উন্মাদনা পর্ব ৫১
কায়নাত খান কবিতা
মিষ্টি সকালের রোদ জানালার ফাঁক গলে এসে আলতো করে আনন্দীর মুখ ছুঁয়ে দিতে লাগলো। রাতে বেলকনির দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ায় সূর্যের কোমল আলো নির্দ্বিধায় তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে সক্ষম হলো।
বিরক্তিভরা মুখে চোখ দুটো আধখোলা রেখেই সে ধীরে ধীরে উঠে বসে সে শোয়া থেকে। অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে এলোমেলো চুলগুলো খোঁপা করতে করতে পাশ ফিরে তাকাতেই তার চোখ পড়ল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অভীর ওপর।পরমুহূর্তেই,
“আআআ…!”
আনন্দীর তীক্ষ্ণ চিৎকারে যেন পুরো ঘরটাই কেঁপে উঠল।চমকে ধড়ফড় করে উঠে বসল অভী। মুখভরা আতঙ্ক, যেন এইমাত্র প্রবল ভূমিকম্পে ঘুম ভেঙেছে তার।ঘুম জড়ানো কন্ঠে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে আওড়ালো,
“চিল্লাস ক্যান, কাক?”
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে, সে অভীর ঘরেই রয়েছে।মনে একের পর এক প্রশ্ন জাগতে শুরু করতেই, অভী হঠাৎ তার হাত টেনে নিজের দিকে নিয়ে নেয়।ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলে,
“এইবার আবার লেদা সুবহার মতো কইস না।নিজের বিয়ার কথাই মনে নাই!”
আনন্দী ভ্রু কুঁচকে বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর বিরবির করে অভীকে শুধালো, “আপনিও উপন্যাস পড়েন?”
অভী শরীরটা টানটান করে একখানা হাই তুলে নির্বিকার গলায় ঝেড়ে জবাব দেয়, “তোরা যেইডা পড়স, ওইডা উপন্যাস কম।কুখাদ্য বেশি! ড্রেরাক রোমান্স… হুই!”
কথা শেষ করেই অভী বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু তার আগেই আনন্দী যেন বিদ্যুতের ঝলকের মতো ছুটে গিয়ে এক নিমিষে বাথরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়।দরজার সামনে এসে অভী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।সে কল্পনা ও করতে পারেনি আনন্দী এমন করবে। এ দিকে তার ইমারজেন্সি ও ধরেছে।কোনো উপায় না পেয়ে অসহায় ভঙ্গিতে হালকা টোকা দিয়ে অভী আকুতি করে বলে,”এই বোকাচন্দ্র, বাইর হ! জলদি!”
ভেতর থেকে আনন্দীর বিজয়ী হাসি ভেসে আসে।আনন্দী ভিতরে দাঁড়িয়ে বেশ মজা পাচ্ছে।ঝাড়া গলায় অভীকে বলে “আগে আমি ফ্রেশ হব, তারপর আপনি!” অভী অসহায় মুখে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে বাবা! ইমার্জেন্সি!” আনন্দী একটুও দয়া না দেখিয়ে জবাব দেয়,
“চাপিয়ে রাখুন!”
আনন্দীর জেদি উত্তর শুনেই অভী বুঝে যায়,এই মেয়েকে এখন বাথরুম থেকে বের করা অসম্ভব। উপায়ান্তর না দেখে বিরক্ত মুখেই বারান্দার দিকে এগিয়ে যায় সে। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে চোখ বুজে গুনগুন করে গান ধরতে ধরতে, নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের জরুরি কাজ সেরে নিতে লাগে অভী।ঠিক সেই সময়ই নিচের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাতে পিতলের লোটা নিয়ে নিরিবিলি এক কোণের উদ্দেশ্যে হেঁটে যাচ্ছিলেন চিকন গড়নের পুরোহিত মশায়।যাকে সবাই চিকন পুরোহিত মশায় বলে জানে।হঠাৎ তার কাঁধে একফোঁটা তরল এসে পড়ে।তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বিস্মিত চোখে আকাশের দিকে তাকালেন। চারদিকে ঝকঝকে রোদ, মেঘের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। আবারও তরল পদার্থ পড়তে থাকে।
পুরোহিত তখন পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! হাতের লোটাটা মাটিতে পড়ে যায়। দু’হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করে আবেগে বলে উঠলেন,
“হে প্রভু! সক্কাল সক্কাল আমায় পবিত্র জল দিয়ে স্নান করাচ্ছ! আহা… কী অপার কৃপা! কিন্তু… এ যে বড়ই বিচিত্র গন্ধ যে!”
ভক্তিভাব বেশিক্ষণ টিকল না পুরোহিত মশায়ের। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে পানির উৎস খুঁজতে গিয়ে উপরে তাকাতেই তাঁর চোখ কপালে উঠে যায়।বারান্দায় দাঁড়িয়ে অভী দিব্যি নিশ্চিন্তে প্র’স্রাব করছে, আর সেই সঙ্গে সুর মিলিয়ে গানও গাইছে!দৃশ্যটা দেখেই পুরোহিত মশায় লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠেন, তার শরীরে আসলেই মু’ত পড়েছে কি-না তা নিশ্চিত হতে অসহায়ের ভঙ্গিতে অভীকে শুধালো,
“নারায়ণ! নারায়ণ! ছিঃ ছিঃ! এই সক্কাল বেলায় বারান্দায় এসব কী করিস রে, চাঁদ?”
অভী একটুও বিচলিত হলো না। নিজের গোপাঙ্গ ঢেকে বরং পুরোহিতের কলকাতার টান নকল করে নির্বিকার গলায় উত্তর দেয়,
“মূত্র বিসর্জন দিচ্ছি, পুরোহিত মশায়!”
“আরে বাবা! থু! থু! ইসস… ইয়াক! থু!”
পুরোহিত মশায়ের মুখভঙ্গি এমন হয়ে গেল, যেন এই বুঝি বমি করে বসবেন। রাগে-ঘৃণায় কাঁপতে কাঁপতে তিনি একের পর এক বকাঝকা শুরু করলেন। সকালের শুরুতেই এমন অযাচিত গালমন্দ খেয়ে অভীর মেজাজও চড়ে গেল। দাঁত চেপে গর্জে উঠে সে! সক্কাল সক্কাল এতো গালমন্দ কেন খাচ্ছে সে তাই তো বুঝলো না! নিজের বাসায়, নিজের বারান্দায় হি’সু দেওয়ার জন্য এখন তার অন্যের থেকে পারমিশন নিতে হবে? খুব কর্কশ গলায় চিকন পুরোহিত মশায়কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এই শালা… মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে! যা, ভাগ!”
পুরোহিতও দমবার পাত্র নন। নিজের শরীর থেকে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে অভীকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ধর্মে সইবে না! বলে দিলুম! নিজের মূত্র খেয়েই মরবি তুই!”
“যাবি, না-কি?”
পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটা হাতে তুলে নিতেই পুরোহিত মশায় আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। ধুতি সামলে এক হাতে লোটা তুলে প্রাণপণে দৌড় লাগালেন।পুরোহিতকে চোখের আড়াল হতে দেখে অভী বিরক্ত মুখে নিচের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,”এই টুনটুনি! তোর জন্যই তো আজ সক্কাল সক্কাল এমন আচ্ছা বিপদে ফাঁসলাম আমি!”
নিজের টুনটুনিকে উদ্দেশ্য করে জমে থাকা সমস্ত রাগ ঝেড়ে ফেলছিলো অভী। ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খচ করে খুলে যাওয়ার সাউন্ড হয়।মুখে পানির ফোঁটা, ভেজা চুলে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে আনন্দী বাইরে বেরিয়ে আসে।তাকে দেখামাত্র অভী প্রায় দৌড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“আর একটু হইলেই তোর জন্য আমার মান-সম্মান একেবারে ধুইয়া যাইত!”
আনন্দী নির্বিকার চোখে তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আপনার মান-সম্মান ছিলোই কবে?”
কথাটা শুনে অভীর চোখ-মুখ কুঁচকে গেল।
“আবার মুখে মুখে তর্ক করে!”
“বেশ করেছি।”
“আনন্দী…!”
সতর্কবাণীর মতো নামটা উচ্চারণ করে অভী।কিন্তু আনন্দী যেন কিছুই শুনল না। অনায়াস ভঙ্গিতে তাকে পাশ কাটিয়ে খাটের এক কোণে রাখা গামছাটা তুলে মুখ মুছতে শুরু করে।অভী এক টানে গামছাটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের গলায় ঝুলিয়ে বলে,
‘অনেক বেয়াদব মাইয়া দেখছি জীবনে… কিন্তু তোর মতো একখান নমুনা এই প্রথম দেখলাম!’
আনন্দী ভ্রু নাচিয়ে মুচকি হেসে জবাব দেয়,”তাহলে এখন দেখে নিন। অভিজ্ঞতা বাড়বে।”
“আবার তর্ক!”
“বেশ করেছি।”
একটু থেমে মাথা থেকে পা পর্যন্ত অভীকে দেখে সে আবার বলল,
“আচ্ছা, একটা কথা বলি? আপনাকে দেখলেই এমনিতেই বিরক্ত লাগে। তার ওপর মেয়েদের মতো সব সময় চুলে ওই ঝুঁটি করে রাখেন কেন?”
অভী গামছাটা কাঁধে ফেলে বুক টান করে দাঁড়ায়।তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
“নজরের ভয়ে!”
কিছুটা গম্ভীর মুখ করে আবার বলল,
” এমনিতেই বেশিরভাগ ছেরিগো মাথায় তো চুলই নাই। পরে যদি আমার চুল দেইখা নজর দেয়?”
কথাটা শুনে আনন্দী অবচেতনেই নিজের চুলে হাত বুলিয়ে নেয়। পরমুহূর্তেই বুঝতে পেরে চোখ রাঙিয়ে বলল,”আপনি… আপনি কি আমাকে খোঁচা দিলেন?”
অভী দুষ্টু হাসি চেপে কাঁধ ঝাঁকাল,”যার পায়ে জুতা ফিট হইবো, সেই সিন্ডারেলা!”
অভীর শেষ কথাটা কানে যেতেই আনন্দীর মুখ রাগে লাল হয়ে উঠে। চোখ-মুখ কুঁচকে চারপাশে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকায় দেয়ালে টাঙানো একটি ছবিতে।ছবিটা দেখেই তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।পরক্ষণেই চোখ দুটো সরু করে ছবিটার দিকে ইশারা করে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“একটা ভণ্ডের ঘরে আরেকটা ভণ্ডের ছবি! আপনার সঙ্গে আর তর্ক করে লাভ কী?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই অভীর চেহারার রং বদলে যায় । যেন কেউ তার আত্মসম্মানেই আঘাত করেছে।বুক টান করে দাঁড়িয়ে সে দৃঢ় গলায় বলে উঠল,”শিরায় শিরায় রক্ত… তাহেরি হুজুরের ভক্ত!”
আনন্দী ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল,”সব ছেড়ে ওই ভণ্ড তাহেরিরই ভক্ত আপনি?”অভীর চোখ মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।তর্জনী তুলে কঠিন স্বরে বলল,
“খবরদার, বাটুলি! আমার তাহেরি হুজুরকে নিয়া একটা কথাও বলবি না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে মাইরা রোদে শুকাইয়া দিমু!” আনন্দীও দমবার মেয়ে নয়।এক পা এগিয়ে নির্ভীক কণ্ঠে বলে উঠল,”যেমন গুরু, তেমন তার মুরিদ! দুইটাই ভন্ড !”
কথাটা শেষ হতেই দু’জনের মধ্যে আবার নতুন করে বাকযুদ্ধ শুরু হওয়ার উপক্রম হলো।ঠিক সেই সময়ই অভীর ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল।ঘরের নীরবতা চিরে ভেসে এল এক চেনা ডিজে বিটসব থুয়ে দয়াল তোর লাইগ্গা রে…তারও আগে স্পিকারে ভেসে উঠল পরিচিত ঘোষণা,ডিজে সুমন…!
রিংটোনটা কানে যেতেই আনন্দীর মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে যায়। বিরক্তিতে সে চোখ বন্ধ করে একবার গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। যেন আর এক সেকেন্ডও এই শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।কোনো কথা না বলে ধপ করে খাটের এক কোণে গিয়ে বসে পড়ে সে। মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল এই রিংটোনই তার মেজাজকে মুহূর্তের মধ্যে চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। অপর প্রান্তে অভী ফোনটা হাতে নিয়ে কথা বলতে বলতে বারান্দায় চলে যায় ।
তার কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যেতেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠা কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে চমকে উঠে আনন্দী।অভীকে ব্যস্ত দেখে সে নিঃশব্দে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই হঠাৎ থেমে যায় সে।মুহূর্তের জন্য নিজের পরনের দিকে তাকায়।এখন সে আর আগের মতো নয়। বিহাবিত সে এখন! এই সময়ে গেঞ্জি আর পাজামা পরে দরজা খুলতে যাওয়া একদমই মানায় না তাকে। অদৃশ্য এক সংকোচ তাকে আবার ঘরের ভেতর ফিরিয়ে আনে।দ্রুত চারদিকে ওড়না খুঁজতে লাগল সে।ঠিক তখনই আবার ও বেল বেজে ওঠে। এবার বেলটা যেন আগের চেয়েও অধৈর্য।হাতের কাছে কোনো ওড়না না পেয়ে তার চোখ পড়ে খাটের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা অভীর মুন্ডুর দিকে।
কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত সেটাই তুলে নেয় সে।দামি, নরম কাপড়টা মাথায় সুন্দর করে ঘোমটার মতো জড়িয়ে নিতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল তাকে। দক্ষিণী ঢঙে পরা সেলাইবিহীন লুঙ্গিটা যেমন অভীর চলাফেরায় একরাশ স্বস্তি এনে দেয়, ঠিক তেমনই সেই প্রশস্ত মুন্ডুটা আজ আনন্দীর মাথায় এক অচেনা নিরাপত্তার আবরণ হয়ে বসে রইলো । কাপড়টায় হালকা চন্দনের সঙ্গে অভীর পরিচিত সুগন্ধ মিশে আছে। অকারণেই বুকের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা অনুভূতি খেলে গেল তার।ঘোমটাটা আরেকবার ঠিক করে নিয়ে দরজার কপাট খুলে সে।দরজা খুলতেই তার নিঃশ্বাস যেন বুকের মাঝখানে আটকে যায়। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা রেহমানকে দেখে।
আজ পুলিশের ইউনিফর্মে নয়, সাধারণ পোশাকেই এসেছে সে। তবু তার উপস্থিতি যেন পুরো পরিবেশটাকেই ভারী করে তুলেছে। চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর মুখজুড়ে গভীর ক্লান্তি ও চাপা যন্ত্রণার ছাপ।আনন্দীর ঠোঁট কেঁপে উঠল,”স্যার… আপনি?”
রেহমান তার দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে ছিলো অভিমান, ক্ষোভ আর অসহায়তার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।পরক্ষণেই সে প্রায় চিৎকার করে উঠে,”কেন করলে এটা, আনন্দী? কেন?”
তার কণ্ঠের ভারে আনন্দী অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পা পিছিয়ে যায়।লোকটার চোখ দেখে মনে হচ্ছে সে কেঁদেছে।কিন্তু রেহমান?যে মানুষটাকে সে সবসময় ইস্পাতের মতো কঠিন, আবেগহীন আর অবিচল দেখেছে, সেই মানুষটাও কি ভেঙে পড়তে পারে?ঠিক তখনই বারান্দা থেকে ফিরে আসে অভী।
পরিস্থিতি বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগে না। সে এগিয়ে এসে আনন্দীর কাঁধে হাত রেখে আলতো টানে নিজের পাশে নিয়ে দাঁড় করায় তাকে। যেন অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে দিল তাদের মাঝখানে।ঠোঁটের কোণে চিরচেনা নির্লিপ্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,”হোয়াটস আপ, রেহমান ডাকাত? এত্ত সক্কাল সক্কাল আমার বাসায় কী করতে আইছস?”
রেহমান কোনো উত্তর দেয় না।নিঃশব্দে কোমরের পেছন থেকে রিভলভার বের করে সোজা অভীর বুকের দিকে তাক করল।এক মুহূর্তেই ঘরের বাতাস জমে গেল। সময় যেন থমকে দাঁড়াল।চোখ না সরিয়েই রেহমান ধীরে, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,”আনন্দী আমার সঙ্গে যাবে। তোর কাছে ওকে আমি এক মুহূর্তও থাকতে দেব না।”
তারপর হাত বাড়িয়ে দেয় আনন্দীর দিকে।সেই কণ্ঠে আর কোনো কঠোরতা নেই, আছে শুধু গভীর আকুতি,”কাম অন, আনন্দী… চলো। এখান থেকে চলো।”
আনন্দী নির্বাক।দু’জন মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন সে নিজেই নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। একদিকে রেহমানের বাড়িয়ে দেওয়া হাত, অন্যদিকে অভীর নীরব উপস্থিতি।দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত সে ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় রেহমানের দিকে।কারণ সত্যিটা তো এটাই আনন্দী নিজে ও অভীর সঙ্গে থাকতে চায় না। সে নিজেই মুক্তি চায় এই নরক যন্ত্রণা থেকে।কিন্তু তার আঙুল রেহমানের স্পর্শ পাওয়ার আগেই অভী শক্ত করে চেপে ধরে আনন্দীর কবজি।
উন্মাদনা পর্ব ৫০
চোখে কোনো রাগ নেই, মুখেও নেই উত্তেজনার ছাপ। শুধু ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি।রেহমানের চোখে চোখ রেখে শান্ত, স্থির স্বরে বলল,
“বউ আর টাকা কখনো কাউকে দিতে নাই।একবার হাত ছাড়া হলে, সহজে পাওয়া যায় না!”
