এই অবেলায় পর্ব ৫
সুমনা সাথী
নবনীর বাপের বাড়ি থেকে লোক বলতে তেমন কেউ আসেনি। যেহেতু বিয়েটা অনেকটা ঝড়ের বেগে আর খুব সাধারণ আয়োজনে হয়েছে। তাই বড় কোনো জমায়েতও আশা করা যায়নি। নবনীর বাবা-মা, ছোট বোন অনিতা আর একমাত্র ভাই অনিক আসলো। নবনী বসার ঘরে তাদের সাথে গল্পে মশগুল থাকলেও তার মনের কোণে তখন এক অন্য অস্বস্তি। বাড়ির বাকি সদস্যরা আজকের দিনটাকে কেন্দ্র করে বেশ ব্যস্ত। রান্নাঘর থেকে সুস্বাদু সব খাবারের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ওদিকে দোতলায় দিব্যর ঘরে কাজ নিয়ে ব্যস্ত অসীম। দিব্য ল্যাপটপে ডুবে থাকলেও অসীমের হাত চলছে না। তার মনের ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দিয়া ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। দিব্যর দিকে দৌড়ে যেতেই সে গম্ভীর স্বরে বলল,
‘আস্তে মাম্মা, পড়ে যাবে তো! কিছু বলতে চাও?’
দিয়া বড় বড় চোখে মাথা নাড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
‘অতিথিরা তো সব চলে এসেছে পাপ্পা। তোমাকে নিচে ডাকছে মাম্মা।’
‘মাম্মা’ শব্দটা শুনতেই অসীমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। নবনীর প্রতি তার সেই পুরনো আবেগ কবেই কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। অন্য একজনের সাথে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে নবনীকে তার অসহ্য এক বোঝা মনে হতো। চেয়েছিল যেকোনোভাবে একটা নিষ্কৃতি। কিন্তু আজ যখন নবনীকে এই রাজপ্রাসাদ সম বাড়িতে, দিব্যর মতো প্রভাবশালী এক মানুষের পাশে দেখল। তখন তার সুপ্ত ইর্ষাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। নবনী তার চেয়ে ঢের ভালো অবস্থানে আছে। এই সত্যটা অসীম কিছুতেই হজম করতে পারছে না। দিব্য ল্যাপটপ বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অসীমের অস্থিরতা তার নজরে না এলেও সে সৌজন্যের খাতিরে বলল,
‘অসীম, চলো নিচে যাওয়া যাক। নাস্তা খেয়ে আসবে চলো।’
অসীম নিজেকে সামলে নিয়ে এক কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলল,
‘না স্যার, আমি বাড়ি থেকে খেয়েই এসেছি। আপনি বরং যান। আমি এখানে বসে বাকি কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।’
দিব্য আর কথা বাড়াল না। দিয়ার ছোট হাতটা মুঠোয় নিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে এল। বসার ঘর থেকে তখন হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। নবনীর পরিবারের সাথে তালুকদার বাড়ির বাকিরা যেন মিশে গেছে। দিব্যর আগমনে ঘরের গুঞ্জন কিছুটা স্তিমিত হলো। সে খুব মার্জিত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল নবনীর বাবার দিকে। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘কেমন আছেন আব্বু? আপনার শরীর এখন ঠিক আছে তো?’
মনিরুল সাহেবের মুখে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। অভাবের সাথে তার নিত্যদিনের লড়াই কিন্তু দিব্যর বদান্যতায় সেই যুদ্ধের তীব্রতা এখন অনেকটাই কম। দিব্য তাকে কখনো অভাবী শ্বশুর হিসেবে দেখেনি বরং নিজের বাবার মতোই সম্মান দিয়েছে। বৃদ্ধের বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। তবে সেই সাথে এক ধরণের কুণ্ঠাও কাজ করে। তিনি ধীর স্বরে বললেন,
‘এই তো আব্বু, আল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ ভালো রেখেছেন। এসো বসো।’
দিব্য সহজভাবেই পাশে দাঁড়িয়ে নবনীর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আম্মু, আপনি ভালো আছেন তো? আর তোমরা দুজন। অনিক, অনিতা কেমন আছো?’
আনিকা বেগম মৃদু হেসে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি ভালো আছেন। অনিক আর অনিতাও মাথা নেড়ে তাদের কুশল জানাল। দিব্য চারপাশটা একবার দেখে নিল কিন্তু নবনীকে বসার ঘরে দেখতে পেল না। সে আন্দাজ করল নবনী বোধহয় রান্নাঘরেই আছে। তার অবশ্য আচমকায় অসীমের কথা স্মরণে এলো। ছেলেটা সকাল সকাল এসেছে তাকে কোনো নাস্তা তো দূর এককাপ কফি ও দেওয়া হয়নি। অন্তত এককাপ কফি তো দেওয়ায় উচিত। দিব্য সপ্রতিভ গলায় বলল,
‘আপনারা একটু বসুন। আমি এখনি আসছি। আমার একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ওপরের ঘরে কাজ করছে ওর জন্য কিছু নাস্তা পাঠাতে হবে। আমি বলে এসেই আপনাদের সাথে জয়েন করছি।’
আনিকা বেগম স্নেহের সুরে বললেন, ‘ঠিক আছে বাবা, তুমি যাও।’
রান্নাঘরে তখন ব্যস্ততার তুঙ্গে। তালুকদার বাড়ির নিয়মটাই এমন; বাইরের যত কাজই লোক দিয়ে করানো হোক না কেন, হাঁড়ির খবর আর রান্নার দায়িত্বটা বাড়ির মেয়েরাই নিজেদের হাতে রাখেন। অলেখা রান্নায় ব্যস্ত। মাজহা নিপুণ হাতে তরকারি কাটছেন। মিলু আর মৌনিতাও তাঁদের হাতে হাত মেলাচ্ছে। নবনীকে তারা আজ জোর করেই বসার ঘরে পাঠিয়েছিলেন যাতে সে বাবা-মাকে সময় দিতে পারে। কিন্তু নবনী মাত্রই রান্নাঘরে এসে দাঁড়িয়েছিল কিছু সাহায্য করার জন্য। এমন সময় দিব্যকে আচমকা রান্নাঘরের চৌকাঠে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। অলেখা খুন্তি হাতে নিয়েই ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী রে দিব্য, কিছু দরকার তোর?’
দিব্যর দৃষ্টি একবার নবনীর ওপর দিয়ে ঘুরে গেল। নবনীও উৎসুক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পুরো রান্নাঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল।
দিব্য শান্ত গলায় বলল,
‘হ্যাঁ, জানোই তো অসীম এসেছে। জরুরি কিছু কাজ আছে বলে ওকে আসতে বলেছি। ও আমার ঘরেই আছে। ওর জন্য কিছু নাস্তা আর কফি পাঠিয়ে দিও কেউ।’
কথাটা শেষ করেই উত্তরের অপেক্ষা না করে সে বেরিয়ে গেল। নবনী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। অসীম নামটা তার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অথচ এই বাড়ির কেউ জানে না। যে মানুষটির জন্য আজ নাস্তা সাজানো হচ্ছে একসময় তার সাথেই নবনীর জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো সাজানো হয়েছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল ইহান। তার চোখমুখ লাল, টলমল করছে অশ্রু। মাজহা আঁতকে উঠে বললেন,
‘কী করছো দাদুভাই! এভাবে পাগলের মতো ছুটছো কেন? কোনো চোট লেগেছে?’
মৌনিতা কাজ ফেলে ছেলেকে দুহাতে ধরে দাঁড় করালো। ইহান আর সামলাতে পারল না। ফোঁপানি ছেড়ে কেঁদে দিল। মৌনিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কী ব্যাপার? কাঁদছো কেন আবার? কার সাথে ঝগড়া করেছো?’
ইহান কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় অভিযোগের সুরে বলল,
‘তুমি এখনই চলো মাম্মা! ইভান আমাকে অকারণেই মেরেছে। আর পাপ্পা? সে তো ইভানের পক্ষ নিয়ে উল্টো আমাকেই ধমক দিয়েছে। পাপ্পা বলেছে আমি নাকি তোমার প্রশ্রয় পেয়ে মাথায় উঠে যাচ্ছি। আমাকে আর তোমাকে নাকি এই বাড়ি থেকে বের করে দেবে!’
অলেখা আর মাজহা একে অপরের দিকে বিস্ফোরক দৃষ্টিতে তাকালেন। মৌনিতা রাগে ফুঁসতে শুরু করল। তার নিজের আত্মসম্মানে যেন কেউ বিষাক্ত তীর ছুঁড়েছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘তোর পাপ্পা সত্যি এমন কথা বলেছে? এত বড় সাহস ওর! চলতো পাপ্পার কাছে।’
মৌনিতা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ইহানের হাত ধরে গটগট করে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। অলেখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাস্তার ট্রে-তে খাবার সাজাতে লাগলেন। কিন্তু তার হাত যেন আর আগের মতো সচল হচ্ছে না। অলেখা কিছুটা ইতস্তত করে আমতা আমতা করে বললেন,
‘নবনী, কিছু মনে না করলে তুমি একটু নাস্তাটা দিব্যর ঘরে দিয়ে আসবে? আসলে মৌনিতা তো রেগেমেগে ওদিকে চলে গেল। আর মিলু অসীমের সেবা করুক এটা দিব্য একদম পছন্দ করে না। ওর ধারণা, বাড়ির কাজের লোক দিয়ে নাস্তা পাঠালে অসীম নিজেকে ছোট ভাববে। এটা নাকি ওকে অপমান করা হবে।’
নবনীর পায়ের তলার মাটি যেন সরে যেতে চাইল। যে মানুষটার ছায়া মাড়াতেও সে আজ কুন্ঠিত তার সামনেই গিয়ে দাঁড়াতে হবে নাস্তার ট্রে হাতে? নিয়তি বোধহয় অট্টহাসি হাসছে। তবে অলেখা বেগমের এই সকাতর অনুরোধ সে ফেলতে পারল না। নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে পাথর চাপা দিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে ম্লান হাসল। বুকের ধড়ফড়ানি আড়াল করে নবনী বলল,
‘কোনো সমস্যা নেই আম্মা। আমি দিয়ে আসছি।’
বসার ঘরের মাঝখানে তখন কানামাছি খেলার হুল্লোড় চলছে। কাব্য, কলরব, কুহু, অনিতা আর অনিকদের সাথে দিয়া আর ইভানও মেতেছে সেই আনন্দে। কাব্যর চোখ শক্ত করে বাঁধা। সে হাতড়ে হাতড়ে কাউকে ধরার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মৌনিতা সেখানে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখা মাত্রই উপস্থিত সবার হাসাহাসি থেমে গেল। মৌনিতার থমথমে মুখ আর অগ্নিঝরা দৃষ্টি দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে রেগে আছে। কাব্য তখনো কিছু টের পায়নি। সে হুট করে সামনে থাকা মৌনিতাকে দুইহাতে ধরল। তারপর চোখের কাপড় না খুলেই বেশ রসিকতা করে বলে উঠল,
‘এই তো ধরেছি! এটা কে? কুহু… তুই কবে থেকে এমন আলুর বস্তার মতো হয়ে গেলি রে?’
কাব্যর এই বেফাঁস মন্তব্যে কলরবসহ বাকিরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কিন্তু মৌনিতার ভেতরটা তখন রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম। সে ঝটকা দিয়ে কাব্যর চোখ থেকে কাপড়টা সরিয়ে দিল। কাব্য চোখের বাঁধন মুক্ত হতেই সামনে রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করা স্ত্রীকে দেখে শুকনো ঢোক গিলল। নিজের ভুল বুঝতে পেরে পরিস্থিতি সামলাতে এক চিলতে জোরপূর্বক হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল,
‘আরে, সোনা তুমি! তুমিও আমাদের সাথে খেলবে? বাহ্ খুব ভালো ব্যাপার তো!’
মৌনিতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আমি তোমার কাছে আলুর বস্তা হয়ে গেছি, কাব্য?’
কাব্যর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। মৌনিতা আবার গর্জে উঠল,
‘তুমি নাকি বলেছ আমাকে আর আমার ছেলেকে এ বাড়ি থেকে বের করে দেবে? আমি মুটিয়ে গেছি বলে কি এখন নতুন করে বিয়ের শখ জেগেছে? তাই আমাদের বিদায় করতে চাইছ?’
কাব্য অবাক হলো না ঠিকই তবে তার মনের গহীনে এক সুপ্ত অপরাধবোধ জেগে উঠল। মা হওয়ার পর মৌনিতার সেই ছিপছিপে গড়নটা বদলে গেছে। শরীরে মেদ জমেছে কিছুটা এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সে অন্য কাউকে বিয়ে করবে বা মৌনিতাকে তাড়িয়ে দেবে; এটা তো সে কল্পনাতেও ভাবেনি কখনো। মেহমানদের সামনে এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়ে কাব্যর মেজাজও বিগড়ে গেল। সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলল,
‘দেখো মৌনিতা, বাড়িতে অতিথি আছে। এই সময়ে এমন আজেবাজে কথা কেন বলছ? আর আমি ঠিক কখন তোমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছি বলবে কি?’
মৌনিতা আর কোনো তর্কে গেল না। তার দুচোখ অশ্রুতে টলমল করে উঠলো। সে শুধু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
‘ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। কাল সকালেই আমি বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি। তুমি তখন যা খুশি করতে পারো! আামকে ও আর দেখতে হবেনা তোমায়।’
কথাটা বলেই মৌনিতা গটগট করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কাব্যকে সাফাই গাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিলো না। কাব্য অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজের স্মৃতি হাতড়ে দেখার চেষ্টা করল কখন সে এমন নিষ্ঠুর কথা বলল? অনেক ভেবে মনে পড়ল, ইহান যখন ইভানকে মারছিল তখন কাব্য শাসনের সুরে বলেছিল। পরের বার ভাইকে মারলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে! অথচ ধূর্ত ছেলেটা নিজের পিঠ বাঁচাতে মায়ের কাছে গিয়ে কথাটাকে কত ভয়ঙ্করভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করেছে! ইহানের দিকে তাকাতেই দেখল ছেলেটা অপরাধীর মতো মুখ করে দৌড়ে পালাচ্ছে। ওদিকে কলরব হো হো করে হাসছে। কাব্য বিরক্ত হয়ে বলল,
‘হাস, যত খুশি হাস! এই হচ্ছে বিবাহিত জীবন। কদিন পর যখন নিজে এই ফাঁদে পা দিবি তখন হাড়ের হাড় টের পাবি। তখন আমিও বসে বসে তোর দশা দেখব আর হাসব।’
কলরব দম্ভের সাথে বুক ফুলিয়ে বলল, ‘আরে রাখ তোর ভয় দেখানো! আমি কি তোর মতো বউয়ের ভয়ে কাঁপা-কাঁপি করার লোক নাকি? আমার হবু বউ তো আমাকে ‘জান’ ছাড়া সম্বোধনই করে না। সে হবে একদম লক্ষ্মী বউ।’
কাব্য একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, ‘জান, তাই না? ঠিক আছে দেখা যাবে। আমি আজ তোকে একটা ভবিষ্যৎবাণী করে গেলাম। তোর বউ তোকে শুধু মুখে বলবে তা নয়, উঠতে-বসতে চড়-থাপ্পড়ও দেবে। কথাটা মিলিয়ে নিস!’
কলরব তবুও দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগল। যেন এমনটা হওয়া অসম্ভব। কিন্তু কাব্য আর কথা বাড়াল না; খেলা ফেলে সে দ্রুত মৌনিতার পিছু ছুটল। মৌনিতা এমনিতেই অভিমানী মেয়ে। একবার রাগলে তাকে মানানো সাধ্যের অতীত।
বুকের ভেতরটা তপ্ত বালুর মতো খাঁ খাঁ করছিল নবনীর। তবু বাইরের আবরণে এক কঠিন শীতলতা নিয়ে সে দিব্যর ঘরে পা রাখল। দরজায় মৃদু করাঘাত করতেই অসীম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নবনীকে দেখা মাত্রই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। কোনো বাক্য বিনিময় না করে নবনী ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নাস্তার ট্রে-টা টি-টেবিলের ওপর রাখল। অসীম আজ অবাক বিস্ময়ে নবনীকে খুঁটিয়ে দেখছে। পরনে ঘন কালো রঙের জর্জেট শাড়ি, কানে মানানসই দুল আর গলায় সোনার একটি চিকন হার। হাতে চওড়া রুলি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা অসীমের চোখ ধাঁধিয়ে দিল, তা হলো নবনীর অনামিকায় থাকা সেই হিরের আংটি। অসীম খুব ভালো করেই জানে আংটিটার দাম; কারণ দিব্য তাকে সাথে নিয়েই এটি চড়া দামে কিনেছিল। অসীম সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি দিলেও নবনীকে এমন একটা রিং দেওয়ার বিলাসিতা করতে পারত না। আভিজাত্যের এই প্রলেপে নবনীকে আজ ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো মোহময়ী লাগছে।
নবনী কাজ শেষ করে চলে যেতে উদ্যত হতেই অসীম ডেকে উঠল,
‘অনী?’
নিজের ডাকনামটা কানে আসতেই নবনীর পা দুটো যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। বুকের অলিন্দে এক অসহ্য মোচড় অনুভূত হলো তার। তবে সে দুর্বল হলো না; বরং ইস্পাতের মতো কঠিন স্বরে সংশোধন করে দিল,
‘নবনী!’
অসীম বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে নবনীর সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়াতেই নবনী ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল। অসীম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বিষিয়ে ওঠা গলায় বলল,
‘এত পরিবর্তন? মাত্র দুদিনে স্বামীর অঢেল ঐশ্বর্য দেখে আমার দেওয়া নামটাও ভুলে গেলে? ‘অনী’ থেকে এক লাফে ‘নবনী’ হয়ে গেলে! বাহ্! এই নাকি তোমার ভালোবাসা? এই না বলতে আমায় ছাড়া বাঁচবে না?’
নবনীর চোখের কোল মুহূর্তেই টলমল করে উঠল। অসীমের সাথে থাকাকালীন নিজের নামের এই সংক্ষিপ্ত রূপটিই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় সম্বোধন। অসীমের সাথে মিলিয়ে অসীম নামটা দিয়ে ছিলো। কিন্তু আজ সেই নামই সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়ে ফিরে এল। নবনী অশ্রুসিক্ত নয়নে সরাসরি অসীমের চোখে চাইল। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
‘আমি কি তোমায় বলিনি অসীম, তুমি পস্তাবে? হ্যাঁ, আমি তোমার বিরহে নির্ঘাত মরে যেতাম যদি জানতাম মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তুমি কেবল আমারই ছিলে। কিন্তু তুমি তো নিজ হাতে আমাকে অন্ধকার গহ্বরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছ। এখন কেউ যদি এসে আমাকে সেই জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করে; তবে তার হয়ে আমি নতুন করে বাঁচব না কেন?’
নবনীর এই তীক্ষ্ণ পালটা জবাবে অসীমের মুখটা অপমানে কুঁচকে গেল। সে নিচু স্বরে বলল,
‘আসল সত্যিটা হলো নবনী, দিব্য তালুকদারের ওই বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে তুমি সব ভুলে গেছো। ভাগ্যিস আমি তোমাকে ছেড়েছি! সত্যি ভালোবাসলে এত সহজে অন্য কারো গলায় ঝুলে পড়তে পারতে না। আমার জন্য অপেক্ষা করতে।’
নবনী তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। সে শান্ত গলায় বলল,
‘মানে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখে ঘর বাঁধবে, আর আমি তোমার শোকে আ ত্মহ ত্যা করব? হাস্যকর ভাবনা তোমার অসীম! এবার পথ ছাড়ো আমার অনেক কাজ আছে।’
নবনী পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই অসীম অতর্কিতে তার বাহু চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল,
‘কী করবে শুনি? স্বামীকে বলেছ তোমার বিয়ের আগের প্রেমিকের কথা? সে কি জানে তার প্রিয়তমা স্ত্রী একটু আগেই নিজের প্রাক্তনকে যত্ন করে নাস্তা দিতে এসেছে?’
নবনী এক ঝটকায় অসীমের হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন আগুনের ফুলকি। সে কঠিন গলায় বলল,
‘নিজের সীমায় থাকো অসীম। একজন সামান্য অ্যাসিস্ট্যান্টের তার বস-এর স্ত্রীর সাথে এমন আচরণ মানায় না। আমি যদি এখন দিব্য তালুকদারকে তোমার এই বেয়াদপির কথা বলি। তবে তোমার পরিণাম কী হবে ভেবে দেখেছ?’
অসীম বাঁকা হেসে বলল, ‘দিব্য তালুকদারকে তোমার চেয়ে আমি অনেক ভালো চিনি নবনী। আমি তার সম্পর্কে যা যা জানি তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তাই আমাকে উস্কে দিও না। তাতে তোমারই ক্ষতি।’
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় দিব্যর ছায়া পড়ল। সে ভেতরে ঢুকে দুজনের মাঝখানের এই থমথমে পরিবেশ দেখে কিছুটা অবাক হলো। ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল,
‘কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা?’
দিব্যর ভরাট কণ্ঠস্বর কানে আসতেই নবনীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এক অজানা আশঙ্কায় তার হাত-পা হিম হয়ে এল। সে কী উত্তর দেবে ভেবে পাওয়ার আগেই অসীম তার ঠোঁটের কোণে একটা ধূর্ত হাসি ঝুলিয়ে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠল,
‘আসলে আপনাকে বলা হয়নি স্যার, নবনী আর আমি কিন্তু পূর্ব পরিচিত। তাই না নবনী?’
নবনীর মনে হলো তার চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এসেছে। দিব্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখন নবনীর মুখের ওপর স্থির। সত্য আর মিথ্যার এক ভয়ংকর দোলাচলে দাঁড়িয়ে নবনী বুঝতে পারল তার জীবনের নতুন অধ্যায়টা শুরু হওয়ার আগেই বুঝি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে চলেছে। নবনী এক পলক কঠিন দৃষ্টিতে অসীমের দিকে তাকাল। অসীম যেন এক চরম বিজয়ী। সে অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো নবনীকে উদ্দেশ্য করে চোখ টিপল। দিব্যর কণ্ঠস্বরে কোনো ভাবান্তর নেই। সে কেবল নিরাসক্তভাবে বলল,
‘আচ্ছা, তাই নাকি?’
নবনীর বুকের ভেতর তখন হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক স্পন্দন। না জানি এই শয়তানটা কী বলে বসে! নবনী মনে মনে ঠিক করেছিল সে নিজেই দিব্যকে সব সত্যি খুলে বলবে কিন্তু সেই সুযোগ বা সময় কোনোটিই সে করে উঠতে পারেনি। আর অসীম যে আজই এখানে এসে উপস্থিত হবে তা ছিল তার কল্পনাতীত। নিজের থেকে বলা আর অসীমের মুখ থেকে সত্য বের হওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। দিব্য যদি এখন ভুল বোঝে তবে পরিস্থিতি যে কতটা কদর্য হবে তা ভেবেই সে সিঁটিয়ে যাচ্ছে। অসীম একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
‘আমরা একই কলেজে পড়তাম। ক্লাসমেট ছিলাম আরকি।’
মুহূর্তেই নবনীর ফুসফুস থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। দিব্য কৌতূহলী চোখে নবনীর দিকে তাকাল। নবনী কেবল যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। অসীম আবারও নিজের জায়গায় গিয়ে আয়েশ করে বসল। নবনী আড়চোখে দেখল দিব্য স্থির দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নবনী চোখ তুলে তাকাতেই দিব্য খুব দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
‘তোমার গলার চেইনটা অলমোস্ট খুলে গেছে। সামলাও ওটা।’
নবনী চমকে উঠে গলায় হাত দিতেই চেইনটা আলগা হয়ে তার হাতের তালুতে চলে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে দিল এবং দুহাত উঁচিয়ে চেইনটা পুনরায় পরার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলের অবাধ্যতায় সে কিছুতেই হুকটা লাগাতে পারছিল না। দুহাত উপরে তোলায় তার শাড়ির বাঁধন কিছুটা আলগা হয়ে সুগঠিত ফর্সা উদর উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। দিব্যর চোখ পড়তেই অপ্রস্তুত হলো সে। চোখেমুখে এক ধরণের অস্বস্তি দানা বাঁধল তার। সে একবার আড়চোখে সোফায় বসা অসীমের দিকে তাকাল। অসীম সেদিকে পিঠ করে বসা৷ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। দিব্য হুট করেই নবনীর হাত থেকে চেইনটা নিয়ে নিল। নবনী হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকালেও দিব্যর কাজের ধরন বুঝে উঠতে পারল না। দিব্য এক হাত দিয়ে নবনীর কাঁধের আঁচলটা ঠিক করে নামিয়ে দিয়ে তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ এই নৈকট্যে নবনীর আড়ষ্টতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। দিব্য নিজের এক হাত দিয়ে নবনীর ঘাড়ের ওপর থেকে চুলগুলো একপাশে সরিয়ে সরিয়ে দিল এবং অত্যন্ত নিপুণতায় চেইনটা পরিয়ে দিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
‘যাও। নিচে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
নবনী যেন এই মুক্তির পরোয়ানাটুকুরই অপেক্ষায় ছিল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে এক প্রকার পালিয়ে গেল। অসীম সোফায় বসে ছিল ঠিকই কিন্তু সামনে থাকা ল্যাপটপের স্বচ্ছ স্ক্রিনে সে দিব্যর প্রতিটি স্পর্শ আর নবনীর আড়ষ্টতা স্পষ্ট দেখতে পেল। নিজের একসময়ের ভালোবাসাকে অন্য কারো এত কাছে দেখে অসীমের বুকের ভেতরটা ঈর্ষার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। অপমানে আর ক্ষোভে সে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল।
দুপুরের খাওয়ার টেবিলে যখন দিব্যর সাথে অসীম এসে বসল তখন যেন পুরো পরিবেশটা নবনীর জন্য এক দমবন্ধ করা খাঁচায় পরিণত হলো। টেবিলের অন্য পাশে বসে থাকা আনিকা বেগম অসীমকে দেখা মাত্রই স্থির হয়ে গেলেন। এই বাড়িতে অসীমের পরিচয় হয়তো কেবল দিব্যর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কিন্তু আনিকা বেগম তো জানেন এই ছেলেটাই একসময় নবনীর জীবনের কালবৈশাখী ছিল। তিনি তীক্ষ্ণ, প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে নবনীর দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে যেমন ছিল সতর্কতা তেমনি ছিল একরাশ দুশ্চিন্তা। নবনী মায়ের চোখের ভাষা পড়তে পারলেও সচেতনভাবেই দৃষ্টি এড়িয়ে গেল; কারণ এই মুহূর্তে কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় সে নেই।
এই অবেলায় পর্ব ৪
খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই নবনীর বাবা-মায়ের বিদায়ের সময় হয়ে এল। ঢাকা থেকে তাদের গন্তব্য বেশ দূরে তাই দেরি করা সম্ভব নয়। আনিকা বেগম বারবার চেষ্টা করলেন নবনীকে আড়ালে ডেকে অসীমের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে কিন্তু বাড়ির লোকজনের ব্যস্ততা কারণে সেই সুযোগ আর মিলল না। বিদায়বেলায় দিব্য খুব মার্জিতভাবে জানাল যে, নিয়ম মেনেই কাল সে নবনীকে নিয়ে তাদের বাসায় যাবে। মনিরুল সাহেব আর আনিকা বেগম আশ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। তবে যাওয়ার সময় আনিকার চোখের সেই অস্থিরতা নবনীকে বিদ্ধ করে দিয়ে গেল।
