ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৮
রিক্তা ইসলাম মায়া
গুলশানে একটা কোচিং সেন্টারে সুখকে ভর্তি করানো হয়েছে। ভালো কোনো কলেজে চান্স পেতে হলে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো মার্কস জরুরি। সালমা সৈয়দ তো চাচ্ছেন সুখকে জাপানে নিজের বড় ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে। সেখান থেকে সুখ বাকি পড়াশোনা করে ফিরে আসলে তখন না-হয় রাদিলের সঙ্গে বিয়ে দিবেন উনারা। নয়তো সুখ মেয়ে হয়ে নিজের বিয়ের জন্য যেসব কথাবার্তা, আচরণ করছে সে-সব সবার চোখে দৃষ্টিকটু লাগছে। সৈয়দ বাড়ির মানুষের একটাই কথা, ছোট সুখকে বিয়ে দেবেন না এখন। সুখের বড় সুফিয়া, আফিয়ার বিয়ের আগে অন্তত সুখের বিয়ে দেবেন না ওনারা কেউ। বাড়ির বড় দুটো মেয়ে রেখে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইলে সমাজে নিন্দা করবে, সৈয়দ বংশের লোকদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করবে, যা কেউ চায় না। সমাজে সৈয়দ বংশের একটা নামডাক আছে। সম্মান নষ্ট করাটা কোনো গর্বের বিষয় নয়। সুখ ছোট মানুষ, বোঝে কম, সেজন্য নিজের বিয়ের জন্য পাগলামি করছে। উনারা বাবা-মা, গুরুজন হয়ে ছোট মানুষের কথায় ডিসিশন নিলে হবে না। তাই সালমা সৈয়দ স্বামী, শ্বশুরকে বলে সুখকে বাকি পড়াশোনার জন্য বড় ভাইয়ের পরিবারের কাছে জাপান পাঠাতে চাচ্ছেন। কিন্তু এতে মারিদ বিশেষ রাজি নয়। সুখও মায়ের ডিসিশনে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বাসায় বেশ কান্নাকাটি করেছে। এতে মাহবুব আলম একমাত্র মেয়ের কান্নায় গলে গিয়ে সুখকে বিদেশ পাঠানোর ডিসিশন বাদ দিয়ে দেন এবং সুখকে গুলশানের নিকটবর্তী একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দেন। সুখ ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে কোচিং ক্লাস করে। বাড়ির গাড়িতেই যাতায়াত করে রোজ।
আজ কোচিং শেষে সুখ গাড়িতে উঠে বসে। আজকাল সুখের বেশ মন খারাপ থাকে আর তার কারণ রাদিল। সুখ ওদের বিয়ের জন্য একা মেয়ে হয়ে পরিবারকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে, অথচ রাদিল নিশ্চুপ। কোনো চেষ্টা করছে না। বরং সবার কথা মেনে নিয়েছে। সেজন্য সুখ ঠিক করেছে সে আর রাদিলের সঙ্গে কথা বলবে না। সেই অভিমান নিয়েই সুখ রাদিলের ফোনও রিসিভ করে না। সুখ যতটা চঞ্চল, তার থেকে দ্বিগুণ জেদি আর অভিমানী মেয়ে। সুখের অভিমানের ভার সবাই সইতে পারে না, যেমন রাদিলও পারছে না। সুখকে রোজ কল দেয়, অথচ সুখ রাদিলের নম্বরটা ব্লকলিস্টে ফেলে রেখেছে। অন্যমনস্ক সুখ বাঁ হাতের দুটো আংটির দিকে তাকিয়ে। একটা গোল্ডের, অন্যটা ডায়মন্ডের রিং। গোল্ডের রিংটা রাদিলের মা হীরা চৌধুরী পরিয়েছেন। আর ডায়মন্ডের রিংটা রাদিল নিজে পরিয়েছে। সুখ রিং দুটোতে চুমু খায়। এই রিং গুলো সাক্ষী দেয় রাদিল ভাই শুধু সুখের একান্ত পুরুষ। সুখ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। ড্রাইভার বারবার চেষ্টা করেও গাড়ি স্টার্ট হচ্ছে না। সুখ ড্রাইভারকে প্রশ্ন করে বলে…
‘কী হয়েছে চাচা? গাড়ি স্টার্ট হচ্ছে না?
‘না আপামণি। কী জানি হইছে গাড়িটা।
অন্যমনস্ক সুখ তেমন কিছু বলল না। সামনেই ওদের বাড়িটা মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সুখ গাড়ির দরজা খুলে বের হতে হতে বলে…
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি পায়ে হেঁটে বাড়িতে চলে যাচ্ছি, আপনি গাড়িটা ঠিক করে পরে না-হয় নিয়ে আসুন।
‘ আপনে ইকটুখানি অপেক্ষা করেন আপামণি, এহনি গাড়ি ঠিক হইয়া যাইব। আপনে গাড়ি ছাড়া বাইত্তে গেলে বড় ম্যাডাম আমারে বকব।
‘কিছুই হবে না। আমি বুঝিয়ে বলব আপনার ম্যাডামকে। তাছাড়া মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা এতটুকু পথ আমি হেঁটে যেতে পারব।
সুখকে কোচিংয়ে নিয়ে যায় হাশেম। লোকটার বয়স চল্লিশের ঊর্ধ্বে। সুখদের বাড়িতে ড্রাইভারের কাজ করছে বিগত পাঁচ বছর ধরে। বিশ্বস্ত লোক বলে হাশেমের একা দায়িত্বে পড়েছে সুখকে কোচিং সেন্টারে আনা-নেওয়ার। সুখ হাশেমকে আর কিছু বলতে না দিয়ে কাঁধে ব্যাগ আর হাতে একটা বই চেপে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রাস্তার ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে আনমনে। সবাই সুখকে পড়াশোনার জন্য চাপ দিচ্ছে। বিয়ের পরেও তো পড়া যায়, এটা কেউ বুঝতে চাচ্ছে না কেন আল্লাহ জানে! সুখ যথাসম্ভব চেষ্টা করবে বিয়ের পরে যেন কোনোভাবে ওর পড়াশোনার ক্ষতি না হয়, তাও সবাই ওকে রাদিল ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিক। সুখ কি সবার কাছে খুব বড় অন্যায় আবদার করছে, যা পূরণ করা যাবে না? সৈয়দ বাড়ির গেটের সামনে আসতে দারোয়ান সুখকে গাড়ি ছাড়া একা আসতে দেখে দারোয়ান সবুজ আলী দ্রুত গেট খুলে দিতে দিতে বলে…
‘ছোট আপামণি, আপনে আইজ একলা ক্যান? হাশেম যায় নাই আপনেরে আনতে?
সুখ কিছু বলবে, তার আগেই ‘বু বু’ শব্দে রাদিল সেখানে উপস্থিত হয় কালো বাইকটা নিয়ে। লম্বা-চওড়া, বলিষ্ঠবান রাদিল সাদা প্যান্টের সঙ্গে ছাই রঙের শার্ট পরেছে। শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। দেখে মনে হচ্ছে না সে আজ কোনো ডাক্তার সাহেব। আজ মনে হচ্ছে রাদিল কোনো উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সুদর্শন মডেল। সুখ ইচ্ছা করেই সবসময় রাদিলকে খেপায় ‘কালো কালো’ বলে। অথচ রাদিল কালো নয়, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মানুষ দেখতে যেমন হয়, রাদিল তেমন গঠনের সুদর্শন পুরুষ। হাসলে রাদিলকে সব থেকে সুন্দর দেখায়। এত সুন্দর আর স্মার্ট ডাক্তার যদি বিয়ে না করে চোখের সামনে ঘুরতে থাকে তাহলে যেকোনো মেয়েই রাদিলের প্রেমে পরে যাবে, বাই এনি চান্স যদি কোনো কারণে রাদিলেরও মন বদল হয়ে যায় এবং সুখকে রেখে অন্য কাউকে পছন্দ করে ফেলে তখন সুখের কি হবে? সেজন্য মূলত সুখ রিস্ক নিতে চাই না বলে রাদিলকে দ্রুত বিয়েটা করতে চাচ্ছে। অথচ কেউ বুঝে না সুখের চিন্তাটা। সুখের কিসমতে মনে হয় বিয়েই নেই বাল।
রাদিল বাইকের ড্রাইভিং হ্যান্ডেল চেপে সুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সুখ রাদিলের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। সুখ রাদিলকে অপরিচিতের মতো পাশ কাটাতে গেলে রাদিল বাইকের সামনের চাকা সুখের পা অবধি নিয়ে আসে। সুখ ভয়ে মৃদু চিৎকার করে রাদিলের বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে তৎক্ষণাৎ বলে…
‘তুমি কি পাগল রাদিল ভাই? আমাকে মারতে চাও?
‘তোকে মারলে আমারই লস। অকালে বউ হারাতে হবে।
আতঙ্কে সুখ ভুলে গিয়েছিল সে রাদিলের সঙ্গে কথা বলে না, রাগ করেছে। রাদিলের কথায় তা পুনরায় মনে পড়ল। সুখ রাদিলের কথার উত্তর না দিয়ে রাগে চলে যেতে চাইলে রাদিল তৎক্ষণাৎ সুখকে ডেকে বলে…
‘এই দাঁড়া তুই। আমি যে এসেছি তোর চোখে পড়ে না?
‘না।
রাদিল বাইকে বসে থেকেই লম্বা হাত বাড়িয়ে খপ করে সুখের বাহু টেনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাতে করাতে বলে…
‘তুই তো বেয়াদব হয়ে গেছিস সুখ? বড়দের দেখলে সালাম-টালাম দিস না, আবার ইগনোর করে চলে যাস? ব্যাপার কী বল তো?
‘ কোনো ব্যাপার নেই। আমি অপরিচিত মানুষদের সাথে কথা বলি না। ছাড়ো আমাকে।
‘আমি তোর অপরিচিত হলাম কিভাবে?
‘ যেভাবে হওয়া যায় সেভাবেই।
‘ তাহলে তোর সাথে আমার কী চলে?
‘কিছু চলে না।
‘কিছু না চললে তুই যে সবাইকে বলে বেরিয়েছিস তোর সাথে আমার তিন বছরের রিলেশন? দুই সপ্তাহের এনগেজমেন্ট? এসব কি মিথ্যা?
‘হ্যাঁ।
সুখের জেদি জবাবে রাদিল নরম হয়ে আসে। সে তার মা আর সুখের উপর কখনো রাগ অভিমান করে থাকতে পারে না। এই পৃথিবীতে এই দুটো মানুষকে সে সব থেকে বেশি ভালোবাসে। বলতে গেলে এই দুটো মানুষই রাদিলের একমাত্র দূর্বলতা। রাদিল নরম সুরে বলে…
‘কী হয়েছে তোর? এমন পাগলামি করছিস কেন?
‘ কেন করছি তুমি জানো।
রাদিল ভারী হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে…
‘ আমার সাথের মারিদ-রিফাত বউ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সংসার করছে, অথচ আমি অপেক্ষা করছি তোর বড় হওয়ার। তোর কী মনে হয় আমার মন ছটফট করে না তোকে বিয়ে করতে? তুই ছোট, চঞ্চল বলে সবাইকে চিৎকার করে বলতে পারছিস তোর কী চাই সেটা। অথচ আমি বড় বলে তা-ও বলতে পারছি না। নিজের চাওয়াটা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে শুধু সবার দায়িত্ব আর বিশ্বাস ভাঙতে পারব না বলে। আজ বড় মামী আমাকে আর আম্মুকে ডেকেছে তোকে বোঝাতে, বিয়ের জন্য পাগলামি না করতে। অথচ আমি কাউকে বলতে পারছি না আমারও বউ লাগবে। উনাদের বাড়ির মেয়ে ছোট হলেও আমার কাছে সুখে থাকবে। বাড়ির বড়রা দেখছে এখন বিয়ে হলে তোর পড়াশোনা নষ্ট হবে। আফিয়া-সুফিয়ার আগে তোর বিয়ে হলে সৈয়দ বাড়ির মান-সম্মান নষ্ট হবে, মানুষ মন্দ বলবে। সেজন্য বড় মামী আমার দুহাত ধরে রিকোয়েস্ট করেছেন তোকে যেন বোঝাই, আপাতত তুই পড়াশোনাটা কন্টিনিউ করতি। আফিয়া-সুফিয়ার বিয়ে হলেই আমাদের বিয়ে দেবেন উনারা। সুখ, মাঝে মাঝে আমাদের না চাইতেও বড়দের কথা মেনে নিতে হয়। পরিবার আমাদের খারাপ চায় না। তোর পরিবারের কথাও ফেলে দেওয়ার নয়। উনারা অযৌক্তিক কিছু বলছেন না। তুই আর দুটো বছর অপেক্ষা কর। ইন্টার পাস করলেই আমি পরিবারকে চাপ দেব বিয়ের জন্য। এই কথাটা রাখ অন্তত আমার জন্য।
সুখের রাগ কমে আসে। রাদিলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে…
‘আমি বড় হতে হতে তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো তখন?
কষ্টের মাঝেও হেসে ফেলে রাদিল। খুব সাধনার সুখ তার। সুখের ভালোবাসা পাওয়া রাদিলের সাত জন্মের ভাগ্য। সুখকে এত ভালোবেসে রাদিলের মন বদল হওয়াটা অসম্ভব। রাদিল সুখের গাল ছুঁয়ে বলে…
‘তোকে ছাড়া ডক্টর রাদিল চৌধুরী অসম্পূর্ণ। তোর সঙ্গে সংসার বাঁধার ইচ্ছা আমার বহু বছরের। ছেড়ে দেয় কিভাবে বল?
‘তাহলে চলো না রাদিল ভাই, আমরা দুজন কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি। পরিবারের কেউ জানল না, আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকলাম।
‘ এমনটা করলে পরিবারের মানুষরা কষ্ট পাবে সুখ।
‘তুমি শুধু পরিবারের কষ্ট দেখছ, অথচ আমার কষ্ট তোমার চোখে পড়ছে না রাদিল ভাই?
‘তোর কী কষ্ট?
‘তোমাকে ছাড়া আমার থাকতে কষ্ট হয়।
সুখের কথায় রাদিলের মাইন্ডে চলে আসল অন্য কিছু। এক মুহূর্তের জন্য রাদিল ভাবল, সুখ হয়তো ফিজিক্যাল কোনো সমস্যায় ভুগছে, যার জন্য বারবার সবাইকে বলছে ওকে বিয়ে দিতে। মেয়েরা সচারাচর বিয়ের জন্য পাগল হয়না। ছেলে বিয়ের জন্য পাগল হয়ে থাকে। এখানে সুখ বিয়ের জন্য পাগলামি করছে এতে বিশেষ কোনো কারণও তো থাকতে পারে তাই না? রাদিল একজন ডাক্তার হয়েও এই কথাটা কেন তার মাথায় আরও আগে আসেনি? হতে পারে সুখের ফিজিক্যাল সমস্যার জন্য ওর একা থাকতে কষ্ট হচ্ছে, সেজন্য সে রাদিলকে স্বামী হিসেবে চাচ্ছে। রাদিল ভ্রু কুঁচকে সুখের মুখের দিকে তাকায়। সুখ সহজ-সরল দৃষ্টিতে রাদিলের দিকে তাকিয়ে উত্তরের আশায়। রাদিল এক পলক চারপাশে তাকিয়ে দরোয়ান লোকটাকে দেখল কোথায় আছে, সবুজ আলী চেয়ার পেতে দরোয়ানঘরে বসে। রাদিল অল্প সুখের দিকে ঝুঁকে ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করে বলে…
‘তুই কি ফিজিক্যালি কোনো সমস্যায় ভুগছিস সুখ? সেজন্য বিয়ে করতে চাচ্ছিস? আমাকে লাগবে তোর?
সুখ মনে করেছিল রাদিল কোর্ট ম্যারেজের ব্যাপারে হ্যাঁ বা না কিছু একটা বলবে ওকে, অথচ রাদিল বলছে অন্য কথা! সুখ রাদিলের কথার অর্থ প্রথমে বুঝতে পারেনি। অবুঝ গলায় সুখ পাল্টা প্রশ্ন করল তক্ষুণি…
‘মানে কিসের ফিজিক্যাল সমস্যা রাদিল ভাই? আমি বুঝিনি তোমার কথা। বুঝিয়ে বলো।
রাদিল একজন ডাক্তার। আর ডাক্তারদের লজ্জা-শরম বলতে কিছু থাকে না। তাদের পড়াশোনায় থাকে মানুষের ভিন্ন বডি পার্টের ওপর। তাছাড়া ডাক্তার হয়ে পেশেন্টের সঙ্গে লজ্জা-শরম রাখলে পেশেন্টের সমস্যা কথা জানা যাবে না। রাদিল এই মুহূর্তে সুখকে একজন পেশেন্ট হিসেবে দেখছে, বিধায় সে সরাসরি সুখকে প্রশ্ন করছে। রাদিলের মনে হচ্ছে সুখের হয়তো ফিজিক্যালি কোনো সমস্যা হচ্ছে। রাদিল সুখকে বোঝাতে চেয়ে সরাসরি প্রসঙ্গ তুলে বলে…
‘তোর কি শারীরিক চাহিদা কিংবা যৌনতার সমস্যা হচ্ছে? স্বপ্ন…
রাদিলের বাকি কথা শেষ করার আগেই সুখের হাতে থাকা বইটা তৎক্ষণাৎ রাদিলের মুখের ওপর ছুড়ে মেরে বলে…
‘তুমি একটা অসভ্য ডাক্তার হয়েছ রাদিল ভাই! ছিঃ, কী খারাপ তুমি আর তোমার চিন্তা ভাবনা।
সুখের ছুড়ে মারা বইয়ের কোণায় লেগে রাদিল ঠোঁটে অল্পস্বল্প ব্যথা পেয়েছে। সুখের বইটা রাদিল পরে যাওয়া থেকে ধরে নেয় বিরক্তিতে সুখকে বলে…
‘কিরে ভাই, আমি খারাপ কী বললাম? তোর কী সমস্যা থাকতে পারে না?
সুখ রেগেমেগে বলে…
‘আমার কোনো সমস্যা নেই, তোমার সমস্যা আছে, আর সেজন্যই তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছ না।
রাদিল বিরক্তি টেনে বলে…
‘যা, তোর বাপরে গিয়ে বল আজই আমাদের বিয়ে দিয়ে দিতে, তারপর দেখব কার কোথায় কী সমস্যা আছে।
‘তুমি অনেক খারাপ রাদিল ভাই। তোমার চিন্তাভাবনা এর থেকেও খারাপ। ছিঃ, কি জঘন্য! ইঙ্গিত করে কথা বলো।
‘তুই আমাকে এমনভাবে দোষ দিচ্ছিস, মনে হচ্ছে তোর এসব লাগবে না কখনো? আমি তো শুধু বিয়েটার অপেক্ষায় আছি, নয়তো সংসার তো আমি ফার্স্ট নাইট থেকেই শুরু করব। এবার তুই যতই ছোট হস কিংবা বড়। আমার এত কিছু ভাবার সময় নাই।
সুখ কিছু বলে না। নাক-মুখ ফুলিয়ে রেখেছে রাগে। রাদিল সুখকে আরও একটু রাগিয়ে দিতে হঠাৎ সুখদের বিল্ডিংয়ের দিকে ইশারা করে তৃতীয় ফ্লোরের বারান্দার দিকে দেখিয়ে বলে…
‘দেখ তো মামাতো বোন, তোর শাশুড়ির সঙ্গে আমার শাশুড়ি দাঁড়িয়ে আছে না বারান্দায়?
সুখ রাদিলের ইশারার দিকে তাকিয়ে দেখল, সালমার সঙ্গে হীরা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে তৃতীয় ফ্লোরের বারান্দায়। দুজনের দৃষ্টি রাদিল-সুখের ওপরই। সুখ সেদিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে রাদিলকে রেগে বলে…
‘ শাশুড়ী না ছাই। আমি তোমাকে এই জীবনেও বিয়ে করব না। যে আমার মন বোঝে না, তাকে আমার দরকার নেই।
সুখ রেগে চলে যেতে চাইলে রাদিল আবার সুখের বাহু টেনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ইমোশনাল হয়ে বলে…
‘বিয়ে করব না—এই কথাটা মজা করেও কখনো বলিস না সুখ। বলা তো যায় না, আল্লাহ যদি তোর মজাচ্ছলে বলা কথাটা কবুল করে নেন, তাহলে আমি পাগল হয়ে যাব তোর বিরহে। আমার ছোট একটা জীবনে ইহকালে, পরকালে—দুইকালেই তোকে চাই বউ হিসেবে, মামাতো বোন।
এবার হয়তো সুখের মনও নরম হয়েছে। সুখ চঞ্চলতায় নিজের ডান হাতের তালু রাদিলের দিকে বাড়িয়ে বলে…
‘তাহলে ওয়াদা করো, তুমি আমাকে খুব দ্রুত বিয়ে করবে। এবং ইহকাল-পরকালে আমাকেই আল্লাহর কাছে চাইবে বউ হিসেবে। আমি কিন্তু পরকালেও তোমার সাথে থাকতে চাই রাদিল ভাই।
রাদিল হেসে ফেলে সুখের চঞ্চলতা আর অবুঝপনা দেখে। ভালোবাসা সত্যি অবুঝ হয়, তার প্রমাণ রাদিলের জন্য সুখের অসীম ভালোবাসার টান দেখলেই বোঝা যায়। রাদিল সুখের হাতের ওপর হাত রেখে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে ওয়াদা করে বলে..
‘ এই যে ওয়াদা করলাম, আল্লাহ যদি চান তাহলে ইহকাল-পরকালে আমরা দুজনই স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকব ইনশাআল্লাহ।
সুখ চট করে খুশি হয়ে যায়। উজ্জ্বল হেসে চঞ্চলতায় ফের বলে…
‘তাহলে আমি এক্ষুনি গিয়ে সবাইকে বলছি, তুমি আমার হাত ধরে কান্নাকাটি করে রিকোয়েস্ট করছ যেন আমি তোমাকে দ্রুত বিয়ে করি। সাক্ষী হিসেবে তোমার শাশুড়ি আর আমার শাশুড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, কী বলো ফুফাতো ভাই যাব?
রাদিল হেঁসে ফেলে। সুখ তার তীর তার দিকেই মারছে। রাদিল বাইকে বসা অবস্থায় মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বলে…
‘তোর মতো বউ যার আছে, তার জীবনে শত্রু আর বিনোদন—দুটোরই অভাব কখনো পড়বে নারে মামাতো বোন। তুই একটা জটিল মানুষ।
মানিক খোলা আকাশের নিচে গাড়ির ওপর হাত-পা মেলে শুয়ে আছে। বুক পুড়ছে নূরজাহানের বিচ্ছেদে। মাত্রই নূরজাহানের জন্য মাজিদ-আহাদকে মেরে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে এসেছে সে। হাসানকেও মেরে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে হুমকি দিয়ে এসেছে—নূরজাহানের স্বামীকে মেরে নূরজাহানকে বিধবা করে তারপর বিয়ে করবে সে। নূরজাহান পরী শুধু তার। নূরজাহান পরীর জন্মই হয়েছে শুধু মানিক সওদাগরের জন্য। মানিকের হাতের তাজা রক্ত শুকিয়ে চামড়ায় লেগে আছে। শরীরের জায়গায় জায়গায় তার আঘাতের চিহ্ন। মানিক অশ্রুসিক্ত চোখে আকাশের মস্ত বড় চাঁদের দিকে তাকিয়ে
মনখারাপের সুরে গান ধরল…
‘কার আসমানে উড়ো রে
আমার মন-পিঞ্জরার পাখি?
ফাঁকি দিবা জানলে কি আর
যতন কইরা রাখি।
আমি জানতাম যদি তোমার
পিরিত কচুপাতার পানি,
তবে কি আর কুল হারাইয়া
হইতাম অপমানী।
বেলাল, কিশোর, আশিক, ঝন্টু, মন্টু—সবাই আজ সকালে মানিকের সঙ্গে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। দীর্ঘ দুমাস জেলে থেকে ফিরে সবাই একবার যার যার বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। বেলাল-কিশোর এতিম ছেলে হওয়ায় তাদের বসতি সওদাগর বাড়িতেই। মানিকের সঙ্গে তাদের চলাফেরা চব্বিশ ঘণ্টাই লেগে থাকে। মানিক জেল থেকে রেহাই পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে মোল্লা সওদাগর, রতন, তাপস, হারুন সওদাগরের কিছু ছেলেপেলে একত্রে।
লাস্টবার মানিক নূরজাহানকে কালিঘাটিতে অসুস্থ অবস্থায় রেখে এসেছিল, মানিক সেই চিন্তায় জেলে বসে পার করে দুটো মাস। দীর্ঘদিন ধরে নূরজাহানকে দেখার তৃষ্ণায়! মানিক প্রথমে নূরজাহানদের বাড়িতে যেতে চাইল নূরজাহানকে দেখতে। কিন্তু মোল্লা বাধা দেয়। রতন, তাপস, মোল্লা সবাই মিলে জানায় সেদিন রাতেই নূরজাহানের বিয়ের খবরটা। মানিকের জন্য নূরজাহানের বিয়ের খবরটা ছিল আসমান ভেঙে মাথায় পড়ার মতো। মানিক কলিজা কেঁপে উঠে। ভিতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। তিলমিলিয়ে ওঠে হিংস্র রাগে। মানিক তক্ষুনি জেল থেকে সোজা সিকদার বাড়িতে পৌঁছায়। সাজিদের বিয়ের জন্য আহাদ বাড়িতে এসেছিল। সাজিদ তখন বাড়িতে ছিল না, সে চট্টগ্রাম শহরে গিয়েছিল জরুরি কাজে। বাড়িতে হাসান, মাজিদ, আহাদ তিনজনই ছিল। মানিক দলবল নিয়ে নূরজাহানদের বাড়ি ভাঙচুর করে। হাসান, মাজিদ, আহাদ—তিনজনকেই মেরে রক্তাক্ত করে। মানিকের ক্ষোভ ছিল হাসানের ওপর। হাসানের জন্য সে কখনো নূরজাহানকে বিয়ে করতে পারেনি। আবার এই হাসানই তার নূরজাহানকে অন্য কারও সঙ্গে আবারও বিয়ে দিয়েছে। মানিক রাগে-ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে হাসানকে মারতে চায়। আহাদ-মাজিদ বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে দুজন মানিকের লোকদের হাতে আহত হয় গুরুতর। মানিক হাসানকে হুমকি দিয়ে এসেছে সে ঢাকায় যাবে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়িতে। নূরজাহানের স্বামীকে মেরে নূরজাহানকে সে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।
চাঁদ রাতের আধারে বেলাল, কিশোর, আশিক, ঝন্টু, মন্টু—সবাই মানিককে ঘিরে দাঁড়িয়ে। মানিক কালো জিপ গাড়িটার ওপর হাত-পা মেলে শুয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে। মানিকের গান যে একবার শুনেছে, সে মুগ্ধ হতে বাধ্য। কালো মানিকের গান অত্যন্ত মধুর, সুরেলা, মানুষের মন-আত্মা জুড়িয়ে যাওয়ার মতোন।
মানিক কাঁদছে। বেলাল, কিশোর, আশিক, ঝন্টু, মন্টু—ওরা কখনো ওদের ভাই মানিককে কাঁদতে দেখেনি। মানিক লোহা পিটিয়ে অস্ত্র বানানো ছেলে। সে মানুষকে কষ্ট দেবে, তারপরও নিজেও কষ্ট পেয়ে কাঁদার ছেলে নয়। আজ সে শক্তপোক্ত কালো মানিক নূরজাহানের বিচ্ছেদে কাঁদছে। এর আগের বারও যখন নূরজাহানের ফোনে বিয়ে হয়, তখনও মানিক কাঁদেনি, বরং তুলকালাম বাধিয়ে নূরজাহানের শ্বশুরকে আগুনে জ্বালিয়ে মারল। একরাতের মধ্যে নূরজাহানের বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটাল। তখন মানিক উপস্থিত ছিল বলে নূরজাহানকে কেউ তার থেকে কেড়ে নিতে পারেনি, কিন্তু এইবার মানিকের ফিরতে হয়তো দেরি হয়ে গেছে। তার ভালোবাসার নূরজাহানকে অন্য কেউ নিয়ে গেছে। মানিকের কলিজা পুড়ছে নূরজাহানের বিচ্ছেদে। হঠাৎ সেখানে মোল্লা সওদাগর লাঠি হাতে উপস্থিত হয়। পাশাপাশি রতন, তাপস এসেছে বড় ভাইয়ের খোঁজে। চারপাশে রাতের অন্ধকার। আকাশে মস্ত বড়ো চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে ধরণীতে। মানিক সওদাগর বাড়ির সামনে রাস্তায় জিপ গাড়ি থামিয়ে তাতে শুয়ে আছে। মোল্লা সওদাগর মানিককে ডেকে বলে…
‘আব্বাজান, উঠেন। কষ্ট পাইয়েন না। আমনের আব্বা এহনো বাইচ্ছা আছে, কেউ আমনের নূরজাহানরে আমনের থেইক্কা আলাদা করবার পারব না। আমি কথা দিতাছি, খুব জলদি নূরজাহানরে আমি আমনের পায়ের কাছে পালামু।
বাবার সান্ত্বনায় মানিক জিপ থেকে নিচে নেমে আসে। চোখ-মুখ ফুলে আছে কান্নায়। মানিক জিপ থেকে নেমে সোজা মোল্লা সওদাগরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে কান্না ভেজা গলায় বলে…
‘আব্বা, আমার নূরজাহান আমারে ছাইড়া কেমনে বিয়া করল? ওর আমার কথা মনে পড়ে নাই? আমার নূরজাহান এত স্বার্থপর কেমনে হইলো, আব্বা? আমার বুকটা ফাইটা যাইতাছে নূরজাহানের লাইগা। আমি আমার নূরজাহানরে ছাড়া কেমনে বাঁচুম, আব্বা তুমি কইয়া দেও? আপনের দুইডা পায়ে পড়ি আব্বা, আমার নূরজাহানরে আমার কাছে আইন্না দেন। আমি নূরজাহানরে ছাড়া বাঁচুম না। মইরা যামু।
পরপরই মানিক মোল্লা সওদাগরের পা দুহাতে জড়িয়ে হাউমাউ করে চিৎকার করে নূরজাহানের নাম ধরে ডাকতে থাকে, ‘ওই পরী, ক্যান করলি তুই বিয়া? ক্যান আমারে ছাইড়া গেলি? আমি তোরে ছাড়া কেমনে বাঁচুম, কইয়া যা? ওই পরী! ওই ক্যান করলি তুই এইডা?
গিফট কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকতেই নূরজাহানকে জায়নামাজে মোনাজাতে দেখে মারিদ নিঃশব্দে ড্রেসিং টেবিলের সামনে পার্সেলটা রেখে গলার টাই ঢিল করে। কাবার্ড থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে যায়। নূরজাহান এশার নামাজে বসে। জীবনের অনেক উত্থান-পতনের সময়ও নূরজাহান কখনো প্রভুর দরবার ছাড়েনি। সবসময়, সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে বলেছে, সাহায্য চেয়েছে আজও তাই করছে। জীবনে অনেক হিসাব অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। নতুন কিছু পেয়ে পুরাতন অনেক কিছুই পেছনে ফেলে এসেছে সে। নূরজাহান মোনাজাতে ফুঁপিয়ে কাঁদে। ঘরে কারও উপস্থিতি বুঝে নূরজাহান মোনাজাত শট করে। আল্লাহর দরবারে চাওয়া কোনো কিছু কারও সামনে প্রকাশ্যে আনতে চায় না নূরজাহান। নূরজাহান নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে চারপাশে তাকায়। ওয়াশরুমের পানির শব্দ পেয়ে বোঝে মারিদ আজ অসময়ে বাড়িতে চলে এসেছে। নূরজাহানের অস্বস্তি লাগে, মারিদ কি নূরজাহানকে কাঁদতে দেখেছে মোনাজাতে? নূরজাহান ভাবার সময় পেল না, এর মাঝে নূরজাহানের ফোন বাজতে নূরজাহান জায়নামাজের-বিছানা গুছিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে হাসানের কল। নূরজাহান ফোন রিসিভ করে কানে দিয়ে বারান্দায় যায়। দীর্ঘ সময় নিয়ে হাসান, তারানূর, আশনূরের সঙ্গে কথা বলে।
মানিকের তুলকালাম, বাড়িঘর ভাঙচুর, হাসান, মাজিদ, আহাদকে রক্তাক্ত করা—সবকিছু নূরজাহান নিশ্চুপে শোনে। মানিক নূরজাহানের খোঁজে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়িতে আসতে পারে, এটাও নূরজাহানকে জানায় তারানূর। হাসান, তারানূর পইপই করে নিষেধ করে নূরজাহানকে এখন থানচিতে না যেতে। মারিদকেও সাবধানে রাখতে বলে। পারিবারিক কল কেটে নূরজাহান ফোন হাতে বেশ কয়েক মুহূর্ত বসে থাকে। মানিক কোনোভাবে যদি একবার নূরজাহানের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যায় তাহলে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ওকেই ভুল বুঝবে। বিশেষ করে নূরজাহানের শাশুড়ি আর মেজো শাশুড়ি ফাতেমা বেশ কড়া মানুষ। বাড়ির বউদের জন্য অশান্তি হোক ওনারা সেটা মোটেও পছন্দ করেন না।
নূরজাহানের পড়াশোনায় গ্যাপ যাওয়ায় নূরজাহান এই বছর ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। মে মাসের ২৬ তারিখ থেকে ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা, সেজন্য নূরজাহানকে অবশ্যই থানচিতে যেতে হবে। এখন মে মাসে ৩ তারিখ চলে। মারিদ নূরজাহানের পড়াশোনার জন্য সকল বইপত্র কিনে এনে দিয়েছে। চাইলেও মারিদ এই অসময়ে নূরজাহানের কলেজ ট্রান্সফার করাতে পারবে না, শিক্ষা বোর্ডের ফাইনাল এক্সামের আগে কলেজ টান্সফার হয় না। নিয়মে নেই। সেজন্য মারিদ বলেছে নূরজাহানকে ঢাকার কোনো একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দেবে। শুধু পরীক্ষার সময় নূরজাহানকে মারিদ থানচিতে নিয়ে যাবে। মারিদ উপস্থিত থেকে নূরজাহানের পরীক্ষা শেষ করিয়ে আবার ঢাকা নিয়ে আসবে তারা। তাই নূরজাহান এখন থানচিতে না গেলেও কিছুদিন পর ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ঠিকই যেতে হবে। নূরজাহান যখন অনেক কিছু ভাবে কিংবা টেনশন করে, তখন সে চুপ করে বসে থাকে মুহূর্তের পর মুহূর্ত। ঘর থেকে মারিদ ডাকলে নূরজাহানের ধ্যান ভাঙে। নূরজাহান ফোন হাতে ঘরে ঢুকতে মারিদ বলে…
‘রেডি হয়ে নাও, আমরা বাইরে যাব।
নূরজাহান ছোট স্বরে প্রশ্ন করে…
‘কোথায় যাবেন।
‘যাব এক জায়গায়। এখন কোনো প্রশ্ন কোরো না, রেডি হয়ে নাও।
নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে চলে যেতে নিলে মারিদ নূরজাহানের চিন্তিত মুখটা দেখে তৎক্ষণাৎ নূরজাহানের বাহু টেনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বলে…
‘কী হয়েছে তোমার? কোনো সমস্যা? কেউ কিছু বলেছে? মুখটা শুকনো লাগছে কেন?
মারিদের কণ্ঠে বিচলিত ভাব। নূরজাহান বোধহয় মারিদের কাছে এই আশ্রয়টুকুই চাচ্ছিল। নূরজাহানের চোখের কোণে মুহূর্তে জল জমে গেল। হঠাৎ নূরজাহান দুহাতে মারিদকে জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে বলে…
‘মানিক ভাই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। আমার বিয়ের খবরটা শুনে আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর করেছে। আব্বা, মাজিদ ভাই, আহাদ ভাই—সবাইকে মেরেছে। এ-ও বলেছে আপনাকে মেরে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে এখান থেকে।
নূরজাহান ফুঁপিয়ে ওঠে। মারিদ নূরজাহানের পিঠে আর মাথায় ভরসার হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করে বলে..
‘এই সামান্য ব্যাপারে তুমি ভয় পাচ্ছ? মারিদ আলতাফের বউকে তার বুকের ওপর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া এত সহজ? তা-ও আবার আমার উপস্থিতিতে? এই দুনিয়ার বুকে কারও এত ক্ষমতা হয়নি যে আমার উপস্থিতিতে আমার বউয়ের গায়ে টোকা দেবে! আমার ওপর বিশ্বাস রাখো জান। আমি থাকতে কেউ তোমার কিছু করতে পারবে না।
নূরজাহান মারিদকে শক্ত করে জড়িয়ে বুকে কপাল ঠেকিয়ে বলে…
‘আমি জানি আপনার উপস্থিতিতে নয়, আপনার অনুপস্থিতিতে হয়তো আমার শেষ হবে। আচ্ছা, যদি কখনো এমন হয় আপনি ফিরে এসে আমাকে পেলেন না, তখন কী করবেন?
মারিদ বেশ বিরক্ত হয়ে নূরজাহানকে বুক থেকে সরিয়ে বলে…
‘আদর করছি, ভালো লাগছে না? আবার সেই পালানোর সুযোগ খুঁজছ?
‘আমি কখনোই আপনাকে ছেড়ে পালাইনি। আমি পালিয়ে যাওয়ার মেয়ে নই।
‘বুঝেছি, তুমি আমার সাহসী বউ। এবার রেডি হয়ে নাও, আমাদের দেরি হচ্ছে। আরেকটা কথা, তুমি তোমার বাপের বাড়িতে না যে রোড সাইড রোমিও হয়ে মানিক আক্রমণ করবে। এটা তোমার স্বামীর বাড়ি, এখানে হাজারটা মানিক সওদাগর আসলেও তোমার অবধি পৌঁছাতে পারবে না, কারণ তোমার সামনে দেয়াল হয়ে তোমার স্বামী দাঁড়িয়ে আছে।
নূরজাহান মুগ্ধ হয়ে মারিদের কথা শুনে। মারিদ নূরজাহানের কপালে চুমু খেয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে গিফট কাগজে মোড়ানো পার্সেলটা দেয়। নূরজাহান পার্সেলটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘এটা কী? কী আছে এতে?
‘খুলে দেখো।
নূরজাহান গিফট কাগজ ছিঁড়ে ফেলতেই বেরিয়ে এল কালো রঙের মোটা একখানা ডায়েরি। ডায়েরিটা দেখে বেশ অবাক হয়ে নূরজাহান বলে, ‘এটা তো একটা ডায়েরি! এটা আমার জন্য?
‘ হুম তুমি ডায়েরিতে লিখতে পছন্দ করো, তাই এটা তোমাকে উপহার দিলাম। তোমার আগের ডায়েরিটা তো চুরি হয়ে গেছে, তাই না?
নূরজাহানের দুটো ডায়েরির মধ্যে একটা ডায়েরি চুরি হয়েছে নাকি কোথাও রেখে যার জন্য এখন ওহ খুঁজে পাচ্ছে না—এটা নূরজাহানই সঠিক বলতে পারছে না।
নূরজাহানের ডায়েরি আছে কিংবা চুরি হয়ে গেছে এই কথাটাও নূরজাহান কখনো মারিদকে বলেনি। তাহলে মারিদ কীভাবে জানল নূরজাহানের একটা ডায়েরি চুরি হয়েছে? বুদ্ধিমতী নূরজাহান মারিদের কথার জবাব না দিয়ে চট করে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে…
‘আমার ডায়েরি চুরি হয়েছে নাকি হারিয়ে গেছে, সেটা তো আমিই ঠিক করে বলতে পারছি না। তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন আমার ডায়েরি চুরি হয়েছে সেটা?
মারিদ নূরজাহানের সাথে কথা ঘোরাল না। সে সরাসরি নূরজাহানের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে..
‘ আমি একটা ডায়েরি শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকে পেয়েছি, সেজন্য জানি।
নূরজাহান অবাক হয়ে বলে…
‘তারমানে আপনিই আমার ডায়েরিটা চুরি করেছেন তাই না? আর আমি কত খুঁজেছি আমার ডায়েরিটা! দিন, আপনি আমার ডায়েরি ফেরত দিন।
মারিদ নূরজাহানের কপালে দুই আঙ্গুলে টোকা দিয়ে বলে…
‘ওইটা আমি শ্বশুরবাড়ির যৌতুকে পেয়েছি, তাই ওইটা কখনো তুমি ফেরত পাবে না। তোমাকে নতুন ডায়েরি উপহার দিয়েছি, এটাতেই কাজ চালাও। দরকার হলে আরও পাবে, তারপরও ওই ডায়েরি আমি ফেরত দেব না কখনো।
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৭
নূরজাহান মারিদের ওপর রেগে যায়। মারিদ নূরজাহানের রাগে পাত্তা দেয় না, বরং নূরজাহানকে তাড়া দিয়ে বলে রেডি হতে। নূরজাহান বোরখা পরে রেডি হয়ে বেরোতে গেলে সালমা নিষেধ করেন মারিদকে এত রাতে বউ নিয়ে কোথাও যেতে। মারিদ মায়ের নিষেধ মানে না, শোনেও না। সে এক প্রকার অবাধ্য হয়েই নূরজাহানকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে সালমার মাঝে স্পষ্ট প্রকাশ পায় তীব্র অসন্তুষ্টি। নূরজাহান শাশুড়ির অসন্তুষ্টি ও নারাজি বেশ গভীরভাবেই টের পায়।
