Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪

এই অবেলায় পর্ব ৪

এই অবেলায় পর্ব ৪
সুমনা সাথী

সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলেছে। পালিয়েছে রোদ্দুর। চারদিকে গোধূলির ধূসর আভা। পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ জানান দিচ্ছে তাদের নীড়ে ফেরার তাড়া। নবনী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল; হঠাৎ দিয়া হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। বড় বড় চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে সে বেশ ভাবুক গলায় প্রশ্ন করল,
‘কার সাথে কথা বলছো তুমি?’
নবনী ফোনের ওপাশ থেকে মনোযোগ সরিয়ে মৃদু হাসল। দিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল,

‘তোমার নানুমণি। কথা বলবে ওনার সাথে?’
দিয়া ছোট্ট করে দুপাশে মাথা নাড়ল। সে কথা বলবে না। তবে ওকে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নবনী ফোনটা রেখে দিল। দিয়ার উচ্চতার সমান হতে সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কিছু বলবে মাম্মা? তোমার কি কিছু চাই?’
দিয়া এবার ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
‘আমি, ইহান আর ইভান এখন লুকোচুরি খেলব। তুমি আমাদের সাথে খেলবে? চলো না মাম্মা, খুব মজা হবে!’
নবনী হাসল। এই ছোট্ট শিশুটির সাহচর্য তার একাকিত্বকে যেন নিমেষেই ভুলিয়ে দেয়। সে বলল,
‘ঠিক আছে আমি যাব। আচ্ছা মাম্মা, তোমার পাপ্পা কি ফিরে এসেছে?’
দিয়া আবারও মাথা নেড়ে জানাল যে তার বাবা আসেনি। নবনী আনমনা হয়ে গেল। দুপুরের সেই দৃশ্যটা এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে। দিব্যর না খেয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার পেছনে ঠিক কী কারণ থাকতে পারে? নবনী এখনো তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। তবে সে আর নিজের মনকে ভারাক্রান্ত হতে দিল না। দিয়ার হাত ধরে খেলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল।

সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ঘন হতেই দিব্য বাড়ি ফিরল। অলেখা কেন দেরি হলো জানতে চাইলে সে সংক্ষিপ্ত উত্তরে জানাল ‘জরুরি মিটিং ছিল।’ তবে বাড়ির থমথমে পরিবেশটা তার নজর এড়াল না। কলরব আজ অন্যদিনের মতো আড্ডা না দিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে। তার চোখেমুখে অস্থিরতা; আজ একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার চাই-ই চাই। বসার ঘরে সবাই নাস্তা নিয়ে বসেছে। কলরব বারবার চোখের ইশারায় মাকে তাগাদা দিচ্ছে আরশাদ তালুকদারের কাছে প্রস্তাবটা পাড়তে। আরশাদ তালুকদার সবার মাঝখানে বসে আছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর মুখের গাম্ভীর্য ভেদ করে কথা বলার সাহস কারো হচ্ছে না। শেষমেশ বাড়ির সবাই মিলে আফতাব তালুকদারকে ইশারা করল। বড় ভাইয়ের সামনে আফতাব তালুকদার সবসময়ই একটু কুঁকড়ে থাকেন। তবুও সবার পীড়াপীড়িতে গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে অত্যন্ত সাবধানে বললেন,
‘বলছিলাম কী ভাইয়া, কলরবের ব্যাপারটা আমি একটু তলিয়ে দেখলাম। আমরা শুধু শুধু বিষয়টাকে জটিল করে তুলছি। মনে আছে সেদিন তুমিই তো বলছিলে, ছেলেটা বড্ড বখে যাচ্ছে। এখন বিয়েশাদি করিয়ে দিলে যদি একটু লাইনে আসে!’

আফতাব সাহেবের এমন কথায় কলরবসহ বাকি সবাই বিস্ফোরক চোখে আরশাদ তালুকদারের দিকে তাকাল। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকাতেই আফতাব সাহেব এক অস্বস্তিকর হাসি দিলেন। নিজের অজান্তে বড় ভাইয়ের গোপন ইচ্ছার কথা ফাঁস করে দিয়ে মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেছেন তিনি। আরশাদ তালুকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
‘আমি ওর বিয়ের কথা বলেছিলাম ঠিকই। কিন্তু ও যাকে পছন্দ করে তাকে নয়। তোমরা কি ভেবেছ ওই মেয়ে সম্পর্কে আমি খোঁজখবর নিইনি? সত্যি বলতে, মেয়েটাকে আমার একদমই পছন্দ হয়নি।’
অলেখা আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। স্বামীর কথার পিঠে কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
‘তোমার পছন্দ দিয়ে কী হবে? বিয়েটা কি তুমি করবে? দেখো, আমাদের কারো কোনো আপত্তি নেই। আমরা মেয়েটিকে দেখেছি। এখন তুমি অযথা জেদ না করে রাজি হয়ে যাও।’
‘তার চেয়ে এক কাজ করো, তোমার ছেলেকে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলো। আমার পক্ষে অন্তত এই বিয়েতে সায় দেওয়া সম্ভব না।’
অলেখা মোটেও অবাক হলেন না। এমন কথা তিনি বহুবার শুনেছেন। তিনি শান্ত দৃঢ় গলায় বললেন,
‘ও যদি বাড়ি ছাড়ে, তবে ওর সাথে আমিও যাব। তাতে তোমার যদি ভালো লাগে তো বলো। আমরা এখনই বেরিয়ে যাচ্ছি।’

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে দেখে কাব্য বলল, ‘আহ্ বড় মা, শান্ত হও! চাচ্চু, প্লিজ রাজি হয়ে যাও না। ও তো কথা দিচ্ছে ও তোমার সব কথা শুনবে। ব্যবসায় মন দেবে।’
আরশাদ তালুকদার কিছুক্ষণ পাথর হয়ে বসে রইলেন। ঘরের প্রতিটি মানুষ তখন তাঁর উত্তরের প্রতীক্ষায়। অবশেষে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নির্লিপ্ত স্বরে বললেন,
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। বিয়ের অনুমতি দিচ্ছি। তবে মনে রেখো। এই বিয়েতে আমার উপস্থিতি আশা করো না। বাকি যা করার তোমরা করো গে। এই উজবুকটাকে যদি মাথায় তোলার শখ থাকে তবে তোলো।’
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরে যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। মুহূর্তের সেই স্তব্ধতা ভেঙে সবাই হইহই করে উঠল। কাব্য উচ্ছ্বসিত হয়ে কলরবের পিঠে এক জোরালো চাপড় দিয়ে অভিনন্দন জানাল। সবার চোখেমুখে এখন বিজয়ের হাসি। সেই খুশির আমেজেই রাতের খাবার পর্ব সারল সবাই।
কাল নবনীর বাবার বাড়ি থেকে সবাই আসবে।

রাতের নিস্তব্ধতা পুরো বাড়িতে জাঁকিয়ে বসেছে। নবনী ধীরপায়ে ঘরে ফিরল। কিন্তু ঘরের চৌকাঠ পেরোতেই এক গুমোট গাম্ভীর্য তাকে জাপটে ধরল। দিব্য খাওয়ার পরপরই দিয়াকে নিয়ে ঘরে চলে এসেছিল। নবনী দেখল বিছানার এক কোণে দিয়া অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আর সোফায় বসে ল্যাপটপের নীল আলোয় নিমগ্ন হয়ে আছে দিব্য। পরনে তার কালো ট্রাউজার আর টি-শার্ট। চোখের চশমা। নবনীর পায়ের শব্দে দিব্য একবার মুখ তুলে তাকাল। নবনী কী বলবে ভেবে পেল না এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। তবে তাকে মৌনতা ভাঙতে হলো না; দিব্য নিজেই ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে টেবিল থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স তুলে নিল। তারপর নবনীর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। নিচু স্বরে সে বলল,

‘হাতটা বাড়াও।’
নবনী বিস্ময়ে পাথর হয়ে রইল। তার চোখের পলক পড়ছে না। দিব্যর ভাবলেশহীন মুখাবয়ব দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। অবচেতন মনেই সে নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিল। দিব্য বাক্স থেকে একটি হিরের আংটি বের করে নবনীর অনামিকায় পরিয়ে দিল। নবনী যেন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে; এই স্পর্শ, এই উপহার সবই তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলো। দিব্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
‘দুপুরে টেবিলে সবাই তোমাকে কিছু না কিছু দিচ্ছিল। তখন খেয়াল ছিল না আমার। তাই এই উপহারটুকু দিতে দেরি হলো।’
নবনীর কাছে এই মানুষটা প্রতি মুহূর্তে এক নতুন রহস্য। সেই রহস্যের জাল যেন ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। সে কোনোমতে বিড়বিড় করে বলল,

‘ইটস ওকে।’
দিব্যর দৃষ্টি এবার আরও গভীর হলো। সে বলতে শুরু করল,
‘দেখো নবনী, আমি তোমাকে অস্বীকার করছি না। আর সারাজীবন কেবল নামের স্ত্রী বানিয়ে রাখার ইচ্ছাও আমার নেই। তোমার নিজের একটা স্বতন্ত্র জীবন আছে। কিন্তু একটা নির্মম সত্য আমরা দুজনেই জানি তুমি এই বিয়েটা করতে চাওনি। আর আমাকে তুমি কোনোদিনই পছন্দ করো না। এমতাবস্থায় আমি যদি তোমার ওপর স্বামীর অধিকার ফলাতে আসি সেটা কি খুব রুচিসম্মত হবে? তোমার ভালো লাগবে?’
নবনীর চোখের পাতা ভিজে উঠল মুহূর্তেই। সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। দিব্যর প্রতিটি শব্দ তীরের মতো তার বুক চিরে যাচ্ছে। কথাগুলো মোটেও ভুল নয়। দিব্য পূনরায়,

‘আমি তোমার আপুকে ভালোবেসেছিলাম, আর সে তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসত বলেই তোমার প্রতি আমার একধরণের স্নেহ কাজ করে। আমি তোমার জীবনটা নষ্ট হোক তা চাই না। এবার আমায় একটা কথা খুব ভেবেচিন্তে বলো তো নবনী। তুমি আসলে কেন এই বিয়েটা করলে? দিয়ার দোহাই দিও না। কারণ ওটা কোনো জোরালো যুক্তি হতে পারে না। তুমি কি সত্যিই বাকি জীবনটা ‘মিসেস দিব্য তালুকদার’ হয়ে কাটাতে পারবে? যদি তোমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয় তবে আমি আমার দিক থেকে সম্পর্কের মর্যাদা রাখার সবটুকু চেষ্টা করব। তবে মনে রেখো। এই সিদ্ধান্তের মাঝে যেন দিয়া না থাকে। দিয়া তখনই পূর্ণভাবে তোমার হবে। যখন আমি আর তুমি একে অপরের হতে পারব।’
নবনীর মনে হলো চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। দিব্য তাকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যেখানে দিয়ার প্রতি ভালোবাসা আর নিজের ভবিষ্যত। নবনীর বুকের ভেতরটা এক নিদারুণ হাহাকারে ভরে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকে সে ভালোবাসে না। এটাই চরম সত্য। তার হৃদয়ের গহিনে এখনো অন্য একজনের অস্তিত্ব অমলিন হয়ে আছে। অসীমের দেওয়া আঘাত আর জেদের বশবর্তী হয়েই সে এই অসম বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল; তখন একবারও ভাবেনি তার অনাগত ভবিষ্যৎ কতটা কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে। কিন্তু দিব্যর স্পষ্টবাদিতা আজ তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সত্যি তো, তার পুরো জীবনটাই তো সামনে পড়ে আছে। কিন্তু যার জন্য সে জীবন সাজাতে চেয়েছিল তাকে যখন পাওয়া হবে না। তখন অন্য কোনো স্বপ্নে বিভোর হয়ে লাভ কী? নবনী দৃষ্টি স্থির করে ধরা গলায় বলল,

‘আমার এই সম্পর্কে থাকতে কোনো সমস্যা নেই।’
দিব্য বোধহয় এত দ্রুত এমন সরাসরি উত্তর আশা করেনি। সে খানিকটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘ভেবে বলছো তো?’
নবনী ধীরস্থিরভাবে মাথা নাড়ল। তারপর অনেকটা সময় নিয়ে যোগ করল,
‘হ্যাঁ। তবে এটা সত্যি যে আমার কিছু সময় চাই। সবকিছু মেনে নেওয়া আমার জন্যও খুব একটা সহজ নয়।’
দিব্য বলল, ‘সময় আমারও প্রয়োজন নবনী। শুধু তোমার নয় শর্ত আমার দিক থেকেও আছে। সত্যি বলতে আমি নিজেও মানসিকভাবে এই সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত নই। হাসপাতালে আব্বুর সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর যখন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তখন উনাকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি বিয়ে করবো। তাই বাড়ির সবাই যখন তোমার কথা তুলল, আমার মনে হয়েছিল দিয়ার জন্য বাইরের কোনো অচেনা মানুষের চেয়ে তুমি অন্তত অনেক ভালো হবে। আমি চেষ্টা করব তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলো গড়ে তুলতে। আর সেই সময়টুকু তোমাকে দিতে হবে। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরেও আমি ব্যর্থ হই, যদি তোমাকে মন থেকে মেনে নিতে না পারি তবে কথা দিচ্ছি। আমি নিজে তোমাকে এই গ্লানিময় সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেব। তোমাকে কোনো জোর করে আটকে রাখা হবে না। আর তোমার ভবিষ্যত সুন্দর করার দায়িত্ব আমার থাকবে।’

নবনী কথার পিঠে বলার জন্য কিছু খুঁজে পেলনা। তার কেনো যেন ভীষণ কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে কোনো গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। যার পারতে পারতে সে শুধু যন্ত্রণায় পাচ্ছে। দিব্য পুনরায় সোফায় গিয়ে বসলো। ল্যাপটপ তুলে নিয়ে কাজে মন দিলো। নবনীকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
‘তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো? লাইট অফ করে শুয়ে পড়ো। ও হ্যাঁ, নবনী?’
নবনী মুখ তুলে চেয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল, ‘আর কিছু বলবেন?’
‘দেখো, আমি তোমাকে আমার সবকিছু বলেছি। আমরা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ব্যাপারে সবকিছু জানার অধিকার দু’জনের আছে৷ তোমার মনে যদি কখনো আমাকে নিয়ে কোনো কৌতূহল থাকে নির্বিধায় জিজ্ঞেস করতে পারো। তেমনি আমিও আশা করবো তুমি ও আমার প্রতি সৎ থাকবে। কারন বিশ্বাসঘাতক আমার পছন্দ নয়।’
নবনী মৃদু মাথা নাড়লো শুধু। কান্নার তোপে কথা বলা মুশকিল। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে লাইটের সুইচ অফ করলো। অতঃপর বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো। চোখের জমে থাকা অশ্রু কণা গাল বেয়ে বালিশে পড়লো নবনীর৷ ওই ভাবে কিছুক্ষণ কাটার পর নবনী অনুভব করলো দিব্য বিছানার অপর পাশে শুয়েছে।

ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানালার পর্দা চুঁইয়ে ঘরে এসে পড়েছে। দিব্য তার প্রাত্যহিক নিয়ম মেনে জিম সেরে রুমে ফিরল। দরজার কাছে আসতেই তার পা দুটো থমকে গেল। এক অদ্ভুত প্রশান্তিময় দৃশ্য তার চোখে ধরা দিল। নবনী অঘোরে ঘুমোচ্ছে আর তার বুকের মাঝে দিয়া যেন পৃথিবীর সবটুকু নিশ্চিন্ততা নিয়ে লেপ্টে আছে। মাসুম এই শিশুটির মুখ আর নবনীর শান্ত অবয়ব দেখে দিব্যর বুকের গহিনে কোথাও একটা দীর্ঘশ্বাস জমা হলো। সে সন্তর্পণে ওদের মাথার কাছে গিয়ে ফোনে অ্যালার্ম বাজিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ শব্দে নবনী আর দিয়া দুজনেই একসাথে চোখমুখ কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলল। ওদের সেই বিরক্ত মাখা ঘুমের চেহারা দেখে দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। নবনী চোখ পিটপিট করে তাকাতেই সামনে সুঠাম দেহের দিব্যকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল। তার অবস্থান বুঝে আড়ষ্টতায় নিজেকে গুটিয়ে নিল। দিব্য তার আড়ষ্টতা খেয়াল করল বটে কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে দিয়ার গায়ে আলতো করে হাত রাখল।

‘প্রিন্সেস, উঠে পড়ো তো মা। অনেক বেলা হয়েছে। স্কুলে যেতে হবে তো!’
নবনী চাদরটা ঠিক করে নিয়ে দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলল,
‘আজকে স্কুলটা থাক না? মানে… আজ তো ওই বাড়ি থেকে সবাই আসবে। দিয়া থাকলে ভালো হতো।’
দিব্য হাতটা সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ স্থির চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আজ আর স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি কি এখন ওয়াশরুমে যাবে? আমি শাওয়ার নেব। বেশ খানিকটা সময় লাগবে।’
নবনী দ্রুত বিছানা ছাড়ল। ‘আমাকে শুধু পাঁচটা মিনিট দিন। এমনিতে আজও আমি দেরি করে ফেলেছি। আপনি না ডাকলে তো টেরই পেতাম না যে সকাল হয়ে গেছে! কি বিশ্রি একটা ব্যাপার।’
নবনী ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দিব্য ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্যও তাদের চোখাচোখি হলো না। দুজনেই এক অদৃশ্য জড়তা এড়িয়ে চলতে চাইছে। নবনী আর ঘরে না থেকে দ্রুত ড্রয়িং রুমের দিকে পা বাড়াল। বাইরের হলঘরটা তখনো বেশ নিস্তব্ধ; বাড়ির বাকি সদস্যরা এখনো উঠেনি বোধহয়। কেবল রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দের আসছে। সেখানে গিয়ে দেখল অলেখা ব্যস্ত হাতে কিছু করছেন। আর মিলু নিপুণ হাতে মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছে। নবনী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল,

‘গুড মর্নিং, আন্টি।’
অলেখা ফিরে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসলেন। হাতের কাজ না থামিয়েই বললেন,
‘গুড মর্নিং নবনী। বেশ সকালেই উঠে পড়েছো দেখছি। তবে একটা কথা ওই ‘আন্টি’ ডাকটা কিন্তু আর চলবে না। এখন থেকে ‘আম্মা’ বলে ডাকবে।’
নবনী আড়ষ্টতায় মাথা নোয়ালো। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি কি চা করছেন? আমি কি একটু সাহায্য করব? অন্য রান্নাবান্না অত ভালো না জানলেও চা-টা কিন্তু আমি মন্দ বানাই না।’
‘চা তো এ বাড়িতে চলতেই থাকবে। এ এক বিরাট কাহিনি! এ বাড়িতে একেকজনের একেক রকম পছন্দ। কারো কড়া লিকার, কারো দুধ-চিনি ছাড়া। আমি এখন আপাতত তোমার শ্বশুরের আর আমার জন্য বানাচ্ছি। তুমি বরং এক কাজ করো। দিব্যর জন্য এক কাপ কফি করে ওর ঘরে নিয়ে যাও। ও সকালে কফি ছাড়া কিছুই বোঝে না।’
নবনী মৃদু স্বরে ‘আচ্ছা’ বলে কফি বানাতে মন দিল। মনে মনে সে এক অদ্ভুত দোটানায় পড়ল। তার কফির কাপে চিনির পরিমাণটা ঠিক কতটা হলে সে খুশি হবে? অলেখা চলেগেছেন ততক্ষণে। নবনীর দ্বিধাগ্রস্ত মুখ দেখে মিলু জিজ্ঞেস করল,

‘কোনো সমস্যা, ভাবি?’
নবনী একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আচ্ছা, তোমার ভাইয়া কফিতে কতটা চিনি খান? মানে চিনির পরিমাণটা ঠিক কেমন হতে হবে?’
মিলু উত্তর দিল, ‘উনি তো চিনিই খান না। আপনি কোনো রকম চিনি ছাড়াই নিয়ে যান, নিশ্চিন্তে।’
কথাটা শুনে নবনী মনে মনে বেশ অবাক হলো। চিনি ছাড়া কফি! সে জানে অনেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য চিনি এড়িয়ে চলে কিন্তু নবনীর কাছে এই বিষয়টাই কেমন যেন বিস্বাদ লাগে। চিনি ছাড়া কফি বা চা দুটোই যেন তার কাছে এক অদ্ভুত কষকষ অনুভূতির নাম। ভাবল, মানুষটা যেমন কাঠখোট্টা তার কফিটাও বুঝি তেমনই বিস্বাদ হওয়া স্বাভাবিক। নিজের এই কিম্ভুতকিমাকার ভাবনায় নিজেই একটু বিরক্ত হলো নবনী।

কফির কাপ হাতে নবনী ঘরে ঢুকে দেখল দিব্য এখনো বেরোয়নি। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে কফিটা সোফার সামনের টি-টেবিলে রাখল। বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল দিয়ার চোখের পাতা মৃদু কাঁপছে। নবনী চট করে বুঝে নিল খুদে রাজকন্যা অনেক আগেই ঘুমের দেশ থেকে ফিরে এসেছে। সে পা টিপে টিপে বিছানার পাশে গিয়ে নিচু স্বরে ডাকল,
‘দিয়া, তুমি কি জেগে আছো? দিয়া সোনা!’
দিয়া কোনো সাড়াশব্দ দিল না; নিস্পন্দ হয়ে পড়ে থেকে ঘুমের অভিনয় চালিয়ে যেতে লাগল। নবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে অতর্কিতে দিয়ার পেটে সুড়সুড়ি দিতেই মেয়েটা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি হয়ে জড়িয়ে ধরল নবনীকে। নবনীও হাসতে হাসতে বলল,
‘আমি জানতাম তুমি জেগে আছো। মাম্মার সাথে বুঝি খুব ড্রামা করা হচ্ছিল, না?’
দিয়া হাসতে হাসতেই বলল, ‘মাম্মা স্টপ!’
বলেই সে পালটা নবনীকে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল দিব্য। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সে থমকে গেল। মা-মেয়ের এই অনাবিল খুনসুটি আর হাসির কলরবে তার গুমোট ঘরটা যেন আজ হুট করে রঙিন হয়ে উঠেছে। এক অদ্ভুত শান্তিময় সুখের আবেশ তার ভেতরটায় ভরে যাচ্ছে। দিব্য মনে মনে খুব করে চাইল নবনী যেন কখনো ‘অবনী’ না হয়ে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের এই অবাধ্য ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হলো সে। অবনীকে তো সে ঘৃণা করতে শিখেছে। তাকে ভুলে যাওয়াই ভালো। যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সে গেছে তাতে ঘৃণাটুকুই কেবল তার প্রাপ্য। ভাবনাচ্ছন্ন দিব্যর দিকে চোখ পড়তেই নবনীর হাসির দমক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। দৃশ্যটা দেখামাত্র সে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। দিব্যর পরনে কেবল একটি ট্রাউজার। গলায় ঝোলানো তোয়ালে। উন্মুক্ত ঊর্ধাঙ্গের সুগঠিত পেশি আর সুঠাম শরীরের প্রতিটি রেখা পৌরুষের প্রখরতা নিয়ে দৃশ্যমান। এমন এক আকস্মিক পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত নবনী তীব্র লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। দিব্য মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। তার সুঠাম, সুগঠিত দেহের উন্মুক্ত উপরিভাগ থেকে এখনো জলের কণা চুঁইয়ে পড়ছে। প্রশস্ত কাঁধ আর মেদহীন পেটের পেশিগুলো পেশীবহুল দৃশ্যমান। ভেজা চুল। নবনী সচরাচর এমন দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত নয়। তীব্র এক লজ্জার ঢেউ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো। গণ্ডদেশ রক্তিমাভ হয়ে উঠল। নবনী চোখের পলকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার হৃদপিণ্ড তখন যেন ড্রাম বাজাচ্ছে। নিজেকে একটু সহজ করতে সে দিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি তো জেগেই ছিলে। তবে ওভাবে ঘুমের ভান করে অভিনয় করছিলে কেন?’
দিব্য ততক্ষণে আলমারি থেকে একটা হালকা নীল শার্ট বের করে পরতে শুরু করেছে। দিয়া আড়চোখে একবার বাবার দিকে তাকিয়ে নবনীর পেছনে একটু লুকিয়ে পড়ল। নবনী ইশারায় ওকে আশ্বস্ত করতেই দিয়া ফিসফিস করে বলল,
‘আমি স্কুলে যেতে চাই না। আজ একটুও ভালো লাগছে না মাম্মা।’
নবনী এক মুহূর্ত দেরি না করে সায় দিল, ‘আচ্ছা।’
দিয়া যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে বড় বড় চোখ করে একবার নবনীর দিকে, আর একবার দিব্যর দিকে তাকাচ্ছে। দিব্য তখন হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল। দিয়া পুনরায় নবনীকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করল,
‘সত্যি বলছো মাম্মা? পাপ্পা কিছু বলবে না? আমার সত্যিই স্কুলে যেতে হবে না?’
দিব্য খাটের পাশে এগিয়ে এল। মেয়েকে কোলে টেনে নিয়ে দাঁড় করাল। তারপর দিয়ার নাকে আলতো করে টিপ দিয়ে বলল,

‘হ্যাঁ মা, আজকের মতো তোমার ছুটি। আজ বাড়িতে অনেক মেহমান আসবে তো। তাই তোমার থাকাটা দরকার। তবে একটা কথা। তোমাকে কিন্তু আজ খুব ‘গুড গার্ল’ হয়ে থাকতে হবে। মনে থাকবে তো?’
বাবার মুখে এমন অভাবনীয় ছুটির কথা শুনে দিয়া খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে প্রবল উৎসাহে মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী দিয়ার হাত ধরে বলল,
‘দিয়া চলো এবার ফ্রেশ হতে হবে। দাঁত ব্রাশ না করলে কিন্তু মেহমানরা পচা মেয়ে বলবে। চলো যাই।’
দিয়াকে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে নবনী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। দিব্যর পান সরাসরি না তাকিয়ে সোফার টেবিলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নিচু স্বরে বলল,
‘আপনার কফি… ওখানে রাখা আছে।’

দিব্য বুঝতে পারল কথাটি তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। সে মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই দিব্য এগিয়ে গিয়ে মগটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু প্রথম চুমুকটা দিতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। কফিটা ধোঁয়া ওঠা গরম থাকার কথা ছিল। কিন্তু তা এখন পুরোপুরি জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে। দিব্য মগটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শরবতের মতো পুরো কফি শেষ করে ফেলল।

‘হ্যাঁ অসীম, তুমি ওই ফাইলগুলো নিয়ে সোজা বাড়িতে চলে এসো। আজ আমার আর অফিসে যাওয়া হচ্ছে না।’
দিয়াকে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতে গিয়েও নবনী ঠিক দরজার মুখেই থমকে দাঁড়াল। কথাগুলো তার কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। ‘অসীম’ নামটা শোবামাত্রই তার মস্তিষ্কের নিউরনে এক তীব্র ঝনঝনানি অনুভব করল সে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেল। বারবার কেন এই একই নামের গোলকধাঁধায় তাকে পড়তে হচ্ছে? কেন নিয়তি তাকে সেই পুরোনো ক্ষতের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে বারবার? দিব্য ফোনের ওপাশে আরও কিছু কথা বলছিল। কথার ধরনে বোঝা গেল, অফিসের কোনো জরুরি ফাইল বা নথিপত্র নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু নবনীর ভাবনার জগৎ তখন বিশৃঙ্খল।

এই অবেলায় পর্ব ৩

নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল নবনী। যান্ত্রিক হাতে দিয়ার রেশমি চুলে ব্রাশ চালিয়ে দিল। তারপর সুন্দর হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে পরিপাটি করে চুলগুলো বেঁধে দিল। দিয়া আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে খুশি হলেও নবনীর চোখ দুটো তখন শূন্য। জোরপূর্বক হাসলো সে। দিব্য একবার আড়চোখে মেয়ের ফিটফাট সাজটা দেখে নিল। তার দৃষ্টিতে ক্ষণিকের জন্য হলেও একটা প্রশান্তির রেশ ফুটে উঠল। এরপর কোনো কথা না বাড়িয়ে সে আবারও ল্যাপটপ খুলে কাজে নিমগ্ন হয়ে পড়ল।

এই অবেলায় পর্ব ৫