বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫ (২)
ইশরাত জাহান
রাতে ঘুমানোর সময় সিনথিয়াকে ঘরে নিয়ে গেলো দিজা।শোভাকে উদ্দেশ্য করে দিজা বলে,“চুপচাপ নিজেদের ঘরে যাও।বাকিটা আমি দেখছি।”
শোভা মুখে হাসি ফুটিয়ে চলে গেলো।শোভা যেতেই তুহিনের উদ্দেশে দিজা বলে,“আপনার জন্য গেস্টরুম সাজিয়েছিলাম দুপুরেই।দেখে বলুন কিছু লাগবে কি না?”
তুহিন গেস্ট রুম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।সুন্দরকরে বিছানা গোছানো।দুটো বালিশ একটা কোলবালিশ রাখা।কাঁথা রাখা আছে পায়ের দিকে।মশারি টানানো আবার গুড নাইট দেওয়া আছে।পাশের টেবিলে পানির জগ আর একটা গ্লাস।সাথে আছে বিস্কুটের কৌটা।দিজা জানায়,“শুনেছি আপনি রাতের দিকে উঠলে ক্ষুধা লাগে তাই কিছু খাবার রেখে দিলাম।”
তুহিন আগ্রহ নিয়ে পিছন ফিরে জিজ্ঞাসা করে,“তুমি কীভাবে জানলে?”
দিজার বলতে মন চাইলো,“প্রিয় মানুষের সবকিছুর ব্যাপারে জানার এক অদম্য কৌতূহল জাগে মিস্টার মাহমুদ।আপনি বুঝবেন না।”
বলতে চেয়েও কথাটা মনের মাঝেই আটকে রাখল দিজা।কথা ঘুরিয়ে বলে,“ভাইয়ার বন্ধু আপনি।অজানা থাকে কিছু?”
তুহিনের মুখটা হাস্যোজ্বল ছিল ক্ষণিকের জন্য।আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে এলো।ছোট্ট করে বলে,“ও।”
দিজা প্রশ্ন করে,“আপনার কিছু লাগবে কি?”
তুহিন চশমার মাঝে দেখতে থাকে দিজাকে।প্রেমিক দৃষ্টি যেনো সরতেই চায়না।তবুও নিজেকে সামাল দিয়ে বলে,“লাগবে না আপাতত।”
দিজা মুখে হাসি ফোটায়।স্বাভাবিক হাসি।মনে মনে চায় দুজনের এই কথপকথন আরো কিছু সময় ধরে থাকুক।ফুরিয়ে না আসুক সময়।চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতে আরো বেশি সময়ের প্রয়োজন।মনকে সাহায্য করতে পারছে না দিজা।ব্যর্থ সে।সাহস নেই নির্লজ্জ হবার।সিনথিয়ার মতো মেয়েদের ধাঁচ পেলে দিজা হয়তো পারতো অধিকার জমাতে।কিন্তু সে তো তা নয়।বাধ্য হয়ে মনকে আটকে দেখে তুহিনের উদ্দেশে বলে,“আসি তাহলে মিস্টার মাহমুদ।”
তুহিন মুখে হাসি ফুটিয়ে জানার আগ্রহ দেখিয়ে বলে,“মিস্টার মাহমুদ?”
দিজা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“আপনার নাম তো এটাই।”
“সবাই তুহিন বলে ডাকে।”
“তাহলে নামের সাথে মাহমুদ থাকাটা বেকার হয়েগেলো না?আমি বরং বেকার নামটাকেই ডাক দিলাম।”
“এজ ইউর উইশ প্রেমা।”
“প্রেমা?”
“এই নামেই তোমাকে প্রথম চিনেছিলাম।”
“ভাইয়া তো আমাকে দিজা বলে ডাকে।”
“তোমাকে আমি দর্শনের বোন হিসেবে জানতাম না।”
“মানে?”
“মানে আর কি?তোমাকে আমি চিনতাম অনেক আগে থেকেই কিন্তু তুমি যে দর্শন ফরাজির আদরের বোন দিজা এটা অজানা ছিল আমার কাছে।ফরাজি বাড়িতে তোমাকে কখনও দেখিনি যে।যেদিন প্রথম দেখি প্রেমা নামেই চিনেছিলাম।এই একমাস হলো তোমাকে চিনেছি।”
“আপনি আমাকে আগে প্রেমা নামে জানতেন?এই নামে তো খালামণিরা ছাড়া কেউই ডাকে না।”
একটু ভেবে দিজা বলে,“আপনি কি কোনোভাবে আমার খালামণিদেরকে চিনেন?”
তুহিন মাথা নাড়িয়ে বলে,“চিনেছি কোনো এক ভাবে।”
“ওহ,আচ্ছা তাহলে আমি আসি?সিনথিয়া আপু ঘরে একা।”
তুহিন সম্মতি দিয়ে ফোস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে,“যাও তবে।”
দিজা চলে গেলো।তুহিন যাওয়ার পানে চেয়ে আছে একদৃষ্টিতে।চোখের কোনা দিয়ে এক ফোঁটা পানি পড়ল।ঠোঁট কামড়ে চশমা খুলে আঙুলের ডগা দিয়ে পানিটুকু মুছে বলে,“পুরুষ মানুষদের কান্না মানায় না।যে আমার না তাকে নাই বা পেলাম।শুধু তো বুকের মাঝে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকবে।এক সময় জ্বলন্ত জায়গাটায় দাগ হয়ে থাকবে।সেই দাগ নিয়েই নাহয় বেঁচে থাকব।”
ঘরে এসে অন্ধকার দেখে দর্শন মুখে হাসি ফোটালো।কিছু অনুমান করতে পেরেও অজানার ভান করে বলে,“এত তাড়াতাড়ি লাইট বন্ধ করে দিলি কেন?আমি আসার অপেক্ষা করতিস।”
শোভা জানায়,“সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।কালকে পরীক্ষা আছে তাই দ্রুত ঘুমাবো।আর হ্যাঁ আমি আপনার বউ আপনার বউয়ের জায়গায় আপনার বন্ধুকে রাখতে পারলাম না।দুঃখিত।”
দর্শন ঠোঁট কামড়ে হাসে।কোনো উত্তর না দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে শোভার পাশে। কোনা থেকে কোলবালিশ নিতে গেলেই আবছা আলোতে শোভা দেখতে পেয়ে বলে,“পাশে জলজ্যান্ত বউ থাকতেও কোলবালিশ লাগে মিস্টার ফরাজির?”
দর্শন সাথে সাথে কোলবালিশ পাশে রেখে শোভার দিকে ফিরলো।জানালা খোলা। চাঁদের আলোতে হালকা হালকা দেখা যাচ্ছে সবকিছু।শোভাকে দেখে বলে,“আমার কাছে আসতে ভয় করছে না তোমার?”
শোভা ঠোঁট বাচ্চাদের মতো ফুলিয়ে বলে,“মাঝে একটু একটু ভয় করলেও এখন বুঝলাম স্বামীকে এত ভয় করে কি হবে?স্বামী তো আমারই।তাকে শুধু ভয় পেলেই চলবে না বরং তার সাথে সব রকমের অনুভূতি জোগাতে হবে।”
“একদিন কি নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলাম তার মাঝেই এতো চেঞ্জ?”
“হুমমম চেঞ্জ।এখন ঘুমোবো।আমার খুব ঘুম পেয়েছে।সারাদিন বই পড়েছি এমনকি রাতেও পিকনিকের জন্য বেশ কাজ করতে হয়েছে রাত বাজে দুটো।এখন না ঘুমোলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়বো।সকাল সকাল ঘুমিয়ে ভোরবেলায় উঠতে উঠতে সেভাবেই অভ্যস্ত আমি।”
দর্শন জড়িয়ে ধরে শোভাকে।খুশি খুশি অনুভূতি হচ্ছে তার।শোভাও দুইহাত দিয়ে দর্শনকে জড়িয়ে ধরে রাখে।আচমকা দর্শনকে জিজ্ঞাসা করে,“সিনথিয়া আপুর হাত ইচ্ছা করে পুড়িয়েছিলেন তাই না?কারণ সে আপনার কাঁধে হাত রেখেছিল।”
“যে কাজ তোমার করার প্রয়োজন সে কাজ আমি করে দিলাম।যাই হোক তোমার তো ঘুম পেয়েছে।অযথা কথা বলো না।”
শোভা ঠোঁট প্রসারিত করে।দর্শনের বুকের মাঝে থেকে ঘুমের চেষ্টা করে।করলেই কি আর সফল হয় ঘুমোতে?শোভার মধ্য দিয়ে শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে।হালকা হালকা কাপছে।দর্শন অনুভব করে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিলো।দুজনেই এক কাঁথার মধ্যে লেপ্টে আছে।আজকের দিনটা কোনোরকমে গেলেও রাতটা যেনো দ্বিগুণ আনন্দে ছেয়ে আছে।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সবার জন্য রান্না করে শোভা।সাথে দিজাও সাহায্য করে।দর্শন ল্যাপটপ নিয়ে ইমারজেন্সি কাজ করছে।তুহিন এগিয়ে এসে ল্যাপটপের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে বলে, “স্কেমার?”
“হুমমম।আজকেই এটাক করতে চাইছে আমাদের।”
“ভাগ্যিস তুই জিনিয়াস।নাহলে তোর এই বাড়ি গাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স সব শেষ হয়ে যেতো।”
দর্শন রান্নাঘরের দিকে এক পলক চেয়ে হাত টানটান করে দুইহাত একত্রে আনে।কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্লান্তি দূর করে বলে,“আমাকে তো জিনিয়াস হতেই হবে।তবেই তো আমার ওয়াইফিকে সেফটিতে রাখতে পারব।”
“ভাবী তো এমনিতেই সেফতিতে আছে।”
“উহু,আমাকে ডেমেজ করতে ওরা শোভাকে টার্গেট করতেও পারে।স্পেশিয়ালি ওই মেয়েটা।যে কিনা শোভাকে দুচোখেও সহ্য করতে পারেনা।কারণ এত বড় নামকরা সেলিব্রেটি হয়েও সে আমার ওয়াইফির মতো হতে পারবে না।”
“এমন আরেকজন আছে।যে সিনথিয়ার মতো সেলিব্রেটিকে টক্কর দিয়ে উপরে যেতে পারে কিন্তু তার মনটা খুব পবিত্র।সে পারবে না এত নিকৃষ্ঠ হতে।আল্লাহ তাকে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছে।চেহারায় নেই ঘাটতি।চলে একদম সাদামাটা।তবুও সে আমার কাছে নজরকাড়া।”
তুহিনের আনমনে বলা কথা শুনে দর্শন তাকালো তুহিনের দিকে।ছেলেটা কোথাও হারিয়ে আছে যেনো।দর্শন তুহিনের কাঁধে আলতো চাপড় মেরে বলে,“মেয়েটা ভাগ্যবতী বলতে হয়।তুই তাকে ভালোবেসেছিস।”
তুহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “নাহ,বরং মেয়েটাকে আমার করতে পারলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে দাবি করতে পারতাম।”
“খুব ভালোবাসিস তাকে?”
“হয়তো।নাহলে আজ অব্দি যার সাথে সামনাসামনি থেকে একটা কথাও বলিনি,যার সাথে আমার কোনো মুহূর্ত নেই,যার সাথে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই তাকে নিয়ে কেন এত উন্মাদ আমি?তাকে না পাওয়ার শূন্যতা আমাকে কেন এত কুড়িয়ে খায়?”
“তাকে নিজের করে নে ভাই।নাহলে দেখা গেলো আমার থেকেও বড় ভয়ানক পুরুষ একদিন তুই হয়ে যাবি।”
“তাকে পাওয়া যে সম্ভব না।”
“কঠিনও না।আমার কথাটাই ভেবে দেখ।দূরে সরে গেলাম একমাত্র তোর ভাবীর সুরক্ষার জন্য।একেতো অল্প বয়সী মেয়ে।বিয়ে করার কথা মাথায় আনিনি কিন্তু তাকে দেখার জন্য দিশেহারা থাকতার।মনকে শান্ত করতে ওর স্কুলের সামনে গিয়ে ওকে দেখতাম।মুখ দেখতে পারতাম না কারণ ও পর্দা করে।শুধুমাত্র একটু দর্শন করতে যেতাম।ওটুকুতেই আমি শান্তি পেতাম।কেন এমন হতো বুঝতাম না।বিয়ে হলো অনাকাঙ্খিতভাবে।ভুল বোঝাবুঝি।এরপর ওর উপর রাগ হোক আর ওর ভালোর জন্য দুটো ভেবেই চারটা বছর নিজেকে দূরে রেখেছি।কতবার দেশে আসার জন্য ছটফট করতো মন কিন্তু আসিনি।সবদিক ভেবে আসিনি।আমার উগ্র আচরণ আমার ওভার পোসেসিভ ওটুকু মেয়ে সহ্য করতে পারবে না।ওর মুখ থেকে আমার আমি মুক্তি চাই শব্দটা শুনতে চাইনা বলেই আমি দূরে থেকে চিকিৎসা নিয়েছি।লাভ হয়নি।বুঝলাম কাজ হবে না।কারণ আমি মানুষটাই এমন হয়ে উঠেছি।যেটা আমার বলে দাবি করি সেটা আমারই।দেশে আসলাম দাদাজানের মিথ্যা অভিনয়ের কারণে।এসেও ফেঁসে গেলাম।মেয়েটাকে ইচ্ছা করেই ডিভোর্সের কথা বলতাম।ভেবেছিলাম ন্যাকামি করে নিজেকে সরিয়ে নিবে।কিন্তু না ওর মধ্যে সাহসিকতা দেখে ফেসেই গেলাম।ও একদম আলাদা।সবার থেকে আলাদা।ও আমাকেও টক্কর দিতে শুরু করে।সবদিক থেকে ইমপ্রেজ হয়েছিলাম মাঝ দিয়ে আবারও ঝামেলা শুরু হলো।ওর ওই প্রতিবেশী এসে ওসব না বললে আমি এত হাইপার হতাম না।খোঁজ নিয়ে দেখেছি ওই ছেলেটাও স্কেমার।ওরকম সাদাসিদা থেকে মেয়েদের ফাঁদে ফেলে।ঠিক সিনথিয়া যেমন মেয়েদেরকে ফাঁদে ফেলে।এসেছিল আমার ওয়াইফিকে ফাঁসাতে।ওই যে প্রতিবেশিরা ওকে নিয়ে কথা বলে।স্বামী দেশে নেই।বিয়ের পর একা রেখে গেছে।এসব শুনেই সুযোগ পেয়ে এসেছিল।লাভ হলো না।আমার নজরে পড়ে ছেলেটার ক্যারিয়ার ডুবে গেলো। ওকে শাস্তি দেবার সময় শোভার চোখে আমার প্রতি ঘৃণা ভয় দেখে আমার রাগ মাথায় চেপেছিল।প্রতিবার যখন শোভার চোখেমুখে এমন ভাব ফুটে ওঠে আমি ঠিক থাকতে পারিনা।মন চায় সবকিছু চুরমার করে দেই।কিন্তু শান্তি কখন পাই জানিস?যখন শোভা নিজে থেকে আমার কাছে ফিরে আসে।আমাকে পেতে যুদ্ধ করে।আমার ভীষণ লাগে।মন তো চায় ওকে সবকিছু উজাড় করে দেই।ওর জন্যই আমি আমার দুনিয়া গড়ি।এই বাড়ির নামটাও আমি ওর নামে করেছি।কিন্তু ওকে জানতে দেইনি।ওকে আমি সারপ্রাইজ দিবো।এই ঝামেলা মিটলেই ও জানতে পারবে এই বাবুই পাখির সুখী নীড় ওর নামে রেজিস্ট্রি করা।”
তুহিন সব মন দিয়ে শুনলেও শেষে গিয়ে অবাক।দর্শন তাহলে শোভাকে কতটা ভালোবাসে যে শোভার নামে বাড়িটাও লিখে দেয়।ইমপ্রেস হয়ে বলে,“তোর ভালোবাসা ভিন্ন রে ভাই।তুই এই উন্মাদ তো এই শান্ত।”
“সবকিছু ডিপেন্ড করে সম্পর্কের ভিত্তির উপর।”
একটু থেমে দর্শন আচমকা প্রশ্ন করে,“তুই নিজের ভালোবাসা পেতে কিসের এত ভয় পাচ্ছিস?”
তুহিন চমকে উঠল।তাকালো দর্শনের দিকে।ঢিলেঢালা টি শার্টের গলার দিকে ধরে ঘাড়ের দিকে হাত নিতে গেলেই দর্শন হাত ধরে নেয়।মুচকি হাসির সাথে বলে,“তুই তখনই মাথার পিছনে রাখিস যখন তুই কোনোকিছু এড়াতে বাহানা খুঁজিস।”
তুহিন শুকনো ঢোক গিলে বলে,“তাহলে জিজ্ঞাসা করিস না আর।আমার আর ভালো লাগছে না এসব নিয়ে কথা বাড়াতে।”
“কতদিন এসব নিয়ে সাফার করবি?তোর কষ্ট দেখে আমারই বিরক্ত লাগে।মন তো বলে ওই মেয়েকে কিডন্যাপ করে তোর সাথে বিয়ে দিয়ে দেই।”
তুহিন কথাটা শোনামাত্রই ফিক করে হেসে বলে,“তুই তা পারবি না ইয়ার।”
দর্শন নিজের উপর কনফিডেন্ট বজায় রেখে বলে,“দর্শন ফরাজিকে চ্যালেঞ্জ!আমি যদি চাই ভিলেন হতে তবে আমাকে কেউ সেদিক থেকেও হারাতে পারবে না।ইউ নো হোয়াট আই হ্যাভ দেট পাওয়ার।”
তুহিন ফিচেল হেসে তাকায় উপরের দিকে।সিনথিয়ার উদ্দেশে বলে,“ওই যে আসছে।”
বিরক্তি বোধ করে দর্শন।সিনথিয়া নিচে নেমে বলে, “হেয় টু হ্যান্ডসাম।গুড মর্নিং।”
দুজনের কেউই কথা বলে না।সিনথিয়া ঢং করে বসে দুজনের সামনে।হাঁটুর উপর হাঁটু রাখতেই শর্ট ড্রেস আরেকটু উঁচু হয়ে আসে। এতে অবশ্য সিনথিয়ার যায় আসেনা। এতে অভ্যস্ত সে।শোভা ও দিজা টেবিলে খাবার রাখতেই সিনথিয়ার কাণ্ড দেখে রেগে যাচ্ছে। দিজা হিংসায় জ্বলে বলে,“সকাল সকাল শুরু!”
শোভা টেবিলের উপর শব্দ করে পানির জগ রেখে বলে,“ওর আবার সকাল বিকাল আছে?”
সিনথিয়া এবং দুই বন্ধু মিলে পিছনে তাকালো।শোভাকে উদ্দেশ্য করে সিনথিয়া বলে,“সাবধানে কাজ করতে পারো না?”
“না পারি না।আপনার কি?”
“একদম মেনারলেস তুমি।”
“তাই তো।অন্যের স্বামীর সামনে ঠ্যাং দেখাতে পারিনা।মেনারলেস তো আমাকেই বলতে হয়।”
“মুখে যা আসে তাই বলে দেও।বেয়াদপ একটা।”
“বলি বলেই আমার স্বামী এখনও আমার আছে।নাহলে কালনাগিন যেভাবে সংসারে ঢুকেছে আমার সংসার গোল্লায় যেতো।”
“আমাকে কালনগিন বলো কোন সাহসে তুমি?”
“আমার স্বামীর গায়ের সাথে চিপকে থাকেন কোন সাহসে আপনি?”
“তোমার মতো মেয়েদের জন্যই হাসিখুশি পরিবেশ মুহূর্তেই নষ্ট হয়।”
“তাই?আমি তো মনে করি আমার মতো মেয়েদের আরো ঘরে ঘরে তৈরি হওয়া উচিত।নাহলে যেভাবে দিনদিন অন্যের সংসারে ঢুকে আসছে কিছু কিট তাদের থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না।”
তুহিন ইশারা করে দর্শনকে বলে,“ভাবীর যে ঝগড়া করার গুণ আছে আগে বলিসনি তো।”
“জেনে কি করবি তুই?”
“তাহলে পপকর্ণ নিয়ে আসতাম।টাইমটা ইনজয় করতে হবে না?”
“ধুর।”
“বিরক্ত হচ্ছিস কেন?আজকের দিনটা কীভাবে সামলাবি তাই ভাব।ভাবী তো ভার্সিটি গেলেই জানতে পারবে কোনো পরীক্ষা নেই।তখন?”
“ক্লাস শেষে শোভার কাছে যাবি।শোভাকে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব তোর।যদি না পরিস তো আমার উপর দোষ চাপিয়ে দিবি।আর হ্যাঁ তোদের বাসায় নিয়ে যাবি।আন্টিকে সব বুঝিয়ে বলেছি আমি।শোভাকে আন্টি সামলে নিবে।এরপর আমি স্বাভাবিক করে নিবো।”
“রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা?”
“রিস্ক না নিলে শোভা বাড়িতে চলে আসবে।আজকে ওকে আর দিজাকে এই বাড়িতে আনাই যাবে না।একটু পর আমরা চলে গেলেই বাড়িতে আতঙ্ক শুরু হবে।”
“আমার কিন্তু এখনই চিন্তা বাড়ছে।”
“রিল্যাক্স।আশেপাশে গার্ড আছে।”
“ওকে আমি রেডি হয়ে আসছি।”
তুহিন উঠতে নিলে দিজা বলে,“খেয়ে নিন আগে।তারপর সবাই যে যার ঘরে যাবো রেডি হতে।আপনিও তখন রেডি হয়েন।”
তুহিন চলে আসে টেবিলের কাছে।দর্শন ইচ্ছা করেই ল্যাপটপ রাখে সোফার সামনের টেবিলে।চলে গেলো খাবার খেতে। দিজা বিরক্তির সাথে সিনথিয়ার উদ্দেশে বলে,“তোমাকে কি ইনভাইট করতে হবে?”
সিনথিয়া এক পলক ল্যাপটপ দেখে বলে,“আমাকে এখানেই দে।আমার অফিসিয়াল কিছু কাজ আছে।খেতে খেতে সেরে নেই।”
দিজা কিছু বলতে নিলে দর্শন বলে,“দিয়ে দে।”
শোভা কপাল কুঁচকে তাকালো।দিজা দিয়ে এলো খাবার।সিনথিয়া সুযোগ বুঝে দর্শনের ল্যাপটপ থেকে ডকুমেন্ট সব নিজের ইমেইলে নিয়ে সেন্ড করে দেয় দর্শনের শত্রুর কাছে।কে সেই শত্রু এটা দর্শনের অজানা।সিনথিয়াকে দর্শনের ল্যাপটপ ঘাঁটতে দেখে শোভা বলে,“ওনার ল্যাপটপ নিয়ে আপনি কি করছেন?”
সিনথিয়া ভয় পেলেও বলে ওঠে,“আমার ফোনে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে।তাই দর্শনের ল্যাপটপ সামনে পেতেই ব্যবহার করছি।”
দর্শন বাকা হেসে খাবারে মনোযোগী হয়।তুহিন এক পলক দর্শনকে দেখে সেও খেতে শুরু করে।তুহিন আছে বিধায় শোভা খাবার নিয়ে সোফায় বসে কিন্তু সিনথিয়ার সামনে হয়ে।তাই কিছুই দেখতে পায়না।সিনথিয়াকে লজ্জা দিতে বলে,“কারো অনুমতি ছাড়া তার জিনিসে হাত দেওয়া অন্যায়।”
সিনথিয়া ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,“থ্যাংকস ফর ইউর এডভাইস।”
শোভা খাবার মুখে দিয়ে বলে,“অন্যকে মেনারলেস বলা ব্যক্তি যখন নিজেই মেনারলেস।”
সিনথিয়ার বিরক্ত লাগছে এবার।কাজে ব্যাঘাত ঘটছে দেখে ঝাড়ি মেরে বলে,“সামান্য কিছুক্ষণের জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করেছি তোমার প্রপার্টি হাতাচ্চ্ছি না।”
“আমার প্রপার্টি আমার স্বামী নিজে।তার জিনিস হাতিয়ে আপনি আবার আমাকেই ধমকান।সাহস কতবড় আপনার।”
দর্শন পিছনে ফিরে।শোভা মুখ খুলে খাচ্ছে। তুহিনও পিছন ফিরতে নিলে দর্শন হাত দিয়ে তুহিনের মুখ ফেরানো থামিয়ে বলে,“তোর ভাবী মুখ খুলেছে।”
“ওকে ইয়ার দেখছি না তোর বউয়ের ঝগড়া।”
দিজার মুখটা ফুলে ওঠে।খাবার খাওয়ার মাঝে দুই বন্ধুর এমন দৃশ্য দেখে হাসি পায় তাই হাসতে গিয়ে এমন অবস্থা।তুহিন যেই দিজার দিকে তাকালো দিজা কাশতে শুরু করে।দ্রুত করে দিজার সামনে পানির গ্লাস ধরে তুহিন।দিজা পানি নিয়ে ঢকঢক করে পান করে।
সিনথিয়া মেজাজ গরম করে বলে,“তোমার জন্য একটা কাজ শান্তিতে করতে পারছি না।”
শোভা বিরক্ত হয়ে দর্শনের উদ্দেশে বলে,“আপনার ল্যাপটপ অন্য কেউ ধরেছে।কিছু বলবেন না?”
দর্শন খাবারের দিকে ফিরে বলে,“কাজিন হয় আমার।ধরতেই পারে।”
শোভার চোখ বড় বড় হলো।প্রথম যেদিন দর্শনের সাথে এক ঘরে ঘুমোতে নেয় দর্শন বলেছিল তার জিনিস কেউ ধরলে তার নাকি রাগ ওঠে।আজ সেই রাগ কোথায়?মনে মনে বলে, “বাহ ভাই বাহ।আমার সাথে দুই নম্বরি।দেখাচ্ছি মজা।”
শোভা খাবার মুখে দিয়ে ধকধক করে পানি পান করে উঠলো।শোভাকে কোথাও যেতে দেখলো সিনথিয়া। পাত্তা দিলো না।নিজের কাজ শেষ করলো।এবার ঢুকলো কার্টুন দেখতে।মনের খুশিতে কার্টুন দেখছে আর খাচ্ছে।এর মধ্যেই কোথা থেকে এক বালতি পানি পড়ল তার মাথায় সমেত ল্যাপটপে।পুরো ল্যাপটপ ও সিনথিয়ার চুল ভিজে গেলো।সিনথিয়া চিৎকার করে ওঠে।টেবিলের উপর বসা সবাই উঠে দেখে শোভা রেগে এক বালতি পানি ঢেলেছে সিনথিয়ার মাথায় আর ল্যাপটপে।
দিজা মুখে হাত দিয়ে দর্শনের দিকে তাকালো।দর্শনের ল্যাপটপের বারোটা বেজেছে।এখন শোভার কি হবে ভাবতেই দিজা ভয় পাচ্ছে।দিদার একবার দর্শনের ল্যাপটপ পানিতে ভুল করে ফেলেছিল।শাস্তিস্বরূপ দিদারকে লাঠি দিয়ে হাতের পাতায় লাল করে দেয়।ল্যাপটপ ধরা বারণ ছিল সবার।দর্শন কড়াভাবে বারণ করেছিল।সেই কথা না শোনায় শাস্তি পায়।এখন শোভার কি হবে!
সিনথিয়া লাফ দিয়ে উঠে বলে,“আর ইউ ম্যাড?”
“আমাকে পাগল আপনি বানাচ্ছেন।আপনি বলে কাকে সম্বোধন করছি?এক শাকচুন্নিকে!কখনোই না।তোর মতো শাকচুন্নিকে আপনি বলে সম্মান করাটাই পাপ।”
দিজাও সম্মতি দিয়ে বলে,“তুমি তো শাকচুন্নিকেও অপমান করলে ভাবী।”
“তাই নাকি?”
শোভা প্রশ্ন করতেই দিজা মাথা উপর নিচ করে দর্শনের দিকে তাকাতেই শুকনো ঢোক গেলে।
সিনথিয়া গা ঝাড়া দিয়ে বলে,“আমাকে আবারও রেডি হতে হবে।”
বলেই উপরে চলে গেলো।তুহিন খেতে খেতেই বলে,“কালকে প্রেমা ওর গায়ে সস ছুড়লো আজকে ভাবী ওর গায়ে পানি ঢাললো।বেচারির উপর পরপর শুধু আক্রমণ হয়েই চলেছে।”
দিজা হাত মুঠ করে বলে,“খুব আফসোস আপনার ওকে নিয়ে?”
দর্শন কপালে ভাঁজ ফেলে দিজার রাগ দেখলো।তুহিন থমকে বলে, “নাহ,একদম না।”
সবাই চুপচাপ খাবার শেষ করে।সিনথিয়া চেঞ্জ করে এসে বলে,“আমাকে ভিজিয়ে দিলে আমি চেঞ্জ করে এসেছি কিন্তু দর্শনের ল্যাপটপের কি হবে?”
“ওটাও চেঞ্জ করা হবে।”
“জানো কত দাম এই ল্যাপটপের?তোমার কারণে ওর টাকা উড়ছে শুধু।”
“আমার স্বামীর টাকা আমার মাধ্যমেই উড়বে।আমার হক আছে আমার স্বামীর টাকা ওড়ানোর।আপনার তো এর মধ্যে হাত ঢোকাতে বলা হয়নি।তাছাড়া আমি ল্যাপটপ নষ্ট করতাম না যদি ওটা আমি ছুঁয়ে দেখতেন।আপনার মত নোংরা মানুষ ল্যাপটপ ধরেছে।ওটাতে এখন সমস্যা।তাই চেঞ্জ করতেই হবে।”
সিনথিয়া তেড়ে আসতে নিলে শোভা বালিশ ছুঁড়ে মারে সিনথিয়ার মুখে।সিনথিয়া পরে গেলো নিচে।অবাক হয়ে তাকায়।শোভা বলে,“আমাকে কেউ মারতে আসলে আমি ডাবল মারি তাকে।আর কিছু না শিখলেও জীবনে ফাইটব্যাক ভালই শিখেছি।”
দর্শন হাততালি দিয়ে এগিয়ে আসে।শোভার দিকে চেয়ে বলে,“ঝগড়া,মারামারি শেষ হলে এগোনো যাক ওয়াইফি।”
শোভাকে নিয়ে দর্শন যেতেই সিনথিয়া কাতর চোখে বলে,“আমি হার্ট হয়েছি দর্শন।”
দর্শন কিছু বলার আগে শোভা বলে,“তো উনি কী করবে?অফিস কামাই করে তোর সেবা করবে?আমার স্বামী কি তোর চাকর লাগে?”
সিনথিয়া দুঃখী দুঃখী মুখে বলে,“দেখো তুমি নিজেই ওকে দেখো ও কেমন?”
দর্শন মুখের হাসি ফুটিয়ে বলে,“আমার ওয়াইফিকে আমি সারাদিন দেখি।এই দেখা কোনোদিন ফুরোবে না।”
দুজনে উপরে চলে যেতেই তুহিনও চলে যেতে নেয় উপরের দিকে।সিনথিয়া আহত অবস্থায় মন খারাপ করে বলে,“আমার কোমরে ব্যথা করছে খুব।”
তুহিন বিপাকে পড়ে তাকালো।দিজা তাজ্জব হয়ে এলো ওদের কাছে।সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “উনি একজন শিক্ষক ডাক্তার ভেবে ভুল করো না।কোমরে যখন ব্যাথা করছে ডাক্তারের কাছে চলে যাও।”
বলেই তুহিনের দিকে ফিরে বলে,“রেডি হতে হবে তো আপনাকে।চলুন।এই কোমরে ব্যথা আপনারা কেউ না থাকলে আপনাপানি ঠিক হয়ে যাবে।আপনি আর ভাইয়া এখানে যতক্ষণ থাকবেন সিনথিয়া আপুর কোমরে ব্যথা ততক্ষণ থাকবে।”
তুহিন ঠোঁট চেপে হেসে চলে গেলো।পিছন থেকে দিজাও নিজ কক্ষের দিকে যাওয়ার জন্য হাঁটছে। উপরে উঠতেই দর্শন একটা বোরকা দিয়ে দিজার উদ্দেশে বলে,“এটা তোর জন্য।আজকেই এটা পরে ভার্সিটিতে যাবি।”
দিজা খুশি হয়ে নিলো।সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেলো তৈরি হতে।সিনথিয়া সোফার কোনা ধরে নিজের মত উঠে দাঁড়ালো।আসলেই কোমরে ব্যথা তার।খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে সোফায় বসে।মোবাইল হাতে নিয়ে ওপর প্রান্তে কল দিয়ে বলে,“এই দর্শন ফরাজির একটা ব্যবস্থা করুন।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫
ওপাশ থেকে কিছু শুনতেই দাঁত খিচে বলে,“হ্যাঁ ক্রাশ খেয়েছিলাম।প্রথমে যখন ওর বাড়িতে এসেছিলাম ভেবেছিলাম ছোটবেলার সেই মোটা গেয় দর্শনের কাছে যাচ্ছি।এখানে এসে ওর স্মার্টনেস দেখে পুরোই ক্রাশ।এইজন্য বলেছিলাম ওর ডকুমেন্ট আপনাকে দিবো শুধু কিন্তু এখন দেখছি নাহ।ওর জায়গা জমি ব্যাংক ব্যালেন্স যা আছে সব নিজের আয়ত্তে এনে ওকে শেষ করে দিবো।আপনি আমাকে ড্রাগটা দিবেন।আমি দুপুরেই ওর খাবারে মিশিয়ে ওর সাথে যা ডিল করার করে নিবো।”
