় অভিবাদন জানানো তার স্বভাবে নেই। সৌজন্যের খাতিরেও নয়। নিজের বিশ্বাস ও পরিচয়ের জায়গায় অভী বরাবরই স্পষ্ট এবং অবিচল। তার কাছে ভদ্রতা মানে নিজের বিশ্বাসকে আড়াল করা নয়।
অন্যদিকে জুলফিকার যেন অভীর সম্পূর্ণ বিপরীত এক সত্তা।অভী যা করে না, জুলফিকার যেন তার প্রায় সবটাই করে। অভী যেখানে নীরবতাকে সঙ্গী করে রাখে, জুলফিকার সেখানে অনর্গল কথায় চারপাশ মুখর করে তোলে। অভী যেখানে মানুষের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দূরত্ব বজায় রাখে, জুলফিকার সেখানে অনায়াসেই সবার সঙ্গে মিশে যায়।

দুজনের স্বভাব যেন দুই ভিন্ন মেরুর। অথচ একই মুদ্রার দুই পিঠের মতোই তারা পাশাপাশি অবস্থান করে। একজনের নীরবতায় যে শীতলতা, অন্যজনের কথায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত উষ্ণতা।অভী আর জুলফিকার, একই বৃত্তের মানুষ হয়েও যেন চরিত্রের দুই বিপরীত প্রান্ত।
চন্দ্রদাস ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাতাসি বেগমের পাশে বসে পড়ল। মুখে তখনও সেই স্বভাবসুলভ স্থিরতা। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে হ্যান্ডব্যাগে হাত ঢুকিয়ে বের করল ছোট্ট একটি বাক্স।বাক্সটি বাতাসি বেগমের হাতে তুলে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,‘বউ রানির জন্য।’
আনন্দীর হাতে বাক্সটি তুলে দেওয়ার আগে বাতাসি বেগম কৌতূহলবশত ঢাকনাটি খুলে একবার দেখে নিলেন। ভেতরে রাখা ঝকঝকে সোনার কানের দুলজোড়া চোখে পড়তেই তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। দুলজোড়া হাতে তুলে আনন্দীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,‘লো ছেরি। তোর কপাল ভালো। চন্দ্র ভাইয়ের মতো চুক্কা মানুষের থেইকা গিফট পাইলি। আমাগো তো সুতা ও দিলো না!’

বাতাসি বেগমের কথা শুনে খুব কষ্টে নিজের হাসি আটকে রাখল আনন্দী। এত গম্ভীর মানুষের ভিড়ে বাতাসি বেগমই বোধহয় একমাত্র মানুষ, যার ভেতরটায় রসিকতা যেন সহজাতভাবেই বাস করে। তাঁর কথা, তাঁর ভঙ্গি, এমনকি সামান্য অভিযোগের মধ্যেও সেই রসিকতার ছাপ লেগে থাকে।
আনন্দী সাদরে গ্রহণ করল দুলজোড়া।ঘরে তখন প্রায় সবাই উপহারটি দেখতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই ব্যস্ততার আড়ালেই অন্য এক দৃশ্য নীরবে জমে উঠেছে।এক ঝলক অভী আর জুলফিকার একে অপরের দিকে তাকাল।দুজনের চোখেই তখন তীব্র রাগ। কথার কোনো প্রয়োজন নেই, ইশারাতেই যেন দুজনের মধ্যে যুদ্ধের ঘোষণা হয়ে গেল।
জুলফিকার ধীরে ধীরে নিজের হাতের কড়াটি একটু ওপরে তুলল। তার অর্থ স্পষ্ট, সময় এলেই সে প্রস্তুত।অভীও কম যায় না। ঠোঁটের কোণে কোনো শব্দ না ফুটিয়েই নিজের ঝুঁটিটা আরও শক্ত করে বেঁধে নিল। তার এই ছোট্ট প্রস্তুতিই যথেষ্ট ছিল জুলফিকারকে জানিয়ে দিতে যে সেও পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়।
দুজন যখন নীরব ইশারা-ইঙ্গিতে নিজেদের প্রস্তুতির জানান দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ঘরের দরজার দিকে সবার দৃষ্টি আটকে যায় ।ঘরে প্রবেশ করল আরেকজন, কৃষ্ণদাস।অভীর অভিভাবক।

কৃষ্ণদাস ঘরে প্রবেশ করতেই মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশের সমস্ত স্বাভাবিকতা যেন হারিয়ে যায়। অদৃশ্য কোনো নির্দেশে একে একে সবার মুখে নেমে এলো নীরবতা। এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে পিন পড়ার শব্দও স্পষ্ট শোনা যেতে পারে।
আবুল বাশার নিজের মেয়ে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে ইশারায় ঘোমটাটা আরও একটু টেনে নিতে বললেন। সাদিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঘোমটা টেনে মুখ আড়াল করে ঘরের এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চন্দ্রদাসও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ায় না। উঠে জুলফিকারকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পরে।শুধু বাতাসি বেগমের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। তিনি যেন এই ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত। আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের জায়গায় বসে রইলেন।
কৃষ্ণদাস ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সামনের সোফাটিতে বসলেন। তারপর সামান্য ইশারা করতেই দুজন লোক বিশাল আকৃতির দুটি ব্যাগ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। ব্যাগ দুটির মুখ খোলা হতেই উপস্থিত সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।ভেতরে সাজানো অসংখ্য ঝকঝকে সোনার অলংকার।
কৃষ্ণদাস আনন্দীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,‘বেটিয়া, আমার চাঁদ কিন্তু আমার জানের টুকরা। হের সামনে এগ্লা তেমন কিছুই না।”

আনন্দী কোনো উত্তর দিল না। শুধু নীরবে মাথা নিচু করে বসে রইল। সামনে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ সোনার অলংকারের দিকে তাকিয়ে তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, এত গহনা দিয়ে সে করবে কী?কৃষ্ণদাস এবার অভীর দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন।অভী সামনে এগিয়ে যেতেই তিনি তাকে আনন্দীর পাশে বসতে বললেন। তারপর দুজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘রাজযোটক। বেশ বানাইছে বাপ তোমার লগে বউরে।’
অভী কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল।কৃষ্ণদাস আবার ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করলেন একটি সোনার কড়া।কড়াটি চোখে পড়তেই অভীর মুখের সমস্ত স্বাভাবিকতা যেন মুহূর্তে মুছে গেল। দৃষ্টিতে নেমে এলো গভীর স্থিরতা। উপস্থিত অন্যরাও কমবেশি চমকে উঠল।কার কড়া এটি, তা সিন্ডিকেটের প্রায় সকলেরই জানা।
কৃষ্ণদাস কড়াটির দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,‘তোমার ভাগ্য কত ভালো, বাজান। উসমান সাহেব এইটা আমাকে দিছিল। আজ আমি তোমারে দিলাম।’

অভী বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কড়াটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটি গ্রহণ করল। তার আঙুলগুলো কড়াটিকে স্পর্শ করতেই চোখের দৃষ্টিতে যেন পুরোনো কোনো স্মৃতির ছায়া এসে থিতু হলো।
কৃষ্ণদাস এবার আনন্দী ও অভীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,‘বাপ মাইয়া কিন্তু খাসা। দেইখা রাইখো।’
কথা শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। নিজের দলবলকে সঙ্গে নিয়ে আস্তানার উদ্দেশে বেরিয়ে গেলেন তিনি।এরপর একে একে অন্যরাও বিদায় নিতে শুরু করে। শেষ মানুষটিও ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আনন্দী যেন বুকভরে শ্বাস নিল। এতক্ষণ গরমের মধ্যে ভারী ঘোমটা টেনে বসে থাকা তার জন্য বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।
অভী উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।আনন্দী আর কোনো আনুষ্ঠানিকতার ধার ধারল না। মাথার ভারী ঘোমটা সরিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ে। কিছুটা স্বস্তি পেতেই তার চোখ আবার ঘরের এক পাশে রাখা গহনার ব্যাগগুলোর দিকে চলে গেল।
অভীও সোফায় এসে বসে। চারপাশের গহনার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে, ‘তোর গহনা দিয়া তো গোসল করা যাইবো রে।’

আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু আড়চোখে একবার তার দিকে তাকায়।কিছুক্ষণ পর এতক্ষণ ধরে মাথায় ঘুরতে থাকা প্রশ্নটি আর চেপে রাখতে না পেরে সে অবশেষে জিজ্ঞেস করল, ‘মই ডলা কী?
অভী কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখে দুষ্টুমি মেশানো হাসি এনে বলল, ‘ যেই ডলা দিলে বউ স্বরবর্ণের উচ্চারন করে..!’
আনন্দী বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘ছি..’
অভীর ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও একটু গভীর হলো। আনন্দী অবশ্য আর তার দিকে তাকাল না আর। বরং সামনে পড়ে থাকা গহনাগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, এই একদিনে তার জীবনটা ঠিক কতটা অদ্ভুত হয়ে গেল।

ভাবতে ভাবতেই আনন্দী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মনের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা যেন একটু একটু করে হালকা হয়ে এসেছে। সে আর দেরি না করে গোসলের জন্য ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায় । দরজার আড়ালে মিলিয়ে যাওয়ার পর ঘরটাও কেমন যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
আনন্দী চলে যাওয়ার পর অভি কিছুক্ষণ সোফায় গা এলিয়ে বসে রইল। চারপাশের নীরবতা তাকে অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। অন্যমনস্কভাবে নিজের হাতের কড়া-টির দিকে চোখ পড়তেই সে সেটার দিকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
কড়াটির গায়ে আঙুল বোলাতে বোলাতে হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। মনে হলো, এতক্ষণে যেন কোনো একটা অদৃশ্য হিসাব তার মনের মধ্যে মিলেছে। তারপর ধীর স্বরে নিজেকেই বলল,“সাগর কিনারা কো ধূন্দনে আহি যাতা হে…”

সকাল গড়িয়ে কখন যে ভরদুপুর হয়ে যায়, আনন্দী টেরই পায় না। একের পর এক মানুষের আসা-যাওয়া, শুভেচ্ছা আর কথাবার্তায় বাড়িটা যেন সকাল থেকেই থামার নামই নিচ্ছে না। সময় যত গড়াচ্ছিল, আনন্দীর ভেতরটায় ততই বিরক্তি জমছিল। অথচ মুখ ফুটে তা প্রকাশ করার উপায়ও ছিল না। এখন সে বিবাহিত। এই বাড়িতে, এই মানুষগুলোর সামনে ইচ্ছেমতো নিজের বিরক্তি প্রকাশ করার স্বাধীনতাটুকুও যেন তার আর নেই। তাই সকলে যেতেই লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে পরে সে।

দুপুরে গোসল সেরে ভেজা কাপড়গুলো হাতে নিয়ে আনন্দী উঠে যায় ছাদে। পুরোনো দোতলা বাড়িটা যেমন একসময়ের জমিদারবাড়ির স্মৃতি বুকে ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে, বাড়ির ছাদটাও তেমনই নিজের বয়সের ছাপ বয়ে চলেছে। রেলিংয়ের গায়ে পুরু হয়ে জমে আছে সবুজ শেওলা, মেঝের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে ছত্রাকের দাগ। চারপাশের স্যাঁতসেঁতে আবহে মিশে আছে বহু পুরোনো দিনের এক অদ্ভুত গন্ধ।
নাক-মুখ কুঁচকে আনন্দী দড়িতে একে একে ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিতে শুরু করে। তারপর গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল সে। মৃদু বাতাসে চুলের ডগাগুলো বারবার উড়ে এসে মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অথচ তার মনটা কেমন যেন অকারণেই ভার হয়ে ছিল। এতো গরম কী আর সহ্য হয়? তার উপরে মৃদু বাতাসি ও যেন শরীর পুড়িয়ে দেওয়ার মতোন।
মনোযোগ দিয়ে চুল মুছতে থাকে আনন্দী। তবে হঠাৎ কয়েক মুহূর্ত পর নাকে এসে লাগে তীব্র এক গন্ধ।
পেছনে না ফিরেও আনন্দী বুঝে যায় , অভী এসেছে।
সিগা:রেটের ধোঁয়ার গন্ধটা এখন তার অচেনা নয়। এই গন্ধের সঙ্গে অভীর উপস্থিতিকে আলাদা করে চেনার অভ্যাস হয়ে গেছে তার।কপাল কুঁচকে আনন্দী আরও জোরে চুল ঝাড়তে লাগল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অভীও কোনো কথা না বলে বেশ কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর হঠাৎ শান্ত, নির্বিকার গলায় বলে উঠল,

“পাঁচ আটা চল্লিশ”
চুল ঝাড়ার গতি থেমে যায় আনন্দীর। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁকা চোখে তাকায় অভীর দিকে।
“ইভটি’জিং করছেন?”
অভী নির্বিকার ভঙ্গিতে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘কই বউ? আমি তো নামতা পড়াতাছিলাম।’

উন্মাদনা পর্ব ৫২

আনন্দী আর কোনো উত্তর দেয় না। মুখ গম্ভীর করে গামছাটাও দড়িতে মেলে দেয়। তারপর এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল, যেন পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অস্তিত্বই তার জানা নেই।কিন্তু অভীও বোধহয় নীরব থাকার মানুষ নয়।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার গলা থেকে ভেসে এলো গুনগুন করে গাওয়া এক গানের সুর, ‘ ওওও..বেহুলা…আমি মরলে আমায় নিয়ে.. ভাসাইয়ো ভেলা..!’
‘ কচু করবো..!’

উন্মাদনা পর্ব ৫৪