Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৭২

এক দেখায় পর্ব ৭২

এক দেখায় পর্ব ৭২
সুরভী আক্তার

মিহি ধক্ করে ওঠে । খাবলে ধরে আম্মুর হাত । সাবিনা বেগম কথার ঘোরে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন । মেয়ের স্পর্শে সম্বিত ফিরলো । মেয়ের দিকে তাকাতেই মাতৃ হৃদয় ছ্যাঁত ওঠে তার । মিহির চোখ ভরে উঠে টলমল করছে ইতোমধ্যে । এক্ষুনি পানি গড়াবে চোখ থেকে । সাবিনা বেগম হতভম্ব হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ালেন । ইশারায় বোঝালেন , যেনো তার মেয়ে না কাঁদে । কিন্তু তার না বোধক ইশারার তোয়াক্কা না করে আহ্লাদি মিহি ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেললো । জাপটে ধরলো আম্মু কে । কান্না সমেত ভেজা কন্ঠে বললো….

” না আম্মু , এ কথা বলবে না কখনো । কি বলছো তুমি এসব ? তুমি জানো না আমি তোমাকে ছাড়া মরে যাবো । কোথায় যাবে তুমি আমাকে আর এ বাড়ি ছেড়ে ? আমি কিন্তু এসব একদম শুনবো না আম্মু ।
” আরে পাগলি মেয়ে , আমি তোর শশুর বাড়িতে সারা জীবন থাকবো নাকি ? আমার জীবনে এখনো কতটা সময় বাকি আছে বল ? এতোটা সময় তোদের ঘাড়ের উপর বোঝা হয়ে থাকবো আমি ? তুই চাস আমি ছোট হই সবার কাছে । নিজেকে ছোট ভাবি , এটা চাস তুই ?
” তুমি ছোট হবে কেনো , তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে থাকবে ! আমি ছাড়া আর কে আছে তোমার । এ জগতে আর কেউ আছে ? খবরদার যদি এসব আরেক বার বলেছো , তাহলে কিন্তু ভালো হবে না বলে রাখলাম । তুমি কোত্থাও যাবে না ।
মিহি ফিকড়ে ফিকড়ে কথা টুকু শেষ করে থামলো । ওর আম্মু ওকে ছেড়ে চলে যাবে , এটা ভাবলেই প্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাবে ওর । মিহি থামতেই সাবিনা বেগম মুখ খুলবেন , এর আগেই রাফির হকচকিত স্বর ভেসে আসলো….

” মিহি , হোয়াট হ্যাপেন্ড ? কি হয়েছে তোমার , কাঁদছো কেনো ?
মিহি আম্মু কে ছাড়ে । ফুঁপিয়ে উঠে সাবিনা বেগম সহ তাকায় রাফির দিকে । নাক টানে মিহি । রাফি উদ্বিগ্ন হয়ে ওর সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসেছে ।
ক্রন্দনরত কন্ঠে রাফি কে সবটা বলার জন্য উদ্যত হতেই সাবিনা বেগম বাঁধা দিয়ে হাত চেপে ধরলেন মেয়ের । মিহি বাঁধা পেয়ে পিটপিট করে তাকালো আম্মুর দিকে । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে রাফি কে এসব বলতে বারন করলেন সাবিনা বেগম । চোখ বুজে আরো আশ্বাস দিলেন , তিনি যাবেন না মিহি কে একলা রেখে । আম্মুর আশ্বাস পেয়ে স্থির হয় মিহি । হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করে । রাফির দিকে ফিরে মিনমিনে গলায় বলে….
” কিছু না ।
” কিছু না হলে কাঁদছিলে কেনো ? এমনি এমনি কাঁদছিলে না নিশ্চয়ই ?
” আব্বুর কথা মনে পড়ে ছিলো , তাই পানি এসেছিলো চোখে । আর তেমন কিছু না ।
রাফি সুক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলো মিহি কে । কথা এগোলো না আর । রাফি অফিসে বেরোবে এখন । ঘরে গিয়ে মিহি কে পায় নি , তাই সোজা এ ঘরে এসেছিলো ।
মিহি কে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাফি । নিজেদের ঘরে ঢুকলো ওরা । মিহি কান্নার তোপে এখনো খানিক বাদ বাদ ফুঁপিয়ে উঠছে মাথা নত করে ।

রাফি এই নিয়ে আর কিছু প্রশ্ন করলো না । ওদের মা মেয়ের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলো না সে ।
রাফির পড়নের সাদা শার্টটা ইন করা কালো প্যান্টে । বিছানার উপর থেকে টাই তুলে মিহির মুখোমুখি দাঁড়ালো সে । মিহি বেঁধে দেবে টাই । মিহির মুখখানা কান্নার দরুন কেমন অদ্ভুত রুগ্ন দেখাচ্ছে । নাক টানছে এখনো । ভীষণ আদুরে লাগছে । নাকের ডগা লালচে হয়ে গেছে । রাফি দূরত্ব ঘুচিয়ে দাঁড়িয়ে খানিক নিচু হলো মিহির সুবিধার্থে । মিহি টাই টা বেঁধে দিতে হাত চালালো আনমনে ।
রাফি সুক্ষ্ম নেত্রে এক ধ্যানে পরখ করছে ওকে । বাঁধার ফুরসতে মিহি রাফির দৃষ্টি বুঝে কপাল গুটিয়ে তাকালো ওর দিকে । অমনি চোখাচোখি হতেই ভ্রু উঁচালো রাফি । আকস্মিক মেয়েটা লজ্জা পেলো অজানা কারনে । লাজুক ভঙ্গিতে হেসেও উঠলো ঠোঁট পিষে । সুযোগ লুফে নিলো রাফি । চট করে কোমর জড়িয়ে ধরলো মিহির । টপাটপ এলোমেলো হয়ে অগনিত চুমু আঁকলো পুরো মুখশ্রীতে । মিহি সিটিয়ে যায় । রাফি হাঁফ ছাড়ল ।
চোখ নিভিয়ে শেষ স্পর্শ টা গভীর করলো ওষ্ঠাধরে । অতঃপর ছেড়ে দিলো মিহি কে । মিহি চোখ তুলে তাকাতে পারে না লাজুকতায় । এই লোকটা আজকাল বড্ড লজ্জা দিচ্ছে ওকে ।
মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে মিহির । রাফি ওর দিকে এখনো ঘোর লাগা নয়নে তাকিয়ে আছে, এটা আন্দাজে ঠেকতেই দুহাতে মুখ ঢেকে নিলো মিহি । রাফি ফিক করে হাসলো । এতক্ষণের নীরবতা ভাঙলো হাস্কি স্বরে….

” ম্যাডাম, অফিসে যাচ্ছি । ভীষণ মিস করবো আপনাকে ।
মিহি মুখ ঢেকেই উত্তর করে ক্ষিণ স্বরে….
” যান তো । আপনি গেলেই বাঁচি আমি । আপনি ইদানিং বড্ড বেশি জ্বালাতন করেন আমায় ।
” জ্বালানো তো সবে শুরু হলো ম্যাডাম । এভাবে না জ্বালালে আমাদের রাহি আসবে কি করে ?
মিহি মুখ থেকে হাত সরায় পিটপিট করে । ভ্রু জড়ো করে অবুঝের মতো চায় । রাফি ঠোঁট কামড়ে আরো একবার কোমর জড়িয়ে ধরে বললো নিচু হয়ে….
” সহ্য করাটা শিখে নিন ‌। আমাদের রাহি কে খুব তাড়াতাড়ি আনতে হবে । বুড়ো হয়ে যাচ্ছি । বিয়ে তো হলো , এবার না হয় ভালোবাসার ফলস্বরূপ কিছু একটা আসুক আমাদের জীবনে । সময় যাক , তবে খুব বেশি যেনো না যায় । বুঝেছেন ? রাহি কে চাই আমার !
মিহি বুঝলো । চোখ নামিয়ে নিলো সে ।
রাফি ঝুঁকে বাম কপোলের পাশে শব্দ করে আরো একটা চুমু খেলো । অতঃপর বাম কানে অধর স্পর্শিত করে আলতো ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করলো….
” আমার রাহি কে চাই ম্যাডাম । বাবা হতে চাই আমি । আপনাকে রাহির মাম্মা বানাতে চাই । খুব করে চাই ।
কথা শেষ করে ঠোঁট সরালো রাফি । সম্মুখ হয়ে কন্ঠ উঁচু করলো….

” বুঝেছো ?
মাথা ঝাঁকায় মিহি । জবান ফোঁটে না দ্বিধায় । রাফি শুধালো….
” কি বুঝেছো ?
” রাহি কে চাই আপনার ।
” রাহি কে ?
” আ.. আমাদের বেবি !
” বেশ বুঝদার হয়েছো দেখছি ! অবশ্য বিয়ের আগে যে মেয়ে বাচ্চাদের ড্রেস সিলেক্ট করে রাখতে পারে , তার আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেভেল সম্পর্কে আমি না হয় নাই বললাম কিছু । আমার আগে বেবির পরিকল্পনা করে রেখেছেন আপনি । তাই আমার এতো তাড়া । বউয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী বেবির ড্রেস কিনে রেখেছি । এখন না হয় বউকে একটা বেবি গিফট করি ।
মিহি ঝট করে চাইলো । প্রশ্ন করলো….
” ড্রেস কিনে রেখেছেন মানে ?
” হুম ।
মলে পছন্দ করে রেখেছিলে তো বেবিদের ড্রেস । আমি কিনেছি কয়েকটা ! আমাদের রাহির জন্য ।
মিহি চোখ বড় বড় করে তাকালো । নির্বোধের ন্যায় শুধালো….

” কবে কিনেছেন ?
” যেদিন পছন্দ করেছিলে ।
” কোথায় সেগুলো ?
” আলমারিতেই আছে !
” আমি তো দেখিনি ।
” ফোর্থ ড্রয়ারে আছে । লক করা । চলো দেখাই ।
মিহির হাত টেনে আলমারির দিকে এগোলো রাফি । কাবাড খুলে ফোর্থ ড্রয়ার ওপেন করলো ।
বাচ্চাদের সফেদ কিছু ড্রেস । মেয়ে বাবুর ড্রেস । মিহি তাজ্জব বনে হাঁ হয়ে গেলো । গোল গোল অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো । রাফি বললো….
” এগুলোই তো নজর কেড়েছিলো আমার রাহির মাম্মামের ? তাই কিনে নিয়েছি আমার রাহির জন্য ।
মিহি তাজ্জব বনে রাফির পানে দৃষ্টি ফেরায় । অমনি জিজ্ঞেস করে রাফি….
” কি হলো বাচ্চার আম্মু , বাচ্চার ড্রেস পছন্দ হয়েছে ? বাচ্চার বাবা কিনে এনেছে !
ঠোঁট প্রগাঢ় হলো মিহির । হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকালো সে ।

কেটেছে আরো দুটো দিন । আপন গতিতে সময় চলছে । ইভান সেই আগের ন্যায় । ফ্যামিলি বিজনেসে জয়েন হয়েছে এখন । কিছুদিন ধরেই সেই অজ্ঞাত নাম্বার থেকে ফোন আসছে । ইভান বিরক্ত এতে । লাস্ট কদিন ধরে বিরক্ত করে ছাড়ছে সেই মেয়ে ।
ইভান প্রথম দিনেই যা কথা বলেছিলো । পরবর্তীতে সন্দেহজনক লেগেছিলো বিধায় আর কথা বলে নি । কিন্তু ঐ মেয়ের তো পিছু ছাড়ার নাম নেই । যখন তখন বারবার ফোন করে ডিস্টার্ব করতো । শেষমেষ বিরক্ত হয়ে নাম্বার টা ব্লকে রেখেছে ইভান । যত্তসব গায়ে পড়া বখাটে মেয়ে ।
আজ অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই টাস্কি খেয়েছে সে । বাড়িতে বিশাল ধুমধাম পড়ে গেছে । সকালেই তো সবটা স্বাভাবিক ছিলো । এখন আবার হঠাৎ করে কি হলো ?
বাড়িঘর সাজানো হচ্ছে । ধুম পড়ে গেছে বিয়ে বাড়ির ন্যায় । মেহমান এসে ভরপুর পুরো বাড়ি । ইভান আহম্মক হয়ে সদর পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । ওকে যেই দেখছে , সেই হাসছে মিটিমিটি । ফোনের স্ক্রিনে নিজেকে একবার দেখে নিলো ইভান । নাহ , ওর চেহারা তো ঠিক আছে । তাহলে সবাই এভাবে মিটমিট করে হাসছে কেনো ওকে দেখে ? বাড়ির লোকেরাও ভীষণ ব্যস্ত । ইভান ড্রইং রুমে দাঁড়ালো । ভালো ভাবে পরখ করলো এদিক ওদিক । ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়েনিতো সে ? নাকি স্বপ্ন দেখছে ? চোখ ডললো ইভান । নাহ , স্বপ্ন নয় । আর না এটা ভুল বাড়ি । তাহলে হচ্ছে টা কি এসব ?
সামনে ওর মা এগিয়ে আসছে হন্তদন্ত হয়ে । অতিথিদের ঘর দেখিয়ে দিতে ব্যস্ত তিনি । ইভান মাকে থামালো । বললো….

” আম্মু , বাড়িতে কিছু আছে ?
থামলেন ওর মা । ছেলেকে দেখে উদগ্রীব হয়ে বললেন….
” এসেছিস তুই ? উফ , যা যা । গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে ।
” কেনো আম্মু । কি হচ্ছে বলতো ? এতো আয়োজন কিসের ?
” সে কি , যার বিয়ে তার হুস নেই আর পাড়াপড়শির ঘুম নেই । বিয়ে তোর । আজ গায়ে হলুদ , কাল বিয়ে । যা যা , তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় । বিছানার উপর তোর হলুদের পাঞ্জাবি পাজামা , সব রাখা আছে । একেই লেইট হয়ে গেছে । যা বাবা আর দেরি করিস না ।
ইভান বোধহয় ভুল শুনলো । আবার পুছালো….
” আম্মু । কি বলছো এসব ?
” উফফফ , কানে কালা হয়েছিস । জ্বালাতে আসিস না তো । কাল বিয়ে তোর । এবার অন্তত আমাকে একটু রেহাই দে ।
আম্মুর কথায় এবার বড় সড় ঝটকা খেলো ইভান । পুরো শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেলো । হকচকিয়ে ভ্যাবলার ন্যায় হা বনে তাকালো সে । উচ্চারণ করলো অস্ফুটে…..
” ও আল্লাহ । আম্মু , মজা করবা না । ছেলের বিয়ে নিয়ে মজা করতে নেই । বিয়ের ভুত মাথায় চাপিয়ে দেবে না একদম ।
বিরক্ত হলেন ভদ্রমহিলা । ইভানের কাজিনরা কোথা থেকে দলবল বেঁধে উড়ে এসে চেপে ধরলো ওকে । ওর একটা কাজিন বলে উঠলো….
” ও হোওও , নতুন বর । এতক্ষণে নিজের বিয়ের হোদিস হলো । চলো বর বাবু , রেডি করিয়ে নিয়ে আসি তোমাকে ।

তব্দা খায় ইভান । মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবটা । কি হচ্ছে এসব ? কিছুই তো বোধগম্য হচ্ছে না । বিয়ে মানে ?
ইভান আর কিছু বলার আগেই ওকে টানতে টানতে ওর কাজিনরা ঘরে নিয়ে গেলো । নিজের ঘরে গিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো ইভান । তাজ্জব বনে এদিক ওদিক তাকালো । ওর কাজিনরা মিটিমিটি হাসছে ওকে দেখে । ইভান বোকার ন্যায় মুখ খুললো…..
” এ আলভি , ভাই আমার ! বাড়িতে কি হচ্ছে এসব ? কার বিয়ে ভাই ?
” বরের মুখে এ কি কথা ?
আজ‌ না তোর গায়ে হলুদ , আর কাল বিয়ে । নিজের বিয়ের কথা নিজেই ভুলে গেছিস ?
” ওওও গড , সবাই ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে ? কিসের বিয়ে ? কার বিয়ে ? কার সাথে বিয়ে ? হোয়াট হ্যাপেনিং ?
ইভানের কন্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেলো । ওর কাজিনরা বিষ্মিত হলো খানিক । আর কিছুই বলার আগেই সবাইকে উপেক্ষা করে গটগটিয়ে নিচে নামলো ইভান । সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে পড়নের ব্লেজার খুলে ছুড়ে মারলো কোনো এক দিকে । উঁচু স্বরে ডাকলো…..
” আম্মু , আম্মু….
ছেলের ডাকে কিচেন থেকে ধড়ফড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন ভদ্রমহিলা । সদর থেকে বাড়িতে ঢুকছিলেন ইভানের বাবা । তিনিও এসে দাঁড়ালেন । ছেলের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন ভদ্রমহিলা…..

” কি হয়েছে , চেঁচাচ্ছিস কেনো এভাবে ?
” এসব কি হচ্ছে আম্মু ? আমাকে একটু ক্লিয়ারলি বলবে ? বিয়ে মানে , কার বিয়ে ? আর কার সাথে বিয়ে ? আমার বিয়ে , আর আমিই জানি না ? হচ্ছে টা কি ? এসব কার মতামতে করছো তোমরা ? আমার বিয়ে মানে ? আমার বিয়েতে একবারও আমার পারমিশন নিয়েছো ? আমার ওপিনিওন জানতে চেয়েছো ? কার সাথে বিয়ে আমার ? এভাবে হুট করে বললেই হয়ে গেলো ? আমি কাউকে পছন্দ করি কিনা সেটা ম্যাটার করে না ? আন্দাজে কার সাথে বিয়ে দিচ্ছো আমার ? আমি কোনো বিয়ে টিয়ে করবো না । আমি কাউকে পছন্দ করি… শুনে রাখো ,, যদি এসব মজা না হয়ে থাকে তাহলে এই মুহূর্তে বন্ধ করো এসব । কোনো বিয়ে হবে না । আমার পছন্দ আছে , আর তাকে হলেই বিয়ে করবো আমি , নতুবা নয় ।
এক মুহুর্তেই স্তব্ধ হলো পুরো বাড়ি । একসাথে জমাট বাঁধলো সকলে । ইভান থেমে বড় বড় শ্বাস টানলো । আকস্মিক ভাবনায় উদাস চোখ সম্মুখে লিনার মুখশ্রী ভেসে উঠলো ।
ছেলের এতো গুলো বকবক শুনে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলেন ইভানের বাবা মা । খানিক হাসি সংবরন করলেন তারা । ইভানের মা শ্বাস ফেললেন । বললেন…..

” তাহলে তো সবটা ক্যানসেল করতে হয় ।
শুনুন না , আপনার ছেলে তো অন্য কাউকে পছন্দ করে । আপনি বরং লিনার মা বাবাকে ফোন করে সবটা ক্যানসেল করতে বলুন ।
লিনা নামটা শুনেই ধক্ করে ওঠে ইভান । ঝট করে চায় মায়ের দিকে । অবিশ্বাসে অস্ফুটে তৎক্ষণাৎ বুলি ফুটায়…
” লিনা , মানে ?
” হ্যাঁ , লিনা । চিনিস না লিনা কে ? মেয়েটা কে ভারী পছন্দ আমার । ভেবেছিলাম তোর বউ করবো । ওর বাবা মাকে বলতেই তারাও রাজি হয়ে গেছেন । লিনাও এক পায়ে রাজি । কদিন ধরেই এই বিয়ে নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছিলো । তোকে জানানোই হয় নি । এখন মনে হচ্ছে ভুল করে ফেলেছি , তোকে জানানো উচিত ছিলো । জানিনা ওদের বাড়িতে আয়োজন কতদূর এগোলো । হুট করে বিয়ে তো । লিনাও বেশ খুশি ছিলো । এইতো একটু আগেই কথা বললাম । মেয়েটার মনটা ভেঙে যাবে এখন এসব শুনলে । যাক , কি আর করার ?
শুনুন , আপনি বরং এক্ষুনি ফোন করুন লিনার বাবা কে ।
বাকরুদ্ধ হলো ইভান । তব্দা খেলো সে । একের পর এক ঝটকায় বিমূর্ত বনে গেলো । কানকে অবিশ্বাস করলো সে । লিনা মানে ? লিনার সাথে ওর বিয়ে ?
ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেললো ইভান । কিছুটা আন্দাজ করেই আনমনে হেসে উঠলো । লাড্ডু ফুটলো অন্তরে অন্তরে । ওর বাবা ফোন হাতে নিয়েছেন । নাম্বার ডায়াল করতেই ইভান ঝটপট বাঁধ সাধলো…..

” আব্বু , আ…আমি বিয়ে করবো । ফোন করতে হবে না । আমি বিয়ে করতে রাজি ।
” সে কি, তুই না অন্য একজনকে পছন্দ করিস ?
মায়ের কথায় আনন্দের উচ্ছাসে ভেসে যায় ইভান । নিজেকে ঠিক রেখে বলে ভাব দেখিয়ে…..
” আমার পছন্দের কথা বাদ । লিনা মেয়েটার মন ভেঙে যাবে এই বিয়েটা না হলে । এটা খারাপ দেখায় । মেয়েদের মন ভাঙ্গতে নেই । তার চেয়ে বরং বিয়েটা হোক । ওর মন ভাঙবে না এতে ।
কথাটা বলেই অস্থিরতা লুকিয়ে তড়তড়ে পায়ে ধুপধাপ করে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠলো ইভান । ভেতর ভেতর ঝড় বইছে । তোলপাড় শুরু হয়েছে । যদিও এখনো অবধি সবটা মাথায় ঢোকে নি । তবুও বিয়েটা লিনার সাথে হচ্ছে , এটা বোধগম্য হওয়া মাত্রই জোয়ারে ভাসছে ওর ছটফটে হৃদয় । ইভান চলে যাওয়া মাত্রই ড্রইং রুমের সবাই শব্দ করে হেসে উঠলেন ।
ওদিকে ইভানের পিছু পিছু ঘরে উঠেছে ওর কাজিনেরা । ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আনন্দ চেপে রাখতে না পেরে উচ্চ স্বরে চিৎকার করে উঠলো ইভান । ওর কাজিনরা অবাকই হলো । এই ছেলে এক্ষুনি তর্জন গর্জন করছিলো , এখন আবার এমন করছে কেনো ? ইভান শরীর দুলিয়ে হাসতে হাসতে পুরো ঘর চক্কর কাটছে । এই লাফিয়ে খাটে উঠছে , তো আবার খাট থেকে নেমে দুহাত মেলে শাহরুখ খান ভাইব নিচ্ছে । ওর কাজিন দের টেনে টুনে যোগ করিয়েছে নিজেদের সাথে । আলভি ভাবলো ইভান হয়তো খুশি । খুশির উত্তেজনা বাড়িয়ে নিজের ফোনে গান চালালো সে ।

” Moonchon ko Thoda , Round ghumake
Anna ke jaisa chasma laga ke ..
Coconut mein ,lassi Mila ke
Aa jao saare Mood banake
All the rajni fans , Don’t miss the chance (2)
lungi dance lungi dance, lungi dance lungi dance…..
নাচতে নাচতে বেসামাল ইভান । মনে লাড্ডু ফুটছে । উড়ছে শতশত প্রজাপতি । পুরো ঘর ডিস্কোতে পরিনত হলো । একসাথে মোটে পাঁচটা দামড়া গানের তালে তালে নাচছে শরীর দুলিয়ে ।

চৌধুরী বাড়ির সবাই তৈরি । বহু বছর পর বাড়ি ছেড়ে এক সাথে বেরোচ্ছে সবাই । একসাথে আর কই । দুটো ভাগ হবে । বিয়ে বাড়িতে যাবে ওরা । লিনা আর ইভান , অর্থাৎ বরপক্ষ এবং বউ পক্ষ , দুই তরফ থেকেই তারা ইনভাইটেড ।
লিনা রাবেয়া চৌধুরীর ভাইজি , আর ইভান হেনা বেগমের । এখন এখান থেকেই দুটো ভাগ হবে চৌধুরী বাড়ির মানুষজন । এক ভাগ যাবে বরপক্ষে । অন্য ভাগ কনে পক্ষে । তৈরি হয়ে বাড়ির বাইরে উপস্থিত সবাই । এই সন্ধ্যায় রওনা দিলে নয়টা হতে হতে দুদিকেই পৌঁছানো যাবে ।
হেনা বেগম আর আফসানা তাদের কর্তাদের নিয়ে বরপক্ষে যাবেন । আর বাকিরা , অর্থাৎ রাবেয়া চৌধুরী, হালিমা বেগম, সাবিনা বেগম , মেহজাবিন, এনারা যাবেন কনেপক্ষে । দীর্ঘ সতেরো বছর পর নিজের বাপের বাড়ির ভিটেয় পা রাখবেন রাবেয়া চৌধুরী । তিনি মোটামুটি নর্মাল । এখন সবাই তৈরি । শুধু গাড়িতে চড়ে বসা বাকি ।
এর মধ্যেই বিপত্তি বাঁধলো মিহি আর রুহি কোথায় যাবে এটা নিয়ে ! রুহির মামাতো ভাইয়ের বিয়ে , তাই সে নিজের নানু বাড়িতেই যাবে । এটা ফাইনাল ছিলো । কিন্তু যখন শুনলো মিহি যাচ্ছে না বরপক্ষে , তখন বেঁকে বসলো রুহি ।‌ সে যাবে তার পাখির সাথে ।

এদিকে আবার রাফি আর শান্ত তাদের বউদের পিছু ছাড়বে না । পরিচয় মেলার পর মিহি তার নানু বাড়িতে যায় নি এ অবধি । সুতরাং সে তার মামাতো বোনের বিয়েতে যাবে । কিন্তু রাফি ? সে কি করবে ? তার ও তো মামাতো ভাইয়ের বিয়ে ! এখন সে কোথায় যাবে ? রাশেদ রায়হান চৌধুরী ছেলেকে আদেশ দিয়েছেন , রাফি আর শান্ত তাদের সাথে ইভান দের বাড়িতে যাবে ।
অন্যদিকে মিহি আর রুহি লিনাদের বাড়িতে যাবে । কিন্তু ছেলেরা এটা মানতে বিমুখ ।
দুই দল দুই ভাগ হয়ে গেছে এর মধ্যেই । রাফি ইতস্তত । সে তার বউকে ছাড়তেও পারছে না , আবার বাপের কথাও অমান্য করতে পারছে না । এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ও । করুন চোখে বারবার তাকাচ্ছে মিহির দিকে । এদিকে রাফির অবস্থা বুঝে মিটিমিটি হাসছে মিহি । হেনা বেগম ছেলেকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাকলেন…
” রাফি , দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? তাড়াতাড়ি চল , দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের ।
রাফি ঢোক গিলে ইতস্তত স্বরে মিনমিন করলো…..
” না , মানে , মিহি আমাদের সাথে যাবে না ?
” না , মিহি লিনাদের বাড়িতে যাবে । ও তো ওর নানু বাড়ি যায় নি কখনো । তাই ওখানেই যাবে ও । তুই চলে আয়…

” ও তো ওর হাসবেন্ডের নানু বাড়িতেও যায় নি কখনো । এটাই সুযোগ যাওয়ার । ও আমাদের সাথে যাক । পরে না হয় অন্য একদিন নিজের নানু বাড়িতে যাবে । মিহি চলে এসো আমাদের সাথে ।
মিহি ঘাড় উঁচিয়ে বিড়বিড় করলো….
” আপনারা যান , আমি লিনা আপুদের বাড়িতেই যাবো ।
রাফি এমতাবস্থায় বড়দের মাঝে বলার মতো কথা খুঁজে পায় না । দোনামোনা করে মিহি কে চোখের ইশারা করে নিজেদের সাথে আসার জন্য । মিহিও চোখের ইশারায় বোঝালো , সে আসবে না ।
এদিকে বাকিরা ওদের দুটোর কান্ড দেখে মিটিমিটি হাসছেন মুখ চেপে । হেনা বেগমের তর সইছে না । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জাকির হোসেন গলা খাঁকারি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছেন । হেনা বেগম গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে আবার ছেলেকে ডাকলেন….

” মিহি আসবে না । তুই আয় জলদি । একেই দেরি হয়ে গেছে ।
শান্ত বেশ ভাব নিলো । গলা ঝেড়ে এগিয়ে নিজের কলার টেনে বললো ভার গলায় বিজ্ঞের ন্যায়….
” ছিঃ রাফি , বউকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারবি না তুই ? এতোটা বউ পাগল হয়ে গেলি ? তোর মতো আন রোমান্টিকের কাছে এটা এক্সপেক্ট করি নি । তোর বউ যাবে না আমাদের সাথে । এবার বোঝ বউকে ছাড়া থাকার কতো কষ্ট ! এই কষ্ট টা শিখে রাখ । বউকে ছাড়া দু একদিন থাকাটা কোনো ব্যাপারই না । এসব ছোট খাটো বিষয় । আমি বাবা বেঁচে গেছি, আমারটা যাচ্ছে আমার সাথে ।
রাফি দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওর দিকে তাকালো । চিবিয়ে বললো চাপা স্বরে….
” শালা লাফাস না এতো , তোর বউ ও যাচ্ছে না আমাদের সাথে । ঐ দেখ , অলরেডি উল্টো গাড়িতে উঠে পড়েছে তোর বউ । আমার বউয়ের সাথে তোরটাও যাচ্ছে কনেপক্ষে । এবার বোঝ ঠেলা….
শান্ত হকচকিয়ে যায় । সে জানতো না রুহি মিহিদের সাথে যাচ্ছে । ভড়কায় ছেলেকে । ছলকানো দৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকায় । উল্টো দিকের কালো গাড়িটায় জানালার পাশে বসেছে রুহি । মিহি এখনো গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে । বাকিরাও সবাই উঠে পড়েছে । শান্ত রুহিকে অন্য গাড়িতে দেখে ছ্যাত করে ওঠে । বিরাট চমকায় সে , তাকায় বৃহৎ নয়নে । মুখ ফাঁক করে গাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে চেঁচায়….

” আমার শান্তিইইইই……
শান্ত পা বাড়ানোর আগেই রাফি ওর কলার টেনে ধরলো । আর এগোতে পারলো না বেচারা । হাসি চেপে শান্তর কথাটাই ওকে শুনিয়ে বললো রাফি…..
” বউকে ছাড়া দু একদিন থাকাটা কোনো ব্যাপারই না ব্রো । চল দেরি হয়ে যাচ্ছে….
শান্তর কলার টেনেই শান্ত কে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে জোর পূর্বক ঠেলে ঠুলে বসালো রাফি । পেছনের সিটে জাকির হোসেন আর রাশেদ রায়হান চৌধুরী । তাদের দেখে ছটফট করতে গিয়েও থেমে গেল বেচারা । পিছন ফিরে বাপ আর শশুর কে দেখে বোকার মতো হাসলো । এদিকে বুক ভেসে যাচ্ছে দুঃখে । ওর বউ ওর সাথে যাচ্ছে না এই দুঃখে । এই বউটাও স্বার্থপর । ওকে একবারও আগে থেকে জানালো না , যে সে যাচ্ছে না ওদের সাথে । বরং উল্টো দিকে যাচ্ছে ।

রাফি গাড়ির ডোর লক করে মিহি দের গাড়িটার দিকে এগোলো । ড্রাইভার নিয়ে যাবে ওদের ।
মিহি এখনো ওঠে নি । রাফি গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিলো মিহির ওঠার জন্য । মিহি হাসি চেপে চেয়ে আছে । ইশারায় ভেঙ্গাচ্ছে রাফি কে । রাফি ঠোঁট পিষলো । মিহি দরজার কাছে আসা মাত্রই বিদ্যুতের গতিতে সবার অগোচরে টুপ খেলো মিহির ঠোঁটে । বাকিরা গাড়িতে । কারোরই নজরে পড়লো না এটা । মিহি হতভম্ব হয়ে হা বনে গেলো । তড়িতে সতর্কিত নজরে এদিক ওদিক তাকালো । কেউ দেখে নি । রাফির দিকে তাকাতেই ওষ্ঠ পিষে হাসি চেপে বিড়বিড় করলো রাফি…..

এক দেখায় পর্ব ৭১ (২)

” কিছুক্ষণের জন্য চোখের আড়াল করছি । তাই বলে ভাববেন না ছাড় দিচ্ছি । যান নানুর বাড়িতে , আমিও নানু শশুর বাড়িতে আসছি একটু পর ।
মিহি ভ্যাবাচ্যাকা খেলো । চোখ নামিয়ে দ্রুত উঠে বসলো গাড়িতে । রাফি ডোর লক করে ড্রাইভার কে আরো একবার পথ চলতে সাবধান করে দিলো । অতঃপর জানালা গলিয়ে আরেক ঝলক মিহি কে দেখে এগোলো নিজের গাড়ির দিকে ।

এক দেখায় শেষ পর্ব