উপসংহারে তুমি পর্ব ৬
রুহানিয়া ইমরোজ
সময় এবং স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। একই বিষয় ঘটেছে নাওয়াফ এবং চিত্রার ক্ষেত্রে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে পুরো একটা সপ্তাহ। এর মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে তাদের জীবনে শুধু পাল্টায়নি চিত্রার পরিস্থিতি।
সেদিন রাতেই পরিচিত জুনিয়রের অনলাইন কোচিং সেন্টারে চিত্রা কে ভর্তি করে দেয় নাওয়াফ। চিত্রার কাছে ফোন নেই শুনে নিজের পুরোনো একটা ফোনও দেয় তাকে। পুরোনো সেট দেখে কোনোরূপ রিয়েক্ট করে না চিত্রা বরং অতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকে।
নাওয়াফ ভেবেছিল চিত্রা হয়তো মুখ কালো করে ফেলবে কিন্তু ঘটনার প্রেক্ষিতে চিত্রার নির্বিকার রুপ দেখে বুদ্ধিমান নাওয়াফ বুঝে যায়, নিজের জন্য চিত্রার মনে বিতৃষ্ণা জাগাতে সক্ষম সে। ভাবনাটা ভীষণ স্বস্তি দেয় নাওয়াফকে। চিত্রা ঝামেলা ব্যতীত কিছুই না তার নিকট। এই আপদ দূর হলেই বাঁচে সে।
চিত্রা টের পায় অবহেলার তীব্রতা। তাই তো নিজেকে আরও বেশি গুটিয়ে নেয় সবকিছু থেকে। চঞ্চল চিত্রা হয়ে যায় নিশ্চল। সারাবাড়ির কোথাও শোনা যায় না তার গুঞ্জন। চুপটি করে সারাদিন পড়ে থাকে ঘরের কোণে। মনে মনে ভাবে , কয়টা টিউশনি পেলে মুক্তি মিলবে এই আশ্রয়কেন্দ্র থেকে? কত টাকা আয় করলে তিন বেলার খাবার যোগান দিতে পারব?
এসব ভেবে ভেবেই দিন কাটে চিত্রার। সেখনে আর আলাদা করে অন্য কিছু ঠাঁই পায় না। বাস্তবতার চপেটাঘাতে কল্প রাজ্য এখন বিষাদময় ঠেকে তার নিকট।
চিত্রার ভাবলেশহীন ভঙ্গিমা খেপিয়ে তোলে নাজনীন বেগমকে। মনে করেন, নাওয়াফকে বশীভূত করতে এমন সরল-সোজা সাজছে চিত্রা। এমনিতেই চৈত্রিকার উপর ভীষণ নারাজ তিনি। তার উপর চিত্রার সতী ভাব সহ্য হয় না উনার।
নাওয়াফের জন্য তাকে কিছু বলতে পারেননি তবে ওই রাগ চিত্রার উপর মেটানোই যায় ৷ উপরন্তু ছেলেকে বশীভূত হওয়া থেকে তো বাঁচাতে হবে।
এসব ভেবে, নাওয়াফের অনুপস্থিততে তার ফ্ল্যাটে এসে নানান কথা শুনান চিত্রাকে। কথার সারমর্ম এমন ছিল, ” আমার ছেলেকে ধ্বংস করার জন্য জন্ম হয়েছে তোদের? ” প্রত্যুত্তরে চিত্রা অস্ফুটস্বরে বলে, ” কীসব বলছেন? ”
ব্যস এটাই আগুন জ্বালিয়ে দেয় নাজনীন বেগমের মাথায়। গায়ে হাত না তুললেও মুখের কথা হয়ে উঠে লাগামছাড়া। নানান গালি-গালাজ শেষে তিক্ত গলায় বলেন, ” তাহলে ওর ঘাড়ে এসে জুটছিস কেনো? ” জবাব দিতে পারে না চিত্রা।
নাজনীন বেগম আরও দু’চার কথা শুনিয়ে এরপর বলেন, বসে বসে আমার পোলার অন্ন ধ্বংস করতে লজ্জা লাগে না? হাহ্! কাকে কী বলছি আমি। শরীর বিকিয়ে আহার কেনা তো তোদের পেশা। ”
চিত্রা ছোটো হলেও ওই কথার মানে বুঝতে একটুও সমস্যা হয় না তার। বেচারি একদম থম মেরে যায়। হতবাক হয়ে তাকায় নাজনীন বেগমের পানে। ভদ্র মহিলা বুঝতে পারেন, বেশি বলে ফেলেছেন তিনি। চিত্রার ওই দৃষ্টি দেখে কিঞ্চিৎ অপরাধবোধ অনুভব হয় উনার কিন্তু ইগোর কাছে হার মানতে নারাজ তিনি।
চিত্রার চোখ বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে দেখে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যান উনি। ওইদিকে ক্ষতবিক্ষত চিত্রা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে। বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে আঙ্গার হয়ে যায় তার৷ ঠিক তখুনি ওর কাঁধে হাত রাখে কেউ। চিত্রা রক্তিম চোখে চাইতেই দেখে, নাফিম কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখটা ছোট ছোট করে বিজ্ঞের মতো শুধায়,
–” কাঁদু কেনওও? বেতা পেয়েচ্ মাম্মাম?
অস্ফুটস্বরে বলা কথাগুলো তে কী ছিল কে জানে? চিত্রা কোনো কিছু না ভেবে ঝাপটে ধরে বাচ্চাটাকে৷ টলমলিয়ে উঠে বেচারা৷ সেসবের তোয়াক্কা না করে নাফিমের ছোট্ট বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে চিত্রা। নাফিম একটুও ছটফট করে না। শান্ত বাচ্চার মতো সটান দাঁড়িয়ে থাকে। কত দিন পর মাম্মাম ভালোবাসছে তাকে। সরলে যদি রাগ করে চলে যায় তখন?
মাতৃস্নেহের স্বাদ পেতে অবুঝ শিশুটা ওভাবেই থাকে। পয়তাল্লিশ মিনিট পেরোনোর পরও যখন চিত্রা থামে না, বীভৎস স্বরে কাঁদতে থাকে তখন ধৈর্য হারিয়ে ফেলে নাফিম। উশখুশ করে বলে,
–” পায়ে বেদনা করে মাম্মাম..
নাফিমের কথায় কিঞ্চিৎ থামে চিত্রা কিন্তু ছাড়ে না। ওকে কোলে তুলে পুনরায় জড়িয়ে ধরে। যেন চিত্রার প্রিয় কোনো পুতুল। ছাড়লেই হারিয়ে যাবে অদূরে। নাফিমও লক্ষী বাচ্চার মতো জড়িয়ে ধরে চিত্রার গলা। বেচারি চিত্রা নীরবে ফোঁপাতে থাকে৷
নাফিমের ছোট্ট মস্তিষ্ক ধরতে পারে না অত জটিলতা। ভেবে নেয়, হয়তো পাপা বকা দিয়েছে মাম্মামকে, তাই কাঁদছে। নাফিম বুজুর্গ দের মতো ছোট্ট হাতে আঁকড়ে ধরে চিত্রার মাথা। এরপর আদুরে স্বরে বলে,
–” কাঁদু না মাম্মাম। বাবা কে বকে দিবে নাফিম..
অসময়ে অবুঝ শিশুটাকেই আপন মনে হয় চিত্রার। অন্তত কারও মনে তো তার জন্য একটা মায়া দয়া আছে। সে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলে,
–” আমি কী খুব খারাপ আব্বু?
নাফিম দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–” নুউ.. আমাল মাম্মাম মেলা গুলা ভালো..
পরিমাপ বোঝাতে সে ছোট্ট হাত দু’টো মেলে দেয়।
চিত্রা শব্দ করে কেঁদে ফেলে৷ নাফিম পড়ে যায় বিপাকে। তার মাম্মাম যে ছিঁচকাদুনে সেটা জানতো না বেচারা। কোনো উপায় না পেয়ে ভারাক্রান্ত গলায় বলে,
–” তুমাকে এত্ত গুলা চকলেট দিবও। মেলা গুলা ভালোবাসাও দিব। আচ্ছা, খেলায়ও নিব। তাও আল কেঁদো না মাম্মাম..
নাফিমের কথাগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করল। চিত্রাও বাচ্চা হয়ে গেল একমুহূর্তের জন্য। দু’হাতে চোখ মুছে বলল,
–” আর কাঁদব না বাবাই। তুমি একটু ঘুম পাড়িয়ে দিবে মা কে?
নাফিম ঠোঁট উল্টে আধো আধো স্বরে বলল,
–” নাফিম স্মল বয়। তুমাকে কুলে নিতে পারব না তো..
চিত্রা ফিক্ করে হেসে দেয়। নাফিমকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার পেটের কাছটায় মাথা রেখে শোয়। অতঃপর নাফিমের ছোট্ট ছোট্ট হাত গুলো নিজের মাথায় রেখে বলে,
–” এই ছোট্ট মাথায় ভয়ানক সব স্মৃতি জমাটবদ্ধ। যা ক্ষণে ক্ষণে ভীষণ যন্ত্রণা দেয় তোমার মাম্মামকে। ফলস্বরূপ বহুদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমায় না সে। তুমি কী একটু স্নেহের হাত বুলিয়ে দিবে বাবা? মাম্মাম একটুখানি শান্তির ঘুম দিতে চায়..
উপসংহারে তুমি পর্ব ৫
শোয়া মাত্রই নাফিমের চোখ ও ছোটো ছোটো হয়ে এসেছে। চিত্রার ভারিক্কি কথাগুলো না বুঝলেও আবছা আবছা কিছু কথা বুঝল নাফিম। তাতেই অনভিজ্ঞ হাতে চিত্রার চুল উল্টেপাল্টে গিট্টু পাকিয়ে বসল। এতে একটুও রাগল না চিত্রা উল্টো শান্তিতে চোখ বুঁজে ফেলল।
কে জানতো এই স্বস্তি স্রেফ ক্ষণিকের? চিত্রা যদি টের পেতো, এক ভয়ানক ঝড় ধেয়ে আসছে ঘন্টা খানেকের মধ্যে তবে কী সে ঘুমাতে পারতো এত স্বস্তি নিয়ে? বেচারি টের পেল না অথচ এক নিমিষেই পাল্টে গেল পুরো গল্প। বদলে গেল সব যুক্তি, তর্ক আর নীতি।
