এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৪
সুহাসিনী
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকে ধীরে ধীরে বাড়ি খালি হতে শুরু করলো। অন্যের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মাঝে যে কি আনন্দ পায় গ্রামবাসী তা ভেবে পায়না সাঈদ।উঠোনে এখনো মাথা নিচু করে বসে আছে সে। বৃষ্টি সেই কখন কাদতে কাদতে গিয়ে ঘরে খিল দিয়েছে। আর রফিক সাহেব এখনও নির্বাক হয়ে পাথরের ন্যায় বসে আছে। কোথা থেকে কি হয়ে গেলো সেটা এখনও বোধগম্য হলো না উনার।এতো শখের মেয়ের সাথে এরকম অন্যায় তিনি সহ্য করতে পারছেন না।বাবা হিসেবে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে আজ।
বৃষ্টিকে ঘরের বাইরে থেকে নানান ধরনের কথা শুনাচ্ছে তার দাদী। মেয়েটা সেই শুরু থেকে কান্না করে যাচ্ছে,কেউ একটা বার তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টাও করেনি।
প্রেম রুমে এসে রাহিকে দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুচকালো।এই সময় কোথায় যাবে? ড্রয়িংরুমেও দেখলো না।আয়েশা একা বসে আছে ড্রয়িংরুমে।সে ভেবেছে রাহি হয়তো রুমেই আছে তাই কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।প্রেম ভাবলো রাহি হয়তো ছাদে গেছে।তাই বেশি চিন্তা না করে আস্তে ধীরে ফ্রেশ হয়ে নিচে গেলো। আফরোজা খান ছেলেকে খেতে দিলো।এখনো কোথাও রাহিকে দেখতে না পেয়ে প্রেমের কপালে ভাঁজ পড়লো।এতক্ষণ তো ছাদে থাকার কথা না।তাহলে কোথায় গেছে।
প্রেম খেতে বসে সময় নিয়ে আয়েশার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,
“তোরা সবাই খেয়েছিস?”
“হুম ভাইয়া।”
আর কিছু বলল না আয়েশা।প্রেম তার যথাযথ উত্তর না পেয়ে বেশ বিরক্ত হলো।আবার কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল,
“বাড়ির আর বাকি সবাই কোথায়?”
আয়েশা বোধহয় এবার প্রেমের প্রশ্নের আসল কারণ বুঝলো। সেও বাকা হেঁসে বললো,
“আব্বু তো না খেয়েই অফিস চলে গেছে। আর ফিরোজা আন্টি নিজের রুমে।”
আয়েশা আবার চুপ করে গেল।ইচ্ছে করেই বললো না রাহির কথা।প্রেম ভাঙবে তবু মচকাবে না।
“ওই অবাধ্য মেয়ে কোথায়?”
“কোন অবাধ্য মেয়ে ভাইয়া?”
বুঝেও না বুঝার ভান করে বলল আয়েশা।প্রেম এবার বিরক্ত হলো ধমকের সুরে বলল,
“পাগল মেয়ে এই বাড়িতে কয়টা আছে?”
ধমক খেয়ে আয়েশা চুপসে গেলো।এবার আর মজা করলো না।
“রাহি বাইরে গেছে নিপার সাথে দেখা করতে।”
প্রেমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো।এতো বার করে নিষেধ করার পরেও একা একা বাইরে চলে গেছে আবার তাকে না জানিয়ে।কিছুদিন আগের বিপদের কথা ভুলে গেছে মনে হয়।প্রেম রাগে খবর শেষ না করেই উঠে গেলো।আফরোজা খান কিচেন থেকে এসে ছেলেকে এভাবে উঠে যেতে দেখে বিচলিত হয়ে বলল,
“কি হয়েছে বাপ,এভাবে খাবার রেখে উঠে যাচ্ছিস কেনো?”
প্রেম যেতে যেতে উত্তর করলো,
“এসব খেতে ভালো লাগছে না আম্মু,আজকে দুপুরে আমি তোমার ছেলের বউ এর কলিজা ভুনা দিয়ে ভাত খাবো।”
প্রেম চলে গেলো।আফরোজা খান আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে ছেলের চলে যাওয়ার দিকে।সব তার মাথার উপর দিয়ে গেলো।আয়েশাকে বললো,
“ও কি বলে গেলো রে?”
“বলে গেলো আজ রাহির কপালে শনি নাচছে।”
নিপা আর রাহি বসে আছে ফুটপাতের একটা ফুচকার দোকানের সামনের চেয়ারে।দুজনের কাছেই কোনোকিছু খাওয়া মানে হচ্ছে ফুচকা।
দুজনে জমিয়ে গল্প করছে।এর মধ্যেই একটা কম বয়সি ছেলে এসে দুই প্লেট ফুচকা দিয়ে গেলো। দেখেই দুজনের জিভে পানি চলে আসলো।দেরি না করে একটার পর একটা মুখে পুড়তে লাগলো দুজন।এরপর আরও দুই প্লেট অর্ডার করলো।
রাহি অনেকক্ষণ ধরে নিপার সাথে ঘেনঘেন করছে তার সাথে তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু নিপা রাজি হচ্ছে না।বারবার বলছে বাড়িতে মানবে না।রাহি বলছে বাড়িতে সে কথা বলে ম্যানেজ করে নিবে।কিন্তু নিপা রাজি হচ্ছে না।রাহি বুঝলো নিপা অন্য কারণে নিজেই যেতে চাইছে না।কিন্তু কারণটা কি।রাহি এসেছে যাবৎ খেয়াল করছে নিপা একটু পর পর ফোনে কি যেনো দেখছে।আগে তো তারা দুজনে কথা বললে কখনও নিপা ফোন দেখতো না। এমনকি কেউ কল করলেও বলতো এখন বিজি আছি পরে কথা বলব।তাহলে আজ কি হয়েছে ওর।রাহি কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো হয়তো ব্যাপারটা।তাই নিপাকে বাজিয়ে দেখতে বললো,
“দেখ নিপা,ছেলেটা কি হ্যান্ডসাম এবং কিউট।”
নিপা একবার দেখলো ছেলেটাকে।এরপর বিরক্তির সুরে বলল,
“তোর না জামাই আছে রাহি,এখন অন্তত নজরটা ঠিক কর।”
“আমি কি আমার জন্য বলেছি নাকি।আমার তো এর চাইতেও সুন্দর জামাই আছে।আমি তো তোর জন্য বললাম।”
“আমার লাগবে না।”
“কেনো? কাউকে পেয়ে গেছিস নাকি?”
নিপা এবার থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আরে কিযে বলিসনা তুই,আমি আবার কাকে পাবো। আসলে ভবিষ্যৎ জামাই এর হোক নষ্ট করতে চাচ্ছি না।”
“হুম,বুঝি বুঝি সবই বুঝি,আগে যেই মেয়ে একটু হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেই ট্যাংকি মারতো আজ সেই মেয়ে তার ভবিষ্যৎ জামাই নিয়া চিন্তা করতেছে।কত বড় দয়াল সে।”
“আমি এখন সত্যিই ভালো হয়ে গেছি রে।”
“হ্যাঁ তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি।ভালো ভালো,চালিয়ে যাও বান্ধবী।”
“এসব বাদ দে তো।বল তোর দাম্পত্য জীবন কেমন চলছে!”
রাহি হতাশার সুরে বলল,
“দাম্পত্য জীবন আবার আমার।”
“কেন রে,আমাদের দুলাভাই এর কি সিস্টেম দুর্বল নাকি?”
রাহি এখন কিভাবে বলবে তার জামাই এর সিস্টেম এমনই যে সে নিজেই ওই সিস্টেমের লোড নিতে পারে না।
“সিস্টেম দুর্বল না,তবে মেশিন মনে হয় একটু বেশিই চলে ওই খবিশ বেডার। কোনো দয়া মায়া নেই, অসভ্য লোক একটা।”
“বাসায় চল আজ বুঝাবো আমার কেমন দয়া মায়া।”
কারো পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠে মৃদু কেঁপে উঠলো রাহি। কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে তাকালো সামনে। প্রেম বুকে দু হাত ভাঁজ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।প্রেমের কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েকটা।রাহি কিছুটা ভয় পেলো।
সাঈদ নিজের পোশাক পড়ে বেরিয়ে এসেছে বাহিরে।সে চলে যাবে নিজের গন্তব্যে। রফিক সাহেব সেই যে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে ছিল এখনও সেই জায়গায় পাথর হয়ে বসে আছে সে। বৃষ্টিকে তার দাদি অনেক ডেকে বের করেছে রুম থেকে। কোনো কিছু বলেও বের করা যাচ্ছিল না তাকে, শেষ মেষ রফিক সাহেব এর দোহায় দিয়ে বের করেছে।মাথা নিচু করে এসে দাঁড়িয়ে বাবার পাশে।কিছু বলার মুখ নেই তার।
সাঈদ কাউকে কিছু না বলে নিজের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।পেছন থেকে খেক খেক করে রফিক সাহেব এর মা বলে উঠলো,
“ওই ছেমরা। বাবু সাইজ্জা নতুন বউ রাইখ্যা কই যাও। এদিকে হুইন্যা যাও।”
সাঈদের মন না চাইতেও সেদিকে গেলো। গম্ভীর স্বরে বলল,
“আমি রাঙামাটি যাচ্ছি। লয়ারকে খবর দিয়ে দিয়েছি আমি।উনি ডিভোর্স পেপার রেডি করে নিয়ে চলে আসবে।আমি রাঙামাটির প্রজেক্টের কাজ শেষ করে ফেরার সময়ে আপনাদের মেয়েকে ডিভোর্স দিয়ে যাবো। বিয়েটা যেহেতু আমাদের সবার অমতেই হয়েছে সে অনুযায়ী ডিভোর্স হওয়াটা আবশ্যকীয়।”
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৩
ডিভোর্সের কথা শুনেই পিলে চমকে উঠলো বৃষ্টির।সে তার বাবার দিকে একবার তাকালো।দেখলো তিনি নির্বিকার। ডিভোর্স এর কোথাও উনার উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারলো না। সাঈদ আবার বলল,
“ডিভোর্স দেওয়ার আগে আঙ্কেল আপনার সাথে আমরা এক বিষয়ে আলোচনা আছে।আগে রাঙামাটির কাজ শেষ করে আসি পরে যা হবার হবে।”
