এক দেখায় শেষ পর্ব
সুরভী আক্তার
রাতের ডিনার সেরে নিজ ঘরে উঠলো নাদিয়া । শরীর কেমন কুঁকড়ে আসছে । মাথা ধরেছে ভীষণ । চোখ দুটো জ্বালা করছে । ঘুমোবে এখন । ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে আটটার ঘর পেরিয়েছে । দরজা চাপিয়ে লাইট অফ করে একটা হলদে ডিম লাইট জ্বালালো নাদিয়া । কোনো রকমে শরীর টাকে এলিয়ে দিলো বিছানায় ।
চোখের পাপড়ি যুগল বুজে আসছে ভারে । বিছানায় গা পড়তেই দীর্ঘ একটা ক্লান্তির শ্বাস পড়লো । অবসন্নতায় চোখ বুজতেই আরামে ব্যাঘাত ঘটিয়ে বিকট শব্দে বেজে উঠলো মুঠো ফোনটা । তড়িতে চোখ মেললো নাদিয়া । নিস্তব্ধ আচ্ছন্ন ঘরে টুং টুং করে ফোনটা বাজছে । নাদিয়া মাথা তুললো । বেড সাইড টেবিলের উপর ফোন । কোনো রকমে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলো সে । আননোন নাম্বার । যা দেখে শুভ্র কপালে ভাঁজ পড়ে মেয়েটার । একটু সময় নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে । কানে ঠেকায় দূর্বল হাতে , বলে নিজে থেকেই….
” হ্যালো , আসসালামুয়ালাইকুম !
ওপাশ থেকে মৃদু পুরুষালি কন্ঠ….
” ওলাই কুমুস সালাম !
ধক্ করে ওঠে মেয়েটায় নমনীয় হৃদয় । ভারী চোখ তড়াক করে মেলে যায় । সীমানা ছাড়িয়ে যায় বক্ষস্থল । তৎক্ষণাৎ শুল্ক ঢোক গেলে মেয়েটা । কম্পিত স্বরে শুধোয় সন্দিহান হয়ে…..
” কে ?
” কন্ঠ টাও ভুলে গেছিস আমার ?
পাল্টা প্রশ্নে চোখ বুজে নেয় নাদিয়া । নীরবে শ্বাস ফেলে ধীরুজ স্বরে বলে….
” সোহেল ? বল , কেমন আছিস ?
” ভালোই ! তুই ?
” আলহামদুলিল্লাহ !
” আমি চলে যাচ্ছি নাদিয়া ।
” কোথায় ?
” যেখানে ছিলাম সেখানে , দেশের বাইরে । এয়ার পোর্টে বসে শেষ বার কল করছি তোকে । ফোনের লাস্ট কল । ভাবলাম তোকে জানানো উচিত ।
নাদিয়ার থেকে কোনো সাড়া নেই । সোহেল এক মুহুর্ত চুপ থেকে আবার বললো কেমন করে , এবার বলতে গিয়ে গলা ধরে এলো ওর….
” আমায় আটকাবি না ?
নাদিয়ার জ্বালা ধরা চোখের জ্বলন বাড়ে । ঝাপসা হয়ে আসে অন্ধকারে । ঢুকি চিপে বলে রুদ্ধ স্বরে….
” তোকে আটকানোর আমি কে ?
” সবটাই তুই ! তুই বললে , একটু আশকারা দিলে আর যাবো না আমি । বিশ্বাস কর , আমার যেতে ইচ্ছে করছে না রে । একটু বোঝ আমায় । শেষ বারের মতো বলছি ! আমি চলে গেলে আর কিন্তু ফিরবো না । এটাই শেষ । প্রথম এবং শেষ বারের মতো একটা সুযোগ দেওয়া যায় না আমায় ? প্লিজ নাদিয়া , আ..আমি তোকে সত্যি সত্যিই ভালোবা….
কথা শেষ করার আগেই বাঁধ সাধলো নাদিয়া…
” সোহেল , অবান্তর কথা বলবি না । আমার জীবন বদলে গেছে । ডিভোর্সি আমি । এটা ভুলে যাস না…
” ভুলতে চাই , তুই ও ভুলে যা ।
প্লিজ নাদিয়া । আমার খুব কষ্ট লাগে ট্রাস্ট মি । ভালোবেসে হেরে যাওয়ার মতো ব্যর্থতা আর কিছুতে নেই । আমি ব্যার্থ হতে চাই না । আমি তোকে ছেড়ে আর অন্য দেশে যেতে চাই না । আমার ফ্যামিলি কে এভয়েড করতে চাই না আর ।
” তো থেকে যা দেশে । থাকতে কে বারন করছে তোকে ?
” তোর স্মৃতি , ব্যার্থ শ্বাস , এসবই বারন করছে আমায় । যে দেশে যে শহরে , পাশাপাশি তুই থাকা সত্ত্বেও তোকে নিজের করে পাবো না , সে দেশ , সে শহরে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে আমার । যদি দেশে থাকি , তাহলে তুই আমার হলে তবেই থাকবো । নতুবা নয় ।
” তাহলে চলে যা বিদেশ । ভালো করে পড়াশোনা কর , দেখবি পুরো লাইফ সেটেল হয়ে যাবে তোর । অনেককে পাবি সেখানে , আমার কথা এক সময় ভুলে যাবি । যৌবনের ভুল হিসেবে কোন এক সময় মনের কোণে উঁকি দিতে পারে আমার স্মৃতি । তবে মনে থাকবে না নিশ্চিত । আমার মতো মেয়েকে নিজের জীবনের সাথে জড়ানোর চিন্তা করাটাই ভুল । ভুল করিস না । একজন ডিভোর্সি মেয়েকে আমাদের সমাজ ভালো চোখে দেখে না । চোখে পট্টি বাঁধা এ সমাজের । আর এর তিক্ততা রোজ রোজ টের পাই আমি । ফেস করি রোজ । তুই খুব ভালো , ভালো পরিবারের । তোর পরিবার আমাদের সমাজের বাইরে নয় । এটা ভুলে যাস না ।
” পরিবার না মানলে পরিবার ছাড়বো । তবুও তুই মেনে নে আমায় । কক্ষনো কষ্ট পেতে দেবো না তোকে । সমাজের বাইরে গিয়ে থাকবো তোকে নিয়ে । যেখানে কেউ তোর সম্পর্কে কিচ্ছু জানবে না । তোকে আমি মেনে নেবো , এ সমাজ মানুক বা না মানুক , এতে কিচ্ছু যায় আসে না আমার । সমাজের ধার ধারবো না আমি । আমার শুধু তুই হলেই চলবে , প্লিজ আমাকে আটকা । আমি যেতে চাই না রে । তোকে নিয়ে এ দেশে থাকতে চাই ।
নাদিয়ার চোখ থেকে নিঃশব্দে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে বালিশে মিশে যায় । মুখ চেপে ধরে নিজেকে সামলায় ও । ফোন খানা একটু দূরে সরিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে । মনের বিপরীতে গিয়ে নিজের জেদকে ধরে রেখে বলে কোন রকমে….
” যদি কখনো ফিরে আসিস , তাহলে আবার তোর সাথে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ । আজ রাখি ? মাথা ধরেছে , ঘুমোতে হবে । ও দেশে গিয়ে ভালো থাকিস । নিজের খেয়াল রাখিস । কাউকে একটা খুঁজে নিস ও দেশে ।
সোহেলের ভারী দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ শোনা গেলো । পরমুহূর্তে শব্দ করে তাচ্ছিল্য হাসির ঝংকার । দম নিয়ে বললো সোহেল….
” আমাকে এখনো বুঝলি না তুই । বিদায় নাদিয়া , এ জীবনে তোর সাথে আর দেখা হবে না । আর ফিরবো না আমি । তবে হ্যাঁ, তোর জায়গায় অন্য কাউকে আর খুঁজে নেবো না । যৌবনের ভুল ছিলি না তুই । যৌবনের প্রথম প্রেম ছিলি । যাকে ভুলতে পারবো না । শ্বাস বন্ধ হবে , তবু থেকে যাবি হৃদকোঠরে । শুধু আফসোস , তুই আমাকে বোঝার চেষ্টা টুকুও করলি না । সেই একরোখাই রয়ে গেলি । একদিন না একদিন কাউকে না কাউকে ঠিক জায়গা দিবি জীবনে , সেই জায়গা টা আমি চেয়েছিলাম । দিলি না । বুঝলি না আমায় নাদিয়া , বুঝলি না । বিদায়…..
টুং টুং শব্দে ফোনটা কেটে যায় । নাদিয়ার কান থেকে আপনা আপনি ফোনটা পড়ে যায় বিছানায় । এক মুহুর্ত অপেক্ষা হয় না । বালিশ খামচে ধরে বালিশে মুখ গুজে ডুকরে ওঠে মেয়েটা । অসম্ভব যন্ত্রনায় চিরে যায় বুক ।
তবুও চিৎকার করে কাঁদতে পারেনা মেয়েটা । চোখের জলে বালিশ ভিজে একাকার হয় । চার দেয়ালের মাঝে ওর গুমড়ে ওঠা কান্নার আওয়াজ বাড়ি খেয়ে বন্দি হয়ে রয় । কেউ শুনতে পারে না , জানতে পারে না এই ঠুনকো অনুচ্চ মেয়েটার অন্তর্দহন । এক পর্যায়ে কান্না চেপে বিড়বিড় করে মেয়েটা…
” আমি সরি সোহেল । তোকে বুঝেও বুঝদার হতে পারলাম না । পারলাম না তোকে আটকাতে । পারলাম না তোকে আমার মতো মেয়ের সাথে জড়াতে । আমি যে পরিত্যক্ত , তার চেয়েও বড় কথা , আমি কখনো মা হতে পারবো না । কি করে জড়াতাম তোকে নিজের সাথে ? তোর সুন্দর জীবনটা আমার সাথে জড়িয়ে শূন্য করতে চাই না আমি । আমাকে ক্ষমা করে দিস , ভালোবাসতে পারলাম কিন্তু স্বীকার করে ভালোবাসার মর্যাদা দিতে পারলাম না এই প্রতিবন্ধকতায় ।
ফুঁপিয়ে ওঠে নাদিয়া ।
এয়ার পোর্টের বাইরে বসে সোহেল চোখ বুজে রাখে কিছুটা সময় । ভেতরে যাবে এখন । দশটায় ফ্লাইট । শরীর টলছে । কোনো রকমে টেনে টুনে চোখ খুললো ও । সহসা দু ফোঁটা অবাধ্য গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়লো পুরুষালি দুটো চোখ থেকে । তৎক্ষণাৎ চোখ মুছে নিলো সোহেল । শ্বাস টেনে উঠে দাঁড়ালো । ল্যাগেজ টা টেনে অবসন্ন পায়ে এগোতে এগোতে হাসলো পাগলের ন্যায় । কি অদ্ভুত জীবন । নাদিয়ার ডিভোর্সের কথা শুনে এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে আবার ছ্যাঁচড়ার ন্যায় দেশে ফিরলো ও । কিন্তু কি হলো ? নাদিয়া বুঝলো না ওকে । নিজের উপর চরম তিরষ্কারের হাসি আসে সোহেলের । পা দুটোকে টেনে নিয়ে এগোতে এগোতে কান্না চাপা রুদ্ধ স্বরে গায় ভাঙ্গা গলায়…..
“ পাখি আমার নিঠুর বড় , মন ও বোঝে না ।
আমার ভাঙ্গা খাঁচা পড়ে আছে , সে তো আসে না ।
ইভানদের বাড়িতে ঢাক ঢোল বাজছে বিয়ের । গায়ে হলুদ ছোঁয়ানো মোটামুটি শেষ । নাচ গান চলছে । এ বাড়ির বড় ছেলে ইভান । বাড়িতে প্রথম বিয়ে , তাও আবার এভাবে হুটহাট । তবুও খামতি নেই কোনো কিছুতে ।
স্টেজে ইভান বসে । নাচ গান চলছে সামনে । শান্ত আর রাফি একপাশে বসে আছে । বসে বসে নখ খুঁটছে শান্ত । কি আর করবে , কিছুই করার নেই ! মোদ্দা কথা কান্না পাচ্ছে ওর । রুহিটা সাথে আসলে কি হতো ? বউটাকে কতো বেশি মিস করছে শান্ত , তা যদি সেই ছিঁচকাদুনে মেয়ে বুঝতো !
রাফি ব্যস্ত ফোনে । আসল কথা ও ফোনের উপর নিজের ব্যাস্ততা দেখাচ্ছে । ভেতরে ভেতরে সেও জ্বলছে । কি হলো এখানে এসে ? বেকার বেকার সেই বসেই থাকতে হচ্ছে । পাশে বউ থাকলে এভাবে বসে বসে কাটানো মানা যায় । কিন্তু বউ না থাকলে কি আর করার ?
রাফি অপেক্ষায় আছে একটা সুযোগের । শান্ত একবার মুখ ফসকে রুহির কথা বললেই একটা বাহানা দেখিয়ে শান্ত কে বগলদাবা করে রুহি আর মিহির কাছে ছুটবে ওরা । কিন্তু এই শান্ত আজ এতো শান্ত কেনো ? কতক্ষন ধরে খচখচ করছে রাফি । কিন্তু শান্ত কিছুই বলছে না । ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে রাফির ।
শেষ মেষ আর ধৈর্য কুলালো না । ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । বিরক্তি দেখিয়ে বললো….
” শালা লাফাঙ্গা , চার ঘন্টা তেই আমার বোনকে ভুলে গেছিস ? রুহির কথা মনে পড়ছে না তোর ? এভাবে চুপচাপ বসে আছিস কেনো এখানে ?
থু করে থুথু ফেললো শান্ত । হাত ঝেড়ে বললো…
” চুপ শালা , সব তোর জন্য হয়েছে । তোর জন্য আমি আমার বউয়ের সাথে যেতে পারি নি । আমাকে ধরে বেঁধে আনলি কেনো এখানে ? আমার বউকে কি আমি কখনো ভুলতে পারি । শুঁকে দেখ , একটা পোড়া পোড়া গন্ধ পাবি , বউ বিরহে হৃদয় পুড়ছে আমার ।
” তাহলে এখানে বসে আছিস কেনো ?
যা বউয়ের কাছে !
” সিরিয়াসলি ভাই , যেতে তো চাইছি । কিন্তু কি করে ?
” আমিও তো যেতে চাইছি । কিন্তু এভাবে দুজনে বেরোলে বাপ মা সন্দেহ করবে । চল একটা টেকনিক খাটাই….
উদ্বেগাকুল হয়ে ছটফটিয়ে উঠলো শান্ত…
” কি টেকনিক , বল না ?
রাফি ঠোঁট চেপে ধরে । ইভানের দিকে তাকায় । শান্ত ও দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকায় ইভানের দিকে । রাফি বলে বিড়বিড় করে…
” ইভান,, আমাদের টোপ । ওকে কাজে লাগাই চল …
রাফি আর শান্ত হুড়মুড়িয়ে ইভানের দিকে এগোলো । স্টেজে দুজন দুপাশে বসে খিচে ধরলো ইভান কে । ইভানের ঠোঁট থেকে আজ হাসি সরছেই না । রাফি আর শান্ত পাশে বসতেই আরো বেশি চওড়া হলো হাসি । রাফি আর শান্ত একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে বাঁকা হেসে আরো চেপে বসলো ইভানের সাথে । অমনি খোশ মেজাজে বললো ইভান….
” হেয়য় ব্রাদার্স…. অবশেষে আমিও তোদের দলে যোগ দিচ্ছি । কনগ্রাচুলেট কর আমার….
মুখ বাঁকিয়ে কানে কানে বললো শান্ত…
” কনগ্রাচুলেট করা ছাড় হতভাগা , তুই তো ভারী আন রোমান্টিক । রাফির থেকে একধাপ উপরে তুই । কাল তোর বিয়ে , এর মধ্যে তুই তোর বউয়ের সাথে কথা বলেছিস একবারও ? নাকি ডিরেক্ট বাসর ঘরে ঢুকে সালাম কালাম সব সারবি ? ও থুক্কু , তোর হবু বউ তো আবার আমার পাতানো বোন । বাদ দে এসব সালাম কালাম । এখন বল , তোর বউয়ের সাথে কথা বলার ইচ্ছে নেই তোর ?
ইভান মুখখানা শুকনো করলো …
” ইচ্ছে তো আছে ভাই । কিন্তু কথা বলবো কি করে ? আরে ওর নাম্বারই তো আমার কাছে নেই । আর এই ব্যাস্ততায় কারোর কাছে চাওয়ার ও সুযোগ পাই নি । তোদের কাছে নাম্বার আছে মিস লিনার ? দে না আমায় , বড্ড উপকার হয় দিলে ?
রাফি ইভান কে নিজের দিকে টেনে ধরলো । বললো…
” আরে বেটা , ফোনে কথা বললে কি আর ফিল পাওয়া যায় নাকি ? চল , তোকে একটা হেল্প করি । ব্রাদার্স হিসেবে এটা আমাদের কর্তব্য । চল তোকে তোর বউয়ের সাথে একপলক মিট করিয়ে নিয়ে আসি ।
চিকচিক করে লাফিয়ে উঠলো ইভান …
” সত্যিই ?
” আরে বেটা আস্তে ! সত্যিই বলছি , দেখেছিস তোর জন্য কতটা ভাবি আমরা । এখন একটা রিস্ক নিতে হবে তোর জন্য । বাড়িতে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে বেরোতে হবে । চল এখনই যাবো ।
কথা শেষ করে ইভানের হাত টেনে উঠে দাঁড়ালো রাফি । প্রথমেই কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে পা বাড়ালো । স্টেজ থেকে নামতেই কোথা থেকে হেনা বেগম হাজির হলেন । তড়তড়ে গলায় প্রশ্ন করলেন…
” এই সময় তিনটেয় মিলে কোথায় যাচ্ছিস তোরা ?
উত্তর করলো রাফি….
” দূরে কোথাও যাচ্ছি না আম্মু । আজকের পর তো ইভানের বিয়ে হয়ে যাবে । ও আমাদের দলের বাইরে চলে যাচ্ছে , তাই ওকে নিয়ে একটু বাইরে যাচ্ছি । ছোট করে একটা রাইড দিয়ে ঘুরে আসবো । এমনিতেও এখানে ওর আর কাজ নেই । আমরা একটু ঘুরে আসছি , বাঁধা দিও না তো ।
হেনা বেগম চোখ সরু করে বললেন….
” ও তোদের দলের বাইরে যাচ্ছে , নাকি তোদের দলে আসছে ? ভুলে গেছিস , তোরা যে বিবাহিত !
পরিপ্রেক্ষিতে বিড়বিড় করলো শান্ত….
” এটা তোমরা ভুলে গেছো শাশুড়ি আম্মা , তাইতো আমাদের বউদের একপাশে আর আমাদের একপাশে বেঁধে রেখেছো ।
আর কথা বাড়ানো হলো না । বাহানা দেখিয়ে ইভান কে নিয়ে বেরিয়ে আসলো ওরা ।
রাত্রি এখন এগারোটার কাছাকাছি প্রায় । কনেপক্ষের হলুদের আয়োজন শেষ ।
মাতামাতি শেষে ফ্রেশ হতে যে যার ঘরে গেছে । মিহি আর রুহি ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো । রাতের খাবার খাওয়া হয় নি এখনো । খিদে নেই পেটে । এদিকে রাফি আর শান্তর ফোন ও অফ । দু’জনে বেশ কবার ফোন করেও পায় নি ওদের । ড্রইং রুমে বড়রা বসে আছেন । লতা বেগম ব্যাস্ত ভীষণ । সাবিনা বেগম, হালিমা বেগম আর রাবেয়া চৌধুরী , এনারা একপাশে বসে আছেন । ওনাদের সাথে যোগ দিয়েছে রুহি মিহি । যদিও এখানে এসে একলা লাগছে না মোটেও । নতুন জায়গা , নতুন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সবাই বেশ মিশুক । সবাই মিশে গেছে ওদের সাথে । মিহি সাবিনা বেগম আর রাবেয়া চৌধুরী মাঝে বসে দুজনের হাত চেপে ধরলো । সাবিনা বেগম প্রশ্ন করলেন…
” মেহজাবিন কোথায় ?
” আপু তো রুমে , ভাইয়া বেরোতে বারণ করেছে আপু কে ।
মুচকি হাসলেন সাবিনা বেগম ।
সদরের দিকে তিন জনের আগমন । দুটো চেনা মুখ । আরেকটার মুখ অদৃশ্যমান । কাজের ফাঁকে লতা বেগমের দৃষ্টি পড়লো সদরের দিকে । অমনি উদ্বিগ্ন হয়ে গলা উঁচু করে ডেকে উঠলেন তিনি…
” আরে রাফি , তোমরা এখানে ?
সচকিতে সবার সাথে ধক্ করে সদরের দিকে তাকালো মিহি । সর্বপ্রথম রাফির সাথে ওর চোখাচোখি হলো । এতেই আরো বেশি ছ্যাঁত করে ওঠে মেয়েটা । দৃষ্টি জোড়া বৃহৎ হয়ে আসে অবিশ্বাসে । সদর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেছে রাফি, শান্ত আর একজন । মিহি হতভম্বের ন্যায় হা বনে দাঁড়িয়ে গেলো । রাফি ড্রইং রুমে এসে লতা বেগমের উদ্দেশ্যে প্রত্যুত্তরে বললো…
” জ্বি আন্টি , ভালো আছেন ?
এগোলেন লতা বেগম । আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বললেন…
” হ্যাঁ হ্যাঁ । কিন্তু তোমরা এখানে,এতো রাতে কি করছো ? তোমরা না বরপক্ষ ?
” বউ পক্ষ থেকেও দাওয়াত পেয়েছি আন্টি । কিন্তু আসার ইচ্ছে ছিলো না । আবারো কিন্তু , আসলে আমাদের বউ গুলো তো এখানে , তাই না চাইতেও আসতে হয়েছে ।
শান্তর কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন লতা বেগম । এক মুহুর্ত পর হাসলেন । রাফি আর শান্তর সাথে কালো বোরখায় আবৃত আরো একজন । মহিলা বোধহয় , তবে বেশ উঁচু লম্বা স্বাস্থ্যবান । চোখ, মুখ সব ঢাকা কালো বোরখা আর লম্বা হিজাবে । লতা বেগম কপাল গুটিয়ে বললেন….
” ইনি কে ? এভাবে বোরকা পরে আছেন , চিনলাম না তো ।
রাফি আর শান্ত একসাথে তাকালো বোরকা পরিহিতার দিকে । হাসি চেপে খুক খুক কেশে উত্তর করলো রাফি…
” আআআ ,, উনি ? উনি আমার সম্পর্কে নানু হন । খুব পর্দাশিল । ইভান , মানে ওনার দূর সম্পর্কের নাতির বউকে দেখতে এসেছেন উনি । বোরকা ছাড়া আসবেন না উনি । তাই আর কি….
লতা বেগম সাথ সাথ সালাম দিলেন । বললেন গুরুজন তুল্য সম্মানের সহিত….
” তাহলে তো উনি আমাদের বিশেষ অতিথি । আসুন আসুন, বসুন ।
রুহি কপাল কুঁচকে পাশ থেকে বললো….
” ইনি আমাদের কোন নানু , ভাইয়া ? চিনলাম না তো !
” তুমি চিনবে না জান । ইনি তোমাদের আপডেট নানু । লিনার সাথে দেখা করতে এসেছে । আর আমি এসেছি তোমার সাথে দেখা করতে ।
রুহি মুখ বাঁকালো । বোরকার আড়াল থেকে ভয়ে ভয়ে চেয়ে আছে ইভান । কলিজা শুকিয়ে গেছে ওর । ও শুধু বলেছিলো , নতুন বর এভাবে বিয়ের আগে শশুর বাড়ি গেলে লোকে কি ভাববে ? সবাই তো চিনে ফেলবে ওকে । ব্যাস , এটাই বলেছিলো শুধু , রাফি আর শান্ত ধরে বেঁধে বোরকা পড়িয়েছে ওকে । যাতে কেউ ওকে দেখতে না পারে । এতে নতুন বরের মুখ , শরীর দুটোই ঢাকা থাকবে । কেউ চিনতে পারবে না । আর এই ছলে এক ঢিলে তিন জন তিন দিকে তিন পাখি মারবে ।
নিকাবের আড়ালে ঢোক গিললো ইভান । রাফির কাছ ঘেঁষে বিড়বিড় করলো….
” ভাই , ধরা পড়ে গেলে প্রেস্টিজ ফালুদা হয়ে যাবে আমার । কিছু একটা কর । হাঁটু কাঁপছে আমার । এভাবে হবু শাশুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না । এখান থেকে বাঁচিয়ে আমার হবু বউয়ের কাছে ছুড়ে মার আমায়….
রাফি শুনে গলা ঝেড়ে বললো…..
” আন্টি , লিনা কোথায় ? উনি দেখা করবেন একটু !
” লিনা তো উপরে । নিজের ঘরেই আছে , ফ্রেশ হতে গেছে । মিহি , ওনাকে লিনার ঘরে নিয়ে যাও তো ।
লতা বেগমের কথায় এতক্ষণে হুসে ফিরলো মিহি । তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই আরো একবার চোখাচোখি হলো রাফির সাথে । অমনি ঠোঁট পিষে ভ্রু নাচালো রাফি । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দৃষ্টি সরায় মিহি । ঢোক গিললো । রাফি বলেছিল ও আসবে , আর এখন এসে গেছে । হৃদকোঠরে তান্ডব চললো মিহির । প্রজাপতি উড়লো শতশত । ঠোঁটের কোণে হাসির দেখা মিললো । হাসি চেপে বললো…
” উপরে চলুন , আপু উপরে আছে ।
মিহি পা বাড়াতে গেলে রাফি বললো….
” আমিও যাচ্ছি চলো ।
ওরা তিনজনে উপরে উঠতে লাগলো ।
এখনো অবধি রুহির পাত্তা না পেয়ে শান্ত বললো লতা বেগমের উদ্দেশ্যে…
” আন্টি , ওয়াশ রুম যেতাম একটু ।
লতা বেগম ব্যাস্ততা দেখিয়ে চটপট বললেন…..
” রুহি , শান্ত কে নিয়ে ওয়াশ রুম টা দেখিয়ে দাও একটু । অ্যাটাচ ওয়াশ রুমে নিয়ে যাও ।
বলেই জায়গা ত্যাগ করলেন তিনি । রুহি মুখ বাঁকিয়ে কড়কড়ে স্বরে বলল পা বাড়াতে বাড়াতে…..
” আসুন ।
ওরা দুটোতেও উপরে উঠলো ।
ওরা চলে যেতেই হালিমা বেগম আর সাবিনা বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠলেন । রাবেয়া চৌধুরী না বুঝে প্রশ্ন করলেন…
” হাসছো কেনো তোমরা ?
উত্তর করলেন হালিমা বেগম….
” ছেলে মেয়েদের প্রেম দেখে হাসছি আপা । ছেলে মেয়েরা ভাবছে আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি । কিচ্ছুটি বুঝি না । কিন্তু আমরা যে তাদের এক কাঠি উপরে , সেটা তারা জানে না ।
এই বলে আবারো হেসে উঠলেন দু’জনে ।
লিনার ঘরের বাইরে থেমে কড়া নাড়লো মিহি । ভেতরে লিনা একা । ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করছে হয়তো । কিছুক্ষণ পর দরজা খুললো সে । দরজার সম্মুখে মিহির সাথে রাফি কে দেখে অপ্রস্তুত হলো খানিক । রাফি নিজে থেকেই কুশল বিনিময় করলো আজ । অতঃপর বোরকা পরা ইভান কে দরজার দিকে ঠেলে দিয়ে বললো….
” লিনা , ইনি তোমার নানু শাশুড়ি । দেখা করতে এসেছেন তোমার সাথে । ভেতরে নিয়ে গিয়ে কথা বলো ….
ইভান কে ঠেলে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিলো রাফি । পিছু পিছু মিহি ঢুকতে গেলে রাফি ওর হাত টেনে ধরলো । করিডোরে হাঁটা লাগাতে গেলে হকচকিয়ে বললো মিহি….
” এ কি , আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ?
” প্রেম করতে ।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই কম্পন বাড়লো ইভানের । হাঁটু কাঁপছে ওর । বুক ঢিপঢিপ করছে লিনা কে এভাবে দেখে । সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে লিনা । ভেজা চুল একপাশ করে রাখা । হাতে এখনো টাওয়েল ।
ইভানের বক্ষ স্পন্দন জোরালো হয় । শুকিয়ে আসে কন্ঠ নালি । পর পর ঢোক গেলে সে । লিনাও অপ্রস্তুত । গুরুজন হিসেবে সালাম দিলেও ইনি সালামের উত্তর করলেন না । আমতা আমতা করে বলল লিনা….
” ভেতরে এসে বসুন , আমি নাস্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করছি ।
দরজা দিয়ে বেরোতে গেলে খপ করে ওর হাত টা টেনে আটকে দিলো ইভান । লিনা ঝট করে তাকানোর সাথে সাথে সহসা ছাড়লো হাত । তড়িত বেগে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো । হতবাক হলো লিনা । চোখ তুলে তাকিয়ে বললো স্বাভাবিক ভাবে….
” কি হলো , কিছু বলবেন ?
পর্দার আড়ালে মাথা ঝাঁকায় ইভান ।
আকস্মিক শ্বাস খিচে মুখের নিকাব সরিয়ে ফেলে এক টানে । পর্দার আড়াল থেকে ইভানের মুখশ্রী ভেসে ওঠা মাত্রই তাজ্জব বনে যায় লিনা । মুখ গোল করে হা বনে তাকিয়ে রয় ফ্যাল ফ্যাল করে । ইভান কেবলই বোকা বোকা হাসে । গলা ভিজিয়ে ধীরে বলে….
” হায়,মিস লিনা…..
ছিটকে পিছিয়ে যায় লিনা । তব্দা খেয়ে শুকনো কেশে ওঠে । ইভান ফের ঢোক গিললো, বললো…..
” মিস লিনা , সরিই । আসলে ঐ রাফি আর শান্ত আমাকে এভাবে সাজিয়ে এনেছে । এতে আমার কোনো হাত নেই , বিশ্বাস করুন । আমি শুধু ওদের কাছে আপনার নাম্বার চেয়েছিলাম । আর ওরা আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এভাবে শং সাজিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে ।
কাশি থামায় লিনা । ইভান শরীর থেকে বোরকা খুলে ঝাড়া মেরে ছুড়ে ফেলে । টেবিলের উপর রাখা গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খায় । ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে । আড়চোখে তাকায় লিনা । ইভান কাঁচুমাচু মুখে বলে কথা খুঁজে না পেয়ে….
” মিস লিনা , আপনি বরং আপনার নাম্বার টা দিন । আমি বাড়িতে গিয়ে আপনাকে ফোন করবো ।
” আমার নাম্বার নেওয়ার জন্য উবে এসেছেন এতো দূর ?
” না , মানে ….
এভাবে সামনা সামনি কথা বলতে আপনি ইতস্তত বোধ করছেন হয়তো । তাই নাম্বার চাইলাম ।
” আমার নাম্বার নিয়েও লাভ নেই । আমার নাম্বার অলরেডি আছে আপনার কাছে ।
” নেই ।
” আছে , ইনফ্যাক্ট আপনি আমার নাম্বার ব্লকে রেখেছেন ।
ইভান কপাল কুঁচকালো । ও বোঝে নি , এটা ধারনা করে মুখ ভেংচালো লিনা । বললো চোখ উল্টিয়ে…..
” কেউ একজন বলেছিলো , আমি যদি তাকে বিয়ে করতে চাই তাহলে যেনো এক চেপে দেই । তাই এক চেপে রোজ ভোরে তার নাম্বারে কল করতাম । কিন্তু সে তো আমার উপর বিরক্ত হয়ে শেষ মেষ ব্লক করে দিলো আমায় । আমার আর কি করার ?
ইভান আশ্চর্য বনে গেলো চোখ বৃহৎ করে ।
এক মুহুর্ত পেরোতেই সব হিসেব মেলাতে সময় লাগলো না আর । সবটা মিলে যেতেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো ইভান । তড়িতে ছটফটিয়ে এগিয়ে বললো….
” আরে মিস লিনা , ঐ গায়ে পড়া মেয়েটা আপনি ছিলেন ?
চোখ ফিরিয়ে জবাব দেয় লিনা….
” হুম । গায়ে পড়া বললেন কেনো আমায় ?
হেসে উঠলো ইভান ।
” সিরিয়াসলি , আরে ভাই আমি তো ভেবেছিলাম আপনাকে হয়তো জোর করে আমার সাথে বিয়ে দিচ্ছে । এখন তো দেখি আপনি নাটের গুরু । তারমানে আগে থেকেই সবকিছু জানতেন আপনি ? শুধু আমিই জানতাম না ।
লিনার দিক থেকে সাঁড়া শব্দ নেই । ইভান পকেট থেকে ফোন বের করে চটজলদি ওর নাম্বার টা আনব্লক করলো । বললো মৃদু স্বরে….
” এই নিন , দিয়েছি নাম্বার আনব্লক করে । এবার যত খুশি ভোর ভোর জ্বালাবেন আমায় । অবশ্য এভাবে ফোন করে আর জ্বালাতে হবে । জ্বালানোর জন্য পারমানেন্টলি কাল নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে । যতো খুশি জ্বালাতে পারেন কাল থেকে । আমি জ্বলতে প্রস্তুত মিস লিনা ।
চিবুক নামিয়ে লাজুক হাসে লিনা ।
চোখ নামিয়ে নিলো লজ্জা আড়াল করে । অনেকটা দূরত্ব ওদের মাঝে । ইভান দুই পা এগিয়ে একটু দূরত্ব কমালো । কন্ঠ আরো বেশি নুইয়ে বললো হীম স্বরে…..
” দূরত্ব রেখে যাচ্ছি আজ , কাল এসে দূরত্ব ঘুচিয়ে নিয়ে যাবো । বি প্রিপেয়ার মিস লিনা ..
রুহি আর মিহির জন্য বরাদ্দ ঘরে ঢুকে ওয়াশ রুম ইশারা করে খড়খড়ে গলায় বললো রুহি…..
” ঐ যে ওয়াশ রুম , যান…
” হ্যাঁ জান ।
” আরে ওয়াশ রুমে যেতে বলেছি , ওয়াশ রুমে যান….
” ওয়াশ রুম পায় নি আমার । ভীষণ প্রেম প্রেম পাচ্ছে , তাই বউয়ের কাছে ছুটে এসেছি । তুমি তো খুব জল্লাদ ।
” জল্লাদ কেনো হলাম ?
কোমরে হাত ঠেসে চোখ পাকিয়ে বললো রুহি । প্রত্যুত্তরে শান্ত বললো….
” বউ ছাড়া এই এতিমের খোঁজ নিলে না একবারও ?
” কতবার ফোন করেছি দেখেছেন ? ফোন ধরছিলেন না কেনো ? নিজে তো আপন ইচ্ছেয় খোঁজ নেবেন না , উল্টে আমি নিজে খোঁজ নিলাম । আর এখন আপনি আমাকেই জল্লাদ বলছেন ?
” ও সরি , ফোন করেছিলে ? দেখিনি তো । রাখো এসব , এখন একটু কাছে এসো…
মুখ বাঁকায় রুহি । ও নাহলেও পঞ্চাশ বার ফোন করেছে এই লোককে । কিন্তু এই লোক ওর ফোন ধরেনি । রুহি রেগে আছে । রেগে মেগেই বললো কন্ঠ চড়িয়ে…..
” শুকনো কথায় চিড়ে ভিজবে না , চুপচাপ চলে যান এখন । আর ঐ নানু , উনি কে বলুন তো ? ওনাকে তো চিনলাম না !
শান্ত এগিয়ে এসে ঠেস দিয়ে রুহি কে জড়িয়ে ধরলো ।
ছটফট না করে স্থির রইলো রুহি । শান্ত বললো….
” উনি স্পেশাল কেউ । ওনাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমায় । আমি তোমার জন্য কতদূর থেকে ছুটে আসলাম , আমায় নিয়ে ভাবো । কাঠখড় পুড়িয়ে এভাবে আসতে গিয়ে চার ফোঁটা ঘাম ঝরেছে আমার । ভাবতে পারছো কতটা কসরত করে এসেছি ।
রুহি নাক কুঁচকে দু’হাতে শান্তর গাল টেনে ধরলো । শক্তি খাটালো একটু । মৃদু ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো শান্ত…
” ওও জান , লাগছে ।
” লাগুক, আরো বেশি লাগুক ।
” ছিঁচকাদুনে মেয়ে , আমি তোমাকে ধরলে কেঁদে কুল পাবে না ।
রুহি ছাড়লো । শিথিলতা টানলো চেহারায় । পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়ালো । ওষ্ঠ বাড়িয়ে একে ডান বাম দুগালেই চুমো খেলো শান্তর । শান্ত অবাক না হয়ে পারলো না এই কান্ডে । অবাক লোচনেই চাইলো সে । রুহি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করলো….
” মি. শাহরিয়ার শান্ত , আমাকে কাঁদানোর কলিজা আছে আপনার ?
একই ভাবে ফিসফিস করলো শান্ত…..
” নেই তো । আর নেই বলেই শতশত চিমটির প্রতিশোধ নেওয়া বাকি এখনো । প্রতিশোধ নেবো কি করে ? ভালোবাসি যে ! প্রতিশোধ নিতে গেলে কাঁদবে তুমি । ছিঁচকাদুনে মেয়ে ।
” উমমম , আমি মোটেও ছিঁচকাদুনে নই ।
শান্ত খানিক হাসে । রুহির নাক টেনে বলে….
” আই নো । মামুর এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসি ।
” আমিও !
” হুম ?
” ভালোবাসি !
শান্ত শীতল হাসে । আলগোছে আরামছে জড়িয়ে নেয় রুহিকে । ছাড়তে বড্ড নারাজ সে । বুকে শীতলতা ছেয়ে যায় এই মেয়ের সংস্পর্শে ।
মিহি কে নিয়ে সোজা ছাদে উঠেছে রাফি । দরজা লাগিয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে । হাত ছাড়ে নি একটা বারও । রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়েই পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রাফি । এতক্ষণে তৃপ্ত শ্বাস ফেললো । মিহির মসৃন কাঁধে নাক ঘষে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো । বিড়বিড় করলো….
” ইউ নো , তুমি হীনা এই পাঁচ ঘন্টা পাঁচ বছরের সমান ছিলো আমার কাছে । বলেছিলাম না আসবো , এই দেখো এসে গেছি ।
মিহি নিজেকে ছাড়াতে কসরত করে বললো…..
” আরে ছাড়ুন , কেউ এসে যাবে ছাদে । এটা আমাদের বাড়ি নয় ।
” কেউ আসবে না , দরজা লাগিয়ে দিয়েছি ।
” এতো রাতে এখানে আসলেন কেনো আপনি ?
” তুমি ছাড়া ভালো লাগেনা তাই !
” আমি কাছে থাকলে ভালো লাগে ?
” ভীষণ ভালো লাগে !
উন্মুক্ত কাঁধে আরো একবার ঠোঁট ছোঁয়াতেই কুঁকড়ে যায় মিহি । ছটফট করে উঠে….
” উফফফ , ভীষণ পাগলামো করছেন আপনি !
” বউয়ের প্রতি করছি !
” একটু পাগলামো কমান ।
” শুরুই করিনি এখনো ।
” ছাড়ুন !
” এ জীবনে ছাড়ছি না ।
” আরে আমাকে এই মুহূর্তের জন্য ছাড়তে বলেছি ।
” এই মুহূর্তে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না ।
” এইইই ছাড়ুন না , দম বন্ধ লাগছে ! একটু শ্বাস নিতে দিন । তারপর আবার এভাবে ধরবেন , বাঁধা দেবো না ।
রাফি ছাড়ার আগেই ছাদের দরজায় কড়া পড়লো । ইভানের চাপা স্বর ভেসে আসলো…..
” এই রাফি , ভাই বাড়ি যাবো । তাড়াতাড়ি আয় ইয়ার , দরজা লাগিয়ে এখানে কি করছিস ?
রাফি তড়িতে মিহি কে ছাড়ে । ছিটকে কিছুটা দূরে সরে মিহি । ইভানের কন্ঠ ঠাহর করে থতমত স্বরে বলে..
” ইভান ভাইয়া ?
বাঁকা হাসলো রাফি । কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে মাথা বাড়িয়ে দেখলো । ইভান আবার আগের মতো বোরকা পরে তৈরি হয়ে গেছে । চড়া গলায় বললো রাফি…..
” কি হয়েছে ? ডিস্টার্ব করছিস কেনো ?
” আরে ভাইই , বাড়ি যাবো চল । এখানে তো সবাই আমায় ট্রিট করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে । জলদি কেটে পড়তে হবে । নয়তো ধরা পড়ে যাবো ।
” ধরা পড়লে তুই পড়বি , আমার কি ? যা ভাগ এখান থেকে । ডিস্টার্ব করবি না একদম ।
বিশাল ঝটকা খেলো ইভান ।
” ইয়া আল্লাহ , পাল্টি খাচ্ছিস কেনো এখন ? তুই না আমাকে আমার হবু বউয়ের সাথে দেখা করাতে নিয়ে আসলি । আমার দেখা করা শেষ । এখন চল ফিরে যাই ।
” শালা হাদারাম , তোর ছলে আমি নিজেই আমার বউয়ের সাথে দেখা করতে এসেছি । আর ফিরছি না আমি । এখানেই থাকবো আজ । তুই যা ভাই । বিয়ের আগে শশুর বাড়িতে থাকতে নেই । লোকে খারাপ বলবে । তাই তোর থাকা হবে না । চলে যা তুই ।
” আমি ? আমি একা কোথায় যাবো ?
” বাড়ি যাবি ।
” এই রাফি , চিপায় ফেলবি না আমায় । শান্ত কেও খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও । তুই আমাকে বাড়ির বাইরে রেখে আয় । তার পর এসে পিরিত কর । আমি একাই চলে যেতে পারবো ।
রাফি ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । কথা বাড়ালো না । মাথা তুলে পিছু ফিরে মিহির উদ্দেশ্যে নরম কন্ঠে বলল…..
” আমি আসছি । এখানেই থাকো…
অতঃপর ছাদ থেকে দরজা মারিয়ে কড়কড়ে গলায় বললো….
” চল হতচ্ছাড়া…..
ইভান বিড়বিড় করলো….
” এদিকে গরম আর ওদিকে নরম । পুরুষ মানুষের কি রুপ ভাই ! বউয়ের জন্য ভাইকে কব্জা করলো । এখন আবার পাল্টি খাচ্ছে । আমার ও কাল থেকে আসছে সুদিন , এবার আমিও দেখিয়ে দেবো , হুহহহ !
ইভান কে বাড়ির বাইরে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসেছে রাফি । ও একাই চলে যেতে পারবে ।
সবার চোখ চুরিয়ে আবার ছাদে উঠলো সে । বাজে প্রায় বারোটা । বাড়িতে কেউ কেউ জেগে , আবার কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে । রাফি ছাদে উঠে এবেলায় দরজা চাপিয়ে দিলো । সোজা নাক বরাবর এগোতেই কপাল কুঁচকালো । মিহি নেই এখানে । এগিয়ে যেতে যেতে ডাকলো রাফি…..
” ব্লোসোম ??
এক ডাকেই এবার রাফি কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো মিহি । ছোট দুহাতে বহু কসরতে ঠিকঠাক জড়াতে সক্ষম হলো । আকস্মিক মিহির কান্ডে মৃদু হাসলো রাফি । মিহি নড়েচড়ে বললো….
” ওটা ইভান ভাইয়া ছিল ?
” হুম ।
” চলে গেছে ?
” হুম ।
” আপনি গেলেন না ?
” না ?
” কেনো ?
” তোমাকে ছেড়ে যাবো কোথায় ?
” যেতে হবে না , আমার কাছেই থাকুন ।
” থাকতে বলছো ?
” হুম !
মিহি কে ছাড়িয়ে সামনাসামনি দাঁড় করালো রাফি । রেলিংয়ে খানিক হেলে মিহির কোমর জড়িয়ে ধরল । খোলা চুল কানের পাশে গুজে দিলো । শাড়ির আঁচল টেনে তুলে দিলো মাথায় । বললো মোলায়েম কন্ঠে…..
” আমি জড়িয়ে ধরেছিলাম বলে এক্ষুনি কার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিলো ?
” কই , দম বন্ধ হচ্ছিলো না তো !
” ছাড়তে বলছিলে কেনো ? আমি জড়ালে দম বন্ধ লাগে ?
” উঁহু । দম ফিরে পাই আপনার সংস্পর্শে ।
রাফি ঝুঁকে মিহির কপালে চুমু খেলো । সুপ্ত অনুভূতিতে চোখ বুজলো মেয়েটা । এক মুহুর্ত পর চোখ খুলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাথাটা এলিয়ে রাখলো রাফির প্রসস্থ বুকের মাঝে । দুহাতে মুড়িয়ে জড়ালো রাফি কে । বললো…
” মি. রুজান রাফি চৌধুরী , এই পাঁচ ঘন্টার বিরহে ছুটে এসেছেন এভাবে ! যদি আপনার আগে আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে….
মিহি কথা শেষ করতে পারে না । ওকে তুলে ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে আঁটকে দেয় রাফি । কিছুটা রাগ দেখায় চোখ রাঙিয়ে । মিহি চোখে চোখ রেখে হাসে বিপরীতে । রাফি রাগ ঠেলে বলে শীতল কন্ঠে…..
” আমি ফুরিয়ে গেলেও তোমার নিঃশ্বাস যেন কভু না ফুরোয় । তুমি হীনা পাঁচ ঘণ্টা, আজ একটু বেশিই সময় পার করেছি । এতেই কলিজা শুকিয়ে গেছে আমার । আমার প্রথম প্রেম , প্রথম ভালোবাসা , আমার নিঃশ্বাস, আমার জীবন , আমার ব্লোসোম কে ছাড়া এক মুহুর্ত ও চলবে না আমার । এটা বুঝে গেছি আমি ।
মিহি কেবলই হাসলো । বললো আবদারের সুরে….
” জড়িয়ে ধরুন শক্ত করে । আমি কাছেই আছি ।
” শুধু শরীরের সাথে নয় , আমার নিঃশ্বাস সাথে সাথে পুরো জীবনে সেই #এক_দেখায় জড়িয়ে নিয়েছি তোমায় । আর ছাড়ছি না । এখন তুমি আমায় জড়িয়ে নাও ।
” নিয়েছি তো ।
” ভালোবাসি বলো ।
” ভালোবাসি !
” আবার বলো !
” ভালোবাসি ।
” আবার ?
” ভালোবাসি , ভালোবাসি, ভালোবাসি , ভীষণ ভালোবাসি মি. রুজান রাফি চৌধুরী ।
রাফি ওকে আলগা করে চোখে চোখ রাখে । ঘোরে আবিষ্ট নজরে চাওয়া চাওয়ি হয় দুজনার । চাঁদের ম্লান আলো আছড়ে পড়েছে দুজনের উপরে । দুজনার ভালোবাসার সাক্ষী হতে গিয়ে লজ্জায় ক্ষণে ক্ষণে মেঘের আড়ালে লুকোচ্ছে নিশাকর ।
রাফি আবিষ্ট নেত্রে চেয়ে থেকে কোমর ছেড়ে নিজের দুহাতের আজলে মিহির মুখখানা আগলে ধরে । ঝুঁকে ওষ্ঠ নামিয়ে মিহির দু’চোখের দিকে অগ্রসর হতেই চোখ বুজে নেয় মিহি । ওর বন্ধ দু’চোখের পাপড়িতে নরম ওষ্ঠ যুগল গাঢ় করে স্পর্শ করায় রাফি । কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাকে নাক ঘষে , হীম শীতল কন্ঠে বলে…
” ভালোবাসি তোমাকেও । সেই #এক_দেখা থেকেই ভালোবাসি । ভীষণ ভালোবাসি । এ ভালোবাসা যেন কভু না ফুরোয় । আই লাভ ইউ মিহি , আই লাভ ইউ ।
একটু থেমে মৃদু স্বরে সুর তোলে গানের ছন্দে….
এক দেখায় পর্ব ৭২
“ এই মন গলে পড়েছে ঢলে
তোর মনেরি কোলে ,, #এক_দেখায় ।
তোর বিশ্বাসে প্রতি নিঃশ্বাসে নে জড়িয়ে আমায় ,
নির্দ্বিধায়……
সুখ বলে যদি থাকে কিছু , এই পৃথিবীতে
তার সবি যেনো আছে তোর ঐ চোখের মনিতে…
এই মন গলে পড়েছে ঢলে
তোর মনেরি কোলে ,, #এক_দেখায় ।
তোর বিশ্বাসে প্রতি নিঃশ্বাসে নে জড়িয়ে আমায় ,
নির্দ্বিধায়……
সমাপ্ত
