উন্মাদনা পর্ব ৫২
কায়নাত খান কবিতা
“ বউ আর টাকা কখনো কাউকে দিতে নাই! একবার হাত ছাড়া হইলে, সহজে পাওয়া যায় না!”
রেহমানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অভী কণ্ঠে বিদ্রূপের ধার মিশিয়ে কথাটি বলে। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে আনন্দীর দিকে তাকাতেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের হাসি।
“তুই তো দেখি একেবারে দারুণ বদমাশ মহিলা! জামাই থাকতে আরেক বেডার হাত ধরস?”
কথাগুলো যেন বি’ষাক্ত তীরের মতো এসে বিদ্ধ করে আনন্দীকে। মুহূর্তেই সে নিঃশব্দে নিজের হাত সরিয়ে নেয়। মাথাটা আরও একটু নুয়ে গেল লজ্জা, অপমান আর অসহায়তার ভারে।কয়েক মুহূর্তের জন্য সে যেন ভুলেই গিয়েছিল বাবার সেই কঠিন কথাগুলো। এলাকার মানুষ সব জেনে গেছে। এখন আর ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখের চেয়েও সম্মানের মূল্য অনেক বেশি। সেই সম্মান একবার হারিয়ে গেলে আর কখনও পুরোপুরি ফিরে আসে না। এই নির্মম সত্যটাই যেন আবার তার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসল। তাই কোনো প্রতিবাদ করল না সে।শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
অন্যদিকে রেহমানের চোখে তখন ক্রোধ ধীরে ধীরে দাবানলের রূপ নিতে থাকে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে তার, মুঠো দুটো অজান্তেই বদ্ধ হয়ে গেছে রেহমানের। কয়েক পা এগিয়ে এসে সে অভীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে গর্জে উঠে বলে, “আনন্দী তোর সঙ্গে থাকবে না, অভী। তোর ছায়ায় থাকলে ও বাঁচবে না।”
অভীর ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠে। যেন রেহমানের প্রতিটি কথাই তার কাছে অর্থহীন।
“যতিষ গিরির কমাই কর, রেহমান ডাকাত! আমার বউরে আমি সামলাতে পারব। সবাই উপকারের পিছুতে লাথি মারে না!”
রেহমানের চোখে ক্ষণিকের জন্য এক অদ্ভুত ঝলক দেখা দেয়। ক্রোধের সঙ্গে যেন মিশে ছিল বহু বছরের চাপা ক্ষত।
“তুই আমার কোনো উপকার করিসনি। এই সত্যটা তুইও জানিস, আমিও জানি।”অভী আর কোনো কথা বাড়াল না। ঠান্ডা, অথচ কর্তৃত্বময় কণ্ঠে বলল,
” ছোটো বেলায় মেমোরি লস হইছিল না-কি? … নাউ, গেট আউট।”
কথা শেষ করেই সে ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দেয় অভী। দরজা লাগার ভারী শব্দে যেন পুরো ঘরটাই কেঁপে উঠে।ঘরের ভেতর নেমে আসে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই আনন্দীর মনে একের পর এক প্রশ্ন মাথা তুলতে লাগল। অভী আর রেহমান কি আগে থেকেই একে অপরকে চিনত? তাদের কথায় যে বহু বছরের হিসাব-নিকাশের ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল, তার অর্থ কী? আর অভী যে ছোটবেলার উপকার এর কথা বলল সেটাই বা কী?প্রশ্নগুলো যেন অদৃশ্য সর্পের মতো তার মনের চারপাশে কুণ্ডলী পাকাতে লাগল। উত্তরগুলো কোথাও আছে কিন্তু সেই উত্তর যেন ইচ্ছে করেই অন্ধকারের গভীরে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে।
আনন্দীর মনের গভীরে যখন প্রশ্নগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে অদৃশ্য গোলকধাঁধা তৈরি করছে, ঠিক তখনই অভী হালকা করে তুড়ি বাজায় তার চোখের সামনে। শব্দটা যেন চিন্তার ঘোর ভেঙে দেওয়া এক ক্ষুদ্র বজ্রপাত।
আনন্দী চমকে চোখ তুলতেই অভী নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথার এলোমেলো চুলের ঝুঁটি খুলে আবার বেঁধে নেয়। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা দুর্বোধ্য হাসি।
“বউ আর বটির মধ্যে তফাৎ খুব বেশি নাই। দুইটাই ধারালো জিনিস।”
আনন্দীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনি আমাকে বটির সঙ্গে তুলনা করলেন?”
অভী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “অন্য কিছুর সঙ্গে করাই উচিত ছিল। কিন্তু ঘরের বউ বলে বটি মনে হইল।”
আনন্দীর চোখে অভিমানের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে ওঠে ।
“মানে… ইনডাইরেক্টলি আমাকে খারাপ মেয়ে বললেন তাই তো..?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অভীর হাত উঠে আনন্দীর গাল বরাবর । খুব জোরে নয়, তবু থাপ্পড়ের শব্দটুকু নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।আনন্দীর গাল লাল হয়ে উঠে। চোখের কোণে টলমল করে জমে অশ্রু কণা।অভী তার কব্জি শক্ত করে ধরে অনড় কণ্ঠে বলল,
“মেয়েরা মায়ের জাত। তাদের অসম্মান করা আমি কোনোদিন শিখি নাই।”
আনন্দী কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,”তাহলে আমাকে কেন করেন?”অভীর চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক ছায়া নেমে এলো,”অসম্মান করলে বিয়া করতাম না। খাইয়া-দাইয়া ছাইড়া দিতাম।”
আনন্দীর ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটে উঠল, “বাহ! তাহলে তো বিয়ে করে উদ্ধার করেছেন আমাকে!”
অভী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ফিরিয়ে নেয়, “এখন যদি প্রেগন্যান্ট না হইতে চাস, তাইলে চোখের সামনে থেইকা সর।”
আর একটি শব্দও উচ্চারণ করে না আনন্দী।নীরবে নিজের ঘরে গিয়ে খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ে সে। মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে নিঃশব্দে। সেই কান্নার কোনো শব্দ ছিল না শুধু কাঁধ কেঁপে উঠছিল বারবার, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমুদ্র নিঃশব্দেই ভেঙে পড়ছে।কিছুক্ষণ পরে দরজার কাছে নরম পায়ের শব্দ।অভী এসে নিঃশব্দে তার পাশে বসে।এক হাত দিয়ে আনন্দীর কাঁধ ধরে তাকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়, এবং অন্য হাতটি ধীরে ধীরে তার মাথায় বুলিয়ে দিতে থাকে। স্পর্শটা ছিল এমন, যেন দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে আহত কোনো পাখিকে কেউ বুকের কাছে তুলে নিয়েছে।
আর সেই স্পর্শেই আনন্দীর সমস্ত সংযম ভেঙে যায়। সে হঠাৎ অভীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।
“প্লিজ, অভী… আমাকে বাড়ি দিয়ে আসুন। প্লিজ…”
অভী কোনো উত্তর দিল না।শুধু তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিয়ে কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দিল।
তারপর ধীরে, খুব ধীরে বলল,
“আমি ম’রলেও তোকে ছাড়বো না, আনন্দী।”
আনন্দী চোখ তুলে তাকায়।তার কণ্ঠে ছিল ভাঙা মানুষের অসহায়তা।
“কিন্তু আমি তো মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে আপনার ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছি। সেই হিসাবেই না হয় ঘৃণা করেই ছেড়ে দিন আমাকে…”
অভীর ঠোঁটে বিষাদমাখা এক হাসি ফুটে ওঠে, “যে মানুষ আমার জীবন বাঁচাইছে, তারে ঘৃণা করমু কেমনে?”
কথাটা শুনে আনন্দীর মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।সে অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল অভীর দিকে, “আমি আপনাকে বুঝি না, অভী…
”সব মানুষরে বুঝতে হয় না। কেউ কেউ ধাঁধা হয়েই জন্মায়।”
আনন্দী গভীর শ্বাস নিল, তারপর অভীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আওড়াল,
“একবার বলেন, আপনার সঙ্গে যা হয়েছে, সব আপনার নিজের ইচ্ছায়। আবার বলেন আমি দায়ী। তারপর আবার বলেন, আমিই আপনার জীবন বাঁচিয়েছি। আসল সত্যিটা কোনটা? আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি…”
অভী দু’আঙুল দিয়ে আনন্দীর চোখের পানি মুছে দেয়
তারপর এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “তিনটাই সত্যি।তোর জন্য আমার ক্যারিয়ার ডুবছে।আমার জীবনে যা ঘটছে, তার প্রতিটা পদক্ষেপ আমি নিজের ইচ্ছাতেই নিছি।আর তুই… তুই-ই আমার জীবন রক্ষা করছিস।”
শব্দগুলো যেন কোনো প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো ঘরের বাতাসে ঝুলে রইল।আনন্দী আর কিছু বলল না।
মাথা নিচু করে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলল।অভীকে বোঝা যেন সমুদ্রের অতল গহ্বর মাপার মতো, যতই গভীরে নামা যায়, ততই নতুন অন্ধকার, নতুন রহস্য।কিছুক্ষণ নীরব থেকে অভী আবার বলল,
“তুই আমাকে এত ঘৃণা করিস কেন, আনন্দী?”
আনন্দী নীরব।তার নীরবতাই যেন হাজারো উত্তরের ভার বহন করছিল।অভী আলতো করে তার মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“তুই ভাবছিস, স্নেহার সর্বনাশ আমি করছি। সেই বিশ্বাস থেইকাই আমার প্রতি তোর ঘৃণার জন্ম। পরে যখন জানলি, আমি কোনোদিন তার গায়ে হাতও তুলি নাই, তখন সেই ঘৃণার জায়গায় করুণা আইসা দাঁড়াইল। কিন্তু ওই যে… তার গর্ভের পাপের ছায়া। সেই ছায়া তোর মনরে এখনও তাড়া করে। তাই তুই আজও ঠিক করতে পারোস না।আমি নায়ক, না খলনায়ক।পাপী, না মুক্তিদাতা। আমি যেন নিজের ভাগ্যেরই এক অভিশপ্ত দেবতা।যারে বিচার করার আগে সবাই পথ হারায়।”
আনন্দী অপলক দৃষ্টিতে অভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন তার সামনে বসে থাকা মানুষটি রক্ত-মাংসের কোনো সাধারণ মানুষ নয়। বরং নিয়তির হাতে লেখা এমন এক দুর্বোধ্য মহাকাব্য, যার প্রতিটি অধ্যায় খুললেই আগের সত্য মিথ্যা হয়ে যায়।স্মৃতির দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।
যেদিন সেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ঠিক দু’দিন পর আনন্দী জানতে পেরেছিল, অভী কখনোই স্নেহার গায়ে হাত তোলেনি। যে মানুষটিকে সে এতদিন উন্মত্ত, নিষ্ঠুর আর সহিংস ভেবেছিল, সে আদতে ছিল আশ্চর্য রকমের সংযমী। যেন ক্রোধের অগ্নি নিজের বুকেই ধারণ করে রাখা কোনো তপস্বী।সেই সত্য জানার পর আনন্দীর বিবেক তাকে এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেয়নি।সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, থানায় গিয়ে নিজের দেওয়া জবানবন্দি ফিরিয়ে নেবে। নিজের ভুলের দায় নিজের কাঁধেই তুলে নেবে। ছোট্ট বুকের ভেতর যতটুকু সাহস সঞ্চয় করা সম্ভব, সবটুকু জড়ো করেছিল সে।কিন্তু নিয়তি মানুষের সিদ্ধান্তকে খুব কমই শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয়।ঠিক সেই মুহূর্তে স্নেহা তাদের বাড়িতে এসেছিল।
চোখদুটি ছিল কান্নায় ফুলে ওঠা। মুখের সমস্ত রঙ যেন কেউ শুষে নিয়েছে।নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে সে আনন্দীর হাতে একটি কাগজ তুলে দেয়।আনন্দী কাগজের অক্ষরগুলোর অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি সেদিন। কিন্তু মানুষের কান্নার ভাষা তো অক্ষরের চেয়েও প্রাচীন। সেই ভাষা বুঝতে তার ভুল হয়নি।স্নেহা ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেছিল,
“অভী আমার বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখতে দিল না…”
সেই একটি বাক্য আনন্দীর সমস্ত বিশ্বাসকে আবার ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।একদিকে তার নিজের অপরাধবোধ একটি নিরপরাধ মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর কর্মজীবন ধ্বংস করার দায়।অন্যদিকে স্নেহার ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যৎ। সমাজের নির্মম চোখে যে মেয়ের কপালে তখন শুধু অপবাদ, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার ছায়া।
সে ভাবতে শুরু করেছিল, অভীর ক্যারিয়ার নষ্ট হয়েছে, কিন্তু স্নেহার জীবনও তো শেষ হয়ে গেল! এই সমাজ কি তাকে আর কখনো স্বাভাবিক জীবনের অধিকার দেবে?
শেষ পর্যন্ত সে নীরব হয়ে যায় ।কিন্তু অভী নীরব থাকেনি।
কারাগারের দরজা পেরিয়েই সে ঝড়ের মতো নেমে
এসেছিল আনন্দীদের বাড়িতে।চারদিকে ভাঙচুর।ক্রোধে জ্বলে উঠেছিল প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি আসবাব, প্রতিটি ইট।অথচ সেই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত আগুন যে স্নেহা, তার দিকে অভী একবারও হাত বাড়ায়নি।বরং সমস্ত ঝড় এসে আছড়ে পড়েছিল আনন্দীর ওপর।তার বাবাকে মিথ্যা দেনার ফাঁদে জড়িয়ে দেওয়া, পরিবারকে নিঃস্ব করার চেষ্টা, ভয় দেখানো, প্রতিটি শ্বাসে আতঙ্ক ঢেলে দেওয়া, এমনকি একসময় নিজের হাতেই আনন্দীকে বন্দি করে রাখা।
এই দীর্ঘ বছরগুলো আনন্দী একটিই সত্য বিশ্বাস করে বেঁচে ছিল অভী তাকে ঘৃণা করে।অথচ আজ, আজ সেই মানুষটিই নিঃসংকোচে বলছে, সে তাকে ভালোবাসে।শুধু ভালোবাসে নয় এমন ভালোবাসে, যা মৃত্যু দিয়েও শেষ করা যায় না।
আনন্দীর মনে হলো, সে যেন কোনো মানুষের সামনে নয়, এক অদ্ভুত মানুষের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে। যার এক চোখে ভালোবাসা, অন্য চোখে প্রতিশোধ। যার হৃদয়ে একই সঙ্গে জন্ম নেয় করুণা আর ক্রোধ, ক্ষমা আর শাস্তি।তাহলে এতদিন যা ঘটল সেসব কী ছিল?প্রতিশোধ?শাস্তি?ভালোবাসার বিকৃত রূপ?নাকি এমন কোনো গোপন সত্য, যা এখনও অন্ধকারের গর্ভে লুকিয়ে আছে। যেখানে পৌঁছাতে না পারলে অভী নামের মানুষটিকে কখনোই সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না?
অভী আলতো করে আনন্দীর থুতনিটা আঙুলের ডগায় তুলে ধরে। তার দৃষ্টিতে তখন আর প্রতিশোধের আগুন নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন অসংখ্য ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে ক্লান্ত এক যোদ্ধা অবশেষে নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। নিম্নস্বরে সে বলল,
“আনন্দী! আমার দেখা সবচেয়ে নিষ্পাপ মেয়েটা তুই। নিজের বান্ধবীর জন্য যে নিজের জীবন, সম্মান—সবকিছু বাজি রাখতে পারে, সে নিজের স্বামীর জন্য কতটা ত্যাগ করতে পারে, সেই হিসাব কইরা আমি কোনোদিন শেষ করতে পারি নাই। এই কারণেই তোকে ভালোবাসি।”
কথাগুলো আনন্দীর হৃদয়ে এমনভাবে নেমে এল, যেন দীর্ঘ খরার পর শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু কেঁপে উঠল।কাঁপা গলায় সে বলল,
“আমি কেন আপনাকে ভালোবাসতে পারলাম না, অভী?”
অভী কিছুক্ষণ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ধীর কণ্ঠে গুনগুন করে উঠল,
“Saanson ki mala pe simru main pi ka naam…
Apne mann ki main jaanu, aur tere mann ki…”
গানটি অসমাপ্ত রেখেই সে থেমে গেল।বাকিটুকু আর উচ্চারণ করার প্রয়োজন হলো না।আনন্দী বুঝে যায় এর অর্থ।হৃদয় তো এমন কোনো দুর্গ নয়, যা শক্তি দিয়ে জয় করা যায়। ভালোবাসা কারও আদেশ মানে না, কারও দাবিও শোনে না। সে নিজের পথ নিজেই বেছে নেয়। মানুষ নিজের মনের ভাষা যত সহজে পড়ে ফেলতে পারে, অন্যের হৃদয়ের অক্ষর তত সহজে পড়া যায় না।অভীর হৃদয়ের ভাষা আজ আনন্দীর কাছে আর অচেনা নয়।
কিন্তু নিজের হৃদয় কেন তার দিকে কখনো সেই পথ খুঁজে পেল না। সেই উত্তর আজও তার নিজের কাছেই অজানা।
আর সেই অজানার হিসাব চাওয়ার অধিকার অভীরও নেই।
দু’জনের মাঝখানে নেমে এল এক দীর্ঘ নীরবতা।সে নীরবতা ছিল না শূন্য, বরং হাজারো অনুচ্চারিত
স্বীকারোক্তিতে পূর্ণ।ধীরে ধীরে তাদের চোখ একে অপরের গভীরে ডুবে যেতে থাকে। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের পর দুটি পথ আবার একই গন্তব্যে এসে মিলেছে।দূরত্ব গলতে লাগল।শ্বাসের উষ্ণতা একে অপরকে ছুঁয়ে যেতে লাগল।
দুটি মুখ ধীরে ধীরে এতটাই কাছে চলে এলো যেন তাদের মাঝখানে আর শুধু এক ফোঁটা নিঃশ্বাসের ব্যবধান।
আর এক মুহূর্ত, হয়তো দুটি ওষ্ঠ একে অপরের স্পর্শে সমস্ত অভিমান গলিয়ে দিত।ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টাধ্বনি আচমকা সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তটাকে ভেঙে দেয়। যেন সময় নিজেই এসে তাদের অসমাপ্ত অনুভূতির সামনে একটুখানি বিরতি টেনে দিল।
আনন্দী লজ্জায় দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়।তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে সন্ধ্যার আকাশে ছড়িয়ে পড়া রক্তিম আভার মতো।অভী দাঁত চেপে বিরক্ত গলায় বিড়বিড় করে উঠো,
” একটু শান্তিতে বউডারে ছুঁইতে ও পারি না!”
আনন্দী কিছু বলেনা।ঠোঁট কামড়ে হাসি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে সে।তার সেই লাজুক মুখখানা দেখে অভীর বিরক্তিও বেশিক্ষণ টিকল না।দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে আবার ফিরে তাকাল। চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক।
“রাতে আবার কন্টিনিউ করবো ডোন্ট ওয়ারি!”
“কচু!”
অভী বিন্দুমাত্র দেরি না করে উত্তর দেয়,
“আমি খাই না। জিহ্বা চুলকায়!”
মুহূর্তেই ঘরের ভারী আবহাওয়া হালকা হয়ে যায় ।
যেন দীর্ঘ মেঘলা বিকেলের পর একফালি চাঁদের আলো নিঃশব্দে জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকে পড়ল। সেই আলোয় দু’টি ক্লান্ত হৃদয় আবারও অজান্তেই একে অপরের দিকে আরেকটু এগিয়ে এলো।
দরজার কপাট খুলতেই অভী যেন মুহূর্তের জন্য থমকে যায় ।ভ্রু দুটো অজান্তেই ওপরে উঠে আসে।সামনের দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছিল, পুরো মহল্লাই যেন তার ছোট্ট বাসার সামনে এসে জড়ো হয়েছে। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ মানুষে মানুষে ভরা। কৌতূহলী বাচ্চারা সামনের দিকে উঁকি দিচ্ছে, কিশোররা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে, আর বড়রা মুখে গাম্ভীর্য রাখার চেষ্টা করলেও চোখেমুখে স্পষ্ট কৌতূহল।
সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আবুল বাশার। পাশে তার মেয়ে সাদিয়া।আবুল বাশারকে দেখেই অভী সম্মানের সঙ্গে সালাম দিল।
আসসালামু আলাইকুম।”
তারপর সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভিতরে আসেন।”
আবুল বাশার ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে সোফায় বসলেন। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গম্ভীর মুখেই বললেন,
“শুনলাম, শাদি করছো। দুলহান কই তোমার? ইধার আনো। দেখনে আয়া হুঁ।”
অভী মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল, “জি, এখনই আনতেছি।”
কথা শেষ করে সে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে যায় ।
ঘরে ঢুকেই প্রথমে তার চোখ আটকে গেল আনন্দীর পোশাকে।একটা সাধারণ গেঞ্জি, সঙ্গে ঢিলেঢালা পায়জামা।
অভী কপালে হাত ঠেকাল।বাইরে এত মানুষ অপেক্ষা করছে, আর নতুন বউয়ের এই সাজ!আবুল বাশারের ধৈর্য সম্পর্কে তার ভালোই ধারণা ছিল। লোকটা বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার মানুষ নন।এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের পরে থাকা মুন্ডুটি নিয়েই খুব যত্ন করে আনন্দীর মাথায় জড়িয়ে দেয় সে। ঘোমটাটাও এমনভাবে টেনে দিয়েছিল, যেন অন্তত দূর থেকে নতুন বউয়ের আভাসটা বজায় থাকে।আনন্দী বিস্মিত হয়ে তাকায়,
“এসব কী করছেন?”
অভী ব্যস্ত হাতেই উত্তর দিল,”তোরে দেখতে আইছে।”
“কে?”
“পুরা এলাকা।”
“কী-ই-ই?”
বিস্ময়ে আনন্দীর চোখ যেন আরও বড় হয়ে যায়। অভী আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না।তার হাতটা আলতো করে ধরে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এল।দরজার চৌকাঠ পেরোতেই আনন্দীর পা যেন থেমে গেল।এত মানুষ!
সিঁড়ি, বারান্দা সব জায়গা ভরে গেছে।মনে হচ্ছিল, যেন কোনো উৎসবের আয়োজন। শুধু তাকে একনজর দেখার জন্যই সবাই ভিড় করেছে।এক নিমিষে শত শত কৌতূহলী দৃষ্টি এসে থামল আনন্দীর ওপর।নতুন বউকে দেখে কেউ মুচকি হাসছে, তো কেউ বা আবার চাপা স্বরে কথোপকথন করতে থাকে ।কিন্তু সবার চোখেই একই প্রশ্ন,
এ কেমন নতুন বউ?শাড়ি নেই, ভারী গয়না নেই,
সাজগোজেরও তেমন কোনো আয়োজন নেই।
অভী চারপাশের মুখগুলো দেখে হালকা হেসে মাথা চুলকাল।তারপর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“ডিজিটাল যুগের বউ তো! শাড়ি পরতে পারে না। তাই ভাবলাম, আপাতত মুন্ডু দিয়াই কাজ চালাই!”
কথাটা শেষ হতেই ভিড়ের ভেতর চাপা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।আর আনন্দী, লজ্জায় মাথাটা আরও নিচু করে ফেলল।
আবুল বাশার ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে স্নেহমাখা হাসি ফুটিয়ে আনন্দীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আও বেটা, ইধার বৈঠো।”
আনন্দী বিনয়ের সঙ্গে এগিয়ে এসে সোফার এক কোণে বসল। এত মানুষের সামনে বসতে তার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল। মাথার ওপর টানা ঘোমটার আড়ালে মুখটা আরও নিচু হয়ে এল।বাশার সাহেব একবার পাশের দিকে তাকাতেই সাদিয়া বুঝে গেলেন কী করতে হবে। তিনি সঙ্গে আনা ছোট্ট বাক্সটি খুলে একটি মোটা সোনার চেইন বের করলেন। তারপর আলতো করে সেটি আনন্দীর হাতে তুলে দিলেন।
বাশার সাহেব স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“দেখো বেটা, তোমার জন্য তেমন কিছু আনতে পারলাম না। সুবহ সুবহ শাদির খবর শুনলাম, তাই আর প্রস্তুতির সময়ও পাইনি। এই ছোট্ট তোহফাটা রাখো। আল্লাহ তোমাদের দু’জনের সংসারে বরকত দান করুন।”
আনন্দী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেইনটার দিকে তাকিয়ে রইল।ধন্যবাদ দেবে, নাকি উপহারটা ফিরিয়ে দেবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হচ্ছিল বাশার সাহেবের কথার ধরন শুনে। অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক হিন্দি-উর্দু মিশে এমন ভাষায় কথা বলতে সে আগে কাউকে শোনেনি।তার মুখের বিভ্রান্তি বুঝতে পেরে সাদিয়া মৃদু হেসে আনন্দীর হাতটা আলতো করে চেপে ধরল।
“অবাক হচ্ছো, তাই না?”
আনন্দী লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।সাদিয়া হাসিমুখে বলল,
“আমার আব্বুজান পাকিস্তানি ছিলেন। তাই উর্দু আর বাংলার মিশ্রণে কথা বলেন। তাই ভাষাটাও এমন হয়ে গেছে।”
কথাটা শুনে আনন্দী যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
এবার রহস্যটার সমাধান হলো।সাদিয়া স্নেহভরা চোখে কিছুক্ষণ আনন্দীর দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে বলল,
“তুমি সত্যিই খুব সুন্দর, ভাবি।”
আনন্দী কিছু বলার আগেই পাশ থেকে অভী দুষ্টুমিভরা গলায় যোগ করল,
“সুন্দর তো আছেই… কিন্তু কান্ডকারখানা? একেবারে বান্দরের মতো!”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল।
আর আনন্দী?সে শুধু লজ্জায় মাথা নিচু করে অভীর দিকে একবার আড়চোখে তাকায়। লোকটা এতোটা শয়তান, পদে পদে তাকে অপদস্ত করতে থাকে। সবাই যখন আনন্দীকে নিয়ে ব্যস্ত।সবার কৌতূহলী দৃষ্টির মাঝখান দিয়ে ঠিক তখনই আরেকটি পরিচিত মুখ এসে হাজির হয়,বাতাসি বেগম। তার পেছনে ছিল তার দলের কয়েকজন মেয়ে লোক। ঠোঁটে গাঢ় লাল পান, চোখে-মুখে চিরচেনা দাপট, আর হাঁটাচলায় যেন পুরোনো দিনের হিন্দি নায়িকাদের সেই নাটকীয় ভঙ্গির ছাপ।মুখের পানের পিকটি টিস্যুতে ফেলে ভিড় সরাতে সরাতে সে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“এই সর তো বাপু! চাঁদের বউ দেখতে বাতাসি আইছে!”
দু-এক পা এগিয়েই তার চোখ গিয়ে থামল আবুল বাশারের মুখে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আরেহ! বাশার ভাই যে! এই দাঁড়া!, আগে একখান ঘুমটা টানি। না হইলে পরে আবার কইবেন বাতাসি ভালো না’!”
বাতাসির কথায় আবুল বাশারের কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়লেও তিনি কোনো জবাব দিলেন না। নীরবতাই বেছে নিলেন।বাতাসি যেন সেসবের তোয়াক্কাই করল না। সে সোজা গিয়ে আনন্দীর একেবারে গা ঘেঁষে বসে পড়ল। আচমকা এমন ঘনিষ্ঠতায় আনন্দী অস্বস্তিতে শরীরটা সামান্য সরিয়ে নিল।তার অস্বস্তি চোখ এড়াল না বাতাসির। মৃদু হেসে সে বলল,
“হিজড়া বইলা ঘিন্না করিস না লো, ছেরি। এই দুনিয়ার অনেক ভণ্ড মানুষের চাইতে বাতাসি বেগমের দিলটা অনেক বেশি সাফ।”
কথাগুলো যেন আনন্দীর বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে ধাক্কা দিল। নিজের আচরণেই হঠাৎ লজ্জা পেল সে। ছোটবেলা থেকেই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দেখলেই ভয় পেতে শিখেছে সমাজ। অথচ তারাও তো মানুষ তাদেরও অনুভূতি আছে, স্বপ্ন আছে, বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সমাজের এক বড় অংশ যেন সেই সহজ সত্যটুকুই বারবার ভুলে যায়।বাতাসি বেগম তার সঙ্গে আনা মোটা সোনার বালাজোড়া বের করে আলতো করে আনন্দীর হাতে পরিয়ে দিতে থাকে। তারপর অভীর দিকে তাকিয়ে চওড়া হাসি হেসে বলে উঠল,
উন্মাদনা পর্ব ৫১
“তোর বউটা কী চিকন রে, চাঁদ! স্বামীর মই ডলা খাইলেই তো পিষা যাইবো!”
বাতাসির মুখ থেকে কথাটা বেরোতেই ঘরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভী ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে জবাব দিল,
“এই জন্যই তো এখনো মই ডলাই দেই নাই!”

