মহামায়া পর্ব ৫১
তুশকন্যা
সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়ালেও, ইউরোপের এমন উথালপাতাল মৌসুমে সকলেই যতটা সম্ভব গায়ে শীতের পোষাক আঁকড়ে নিতে ব্যস্ত। ভার্সিটির দীর্ঘ প্রহর শেষে কমবেশি সবাই এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।তবে গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর সমাগম এখনোও ভার্সিটির অলিগলিতে।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে আনায়া নিজেকে অনুধাবন করল টিচার্স রুমের পাশেই এক রেস্টরুমে। আইজেল,লারিসা, সাবা কিংবা জেইন সহ বেশ কয়েক জোড়া উদ্বিগ্ন দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। পাশেই একজন ভার্সিটির মেডিকেল টিমের লোক তার চেক-আপ করছে। অথচ আনায়া সবার মাঝে কেবল কেনীথকেই খুঁজে চলল। কিন্তু আশেপাশে কোথাও তার দেখা না পেয়ে, খানিক ভারী শ্বাস ফেলল।
ততক্ষণে আনায়ার চেক-আপ শেষে লোকটা সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“চিন্তার কিছু নেই, অতিরিক্ত স্ট্রেস আর শারিরীক দুর্বলতার কারণেই ও সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তো এমনটাই মনে হচ্ছে, তবুও একবার সময় করে হসপিটালে গিয়ে চেক-আপ করিয়ে নেওয়াই ভালো।”
বলেই তিনি কক্ষ ত্যাগ করল। ভার্সিটি শেষে আইজেলের কাছে খবর পেয়ে সাবাও এখানে হাজির হয়েছে। সে সুযোগ পেতেই আনায়ার উপর রেগে গিয়ে বলে উঠল,
“ম’রবি তুই, যা শুরু করেছিস! ঠিকমতো খাবি না। এদিক-সেদিক টইটই করে বেড়াবি, আর শেষে ধুমধাড়াম জ্ঞান হারাবি।”
আনায়া তার কথা শুনে নড়েচড়ে স্ট্রেচার থেকে নেমে পড়ল। গা ছাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বুঝল, শরীরটা আসলেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তবে সেটা কাউকে বুঝতে না দিয়ে, আনায়া জোর গলায় সাবা’র দিকে দুহাত একজোর করে বলল,
“মা আমার চুপ কর, কিচ্ছু হয়নি আমার।”
বলেই সে আগে আগে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। তাকে চলে যেতে দেখে সাবা রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“এখন আবার কোথায় যাচ্ছিস তুই?
আনায়া পেছনে মুখ ফিরিয়ে নির্বিকার স্বরে বলল,
“আমার কাজ আছে, তোরা সবাই বাড়ি চলে যা।”
—“মানে কি? কি কাজ আছে, কোথায় যাবি তুই?”
আনায়া আর কিছু বলল না। সাবা’র থেকে নজর সরিয়ে, বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল,
“সরি, আমার জন্য বারবার সবাইকে ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। আশা করছি, আর এমনটা হবে না।”
খানিকটা উদাসীন ঢঙেই কথাটা বলল আনায়া। অতঃপর আর দাঁড়াল না। ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে, দৃঢ় পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
পেছন হতে চার জোড়া চোখ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সাবা অস্ফুটে বিড়বিড় করল,
“দিনদিন ওর কি হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ও তো এমন ছিল না, তাহলে?”
ধীরস্থিরে হাঁটতে হাঁটতে আনায়া নিজেদের ডিপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে চলল। ক্লাসরুমে নিজের বেঞ্চের নিচে নোটবুকটা ফেলে রেখে এসেছে। মূলত সেটা নিতেই তার এখানে আসা। হয়তো বাকিদের একথা বলেও এখানে আসা যেত, কিন্তু তার এখন কারো সংস্পর্শেই ঘেঁষতে ইচ্ছে করছে না৷ আপাতত নোটবুকটা নিয়ে সোজা ভার্সিটি ছাড়বে। অতঃপর আনমনা হয়ে কোথাও একটা চলে যাবে। কিন্তু সেটা ঠিক কোন জায়গায়, আনায়া তা-ও জানেনা।
এমন খামখেয়ালি ভাবনা নিয়ে আনায়া আশেপাশে তাকাল।চারপাশের সবদিকই তখন ফাঁকা। কোথাও বিশেষ কারো ছায়া অব্দি নেই। আনায়া শুষ্ক মলিন হেসে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। নিস্তব্ধ, বিস্তৃত সিঁড়িটা পেরোতে পেরোতেই সে হঠাৎ থমকে গেল। মনে হলো তার সাথে সাথে পেছনে থেকে হয়তো আরো কেউ এগিয়ে আসছে।
একমুহূর্তের জন্য আনায়ার বুক ধক করে উঠল। তবুও ভাবল এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না। কিন্তু কৌতুহলী মনটা ঠিকই তা হতে দিল না। আনায়া সিঁড়ির মাঝপথে পাজোড়া থামিয়ে, ঘাড়টা খানিক পেছনে ফেরাল। চোখের সামনে হঠাৎ কেনীথের স্পষ্ট অবয়ব দেখতে পেয়ে ভুত দেখার মতো চমকে উঠল। লোকটা ধীরস্থিরে তার সাথে সাথেই এগিয়ে আসছে। আনায়া তাকানো মাত্রই কেনীথের সাথে তার দৃষ্টি একত্রে মিলে গিয়েছে। দুজনের মাঝের দূরত্ব বলতেও মাত্র কয়েক সিঁড়ির ব্যবধান।
আনায়া আর দাঁড়াল না। দ্রুত পা চালাতে লাগল। থতমত খেয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“হঠাৎ উনি এখানে কি করছে? মতি-গতিও ভালো না।….ভাগ আনায়া ভাগ!”
বলতে না বলতেই আনায়ার হঠাৎ সেন্সলেস হওয়ার পূর্বের ঘটনাটুকু মনে পড়ল। ইশশ! কিভাবে সবার সামনে লোকটার বুকের উপর আছড়ে পড়ল। আর তারপর?
কিচ্ছু মনে নেই। আপাতত মন-মস্তিষ্ক নতুন কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মূখীন হতে না চেয়ে, রমণীকে চিলচিৎকার করে সতর্ক করল,
“পালা তারা পালা, পেছনে বিপদ…!”
বলতে না বলতেই সে হঠাৎ সিঁড়ির মাঝেই হুড়মুড়িয়ে দৌড় দেওয়ার সিন্ধান্ত নিল। এবং এ-ও টের পেল তার ছুটে চলার গতিতে পেছন হতেও আগন্তুকের গতির তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে।
আনায়া আরো বেশি ভড়কে গেল। যা ভেবেছিল তাই।লোকটা এই অসময়ে এমনি এমনি এখানে আসেনি। কিন্তু সে-ই বা কি করেছে? আশ্চর্য! সে যদি কিছু নাই করে থাকে তবে পালাচ্ছে কেনো?
কিন্তু ততক্ষণে হয়তো বহু দেরি হয়ে গিয়েছে। মস্তিষ্ক থামতে বললেও, হাত-পা ঠিকই ছুটছে। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে উঠে যাওয়া মাত্রই, অকস্মাৎ আনায়া পেছনে তাকানোর ভুলটাও করে ফেলল। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ দেখতে পেল, পেছন হতে মানবের অকস্মাৎ এক ক্ষিপ্র থাবা এসে ঠিক তার পিঠের উপরই আছড়ে পড়ল। একইসাথে শুনতে পেল,চাপা সেই ভারিক্কি কন্ঠস্বর,
“পালাচ্ছিস কোথায়?”
আনায়া আরো বেশি অপ্রস্তুত হলো। খামখেয়ালিতে ছিটকে লাফিয়ে সরতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। ততক্ষণে কেনীথ তার হুডির পিঠের একাংশ খামচে ধরে, পেছনের দিকে টান মারল। আনায়া নিজের ভারসাম্য হারিয়ে প্রথম সিঁড়ি হতে পা পিছলে বলিষ্ঠ পুরুষের প্রশস্ত বুকে পিঠ ঠেকিয়ে আছড়ে পড়ল। তবে কেনীথ ঠিকই তাকে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে, সিঁড়ির ওপর একত্রে দুজনের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখল।
পুরো মুহূর্তটুকু সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত হওয়ায়, আনায়া একপ্রকার থরথর করে কাঁপছে। ততক্ষণে কেনীথ তার কাঁধের কাছে মুখ নামিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“খেয়ে ফেলেছি তোকে? এভাবে পালাচ্ছিলি কেনো? এখনই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলে কি হতো?”
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। দুহাতে শক্তকরে জামাটা আকড়ে মাথাটা খানিক নুইয়ে দেখে,কেনীথের হাতদুটো পেছন হতে তার কোমড়-বুক আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে; তবে কিছুটা আলগাভাবে।
আনায়া তীব্র অস্বস্তিতে উসখুস করতে লাগল। অদ্ভুত এক পালাই পালাই মনোভাব নিয়ে সুযোগ খোঁজার অপেক্ষায় রইল। সে কিছু বলছে না দেখে, কেনীথ নিজেই আবার প্রশ্ন ছুড়ল,
“কাহিনি কি তোর বলতো? গতকালও তো সব ঠিক ছিল, হুট করে এমন সব অদ্ভুত আচরণ কেনো করছিস,হুহ?”
আনায়া কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়, সে মুখ ফুটে কোনো প্রত্যুত্তর করতে পারেনা। কেনীথ তার কাঁধে-গলায় আলতোকরে মুখ ডুবিয়ে দেয়। গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির ঘর্ষণে আনায়ার সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে; চোখদুটো বিস্ফোরিত হয়। তথাপি কেনীথ তার কানের কাছে নির্লিপ্ত ভগ্নস্বরে শুধায়,
“চেক-আপ করেছিস?”
আনায়া নিজেকে সামলে নিয়ে, মাথা ঝাকায়। কেনীথ আবারও জিজ্ঞেস করে,
“মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট কি বলেছে?”
আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে প্রত্যুত্তর করে,
“তেমন কিছু হয়নি…বলেছে শরীর দুর্বল; ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে।”
কেনীথ নির্বিকারে তার কথাগুলো শুনল। কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর হঠাৎ কানের কাছেই ধমকে উঠল,
“তো ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না কেনো? তুই কি চাস, প্রতি বেলায় বেলায় তোকে ধরে-বেঁধে আমার সামনে বসিয়ে তুলে তুলে খাওয়াব?”
আকস্মিক ধমকে আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে নেয়।প্রশ্নের যথাযথ প্রত্যুত্তর না করে, এলোমেলো শ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
—“আপনি ছাড়ুন আমায়!”
কেনীথ শুষ্ক হেসে বলে,
“তোকে আমি ধরে রেখেছি নাকি? কই, আমার তো মনে হচ্ছে না।”
আনায়া আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠল। দূর্বল শরীর আরো বেশি অবশ হতে থাকে। সে মাথাটা আরো খানিকটা নুইয়ে নিজেদের ঘনিষ্ঠ অবস্থান বুঝে, চাপা স্বরে বলল,
“দেখুন, এখানে এসব করবেন না। লোকে ভালো বলবে না।”
—“লোকে কি বলল, সেসব নিয়ে তো আমি ভাবি না।”
কেনীথের নির্লিপ্ততায় আনায়া তীক্ষ্ণতার সাথে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ভাবেন না? কিন্তু ভার্সিটিতে তো আপনার যথেষ্ট নামডাক। শুধু ভার্সিটি কেন, পুরো ইউরোপেই তাই।”
—“তো?”
—“তো… আমার কিছু না হলেও, নাম তো আপনারই বদনাম হবে।”
আনায়ার অভিব্যক্তিত্বে কেনীথ এক চিলতে তির্যক হাসল। বলল,
—“হঠাৎ আমার নাম বদনাম হওয়ার খুব চিন্তায় আছিস দেখছি। তোর জন্য যে পুরো আমি-টাই বরবাদ হলাম, সেটা বুঝলি না?”
খানিকটা তির্যক ভাবেই প্রশ্নটা ছুড়ল কেনীথ। আনায়া উত্তর দেবার মতো কিছু খুঁজে পেল না। বরং কেনীথের হাতের বাঁধন কিছুটা আলগা মনে হতেই, খামখেয়ালি রমণী তার সুযোগ লুফে নিল। কেনীথ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে অকস্মাৎ গা ছাড়া দিয়ে, একপ্রকার ফাঁক ফোকর খুঁজে নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে সোজা দৌড় দিল। কেনীথ পেছন হতে তাড়া করে তৎক্ষনাৎ তাকে ধরতে গেলে, আনায়া হুড়মুড়িয়ে ছুটতে নিল আর ফলাফলস্বরূপ করিডোর পৌঁছেই সে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল; বেশ খানিকটা চোটও পেল হাতে-পায়ে।
মুহূর্তেই কেনীথ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো। তবে খানিক ভিন্নমূর্তিতে। আনায়াকে পড়ে যেতে দেখেই যে চোখে-মুখে উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এক নিমিষেই উবে গেল করিডোরে পা রাখামাত্রই। অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা ও অপরিচিতির ন্যয় সে আনায়ার সামনের গিয়ে স্থির দাঁড়াল।
আনায়া তার দিকে মলিন দৃষ্টিতে তাকানো মাত্রই, কেনীথ খুব স্বাভাবিক ঢঙে তার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জার্মান সুরে বলল,
“পড়ে গেলেন কিভাবে? উঠে আসেন।”
আনায়া হঠাৎ তার অবয়বে এরূপ পরিবর্তন দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। সিঁড়িতে একরকম আচরণ আর করিডোরে পা ফেলতেই সে আচরণের এতো পরিবর্তন? আনায়া কিছু বলার আগেই, কেনীথ আবারও খানিকটা ঝুঁকে তার দিকে হাত বাড়াল। নিরেট স্বরে বলল,
“উঠতে বলেছি!”
বলতে না বলতেই সে আনায়া’র সামান্য বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে,হেঁচকা টানে তাকে টেনে তুলল। আনায়া হুড়মুড়িয়ে তার সম্মূখে উঠে দাঁড়াতেই, কেনীথ হাতটা ছেড়ে দিয়ে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দুপা পিছিয়ে দাঁড়াল। আনায়া তার এই অদ্ভুত মতিগতির উদ্দেশ্য ঠিক বুঝতে পারল না। সে ভ্রু কুঁচকে উচ্চ স্বরে বলে উঠল,
“আপনার সমস্যাটা কি বলুন তো? বারবার এভাবে…”
আনায়াকে তার কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে, কেনীথ ওভারকোটে দুহাত গুঁজে নিরেট স্বরে সতর্ক করল,
“গলা নামিয়ে কথা বল।”
আনায়া তার কথায় মুখ ফুলিয়ে দমে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে কন্ঠস্বর নামিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“বলব না, কি করবেন?”
—“মেরে তক্তা বানাবো।”
আনায়া মুখ ভেঙচিয়ে আওড়াল,
“একবার ছুঁয়ে দেখান শুধু!”
আনায়া খানিক থেমে আবারও বলল,
“আগেই বলেছি, আমার ওপর হুকুম চালানোর অধিকার আমি কাউকে দেইনি৷ যদি কারো অধিকার চাই, তবে সে যেন তার নিজের ওপর হুকুম-হাকুম চালানোর অধিকারটাও আমায় দিয়ে দেয়।”
মুখ উঁচিয়ে সম্পূর্ণ অভিব্যক্তিটুকু অকপটে বলল নির্ভীক রমণী। কেনীথ তার কান্ড দেখে আড়ালে শুষ্ক হাসল। আনায়ার চোখে সেই হাসি ধরা পড়ার পূর্বেই সে রমণীকে উদ্দেশ্য করে,গুরুগম্ভীর স্বরে কিঞ্চিৎ কটাক্ষের সুরে বলল,
“নিজের সাইজ দেখেছিস?”
আনায়া তৎক্ষনাৎ চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। ডান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কি বলতে চাইছেন?”
কেনীথ তার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দিয়ে, আবারও শান্ত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,
“ক্লাস তো শেষ, এই অসময়ে এখানে একা একা কেনো এসেছিস?”
—“নিশ্চয় হাওয়া খেতে নয়, কাজেই এসেছি। কিন্তু এই অসময়ে আপনি কেন এখানে?” আনায়ার ত্যাছড়া প্রত্যুত্তর।
—“তার কৈফিয়ত নিশ্চয় আমি তোকে দেবো না।”
কেনীথের নির্লিপ্ততায় রমণীর সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠার দশা। এই লোকটাকে এতো অসহ্য কেনো লাগছে তার? আনায়া কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে অকপটে বলল,
—“তো আমিও কোন জাহান্নামে যাই, সেসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।”
কেনীথ ভ্রুযুগল কুঁচকে বলল,
“বেয়াদবি ইদানীং বেশি হয়ে যাচ্ছে না?”
আনায়া কটাক্ষ করে হেসে বলল,
“বেয়াদবির দেখছেনটা কি! আমার পাল্লায় তো এখনো পড়েননি তাই ঠিকমতো টের পাচ্ছেন না। আমার সাথে পাঙ্গা নিতে এলে, জীবনটা শেষ করে দেব আপনার।”
কেনীথের ললাটে ভাজগুলো স্থির রইল। মনে মনে কিসব ভাবতে গিয়ে হঠাৎ গতরাতের কথা মাথায় এলো। হঠাৎ পাগলামি ছেড়ে তার প্রতি এতো আক্রোশের কারণ কি তবে, গতরাতের কনভারসনগুলো? হ্যাঁ, সে জানত—তার অপ্রত্যাশিত কথার ধরনে আনায়ার মাঝে একটা বিশেষ ইফেক্ট তো পড়বেই; কিন্তু তা যে এমন কিছু, এটা ঠিক মেনে নেওয়ার মতো না। তাছাড়া মেয়েটার হাবভাব দেখে তো এটাই আন্দাজ করা যায়—ওর মাথায় বেশ বড়কিছু চলছে। কিন্তু সেটা কি?
কেনীথ তার ভাবনাগুলো সরিয়ে রেখে, নিরেট ভারিক্কি স্বরে বলল,
“ঠিক আছে,আমিও দেখতে চাই তুই ঠিক কত বড় বেয়াদব।”
আনায়া কিছুক্ষণ স্থির স্তব্ধ হয়ে কেনীথের দিকে তাকিয়ে রইল। মাথাটা কেমন যেন ভনভন করছে। ভার্সিটির করিডোরে ক্ষণে ক্ষণে শীতলরক্তের প্রাণীদের ন্যায়, কেনীথের নিত্যনতুন রূপের বহিঃপ্রকাশ দেখে এক নিমিষেই মেজাজ চটে গেল আনায়ার। কেনীথ যে তার ভার্সিটির একজন সম্মানিত প্রফেসর, তা সে নূন্যতম তোয়াক্কাই করল না। বরং অদ্ভুতপূর্বক ভাবে বিরক্তিতে একবার মাথাটা এদিক-সেদিক করে চারপাশটা দেখে নিল। কেনীথ ভ্রু কুঁচকে নিল তাতে। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো আনায়ার পরবর্তী পদক্ষেপে।
হুট করেই ক্ষিপ্ত রমণী তার চাপা রাগ ঝাড়ল এক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায়। কেনীথের চোখে চোখ রেখে, হঠাৎ তাকে উদ্দেশ্য করে নিজের হাতের আঙ্গুলগুলি দিয়ে কিছুটা একটা দেখানোর চেষ্টা করল। কিন্তু প্রতিবারেই সে ব্যর্থ হলো; আঙ্গুলগুলো বারবার একে-অপরের সাথে জটলা বেঁধে গেল। কারণ এমন আচরণ কিংবা সংস্কৃতির সাথে সে অভ্যস্ত নয়। চরম বিরক্তিতে শেষ অব্দি দুহাতের প্রচেষ্টায়, ডান হাতের মধ্যমা আঙ্গুলটি উঁচিয়ে সফল হতে হতে আনায়া বলে উঠল,
“কোন আঙ্গুলটা যেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ এটাই। আই জাস্ট ফা*ক ইউ!”
বুকভরা সাহস নিয়ে কথাটা বলে ফেললেও, আনায়া আর সেথায় দাঁড়াল না। ক্লাসরুম থেকে নিজের নোটবুকটা নেওয়ার জন্য একদৌড়ে সেদিকে ছুটে চলল। কেনীথ আর তার পিছু নিল না। সে তখনও একপ্রকার হতভম্ব, বিমুঢ় হয়ে দাড়িয়ে আছে। তার সাথে এমন অসভ্যতা করার দুঃসাহস আজ অব্দি কেউ কল্পনাতেও করেছে কিনা সন্দেহ!
কেনীথ থমথমে মুখে দৃষ্টি ফিরিয়ে পাশে তাকাল। ততক্ষণে রমণী এক দৌড়ে করিডোরের সীমানা পেরিয়ে গিয়েছে। এইমূহূর্তে সে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে, কিন্তু আপাতত তা করার কোনো ইচ্ছে নেই। বরং সে খুব নির্লিপ্ততা নিয়ে দৃঢ় ভঙ্গিতে আবারও সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে আঁড়চোখে একপলক চেয়ে দেখল করিডরের প্রতিটি কোণায় থাকা সিসিটিভি। যার কোনোটাই সম্ভবত সিঁড়ির কোনো দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দী করতে পারে না।
নোটবুকটা নিয়ে আনায়া ধীরেধীরে ক্লাস রুম হতে বেরিয়ে এলো। করিডোরে পা রেখেই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। নাহ! কোথাও কেউ নেই। আনায়া ভারীশ্বাস ফেলে নিজের চুলগুলো ঝাড়া দিয়ে পেছনের দিকে ছুড়ল। চাপা স্বরে ভেঙচি কেটে আওড়াল,
“তারা’র সাথে পাঙ্গা? উনি ভেবেছে-টা কি আমায়? আমি উনার টাইপের না অথচ সারাক্ষণ আমার সাথে এসেই লটরপটর করতে মন চায়? এতোই যখন ঠোঁটফুলা,পাছুফুলা মেয়ে চাই—তখন আমার কাছে ওনার কি, হ্যাঁ? সাথে গা ভরা ভাব তো তার আছেই। ঠিক আছে, লাগবে না আমার এমন ভাবের স্বামী।”
আনায়া নিজের ডিপার্টমেন্ট পেরিয়ে ভার্সিটি থেকে বেরোনোর পথে এগিয়ে চলেছে। আশেপাশে কোথাও বন্ধুদের না দেখে বুঝে নিল, ওরা হয়তো সবাই চলে গিয়েছে। আনায়া ভারী শ্বাস ফেলল; নিজের হুটহাট বদলে যাওয়া মেজাজে ওদের সাথে ওভাবে আচরণ করাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। আর কিছু না হোক, সবক’টা কিছু না কিছু তো সন্দেহ করে বসে থাকবে।
রমণীর বেখেয়ালি ভাবনার মাঝেই, হঠাৎ তার সম্মূখে একজন অফিস ক্লার্ক এসে উপস্থিত হলো। মধ্যবয়স্ক লোকটার ভাবগম্ভীর্য দেখে আনায়া তেমন কিছুই আন্দাজ করল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই, লোকটি তাকে কাটকাট গলায় জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করল,
“আনায়া এহসান, মাত্রিকেল-নুমার (আইডি নাম্বার) 03748291; ডিপার্টমেন্ট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং?
আনায়া অবোধের মতো মাথা নাড়ল,
“জ্বী।”
লোকটি আবারও বলল,
“তোমাকে একবার টিচার্স রুমে যেতে হবে। চলো আমার সাথে।”
আনায়া খানিকটা হকচকিয়ে গেল। ঘটনা কি! লোকটা হঠাৎ এই সময় তাকে কেনো টিচার্স রুমে নিয়ে যাচ্ছে? আনায়া উত্তর খোঁজার সুযোগ পেল না। তার আগেই তাকে বুকে নোটবুক আঁকড়ে, ব্যাকপ্যাকের স্ট্রিপ শক্তহাতে চেপে লোকটার পেছন পেছন পা বাড়াতে হলো।
অবশেষে অনেকটা পথ অতিক্রমের পর তারা কাঙ্ক্ষিত স্থানে উপস্থিত হলো। বিশাল দরজার সম্মূখে এসেই, লোকটা তাকে হাত বাড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার নির্দেশ দিল। আনায়া এবার আরো কিছুটা ভড়কে গেল। আগে কখনো এখানে আসা হয়নি তার। অবশ্য অকারণে এখানে প্রবেশও নিষেধ।
তবুও ‘কিছু হবে না’ ভেবে নিজেকে সাহস দিয়ে আনায়া ভেতরে প্রবেশ করল। নিমিষেই একমুহূর্তের জন্য মাথাটা চক্কর দেওয়ার দশা হলো তার। ভার্সিটি পুরোপুরি ছুটি না হওয়ায়, এখনও কমবেশি অধিকাংশ প্রফেসর এখানে উপস্থিত। প্রকাণ্ড এক কালচে কাঠের টেবিলের চারপাশজুড়ে অসংখ্য কালো-ধূসর সুট বুট পরিহিত দৃঢ়-গম্ভীর অবয়ব। কেউ কেউ ধীরস্থিরে নিজেদের মাঝে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলছে, তো কেউ নিজেদের মতো নানান ফাইলের ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছে। কিন্তু প্রত্যেকেটা অবয়বই এতোটা মার্জিত যে, আনায়া এই শান্ত-শীতল আবহেও একপ্রকার ঘেমে উঠেছে। এমনিতে সারাক্ষণ লাফিয়ে-ঝাপিয়ে বেড়ালেও, প্রকৃতপক্ষে সোশ্যাল-ফোবিয়া নামক বিব্রতকর রোগটা তার নিজেরও আছে।
তথাপি আনায়া চেষ্টা করল যেভাবেই হোক নিজেকে সামলে রাখা। তাকে যেহেতু এখানে ডাকা হয়েছে তবে নিশ্চয় কোনো প্রয়োজনেই! এই ভাবনায় সে নিজেকে দৃঢ় রেখে বুক ভরে শ্বাস নিল। এতসব গম্ভীর মানুষজের মাঝে কাকে ডেকে কি জিজ্ঞেস করবে, তা-ই বুঝে উঠতে পারছে না।
ততক্ষণে আনায়ার সাথে আসা সেই অফিস-ক্লার্ক আনায়াকে পাশ কাটিয়ে ধীরস্থিরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। উদ্দেশ্য—যার আদেশে আনায়াকে এখানে ডেকে নিয়ে আসা, তাকে আনায়া’র আগমনের খবরটা পৌঁছানো।
এদিকে ভীত-সন্ত্রস্ত আনায়ার চোখদুটো তখন নিজের কাঙ্খিত ব্যক্তির উপর গিয়ে পড়েছে। প্রফেসর রূপে ভিকে বেশ দৃঢ় ভঙ্গিতে টেবিলের প্রধান সারিতে, নিজের আসনে বসে আছে। একহাতে সাইনপেন; দৃষ্টি তার টেবিলের ওপর থাকা একখান কালো ফাইলে। আশেপাশের আর কোনোদিকেই যেন তার ধ্যান নেই৷
আনায়া’র এই আঁড়চোখা অবলোকনের মাঝেই, হঠাৎ একটি নিরেট গুরু-গম্ভীর চাপা জার্মান কন্ঠস্বরে আনায়া চমকে উঠল।
—”ওহ! তুমিই আনায়া এহসান?”
রমণী দৃষ্টি ফেরাতেই দেখল, উর্ধবয়স্ক এক লোক সিনিয়র প্রফেসর রূপে ভারিক্কি অবয়ব নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে। পরনে কালো সুট-বুট, ললাটে তীক্ষ্ণ ভাজ, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা; সাথে আধাপাকা গোছানো চুলদাড়ি। তার সাথেই আবার দাঁড়িয়ে আছে সেই সহকারী ক্লার্ক।
আনায়া মনে মনে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও, প্রত্যুত্তরে সে মাথা নেড়ে বলল,
“জ্বী!”
সিনিয়র প্রফ তৎক্ষনাৎ তাকে কিছু বলল না, বরং সরু দৃষ্টিতে আনায়ার আপাদমস্তক একবার পরখ করে নিল। ওদিকে আনায়ার বুক দুরুদুরু কাঁপতে থাকে, অজানা সব আশংকায়। আঁড়চোখে পুনরায় কেনীথের দিকে তাকাতে নেওয়ার আগমুহূর্তে হঠাৎ প্রফেসরের প্রশ্নের তীক্ষ্ণতায় আনায়া থমকে যায়।
—“তুমি প্রফেসর ভিকে’র সাথে বেয়াদবি করেছো?”
রগচটা মানুষটা প্রশ্ন শুনে হতভম্ব হয়ে গেল আনায়া। চোখমুখ শুকিয়ে চৌচির হলো এক লহমায়। ততক্ষণে সিনিয়র প্রফ তার নিজের সকল আক্রোশ নিয়ে ধমকে উঠলেন,
“ভারুম জাগস্ত দু নিখৎস, দু উনফাশ্চেমতেস মেডখেন? জাগ শোন, ভার্স্ট দু ফ্রেখ ছু প্রফেসোর ভি-কে? ভি কান্স্ট দু এস ভাগেন, ডিখ গেগেন্যুবার আইনেম জিনিয়র প্রফেসোর জো উনফাশ্চেম্ত ছ্যু ফারহালতেন?”
(কিছু বলছো না কেনো, অসভ্য মেয়ে! বলো তুমি প্রফেসর ভিকে’র সাথে বেয়াদবি করেছো কিনা? তোমার সাহস হয় কি করে, একজন সিনিয়র প্রফের সাথে এমন অসভ্যতা করার?)
প্রত্যেকটি ভারিক্কি জার্মান শব্দ কেবল আনায়ার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। আদোও সে কিছু শুনতে পেয়েছে কিনা তা বোধগম্য নয়। স্তব্ধ-বিমূঢ় হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে সে। শূন্যদৃষ্টি জোড়া আড়চোখে পরখ করছে চারপাশ। অসংখ্য থমথমে উৎসুক দৃঢ় দৃষ্টি কেবল তার দিকেই নিবদ্ধ। আর সেইসব অবয়বের মাঝে একজনের দিকে আনায়ার দৃষ্টি থমকে গেল।
ফাইল হতে নজর সরিয়ে আনায়ার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে ভিকে। চোখেমুখে দৃঢ়তা অথচ সেই দৃঢ় অববয়ের মাঝেই যেন একরাশ তাচ্ছিল্যের উপহাস। আনায়া স্তব্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকানো মাত্রই, লোকটা চেয়ারে গা এলিয়ে পায়ের উপর পা তুলে, আরেকটু আয়েশ করে বসল। আঙুলের ডগায় কালো-সোনালী রাঙা সাইনপেনটা নির্বিকারে ঘুরিয়ে, একচিলতে বাঁকা মুচকি হাসল সে।
মুহূর্তেই আনায়া যেন পাথরের মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গেল। অন্তত এমন কিছু তো সে প্রত্যাশা করেনি। তাকে শায়েস্তা করার জন্য লোকটা এভাবে,এমন একটা উপায় বেছে নিয়েছে? আনায়া চোয়াল শক্ত করে, আঁড়চোখেই মনের ক্ষিপ্ততায় মনে মনে আওড়াল,
মহামায়া পর্ব ৫০
“কাজটা একদম ঠিক করলেন না! এর বদলা আমি নেবো, ঠিকই নেবো!”
আনায়া একটা শব্দ উচ্চারণ না করলেও, কেনীথ যেন তার মনের সবটাই বুঝে নিল। মুখ ফুটে কোনো কিছু বললেও, সে-ও যেন তির্যক হেসে নিঃশব্দে প্রত্যুত্তর করল,
“আই’ল বি ওয়েইটিং, বেইবি!”
