Home উপসংহারে তুমি উপসংহারে তুমি পর্ব ৯

উপসংহারে তুমি পর্ব ৯

উপসংহারে তুমি পর্ব ৯
রুহানিয়া ইমরোজ

নাওয়াফের সাথে এক ঘরে থাকার পর সাংঘাতিক জ্বর এসেছে চিত্রার। আপাতত দৃষ্টিতে কেউই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না বিষয়টা। বিশেষ করে আশরাফ সাহেব তো হতভম্ব হয়ে গেছেন। একবার নাওয়াফের দিকে তাকাচ্ছেন তো আরেকবার বেহুঁশ চিত্রার দিকে৷
ওদিকে নাওয়াফ পড়েছে ফ্যাঁসাদে। সবার অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় তার৷ ওরা কী ভাবছে কে জানে কিন্তু সে-তো কিছুই করেনি। কথা শেষ করে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেহরিতে উঠে চিত্রাকে ডাকতে নিলে টের পায় ওর ভীষণ জ্বর। মাত্রা এতটাই বেশি যে মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
নাওয়াফ শক্ত মনমানসিকতার হলেও জালিম নয়। সময়ের অপেক্ষা না করে চটজলদি ডক্টর কে কল দেয়। আশরাফ শিকদার তখন হাঁটা হাটি করছিলেন বাইরের দিকটায়। আচমকা নাওয়াফের ফ্ল্যাটে কাউকে ঢুকতে দেখে তিনিও হুড়মুড়িয়ে এসে হাজির হন এখানে৷ উনার পিছু পিছু আবার নাজনীন বেগমও আসেন। এসে সবকিছু জানতে পারার পর উনাদের সন্দিহান দৃষ্টি পড়ে নাওয়াফের উপর।
নাওয়াফ শক্ত মুখে নাফিমকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল। ডক্টর তখনও চেক-আপ করতে ব্যস্ত ছিলেন।বেচারি চিত্রা একেবারে গলে গেছে জ্বরের ঠেলায়৷ দু’টো কম্ফোর্টার দিয়েও তার কাঁপুনি কমানো যাচ্ছে না। ডক্টর চেক করে দু’টো ইনজেকশন দিলেন অতঃপর সাদা কাগজে কিছু একটা লিখে নাওয়াফ এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

–” অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। ওর দুর্বল শরীর নিতে পারছে না এতকিছু। বি কেয়ারফুল।
প্রেসক্রিপশন দিয়ে আরও দু তিনটে কথা বললেন ডক্টর। সবটাই বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনল নাওয়াফ। ডক্টর প্রেসক্রিপশন দিয়ে যাওয়ার পর সবাই রুম থেকে বেরোলো। নাফিমকে মায়ের কাছে দিয়ে নাওয়াফ ও বের হলো মেডিসিন আনবে বলে। তখুনি আশরাফ সাহেব তাকে পিছু ডেকে বললেন,
–” এটা কী করলে তুমি? মেয়েটা ছোটো…
কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন আশরাফ সাহেব৷ বিষয়টাই এমন কিন্তু ভেতরকার চিন্তাও তো দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মেয়েটার আছেই বা কে? নাওয়াফ ওকে মেরে ফেললেও তো কেউ এগিয়ে আসবে না।
বাবার অপ্রস্তুত কন্ঠ শুনে নাওয়াফের কপালে ভাঁজ পড়ে। আশরাফ সাহেবের ইঙ্গিতটা বোঝেনি ও। কী বলতে চাইল বাবা..ভাবতে ভাবতেই পুরো বিষয়টা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল তার নিকট।
জ্বর আসার জন্য পরোক্ষভাবে তাকেই দোষ দেওয়া হচ্ছে। বুঝতে পেরে একদিকে যেমন মেজাজ খারাপ হলো অন্যদিকে তেমন হাসি ও পেল। তবে নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কাজটা করল না নাওয়াফ। বাবাকে আরেকটু চিন্তায় ফেলে দিতে গম্ভীর মুখে ত্যাড়া গলায় বলল,

–” যার বউ তার মাথা ব্যথা। অন্য কারও এত চিন্তা করার দরকার নেই।
সিরিয়াস মুহূর্ত ওমন অযৌক্তিক খোঁচা পেয়ে তেঁতে উঠলেন আশরাফ সাহেব। রাগী গলায় বললেন,
–” ফাজলামি করো না সমুদ্র। মেয়েটার অবস্থা দেখেছ? এমনিতেই…
নাওয়াফ কথার মাঝেই ফোড়ন কেটে বলল,
–” আমার ডিপার্টমেন্ট আমি খুব ভালো মতো দেখছি বাবা। আস্ক হার.. কোনো অভিযোগ করতে পারবে না তোমার ভাতিজি ৷ সেই অবকাশ রাখিনি আমি।
ছেলের কথায় রীতিমতো আগুন ধরে গেল আশরাফ শিকদারের মাথায়। এই অসভ্য ছেলে বলে কী? মনে মুখে অজস্র গালি আসলেও বয়সের লেহাজ করতে গিয়ে কিছুই জাহির করতে পারলেন না। রাগে বোম হয়ে বললেন,
— ” দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো তুমি সমুদ্র।
আশরাফ শিকদারের সাংঘাতিক রাগের পারদ টের পেয়েছে নাওয়াফ। মনে মনে খুব শান্তিও পেয়েছে অবশ্য। তার ঘাড়ে চিত্রা নামক দায়িত্ব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার শোধ হাড়ে হাড়ে তুলবে ও । বাবা উচ্চবাচ্য করলেও নাওয়াফ আর দাঁড়ালো না৷ স্বস্তির শ্বাস ফেলে তার বালিকা বধূর জন্য মেডিসিন আনতে গেল। ফিরল প্রায় ঘন্টাখানেক পর ততক্ষণে সবাই চলে গেছে।
নাফিমকেও নিয়ে গেছে সাথে৷ অত রাতে ডাকাডাকি দৃষ্টিকটু দেখায় বিধায় নাওয়াফ সোজা রুমে এসে দরজা আঁটকে দেয়। চিত্রা তখনও বেহুঁশ। নাওয়াফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। কানে বাজতে থাকে ডক্টরের বলা কথা গুলো কিন্তু নিজেকে প্রভাবিত হতে দেয় না নাওয়াফ৷ লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়য়ে বলল,

–” শুধুমাত্র ক’দিনের মেহমান ও..
এতটুকু বারংবার আওড়াতে আওড়াতে ঘুমিয়ে পড়ে একটা সময়। পরবর্তী সময়গুলো কাটে খুব জলদি। সেই রাতের পর আর চিত্রার সাথে কঠোর হয়নি নাওয়াফ। উল্টো অসুস্থ চিত্রার কেয়ার করেছে অল্পসল্প। চিত্রা তো হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল পরক্ষণে বুঝেছে, মানবিকতা দেখাচ্ছে নাওয়াফ।
পার হয়েছে প্রায় একটা মাস। এরমধ্যে নাওয়াফের সাথে সম্পর্কের উন্নতি না ঘটলেও নাফিমের কলিজা হয়ে গেছে চিত্রা৷ বাচ্চাটা তাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না। নাফিমের সকাল শুরু হয় চিত্রার বুকে আর রাত শেষ হয় তার সান্নিধ্যে।
ক’দিন পর পরীক্ষা বিধায় পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী হয়েছে চিত্রা। একদম নাওয়াখাওয়া ভুলে পড়তে ব্যস্ত ও৷ আশ্চর্যজনক ভাবে তার এই ব্যস্ততার মাঝে একটুও ব্যঘাত ঘটায়নি নাফিম। উল্টো খেলনা টেনে এনে চিত্রার পাশে বসে চুপটি করে খেলেছে। ঘুম পেলে চিত্রার কোলের মধ্যে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। ক্ষুধা লাগলে শুধু একটু জ্বালিয়েছে৷ এ ক’দিনে চিত্রার হাত ছাড়া কারও হাতের কিছু মুখে তুলেনি নাফিম।

চিত্রার আর কী। যেদিকে বৃষ্টি হয়েছে সেদিকে ছাতা ধরেছে। তার জিন্দেগী হয়ে গেছে পড়াশোনা আর নাফিম। নাওয়াফের ধারের কাছেও ঘেঁষেনি ও৷ আগে যা ও বা একটু টান ছিলো, সেদিন চৈত্রিকার কবর দেখার পর আর ইচ্ছে করে না নাওয়াফের সাথে থাকতে কিংবা একটা সুন্দর সংসারের স্বপ্ন দেখতে।
এসবের মাঝে পরিবর্তন ঘটেছে নাওয়াফের৷ লোকটা রোজ রাতে বাড়ি ফিরে ইফতারি করে ঘরে বসে কাজ করে অথচ আগে রাত-বিরেতে ঘরে ফিরত সে। এটা বাদেও কিছু ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে। যার রেশ শঙ্কিত করে তুলেছে চিত্রার মন৷
নাওয়াফের ঘরে ওয়াই-ফাইয়ের নেট ভালো পাওয়া যায় দেখে চিত্রা সে ঘরেই পড়তে বসে। আগে সমস্যা ছিলো না কিন্তু ইদানীং চিত্রা অনুভব করে, নাওয়াফ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে পরপর তাকিয়েছে ক’বার কিন্তু ধরতে পারেনি।

শুরুতে ভ্রম মনে হয়েছিল তবে চাঁদ রাতে সেটার সত্যতা খুঁজে পায় চিত্রা। সে বসে বসে ক্লাস করছিল। ম্যাথ এতটাই কঠিন যে সহজে সমাধান করতে পারছিল না চিত্রা। তার উপর নাফিমটা এত দুষ্টুমি করছিল সেদিন। পরে সইতে না পেরে নাফিম কে কোলের মধ্যে নিয়ে ঘুম পাড়ায় চিত্রা। ওর ওড়না টা চুৃমকি ওয়ালা বলে এক পাশে সরিয়ে রেখেছিল৷
নাফিম ঘুমানোর পর তাকে বেডে শুইয়ে দেয় চিত্রা। এরপর ক্লাসে মগ্ন হয়ে যায়। সে যে ওড়না সরিয়ে রেখেছে সেটা বেমালুম ভুলে বসে। নাওয়াফ ঘরেই ছিল। পুরো দৃশ্যটা দেখেছে ও। চিত্রা ওদিকে ধ্যান দেয়নি বলে টের পায়নি শুরুতে।
ম্যাথ সলভ্ হওয়ার পর মাথার জট খুলে চিত্রার। তখনও রেকর্ডেড ক্লাস চলছিল৷ নোটস নিতে নিতে চিত্রার মনে হয়, কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। চিত্রার বিরক্ত লাগতে থাকে। কে তাকাবে? কেনো তাকাবে? ঘরে আছেই বা কে? পরক্ষণে তার মনে পড়ে নাওয়াফের কথা। হুট করে কৌতূহল বশত সেদিকে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় চিত্রার।

পায়ের উপর পা তুলে সোফায় হেলায় দিয়ে বসে থাকা নাওয়াফ একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। চিত্রা যখন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকায় তখন আরেকটা ঝটকা খায়। ক্লিভেজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার। নাওয়াফকে শোয়াতে গিয়ে হয়েছে হয়তো। সে তৎক্ষনাৎ ওড়না ঠিকঠাক করে নাওয়াফের দিকে বড় বড় চোখে তাকায়।
নাওয়াফ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মৃদু হেসে তার ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিটিং চলছিল তার তখন। আর চিত্রা? তার তো রাতের ঘুম উড়ে যায়৷ এরপর থেকে যথেষ্ট সতর্ক থাকে কিন্তু নাওয়াফের ধুরন্ধর দৃষ্টি ঘুরে ফিরে তার উপরেই ঘুরঘুর করে। চিত্রা না পারে সইতে আর না পারে কিছু বলতে৷
ঘটনা সেখানেই স্থগিত নয়। ওটা ছিল শিরোনাম। বিস্তারিত এখনও বাকি আছে। দেখতে দেখতে ঈদ চলে আসে। যথারীতি ভীষণ মন খারাপ ছিলো চিত্রার। গ্রামের কোলাহল ছেড়ে শহরের দমবন্ধকর নির্জীবতা সহ্য হচ্ছিল না ওর। ঈদের দিনে আশরাফ সাহেবের দেওয়া আনারকলি পড়ে নাফিমকে নিয়ে ছুটোছুটি করছিল সারা বাড়ি জুড়ে। এ ছাড়া আর করারই বা কী আছে?
সকালে নামাজ পড়তে গিয়ে আর বাড়ি ফিরেনি নাওয়াফ। চিত্রার অবশ্য তাতে বিশেষ কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না তবে তার শাশুড়ির কঠিন রেগে ছিলেন। সকালে উঠে নাওয়াফকে সেমাই দেওয়া হয়নি কেনো এটা নিয়ে পরক্ষ ভাবে দু’বার কথা ও শুনিয়েছেন চিত্রাকে। চিত্রা গায়ে মাখেনি সেসব৷ মা বলে কাছে থাকতে, ছেলে বলে দূরে যেতে। চিত্রা কী করবে?

এসবের মধ্যে নাওয়াফ ঘরে ঢুকে। তার আউটফিট দেখে টাস্কি খেয়ে যায় চিত্রা। আসা থেকে ফর্মাল আর ক্যাজুয়াল গেটআপে নাওয়াফকে দেখেছে ও৷ তাই হুট করে পাঞ্জাবিতে দেখে খানিকটা ভড়কে গেছিল।নাওয়াফ বয়স চোরা৷ ওর হাইট, বডি আর স্কিন এত বেশি পার্ফেক্ট যে সঠিক বয়সটা অনুমান করা যায় না।
নাওয়াফ এগিয়ে আসলে চিত্রার হুঁশ ফিরে। তার হাত ভর্তি ছিলো নানান শপিং ব্যাগে। বাড়ি ফিরে একে একে সব গুলো তার মা বাবা নাফিমকে বুঝিয়ে দিয়ে সব থেকে বড় প্যাকেটটা চিত্রার হাতে দেয় এবং তার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
–” ঘরে গিয়ে দেখো কী আছে। সেমাই বানাতে পারো?
এই প্রথম এত স্বাভাবিক সুরে, চিত্রার সাথে কথা বলছে নাওয়াফ। চিত্রা হতভম্ব মুখে চেয়ে বলে,
–” জি পারি।
নাওয়াফ শান্ত গলায় বলে,
–” রেডি হয়ে রান্না ঘরে গিয়ে সেমাই, নুডলস আর স্যান্ডুইচ বানাও। বাসায় গেস্ট আসবে। কোয়ান্টিটি সেরকমই রেখো।
চিত্রা চেপে রাখা শ্বাসটা ফেলে ধীর গলায় বলে,
–” আচ্ছা।

আজকে কেউই আসেনি। বাসায় কাজের মহিলা বলতে চিত্রাই আছে। এজন্যই তাকে বলা হয়েছে ওসব। নয়তো দ্যা গ্রেটেস্ট নাওয়াফ শিকদার তার সাথে নরম সুরে কথা বলবে? এ-ও পসিবল? হুহ্, এসব ডে ড্রিমিং করে না চিত্রা। বয়স অল্প হলেও সময়ের কষাঘাতের ফলস্বরূপ মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা ধারাটা যথেষ্ট পোক্ত।
ঘরে ঢুকে শপিং ব্যাগটা খুলতেই চোখ চড়কগাছ হয়ে যায় চিত্রার। মস্তিষ্কের চিন্তাধারা উল্টেপাল্টে যায় রীতিমতো। শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে বের হয় কারচুপি ওয়ার্ক করা পিওর মসলিন শাড়ি আর একটা নতুন একহাজার টাকা নোটের বান্ডিল। টাকাটা যে তার ঈদি সেটা স্পষ্ট করে লেখা ছিল উপরে।
চিত্রা এতটাই অবাক হয় যে রিয়েকশন দিতে ভুলে যায়। বাইরে থেকে নাফিমের চিল্লাচিল্লি শুনে হুঁশ ফেরে তার। অযথা নাওয়াফকে রাগাতে চায় না ও তাই আনাকরলি ছেড়ে ওয়াইন কালারের মসলিন শাড়িটা গায়ে জড়ায়। তার শ্যামলা বরণে শাড়িটা জ্বল জ্বল করে ফুটে ওঠে। চিত্রা তার বিশাল লম্বা চুল গুলো আধ খোঁপা করে। ফলস্বরূপ চুলগুলো কোমর অব্দিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।
খুব বেশি একটা সাজগোছ করার সুযোগ পায়নি চিত্রা। নাফিম পাগল হয়ে উঠেছে তাকে না পেয়ে। বাধ্য হয়ে চটজলদি একটা স্টোনের টিপ কপালের মাঝ বরাবর লাগিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে চিত্রা। ড্রয়িংরুমে বসে ছিল সবাই। ও বেরোতেই সবার নজর আটকায়। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে সকলে৷ নাফিম তো হা করে চেয়ে থাকে মায়ের দিকে৷ বাবার হাতের প্যাঁচ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে আসে চিত্রার কাছে। আধোআধো বুলিতে বলে,

–” কী তুন্দল!
ছোট্ট কথাটাই ভীষণ খুশি হয়ে যায় চিত্রা। সামান্য ঝুঁকে নাফিমকে কোলে তুলে বলে,
–” তাই নাকি বাবা? আর কেমন লাগছে আমাকে?
চিত্রার কোলে উঠতে পেরে ভীষণ খুশি হয় নাফিম। তার গলা জড়িয়ে ধরে গালে ছোট্ট পাপ্পি দিয়ে বলে,
–” মায়া মায়া লাগচেএএএ
মায়াবতী শব্দটা উচ্চারণ করা খুব কঠিন তার নিকট। তাই সংক্ষেপে বলেছে কিন্তু মানেটা বুঝতে বিন্দু মাত্র কষ্ট হয়নি চিত্রার। সে ছেলেকে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বিভিন্ন রকমের খুনসুটিতে মেতে উঠে। পেছন থেকে সকলেই দেখে তাদের। এই প্রথম নাজনীন বেগম প্রতিহিংসা ভুলে পরক্ষ ভাবে বিচার করেন চিত্রাকে৷ আশরাফ সাহেব তো খুশি মনে দেখছিলেন দু’জনকে। আর নাওয়াফ? তার দৃষ্টির ভাষা বোঝা বড় দায়৷
আড্ডায় গল্পে বেশ খানিকটা সময় কাটলো। জরুরি কাজ থাকায় নাজনীন বেগম এবং আশরাফ সাহেব চলে আসেন নিজ ফ্ল্যাটে। এই সুযোগেরই বোধহয় অপেক্ষা করছিল নাওয়াফ। সবাই বেরিয়ে যেতেই সে ধীর পায়ে উঠে রান্নাঘরে যায়। এটা তার নেওয়া সব চেয়ে সুন্দর সিধান্ত ছিলো। রান্নাঘরে যেতেই ভীষণ সুন্দর এক দৃশ্যের সাথে পরিচয় ঘটে তার৷

কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে রান্না করছে চিত্রা৷ ছোটো মানুষ হলেও ভীষণ গুছিয়ে কাজ করে মেয়েটা। পুরোদস্তুর পাকা গিন্নি। এমনটাই মনে হলো নাওয়াফের। নুডলস এর জন্য পেঁয়াজ ভাজতে দিয়ে ফাঁকে ফাঁকে ছোট্ট নাফিমকে পরোটা খাওয়াচ্ছিল চিত্রা। এমন সময় আচমকা ফুটন্ত তেল ছিটকে এসে তার কোমরের কাছটায় পড়ে। বেচারি আর্তনাদ করে উঠে তৎক্ষণাৎ।
নাফিম ঘাবড়ে যায়। নাওয়াফ চটজলদি এগিয়ে এসে ফ্রিজ খুলে আইস কিউব বের করে। চিত্রা তো আর্তনাদ করেই চুপ। ভেতরে ভেতরে ছটফট করলেও প্রকাশ করতে পারছে না। চোখে জল জমে গেছে মেয়েটার৷ নাওয়াফ এগিয়ে এসে গ্যাসটা বন্ধ করে আইস কিউব ওর হাতে দিয়ে বলে,

–” ক্ষতস্থানে দাও।
চিত্রা সাহস করে একবার দিলেও পরে আর দেয় না৷ চুপচাপ হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মরিচের মতো জ্বলছে জায়গাটা। নাওয়াফ বুঝতে পারে সেটা তাই নাফিমকে বলে,
–” দিদুনের কাছ থেকে পেস্ট নিয়ে আসো তো বাবা৷
নাফিম দিগ্বিদিক ভুলে দৌড় দেয়। এই সুযোগে চিত্রার কাছে এসে দাঁড়ায় নাওয়াফ৷ চিত্রা তো ভয় পেয়ে সরে যায়। নাওয়াফ কী আর থামার বান্দা? একদমই না। কোনোরূপ ভনিতা ছাড়াই পেছনের দেওয়ালের সাথে চিত্রাকে আঁটকে দেয় নাওয়াফ। এক হাতে চিত্রার দু-হাত বন্দী করে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে৷ ফলস্বরূপ কোমরের কাছকার শাড়ি সরে উন্মুক্ত হয়ে যায় পুরো উদর৷ চিত্রা লজ্জায় খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেলে চোখমুখ। নাওয়াফ শান্ত দৃষ্টিতে সেটা দেখে অন্য হাতে থাকা আইস কিউব চেপে ধরে চিত্রার ক্ষতস্থানে।
সাথে সাথেই আর্তনাদ করে চোখ মেলে তাকায় চিত্রা। নাওয়াফ তখনও তার মুখের দিকেই চেয়ে ছিল। ভীষণ লজ্জাজনক আর দমবন্ধকর পরিস্থিতি। আচমকা নাওয়াফের এতটা সান্নিধ্যে এসে মেয়েটা হতভম্ব হয়ে চুপসে গেছিলো৷ পুরোপুরি আঁটকে গেছিলো এক গোলকধাঁধায়। ওভাবেই পার হয় আরও মিনিট দশেক।
নাফিমের পায়ের আওয়াজ শোনা গেলে নাওয়াফ ছেড়ে দেয় ওকে। নাফিমের সাথে নাজনীন বেগমও এসেছিলেন। রান্নাঘরে নাওয়াফ আর চিত্রাকে এক সাথে দেখে ভাবনায় পড়ে যান উনি। তবে সেটা প্রকাশ করেননি। চুপসে যাওয়া চিত্রার কাছে এসে নরম গলায় বলেন,

–” যেখানটায় পুড়েছে সেখানে অল্প করে পেস্ট দাও৷ জ্বলন কমে যাবে। আর রান্না করতে হবে না তোমায়। বাকিটা আমি দেখছি।
চিত্রা তখন কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলো না। সে চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে চলে আসে। এরপর সময় গুলো যায় আরও দ্রুত। সেদিনকার পর চিত্রা ভীষণ চুপচাপ হয়ে পড়ে। নাওয়াফ অবশ্য আগেরই মতো থাকে। তবে তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমে কিছুটা।
এখন আর আলাদা বেডে ঘুমায় না নাওয়াফ। বিভিন্ন ছুতো দেখিয়ে বিছানায় নিজের ভাগের জায়গাটা দখল করেছে ও। চিত্রার আপত্তি থাকলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। নাওয়াফ কখনো বাউন্ডারি ক্রস করেনি বরং আগের মতোই থেকেছে কিন্তু চিত্রা সন্দিহান। তার একবার মনে হয় নাওয়াফ ফল করে গেছে। আরেকবার মনে হয় নাওয়াফ স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে এসব করছে৷

সময় প্রমাণ করে দেয় চিত্রার দ্বিতীয় ভাবনাটাই সঠিক। নাওয়াফ স্রেফ স্বাভাবিকতা বজায় রাখছিল৷ তবে এই উপলব্ধিটা খুব একটা স্বস্তি দেয় না চিত্রাকে। ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় তার। কেনো হয় জানা নেই তবে চিত্রা আরও গুটিয়ে যায় সেদিনের পর থেকে। মোটামুটি আরও একসপ্তাহ পার হয়৷
এই দিনগুলো জাহান্নামের মতো কেটেছে চিত্রার৷ ওই এক ব্যপার কোনোভাবেই মাথা থেকে বের করতে পারেনি ও৷ নানান ধরনের ইনসিকিউরিটি ওকে শেষ করে দিতে থাকে ভেতরে ভেতরে।
সামনে এডমিশন। একেই পড়াশোনার চাপ অন্য দিকে মানসিক অশান্তি। দুই মিলিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চিত্রার। নাফিমটা হয়েছে এক্সট্রা আহ্লাদী। সবকিছুতে মা কে চাই তার।
জটিল কিছু ম্যাথ সলভ করতে বসেছিল চিত্রা। এমনিতেই মক টেস্টের রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় মেজাজ বিগড়ে ছিলো তার উপর হয়েছে পিরিয়ড। যন্ত্রণায় জান আসে যায় চিত্রার। এরমধ্যে নাফিম তার আঁচল ধরে টানাটানি করে বলে কানামাছি খেলার জন্য। চিত্রা ভালোভাবে নিষেধ করার পরও এক জেদ তার। লাস্টে যখন চিত্রা না শোনার ভান ধরে পড়তে লাগে তখন তার ক্যালকুলেটর ছিনিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে নাফিম।
হুট করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে চিত্রা। না চাইতেও ভীষণ জোরে ধমকে উঠে ও নাফিমকে। ঠিক তখুনি ঘরে ঢুকে নাওয়াফ। এরকম একটা দৃশ্য দেখে কিয়ৎকাল চেয়ে থাকে ও চিত্রার দিকে। নাফিম যখন ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে চায় তখন অপরাধবোধে দুমড়ে মুচড়ে যায় চিত্রার অন্তঃকরণ। সে হাত বাড়িয়ে নাফিমকে কোলে নিতে গেলে, ছোঁ মেরে তাকে ছিনিয়ে নেয় নাওয়াফ৷

বাবার বুকে গিয়ে সেই কী কান্না নাফিমের। কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো শব্দ করে কেঁদে উঠে বাচ্চাটা। চিত্রার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠে। ও ওইভাবে বলতে চায়নি। কীভাবে যেনো হয়ে গেছে। নাওয়াফ একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। ছেলেকে শান্ত করতে বাইরে বেরিয়ে যায়। পুরো ফ্ল্যাটটাই রয়ে যায় কেবল চিত্রা।
বেচারি হতাশাগ্রস্ত হয়ে ধপ করে বসে পড়ে ফ্লোরে৷ কীভাবে কী হয়ে গেছে নিজেও বুঝতে পারছে না ও তবে এতটুকু বুঝে গেছে, নাওয়াফ আর তাকে মিশতে দিবে না নাফিমের সাথে। যতটুকু সহজ হয়েছিল তার থেকেও বেশি কঠিন হয়ে উঠবে এখন৷
চিত্রা বুঝে না, সব অলক্ষুণে কাজকর্ম তার সাথেই কেনো হয়? এতটা অপয়া কেনো সে? আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা দেবে ও? কেউ কী কখনোই বুঝবে না ওকে? কারও কী একটুও দয়ামায়া হবে না তার জন্য? আর পারছে না ও। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেছে এবার৷

রাত একটার দিকে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরে নাওয়াফ। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে বাচ্চাটা। চোখমুখ ফুলে ফেঁপে লাল হয়ে আছে। পরনের পরিচ্ছদটা এলোমেলো। তার হাত ভর্তি খেলনা আর চকলেট। নাওয়াফ ঘরে ঢুকতেই চিত্রা এগিয়ে যায়। সব জড়তা ভুলে অনুরোধের গলায় বলে,
–” একটু কোলে নিই ওকে? আমি শুইয়ে দিবনি। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন৷
নাওয়াফ শোনে না তার কথা। নাফিমকে বিছানার মিডল বরাবর শুইয়ে দিয়ে ধীর গলায় বলে,
–” বহু কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি। এখন আর জাগিয়ো না ওকে। কাল থেকে স্কুল আছে। এখন অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে সমস্যা হবে৷
ভীষণ গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলে শাওয়ারে যায় নাওয়াফ। চিত্রা বুঝে যায় তার ধারণাই সঠিক৷ ছলে বলে কৌশলে নাফিমকে আলাদা করতে চাইছে নাওয়াফ। সাথে সাথেই হাহাকারে ছেয়ে যায় চিত্রার বুকের ভেতরটা। আর পারছে না ও৷ নাওয়াফ নিষেধ করা সত্ত্বেও নাফিমের পাশে শুয়ে বাচ্চাটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নেয় চিত্রা। পরপর কয়েকটা চুমু খায় তার কপালে৷ ওকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে হু হু করে কেঁদে উঠে অথচ তখনও বুঝে উঠতে পারে না এই ভয়টাই সত্যি হতে যাচ্ছে অচিরে৷
প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে শাওয়ার নেয় নাওয়াফ৷ এরমধ্যে নাফিমকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে চিত্রা। দৃশ্যটা দেখে অন্যদিন শান্ত থাকলেও আজকে চুপ রইল না নাওয়াফ। বেডে এসে খুব সাবধানতার সাথে নাফিমকে নিজের বুকের উপর নিয়ে আসলো। চিত্রা টের পেলেও চোখ খুলল না। এই অপমান সহ্য করার মতো নয়। তবুও নিরবে সয়ে গেল৷ তার বন্ধ চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল উষ্ণ জল।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল চিত্রার। উঠে বসতেই দেখল, বিশাল আয়োজন চলছে। বেডের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নাফিমের জামাকাপড়। একপাশে স্কুলের ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে বসে আছে নাফিম। চিত্রা হতভম্ব মুখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরক্ষণে তার মনে পড়ে, আজকে তো স্কুলে যাওয়ার কথা নাফিমের। সে হুড়মুড়িয়ে উঠে নাফিমের কাছে যায়। সাথে সাথেই বাচ্চাটা অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
চিত্রা তাকে আদর করে দিতে দিতে বলে,
–” আম স্যরি বাবা। ভুল হয়ে গেছে মাম্মার। মাফ করে দাও প্লিজ৷
নাফিম তো জন্মের ত্যাড়া। সে-ও পাল্টা উত্তরে বলে,

–” নুউউউ।
বলেই দৌড়ে নাওয়াফের কাছে যায়। চিত্রা ওখানে যেতে নিলে নাওয়াফ শান্ত গলায় বলে,
–” রেডি হয়ে নাও। নাফিমকে সি অফ করতে যাব আমরা।
চিত্রা থেমে যায় তৎক্ষনাৎ। বুঝতে পারে, নাওয়াফ থাকলে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারবে না ও। এই ব্যাটা বাড়ির বাইরে গেলেই সুযোগ বুঝে নাফিমকে বাগে আনতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। অযথা আর এনার্জি ওয়েস্ট করে না চিত্রা। চুপচাপ যায় রেডি হতে।
শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে দেখে এলাহি কান্ড। পুরো পরিবার উপস্থিত হয়েছে ড্রয়িং রুমে। লাগেজ সহ নাফিমকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাওয়াফ। চিত্রার অবাক লাগে ভীষণ। না চাইতেও সে জিজ্ঞেসা করে বসে,
–” লাগেজ কেনো?
নাওয়াফ এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

–” নাফিমকে হোস্টেলে দেওয়ার সিধান্ত নিয়েছি আমি। শুরুতে একটু কষ্ট হবে জানি তবে ব্যপার না৷ প্রতি সপ্তাহে ওকে গিয়ে দেখে আসব আমি৷
চিত্রা এতটাই অবাক হয় যে কথা বলতে ভুলে যায় ও। নাজনীন বেগম তখনও কেঁদে যাচ্ছেন নাতিকে বুকে জড়িয়ে। আশরাফ সাহেবের চোখমুখ শক্ত। নাওয়াফ তাদের তাড়া দিয়ে বলে,
–” বাস মিস হয়ে যাবে। ছাড়ো ওকে..
চিত্রা শুনে না সে কথা। হতভম্ব মুখে বলে,
–” মাথা ঠিক আছে আপনার? এইটুকু বাচ্চা কীভাবে থাকবে ওখানে? ওর সবকিছু আমার করিয়ে দেওয়া লাগে সেখানে..
নাওয়াফ তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কঠোর গলায় বলে,
–” তার জন্য কৃতজ্ঞতা। আর কিছু করা লাগবে না তোমার। ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না৷ এটাও তেমনই কিছু। ওখানে প্রত্যেক বাচ্চাকে সামলানোর জন্য আলাদা টিচার আছে। নাফিম যথেষ্ট শান্ত। আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।
নাওয়াফের এমন সিধান্তের কারণ যে গত কালের ঘটনা সেটা বুঝতে আর বাকি থাকে না চিত্রার৷ কী বলবে সেটাও ভেবে পায় না ও। সবার থেকে বিদায় নিয়ে নাফিমকে কোলে তুলে লিফটের দিকে এগিয়ে যায় নাওয়াফ। চিত্রা কিছুই বলে না কেবল মূর্তির মতো ফলো করতে থাকে। শেষমুহুর্ত টুকু হারাতে চায় না ও।
দেখতে দেখতে বাস স্টপেজের কাছে পৌঁছে যায় ওরা। অন্যান্য মা বাবারাও এসেছেন তাদের বাচ্চাদের সী অফ করতে। নাওয়াফ যখন নাফিমের ব্যাগপত্র নামাতে শুরু করে তখন নাফিমকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসে চিত্রা। ছলছল চোখে চেয়ে বলে,

–” আমি একশ হাত দূরে থকব ওর থেকে তবুও আমার বাচ্চাটাকে পাঠায়েন না ওই নরকে। অতি যত্নে বেড়ে ওঠা রত্ন ও। চোখের আড়াল হলেই সর্বনাশ নিশ্চিত।
নাওয়াফ শুনল না সে কথা। চিত্রাকে এড়িয়ে নাফিম এর জিনিসপত্র গুলো বাসে তুলে দিল৷ এরপর ছেলে কে ডাকল। এতক্ষণ রাগ করে থাকলেও মা কে কাঁদতে দেখে সব অভিমান হাওয়া হয়ে যায় নাফিমের। তাই যাবে না বলে শক্ত হাতে খামচে ধরে চিত্রার ওড়না৷
নাওয়াফ বাধ্য হয়ে জোর করে ছাড়িয়ে আনে তাকে। চিত্রা হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে৷ নাওয়াফেরও খারাপ লাগছিল৷ মনটা কু গাইছিল তবে সন্তানের ভালো চাইলে একটু তো কঠোর হতেই হবে। কষ্ট না করলে কী কেষ্ট মিলে?
নাফিম কান্নাকাটি করা সত্ত্বেও তাকে বাসে তুলে দেয় নাওয়াফ। চিত্রা নিজেও ছাড়তে চাইছিল না ওকে তাই দু’দিকেই সামলাতে হয় তাকে। চিত্রাকে ছাড়িয়ে এনে জোরপূর্বক গাড়িতে বসায়৷ নাফিম তখনও গলা ছেড়ে কেঁদে কেঁদে ডাকছিল তাদের৷ নাওয়াফ সাড়া দেয় না উল্টো শক্ত করে চেপে ধরে রাখে চিত্রাকে অতঃপর গাড়ি ঘুরিয়ে রওনা দেয় বাড়ির দিকে। মেয়েটা দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল কিন্তু পাথর কঠিন নাওয়াফ তাতে গলার মানুষ নয়।
একটা সময় নিশ্চুপ হয়ে যায় চিত্রা। ভাবখানা এমন যেনো নাফিমের শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে ও। নাওয়াফ ওর দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিলে পুনরায় নাফিমকে ফিরিয়ে আনার আবদার করতে থাকে চিত্রা। এপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে এক ধমক দেয় নাওয়াফ৷ আজ দমানো যায় না চিত্রাকে৷ সে-ও পাল্টা উত্তরে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলে,

উপসংহারে তুমি পর্ব ৮

–” যেদিন সন্তান হারাবেন সেদিন টের পাবেন তার মর্ম। থাকতে আর ক’জন বুঝে?
সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা বোঝা বড় দায়। পোড়াকপালির কথাগুলো কীভাবে যেন মিলে যায় আজ৷ মাত্র ঘরে ফিরে রিল্যাক্সে বসেছিল নাওয়াফ। এমন সময় হুট করে কল আসে তার ফোনে৷ রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশের জন ভীষণ হুড়োহুড়ি করে আতংকের সহিত বলে,
–” সর্বনাশ হয়ে গেছে স্যার। স্কুল বাসে বোমা ছিল৷ দ্বিতীয় স্টপেজে গিয়ে থামতেই ব্লাস্ট হয়ে যায় সেটা। কাউকে বাঁচানো যায়নি। জলদি আসেন আপনি।

উপসংহারে তুমি পর্ব ১০