উন্মাদনা পর্ব ৫০
কায়নাত খান কবিতা
‘কাছে আসার চেষ্টা করলে জায়গা মতো লা’থি পড়বে!”
আনন্দীর কথা শুনে অভী নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুকের ওপর আলতো করে থুথু ছিটিয়ে দেয়। যেন নিজের মনকেই শাসন করছে সে।তারপর আধো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি টেনে বলল,
‘নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই অন্ধকার করিস না, বোকাচন্দ্র!’
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে নিজের এক পা এগিয়ে এনে আনন্দীর পায়ের সঙ্গে আলতো করে ছুঁইয়ে দেয় সে। স্পর্শটা অনুভব করতেই আনন্দী এক মুহূর্তও দেরি করে না।প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মে’রে অভীর পা নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় আনন্দী।
অপ্রস্তুত সেই লাথি খেয়ে অভী ধড়মড় করে উঠে বসে।মুখভর্তি বিরক্তি নিয়ে অন্ধকারেই আনন্দীর দিকে তাকিয়ে রইল সে। ঘুমঘোরে থাকা চোখ দুটোতে তখন রাগ, বিস্ময় আর অসহায়তার অদ্ভুত এক মিশেল ফুটে উঠেছে। চুলের ঝুঁটি ঠিক করতে করতে অভী বলে, “ শুধু একটু ভালোবাসি দেইখা। নাইলে তোর মতো পিচ্চিরে থাপ’ড়াইয়া সোজা করতাম!”
অভীর কথায় সামান্যতম গুরুত্বও দিল না আনন্দী। নির্বিকার ভঙ্গিতে কোলবালিশটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর আরাম করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল, যেন এই ঘরে অভী বলে কেউ আদৌ নেই।
খাটজুড়ে এমনভাবে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে সে, দেখে মনে হচ্ছে পুরো বিছানাটার একচ্ছত্র মালিক সে-ই। অভীর জন্য অবশিষ্ট যে সামান্য জায়গাটুকু রয়েছে, সেটুকুও যেন নিছক দয়া করে ছেড়ে দেওয়া।অভী অসহায় চোখে কিছুক্ষণ সেই দৃশ্য দেখল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে ছাদের ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকাল। বুকের গভীর থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘশ্বাস।মুখে আর কোনো অভিযোগ রইল না।নিঃশব্দে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে সেও।
একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও দু’জনের মাঝখানের দূরত্বটা যেন কয়েক হাত নয়, কয়েক আলোকবর্ষের। নীরব রাত সেই অদৃশ্য ব্যবধানের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।
“ হয়তো আপনি আমাকে রে*প করেনি।”
আনন্দীর কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই অভী ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। বিস্ময়ে তার ভ্রু কুঁচকে এলো।
“ হয়তো আপনি আমাকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দেখেননি। হয়তো আমার পিরি’য়ড মিস হওয়ার জন্য আপনার চালাকি করে খাওয়ানো ঔষুধ দায়ি। হয়তো আমি এখনো ও পবিত্র। কিন্তু..!”
কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল আনন্দী। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো হঠাৎ করেই গলায় এসে আটকে গেছে। চারপাশে নেমে এলো এক অস্বস্তিকর নীরবতা।অন্যদিকে অভীরও গলা শুকিয়ে কাঠ। অজানা আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠছিল। তবু সেই নীরবতার ভার আর সহ্য করতে না পেরে সমস্ত দ্বিধা গিলে নিয়ে সে নিজেই এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ কিন্তু কী আনন্দী?”
“ কিন্তু! আমি নিজেকে অপবিত্র ভাবতাম। প্রতি নিয়ত মনে হতো আমি নোংরা মেয়ে মানুষ। তার উপরে মধ্য বিত্ত ঘরের সন্তান। প্রাণের থেকে যাদের সম্মানের চিন্তা বেশি। এতো বড় অন্যায় না করলে ও পারতেন অভী। বিয়ে তো অন্য ভাবে ও করা যেত। রে*পের মতো একটি সেনসিটিভ জিনিসকে বলি করে নয়। আমি তো এখন ও আপনাকে নিজের স্বামী বলে মানতে পারছি না অভী। ভিষণ ট্রমাটাইজ হয়ে আছি। আপনাকে দেখলে সে সমস্ত কিছু মনে পড়ছে। কি করবো বলুন তো? প্রতি নিয়ত আপনাকে দেখা কিছুটা দমবন্ধকর পরিস্থিতির মতো লাগছে।”
মুহূর্তের জন্য যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে অভী। আনন্দী ঠিক কী বলছে কোনোভাবেই তা বিশ্বাস করতে পারছিল না অভী। তার চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠল বিস্ময় আর প্রশ্নের ছায়া।
“ আমি কোনো সিনেমার হিরো নই আনন্দী। আমার ক্ষমতা ও নেই তোকে তুলে নিয়ে বিয়ে করার মতো! লোক বল ও নাই!”
“ তাই বলে এটা করলেন অভী? সারাজীবন তো আমি ঘৃণা ছাড়া কিছুই করতে পারবো না আপনাকে।”
“ তোর ঘৃণা ও মঞ্জুর। তাও আমার সাথেই থাক!”
“ সম্ভব নয় অভী! বুক ভার হয়ে আসে। আপনাকে দেখলে বড্ড ভয় লাগে। এখন তো বিয়ে হয়ে গেছে। চাইলেই যখন মন চায় ছুঁতে পারবেন।তবে সেটা ও একপ্রকার…!”
আনন্দী বাকি কথাগুলো উচ্চারণ করার আগেই অভী মৃদু হেসে উঠে। সেই হাসিতে ছিল ক্লান্তির ছোঁয়া, আবার অদ্ভুত এক প্রশান্তিও। ধীরে ধীরে সে আনন্দীর একটি হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে আলতো করে নিজের বুকে চেপে ধরে। বুকের ভেতরকার প্রতিটি স্পন্দন যেন নীরবে কিছু বলতে চাইছিল।আনন্দীও আর কোনো কথা বলে না।একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অভী বলল, “ তুই এখন সম্পূর্ণ আমার আনন্দী। আমি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু বউয়ের উপরে জোর করার অভ্যাস এখন ও হয়নি আমার। তুই নিজ থেকে ধরা দিলে কিছু হবে। না হলে নাই!”
“ মাঝে মাঝে আপনাকে প্রচন্ড সুদর্শন, উচ্চবিত্ত, ভদ্রলোক মনে হয়। আর মাঝে মধ্যে বখাটে। কেনো এমন হয়?”
“ কারণ আমি চাই তাই! আমি যদি তোকে বলতাম। চল আনন্দী বিয়ে করে ফেলি।তুই কী করতি? কাজি অফিসে কান্নাকাটি করতি। তখন কাজি শা’লায় পুলিশ ডাকতো। ফ্রী-তে আমি জেলে যাইতাম। তোরে ও আর পাওয়া হইতো না। তাই এই নাটক সাজাইতে হইছিলো। তোরে এখন বিয়ের করার কোনো আগ্রহ ও ছিলো না আমার। যদি সেদিন না ভুলবশত চিলেকোঠাতে তোর দিকে কুনজর না পড়তো আমার।”
“ আপনাকে স্বামী হিসেবে মানতে কষ্ট হবে আমার অভী! নিজেকে অভীর বউ বলে ও পরিচয় দিতে কষ্ট লাগবে খুব!”
“ কিন্তু আমি আনন্দীর জামাই! এতো বছর আমার নিজস্ব পরিচয় ছিলো না। এখন আছে। আমি আনন্দীর স্বামী।”
ধীরে ধীরে নিজের হাতটা অভীর বুক থেকে সরিয়ে নেয় আনন্দী। একটি শব্দও উচ্চারণ করে না সে। নীরবে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ঘরজুড়ে নেমে এলো এক ভারী নীরবতা, যেখানে অগণিত না-বলা কথার প্রতিধ্বনি যেন নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।অভীও আর কিছু বলল না। দু’হাত মাথার নিচে রেখে ছাদের ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো অস্থিরতা ছিল না, ছিল শুধু গভীর, দুর্বোধ্য এক চিন্তার ছায়া।
কিছুক্ষণ পর আনন্দীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত হয়ে এলে অভী নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে গিয়ে আয়নার সামনে থামে। এক মুহূর্ত নীরবে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখের কালো কনট্যাক্ট লেন্স দুটো খুলে ফেলে। লেন্সের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ বাদামি চোখজোড়া যেন মুহূর্তেই অন্য এক মানুষের পরিচয় প্রকাশ করে দিল। সেই চোখে ছিল না কোনো কোমলতা, ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা প্রতিশোধের শীতল আগুন।
নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে অভী করে বলল,”সব কো হিসাব মিলেগা!”
‘না-জানি কোন অপরাধে দিলা এমন জীবন! আমারে পু’ড়াইতে তোমার এতো আয়োজন…’
অন্ধকারে ডুবে থাকা ছোট্ট কক্ষটিতে একা বসে ধীর কণ্ঠে গান গাইছিল বিলকিস। তার কণ্ঠে সুরের চেয়ে হাহাকারই বেশি ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসছে।জীবনের প্রতি আজ ভীষণ ক্লান্ত সে।ইচ্ছে করলে সেও তো আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো বাঁচতে পারত। স্বপ্ন দেখতে পারত, সংসার গড়তে পারত, নিজের নামে একটা পরিচয় তৈরি করতে পারত।হয়তো তারও একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হতে পারত।
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে এমন এক জীবনের মোড়ে, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই।আজ সবাই তাকে চেনে রেডলাইন এরিয়ার নামকরা মেয়ে বিলকিস রানি নামে।মাঝেমধ্যে সে নিজের আসল নামটা মনে করার চেষ্টা করে। চোখ বন্ধ করে অতীতের ভাঙা স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়ায়। কিন্তু পারে না।বাস্তবতা বড় নির্মম।
এটা শুধু মানুষের স্বপ্নই কেড়ে নেয় না, একসময় তার পরিচয়টুকুও মুছে দেয়।ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটি কণ্ঠ।
‘বিলকিস?’
কুসুমের ডাক শুনেও পেছনে ফিরল না বিলকিস। শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই বলল,
‘আমার চাঁদের বিয়া হইয়া গেছে জানোস?’
কুসুম কোনো উত্তর দিল না। নীরবে এসে তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।এই পল্লীর প্রায় সবাই জানত, বিলকিস কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসত অভীকে।কিন্তু অভী কোনোদিন সেই ভালোবাসার দিকে ফিরে তাকায়নি।তার মনের ভাষাও বুঝতে চায়নি।কুসুম আস্তে করে ডাকল,
‘বিলকিস রে… কষ্ট..!’
বিলকিস মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।
‘পাই না আমি। কষ্ট আমি পাই না।’
কথাগুলো বললেও তার চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু।সে ধীরে ধীরে কুসুমের দিকে ফিরে দাঁড়াল।চোখে পানি ঠোঁটে তিক্ত হাসি।
‘আমার মতো মাইরে কেউ বউ বানাইতে চাইবো কেন বল? আমার তো দামই সমাজে ৫০০-১০০০। আমারে কে নিবো বউ হিসাবে!’
কুসুমের বুকটা হুহু করে উঠল।সে তাড়াতাড়ি বিলকিসের দুই কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘বিলকিস, শান্ত হ বইন!’
বিলকিস শুকনো হেসে চোখের জল মুছে ফেলল।
‘আরেহ, আমি শান্তই আছি। মাঝে মাঝে নিজের ওকাত ভুইলা যায়… এই আর কী!’
বিলকিস আর কুসুমের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ কোঠার নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এলো এক বুকফাটা আর্তনাদ। তারপর আরেকটি। তারও পর আরও কয়েকটি কণ্ঠ একসঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সেই আর্তচিৎকার যেন মুহূর্তেই চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলে।
বিলকিস আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইল না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা রাজিয়া বিবির কক্ষে পৌঁছে গেল।ভেতরে ঢুকেই তার পা থমকে গেল।মেঝেতে গুটিসুটি মেরে বসে আছে কয়েকজন কিশোরী। কারও চোখ কান্নায় ফুলে উঠেছে, কারও গালে আঙুলের দাগ, কারও ঠোঁট ফেটে রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। ভীতসন্ত্রস্ত চোখগুলো বারবার দরজার দিকে ছুটে যাচ্ছে, যেন অলৌকিকভাবে কেউ এসে তাদের এই নরক থেকে উদ্ধার করবে।বিলকিসকে দেখেই রাজিয়া বিবি ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি টেনে হাত নাড়ল।
“এইদিকে আয়, বেটা।”
বিলকিস ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এরা কারা, বিবি?”
পানের পিক এক পাশে ফেলে আঁচল দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে রাজিয়া নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“নয়া মাল। ছয় মাস পর ডেলিভারি যাইব। ততদিন ভালো কইরা শিখাইতে হইব, কেমনে কী করতে হয়!”
কথা শেষ করেই হো হো করে হেসে উঠে সে। সেই হাসিতে মানবতার লেশমাত্র ছিল না। উপস্থিত প্রত্যেকেই বুঝে গেল, ঠিক কোন ‘শিক্ষার’ কথা বলা হচ্ছে।
বিলকিস একবার মেয়েগুলোর দিকে তাকায়।মনে হলো, এরা এখনো স্কুল-কলেজের গণ্ডিই পেরোয়নি। নিষ্পাপ মুখগুলো আতঙ্কে বিবর্ণ। চোখ দুটোতে বেঁচে থাকার আকুতি ছাড়া আর কিছু নেই।
দৃশ্যটা দেখতেই আচমকা নিজের শৈশবের মুখোমুখি হয়ে পড়ল বিলকিস।সেদিন,যেদিন তাকেও ঠিক এভাবেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল এই অভিশপ্ত কোঠায়।অতীতের সেই বিভীষিকা স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়ার আগেই ভেতরের আরেকটি কক্ষ থেকে আবারও ভেসে এলো হৃদয়বিদারক এক চিৎকার।বিলকিস আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দ্রুত সেদিকে এগোতেই রাজিয়া শক্ত করে তার কবজি চেপে ধরল।
“ভিতরে কাশেম নিজের শখ মিটাইতাছে। বাধা দিস না। কত কষ্ট কইরা নয়া মাল আনছে। একটু ফুর্তি করুক।”
রাজিয়ার কথায় বিলকিসের পা থেমে গেল, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যেন ছটফট করে উঠল। অচেনা মেয়েটির প্রতিটি আর্তনাদ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল নিজের সেই দুঃসহ রাতটিতে যে রাত তার শৈশব, স্বপ্ন আর পরিচয় সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।
আর সহ্য করতে পারল না সে।হোঁচট খেতে খেতে বাইরে বেরিয়েই প্রবল বমি করে ফেলল। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে। বুকের ওপর যেন কেউ পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।
একটাই প্রশ্ন বারবার তাকে বিদ্ধ করতে লাগল।তাহলে কি এই মেয়েগুলোর ভাগ্যও তার মতোই হতে চলেছে?কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে কাঁপা হাতে ফোন বের করল বিলকিস। বহুদিনের পরিচিত একটি নম্বরে কল দিল।লোকটার হৃদয়ে দয়া-মায়া আছে কি না, সে জানে না। বিবেকও হয়তো বহু আগেই মরে গেছে। কিন্তু একটি বিষয় সে নিশ্চিত জানে।মেয়েদের সম্মানের প্রশ্নে জুলফিকার কখনো আপস করে না।
গভীর রাত।ঘুমে ডুবে আছে পুরো ঢাকা শহর। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জন স্টেডিয়ামে তখনও থামেনি ঘুষির শব্দ।পাঞ্চিং ব্যাগের ওপর একের পর এক আঘাত হানছে জুলফিকার। তার প্রতিটি ঘুষিতে যেন জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হচ্ছে। আফরিনের লাগামহীন আচরণ তাকে দিনের পর দিন অস্বাভাবিক রকমের ক্ষুব্ধ করে রেখেছে।শেষ ঘুষিটা মেরে সে ধীরে ধীরে গ্লাভস খুলে ফেলল।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“ব্যাগটা নদীতে ফেলে দে।”
ওটা কোনো সাধারণ বক্সিং ব্যাগ ছিল না।মোটা চামড়ার আড়ালে বন্দী ছিল এক জীবন্ত মানুষ যার অপরাধ, সে একবার ভুল সময়ে ভুল মানুষের দিকে তাকিয়েছিল। আর সেই মানুষটি ছিল আফরিন।
মুখে পানি ছিটিয়ে স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে বসতেই ফোনটা কেঁপে উঠে।স্ক্রিনে ভেসে উঠে, বিলকিস।ভ্রু কুঁচকে সময় দেখল জুলফিকার।এত রাতে বিলকিস কখনো ফোন করে না।এক মুহূর্ত দেরি না করে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কান্নাভেজা কণ্ঠ।
“জুলফি ভাই…!”
জুলফিকার ফোনটা কান থেকে সামান্য সরিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“আস্তে কথা বল, বাইজি। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।”
বিলকিস কান্না চেপে বলল, “জুলফি ভাই। একমাত্র তুমিই পারবা এই ছেমরিগুলারে বাঁচাইতে।”
জুলফিকারের চোখ সরু হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে উঠল।
“কেন? তোর সেই চাঁদ ডার্লিং কই? শুনলাম বিয়া কইরা তোকে পাত্তাই দিল না!”
বিলকিস কোনো উত্তর দেয় না। ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্ত শুধু তার ভারী নিশ্বাসের শব্দই শোনা গেল। কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে গেছে। কারণ এই শহরে এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা জানে না, অভীকে সে কতটা নিঃশর্তভাবে ভালোবেসেছিল। সেই ভালোবাসা কখনো উচ্চস্বরে প্রকাশ পায়নি, তবু তার প্রতিটি নীরবতায়, প্রতিটি অপেক্ষায় তার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
উন্মাদনা পর্ব ৪৯
ওপাশে কোনো উত্তর না পেয়ে জুলফিকার ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর বিরক্তি মেশানো স্বরে বলে উঠল,
“শালা, আস্ত একটা জা’উ’রো! তোর লগে কোমর দুলাইয়া আরেক জনের লগে ডিস্ক ড্যান্স করতাছে দেখ!”
