Home উপসংহারে তুমি উপসংহারে তুমি পর্ব ১২

উপসংহারে তুমি পর্ব ১২

উপসংহারে তুমি পর্ব ১২
রুহানিয়া ইমরোজ

সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রকৃতি পছন্দ করে না শূন্যস্থান৷ তা-ই তো,কারও অবর্তমানে থেমে থাকে না জীবন। নাফিমের চল্লিশা সম্পন্ন হলো আজ। পুরো শিকদার ভিলায় আবছা শোক বিদ্যমান তবে দোয়ার চাইতে সমালোচনা হয়েছে বেশি। টপিক ছিলো, নাওয়াফ চিত্রার সংসার এবং তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত।
চিত্রা কোনো ধরনের রিয়েক্ট করে না। চটজলদি কাজ করতে থাকে। তিলাওয়াত শেষে জোহরের সালাত আদায় করতে গেছে ছেলেরা। নাফিমের কবর জিয়ারত করে ফিরবে। খুব বেশি সময় নেই হাতে। ওদের কিছু বলেও বা কী লাভ? অমানুষেরা কি আর বুঝবে মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা? এসব বলে কয়ে নিজেকে বোঝাতে থাকে চিত্রা। কান্না চেপে রান্নায় মনোনিবেশ করে। মনে মনে ভাবতে থাকে..

নাওয়াফ এলে তাকে খেতে বসাতে হবে। সকাল থেকে কিছুই মুখে দেয়নি লোকটা। এমনকি পুরোটা রাত জাগনা ছিল। মুখটা শুকিয়ে আমসি হয়েছিল কিন্তু সাহস করে কিছু বলতে পারেনি চিত্রা। ইদানীং মন মেজাজ ভালো থাকে না নাওয়াফের। কখন কী বলে বসে কে জানেন? তার মেজাজ বুঝে চলার চেষ্টা করে চিত্রা৷
অপরাহ্নের প্রথম প্রহর। বাড়ির মহিলাদের খাওয়া শেষ হতেই ছেলেরা বাসায় ঢোকে। রান্না করে ঘাপটি মেরে নিজের ঘরে বসেছিল চিত্রা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনে চেয়েছিল পথের দিকে। হুট করে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে ড্রাইভ ওয়ের লেন ধরে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে আসতে দেখে থমকে যায় তার দৃষ্টি। ছেলের কবর জিয়ারত করে আসা নাওয়াফকে বেশ ভঙ্গুর দেখাচ্ছে। নিশ্চয়ই ঘরে ফিরে ধপাস করে শুয়ে পড়বে কিন্তু এখন অল্প কিছু হলেও খাওয়া দরকার লোকটার। ভেবেই রান্নাঘরের দিকে ছুটে যায় চিত্রা।
খাওয়ার ব্যপারে যথেষ্ট সচেতন নাওয়াফ। ওয়েলি ফুড খুব একটা খায় না। আজ তো সকাল থেকেই না খাওয়া বিধায় তার জন্য আলাদা করে সবজি আর সাদা ভাত রেঁধেছে চিত্রা। দু’টো ডিমও ভেজেছে অল্প পেঁয়াজ দিয়ে। যদি মাংস খেতে অনীহাবোধ করে সেই ভাবনা থেকে। প্লেটটা সাজিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে পা বাড়াতেই কিছু কথা কানে আসে চিত্রার,

–” নাফিমটা অকালে মরাই তোর ছোডো বউয়ের সুবিধা হয়েছে। পরের বোঝা টানতে হইব না তাকে। ভবিষ্যতে জমি লইয়া মনকষাকষি হওনের সুযোগ নাই। এই খুশিতেই সকাল থেকে লম্ফঝম্প করছে তোর বউ। চোখে এক ফোঁডা পানি নাই বাপ। তোর মায়ের কাছে দুদণ্ড না থেকে ঘরের দোর আঁটকে বসে আছে। এ কোন অলক্ষুণে মেয়ে আনলি?
সদ্য ঘরে ফেরা নাওয়াফকে জড়িয়ে ধরে বিলাপের সুরে এসব বলে যাচ্ছেন তার মেজ চাচি। সাথে নেকা কান্নার সুর তো আছেই। সোফার এক কোণে বসে থাকা নাজনীন বেগমের মুখটা দুঃখী দুঃখী। উপস্থিত অনেকেই থম মেরে তাকিয়ে আছে এদিকে। এতক্ষণ সহ্য করলেও এবার আর পারলো না চিত্রা।
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নাওয়াফের প্লেটটা সেন্টার টেবিলে রেখে আঁটকে আসা গলায় বলল,

–” আমি আসলেই অলক্ষুণে নয়তো এই ভেঙেপড়া সংসারটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করি? স্বামীর অনাদর, শাশুড়ির অপমান সহ্য করে পড়ে থাকি? একদম ঠিক বলেছেন আপনি, নাফিমকে একটুও ভালোবাসিনি আমি। তাইতো, ওকে মমতার স্বাদ দিয়েছিলাম। সত্যি আমি খুনি নয়তো ওইসব দেখে গোটা দিন বেহুঁশ হয়ে থাকার নাটক করতাম? আপনার ছেলেকে বলুন, দেরি না করে আমায় জেলে দিতে। সরাসরি ফাঁসি দিলে আরও ভালো হয়। পৃথিবীরও মুক্তি পাওয়া উচিত চিত্রা নামক বোঝা হতে।
নাওয়াফের চোখে চোখ রেখে প্রত্যেকটা কথা বলে চিত্রা।কত সহ্য করা যায়? সে-ও তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। এই চিত্রা কে চিনতে কষ্টই হয় নাওয়াফের। অনিমেষনেত্রে চেয়ে দেখে তার শ্যামবর্ণের মুখটা লাল হয়ে এসেছে অপমানের তোপে। ঘন পাপড়িগুলোতে লেপ্টে আছে নোনাজল। চক্ষুদ্বয়ে ছেয়ে গেছে বিষাদ এর লালিমা। চিত্রা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না ; ছুটে যায় ঘরের দিকে।
নাওয়াফ চোখ বুঁজে লম্বা একটা শ্বাস টানে। বাড়ি ভর্তি মানুষ আপাতত মেজাজ গরম করতে চায় না সে কিন্তু কিছু কথা না বললেও নয়। মেজ চাচিকে বুক থেকে সরিয়ে কাটকাট গলায় সোজাসাপ্টা বলে নাওয়াফ,

–” মৃত্যু অনিবার্য। আমার ছেলের আয়ু ছিলো না বিধায় বাঁচেনি। এখানে প্রত্যক্ষ বা পরক্ষ ভাবে কেউই দোষী নয়। তোমরা অহেতুক কাঁদা ছোড়াছুঁড়ি বন্ধ করো। আমার স্ত্রী মানে আমার সম্মান সুতরাং তাকে নিয়ে কোনোরূপ আলাপচারিতার আগে স্মরণ করে নিও সেটার ফলাফল কি হতে পারে। বয়সে কিংবা বুদ্ধিতে তোমরা কেউই ছোটো নয়। আশা করছি আচরণবিধি তেমনই থাকবে।
উপস্থিত সকলেই চুপসে যায়। নাজনীন বেগমের রুহ্ কেঁপে উঠে ছেলের রক্তাক্ত দৃষ্টি দেখে। শোকাভিভূত ছেলেটার মাথায় যে সর্বনাশা খুন চেপেছে সেটা আর কেউ না বুঝলেও তার চোখ এড়ায়নি। হাজার হোক মা বলে কথা। তিনি আগ বাড়িয়ে কিছু বললেন না উল্টো মেইডদের তাড়া দিতে লাগলেন খাবার পরিবেশনের জন্য।

দৌড়ে এসে জানালার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে চিত্রা। খোলা বারান্দার মৃদুমন্দ বাতাসের তোড়ে উড়িয়ে দিতে চাইছে সমস্ত মন খারাবি। আজ বিষন্নতারা বাঁধনছাড়া; কথার তীরে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। তাইতো হেঁচকি তুলে কাঁদতে ব্যস্ত রমণী। এমন সময়..
চিত্রার পেছনে এসে দাঁড়াল নাওয়াফ। ওর গুমরে ওঠা চাপা কান্নার স্বর রুখে দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না । না তো বিচলিত হলো চিত্রার শ্বাস টান দেখে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে মেয়েটা যখন পিছু ফিরে তাকাল তখন তার রক্তাভ চোখজোড়ায় দৃষ্টি স্থির রেখে ভীষণ ঠান্ডা গলায় নাওয়াফ বলে উঠল,
–” তুমি পাপী; তুমিই নিষ্পাপ। বিচারের মালিকা স্বয়ং ওই খোদা। দুনিয়াবি কাউকে এই দায়িত্ব দেয়নি সৃষ্টিকর্তা সুতরাং কারও জাজমেন্টে কষ্ট পাওয়া এক ধরনের বোকামি। আর..
কথাটা বলে সামান্য থামল নাওয়াফ। চিত্রা তখনও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফোপাঁচ্ছে অল্প সল্প৷ তার ডাগর আঁখি জোড়ায় আঁটকে আছে অশ্রুকণা। নাওয়াফ আজ কেনো যেনো কঠিন হয়ে রইল না। গাম্ভীর্যের সীমা অতিক্রম করে ছুঁয়ে দিল চিত্রার গাল। গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিয়ে গা হিম করা কন্ঠে বলল,

–” যে তোমার জানাজায় উপস্থিত পর্যন্ত হবে না তার কথায় কিছু যায় আসা উচিত না তোমার।
চিত্রা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে শুধায়,
–” আর যারা উপস্থিত হবে তাদের বেলায়?
নাওয়াফ তাচ্ছিল্যের গলায় জবাব দেয়,
–” দুনিয়াটা স্বার্থপর বুঝলে? সবাই আপন নয়। বেশিরভাগ মানুষ সম্মানের মান রাখতে শেষ বিদায়ে হাজির হয়। খোঁজ নিয়ে দেখো, যাকে ঘিরে এতো আয়োজন কোনো না কোনো ভাবে তার মৃত্যুর আয়োজক ওই উপস্থিত মানুষ গুলোই।
চিত্রা খুব করে টের পায় নাওয়াফের বলা কথাগুলোর সত্যত কিন্তু আকস্মিক তার মস্তিষ্কে খেলে যায় ভিন্ন প্রশ্ন। সে বড্ড আগ্রহ নিয়ে শুধায়,

–” তাহলে আমার আপন কে?
নাওয়াফ স্মিত হেসে জবাব দেয়,
–” তোমার মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর যার আত্মিক মৃত্যু অবধারিত সেই কেবল তোমার আপন।
কথাটা বাস্তব তবে এই স্বার্থের দুনিয়ায় এমন মানুষ থোড়াই না আছে? চিত্রার দুঃখ হলো ভীষণ। কি এক কপাল দিয়ে পাঠাল খোদা। গোটা একটা জীবন স্রেফ অনাদারই পেল।

উপসংহারে তুমি পর্ব ১১

বিরস বদনে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবতে লাগলো চিত্রা। এক জোড়া ক্লান্ত চোখ অনিমেষ নেত্রে দেখে গেল তাকে। যেখানে শোকের পাশাপাশি সামান্য অজানা অনুভূতিও উঁকি দিচ্ছে। অথচ কেবল নিয়তি জানে, ভাবিতব্য ভয়ংকর। ওই দৃষ্টি জড়োয় লুকিয়ে আছে চিত্রার ধ্বংস। যা অচিরেই গ্রাস করবে তাকে।

উপসংহারে তুমি পর্ব ১৩

1 COMMENT

Comments are closed.