Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪৩

এই অবেলায় পর্ব ৪৩

এই অবেলায় পর্ব ৪৩
সুমনা সাথী

কিছুক্ষণ তীব্র গতিতে চলার পর ওরা এসে পৌঁছাল একটা বিশাল মেলার মাঠের সামনে। শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। একটা বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে বসেছে এই মেলা। বাইকটা একপাশে স্ট্যান্ড করিয়ে কলরব পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে একটা কল করল। নিযানা তখন মুগ্ধ চোখে মেলার বিশাল প্রবেশদ্বারটার দিকে তাকিয়ে আছে। রঙিন মরিচ বাতি আর তাজা ফুলের স্তবক দিয়ে কী চমৎকার করেই না সাজানো হয়েছে চারপাশটা! মেলার ভেতর থেকে ভেসে আসছে চেনা-অচেনা গানের সুর আর মানুষের কলরব। সে গভীর আগ্রহে মেলার রূপ দেখছিল। এমন সময় ভেতর থেকে দুমদুম পা ফেলে বেরিয়ে এলো অনন্ত আর শান্ত। কলরবকে দেখেই ওদের চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শান্ত তো এক প্রকার ছুটে এসেই কলরবকে বুকে জড়িয়ে ধরল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল,
“ভাই! আমি তো ভাবতেই পারিনি যে তুই সত্যিই আজ আসবি! একদম এক্সপেক্ট করিনি রে ভাই। এবার কিন্তু শো পুরো জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। সবাই যে কী লেভেলের সারপ্রাইজড হবে তুই ধারণাও করতে পারছিস না!”

নিযানা বিস্ময় নিয়ে ওদের এই কথোপকথন শুনছিল। হঠাৎ করে কী হচ্ছে তার কিছুই ওর মাথায় ঢুকছে না। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের শো? কলরব?”
কলরব অবশ্য কোনো স্পষ্ট উত্তর দিল না। সে নিযানার ডান হাতটা আলতো করে নিজের শক্ত মুঠোয় পুরল। তারপর মেলা প্রাঙ্গণের ভেতরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
“গেলেই দেখতে পাবি। চল আমার সাথে।”

মেলার ভেতরটা লোকারণ্য। উৎসবের এক তুমুল হুল্লোড় আর উন্মাদনা চারিপাশে। সেই উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে নিযানার হাতটা হাতছাড়া হতে দিল না কলরব। শক্ত করে আগলে নিয়ে এগোতে লাগল। নিযানা চারপাশের এই চোখধাঁধানো আলো আর জমকালো আয়োজন দেখে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। সারি সারি কাঁচের চুড়ি, রকমারি দুল, ঝিলমিলে গলার হার। কত কী যে সাজানো রয়েছে দোকানগুলোতে! মাথার ওপর রঙিন আলোর রোশনাই। একটু দূরেই মস্ত বড় এক নাগরদোলা আকাশ ছুঁয়ে ঘুরছে। তার ঠিক পাশেই খুদেদের খেলনা রেলগাড়ি ঝকঝক শব্দে মেতে উঠেছে আপন ছন্দে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা সেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো মেলার ঠিক মাঝখানে থাকা এক বিশাল ওপেন-এয়ার স্টেজের সামনে। সেখানে তখন মাইকের চড়া আওয়াজে এক শিল্পী দরাজ গলায় গান গাইছেন। স্টেজের সামনের বিস্তীর্ণ চত্বর জুড়ে শত শত চেয়ার পাতা। আর তার প্রতিটিই দর্শকে ঠাসা। চারিদিকের করতালিতে উন্মাদনা তখন চরমে। কলরব সেখানে এসে থমকে দাঁড়াল। তারপর শান্তর দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“নিযানাকে ভালো দেখে কোথাও একটা বসানোর ব্যবস্থা কর তো।”

শান্ত চটপট উত্তর দিল, “আরে ভাই, কোনো সমস্যাই নেই। একদম সামনের সারির দিকে বসিয়ে দেব।”
“না, তুই না। অনন্ত, তুই ভালো একটা সেফ জায়গায় বসিয়ে দে। শান্ত, তুই আমার সাথে ব্যাকস্টেজে চল।”
কলরব বলল। নিযানা অবাক চোখে কলরবের পানে চাইল। তার চোখমুখের বিষণ্ণতা কেটে গিয়ে এখন এক রাশ অভিমান জমা হয়েছে। সে ঠোঁট উল্টে বলল,
“আমরা মেলা ঘুরতে আসিনি? আমাকে এখানে একা বসিয়ে রেখে তোমরা কোথায় যাচ্ছো? আমি কিন্তু এসব গানটান শুনতে একটুও আগ্রহী নই।”
কলরব সেই অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। ওঁর মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“কিছুক্ষণ বোস। আমি একটু পরেই আসছি। ওখান থেকে ফিরেই তোকে পুরো মেলা ঘুরিয়ে দেখাব।”
নিযানা আর দ্বিরুক্তি না করে অগত্যা মাথা নাড়ল। অনন্ত ওদিকের সিটগুলো দেখতে গিয়েছিল। সে ফিরে আসতেই কলরব আবারও নিযানার হাতটা ধরে টেনে নিয়ে একটা সামনের চেয়ারে বসাল। অতঃপর নিযানার দিকে এক পলক চেয়ে শান্তর সাথে দ্রুত ব্যাকস্টেজের দিকে চলে গেল। নিযানা চেয়ারটায় বসল ঠিকই কিন্তু তার মন পড়ে রইল কলরবের দিকে। চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে অস্থিরতায় চারিদিকের অচেনা মানুষের কোলাহল আর স্টেজের আলো-আঁধারির দিকে তাকাতে লাগল। এর মধ্যেই মঞ্চের সঞ্চালক মাইক হাতে চড়া গলায় ঘোষণা দিলেন,

“কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চে আসছে ‘কে টি’ (KT) এবং তার পুরো টিম!”
ঘোষণাটি শোনামাত্রই যেন পুরো মেলা প্রাঙ্গণে এক তুমুল হইহই শুরু হয়ে গেল। দর্শকদের মাঝে উন্মাদনার জোয়ার বয়ে গেল। নিযানা অবাক হয়ে চারিদিকের মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেজের রঙিন আলোর রোশনাই ছাপিয়ে পাঁচজন কালো মুখোশ পরিহিত যুবক এসে মঞ্চে দাঁড়াল। নিযানা স্টেজটার দিকে তাকিয়ে একদম হতভম্ব হয়ে গেল! চোখের চশমাটা আরেকটু ভালো করে চেপে ধরল সে। এই পাঁচজনকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। এরা আর কেউ নয়। কলরব, অভিক, অনন্ত, শান্ত সাথে নাম না জানা আরেকজন! আশ্চর্য! এরা এখানে গান গাইবে নাকি? নিযানার বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই স্টেজে গিটারের তারে আঙুল বুলাল কলরব। তারপর মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে দরাজ গলায় চট্টগ্রামের চেনা আঞ্চলিক সুরে গাইতে শুরু করল,

“তুই হইলা আঁর মধুর বাঁশি মনেরই আশা
তোঁয়ারে ছাড়া খোয়ানডে ফাইয়ুম ভালবাসা
সুন্দর সুন্দর গান শুনাইয়ুম—
সুন্দর সুন্দর গান শুনাইয়ুম
নিশিত জাগিয়ারে, ও ন’নাইরে
কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে…”
পুরো মেলার মাঠ যেন কলরবের কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে আছে। চারিদিকে করতালির ধুম লেগেছে। একটা গান শেষ হতেই নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এইসব পাগলামি করে বেড়ায় এই ছেলে! ঠিক তখনই তার পেছনের চেয়ারে বসা দুইজন নারী দর্শকের ফিসফিসানি কানে এলো ওর। একজন উচ্ছ্বসিত হয়ে অন্যজনকে বলছে,

“ভাই! ‘কে টি’ আসবে আমি তো ভাবতেই পারিনি। আমি জানতাম সে এক্সিডেন্ট করে অসুস্থ। তাই আজকের শো-তে আসবে না। কিন্তু ভাই দেখ। আগে তাও সে শুধু মুখে একটা কালো মুখোশ পরত। আজকে আবার মাথার ওপর ওই ক্যাপটা পরেছে কেন রে? মুখ ও দেখিনা৷ এখন মাথাও না।”
নিযানা চট করে পেছনের দিকে তাকাল। তার ঠিক পেছনের সারিতে বসা দুটো মেয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। পোশাক-আশাকে স্পষ্ট বোঝা যায় তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। প্রথম মেয়েটার কথার প্রত্যুত্তরে দ্বিতীয় মেয়েটা আফসোসের সুরে বলল,
“আরে তুই জানিস না? শুনেছিলাম ও নাকি মাথায় ভীষণ চোট পেয়েছিল। ইশ! ওর ওই অত সুন্দর চুলগুলো বোধহয় চিকিৎসার জন্য কেটে ফেলতে হয়েছে। সেই জন্য হয়তো আজ মাথার ওপর ক্যাপটা পরেএসেছে।”
মেয়ে দুটোর কথা শুনে নিযানা সত্যি সত্যি আরো অবাক হলো। কলরবের এক্সিডেন্টের কথা এরাও জানে! কিন্তু কীভাবে? কলরবকে এতটা চেনে কী করে? নিযানার ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিয়ে এর মধ্যেই স্টেজে কলরবের দ্বিতীয় গান শুরু হলো। দর্শকদের মাঝখান থেকে জোর রিকোয়েস্ট আসায় সঞ্চালক নিজেই এই গানটা গাওয়ার জন্য অনুনয় করেছিলেন। এটা নাকি এই ব্যান্ডের সিগনেচার গান। কলরব মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ড থেকে খুলে নিয়ে একটু ঝুঁকে গাইতে শুরু করল,

“নাইরে….নাইরে….নাইরে….নাই
নিশ্বাসের কোনো বিশ্বাস নাই৷
রাস্তা বড় ছোট। ধীরে ধীরে হাঁটো
রাস্তা বড় ছোট। বুঝে শুনে গুনে গুনে,
পা ফেলো তাই। পরাণ পাখি
দেবে ফাঁকি পিছলে গেলে ভাই।
নাইরে….নাইরে….নাইরে…. নাই,
নিশ্বাসের কোনো বিশ্বাস নাই৷”
গানের শেষ লাইনের সাথে সাথে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ করতালি আর চিৎকারে ফেটে পড়ল। চারিদিকে এক হইহই রইরই ব্যাপার। তবে গান শেষ করেই কলরব আর স্টেজে দাঁড়াল না। মাইক্রোফোনটা অভিকের হাতে দিয়ে দ্রুত স্টেজ থেকে নেমে গেল। দর্শকরা অনবরত চিৎকার করে রিকোয়েস্ট করছিল তাকে আরেকটু সময় থাকার জন্য কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। এখন মঞ্চ সামলাচ্ছে অভিক। সে-ও অসম্ভব সুন্দর গায়। এদিকে নিযানা তখনো বিস্ময়ে একেবারে বিমূঢ় হয়ে বসে আছে। কলরব যে কখন ভিড় ঠেলে এসে ঠিক ওর সামনে দাঁড়িয়েছে সে টেরও পায়নি। কলরব প্রথমে একবার নিচু স্বরে ওকে ডাকল কিন্তু নিযানা খেয়াল করল না। ওর এমন ঘোরলাগা আনমনা ভাব দেখে কলরব মনে মনে বেশ মজা পেল। সে নিযানার কাঁধে আলতো একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

“কী হয়েছে তোর? এভাবে স্ট্যাচু হয়ে আছিস কেন?”
নিযানা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে হড়বড় করে বলে উঠল,
“তু… তুমি কলরব? এই ‘কে. টি’ আসলে তুমি?”
ওর গলার স্বর কিছুটা চড়া হওয়ায় পেছনের সেই মেয়ে দুটো বোধহয় কথার আংশিক শুনতে পেল। তারা বেশ কৌতূহলী হয়ে ঘুরে তাকাল নিযানার দিকে। কলরব পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিজের মাথার ক্যাপটা টেনে মুখটা আরও কিছুটা আড়াল করে নিল। তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিযানার একটা হাত শক্ত করে ধরে ওখান থেকে দ্রুত টেনে নিয়ে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসলো। মেলায় তুলনামূলক একটা নির্জন জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে কলরব। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তারপর নিযানার দিকে তাকিয়ে চোখ বলল,
“তুই আসলেই একটা আস্ত বলদ! ওভাবে সবার সামনে কেউ ওই নাম ধরে চিল্লে ওঠে?”
নিযানা নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “তুমি এসব কথা আমার কাছে আগে কেন গোপন করেছ, হ্যাঁ? এসব গানের দল, শো। এসব কবে থেকে চলছে তোমার? তুমি কি আরও বিভিন্ন জায়গায় এভাবে শো করো? কিন্তু মেলা কমিটির লোক তোমাকে টাকা দিয়ে ভাড়া কেন করবে? তুমি তো তেমন বিখ্যাত কেউ নও!”
কলরব নিযানার একনাগাড়ে করা প্রশ্নের বহর দেখে হেসেই ফেলল। নিজের হাত দুটো তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে বলল,

“আস্তে, দয়া করে একটু থাম। একটু দম নিয়ে নে আগে। চল, কিছু খেতে খেতে কথা বলা যাক। স্টেজে অতক্ষণ চিল্লাপাল্লা করে আমার তেষ্টা পেয়েছে। ফুচকা খাবি?”
নিযানা ঠোঁট উল্টে ঝট করে মাথা নাড়ল, “নাহ! না আমি এসব ফুচকা-টুচকা একদম খাই না। অস্বাস্থ্যকর!”
কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিযানার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“খাইছিস কোনোদিন? না খেয়েই বুঝে গেলি কোনটা স্বাস্থ্যকর আর কোনটা অস্বাস্থ্যকর! আমি তো প্রায়ই খাই। কই আমি কি মরে গেছি?”
নিযানাকে আর কোনো প্রত্যুত্তর করার সুযোগ দিল না সে। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে মেলা প্রাঙ্গণের এক কোণে থাকা একটা ফুচকার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানের একপাশে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা টেবিল পাতা আছে। জায়গাটা তুলনামূলক ফাঁকা আর ভিড়ও কম। কলরব নিযানাকে টেনে একটা চেয়ারে বসাল। নিজে বসল মুখোমুখি। ফুচকা অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেট সাজিয়ে দিয়ে গেল দোকানদার। নিযানা চোখমুখ কুঁচকে বসে আছে। কলরব একটা ফুচকা তুলে টক জল দিয়ে নিযানার মুখের সামনে ধরল। ধমকের সুরে বলল,

“হা কর তো! আরে, খেয়ে দেখ। মরবি না।”
নিযানা অগত্যা মুখটা সামান্য হা করে ফুচকাটা মুখে পুরে নিল। কলরব অবশ্য ওর ভালো লাগা বা মন্দ লাগার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করল না৷ সে নিজে প্লেট থেকে গপগপ করে খাওয়া শুরু করে দিল। তবে নিযানার মুখের ভেতরের স্বাদটা চিবানোর সাথে সাথেই বদলে গেল। মচমচে ফুচকার সাথে তেঁতুলের টক আর ঝালের মেলবন্ধনটা ওর আসলেই দারুণ লাগল। কলরব নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি রাত অব্দি কনসার্ট করি। পরকীয়া করি না।”
কথাটা শোনামাত্রই নিযানা চমকে উঠল। কলরবের ওপর রাগ করে সে যে কী এক জঘন্য ইঙ্গিত করেছিল। তা এই মুহূর্তে তীরের মতো ওর বুকে এসে বিঁধল। একটা অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় ওর ভেতরটা কুঁকড়ে গেল। অস্বস্তি হতে লাগল। কলরবের মুখের দিকে সোজাসুজি তাকানোর মতো সাহসটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলল। নিজের ভেতরের এই অস্বস্তিটা ঢাকার জন্যই সে প্লেট থেকে আরও একটা ফুচকা চট করে মুখে পুরে দিল। নিযানার এই অপ্রস্তুত অবস্থা আর চটজলদি ফুচকা গেলার ভঙ্গি দেখে কলরব মনে মনে বেশ হাসল। নিযানা চিবোতে চিবোতে আমতা আমতা করে বলল,

“তুমি… তুমি আসলেই বেশ ভালো গাও কলরব। কিন্তু এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে করার মানে কী?”
“আব্বু পছন্দ করেন না।”
সেই প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে নিযানা বেশ উৎসাহ নিয়ে টপিকটা বদলে ফেলল। চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
“আচ্ছা তুমি জানো? দুপুরে তোমার ওই ভিডিওটা আমি ফেসবুকে পোস্ট করার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পুরো চল্লিশ হাজার ভিউ হয়েছে! রিয়াক্টও প্রায় দুই-তিন হাজারের ওপরে পড়েছে!”
কথাটা শুনে কলরব খাওয়া থামিয়ে অবাক চোখে নিযানার দিকে তাকাল। ওঁর ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কিছু একটা খুঁজল। অতঃপর ফোনটা ঘুরিয়ে সোজা নিযানার চোখের সামনে ধরল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই নিযানা আরও এক চোট অবাক হলো। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা ঘরে ওরা কয়েকজন বন্ধু বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গোল হয়ে বসে আছে। সবার মুখে কালো মুখোশ। গিটার হাতে গান গাইছে কলরব। নিযানা চমকে উঠে দেখল। ওই ভিডিওটার নিচে রিয়াক্ট-এর সংখ্যাই প্রায় তিরিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে! তাহলে ভিউ নিশ্চয়ই কয়েক লাখ বা তারও অধিক হবে! নিযানার ঘোর কাটার আগেই কলরব স্ক্রিনটা স্ক্রোল করে তাদের অফিশিয়াল পেজটা দেখাল। পেজটির ফলোয়ার সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি! নিযানার বিস্ময়বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে কলরব ফোনটা লক করে পকেটে রেখে দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“মূলত এই পেজটার মাধ্যমেই আমাদের যা একটু পরিচিতি তৈরি হয়েছে। এখান থেকেই বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা মেলা কমিটির মানুষ আমাদের সাথে যোগাযোগ করে কনসার্টের জন্য। শুরুতে এক-আধটা অফার আসত, কিন্তু এখন এক-দুই করতে করতে কিছুদিন পর পরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমন বড় বড় অফার আসে।”

নিযানা কেবল মাথা নাড়ল। সে যেন সত্যিই এক নিমেষে বোকা বনে গেছে। ওর ভাবনার মাঝেই কলরব প্লেটের শেষ ফুচকাটা মুখে পুরে জিজ্ঞেস করল,
“আর এক প্লেট খাবি?”
নিযানা চমকে উঠে নিজের প্লেটের দিকে তাকাল। সে যে কখন পুরো প্লেট শেষ করে ফেলেছে তা নিজেই খেয়াল করেনি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে চট করে বলল,
“না, আর লাগবে না। ওদিকে চলো। মেলাটা ঘুরে দেখি।”
কলরব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “তুই চাইলেও অবশ্য আর দিতাম না! টাকা কী গাছে ধরে নাকি? তোর বাপের মতো কালো টাকা না আমার।”

নিযানা বিরক্ত হয়ে কিছু বলার আগেই সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল বিল মেটাতে। নিযানা ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটু হাসল। বিল মিটিয়ে কলরব এসে আবার নিযানার পাশে দাঁড়াল। তারপর দুজনে মিলে মেলার রঙিন অলিগলিতে হাঁটতে শুরু করল। চারপাশের ঝলমলে আলো আর মানুষের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে নিযানা মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কলরব একটার পর একটা বিচিত্র জিনিস আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে ওকে মেলার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে থামল এক মস্ত বড় চুড়ির দোকানের সামনে। সেখানে থরে থরে সাজানো রকমারি কাঁচের চুড়ির যেন এক বর্ণিল সমুদ্র। সেই ঝিলমিলে ভিড়ের মাঝে নিযানার চোখ আটকে গেল এক জোড়া চুড়ির ওপর। কাঁচের খয়েরি রঙের ওপর নিখুঁত কারুকাজে বসানো ছোট ছোট কয়েকটি স্টোন। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা আছে তাতে। নিযানা আলতো করে চুড়ি জোড়া তুলে নিজের হাতে পরে দেখল। ওর ফর্সা হাতে খয়েরি রঙটা বেশ মানাল। কলরব আড়চোখে ওর চোখমুখের সেই অনাবিল উচ্ছ্বাস আর হাতের সৌন্দর্য খেয়াল করছিল। নিযানা হঠাৎ ওর দিকে তাকাতেই সে চট করে চোখ সরিয়ে নিল। নিযানা পরক্ষণেই এক রাশ বিষণ্ণতা নিয়ে চুড়িগুলো হাত থেকে খুলে আগের জায়গায় রেখে দিল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

“চলো। আর ভালো লাগছে না। এবার বাসায় যাব।”
ওর মুখের এই আকস্মিক মলিনতাটুকু কলরবের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারল না। ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো? চুড়ি নিবি না? পছন্দ হয়নি?”
নিযানা মাথা নিচু করে বলল, “আসলে, আমার কাছে এখন কোনো টাকা নেই। বাসায় চলো।”
কলরব বিরক্ত চোখে ওর দিকে চাইল। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে খয়েরি রঙের সেই পাথর বসানো চুড়ি জোড়া তুলে দোকানদারের হাতে দিল। তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে বিল মিটিয়ে দিল। চুড়িগুলো নিয়ে সে সোজা নিযানার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে বলল,
“নে, বাকিতে দিলাম। পরে সুদে-আসলে ফেরত দিয়ে দিস। এবার চল। আমি এখনো মেলা ঘুরব। এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে কী হবে?”

প্রত্যুত্তরে নিযানার কিছু বলার বা আপত্তি করার কোনো সুযোগই দিল না কলরব। তার আগেই বরাবরের মতো ওর একটা হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে ভিড়ের মাঝে হাঁটতে শুরু করেছে সে। নিযানা এবার আর চারপাশের সাজসজ্জা দেখল না। দোকানপাটের ভিড় দেখল না। সে কেবল অপলক চোখে পাশে হেঁটে চলা কলরবের অবয়বটা দেখতে লাগল। হ্যাঁ, আজকের এই কলরবকে তার নতুন লাগছে। বুকের ভেতর এক অবাধ্য মুগ্ধতা প্রতিনিয়ত ডানা ঝাপটাচ্ছে। চারিদিকে চড়া আওয়াজ, মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর উড়ো ধুলাবালি। অথচ এই কোলাহলের মাঝেও কারো একটা হাত শক্ত করে ধরে শুধু হেঁটে যেতে যে এত গভীর সুখ লাগে, তা নিযানা এর আগে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। ওর অবুঝ মনে হঠাৎ এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। এই রাতটা যেন কখনো শেষ না হয়। এভাবেই অনন্তকাল সে এই মেলার মাঠে থেকে যাক। সামনে দিয়ে কলরব ঠিক এভাবেই নির্ভরতায় ওর হাত ধরে পথ চলুক। নিযানা নিজের বুকের ধকধকানি স্পষ্ট শুনতে পেল। এসব কিছুর মানে কী? এই অচেনা, তীব্র অথচ অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতির আসল অর্থটা কী হতে পারে? একেই কি তবে মানুষ ভালোবাসা বলে? সে কি সত্যিই এই খ্যাপাটে, একরোখা ছেলেটার প্রেমে পড়ে গেছে? সে কি ভালোবেসে ফেলেছে কলরবকে?

ভোরের আলো একটু একটু করে ছুঁয়ে দিচ্ছে ধরণীকে। শান্ত সকালের সেই প্রথম আলোটুকু খোলা জানালার পর্দা ভেদ করে এসে স্পর্শ করল বিছানায় শায়িত তিনটি মানব-মানবীকে। আলোর স্পর্শে নবনী নড়েচড়ে উঠল একটু। তার গলার কাছে কার যেন উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছোঁয়া। যা প্রতি মুহূর্তে এক অদ্ভুত ভালোলাগার উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার শরীরে। নবনী চোখ মেলে তাকাল। চোখের সামনেই ভেসে উঠল দিব্যর শান্ত, ঘুমন্ত মুখটা। ওঁর মাথার দু-একটা চুল এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। চোখের অর্ধেক অংশ ঢেকে দিয়েছে। নবনী আলতো হাতে চুলগুলো সরিয়ে দিল। ওঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মৃদু হাসি।অন্ধকার কেটে ভোরের আলোয় স্পষ্ট হওয়া অসম্ভব সুন্দর গঠনের এই পুরুষালী মুখটা কার ভালো না লেগে থাকতে পারে? আর মুখাবয়ব ছাড়িয়ে ওঁর যে মন। এমন একটা অসাধারণ চরিত্রের মানুষকে কে ভালো না বেসে থাকতে পারে? নবনী আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল দিব্যর ললাটে। তৃপ্তিতে চোখ দুটো বুঁজে এলো তার। কিছুক্ষণ ওভাবেই কেটে যাওয়ার পর নবনী বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু লাভ হলো না। লোকটা ঘুমের ঘোরেও তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মনেহলো এক চুলও নড়তে দেবে না। নবনী অনন্যোপায় হয়ে ওঁর বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে ডাকল,

“শুনুন। শুনতে পাচ্ছেন? উঠুন না প্লিজ।”
দিব্য একটু নড়েচড়ে উঠল। চোখ মেলে একবার অলস দৃষ্টিতে দেখল নবনীকে। অতঃপর কোনো কথা না বলে চোখ দুটো আবারও বুঁজে নিল। নিজের শক্ত হাত দুটো দিয়ে নবনীকে আরেকটু নিবিড় করে নিজের কাছে টেনে নিল।
দিব্যর এমন কাণ্ডে নবনী পুরো হতভম্ব হয়ে গেল।
“কী আশ্চর্য! আপনি উঠবেন না? কয়টা বাজে দেখেছেন?”
দিব্য নবনীর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ঘুম জড়ানো ভারী গলায় বলল,
“আজকে অফিস যেতে ইচ্ছা করছে না।”
“ঠিক আছে। যেতে হবে না।”
“হুমমম…!”

নবনী ওঁর হাতের বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,
“হুমম কী? আমাকে তো ছাড়ুন অন্তত। আমি তো উঠব নাকি? সকালে কত কাজ আছে।”
দিব্য চোখ না খুলেই আধো-োঘুমো গলায় বলল, “তুমিই যদি উঠে চলে গেলে তবে আমি একা একা শুয়ে থেকে কী করব?”
দিব্য চোখ খুলল। নবনী তখনো অপলক চেয়ে ছিল ওঁর দিকে। যার ফলে মুহূর্তেই দুজনের চার চোখ এক হলো। ধরা পড়ে যাওয়ার এক তীব্র সংকোচে নবনী তড়িঘড়ি করে নিজের চোখ সরিয়ে নিল। দিব্য ওঁর এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে শব্দহীন হাসল। এতদিনের চেনা মানুষটা এখনো ওঁর চোখের সামনে অবুঝ বালিকার মতো লজ্জা পাচ্ছে৷ ওঁর ফর্সা গাল দুটো যেন ভোরের আলোকেও হার মানিয়ে একটু একটু করে রক্তিম হতে শুরু করেছে। দিব্য আর দূরত্ব রাখল না। নিজের নাকটা আলতো করে ঠেকাল নবনীর নাকের ডগায়। নবনী ভেতর থেকে মৃদু কেঁপে উঠল বোধহয়। দিব্য একদৃষ্টিতে নিথর চোখে চেয়ে রইল ওঁর পানে। নবনী সেই গভীর চাহনি সহ্য করতে না পেরে চোখজোড়া এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ওঁর দৃষ্টি উপেক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। দিব্য ওঁর এই দুষ্টুমিটুকু ধরে ফেলে একটু নিচু স্বরে বলল,

“কাল রাতে…!”
“কী কাল রাতে?”
নবনী চট করে ওঁর কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “আমি বিশ্বাস করুন কোনোদিন ভাবিনি যে আপনি এতটা… এমন!”
“কেমন? একটু বেশিই রোমান্টিক?”
কথাটা শোনামাত্রই নবনীর কান জোড়া লজ্জায় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। এক রাশ রক্তিম আভা পলকে এসে ভর করল তার সারা মুখ জুড়ে। গলার কাছে এসে কথাগুলো সব আটকে গেল ওঁর। কোনো জোরালো উত্তরই আর খুঁজে পেল না সে।
দিব্য একটু শান্ত হয়ে মৃদু হাসল। তারপর ওঁর চোখের পানে চেয়েবলল,
“সত্যি করে বলো তো নবনী, আফসোস হয় না তোমার? ইদানীং তোমার জন্য আমার নিজেরই খুব কষ্ট হয়। তোমার স্বামীটা একটু সুন্দর হলো না।”
নবনী চোখের দিকে সোজা তাকাল। স্পষ্ট গলায় বলল,
“কিন্তু আমার তো বিন্দুমাত্র আফসোস হচ্ছে না। আর সত্যি বলতে, পুরুষ মানুষ বেশি সুন্দর না হলেই বরং ভালো হয়।”

দিব্য কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন?”
“আপনি যখন কাজের সূত্রে বাইরে যাবেন। আমাকে আর ঘরে বসে সারাক্ষণ টেনশন করতে হবে না। অন্য কোনো মেয়ে নজর দেবে না। কত বড় সুবিধা এটা, আপনি জানেন?”
নবনীর যুক্তি শুনে দিব্য খিলখিল করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসিটা দেখে নবনী যেন আরও এক চোট মুগ্ধ হলো। হাসিমুখের দিকে চেয়ে এক প্রকার সম্মোহিত হয়ে পড়ল।
দিব্য হাসতে হাসতেই ওর দিকে চেয়ে বলল,
“তাই নাকি? তাহলে তো আমার নিজেরই এখন খুব বেশি টেনশন করা উচিত বলো? আমার স্ত্রী যা অপরূপ সুন্দরী! যদি কখনো আমাকে ফেলে অন্য কোথাও চলে-টলে যায়। তখন কী হবে?”
নবনী নিজের একটা হাত রাখল দিব্যর শক্ত গালের ওপর। চোখের মণি দুটো স্থির করে ধীরস্থির গলায় বলল,
“একটা সময় অবশ্য এই মেয়েটা আপনাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে পারে।”
“কখন?”
“তার মৃত্যুর পর।”

দিব্য চোখ মেলে নবনীর গালে রাখা হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। তারপর আঙুলের নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে অনুচ্চ স্বরে বলল,
“আজকাল বেশ কথা শিখেছ তুমি? বয়সটা তো আমার একটু বেশিই। তা তোমার এই সুন্দর যুক্তি মেনে আমি দোয়া করি। তোমার আগে যেন এই পৃথিবী থেকে আমি বিদায় নিতে পারি। তাহলে আর বুড়ো বয়সে তোমাকে হারানোর বাড়তি টেনশনটা আমায় নিতে হবে না। তবে হ্যাঁ, তার আগে তোমাকে অন্তত দশ-বারোটা ছেলেমেয়ে আর গোটা বিশেক নাতি-নাতনি উপহার দিয়ে যেতে চাই। যাতে আমার অবর্তমানেও তোমার এই বিশাল তালুকদার বাড়িতে বিন্দুমাত্র একাকীত্ব বোধ না হয়।”
নবনী গম্ভীর গলায় বলল, “দশ-বারোটা ছেলেমেয়ে? তা, সংখ্যাটা কি একটু কম হয়ে গেল না তালুকদার সাহেব?”
নবনীর নরম গালে একটা চুমু খেল দিব্য। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“তুমি চাইলে আর দুই-একজন বাড়ানো যেতেই পারে। দিব্য তালুকদারের মন ভীষণ উদার, তা তো জানোই। এদিক দিয়ে সে নিজের পুরো চেষ্টাটাই করবে। কোনো কমতি রাখবে না।”
নবনীর সারা মুখে আবার লজ্জার পশলা নেমে এলো। দিব্যর বুকে আলতো চাপ দিয়ে বলল,
“খালি বাজে কথা! সরুন তো এবার। আমাকে আসলেই উঠতে হবে।”
“আর কিছুক্ষণ থাকো না। বেশি সময় নিবো না…!”

“মাম্মা… দিয়াকে ধরো…!”
আচমকা পেছন থেকে দিয়ার এই আধো-আধো কণ্ঠস্বর শুনে নবনী ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দেখল, যেমন ছিল তেমনই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ওঁর ঘুম ভাঙেনি বিন্দুমাত্র। নবনী ওর এই কাণ্ড দেখে খিলখিল করে হেসে ফেলল। দিয়া প্রায় সময়ই গভীর ঘুমের ঘোরে স্পষ্ট করে কথা বলে। হাসতে হাসতে দিব্যর পানে চেয়ে বলল,
“ও ঘুমের ঘোরে কথা বলছে, দেখছেন? অদ্ভুত না?”
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস গলায় বলল, “আমার তো মনে হলো ও ঘুমের ঘোরেও সিগন্যাল দিচ্ছে। ও চায় না ওর রাজত্ব ভাগ করতে কোনো ভাইবোন আসুক। আমার মেয়েটা এত হিংসুটে হলে কীভাবে হবে?”
নবনী ঠোঁট উল্টে টিপ্পনী কাটল, “আপনার মতোই হয়েছে একদম!”
“আমার মতো কীভাবে হলো? চলো আজকে আমরা সবাই মিলে একটু মার্কেটে যাই।”
নবনী ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন? হঠাৎ মার্কেট কেন?”
“আমার কিছু কেনাকাটা করার আছে। আর তাছাড়া সামনে তো অনুষ্ঠান। দিয়ার জন্যও নতুন কিছু জামাকাপড় নেওয়া দরকার।”

নবনী মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে যাব। তবে এখন শুনুন না…!”
“হুমমম…!”
“এবার তো ছাড়ুন!”
“আচ্ছা, ছেড়ে দেব। আর মাত্র দশটা মিনিট পর, পাক্কা…!”
নবনীর কোমর জড়িয়ে থাকা হাতের বাঁধনটা আরেকটু শক্ত করল দিব্য। নবনী ছটফট করে উঠল।
“নাহ, একদম না!”
“হ্যাঁ, একদম হ্যাঁ! পারো তো গিয়ে দেখাও৷”

“চাচ্চু, তোমার মুসলমানি হয়েছে?”
“হ্যাঁ হয়েছে তো। সবার হয়।”
“সত্যি কেটে দেয়?”
“হ্যাঁ, সত্যিই কেটে দেয়।”
“তোমাকে ও দিয়েছে?”
“বললাম তো সবাইকে দেয়।”
“না, তুমি মিথ্যা বলো।”
“আজব! মিথ্যা বলবো কেন?”
“তাহলে দেখাও?”
“কীহ!”

ইহানের কথায় আতঙ্কে উঠল কলরব। নিজের বাইকটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। এই প্রশ্নে উত্তেজনায় বাইক থেকে প্রায় পড়তে নিচ্ছিল। আশপাশে থাকা কয়েক টা জোড়া চোখ মুহূর্তের জন্য স্থির হলো ওর ওপর। লজ্জায় কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল কলরবের। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনিতা, নবনী, মাজহা আর কাব্য। সবাই তখন ঠোঁট টিপে হাসছে। পুরো তালুকদার পরিবার আজ একসাথে শপিং-এ বের হয়েছে। কদিন বাদেই ইহান আর ইভানের সুন্নতে খাতনা। তাই ওদের জন্যই মূলত কেনাকাটা হবে। কলরব সবার হাসিমুখ দেখে চোখ রাঙাল কিন্তু ইহান নিজের মতো মুখ ভার করেই দাঁড়িয়ে রইল। মুসলমানির গল্প শোনার পর থেকেই তার মনে একটা অশান্তি আর ভয় দানা বেঁধেছে। কাব্যকে এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলেই সে গম্ভীর হয়ে কলরবের দিকে আঙুল তুলে বলে, তোর কলরব চাচ্চুকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। কলরব আছে বিপদে। ঠিক তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হলো দিব্য, নবনী আর দিয়া। কলরবকে দেখে দিব্যর কপাল কুঁচকে গেল। ভাইয়ের এই বাইক-প্রেমের ওপর সে প্রথম থেকেই বিরক্ত। এগিয়ে এসে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,

“তুই এটা এখনো ছাড়বি না, কলরব?”
“কেন? কী সমস্যা?”
দিব্য এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। ওঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেদিনের সেই হাসপাতালের দৃশ্যটা। গলার স্বর কিছুটা ভারী হয়ে এলো,
“কলরব, তুই তো সেদিন মরেই যেতে পারতিস। ওটিতে যখন তোর অপারেশন চলছিল। আমি নিজে তোর ওই অবস্থা দেখেছিলাম। ভয়ে আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। এই বাইকটা দেখলেই এখনো আমার বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি শুরু হয়। আর তুই এইটা আবার চালাবি? তোর যদি বাড়ির গাড়িটা চালাতে সমস্যা হয়। আমি তোকে আমার গাড়িটা দিয়ে দিচ্ছি। তাও প্লিজ। এই জিনিসটা আর ব্যবহার করিস না।”
কলরব একটু দমে গেল। নিচু স্বরে বলল, “ভাইয়া, প্লিজ!”
কাব্য আর সহ্য করতে পারল না। হনহন করে এগিয়ে এসে দিব্যর হাত ধরে টানতে টানতে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। যাওয়ার সময় গজগজ করতে করতে বলল,

“বাদ দে তো দিব্য! গোল্লায় যাক ও। পরের বার ও বাইক থেকে পড়ে হাত-পা ভাঙলে আমি ওকে দেখতেও যাব না। হাসপাতালের ওয়ান-এমার্জেন্সি বেডেই ফেলে রাখব। ওটিতেও নেব না। অসভ্য, ইতর একটা!”
নিযানা আর কুহু হাসাহাসি করতে করতে বের হলো। ওরা দুজনে কলরবকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে। সোজা গিয়ে গাড়ির দরজায় হাত দিল। কলরব একটু চড়া গলায় ডাকল,
“কী রে! বাইকে কেউ যাবি না আমার সাথে?”
কুহু মুখ ভেঙচিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “মরলে তুমি একা মরো যাও! আমাদের মরার শখ হয়নি।”
কলরব চোখ ছোট ছোট করে বলল, “পরের বারের অনুষ্ঠানটা কিন্তু তোর বিয়েরই হবে কুহু। বড্ড বেশি বাড় বেড়েছে তোর ইদানীং।”
কুহু অমনি থতমত খেয়ে চিৎকার করে কাব্যর দিকে তাকাল,
“ভাইয়া! দেখো না ভাইয়া কী বলছে! সে কি আমাকে খাওয়ায় পরায় নাকি? সবসময় আমার বিয়ের পেছনে কেন লাগে বলো তো?”

গাড়ির ভেতর থেকে কাব্য মাথা বের করে বলল, “কারণ ওর বিয়েলগ্নে জন্ম বুঝলি? জন্মের পর থেকে শুধু বিয়ে বিয়ে আর বিয়ে লাগিয়ে রাখছে নিজের জীবনে। ওর জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল বিয়ে করা। যেটা করা আপাতত শেষ। এখন কোনো কাজকাম নেই। তাই এসব ফালতু কথা বলে বেড়ায়। তুই ওর কথা কানে নিস কেন? আয়, গাড়িতে এসে বোস।”
কলরবকে কিছু বলতে না দিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে দিলো কাব্য৷ দিব্য নিজের গাড়িতে ওঠার আগে কলরবের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“সাবধানে আসিস কিন্তু।”

কলরব খালি মাথা নাড়ল। গাড়ি দুটো যখন স্টার্ট নিয়ে চলে যেতে লাগল। কলরব অপলক চোখে গাড়ির কাঁচের ওপাশে বসে থাকা হাসতে থাকা নিযানার পানে এমনভাবে চাইল যেন আস্ত গিলে ফেলবে ওকে। যাকে এই বাইকে করেই সে কলেজে দিয়ে আসলো আবার নিয়ে আসতো। সে আজ সবার সামনে কেমন গিরগিটির মতো রঙ বদলে সুযোগ পেয়ে তাকে এড়িয়ে গেল! কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরলো। আসুক বাড়ি বোঝাবে ওকে। স্বার্থপর কোথাকার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা শপিং মলে পৌঁছে গেল। সবাই যার যার মতো দল ভাগ হয়ে কেনাকাটা করতে শুরু করেছে। নবনী আর দিয়া একটা দোকানে দিয়ার জন্য জামা দেখছিল। হঠাৎই পাশে দিব্যকে না পেয়ে নবনী দোকান থেকে একটু বাইরে বেরিয়ে এলো। তখনই মলের করিডোরে অসীমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। মুহূর্তের মধ্যে নবনী আর দিব্যর সাথে ঘটে যাওয়া অতীতের সেই দিনগুলোর কথা নবনীর মাথায় ভেসে উঠল। রাগে ওঁর ভেতরটা যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। শাড়ির কুঁচি এক হাতে শক্ত করে ধরে টান পায়ে সে এগিয়ে গেল অসীমের দিকে। সম্মুখে দাঁড়ানো অপ্রস্তুত অসীম কিছু বুঝে ওঠার আগেই নবনী সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল ওঁর গালে। আকস্মিক এই আঘাতে অসীম গালে হাত দিয়ে বিস্ময় আর অবাক চোখে তাকাল। নবনী ওঁর চোখের দিকে চেয়ে শক্ত গলায় বলল,

“তোমার সাহস হলো কী করে, অসীম? আমার মেয়ের দিকে নজর দেওয়ার? অতটুকু একটা বাচ্চাকে তুমি কিডন্যাপ করতে চেয়েছিলে? একবারও তোমার বিবেকে বাঁধেনি? আমার স্বামীকে তুমি খু*ন করতে চেয়েছিলে? হাউ ডিয়ার ইউ!”
ঠিক পাশেই একটা পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে ফোনে জরুরি কথা বলছিল দিব্য। আচমকা নবনীর গলা কানে পৌঁছাতেই সে ঝট করে তাকাল সেদিকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কেটে সে দ্রুত এগোতে লাগল ওদের দিকে। অসীম চারপাশের মানুষের উৎসুক দৃষ্টি দেখে দাঁতে দাঁত পিষে নিচু স্বরে বলল,

“নবনী, ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিট!”
নবনী বলল, “লিমিট, তাই না? পরের বার যদি আমার স্বামী আর সন্তানের দিকে হাত বাড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেছ তখন তোমায় দেখাব লিমিট ক্রস করা কাকে বলে! ইডিয়ট, কাপুরুষ কোথাকার!”
দিব্য ততক্ষণে এসে পৌঁছে গেছে। সে দ্রুত এগিয়ে এসে নবনীর একটা হাত শক্ত করে ধরল। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
“নবনী, কী করছ এসব? রিল্যাক্স করো প্লিজ। অসীম, তুমি এখন যাও এখান থেকে।”
নবনী দিব্যর মুখের পানে চেয়ে রাগ নিয়ে বলল, “কিসের রিল্যাক্স, হ্যাঁ? ও যখন একবার এমন জঘন্য কাজ করতে পেরেছে। পরের বার যে করবে না তার গ্যারান্টি কী? আপনি কেন ওর সাথে এত ভালোমানুষী দেখাচ্ছেন?”

অসীম ম্লান গলায় বলল, “পূর্বের সবকিছুর জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত, নবনী। তবে আপাতত আমার কোনো বাজে ইনটেনশন নেই। এমনিতেও আমি এখন পুরোপুরি জবলেস হয়ে রাস্তায় বসে আছি। আজকে এই মলে এসেছি একটা কাপড়ের দোকানের কর্মচারী পদের ইন্টারভিউ দিতে। তোমার কী মনে হয়? আমার কাছে এখন এসব ফালতু ষড়যন্ত্র করার মতো সময় আছে?”
দিব্য অসীমের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যাও এখান থেকে।নবনী, তোমার কমনসেন্স কোথায় গেছে বলো তো?”
অসীম আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত চলে গেল। ও যেতেই নবনী এক ঝটকায় দিব্যর হাতটা ছাড়িয়ে ছিঁটকে সরিয়ে এল। ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“রাখুন আপনার কমনসেন্স! একদম কথা বলবেন না আপনি আমার সাথে!”
দিব্য একটু হেসে বলল, “তাহলে আমার মুখে একটা টেপ মেরে দাও। নয়তো তোমাকে দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।”

“আপনার এইসব ফালতু মজা এই মুহূর্তে আমার একদম ভালো লাগছে না।”
দিব্য নরম গলায় বলল, “আপাতত রেগে না থেকে কেনাকাটাটুকু শেষ করি? তারপর বাড়িতে গিয়ে তোমার এই রাগে ভাঙানোর পুরো চেষ্টা করবো।”
নবনী এক পলক কড়া দৃষ্টিতে দিব্যকে দেখল। তারপর ওঁর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই দিব্য চট করে ওঁর একটা হাত ধরে ফেলল।

এই অবেলায় পর্ব ৪২

“নবনী, কী হচ্ছে কী এসব?”
“আমার মেজাজ মারাত্মক খারাপ হচ্ছে!”
নবনী হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। দিব্য বলল, “মেজাজ ঠাণ্ডা করতে আইসক্রিম খাবে? নাকি ফুচকা?”
“আপনার খেতে ইচ্ছে হলে আপনি একাই খান। যান!”

এই অবেলায় পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here