মৌটুসী পর্ব ১১
ঋতস্বিনী মাহবিশ
হসপিটাল স্টাফ চড়ুইয়ের নাম ধরে ডেকে উঠলে মৌটুসী তাড়াহুড়ো করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল চড়ুইকে নিজের কোলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু চড়ুই মৌটুসীর দিকে না তাকিয়ে উল্টো বোরাকের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বোরাক বলল, “আমার কাছেই থাক। চলুন, আমিও যাচ্ছি।”
মৌটুসী দ্বিধান্বিত হয়ে বলল, “আপনার লেট….
“সমস্যা নেই। তেমন তাড়া নেই আমাদের।”
মৌটুসী আর কিছু বলার ভাষা পেল না।
বোরাক বীরের দিকে ফিরে বলল, “পাপা, তুমি সাফওয়ান চাচ্চুর সাথে এখানে একটু বসো, কেমন? আমি চড়ুই পাখিকে ডাক্তার দেখিয়ে আসছি।”
বীর বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।
ডাক্তারের কেবিনে ঢুকে বোরাক চড়ুইকে নিয়ে চেয়ারে বসল। পাশেরটাতে মৌটুসী। মধ্যবয়স্ক ডাক্তার চশমার ওপর দিয়ে দুজনকে একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাচ্চার কী সমস্যা?”
উদ্বিগ্ন মৌটুসী বলতে লাগল, “পেটে ব্যথা ডক্টর। সকালে একবার উঠেছিল। তারপর হজমের ওষুধ দিয়েছিলাম, একটু পটি হওয়ার পর প্রায় সেরে গিয়েছিল। কিন্তু দুপুরের পর ব্যথাটা আবারো উঠেছে, একবার বমিও করেছে।”
ডাক্তার সবকিছু শুনে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে ওকে কাছে ডাকলেন, “আমার কাছে এসো তো মা!”
কিন্তু চড়ুইয়ের যাওয়ার নামই নেই। বোরাকের কোলে শক্ত হয়ে বসে আছে সে। ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন,
“আচ্ছা বাবার কোলেই থাকো। আঙ্কেল নিজেই আসছি।”
ডাক্তার নিজেই উঠে এসে চড়ুইয়ের পেটের কাপড় সরিয়ে হাত দিয়ে চেক করলেন। তারপর বললেন, “আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে হবে, ভেতরের রুমে নিয়ে আসুন।”
ভেতরের রুমে গিয়ে চড়ুইকে আলতো করে বেডে শুইয়ে দিল বোরাক। তারপর নিজেও চড়ুইয়ের মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতে লাগল। মৌটুসী বসল চড়ুইয়ের পায়ের দিকেটায়। আল্ট্রা করে ডাক্তার আশ্বস্ত করে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, এটা ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস। ভাইরাসজনিত ব্যথা, এমনিতেই ২৪ ঘণ্টার মাঝে সেরে যাওয়ার কথা। তবে বাচ্চার কষ্ট কমাতে আমি একটা ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছি, আধা ঘণ্টার মাঝেই ব্যথার উপশম পাবে। আর বাচ্চার খাবারের দিকে একটু নজর রাখতে হবে, বাইরের খাবার এড়িয়ে চলবেন।”
মৌটুসীর বুক থেকে যেন একশ মনের পাথর সরে গেল। স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে মনে মনে কয়েকবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ জপে বলল, “ডক্টর, আমি তো এমনিতেও ওকে তেমন একটা বাইরের খাবার দিই না।”
ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন, “আসলে ছোট বাচ্চার পাকস্থলী অত্যন্ত নাজুক। সামান্য এদিক-সেদিক হলেও বদহজম কিংবা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়। প্যানিক হওয়ার কিছু নেই।”
বলেই ডাক্তার ইনজেকশনের সিরিঞ্জ রেডি করতে লাগলেন। ওষুধের শিশি থেকে তরল টেনে নেওয়া দেখে চড়ুইয়ের মুখটা আতঙ্কে সাদা হয়ে গেল। এক সেকেন্ডের মাথায় চিৎকার করে উঠল সে, “সুই! ব্যথা! আমি সুই ফোঁড়াব না! মাম্মা… মাম্মা!”
মৌটুসী উঠে গিয়ে চড়ুইয়ের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে মুখে পড়ে বুঝাতে লাগল, “কিচ্ছু হবে না মাম্মা, এই সুইটা দিলে পেট ব্যথা ভালো হয়ে যাবে। একদম ব্যথা লাগবে না চড়ুই পাখি। টুস করে চলে যাবে।”
চড়ুই এবার পুরো শরীর বাঁকিয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করল। বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতে চাইছে সে। বোরাক চড়ুইকে এক হাতে আলতো করে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “চড়ুই পাখি না ব্রেভ গার্ল? একদম ব্যথা লাগবে না। বীরও তো সুই দেয়, ও কিন্তু একদম কান্না করে না!”
“না! আমি দিব না!” বোরাকের পেটের কাছের স্লিভলেস জ্যাকেটটা শক্ত করে খামচে ধরল চড়ুই।
ডাক্তার সুই নিয়ে হাতের কাছে এগিয়ে এলে, চড়ুই এবার আরও জোরে আর্তনাদ করে উঠল। মেয়ের এই করুণ কান্না মৌটুসীর মাতৃত্বকে এক মুহূর্তেই দুমড়েমুচড়ে দিল। আবেগ সামলাতে না পেরে সেও চড়ুইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডাক্তারকে বলে উঠল, “ডক্টর! সুই দিতে হবে না! প্লিজ। সুই দিতে হবে না। এমনই সেরে যাবে। ওটা রেখে দিন।”
বেচারা ডাক্তার হতবাক হয়ে মৌটুসীর পাগলামী দেখছে। কোথায় বাচ্চাকে সাহস দিবে তা না, মা নিজেই না না বলে লাফাচ্ছে।
“দিবে না মাম্মা সুই দিবে মা। ডক্টর আঙ্কেলকে আমরা বকে দিব। এসো তুমি। আমার কাছে এসো।”
মৌটুসী চড়ুইকে তার কাছে সরিয়ে আনার জন্য হাত বাড়াল।
ওর এমন অযৌক্তিক অস্থিরতা দেখে বোরাকের কপালের পুরু চামড়া জমে উঠল। সে মৌটুসীর ছেলেমানুষি আটকাতে চড়ুইয়ের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া ওর হাতের কবজিটা শক্ত করে ধরে বলল, “হ্যালো মিস! আপনি বাচ্চার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেও বাচ্চামো করছেন তা বুঝতে পারছেন? ইনজেকশনটা না দিলে মেয়েটা আরও বেশি কষ্ট পাবে। এই ব্যথা চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। চব্বিশ ঘণ্টা কি কম সময়? এত সময় বাচ্চাটা যন্ত্রণায় ছটফট করবে?”
বোরাকের আকস্মিক এই কঠোর আচরণে জমে গেল মৌটুসী। একজোড়া গাঢ় বাদামী চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে তার ছলছল দৃষ্টির এক লহমা সূক্ষ্ম বিনিময় হয়ে গেল। পরক্ষণেই মৌটুসী ধীরস্থির দৃষ্টি নামিয়ে আনল নিজের ফিনফিনে কবজিতে, যেখানে বোরাকের শক্ত হাতের বাঁধন স্পষ্ট। মুহূর্তের ব্যবধানেই যেন তাদের বর্তমান পরিস্থিতি ও নিজের অবস্থানের কথা বোরাকের বোধোদয় হলো। দায়বদ্ধতা বা অধিকার—কোনোটিরই ভিত্তি নেই তাদের মধ্যে, অথচ সে তার আচরণের মাত্রা ক্রস করে ফেলেছে। অপ্রস্তুত হয়ে বোরাক তৎক্ষণাৎ মৌটুসীর হাত ছেড়ে দিয়ে একটু পিছিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “সরি।”
মৌটুসীও নিশব্দে দুই কদম পিছিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল।
ডাক্তার এই দৃশ্য দেখে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এতক্ষণ তিনি যাদের রোগীর অভিভাবক অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী ভেবে আসছিলেন তাদের মধ্যে হঠাৎ এই ‘হ্যালো মিস’ সম্বোধন ভদ্রলোককে বেশ অবাক করল।
বোরাক আর সময় নষ্ট করল না। চড়ুইকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। ছোট্ট মাথাটা পরম মমতাময় বক্ষভাগে ঢেকে রাখল যাতে মেয়েটা ইনজেকশনের ফলাটা দেখতে না পায়। এরপর ওর ছোট হাতটা বাহুর সাথে চেপে ধরে ডাক্তারকে ইশারা করল বোরাক।
ডাক্তার দ্রুত ইনজেকশনটা পুশ করে দিলেন। আকাশ ফাটানো একটা চিৎকারে কেঁদে উঠল চড়ুই। মৌটুসী দ্রুত ছুটে এসে চড়ুইকে বোরাকের থেকে কেড়ে নিজের কাছে টেনে নিল। মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে এবার নিজেও নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সে।
ডাক্তার এবং বোরাক দুজনেই বিস্ময় নিয়ে এই মা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে।ডাক্তার সাহেব বুঝি তার পেশাদারিত্বের এতগুলো বছরে প্রথমবার এমন মা দেখলেন, যে বাচ্চাকে ইনজেকশন দেওয়ার ভয়ে বাচ্চার সাথে তাল মিলিয়ে কান্নাকাটি করে একাকার।
পরিবেশ একটু থিতু হয়ে এলে ডাক্তার টিস্যু বক্স থেকে একগুচ্ছ টিস্যু বের করে মৌটুসীর দিকে এগিয়ে দিলেন। মৌটুসী টিস্যুগুলো হাতে নিয়ে নিজের চোখ মুছল, চড়ুইয়ের চোখমুখও মুছে দিল। ছোট্ট চড়ুই এখনও থেকে থেকে অল্প ফোঁপাচ্ছে। শ্বাসের গতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ডাক্তার মৃদু হেসে রসিকতার সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “ম্যাডাম, মেয়েকে কি সরকারি টিকাগুলো দেওয়ানো হয় না?”
মৌটুসী খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। চোখ-মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, “জ্বি ডক্টর, দেওয়া হয়।”
ডাক্তার আবার হাসলেন, “টিকা দিতে বাচ্চার বাবা নিয়ে যান বুঝি?”
মৌটুসী মৃদুস্বরে বলল,
“আমার মা নিয়ে যান।”
মধ্যবয়স্ক ডাক্তার এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। চশমাটা একটু ঠিক করে বললেন, “তাহলে আজকেও আপনার মাকে নিয়ে আসা উচিত ছিল, ম্যাডাম! এমন কাণ্ড মনে হয় উনিই ভালো সামলাতে পারেন।”
মৌটুসী একটু লজ্জিত হয়ে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল। বোরাক বেডের একপাশে বুকে দুই হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মৌটুসীর কাচুমাচু লজ্জিত মুখটা দেখে অজান্তেই পুরুষালি ঠোঁট দুটো একদিকে মৃদু প্রসারিত হয়ে উঠল।
ডাক্তার বোরাককে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি একটু আসুন আমার সাথে।”
ওয়েটিং করিডোরের চেয়ারে বসে চিপস খাচ্ছে আর চড়ুই পাখির জন্য অপেক্ষা করছে বীর। তার পাশেই বসে ফোন স্ক্রোল করছে সাফওয়ান। পরনে কার্গো জিন্স আর ব্লু ডেনিম জ্যাকেট। কোনোটিই দামী কোনো ব্র্যান্ডের নয়, বরং সাধারণ আউটলেট থেকেই কেনা। তবে মানুষটা সে একটু অসাধারণ বৈকি! ফর্সা লম্বা ছেলেটার মাথায় একঝাক হালকা কোঁকড়া চুল। তেইশ বছরের শরীর তথাকথিত বলিষ্ঠ না হলেও খুব একটা ছিমছাম নয়। নির্দ্বিধায় একজন অল্প বয়সী তরুণী কিংবা কিশোরীর চোখ আটকানোর মতোই সৌন্দর্য বিরাজমান তার মাঝে। আর তার এই সৌন্দর্য বিশ্লেষণে নেমেছে অদূরে বসে থাকা দুই তরুণী। মুগ্ধ চোখে এদিকে তাকিয়ে দুই বান্ধবী ফুসুর ফুসুর গল্প করছে।
বীর অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে বলল,
“সাফান চাচ্চু, পাপা-চুলুই পাখি ওলা এখনো আসছে কেন?”
বীরের কথায় সাফওয়ান ফোন থেকে সরিয়ে স্ক্রিন অফ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল,
“ডাক্তার চড়ুই পাখির চিকিৎসা করছে বাবা।”
”চিকিৎসা কলতে এত দেলী!”
” হুমমম, অনেক দেরী!”
কিছু ভেবে বীর আবার বলল,
“ডাক্তাল আঙ্কেল কি চুলুই পাখিকে সুই ফুটিয়ে দিবে? আমাকে যেভাবে দেয়।”
”উম..জানি না, তবে দিতেও পারে।”
বীরের মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, “ওহ, চুলুই পাখি তাহলে অনেক ব্যথা পাবে!”
বীরের চিন্তিত মুখটা দেখে মুচকি হাসল সাফওয়ান। ওর এই হাসি দেখে তরুণী দুটো আর অদূরে বসে থাকার ধৈর্য কুলোল না। তারা উঠে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বীরের গালে হাত টেনে বলল,
“হাই কিউট বেবি! কি সুন্দর তুমি!”
বীর গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “তোমলা কে?”
তরুণীদের একজন হেসে বলল, “আমরা তোমার আপু হই, বাবু।”
এরপর অন্যজন সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যালো ভাইয়া!”
সাফওয়ান নির্লিপ্ত ভাবে কাটকাট বলল, “ভাইয়া না, আব্বা।”
মেয়েটার উজ্জ্বল মুখখানা চুপসে এল মুহূর্তেই, “আব্বা?
”হুম। আব্বা। আপনার আব্বাজান হই আমি।”
মেয়েটার মুখ চোখে রাজ্যের বিস্ময়। “আপনি! আব্বা? মানে কি?”
”ছোট ভাইয়ের বাপ তো আব্বায় হয় তাই না?” বলেই সাফওয়ান এবার বীরকে এক হাতে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল, “আমার ছেলে।”
”এই বাচ্চাটা আপনার ছেলে?”
”হুম, একেবারে আমার পেটের ছেলে।”
পাশের তরুণীটি এবার বান্ধবীর হাত ধরে টানতে টানতে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “চল বোন, অনেক হইছে চল এখান থেকে। এটা রং স্টেশন। ট্রেনে উঠার স্বপ্ন দেখে লাভ নাই।”
তরুণী যেতে যেতে অপ্রস্তুত হেসে আমতা আমতা করে বলল, “ইয়ে! না মানে আব্বা। আসি তাহলে।”
সাফওয়ান হাত উঁচিয়ে বিদায় দিল,
মৌটুসী পর্ব ১০
“আচ্ছা আম্মাজান। ভালোই ভালোই যায়েন।”
ওরা চলে গেলে বীর জিজ্ঞেস করল, “ওলা কে চাচ্চু?”
সাফওয়ান তীর্যক হেঁসে বলল,
”ওরা তোমার বড় বোন বাবা। আর আমার সুন্দরী দুইটা রাজকন্যা।”
