Home উপসংহারে তুমি উপসংহারে তুমি পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি পর্ব ৩
রুহানিয়া ইমরোজ

চিত্রলেখাকে টেনে এনে সজোরে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দেয় নাওয়াফ। বিকট শব্দে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠে চিত্রা। রাগে অগ্নিশর্মা নাওয়াফ বেচারিকে সামলে উঠার সময়টুকু পর্যন্ত দেয় না। তার আগেই বাহু খামচে ধরে সামান্য কাছাকাছি এনে হিসহিসিয়ে বলে,
–” কী ভেবেছিস? আমি বুঝি না তোর মতলব? পুরো রাস্তা এসবই প্ল্যান করতে করতে এসেছিস তাই না?
নাওয়াফের হুংকারে সিঁটিয়ে যায় চিত্রা। তার ক্লান্ত মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারে না ইঙ্গিতপূর্ণ কথা গুলোর অর্থ। অন্যদিকে হাতের ব্যথায় জান যায় যায় অবস্থা। বেচারি অতিকষ্টে মুখ ফুটে বলে,
–” আমি কিছু করিনি ভাইয়া। আর কিসের কথা বলছেন আপনি?
নাওয়াফ খেঁকিয়ে উঠে। হাতের জোর বাড়িয়ে রাগী গলায় বলে,
–” কিছু না করলে বাবা কেনো আমার বিপক্ষে গেল? কেনো তোকে নিয়ে সংসার করতে জোর করছে? কী বলে বশে এনেছিস তাকে ?
চিত্রা হতভম্ব হয়ে গেল। তাকে এমন ভাবে নাওয়াফ? এতটা নীচু মন-মানসিকতার ভাবে? তার চেয়েও বড় কথা, সে কেনো করবে এসব ? নাওয়াফ কে নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই তার। শুধুমাত্র ক’টা বছর ওদের কাছে আশ্রয় চেয়েছিল ভাতিজির পরিচয়ে৷
চিত্রাকে ওমন বিষন্ন দেখে আরও মেজাজ খারাপ হয় নাওয়াফের৷ রাগে জেদে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

–” যদি মনে করে থাকিস, একই বাসায় একই ঘরে থাকায় তোর প্রতি আমার অনুভূতি জন্মাবে বা ছয় মাস পর আমার সিধান্ত পাল্টাবে তাহলে তুই ভুল ভাবছিস। আমি নাওয়াফ শিকদার সমুদ্র তোর মৃত দেহটা পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখব না। কথা বুঝেছিস?
ভয়ংকর কথাটা বড্ড অনায়াসে বলে দেয় নাওয়াফ কিন্তু শব্দচয়নের গাম্ভীর্যতা বিঁধে যায় চিত্রার মনের কোণে। শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে তার। অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে থাকে কেবল। আর নাওয়াফ? সে প্রশ্ন সূচক চাহুনিতে তাকিয়ে থাকে উত্তরের আশায়৷
চিত্রাকে নিস্তব্ধ থাকতে দেখে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে। প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই আবার বলে,
–” ভালোই ভালোই ডিভোর্স দিচ্ছিলাম কিন্তু তোর সহ্য হলো না৷ সংসার করার বহুত শখ তাই না? জাস্ট সী..কীভাবে পূরণ করি সেটা। এসেছিস আমায় আঘাত করতে কিন্তু ঘায়েল হয়ে ফিরবি তুই নিজেই।
কথাটা শেষ হতেই নাফিমের কান্নার স্বর ভেসে আসে৷ সাথে সাথেই চিত্রার থেকে ছিটকে দূরে সরে যায় নাওয়াফ। ঘটনার আকস্মিকতায় চিত্রা গিয়ে ধাক্কা খায় পেছনে থাকা ‘ শ্যু ‘ র‍্যাকের সাথে। মেরুদণ্ডের হাড্ডিতে তীক্ষ্ণ আঘাত পাওয়ায় মৃদু শব্দে গুঙিয়ে উঠে বেচারি।
সেসব পরখ করার সময় কী আছে কারও? না.. নেই। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা ছেলের কান্না থামাতে নাওয়াফ হনহনিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে৷ বেচারি চিত্রা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরপরই নাফিমের ন্যানি এসে হাজির হয়। চিত্রাকে মূর্তির মতো চেয়ে থাকতে দেখে বলে,

–” স্যার আপনারে স্টোর রুমে যাইতে কইছে ।
কথা বলার মতো অবস্থায় নেই চিত্রা। শরীর টলছে তার। কথার আঘাত আর শারিরীক যন্ত্রণার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে তার কোমল সত্তা। নাফিমের ন্যানি তথা প্রৌঢ়া মহিলার পানে চেয়ে বেচারি কোনোমতে বলে,
–” স্টোর রুম কোনদিকে?
চিত্রার অবস্থা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করে নেন সেই মহিলা। তার উপর নাওয়াফের চিল্লানোর শব্দ তো কানে এসেছেই। অল্প বয়স্কা চিত্রার জন্য বিশাল দুঃখ হলো উনার কিন্তু সেটা প্রকাশ করার অনুমতি নেই। তাই কথা না বাড়িয়ে সোজা এসে চিত্রার বরফ শীতল হাতটা আঁকড়ে ধরে বলেন,

–” আপনের শইলের অবস্থা ভালো ঠেকতাছে না। আমি লইয়া যাইতাছি চলেন…
চিত্রা টু শব্দও করল না। জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকল শুধু। হাত পা কাঁপছে তার। অসহ্য লাগছে সব কিছু। বুকের ভেতর চলছে উত্তাল পাথাল ঝড়। শ্বাস টাও আঁটকে আসছে.. কী আশ্চর্য! সবাই আজ তাকে কষ্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে নাকি?
ভাবনার মাঝেই রুমের ভেতর চলে আসে তারা। বেড এর কাছাকাছি আসতেই শরীর ছেড়ে দেয় চিত্রা। ধপ করে শুয়ে পড়ে নরম গদির উপর। আস্তে-ধীরে গা এলিয়ে দেয় সেখানে। তারপরই যেন বাঁধ ভাঙে সমস্ত ধৈর্যের। বালিশের ভাঁজে মুখ গুঁজে গুনগুনিয়ে কেঁদে উঠে চিত্রা। বুকের ভেতরে এতটা যন্ত্রণা হচ্ছে যে চিল্লিয়ে কাঁদতে অব্দিই পারছে না। স্রেফ চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুকণা।
তার করুণ কান্নার দৃশ্য প্রৌঢ়ার বুকে লাগে। না চাইতেও তিনি বলেন,

–” এমনে কাঁদে না মা। মাইয়া মানুষের জীবন এমনই। স্যার রাগী হইলেও কিন্তু ভালা মনের মানুষ। রাগটা পড়ুক একবার৷ দেখবেন রাণী কইরা রাখব আপনারে৷
চিত্রা প্রত্যুত্তর করে না। এসব নিছকই কল্প কথা তাই কান দেয় না সেদিকে। একটুখানি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে। সেটা তো হয়ই না উল্টো সারাদিনের ঘটনা প্রবাহ একের পর এক ভাসতে থাকে তার চোখের সামনে। মেয়েটা গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফটিয়ে উঠে রীতিমতো।
চিত্রার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যান প্রৌঢ়া৷ কী ভয়ানক দশা মেয়েটার। কান্না করতে না পারার তোপে শ্যামলা মুখটা রক্তিম দেখাচ্ছে। চোখের দুই কার্ণিশ জলে ভেজা। পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে অনবরত। মেয়ে সমানতালে গলায় বুকে হাত রেখে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না।
ওকে এভাবে ছটফটাতে দেখে প্রৌঢ়া আর পারলেন না কঠিন হয়ে থাকতে। এগিয়ে এসে শিয়রে বসলেন।মেয়ের বয়সী বিধায় আর আপনি আজ্ঞে সম্বোধনে গেলেন না। চিত্রার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

উপসংহারে তুমি পর্ব ২

–” শান্ত হও মা। কী লাগবে বলো ? পানি দিব? নাকি স্যারকে ডাকব?
চিত্রা আর্তনাদ করে বলে উঠল,
–” আজরাইলকে ডেকে দাও খালা। একমাত্র মৃত্যুই আমার যন্ত্রণা ঘোচাতে পারবে।
চিত্রার কথায় নির্বাক বনে গেলেন প্রৌঢ়া। কী উত্তর দিবেন ভেবে পেলেন না। মেয়েটা সমানে ফোঁপাচ্ছে। যা অবস্থা দেখছেন তাতে ওই কথা ফলতে সময় লাগবে না। মনে মনে ভীষণ ভয় পাচ্ছেন তিনি৷
তাই কী আর হয়? চিত্রারা কই মাছের জান৷ সহজে এদের মৃত্যু হয় না। সয়ে যেতে হয় বহু কিছু.. সেখানে চিত্রার দুঃসময় তো সবে শুরু।

উপসংহারে তুমি পর্ব ৪