মহামায়া পর্ব ৫২
তুশকন্যা
টিচার্স রুমের সুবিশাল কালচে কাঠের টেবিলটার চারপাশে তখন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধতা। প্রকাণ্ড কক্ষটির থমথমে আবহে প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। উপস্থিত বাকি প্রফেসরদের প্রখর, বিচারক দৃষ্টি কেবল আনায়ার দিকেই নিবদ্ধ। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না। কারণ, আনায়ার সামনে সটান দাঁড়িয়ে যে প্রবীণ গাম্ভীর্যপূর্ণ অবয়বটি তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছে, তিনি এই ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রভাবশালী ও কড়া মেজাজের সিনিয়র ডিন—প্রফেসর মুলার গিলবার্ট। ওনার অনমনীয় ব্যক্তিত্ব আর প্রভাবের সামনে টু শব্দ করার সাহস ডিপার্টমেন্টের কারো নেই।
প্রফেসর মুলার গিলবার্ট চশমার ফ্রেমটা নাকের ওপর আরেকটু ঠেলে দিয়ে, টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা আনায়ার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। হীমশীতল, গুরুগম্ভীর চড়া জার্মান কণ্ঠে গর্জে উঠলেন,
“ভারুম জাগস্ত দু নিখৎস, দু উনফাশ্চেমতেস মেডখেন! ভাস জল ডাস বেডয়তেন?”
(কিছু বলছো না কেন, অসভ্য মেয়ে! এবার বলো এইসব কি?)”
ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে কিছুক্ষণ আগের সেই করিডোরের সিসিটিভি ফুটেজ। অতি নিখুঁত ও স্পষ্ট ফ্রেমে বন্দী হয়ে আছে আনায়ার ক্ষুব্ধ অবয়ব—ডান হাতের মধ্যমা অঙ্গুলিটি সগর্বে উঁচিয়ে কেনীথের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেওয়া সেই চূড়ান্ত অপমানজনক অঙ্গভঙ্গি!
প্রফেসর মুলার গিলবার্ট টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার ছেড়ে উঠলেন,
“একজন প্রফেসরের সাথে এমন আচরণ করার সাহস পাচ্ছো কি করে তুমি? হাউ ড্যার ইউ!”
পুরো কক্ষে যেন বিষাক্ত এক অপমান-অপদস্ততার রেশ ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত অন্যান্য প্রফেসররা অসন্তোষে মাথা নাড়লেও, প্রভাবশালী গিলবার্টের রাগের সামনে কেউ একটি কথাও বলল না। সবাই চুপচাপ সেই অনাকাঙ্ক্ষিত অপমানজনক নাটক দেখতে লাগল।
অথচ এতসব তিরস্কার, সিসিটিভির চাক্ষুষ প্রমাণ আর চারপাশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা তীব্র অপমানের মাঝেও আনায়া নিস্পৃহ। সে স্রেফ মাথা নুইয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি মাটির দিকে নিবদ্ধ; মুখাবয়ব একদম ভাবলেশহীন। না আছে অপরাধবোধের কোনো রেশ, না অনুশোচনা, না কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ! ঠিক যেন এক জীবন্ত কাঠের পুতুল।
ভেতরের অনুভূতির পারদ ঠিক কোন চরমসীমায় পৌঁছালে একজন মানুষের বাহ্যিক রূপ এতটা শুনশান, নীরব হয়ে যেতে পারে—তা অনুমান করাও অসাধ্য। ঘটনার এই অপ্রত্যাশিত মোড়ে সবচেয়ে বেশি গোলকধাঁধায় পড়ল প্রফেসর ভিকে নামক ধুরন্ধর মানুষটা!
টেবিলের প্রধান সারিতে বসে থাকা কেনীথের লালচে চোখের দৃষ্টি আটকে আছে আনায়ার ওপর। আনায়াকে এভাবে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে, সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস করে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে সুক্ষ্ম নীল নকশা সে এঁকেছিল—তার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে কেনীথ হয়তো আনায়ার চোখে ভয়, কান্না কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যাকুলতা দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু আনায়ার এই অতিপ্রাকৃতিক নিস্পৃহতা ও নীরবতা কেনীথের হিসাব এক নিমিষেই উল্টে দিল। মেয়েটার চোখের কোণে জল তো দূরের কথা, কোনো কাঁপন অব্দি নেই!
আশানুরূপ দশা দেখতে না পেয়ে কেনীথের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ধীরস্থিরে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরনের ওভারকোটটি সযত্নে ঠিক করে নিয়ে, পরিমাপিত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো আনায়ার দিকে।
কেনীথ আনায়ার একদম কাছে এসে সটান দাঁড়াল। অতঃপর প্রফেসর গিলবার্টের দিকে ফিরে অত্যন্ত মার্জিত জার্মান সুরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
”প্রফেসর গিলবার্ট, আমার মনে হয় প্রমাণ যেহেতু স্পষ্ট, আর ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ করে আছে—অতএব বিষয়টি নিয়ে আর জলঘোলা না করাই শ্রেয়। ডিপার্টমেন্টের ভেতরের নিয়ম অনুযায়ী ওর ডিসিপ্লিনারি ব্যবস্থা যা নেওয়ার, তা আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখে নেব।”
প্রফেসর গিলবার্ট কেনীথের দিকে তাকালেন। কেনীথের এই অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তিত্বকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারলেন না। গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
“অলরাইট,প্রফ ভিকে! তবে এই ধরনের অসভ্যতা যেন দ্বিতীয়বার এই ক্যাম্পাসে না ঘটে।”
কেনীথ একবার আনায়ার ঝুঁকে থাকা মাথার দিকে তাকাল। ধীর ও নির্দয় শান্ত স্বরে বলল,
“গেট আউট ফ্রম হেয়ার, মিস এহসান।”
আনায়া একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। এমনকি কেনীথের মুখ পানে চোখ তুলে তাকালও না। স্রেফ নিঃশব্দে এক পা পিছিয়ে গিয়ে, বুকে আঁকড়ে ধরা নোটবুকটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে ধীর পায়ে টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
কেনীথ থমথমে মুখে নিঃশব্দে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। আনায়ার এই অতিরিক্ত শান্ত ভাবটাতেই যেন তার মনে নানান খটকা লাগল।
টিচার্স রুম থেকে একা বেরিয়ে আসার পর আনায়ার প্রতিক্রিয়া সাধারণ কোনো রমণীর মতো হলো না। না সে কান্নায় ভেঙে পড়ল, না ক্ষোভে ফুঁসে উঠল। চারপাশের সব কিছু অদ্ভুতভাবে শুনশান শান্ত। ঠিক যেমনটা কোনো প্রলয়ঙ্কারী কালবৈশাখী আছড়ে পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পুরো প্রকৃতি থমথমে, নিথর হয়ে যায়—আনায়ার ভেতরের পরিবেশটাও ঠিক তেমন রূপ ধারণ করেছে।
সে নির্জীব কিন্তু দৃঢ় পায়ে ভার্সিটির সীমানা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বন্ধুদের কেউ এখনো ক্যাম্পাসে আছে কিনা, কিংবা কেউ তাকে খুঁজছে কিনা—সেসব কোনো ভাবনা তার মাথায় প্রবেশ করল না। সোজা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও, আনায়া বাড়ির পথ ধরল না।
এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে শহরের এক কোণে অবস্থিত ফাঁকা, নির্জন এক পার্কে এসে উপস্থিত হলো। ইউরোপের এই কনকনে হিমেল আবহে, শেষ দুপুরে পার্কে বিষণ্ন এক নীরবতা বিরাজ করছে। আশেপাশে এই অসময়ে তেমন কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
আনায়া পার্কের একপাশে জমে থাকা বরফ-ছোঁয়া কাঠের বেঞ্চটায় গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল। ব্যাকপ্যাকটা পাশে রেখে, সে দুই হাঁটু সামান্য উঁচিয়ে সটান বসে রইল। খানিক বাদে আস্তে করে মুখ তুলে ওপরের বিশাল আকাশের পানে তাকাল। ধূসর, মেঘাচ্ছন্ন শূন্য আকাশের দিকে একনাগাড়ে শান্ত, নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সেই স্থির অক্ষিপটে পৃথিবীর সমস্ত জটিলতা আর অপমানের ভার যেন একাকার হয়ে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ চিরে গুঁড়ি গুঁড়ি তুষার ঝরতে শুরু করল। হিমশীতল তুষারকণাগুলো হাওয়ায় ভেসে এসে আনায়ার দীর্ঘ চোখের পাপড়ি কিংবা ধূপছায়াময় ললাট আর সামান্য শুষ্ক হয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এসে আস্তে করে ঝরে পড়তে লাগল।
ঠান্ডা তুষারের স্পর্শে আনায়া শুষ্ক, মলিন একচিলতে রহস্যময় হাসি হাসল। বিষাদ আর আক্রোশের অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ ফুটে উঠল সেই হাসিতে। অতঃপর সে ধীরেসুস্থে দুটি চোখ বুঁজে নিল।
চোখ বুঁজেই সে লাগাতার কিসব যেন ভাবতে থাকল। কেনীথের সেই বক্রহাসি, সিসিটিভির ফুটেজ, টিচার্স রুমের বিচার আর নিজের আত্মসম্মানের ওপর আঁচড় লাগার প্রতিটি মুহূর্ত তার মস্তিষ্কের অলিতে-গলিতে তীব্র গতিতে ঘুরপাক খেতে লাগল। প্রতিটি অপমানের জবাব কীভাবে কড়ায়-গণ্ডায় ফিরিয়ে দেওয়া যায়—মনের গহীনে যেন তার এক সূক্ষ্ম জাল বুনতে শুরু করল সে।
কিছুক্ষণ পর আনায়া ধীরে ধীরে চোখ দুটো মেলে তাকায়। চোখের সেই নিস্পৃহ ভাবটা উবে গিয়ে সেখানে জমা হয়েছে এক অদ্ভুত, দৃঢ় সংকল্প। সে বুক ভরে এক দীর্ঘ, শীতল শ্বাস ত্যাগ করল। সেই শ্বাসের সাথে যেন ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা ও ইতস্তত ভাবকে সে বাতাসের সাথে উড়িয়ে দিল।
আনায়া নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। ঠোঁটের কোণের সেই মলিন হাসিটা এবার আরো কিছুটা প্রসারিত ও ধারালো রূপ নিল। নিঃশব্দে বিড়বিড় করে আওড়াল,
”খেলাটা আপনি শুরু করেছেন মিস্টার ভিকে… কিন্তু সমাপ্তির পাতাটা আমিই লিখব। হয় আমি নিজে ধ্বংস হবো, নয়তো আপনাকে ধ্বংস করব। বাট আই প্রমিস,এই খেলার শেষটা আমি দেখেই ছাড়ব!”
বিকেল নাগাদ আনায়া বাড়ি ফিরে এলো। আইজেল-সাবা নিজেদের ঘরে অবস্থান করায় আর কারো সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ হলো না। আনায়া থমথমে গম্ভীর্যের সাথে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। একদম শান্তরূপেই আবার তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
সময়মতো বিকেলের শেষ প্রহরের দিকে সে এগিয়ে চলল ব্লাডেনের হেডকোয়ার্টারের দিকে। যদিও আজ ওখানে যাওয়ায় কোনো ইচ্ছে তার ছিল না, তবে নিজের মনমর্জির এক নিগূঢ় ভাবনাতেই সে হেডকোয়ার্টারে এসে পোঁছাল।
শুরুতেই একবার গ্যালারিতে চলে গেল; গতরাতে রাগের বশে ফোনের যে হাল করেছে তাতে নতুন একটা কিনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। টাকা-পয়সা যা ছিল তা দিয়ে নতুন আরেকখান অ্যাপেল ব্রান্ডের ফোন কিনে নিল; আগেরটা গোলাপী রঙের হলেও, এবারেরটা শখের বশে আকাশী-নীল রঙের। ফোন কিনতে গিয়ে সাথে কিছু ক্যামেরা নজরে পড়তেই, পছন্দ মতো সেটাও কিনে নিল। বাবার পাঠানো ও নিজের অর্জিত টাকার সবটাই শেষ করে সে হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে চলল। অতঃপর কোনোপ্রকার কালবিলম্ব বা করে সোজা ঢুকে পড়ল কেনীথের কেবিনে।
কেনীথ তাকে দেখামাত্রই খানিক অপ্রস্তুত হলো। অন্তত আজকেই এখানে আনায়াকে সে প্রত্যাশা করেনি। যে চাপারাগ নিয়ে মেয়েটা ভার্সিটি ছেড়েছে, সে তো ভেবেছিল এই রমণী আর সপ্তাহখানেক দেখা দিবে না।
স্বাভাবিকভাবে আনায়া বেশিরভাগ সময়ই পারমিশন নিয়ে কেবিনের ভেতরে ঢোকে না; অন্যান্য সময় এটা নিয়ে তাকে ঝারাঝারি করা গেলেও, আপাতত কেনীথ নিশ্চুপ থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনায়ার ভাবগম্ভীর্য পরখ করল।
সবর্দা চঞ্চলতায় উজ্জীবিত আনায়ার মুখাবয়বে নিকষিত অন্ধকারের গম্ভীর ছায়া। গায়ে লংসাইজের বাদামী হুডি আর কালো লেগিংস। পায়ে বেইজ স্নিকার্স,চুলগুলো আলগা খোঁপা করে বাঁধা। ভার্সিটিতে যেরূপে দেখেছিল অনেকটাই তেমন, কেবল গোসল সেরে ড্রেসগুলো চেঞ্জ করেছে। এই অবলোকনের মাঝেই কেনীথের মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগল, ‘এই মেয়ে আদোও খেয়ে-টেয়ে এসেছে তো? আমার এমন কেন মনে হচ্ছে, ও এতক্ষণ বাড়িতে নয় অন্যকোথাও ছিল!’
ততক্ষণে আনায়া থমথমে মেজাজ নিয়ে সোজা তার সম্মূখে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। কেনীথ কিছু বলার আগেই, আনায়া হঠাৎ স্পষ্টত জার্মান সুরে বলল,
“স্যার, ভাস্ মুস্ ইখ্ টুন?”
(স্যার, আমায় কি কি করতে হবে?)
কেনীথ কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই, আনায়ার স্থির অবয়বের দিকে একনাগাড়ে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। জিভের অগ্রভাগ দিয়ে মুখ-অভ্যন্তরে গালের একাংশের ত্বক স্পর্শ করে,কিছু একটা ভাবল। ওদিকে আনায়ার নিস্পৃহ দৃষ্টি সরাসরি কেনীথের দিকেই নিবদ্ধ। না কোনো সংকোচ, না কোনো ভয়—অনুভূতির কোনোকিছুই খুঁজে পেল না কেনীথ।
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলল; স্বাভাবিক হয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিজের সম্মুখের ফাইলের দিকে নজর দিল। কোনো কথাবার্তা ব্যতীত এতক্ষণ এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার পরও,আনায়ার মাঝে কোনো বিরক্তিবোধ এলো না। বরং ওদিক হতে কেনীথ থমথমে সুরে টেবিলের পাশেই রাখা কিছু ফাইলের দিকে ইশারা করে বলল,
“ঐ ফাইলগুলো ভালোমতো একবার চেক করে দেখবি, কোনোটায় সাইন করা বাদ পড়েছে কিনা। সবগুলো ঠিকঠাক থাকলে, সেলফে জায়গামতো সাজিয়ে রাখবি।”
আনায়া মাথা নামিয়ে আওড়াল,
“জ্বী!”
বলেই সে ফাইলগুলো নিয়ে, কেবিন হতে বেরিয়ে যেতে পা বাড়াল। কিন্তু তৎক্ষনাৎ পেছন হতে কেনীথ নিরেট স্বরে ডাকল,
“থাম!”
আনায়া দুহাতে ফাইল চেপে নিস্পৃহে পেছনে ফিরল। কেনীথ ফাইল হতে নজর তুলে আনায়ার দিকে তাকাল। আনায়ার নির্বিকার দৃষ্টির সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মিলিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“এখানে এতো ফর্মালিটিস না দেখালেও চলবে। এইসব স্যার ডাকা, জার্মানে কথা বলা…কোনোটারই প্রয়োজন নেই। এসব ফর্মালিটিস, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার দয়া করে ভার্সিটিতে মেনে চলবি।”
কেনীথ নিজের কথা শেষ করতে না করতেই, আনায়া প্রত্যুত্তর করল,
“যতদূর জানি, এই অফিসে জার্মানে কথা বলাটা বাধ্যতামূলক, তাহলে আমার ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন?”
কেনীথ দৃষ্টি উঁচিয়ে নিরেট স্বরে আওড়াল,
“আমি বলেছি তাই!”
আনায়া আর প্রত্যুত্তর দিল না। মাথাটা সামান্য ঝাঁকিয়ে কেবিন হতে বেরিয়ে গেলো। সে চলে যেতেই, কেনীথ নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। তবে একইসাথে চলতে লাগল, রমণীকে নিয়ে নানান সব অবাধ ভাবনা।
আধঘন্টা পর পুনরায় কেবিনে আনায়ার আগমন হলো। সে দুটো ফাইল ব্যতীত বাদবাকি সব নির্দেশমতো সেলফে সাজিয়ে রাখল। আর সেই দুটো ফাইল কেনীথের সামনে টেবিলের উপর আলতোভাবে রেখে দিয়ে বলল,
“ভাইয়া, এদুটোতে সাইন করা হয়নি।”
কেনীথ কর্মব্যস্ততার খেয়ালে প্রত্যুত্তর করল,
“আচ্ছা… ”
কিন্তু ফাইলদুটো টেনে নিতে হাত বাড়ানো মাত্রই তার হাতখানা থেমে গেল। ভ্রুযুগল কুঁচকে গেল এক লহমায়। থমথমে গম্ভীর্য নিয়ে সে আনায়ার নির্লিপ্ত মুখপানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এটা তুই কি বললি আমায়?”
আনায়া কোনোপ্রকার সংকোচ না দেখিয়ে,অকপটে বলল,
“কোনটা ভাইয়া? কি বলেছি?”
কেনীথ দাঁতে দাঁত পিষে আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোয়াল দৃঢ় হয়, ধমকে ওঠার প্রবণতা বাড়ে। তবুও নিজেকে শান্ত করে গমগমে সুরে আওড়ায়,
“ভাইয়া?”
আনায়া আবারও প্রত্যুত্তর করে,
“জ্বী ভাইয়া!”
কেনীথ আক্রোশে ওষ্ঠদ্বয় ভিজিয়ে, ফাইলগুলো সামনে থেকে একপাশে সরিয়ে রাখে,
“এবার একটু বেশি বেশি করছিস না?”
আনায়া সামান্য মুচকি হেসে বলে,
“কি আশ্চর্য! আপনার কাছে কোনটা বেশি বেশি মনে হচ্ছে বলুন তো? আপনাকে ভাইয়া ডেকেছি বলে কি আপনি রেগে যাচ্ছেন?”
কেনীথ দাঁত চেপে নিশ্চুপ রয়; আনায়া অবোধ হওয়ার ভঙ্গি করে আবারও বলে,
“প্লিজ রাগ করবেন না। আপনিই তো আমায় স্যার ডাকতে নিষেধ করলেন, সেক্ষেত্রে আমি আর কি করব বলুন? ভাইয়ার পরিবর্তে ছাইয়া বলে তো আর ডাকা যায় না!
আবার আপনার নাম ধরেও তো আর ডাকতে পারব না। যতই হোক আপনি আমার চেয়ে বয়সে কত বড়ওওও! ঠিকসময়ে সঠিক কাজটা সেরে ফেললে এতোদিনে আমার বয়সী আপনার একটা-দুটো মেয়েও থেকে যেত, তাই না ভাইয়া? এতোসব না ভেবে, আমার মনে হয় আপনাকে ভাইয়া ডাকাটাই ভালো হবে। সম্পর্কেও তো আমরা তেমন কিছুই, রাইট?”
কেনীথ বুঝতে পারছে না, এই মেয়েটার সাথে আদতে এইমূহূর্তে ঠিক কি করা উচিত। আনায়ার পরিবর্তে এইমূহূর্তে অন্য কেউ থাকলে নিশ্চিত একটা দ্বন্দ্বকন্দল লেগে যেত।
কেনীথ তার সর্বচ্চ প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো; চাপা স্বরে হুংকার ছুড়ল,
“তুই কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ করছিস!”
এই পর্যায়ে আনায়ার ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে গেল। শান্ত-নির্লিপ্ত রমণী হুট করেই চাপা আক্রোশে তেড়ে এসে টেবিলে উপর দুহাত ঠেকিয়ে, কেনীথের সম্মূখে ঝুঁকে পড়ল। হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“মেজাজ তো আপনি আমার খারাপ করছেন, আমার পুরো মাথা আপনি খারাপ করেছেন!”
কেনীথ তার আক্রোশে আরো খানিকটা ক্ষিপ্ত হলো। তাচ্ছিল্য করে পাশে মুখ ফিরিয়ে তির্যক হেসে, রাগ নিয়ন্ত্রণের সর্বচ্চ চেষ্টা করেও পুনরায় যেন ব্যর্থ হলো। হাতের সাইনপেনটা দৃঢ় শব্দে টেবিলের উপর ছুঁড়ে, তৎক্ষনাৎ আনায়ার দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে গর্জে উঠল,
“ফাইজলামি করিস আমার সাথে? দিনদিন অসভ্যের মতো আচরণ করবি, আর তা নিয়ে আমি শাসন করলেও সেটা দোষের হয়ে যাবে?”
আনায়া গা ঝেড়ে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াল। নির্ভীক কন্ঠে গমগমে সুরে বলল,
“ও আচ্ছা, শাসন করেছেন আমায়? তা কিভাবে শুনি? অথোরিটির কাছে গিয়ে নালিশ দিলেন, সবার সামনে সিনিয়র প্রফেসরকে দিয়ে কথা শুনালেন। অথচ নিজে যখন আগে আগে আমার কাছে এলেন, অসভ্যতা করলেন, তখন কিছু না? আর আমি কিছু করলেই ওটা ভুল,ওটাই দোষ?”
ক্ষিপ্ত রমণী রাগে একপ্রকার কাঁপতে শুরু করেছে। অথচ তার চোখ দুটোও আক্রোশে তখন ভিজে উঠেছে। কেনীথকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, সে আচমকা পায়ের কাছে থাকা চেয়ারে একটা লাথি মেরে শব্দ তুলে, বলে উঠল,
“এখন কিছু বলছেন না কেন, হ্যাঁ? আর কিসের শাসনের কথা বললেন? আপনি কি এটা বোঝাতে চাইছেন যে, আমার বাবা-মা আমায় কোনো শিক্ষা-দীক্ষা দেয়নি?”
—“না দেয় নি।”
কেনীথ সপাটে উত্তর দিতেই, আনায়া হকচকিয়ে বিভ্রান্ত হয়। আরেকটু দৃঢ়তা নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
—“ওহ রিয়েলি? তার মানে আপনি স্পষ্টভাবেই এটাই বলছেন যে, আমার বাবা-মা আমায় শাসন না করে অমানুষ বানিয়েছে? যেকারণে আজ যার-তার কাছ থেকে আমার কথা শুনতে হবে, তাই তো?”
কেনীথ শান্ত ঢঙে ব্যাকচেয়ারে গা এলিয়ে বসে রইলেও, অভিব্যক্তিত্বে চোয়াল দৃঢ় করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“একজন সিনিয়র প্রফ না হয় দুটো কড়া কথা বলেই ফেলেছে, তাতে এতো ট্রিগার্ড হওয়ার কি আছে?”
—“বেশি কথা বলবেন না, ঐ মুলার গিলবার্ট না কি যেন—আমার ইচ্ছে করছে ঐ স্যাকস্যাকা মুলাকে ধরে চিবিয়ে গিলে খেয়ে ফেলতে।”
আনায়ার আক্রোশের মাত্রায় কেনীথ তৎক্ষনাৎ ধমকে উঠল,
—“ঐ মুখ সামলে কথা বল! প্রফেসর গিলবার্ট তোর বাপ-চাচার বয়সী। শো সাম বেসিক রেসপেক্ট,ইডিয়েট!”
আনায়া মুহূর্তেই দমে গিয়ে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগল। আসলেই! এতো সিনিয়র প্রফেসরকে নিয়ে কথা বলে লাভ নেই, কিন্তু যিনি সামনে বসে আছেন—তাকে কি করে এতো সহজে ছেড়ে দেওয়া যায়?
আনায়া কোনোপ্রকার ভণিতা না করে, কাটকাট ত্যাছড়া সুরে বলতে চাইল,
“ও হ্যা তাই তো! তাহলে তো আপনাকেও আমার একই রেসপেক্ট দেওয়া উচিত। আপনিও তো আমার….”
আনায়া মুখ ফস্কে কি বলতে চাইছে, তা কেনীথের বোঝা হয়ে গিয়েছে। সে রমণীর চেষ্টা সফল হতে না দিয়ে, ঠান্ডা গলায় আবারও ধমক দিল,
—“কষিয়ে থাপ্পড় খাবি কিন্তু!”
সরাসরি থাপ্পড় দেওয়ার কথা শুনে, আনায়া একপ্রকার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল,
—“তো মারুন না! খালি মেরে দেখান একবার—তারপর দেখুন না, আমি আপনার কি করি!”
কেনীথ আর কথা বাড়াল না। সে বুঝে গিয়েছে,এই মেয়ের সাথে যত তর্কে যাওয়া যাবে, ততই ইডিয়টটা অভদ্রের মতো আচরণ করবে। এতোদিন সামনে এলেই মিনমিন করত,অথচ এখন সব ভয়ডর গুটিয়ে গলা উঁচিয়ে অসভ্যতা করতেও দুবার ভাবছে না। এমন ভাবনায় সে বিদ্রুপের স্বরে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
—“চোখের সামনে থেকে চলে যা!”
আনায়া ভেবেছিল আজ বোধহয় বড়সড় এক যুদ্ধ বেঁধে যাবে। কিন্তু হঠাৎ কেনীথ এরূপভাবে অবজ্ঞা করে চলে যেতে বলায়, সে মুহূর্তে দমে গেল। উগ্র মেজাজ থেমে গিয়ে পরিণত হলো ত্যাছড়া জেদে।
—“একবারেই চলে যাব আমি, করব না এই চাকরি-বাকরি। আপনার চেহেরাও আর দেখতে চাই না আমি।”
হাতদুটো মুঠো করে,গুমরো সাপের ন্যায় একপ্রকার ফুঁসতে ফুঁসতে আনায়া গমগমে মেজাজ নিয়ে কেবিন হতে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার পূর্বে কেবিনের দরজাটাও লাগাল বেশ শব্দ করে—নিজের রাগ-ক্ষোভের উগ্র বহিঃপ্রকাশে।
অন্যদিকে কেনীথ তখন থমথমে মেজাজ নিয়ে,কাঁচের দরজার দিকেই তাকিয়েই। চোখের সামনে কিভাবে রাগে ছটফট করতে করতে মেয়েটা চলে গেল—এটাই তাকে অনবরত ভাবাচ্ছে। মনে মনে বেশ খানিকক্ষণ আনায়াকে নিয়ে চিন্তাভাবনা পর, অস্ফুটে চাপা বিরক্তি নিয়ে আওড়াল,
“এতো রাগ, এতো জেদ! আবার মুখে মুখে তর্কও করছে—ইডিয়েট!”
আনায়ার মাথা ভনভন করতে শুরু করেছে। এটা কোন মুসিবত! গা থেকে রাগ-ক্ষোভ যেন কোনোমতেই কমছে না। এইমূহূর্তে তার মনের কোণে সুপ্ত ইচ্ছে জেগেছে,
“ওনার কপাল ভালো, জার্মানিতে বাংলা-বাঁশ পাওয়া যায় না! নয়তো বাড়ির পেছন থেকে বাঁশ এনে সোজা ওনার মাথায় ভাঙ্গতাম আমি!”
আনায়া দাঁত কিড়মিড়িয়ে নিজের রাগ ঝাড়তে ঝাড়তে পাভেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। পাভেলকে তার নিজের কেবিনে না পেয়ে,সোজা ইমানির কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের সামনে নিজের রাগ দেখানো ঠিক হবে না ভেবে, দরজার বাহিরেই নিজেকে কোনো মতো শান্ত করে সে কেবিনের ভেতর প্রবেশ করল।
ওদিকে ইমানি-পাভেল দুজনেই ফাইলের গাদা নিয়ে টেবিলের উপর ব্যস্ত সময় পার করছে। আনায়াকে শুরুতে পাভেলের নজরে পড়ায়, সে ব্যস্ততা সামলে মুচকি হেসে বলল,
“আরে আনায়া যে, এসো….”
আনায়া শুষ্ক হেসে কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। পাভেল তার পাশের চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে, তাকে বসতে ইশারা করল। তবে আনায়া বসল না। বরং সে দাঁড়িয়েই দুজনের দিকে অপ্রস্তুত ঢঙে দাঁড়িয়ে রইল। এইবার ইমানি তার ফাইল হতে নজর তুলে, আনায়ার দিকে তাকিয়ে তাকে এক সেকেন্ডের মাথায় ভালোমতো পরখ করে নিল। আনায়ার ফর্সা মুখটা খানিক লালচে তো মলিন দেখাচ্ছে। বেশভূষা অগোছালো না হলেও বিধস্ত ঠেকছে।
তৎক্ষনাৎ ললাটে কিঞ্চিৎ ভাজ ফেলে ইমানি প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে আনায়া, সব ঠিক আছে?”
আনায়া বিলম্ব না করে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“আমি এই জবটা আর করতে পারব না। ছেড়ে দিতে চাচ্ছি… ”
আনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই, দু’জোড়া চোখ আরেকটু গুরুত্ব দিয়ে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আনায়া দুজনের চাহুনিতে খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও, নিজেকে সামলে বলল,
“না মানে…”
ইমানি তাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলল,
“ভি-এর সাথে তোমার কিছু হয়েছে?”
আনায়া আবারও অপ্রস্তুত হলো। অবোধের মতো হাসার চেষ্টা করে বলল,
“না,না, ওনার সাথে আমার কি হবে? কিচ্ছু হয়নি, আসলে ভার্সিটির সাথে জব…আমি ঠিক সামলাতে পারছি না!”
ইমানি কিছু একটা ভেবে তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“ইট’স ওকে, তোমাকে অতিরিক্ত প্রেশার নিতে হবে না। বিকেলের সিফটে যেহেতু কাজ করছো তবে, দু-তিন ঘন্টা ম্যানেজ করতে পারলেই এনাফ!”
আনায়ার মনে হচ্ছে সে সমস্যা না কাটিয়ে উল্টো ফেঁসে যাচ্ছে। ইমানির কথার বিরোধিতা করে,আনায়া শান্ত সুরে বোঝাতে চাইল,
“না, বিষয়টা তা না। আমি সত্যিই চাচ্ছি না এই জব-টা করতে। আমার মূলত এই জবটার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে ভালো হয়, আমি চলে গেলে এই পোস্টে আরো ভালো বা ট্যালেন্টেড কেউ আসুক। যা আপনাদের জন্যও ভালো হবে,আর আমার জন্যও ভালো হবে।”
ইমানির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে আর বুঝতে বাকি নেই, ঘটনা মূলত কেনীথকে ঘিরেই কিছু একটা ঘটেছে। মুহূর্তেই শান্ত ইমানি তার গাঢ় লিপস্টিকের প্রলেপে সিক্ত ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে,খানিকটা কঠোর সুরে বলল,
“এভাবে তো তুমি জব ছেড়ে দিতে পারো না, আনায়া! তোমাকে সেদিন কি লরেন সবকিছু বুঝিয়ে পেপার্সে সাইন করায়নি?”
মুহূর্তেই আনায়ার চোখ-মুখ থমথমে গম্ভীর্যের আড়ালে ঢেকে গেল,
“পেপার্স? কোন পেপার্স?”
ইমানি মৃদু হেসে বলল,
“কন্ট্রাক্ট পেপার্সের কথা বলছি। ব্লাডেন গ্রুপের একটা রুলস আছে। এখানে কাজ করতে হলে, অবশ্যই নূন্যতম তিনমাসের একটা প্রিপারেশন নিয়েই আসতে হয়। এই তিনমাসে যতযাই কিছু হয়ে যাক, মেডিক্যাল ইঞ্জুরি ব্যতীত আর যে-কোনো কারণে যদি কেউ তিনমাসের আগেই জব ছেড়ে দেয়—তবে তার ছয়মাসের জেল হবে।”
আনায়ার মাথা আবারও ভনভন করতে লাগল। সে হতভম্ব সুরে বলল,
“মানেহ্?”
ইমানি আবারও মুচকি হাসে,
“কেনো, পেপার্সে তো সবটাই স্পষ্ট করে লেখা ছিল। তুমি পেপার্স পড়ে সাইন করোনি? আর এমনিতেও, তুমি কিন্তু এমাসের স্যালারি আগেই নিয়েছো। সেক্ষেত্রে কিভাবে এইমূহূর্তে জব ছাড়বে, বলো?”
আনায়া বুঝতে পারছে না তার এখন কি বলা উচিত। চিন্তায় যে মাথাটা ঘুরছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আ…যদি আমি আমার ঐ স্যালারির টাকাগুলো ফিরিয়ে দেই? তাহলে?”
ইমানি তার থেকে নজর সরিয়ে,ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল। মৃদু হেসে বলল,
“টাকাগুলো তো ফিরিয়ে দিতে হবেই! কিন্তু সাথে যে তোমায় ছ’মাসের জেলও খাটতে হবে, আনায়া!”
আনায়ার শরীরের সকল রক্ত যেন কেউ শুষে নিচ্ছে। সে ইমানির থেকে নজর সরিয়ে, পাভেলের দিকে তাকাল। পাভেলেও নিয়মের উর্ধ্বে গিয়ে, কিছু করতে পারবে না—এমনই অসহায়ত্বের ভঙ্গি ধরল। অথচ সে মনে মনে ভাবছে,
“ইমানি যেখানে চাইলেই, এই সমস্যা সমাধান করতে পারে—সেখানে কেনো নিয়মের ভক্করচক্করে আনায়াকে পেঁচিয়ে দিচ্ছে!”
মাথায় নানান ভাবনা ঘুরপাক খেলেও, পাভেল মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। ওদিকে আনায়াকে উদ্দেশ্য করে,ইমানি শেষবারের মতো বলল,
“এতো না ভেবে, তোমার সুবিধামতো কাজ করতে থাকো। যদি কোনো সত্যিই সমস্যা থেকে থাকে,তবে সময় নিয়ে এসো—আমরা একত্রে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করব।”
মহামায়া পর্ব ৫১
আনায়া’র আর কিছু বলার নেই। পারছে না শুধু হাত-পা ছুড়ে গড়াগড়ি করে কাঁদতে। সে কেবিন হতে অবশ ভাবমূর্তিতে বেড়িয়ে যেতে যেতে, কান্না মিশ্রিত স্বরে অস্ফুটে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“মন দিয়ে কাজ করব? কোথায় করব কাজ? কাজ করার জন্য তো ঐ লোকটার কাছেই যেতে হবে। এখন এই মুখ নিয়ে কিভাবে যাব ওনার সামনে! সব ফাঁসিয়েছে আমায়, সবক’টা ইচ্ছে করে ফাঁসিয়ে দিয়েছে!”
