এই ভালো এই খারাপ শেষ পর্ব
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
তিথি আজ একটা কেক অর্ডার করেছে। বেশ বড় সাইজের কেক। যাকে বানাতে দিয়েছে তাকে বলেছে কেকটার রঙ যেন কটকটে হলুদ রঙ হয়। কেকের উপর তার আর ডোডোর বাপের ছবি। তাও বিয়ের। ছবিটাতে তিথিকে বেশ বিচ্ছিরি লাগছিলো ঠিক কিন্তু এসব এখন যায় আসেনা।
কেকটা যারিফ আর আয়জা আসার পথে নিয়ে এসেছে। তিথির জন্য তারা গিফটও এনেছে। ডোডোর জন্য খেলনা গাড়ি।
কেকটা দেখে তিথির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আয়জাকে বলল,”হলুদ রঙ দিতে বলেছি না? এটা কি রঙ দিয়েছে? কালো কেক কেন কাটবো আমি? আমি কি কারো শোক পালন করছি? ধুর আর খেলবো না।”
আম্বিয়া বেগম বললেন,”তার ছিঁড়লো তো আবার?”
তিথি সোফায় মুখ গোমড়া করে বসে রইলো। আয়জা হেসে বললো,” তুমি ভাইয়াকে খুশি করতে চাওনা?”
তিথি বলল,”হুহ চাই।”
আয়জা বলল,”ভাইয়া এটা পছন্দ করবে।”
তিথি বললো, “ঠিক আছে তাহলে।”
আজলান রাত দশটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছালো। যারিফ আর আয়জাকে দেখে খুশি হলো। ওদের সাথে কথা বলার সময় ডোডো তাকে দেখে আম্বিয়া বেগমের কোল থেকে ঝাপটাঝাপটি ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল। আজলান তার জন্য আনা মিনি কেক আম্বিয়া বেগমের হাতে দিয়ে বললো,
“এটা ওকে খেতে দাও। ওর হাতে দিওনা। তুমি খাইয়ে দাও।”
আম্বিয়া বেগম কেকটা নিয়ে ডোডোর গালে চুমু খেয়ে বললো,”কেক খাবে আমার ভাই?”
ডোডো কেকটা হাতে ধরতে না পেরে ভীষণ রাগত স্বরে ডাক দিলো,”দাদ্দাহ!”
আম্বিয়া বেগম হেসে উঠে বললো,”দিচ্ছি দিচ্ছি।”
তিথির লিপস্টিক একটু কমে গিয়েছিলো। সে আবারও লিপস্টিক পড়লো। লিপস্টিকের কালার হালকা খয়েরী রঙের। ডোডোর বাপ বলেছে এই লিপস্টিকটা তাকে দারুণ মানায়। লিপস্টিক পড়া শেষ হতে না হতেই আজলান অনেক জিনিসপত্র হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। তিথি খুশি হয়ে গেল। আজলান তার দিকে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো তারপর বিছানায় বসে বললো,
“এত সাজগোজের কি আছে?”
তিথি এসে তার কোলের উপর বসে বললো,”আগে আমার কথা শুনো। অর্ডার দিলাম হলুদ রঙের কেক। ওরা দিল কালো কুচকুচে।”
আজলান বলল,”আমি ফোন করে বলেছি কালো দেয়ার জন্য।”
তিথি রেগে গিয়ে বললো,”ওহহ আচ্ছা, আমি কালো সেজন্য তুমি কালো কেক বানাতে দিয়েছ? তুমি হলুদ রঙের বলে আমি তোমার জন্য হলুদ রঙের কেক অর্ডার দিয়েছি।”
আজলান বললো,”মাত্রই বাড়িতে ফিরলাম। আর তুমি শুরু করে দিয়েছ?”
তিথি নিজেকে শান্ত করে বললো,”আচ্ছা কিছু দেয়ার থাকলে দিয়ে দাও। আমি যাই। কাজ আছে।”
আজলান বলল,”বাহির থেকে এসেছি। হাতমুখ ধুইনি।”
তিথি জেদ ধরে বলল,”ধুতে হবে না।”
আজলান তাকে চুমু দিল গালে। তিথি বললো,”লিপস্টিকটা শুকনো। চুমু খেলে তোমার ঠোঁটে লিপস্টিক লাগবে না।”
আজলান তার ঠোঁটের কোণায় চুমু দিতেই কোল থেকে নেমে দৌড়ে দিতে দেরী নেই। আজলান গোসল করে বের হতেই তিথি এসে বললো,
“দাঁড়াও। তোমাকে আমি কখনো সাদা পাঞ্জাবি পড়তে দেখিনি। একবার এটা পড়ো।”
আজলান দেখলো একটা সাদামাটা সাদা রঙের পাঞ্জাবি। আইরন করা ছিল তাই সে আইরন না করিয়ে গায়ে দিল। চিরুনি হাতে নেবে তক্ষুনি তিথি চিরুনি কেড়ে নিয়ে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“দাঁড়াও, আমি আঁচড়ে দিই। খবরদার আর হাত দেবেনা।”
চুল আঁচড়ে দিয়ে হাত দিয়ে আবার এলোমেলো করে চুলগুলো একপাশে তুলে দিল তিথি। বললো,”এবার হিরো হিরো লাগছে। আসো তুমি।”
আজলান বললো,”আমি দুটো কেক এনেছি। একটা তোমার জন্য। অন্যটা ডোডোর জন্য।”
তিথি একদৌড়ে কেকের বক্সটা খুলতে লাগলো। হলুদ রঙের কেক! তিথি খুশি হয়ে দৌড়ে এসে আজলানের গালে চুমু খেয়ে আবার কেকের কাছে চলে এল। বললো,”ভালো কাজ করেছ। কিন্তু ডোডোরটা কি রঙের? ওর গায়ের রঙ কিন্তু মসুর ডাল বাটার পর যে রঙ আসে ওটা।”
আজলান বললো,”তুমি এতকিছু জানো কি করে?!
তিথি বললো,”আরেহ বিয়ের আগে আম্মা আমাকে কত মসুর ডাল বেটে মুখে লাগিয়ে বসিয়ে রাখতো একটু ফর্সা হওয়ার জন্য। আম্মা তখনকার মানুষ তো তাই কিচ্ছু বোঝেনা। আম্মা তো আসল কাহিনী জানেনা।”
আজলান অবাক কন্ঠে বললো,”কি জানে না?”
তিথি তার গাল টেনে দিয়ে বললো,”কালো মেয়েদের জামাই সুন্দর হয়। এইটা।”
আজলান তার হাত নামিয়ে দিয়ে বললো,”যত্তসব ফালতু কথা।”
তিথি বললো,”কিন্তু কেকটা তো অনেকটা ভেঙে গেছে।” সে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলে লোহার স্কেল বের করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিল। তারপর স্কেলটা দিয়ে এক পিস কেটে নিল। নিজে খেয়ে বাকিটা আজলানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“উম হেব্বি টেস্টি। মুখ মুছে ফেলো। কাউকে কিছু বলবো না আমরা কেক খেয়ে ফেলেছি ওদের আগে।”
আজলান বললো,”হ’য়েছে এবার চলো।”
তিথি চলে গেল তার পিছুপিছু। কেকটা বক্সে ভরে নিয়ে গেল। সবাইকে বললো, কেক কাটার পর খুলবো এটা। কি আছে সবাই ভাবতেও পারবে না। আজলান চুপচাপ তার কথা শুনছে।
কেক কাটার সময় আজলানের হাতটা টেনে এনে নিজের হাতের উপর রাখলো তিথি। কেক কেটে আজলানকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেয়ে বললো,”ওটার চাইতে এটা বেশি মজা। তাই না?”
আম্বিয়া বেগম বললেন,”কোনটা?”
তিথি বললো,”তোমার ছেলে যেটা এনেছে সেটা।”
সে সবাইকে কেক কেটে খাইয়ে দিল। রমলা চাচী বললো, “তোমাদের ঝগড়াঝাটি কমায় দিক আল্লাহ। অনেক বছর একসাথে বাঁচো।”
তিথি বললো,”এসব কোনো কথা বললে চাচী? ঝগড়া না করলে অনেক বছর বাঁচবো কি করে? ধুরোহ।”
সবাই হেসে উঠলো হঠাৎ। আফতাব শেখ বললেন,”বৌমা, আমার এত অল্প কেক দিয়ে হবে না। আমার বড় পিস চাই।”
তিথি বললো,”একটু সবুর করো বাপু। এমন রাক্ষুসে শ্বশুর হলে চলে?”
ডোডোকে কেক খাইয়ে দিল তিথি। ডোডোর কেক থেকে ততটুকু নিজেও খেয়ে নিল, আজলানকেও খাইয়ে দিল। আর কাউকে দিল না।
তারপর কেকের ক্রিম নিয়ে ডোডোর দুগালে লাগিয়ে দিতেই ডোডো খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়লো। তিথি তাকে আদর করতে করতে বললো,”কচুর মতো হাসে আমার ব্যাটা।”
ডোডো আজলানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। “এ্যাহ পাপ্পাহ! তার ডাক শুনে আজলান তাকে কোলে নিয়ে টিস্যু দিয়ে গাল মুছিয়ে দিয়ে বললো,” টিশার্টের কি অবস্থা করেছ? মেহবুব ওকে চেঞ্জ করিয়ে দাওনি কেন?”
তিথি বললো,”আমার মনে নেই।”
সে ব্যস্তপায়ে হেঁটে রান্নাঘরে চলে গেল। সে আজ কাচ্চি বিরিয়ানি রেঁধেছে। সবাই মিলে এখন খাবে। খাবার টেবিলে কাচ্চি বিরিয়ানি বাসনে বেড়েছে তিথি। সবাই খেতে বসলো। তিথি যারিফকে বললো,
“এই জামাই ভালো হয়েছে রান্না?”
যারিফ মাথা দুলিয়ে বললো,”হ্যা ভাবি। আপনার হাতের রান্না তো এমনিতেই ভালো।”
তিথি বললো,”এতবড় মিছেকথা কে বলেছে আপনাকে?”
আয়জা খেতে গিয়ে থেমে গেল। যারিফের চোখ তার দিকে দেখে তিথি আয়জাকে বললো,
“এর পরের বার বরকে মিথ্যে বলবে না।”
আম্বিয়া বেগম বললেন,”রাঁধিস তো ভালোই। আজলান কিছু তো বল।”
আজলান বললো,”মা ভালো জিনিস চুপচাপ খেতে হয়। খাবার টেবিলে এত কথা কিসের সেটাই বুঝতে পারছিনা আমি।”
আফতাব শেখ বললেন,”বৌমা তোমার আম্মা আব্বা আসেনি তা মানলাম কিন্তু তুষারকে তো পাঠাতে পারতো।”
তিথি বললো,”ওই ছেলের কথা আর বলোনা বাবা। কোন একটা বড়লোকের মেয়ের পাল্লায় পড়ে ছেলেটা পুরো বরবাদ হয়ে গেল। আমাকে ওইদিন ফোনে বললো, “আপা ওই মেয়ে বলছে আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবে না। কানের নীচে মেরেছি এক চড়। কিন্তু তারপরও বললো আমাকে ছাড়া নাকি মরে যাবে। আপা আমি এই মেয়ের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে মরে যাবো।” সবাই হাসতে লাগলো। যারিফ বললো,”ও তো এখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে তাই না ভাবি?”
তিথি বললো,”হ্যা। আমি জানতে চাইলাম কিসে পড়ে মেয়েটা? সে বললো, ক্লাস এইটে পড়ে। আপা মেয়েমানুষ এত গায়েপড়া কেন?”
কতবড় বেয়াদব কথা! আম্মা সময়মতো শাসন করলে ও এতবড় কথা জীবনেও বলতে পারতো না।
সবাই আরেকদফা হাসলো। আফতাব শেখ বললেন,”মেয়েটা ভালো হলে তোমার উচিত মেয়েটার মা বাবার সাথে কথা বলে বিয়েটিয়ে ঠিক করে রাখা।”
তিথি বললো,”ওসবের কোনো দরকার নেই। ও আমার মতো কালো না। ওর রঙ মিষ্টি কুমড়োর মতো। লম্বাসম্বাও আছে। কত মেয়ে পেয়ে যাবো তখন।”
ডোডো অদ্ভুত শব্দ করছে মুখ দিয়ে। আয়জা মাংস ছিঁড়ে একটুখানি তার গালে পুরে দিল। ডোডো বের করে দিল সাথে সাথে। তিথি বললো,
“কেক খেয়েছে এখন আর কিছু খাবেনা বজ্জাত ছেলে।”
আজলান বললো,”জোর করে খাওয়ানোর দরকার নেই। তোমার কথা শেষ হয়েছে? আমি তাহলে খাওয়া শুরু করতাম।”
তিথি ঠোঁটের উপর আঙুল রাখলো।
সবার খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যেতে যেতে রাত বারোটার কাছাকাছি। তিথি তখন তার বাবাকে ফোন করলো। বাবা ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
“কিরে মা এতরাতে ফোন করেছিস? গোলামের ফুত তোকে আবার কিছু বলছে নাকি?”
তিথির কন্ঠে কান্না। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো,”আব্বা বলো হ্যাপী এনিভার্সারি।”
মফিজ সাহেব বললেন,”ওটা আবার কি?”
“ধুর, বলো না।”
“হ্যাপী ভাসসারি।”
“হয়নি। মেয়েকে বিবাহ বার্ষিকীতে কিভাবে উইশ করবে সেটা না জানলে তুমি বাপ হইছো কেন?”
“রাগ করিস না মা। আমি কি অতকিছু জানি নাকি? মূর্খ মানুষ। দোকানের হিসাব মিলাতে গিয়ে এখন গড়বড় করে ফেলি।”
তিথি আবারও কেঁদে বললো,”বলো গোলামের ফুতের সাথে তুই হাজার বছর বেঁচে থাক।”
মফিজ সাহেব তাই তাই বললেন। তিথি বললো,”এবার আম্মাকে দাও।”
মালেকা বেগমের হাতে ফোনটা দিলেন মফিজ সাহেব। উনি জানতে চাইলেন,
“কিরে কাঁদছিস কেন? কি হলো?”
“খুশিতে কাঁদছি। আম্মা বলো হ্যাপী এনিভার্সারি।”
মালেকা বেগম বললেন,”হ্যাপী এনিভার্সিরি।”
তিথি ঝাড়ি মেরে বললো,”ধুর তাও হয়নি। আচ্ছা বাদ দাও। বলো, আমার জামাতার হায়াত যেন আল্লাহ হাজার বছর বাড়িয়ে দেই।”
মালেকা বেগম তাই তাই বললেন। তিথি বললো,”এবার তুষারকে দাও।”
মালেকা বেগম তুষারকে ঘুম থেকে তুলে ফোন দিলেন। সে ফোন কানে চেপে বললো,
“হ্যা আপা। ডোডো অসুস্থ? কি হয়ছে?”
“হ্যাপী এনিভার্সারি বল ভাই।”
“হ্যাপী এনিভার্সারি।”
“এবার বল, দুলাভাই যেন অনেক বছর বাঁচে।”
“দুলাভাই যেন অনেক বছর বাঁচে।”
“হয়েছে তোরা পরীক্ষায় পাস। তোদের জন্য গোটা একটা কেক পাঠিয়েছি। একপিস শুধু আমি আর তোর দুলাভাই খেয়েছি। ওতে রাগ করিস না। সাথে কাচ্চি বিরিয়ানিও আছে। ড্রাইভার কাকা এক্ষুণি গিয়ে পৌঁছুবে। রাখি। ওই প্যাকেটটা নিয়ে খেয়েদেয়ে তারপর ঘুমা। ওই মেয়ে স্বপ্নে এসে তোকে আর জ্বালাবে না।”
তুষার বললো,”আচ্ছা।”
তিথির কান্না আরও ভারী হলো। সে ফোন রেখে দিল। ঘাড় ফিরাতেই দেখলো আজলান তার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। বললো
“এসব কি কথা বলছিলে উনাদের সাথে?”
তিথি এসে তার বুকে থুঁতনি ঠেকিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বললো,”তুমি বেঁচে না থাকলে ঝগড়া করবো কার সাথে ডোডোর বাপ?”
আজলানের ঠোঁটের কোণায় হাসি ঝুলছে কিন্তু তা অতটা স্পষ্ট না। তিথি তার গাল টেনে দিয়ে বললো,”কিন্তু তুমি তো চাও আমি মরে যাই। যাতে তুমি আরেকটা বিয়ে করতে পারো।”
আজলান বললো,”আর কি?”
তিথি বললো,”তুমি আমাকে কালো বলো। কথায় কথায় মেহবুব বলে জোরে ডাক দাও।”
তিথি তাকে ছেড়ে দিল। আজলান বিছানায় তার ফোনে হাতে নিয়ে বললো,”এসব তোমার খারাপ লাগে?”
“না না। মেহবুব যখন ডাকো না বস তখন আমার দিলের ধারকান বাইড়া যায়।”
“আর?”
“ধুর আর টার কিছু না। তুমি কথায় কথায় আমায় ধমকাও।”
আজলান বললো,”খারাপ লাগে?”
“ধুর না। তুমি আমায় ধমকাও, আমি তোমাকে ঝাড়ি মারি। ইকুয়াল ইকুয়াল।”
আজলান বললো,”আর?”
“তুমি আমাকে সারাক্ষণ ব্রাশ করতে বলো। গোসল করতে বলো।”
“ভালো লাগে না!”
“না বললে খারাপ লাগে গো।”
আজলান হেঁটে আলমিরার কাছে গেল। কিছু কাগজপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে বললো,
“আর?”
“তুমি আমায় কালো ডাকো কেন?”
“খারাপ লাগে?”
“না তা নয়। ফর্সা বললে ভাবতাম তুমি কানা। আমাকে ভালো করে দেখো না। ভালো করে দেখো বলেই তো কালো বলো।”
তিথি ভাবুক হয়ে বিছানায় বসলো। আজলান বললো,”আর?”
“আর কিছু না। তুমি ডিভোর্স পেপারটা বের করেছ কেন?”
“এটা তোমাকে দেব।”
তিথির কন্ঠে কান্না। “তোমার এসব শয়তানি এজন্যই ভালো লাগেনা আমার।”
আজলান বললো,”আরেহ এটা আগুনে পুড়বো।”
তিথি খুশি হয়ে গেল। আজলানের কোলে চেপে বসে জড়িয়ে ধরলো। অনেকক্ষণ আজলানকে ধরে বসে রইলো তারপর নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,
“এত মহান সাজার দরকার নেই। তুমি আমাকে কত ভালোবাসো তা আমি জানি।”
আজলান পেপারটা খুঁজে নিল। দেশলাইকাঠি মেরে আগুন লাগিয়ে দিল। পেপারটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তিথিকে বললো,
“মেহবুব! এবার কাছে এসো।”
তিথি এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো। বললো,
“ডোডোটা এখন চলে আসবে। ব্যাটা এক্কেবারে থার্ড পার্সন সিংগুলার নাম্বার হয়ে বড়ো জ্বালায়।”
আজলান রাগী কন্ঠে জানতে চাইলো, “কি বলছো?”
তিথি তার দিকে মুখ করে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,”প্লুরাল নাম্বার হওয়া জরুরি আঁফিসার।”
আজলান তাকে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। বললো,”ডোডো এখনো ছোট। তুমি এসব ভাবলে কি করে?”
তিথি তার পাশে গিয়ে বসে বললো,”ধুর গাধা ভাবতে কি পয়সা লাগে? ভাবার জগতে আমি এখন দশ বাচ্চার মা।”
আজলান বললো,”তুমি জানো এখনকার সময় কত খারাপ। ডাক্তাররা বলেন, একটা বাচ্চা নেয়ার তিন চার বছর পর আরেকটা নিতে।”
তিথি বললো,”ডাক্তার ব্যাটাদের বলতে ইচ্ছে করে তাই বলে। ডোডোর একটা বোন তো লাগবেই।”
আজলান বললো,”বাজে কথা বলো না।”
“বললে ঘর থেকে বের করে দেবে?”
“হ্যা দেব।”
“দাও তো দেখি।”
আজলান তার হাত টেনে ঘর থেকে বের করে দিল। তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে পায়চারি করতে করতে বললো,
“এটুকু বয়সে নাকি দুই বাচ্চার মা হবে। একটাকে সামলাতে গিয়ে অবস্থা কাহিল। এই মেয়ে মাথা খারাপ করে দেবে আমার।”
সে দরজা খুলে দিল। তিথি দাঁড়িয়েই ছিল। দরজা খুলে আজলান তাকে ভেতরে টেনে এনে বললো,
“আরও দু বছর পর।”
তিথি বললো,”ততদিন ডোডোর আরেকটা ভাই আসার সময় হয়ে যাবে।”
আজলান বললে,”নেভার। আমি তোমার ফাঁদে পা দেব না।”
তিথি বললো,”আচ্ছা ওসব দেখা যাবে পরে। আমাকে কেমন লাগছে বললে না আজকে।”
আজলান বললো,”তুমি কালো হলেও সুন্দর, ওটা খালি চোখে দেখা যায় না।”
“তুমি কিভাবে দেখো।”
“আমার চোখ ম্যাগনিফাইং গ্লাস।”
তিথি দৌড়ে এল তার কাছে। গলা জড়িয়ে ধরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“বলোতো আমার চোখে কি লেখা আছে?”
“তুমি ডোডোর আব্বাকে ভালো টালো বাসো এমন কিছু।”
তিথি তার গালে জোরসে একটা চুমু খেয়ে তাকে আয়নার সামনে টেনে নিয়ে গিয়ে বললো,”বলোতো আয়নার ভেতরে যাকে দেখা যাচ্ছে তার চোখে কি লেখা আছে।”
আজলান বললো, “He loves the woman who is the mother of his child.”
তিথি হা হা করে হেসে বললো,”কমপ্লেক্স সেনটেন্স। বুঝি বুঝি। তুমি বলেছ, Woh apne bachay ki maa se mohabbat karta hai.”
তিথি বললো,”কিন্তু বিশ্বাস করিনা। খাঁটি বাংলায় বলো। মেহবুব আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আজলান ভয়ানক রেগে গিয়ে দরজা বন্ধ করে। ঘরের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো কাত হয়ে। তিথি বললো,
“হায়হায় বেটা দেখি গোসসা করে বসে আছে।”
সে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ডিমলাইট জ্বালিয়ে দিল। তার পছন্দের গোলাপি আলো। তিথির কান্না পেল। তার কান্না যখন তখন চলে আসে। বেহায়া। সে আজলানের পাশে বসে কাঁদতে লাগলো। বললো,
“ভালোবাসে এটা বলতে গিয়ে সে একলাফে বিট্রিশ হয়ে গেল। কচু ভালোবাসে।”
আজলান উঠে বসলো। বিরক্ত হয়ে বললো,”আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা ইংরেজিতে বলা যে, বাংলায় বলাও সেই।”
তিথি বললো,”না তারপরও বাংলায় বলো।”
আজলান তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। তিথি বলল,”হায়হায় তোমাকে সাদা পাঞ্জাবিতে এত কিউট লাগে তা তো আগে জানতাম না আঁফিষাড়।”
আজলান বললো,”এবার ঘুমাবে?”
তিথি বললো,”বাংলায় বলো।”
আজলান মহাবিরক্ত হয়ে বললো,”আমি তোমাকে ভালোবাসি, এটা না বললেও ভালোবাসা হয় মেহবুব!”
তিথি বললো,”তাও বলো।”
আজলান বললো,”আমি তোমাকে ভালোবাসি, এটা না বললে কি আমি তোমাকে ভালোবাসি না?”
“না।”
আজলান এবার তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে কর্কশস্বরে বলে উঠলো, তিন তিনবার বলেছি। তারপরও মাথায় ঢোকে না। এক্ষুণি ঘর থেকে বের হও।”
তিথি অশ্রুসজল চোখে চেয়ে রইলো তার দিকে। তার মায়া মায়া চোখদুটো আজলানের জীবনে সবচাইতে জঘন্যরকম দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আজকাল। সে তিথিকে বুকে টেনে নিয়ে বললো,
এই ভালো এই খারাপ পর্ব ৩১
“মেহবুব!”
তিথি কেঁদে জবাব দিল,”হুহ।”
“তুমি কি এই ডাকে হাজারবার “ভালোবাসি” শব্দটা খুঁজে পাও না?”
সমাপ্ত
