Home উপসংহারে তুমি উপসংহারে তুমি পর্ব ৫

উপসংহারে তুমি পর্ব ৫

উপসংহারে তুমি পর্ব ৫
রুহানিয়া ইমরোজ

নাওয়াফ হুমকি দিলেও ওমন কিছুই করেনি৷ অন্যান্য নরমাল দিনের মতোই আচরণ তার।সকালে ছেলেকে রেখে কাজে বেরোনোর পর ফিরেছে সন্ধ্যার একটু আগে। হাতে ছিল এক গাদা ইফতারের বাজার। বাসায় ঢুকেই মেইডের উদ্দেশ্যে বলে,
–” আজ এখানেই ইফতার হবে। রেডি কর সবকিছু।
বাবার উপর অভিমান নাকি ভিন্ন কারণ কে জানে? বহু বছরের নিয়ম ভেঙে নাওয়াফ নিজের ফ্ল্যাটে ইফতারি করার সিধান্ত নেয়। দৃশ্যখানা দেখে কেঁদে ফেলেন নাজনীন বেগম। বকাবকি করতে থাকেন স্বামীকে কিন্তু আশরাফ শিকদার নির্বিকার।

স্বামীর ওমন ভাবলেশহীন ভাব দেখে নাজনীন বেগম এর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে চিত্রলেখার উপর। কথায় আছে না.. শক্তের ভক্ত নরমের জম? চিত্রার বেলায় খাটছে সেই নীতি। নাজনীন বেগম চাইলেও স্বামী বা সন্তানকে কিছু বলতে পারবেন না। তবে পরের মেয়ে কে দুই কথা শুনিয়ে মনের রাগ তো মেটাতে পারবেন।
ওদিকে সেহরিতে স্টোর রুমে ঢোকার পর চিত্রা আর বেরোয়নি। সারাটা বেলা শুয়েই কাটিয়েছে। তার হতাশাগ্রস্ত মন ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির। চিত্রা বুঝে গেছে, দুমুঠো ভাতের জন্য সম্মান জলাঞ্জলি দেওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। কথার আঘাত তীব্র যন্ত্রণা দেয়। তছনছ করে ফেলে ভেতরটা।
তাহলে এখন উপায় একটাই , সামনের এডমিশনে পাবলিকে চান্স নেওয়া। অতঃপর দু চারটে টিউশনি ধরে চিরতরে এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়া। সমাধান মিলতেই চিত্রার চোখের কোল বেয়ে অভিমানী অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ে। মেয়েটা নিজেই দুহাতে চোখ মুছে ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলে,

–” কেউ নেই আমার। কিচ্ছু নেই পাওয়ার। শ্বাস নেওয়া মানেই বেঁচে থাকা। সুখ, শান্তি তো কেবল অলৌকিক পূরাণ কথা৷
চিত্রার কান্না পায়। ভেতরটা উথলে ওঠে নিদারুণ যন্ত্রণায় কিন্তু আর কাঁদবে না সে। গত দুইদিনে বুঝে গেছে, এই দুনিয়া অসহায়দের জন্য আজরাইল সম। যেখানে নিজের জন্মদাতারা সহায় হয়নি সেখানে আর কার থেকে কী আশা করবে চিত্রা?
অসহ্য যন্ত্রণা গুলোকে গিলে ফেলার জন্য বড় বড় করে শ্বাস নেয় চিত্রা। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। পেটের ভেতর অসহ্য রকমের ক্ষুধা। সব মিলিয়ে উদ্ভ্রান্ত অবস্থা তার।
চিত্রা যখন নিজের সাথে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত ঠিক তখুনি দরজায় টোকা পড়ে। চিত্রা কান্না আঁটকে বলে,

–” কে?
নাফিমের ন্যানি বলে,
–” স্যার আপনারে ডাকছে ম্যাডাম।
চিত্রার বুক ছ্যাত করে উঠে। স্যার মানে তো নাওয়াফ। সে কেনো ডাকবে চিত্রাকে? আবার কী কোনো ভুল করে বসেছে অজান্তেই? চোখমুখ মুছে নিজেকে প্রস্তুত করে চিত্রা। অহেতুক ভাবনা ভেবে তো লাভ নেই। গিয়েই দেখবে না-হয়। যথারীতি উঠে দ্রুত নিজেকে ঠিকঠাক করে নিয়ে ধীর কদমে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে যায় চিত্রা।

আযানের মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে। শাওয়ার শেষে ছেলেকে নিয়ে টবিলে হাজির হয়েছে নাওয়াফ। নাফিমটা দুষ্টু হলেও একদম বাপের নেওটা। নাওয়াফ একবার কোনো কিছুতে বাঁধা দিলে ভুলেও ধরবে না সেটা। তবে বাবার অনুপস্থিততে তার বাঁদরামি আকাশ ছোঁয়।
ছেলেকে মোনাজাত করা শেখাচ্ছিল নাওয়াফ এমন সময় গুটিসুটি পায়ে এসে হাজির হয় চিত্রা। ছেলের হাত ছেড়ে নাওয়াফ তাকায় মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রার পানে। মেয়েটা গুমসুম। মুখে রা নেই।
নাওয়াফ তার ভাবমূর্তি দেখে নিখুঁত নজরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরখ করে । চিত্রার পরনে আছে সফট কটনের একটা কামিজ। কমলা রঙের হওয়ায় শ্যামকন্যাকে মনোরম দেখাচ্ছে তবে চোখ মুখের অবস্থা ভয়ংকর।
নাওয়াফের ভ্রু কুঁচকে যায় রীতিমতো। এই মেয়ে কী সারাদিনই কাঁদে? আনমনে প্রশ্নটা আওড়ালেও মুখে কিছু বলে না। ওদিকে চিত্রা খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। তার মুশকিল আসান করে দেয় নাফিম। উচ্ছ্বসিত গলায় হাত নেড়ে নেড়ে বলে,

–” মাম্মাম.. আতো একানে.. ( আসো এখানে)।
নাফিমের ডাকে চমকে উঠে চিত্রা। নাওয়াফও স্তব্ধ হয়ে যায়। কীয়ৎকাল চেয়ে রয় নাফিমের গোলগাল ফর্সাটে চেহারার দিকে। দু’জনকে নির্বিকার দেখে নাফিম খুশিতে আত্মহারা হয়ে ডাকে,
–” মা…
নাফিম বাকিটুকু উচ্চারণ করার আগেই নাওয়াফ কড়া গলায় বলল,
–” শাট আপ নাফি। শী’জ নট ইয়্যোর মাম্মাম।
বাবার মৃদু ধমকে কেঁপে উঠে চুপসে যায় বাচ্চাটা। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাকিয়ে ভাবে, চিত্রা যদি তার মা না হয় তাহলে দাদুভাই মাম্মাম ডাকতে শেখলো কেনো? তার বাচ্চা মস্তিষ্ক এতকিছু প্রসেস করতে পারল না কেবল দুঃখী হয়ে বাবা কে জড়িয়ে ধরল। ওদিকে চিত্রার মন ভয়ে এইটুকুনি হয়ে যায়। নাফিম এর ভুলের শাস্তি তাকে আবার না দিয়ে বসে।
ওরকম কিছুই করে না নাওয়াফ। স্রেফ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

–” খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন?
চিত্রা বুঝল নাওয়াফ তাকে বসতে বলছে। সে-ও কথা বাড়াল না। চুপচাপ গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। পরপর আযান দিল। দু’জন নিশ্চুপে ইফতার সারলো। চিত্রা বেশি কিছু খেতে না পারলেও ক্ষুধা মিটে যায় তার। নাওয়াফ অপেক্ষা করছিল চিত্রার ইফতার শেষ হওয়ার।
যেই মেয়েটা খাবার শেষ করে ওমনি নাওয়াফ ওর দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় প্রশ্ন করে,
–” সম্মান চাও নাকি সংসার? ”
আকস্মিক প্রশ্নটা শুনে চিত্রা থমকে যায়। শুরুতে বুঝে উঠতে সমস্যা হয়। পরক্ষনে বুঝে নাওয়াফ জানতে চাইছে ডিভোর্স চাও নাকি সংসার? হুট করে একটা প্রশ্ন খেলে যায় তার মাথায়, সংসারে বুঝি সম্মান মেলে না? প্রশ্নটা জিহ্বার আগালে আসলেও জিজ্ঞেস করল না চিত্রা। সল্প জবাবে বলল,
–” সম্মান।
জবাবটা পছন্দ হলো নাওয়াফের। চোখ উঁচিয়ে চিত্রার পানে চেয়ে সাবলীল গলায় বলল,

–” বুদ্ধিমতি মেয়ে তুমি।
কথাটা শুনে চিত্রা তাচ্ছিল্য হাসল। আনমনে বলল,
–” এমনিতেই দুঃখ আমার চিরসঙ্গী। সর্বনাশের পিছু ছুটে সর্বহারা হতে চাই না আমি।
নাওয়াফ শার্প মাইন্ডেড সেই সাথে ভীষণ চালাকও। চিত্রা আনমনে কথা বললেও নাওয়াফ তার প্রত্যেক টা শব্দ শুনে তবে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। কারও দুঃখে দুঃখিত হওয়ার সময় নেই তার৷ তাই গলা ঝেড়ে বলে,
–” আগামী ছয়মাস একত্রে থাকব। ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো এক কামরায় ও থাকতে হবে। সবটাই বাধ্য বাধকতা৷ তুমি আমার কাছে জাস্ট একটা দায়িত্ব। সময় শেষ হলে..
একই কথা.. একই খোঁচা। নিতে পারল না চিত্রা। নিভু নিভু গলায় বলল,
–” জানি।
নাওয়াফ গম্ভীর গলায় বলল,

–” দ্যাটস গুড। সাথে এটাও জেনে রাখো, আই হ্যাভ আ স্টুপিড ফ্যামিলি। স্পেশালি বাবা বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করবে আমাদের এক করতে। ভুলেও সেসব ফাঁদে পা দিয়ো না। নয়তো দেখা যাবে বাকি জীবন পঙ্গু হয়ে কাটাতে হলো। নাফিমের থেকেও দূরে থাকবে।
নিশ্চুপে কথাগুলো শুনে গেল চিত্রা সেই সাথে এটাও সুনিশ্চিত হলো, এই পরিবার কিংবা এখানকার কেউ কখনোই তাকে আপন করে নিবে না। ঠিকই আছে.. পরের থেকে আবার কিসের চাওয়া-পাওয়া? তার নিজেরই স্টেপ নিতে হবে। লম্বা একটা শ্বাস টেনে খানিকটা সহস জোগাড় করল চিত্রা। সাথে সাথে জবাব দিল না। সময় নিল কিছুটা। এরপর ধীর গলায় বলল,
–” জ্বি বুঝেছি তবে একটা কথা বলার ছিল।
নাওয়াফ ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
–” কী?
চিত্রা সাহস নিয়ে বলল,
–” আমি পড়তে চাই। সামনে এডমিশন..
নাফিম ইন শর্টে বলে উঠল,

–” অনলাইন কোচিংয়ে ভর্তি করে দিব। বইয়ের লিস্ট ড্রাইভারকে দিলে সে এনে দিবে।
চিত্রার মনে হলো তার বুকের উপর থেকে বিশাল একটা ভার সরে গেছে। গুড নিউজটা অপ্রত্যাশিত ঠেকল । সে ভাবেতেও পারেনি নাওয়াফ এভাবে রাজি হয়ে যাবে। ভেবেছিল হয়তো উল্টাপাল্টা কথা শুনতে হবে। নয়তো মুখের উপর না করে দিবে নাওয়াফ কিন্তু সম্মতি প্রকাশ করায় কিঞ্চিৎ অবাক হয় চিত্রা। বুঝে উঠতে পারে না, এতকিছু থাকতে অনলাইনে কেন ভর্তি করবে?

উপসংহারে তুমি পর্ব ৪

ওটা নিয়ে আর মাথা ঘামালো না চিত্রা। এটলিস্ট সুযোগ পাচ্ছে এটাই অনেক কিছু তার কাছে। বহু সময় পর একটু স্বস্তি অনুভব করছে সে অথচ বেচারি জানলো না.. কী ঝড় ধেয়ে আসছে তার দিকে। এই একটা সিদ্ধান্ত কীভাবে তছনছ করে দিতে যাচ্ছে গোটা পরিবার আর সম্পর্কের বাঁধন।

উপসংহারে তুমি পর্ব ৬