উপসংহারে তুমি পর্ব ৮
রুহানিয়া ইমরোজ
তারাবির নামাজ শেষ হয়েছে। নাওয়াফ বাসায় চলে আসবে যেকোনো সময় অথচ চিন্তায় অস্থির চিত্রা স্টোর রুমে বসে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে ব্যস্ত। আজ থেকেই এক ঘরে থাকার কথা তাদের কিন্তু কীভাবে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না চিত্রা। আগে ঘরে গেলে যদি নাওয়াফ ওকে ছ্যাঁচড়া ভাবে? পরক্ষণে মনে হচ্ছে পরে গেলে যদি ত্যাড়া কথা শোনায়?
সবমিলিয়ে ভালোই বিপাকে পড়েছে চিত্রা। তার পাশে ব্যাঙের মতো উবু হয়ে শুয়ে আছে নাফিম। মনোযোগ দিয়ে কার্টুন দেখায় ব্যস্ত সে। ওর দিকে চেয়ে কিঞ্চিৎ হিংসা হলো চিত্রার৷ আজ যদি ও এরকম লিলিপুট থাকতো তাহলে এত জটিলতা ফেস করতে হতো না। পরক্ষণে নাফিমের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখল চিত্রা।
মা কী জিনিস বোঝার আগেই এতিম হলো বাচ্চাটা। এখন যাকে মা হিসেবে কাছে টানছে তাকেও দুদিন পর হারাতে হবে। কথা গুলো ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসলো তার। ভেতরকার ঝড়টা দমাতে, স্নেহের হাত বুলিয়ে দিল নাফিমের মাথায়।
চিত্রার হাতের স্পর্শ পেয়ে নাফিম ঘাড় ঘুরিয়ে পিটপিটিয়ে চাইল। পরপরই ফোন ছেড়ে ডিগবাজি খেয়ে চিত্রার হাতের উপর শুয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। যেন মজার একটা খেলা এটা।
নাফিমের সান্নিধ্যে এসে চিত্রাও বাচ্চা হয়ে গেলো। কাতুকুতু দিতে শুরু করল ওকে। ব্যস! নাফিমের উচ্চ স্বরের হাসিতে মেতে উঠল পুরো ঘর। তার সাথে শোনা গেল চিত্রলেখার মৃদু হাসির কলরব।
ঠিক সে সময়ই দরজার পাশে এসে দাঁড়াল কেউ। মিনিট খানেক সময় নিয়ে দেখল তাদের খুনসুটি অতঃপর গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
–” দম আঁটকে আসবে ওর।
সহসাই থেমে গেল চিত্রলেখার হাত। তখনও খিলখিলিয়ে হাসছে নাফিম। অতিরিক্ত হাসার ফলে জল জমেছে তার অক্ষিকোটরে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে এসেছে কিঞ্চিৎ। একদম বাপের রং পেয়েছে ছেলেটা। হয়েছেও তার মতোই সুদর্শন।
নাওয়াফের উপস্থিততে গুটিয়ে যায় চিত্রা। একটা কথাও বের হয় না তার মুখ থেকে এমনকি চোখ তুলে পর্যন্ত তাকায় না। অবশ্য তাকাবেই বা কেনো? বিগত দিনগুলোর ঘটনায় তো যথেষ্ট এসবের জন্য।
নাওয়াফ বিনা অনুমতিতে ঘরে আসে। বেডের কাছে এসে নাফিমকে কোলে নেয়। সারাদিন পর বাবাকে কাছে পেয়ে নাফিমও আহ্লাদী হয়ে উঠে৷ ফটাফট চুমু খায় বাবার কপালে, গালে। আধো আধো বুলিতে বলে,
–” বাবা, খেয়েত?
নাওয়াফ মৃদু হাসে ছেলের প্রশ্নে। তার মাথাটা কাঁধে ঠেকিয়ে ধীর গলায় বলে,
–” হ্যাঁ বাবা খেয়েছি। আমি জানি তুমিও খেয়েছ। নাও ইট’স স্লিপিং টাইম। ঘুমাও জলদি। তোমায় ঘুম পাড়িয়ে কাজে যাব আমি।
বাবার বাধ্য ছেলে নাফিম কিন্তু আজ কেনো যেনো বাবার কাছে থাকতে মন চাইছে না ওর৷ চিত্রলেখার গায়ের ওই মা মা গন্ধটা হাতছানি দিয়ে ডাকছে বার বার। শিশু মন তো আর অত জটিলতা বুঝে না তাই সে বাবার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে আদুরে স্বরে বলে,
–” টুমি যাও বাবা। নাফি মাম্মাম বুকে ঘুমাবে।
কথাটা শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে চিত্রার বুক। ঝট করে চোখ তুলে তাকায় ও। নাওয়াফও এদিকেই তাকিয়ে ছিল। কী শাণিত সেই দৃষ্টি। টিকতে পারে না চিত্রা তাই চট করে চোখ নামিয়ে ফেলে। অস্থিরতা দমাতে খামচে ধরে পরনের পরিচ্ছদ। কে জানে, এবার কী শুনতে হবে নাওয়াফের থেকে।
তবে তেমন কিছুই হয় না। নাওয়াফ ধীর গলায় বলে,
–” ওকে বাবা। তাহলে তুমি কিছুক্ষণ মোটু পাতলু দেখো। তোমার মাম্মামের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে আমার। শেষ হলেই আমরা একসাথে ঘুমাব কেমন?
নাফিম খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় ওদিকে চিত্রার দিন দুনিয়া দুলে উঠে। একসাথে ঘুমাবে মানে? গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে চিত্রার। একরুমে থাকা পর্যন্ত ঠিক ছিল। আবার একসাথে ঘুমাবে… কানে কী ঠিক শুনলো ও?
ওর চেহারা দেখে মনের কথা পড়তে খুব বেশি সময় লাগলো না নাওয়াফের। তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না ও বরং উল্টো পথে পা বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
–” ঘরে এসো।
কথাটা শুনে বুকের দ্রিমদ্রিম শব্দটা দ্বিগুণ হয়। ভয় লাগলেও একটুখানি সাহস করে নাওয়াফের পিছু নেয় চিত্রা। অযাচিত প্রশ্নবাণে মাথা নষ্ট করার চেয়ে সরাসরি সত্যের সম্মুখীন হওয়া ভালো।
সময়কাল রাত দশটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। ধরণীর বুকে আঁধারের রাজত্ব বিদ্যমান। অন্ধকারাচ্ছন্ন বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে নাওয়াফ এবং চিত্রলেখা। মাঝেমধ্যে মৃদুমন্দ বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে ওদের। দুজনেই নিশ্চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কেবল একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে অদূরে থাকা একটা সমাধির পানে।
ওটা আর কারও নয় বরং নাফিমের মরহুম মা চৈত্রিকা শিকদারের। চিত্রা জানতো না শিকদার ভিলার পেছনে তার কবর আছে। সে এটাও জানতো না, নাওয়াফের বারান্দা দেখে স্পষ্ট দেখা যায় সেটা ৷
জানলে কখনোই আসতো না এদিকে। ভীষণ ঘৃণা করে সে ওই মহিলাকে। মৃত মানুষের জন্য নাকি ক্ষোভ পুষে রাখতে নেই কিন্তু চিত্রা পারেনি তাকে ক্ষমা করতে। ওই একটা মেয়ের জন্য ওর গোটা জীবন বরবাদ হয়ে গেছে।
চৈত্রিকা হলো চিত্রার সৎ বোন। বিয়ের পনেরো বছরের মাথায় নিজের সুখের সংসার ফেলে এক বাচ্চার মা কে নিয়ে নিরুদ্দেশ হোন আশিকুর শিকদার। অবশ্য জানিয়েই গিয়েছিলেন। পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন রাতে চিত্রার মা চৈতী বেগমকে বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান তিনি ।
কোনো নারী কী আর স্বামীর ভাগ ছাড়তে পারে? তিনিও পারেননি। স্বামীর পায়ে ধরে বলেছিলেন,
–” দোহায় লাগে আপনার। দুই সন্তানের মুখ চেয়ে হলেও ফিরে আসুন।
চৈতী বেগম তখন সাড়ে আটমাসের প্রেগন্যান্ট। আল্ট্রা করে জেনেছিলেন ছেলে সন্তান হবে। চৈতী বেগমের খুশি দেখে কে? ভেবেছিলেন এবার হয়তো সুখের মুখ দেখবেন উনি কিন্তু নিয়তির লিখন ছিলো ভিন্ন।
স্বামীর পথে বাঁধা হতে চাইলে, রেগেমেগে আশিকুর শিকদার ভীষণ মারধর করেন তাকে। চিত্রা ঘরের বাইরে থেকে শুনেছিল মায়ের গগনবিদারী চিৎকার। কত করে ডেকেছিল বাবাকে কিন্তু থামাতে পারেনি সেই আগ্রাসী অত্যাচার। মাত্র আট বছরের শিশু ও তখন। ওসব নির্মমতা সয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি-ইবা করার আছে?
ওই মারের প্রকোপেই প্রসব বেদনা শুরু হয় চৈতী বেগমের। আশিকুর শিকদারের কী আর সেসব দেখার সময় ছিলো? তার মন পড়ে ছিল সেই নষ্ট নারীর কাছে যে তার সুন্দর সংসার তছনছের একমাত্র কারিগর।
আশিকুর শিকদার বেরিয়ে যাওয়ার পর চিত্রা দৌড়ে আসে মায়ের কাছে । চিৎকার দিয়ে ডাকে একে ওকে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না। সুসময়ের বন্ধু আবার অসময়ে থাকে নাকি? চৈতী বেগম তখন অচেতন। ভয়ংকর রকমের রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল তার৷ লালচে তরলের ঘনত্ব দেখে মাথা ঘুরিয়ে উঠে চিত্রার।
কী করবে ভেবে না পেয়ে দৌড়ে যায় বাহিরে সে। দু চারজনকে সাহায্যের জন্য বলতেই, ওরা একটা সিএনজি ডেকে দেয়। তাতে করে কোনোমতে চৈতী বেগমকে নিয়ে হসপিটালে যায় চিত্রা। পৌঁছে ঘটে আরেক বিপত্তি। ভাড়া তো নেই তার কাছে৷
সিনএনজি চালকও চৈতী বেগমকে হসপিটালে নিতে দিবেন না, ভাড়া পরিশোধ না করলে।ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে উঠে পরিস্থিতি। পরবর্তীতে আশপাশের মানুষের বুদ্ধিতে নিজের গলার লকেট দিয়ে ভাড়া মেটায় চিত্রা।
প্রাপ্য বুঝে পেতেই সিএনজি চালক হসপিটালের সামের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেন চৈতী বেগমের অসার দেহখানা। চিত্রা সেদিন প্রতিবাদ করতে পারেনি। কেবল হাউমাউ করে কেঁদেছিল৷
সেদিনই বাস্তবতার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল তার। মায়ের রক্তাক্ত দেহখানি আগলে কীভাবে হসপিটাল অব্দিই নিয়েছিল তা কেবল সেই জানে। সেদিন এ-ও বুঝেছিল, রক্তের সম্পর্কই সবকিছু না বরং এরা সবচাইতে বড় স্বার্থপর। সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কেবল নিজের স্বার্থটুকু হাসিল করতে চায়৷
শত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন চৈতী বেগম কিন্তু চিকিৎসার অভাবে মারা যায় শিশুটা অথচ বিত্তশালী বংশের প্রদীপ ছিল সে। জানাজাটা পর্যন্ত নসিব হয়নি তার। অন্তিমের বিনম্র আয়োজন ছাড়াই মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল তার কোমল দেহখানি। কেউ খুশি হয়নি তার আগমনে আবার কেউ কাঁদেনি তার প্রস্থানে, এতটাই দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছিল সে।
সেদিনকার পর একেবারে নির্বিকার হয়ে যান চৈতী বেগম। স্বামী কিংবা সন্তান কোনো কিছুর উপর বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না উনার। শুধু সৃষ্টিকর্তার উপর হয়েছিল এক রাশ অভিমান। সময় পেরোয়। বাড়ি ফিরেন উনারা কিন্তু আগের মতো আর কিচ্ছু হয় না।
মায়ের ভাবলেশহীন আচরণ ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় চিত্রাকে। মেয়েটা শৈশব হারায়। অল্প বয়সে হতে হয় ভীষণ বুঝদার। সবকিছু যখন মোটামুটি চলনসই তখনি ঝড়ের মতো আগমন ঘটে আশিকুর শিকদার এর। এক কিশোরীর হাত ধরে শিকদার বাড়ির চৌকাঠে এসে দাঁড়ান তিনি। পরিচয় হিসেবে তিনি জানান, এটা তার বড় মেয়ে চৈত্রিকা শিকদার।
চিত্রা অবাক হয়ে চেয়েছিল মেয়েটার পানে। তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী ছিলো চৈত্রিকা। আশপাশের মানুষ জন চৈত্রিকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আশিকুর শিকদার বলেন,
–” চৈত্রিকার মায়ের সাথে উনিশ বছরের সংসার ছিল আমার। চৈত্রিকা আমাদের ভালোবাসার ফল। কেউ তাকে জড়িয়ে একটাও বাজে কথা বলবে না।
বড্ড ঠুনকো ছিল সেই যুক্তি। লোকমুখে শোনা গেছে, পতিতালয়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী চাঁদনী বাঈজীর সৌন্দর্যে মেতে ঘর ছেড়ে ছিলেন আশিকুর শিকদার। চৈত্রিকা তাদের নয় বরং চাঁদনীর কোনো এক পাপের ফসল।
পরবর্তী কী হয়েছে জানা নেই। আশিকুর সাহেব কেনো অন্যের সন্তানকে নিজের বলে পরিচয় দিয়েছেন তার জবাবও জানা নেই। অবশ্য চিত্রার রুচি হয়নি কখনো এসব জানতে। সেদিনের পর থেকে বাবা নামক শব্দটাকে ভীষণ রকমের ঘৃণা করে সে।
তার এই ঘৃণা সময়ের সাথে বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁয়। চৈত্রিকা আর তার মধ্যে সব সময়ই পার্থক্য করতেন আশিকুর সাহেব। চিত্রা আজীবনই ছিল অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় কেউ। তাই তো মার এর ভাগটা তার জন্য তোলা থাকতো। শাসনও সইতে হতো চিত্রাকেই। কিছু না করেও শুনতে হতো অকথ্য ভাষায় গালাগাল। এমনকি কোনো ঈদে নতুন জামা গায়ে দেয়নি চিত্রা। চৈত্রিকার পরা গত ঈদের জামা গুলোই ছিল চিত্রার নতুন ঈদের জামা।
সেই অতীত আজও পিছু ছাড়ল না। চৈত্রিকার স্বামী সন্তানকে নিয়েই ঘর করতে হচ্ছে চিত্রার। ভাগ্য এত নিষ্ঠুর কেনো কে জানে? নাকি সে সইতে জানে বলে খোদা তার বেলায় কঠোর হয়? সেটাও জানা নেই চিত্রার।
অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থাকা চিত্রার ঘোর ভাঙল নাওয়াফের প্রশ্নে,
–” তোমার চোখে আমি নিকৃষ্ট পুরুষ তাই না?
প্রশ্নটা বুঝতে খানিকটা সময় লাগলো চিত্রার। কোথা থেকে সাহস পেল কে জানে। ফটফট করে জবাব দিল,
–” কিছুটা তেমনই।
সহজ স্বীকারোক্তি শুনে অবাক হলো না নাওয়াফ। এ কদিনে খুব ভালো মতো মেপে ফেলেছে ও চিত্রার ব্যক্তিত্ব। তাই পরপরই শুধাল,
–” তোমার কী মনে হয়? ওমন পশুর মতো আচরণ কেনো করেছি আমি তোমার সাথে?
নাওয়াফের সোজাসাপটা প্রশ্নে খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে যায় চিত্রা। তবুও সময় নিয়ে উত্তর দেয়,
–” হয়তো নাফিমের মায়ের জায়গায় আমায় মানতে পারেননি।
নাওয়াফ সরাসরি বলে,
–” ভ্রান্ত ধারণা তোমার। এরকম কিছুই নয়।
নাওয়াফের কথায় ভীষণ অবাক হয় চিত্রা। না চাইতেও তার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে,
–” তাহলে?
নাওয়াফ ধীর গলায় বলতে শুরু করে,
–” তুমি বাচ্চা একটা মেয়ে। তোমার বয়সের প্রায় দ্বিগুণ আমি। দ্বিতীয়ত, লাইফ পার্টনার হিসেবে আর কাউকে চাই না আমার। তৃতীয়ত, এতদিন পরীক্ষা করছিলাম তোমায়।
চিত্রা অবাক হয়ে শুধায়,
–” কিসের পরীক্ষা?
নাওয়াফ সরাসরি জবাব দেয়,
–” নারী বড় রহস্যময়ী। অভিনয়েও সেরা। তাই একটু পরখ করে দেখছিলাম, আদৌ বিশ্বস্ত কি-না তুমি। দিনশেষে বুঝলাম, তুমি নিজেই পরিস্থিতির স্বীকার।
নাওয়াফের জবাবে না চাইতেও বিষিয়ে গেল চিত্রার মন। বিস্মিত হয়ে সরাসরি নাওয়াফের দিকে তাকাল ও। লোকটা তখনও অদূরে তাকিয়ে। কী দেখছে কে জানে? তবে চিত্রার মনে তখন প্রশ্নের ঝড়। সামান্য একটা পরীক্ষার জন্য অমানুষিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে তাকে। এটা কী ছেলেখেলা মনে হয় নাওয়াফের?
মনের প্রশ্ন মনেই রাখল চিত্রা। করেই বা কী লাভ? তাই নিশ্চুপ রইল। নাওয়াফই আবার বলল,
–” আশা করছি সামনেও তুমি এমনই ভাবলেশহীন থাকবে আমার বিষয়ে এবং আগামী তিনটা মাস তুমি রিলেটেড কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না আমায়। আমি এ-ও আশা রাখছি, ডিভোর্সের ব্যপারে কোনো ঝামেলা করবে না তুমি।
চিত্রা ভেবেছিল নাওয়াফ হয়তো একটু হলেও অনুতপ্ত হবে। আসলেই বোকা সে। সে তো আর গুরুত্বপূর্ণ মানুষ না। আদোতে সে মানুষই না।
মাঝেমধ্যে নিজেকে জড়বস্তু মনে হয় চিত্রার। জড় বস্তু বলেই বোধহয় প্রয়োজন শেষে সবাই ছুঁড়ে ফেলে ওকে। পশু হলে নিশ্চয়ই একটু হলেও মায়া দেখাতো তারা?
এই প্রথম মানুষ হওয়ায় বড্ড আফসোস হচ্ছে তার। খুব বেশি কান্না পাচ্ছে, নিকৃষ্টতর জীব হলো না কেনো? অন্তত এই অমানুষিক যন্ত্রণা আর সহ্য করা লাগতো না তখন।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় পা ঝিমঝিম করতে থাকে চিত্রার। চোখ দুটো ভরে উঠে অশ্রুতে। তার হাব ভাব দেখে নাওয়াফ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
–” আরেকটা কথা বলতে চাইছি। আশা করি তুমি বুঝবে এবং রাখবে৷
চিত্রার গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে গেছে কান্নারা। চেয়েও কথা বলতে পারল না ও। ছোট করে বলল,
–” জি?
নাওয়াফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–” জন্মের পরই মা হারিয়েছে ছেলেটা। এতকাল আমাদের কাছে বড় হলেও হুট করে তোমায় কাছে পেয়ে মাতৃত্বের স্বাদ মেটাতে চাইছে। বেশি লাই দিয়ো না ওকে। তুমি চলে যাওয়ার পর সামলাতে কষ্ট হয়ে যাবে আমাদের। আমি চাই না এইটুকু বয়সে কোনো বাজে ট্রমার সম্মুখীন হোক আমার বাচ্চা।
কথাগুলো শুনে নিজেকে দমাতে পারল না চিত্রা। তার গাল বেয়ে কয়েক ফোটা উষ্ণ পানি গাড়িয়ে পড়ল তবে সেটা নাওয়াফকে দেখাতে চাইল না সে। থেমে থেমে বলল,
–” আমি নিজে থেকে যাইনি ওর কাছে। ওই আঁচল ধরে ঘুরে আমার পিছু। এটা কীভাবে রোধ করব?
নাওয়াফ খানিক সময় নিয়ে বলে,
–” আমি বলছিনা তোমাকে সরে যেতে। শুধু বলছি ওকে মাতৃত্বের স্বাদ দিয়ো না। ফ্রেন্ডের মতো মিশো। দ্যাটস অল।
চিত্রার মাথায় ঢুকল না কিছু। অন্দরমহলে ঝড় চলছে ওর। ভেবেছিল, নাফিমটাকে আগলে কষ্ট গুলো ভুলে থাকবে। তা আর হলো কই? চিত্রা বুঝে গেছে, ❝ যার যত একাকীত্বে ভয়, তার তত মানুষ হারায়। ❞
ভীষণ চালাক পুরুষ নাওয়াফ। চিত্রার পাংশুটে মুখ দেখে ওর ভেতরের অবস্থা বুঝতে বাকি রইল না তার৷ তাই গল বলল,
–” আম ডান। তোমার কিছু বলার আছে?
চিত্রা মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। নাওয়াফ তীক্ষ্ণ চোখে দেখে ওর কম্পনরত শরীরটা। মনে হচ্ছে এই বুঝি নেতিয়ে পড়লো। নাওয়াফ আর রিস্ক নিলো না৷ ঘরের দিকে পা বাড়াল৷ চিত্রাও এলো তার পিছু। নাওয়াফ তার উদ্দেশ্যে বলল,
–” তুমি আর নাফিম বেডে ঘুমাও। আমি ফ্লোরে এডজাস্ট করে নিব৷
চিত্রা কিচ্ছু বললো না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বেডের দিকে। নাফিমকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল চুপচাপ। মিনিট গড়াতেই বোবা কান্নার তোড়ে থেমে থেমে কেঁপে উঠতে লাগলো তার শরীর৷
উপসংহারে তুমি পর্ব ৭
ফ্লোরে ফোমের বেডে সটান হয়ে শুয়ে থাকা নাওয়াফ স্পষ্ট টের পেলো ব্যপারটা কিন্তু আগ বাড়িয়ে সান্ত্বনা দিতে গেলো না। তার ভাষ্যমতে সারা জীবন কান্নার চাইতে একরাত কান্না করা ভালো৷ সে একদমই চায় না চৈত্রিকার মতো ধ্বংস হোক চিত্রা। মেয়েটা এমনিতেই ভুক্তভোগী। আলাদা করে তার জীবনটা আর জাহান্নাম বানাতে চায় না নাওয়াফ। হতে হলো নাহয় একটু খারাপ। তবুও দিনশেষে ভালো থাকুক কিছু মানুষ।
