Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৪

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৪

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৪
Raiha Zubair Ripti

সিকান্দার কপালে হাত বুলাতে বুলাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল। মাথার ভেতর তখনও হাজারো চিন্তার আনাগোনা। ঠিক সেই মুহূর্তেই সদর দরজা ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকে পড়লো ড্রাইভার রহিম।
তার মুখ ফ্যাকাশে, শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত।
“বড় স্যারের গাড়ি এক্সিডেন্ট হইছে! অবস্থা ভালো না। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করানো হইছে। তাড়াতাড়ি চলেন আপনারা…”
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। সিকান্দার ঠোঁটের কোনে বিরবির করে উচ্চারণ করলো,

“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! হে আল্লাহ, আপনি উনাকে হেফাজত করুন।”
অনেকেই মনে করেন এই দোয়াটি শুধু মৃত্যুর সংবাদ শুনলে পড়তে হয়। কিন্তু কুরআনে এই আয়াতটি মূলত যেকোনো মুসিবত, বিপদ, ক্ষতি বা দুঃসংবাদে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
সাইদা মির্জা হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি ইতিমধ্যে জেনে গেছেন খবরটা। এখন হসপিটালের দিকেই যাচ্ছেন। সিকান্দারের পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলে সিকান্দার সাথে সাথে তাকে পড়া থেকে বাঁচিয়ে সোজা করে বলল-
“ সাবধানে। ”
সাইদা মির্জা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো হাত টা। সাইদা মির্জা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না। ড্রাইভার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গাড়ি বের করো।”
পেছন পেছন সিকান্দার ও বের হলো নিজের গাড়ি নিয়ে। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তারা পৌঁছে গেল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে।
হাসপাতালের করিডোর জুড়ে তীব্র ওষুধের গন্ধ। চারপাশে আহত রোগীদের স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর কান্নার শব্দ।
ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়েই সাইদা মির্জা ভেঙে পড়লেন।
“আমার স্বামী কোথায়? উনি কেমন আছেন?”
একজন নার্স তাদের শান্ত থাকার অনুরোধ করে অপেক্ষা করতে বললো।
আরও প্রায় পনেরো মিনিট পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার।
সবাই একসাথে তার দিকে এগিয়ে গেল। সিকান্দার এগিয়ে গিয়ে শুষ্ক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ সেলিম মির্জা এখন কেমন আছেন?”
ডাক্তার ফাইলের দিকে চোখ বুলিয়ে বললেন-
“আলহামদুলিল্লাহ, আপাতত উনি বিপদমুক্ত আছেন। তবে আঘাত বেশ গুরুতর ছিল।”
সাইদা মির্জা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন,

“ কি হয়েছে উনার?”
“দুর্ঘটনার সময় মাথা গাড়ির পাশের অংশে জোরে আঘাত পেয়েছে। কপালে প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা কাটা ছিল। আমরা সেলাই দিয়েছি। মোট বারোটা সেলাই লেগেছে। বাম হাতে ফ্র্যাকচার হয়নি, তবে হাড়ের আশপাশে গভীর আঘাত আছে। লিগামেন্টে টান লেগেছে। হাতটা কয়েক সপ্তাহ সাপোর্টে রাখতে হবে।”
সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,
“মাথার ভেতরে কোনো সমস্যা?”
“আমরা সিটি স্ক্যান করেছি। ব্রেইনে কোনো রক্তক্ষরণ পাওয়া যায়নি। এটা সবচেয়ে ভালো খবর।”
সাইদা মির্জার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
ডাক্তার বললেন,
“তবে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্তচাপও কিছুটা নেমে গিয়েছিল। স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।”
সাইদা মির্জা জিজ্ঞেস করলেন,
“উনার জ্ঞান ফিরছে?”
“ফিরেছে। কিন্তু আমরা সেডেশনে রেখেছি যাতে শরীর বিশ্রাম পায়। কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।”
সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,

“জীবনের কোনো ঝুঁকি আছে?”
“এই মুহূর্তে না। তবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। মাথায় আঘাতের রোগীদের আমরা পর্যবেক্ষণে রাখি। যদি বমি, অস্বাভাবিক মাথাব্যথা বা অন্য কোনো নিউরোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দেয়, তখন পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে।”
চারপাশে নেমে এলো স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস। যেন সবাই এতক্ষণ বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা নামানোর সুযোগ পেল।
সিকান্দার ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলো,
“ কিভাবে হলো এটা? ”
ড্রাইভার বলল,
“ স্যারের তেষ্টা পাইছিল। সেজন্য রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করাইয়া পানি আনতে গেছিলাম। আর তখনই নিয়ন্ত্রণ হারানো একটা ট্রাক সোজা এসে ধাক্কা মেরে দেয়। ”
কয়েক ঘন্টা শেষে সেলিম মির্জার সাথে দেখা করতে দেওয়া হলো। অর্নব আর সুনেহরা একটু পরপর ফোন করে বাবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছে। সাইদা মির্জা গিয়ে দেখা করে বের হতেই সিকান্দার ঢুকলো। তবে টুল টেনে বসলো না। পাশে দাঁড়িয়ে সেলিম মির্জার নিস্তেজ তেজ বিহীন দেহটা একবার দেখে নিয়ে বলল,
“ আসআলুল্লাহাল আযীম, রাব্বাল আরশিল আযীম, আন ইয়াশফিয়াকা। ”

অর্থ: “ আমি মহান আল্লাহ, মহান আরশের রবের কাছে আপনার সুস্থতা কামনা করছি। ”
এই দোয়াটা কোনো অসুস্থ রোগী কে দেখতে গিয়ে তার সুস্থতা কামনা চাওয়ার উদ্দেশ্যে পড়া হয়। সিকান্দার প্রয়োজনীয় সকল ঔষধ পত্র,হসপিটালের বিল মিটিয়ে মুনতাহা কে ফোন করে বলল,তার ফিরতে ভোর হবে। সে যেন খেয়েদেয়ে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো, “ সব ঠিক আছে? ”
সিকান্দার বলল, “ আমি হসপিটালে আছি। সেলিম মির্জা এক্সিডেন্ট করেছে। দাদিজান কে বলবেন না। উনি হার্টের রোগী। ”
মুনতাহা চমকালো। জিজ্ঞেস করলো,

“ কিভাবে হলো? ”
সিকান্দার সবটা খুলে বললো। মুনতাহা শুনে বলল,
“ নিজের খেয়াল রাখবেন। আল্লাহ অতি শীগ্র তার সুস্থতা দান করুন। ”
“ আমিন। ”
সিকান্দার ফোন কেটে পাশের মসজিদে গিয়ে এশার নামাজ পড়ে আসার পথে সাইদা মির্জার জন্য খাবার আনলো। নিঃসন্দেহে বলা যায় সাইদা মির্জা তার স্বামী কে ভালোবাসেন। সাইদা মির্জা নিজ হাতে খেতে পারছিলো না। কাঁদছিল বারবার। অগ্যতা সিকান্দার তাকে নিজ হাতেই খাইয়ে দিলো। সাইদা মির্জা বিনাবাক্যে বিনা রাগে খেয়েও নিলো। খাওয়া শেষে সিকান্দার তাকে বাসায় ফিরে গিয়ে রেস্ট নিতে বললো। সাইদা মির্জা যাবেন না। কি আর করার। দুজন মানুষ করিডরে বসে রাত পার করলো। পরের দিন সেলিম মির্জা কে বাড়িতে আনা হলো। সিকান্দার এই সময়ের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিল ঐ তান্ত্রিকের কথা। ইনস্পেক্টর শরাফত উল্লাহ ফোন দিতেই সিকান্দারের স্মরণে আসলো। না খেয়েই রেডি হয়ে দুরুদুরু বুকে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলো আল্লাহর নাম জপতে জপতে। পুরান ঢাকার সেই ডেরায় আসতেই শরীর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেলো সিকান্দারের। ঘুটঘুটে অন্ধকার, বিশ্রী দুর্গন্ধ। যেমন টা পশু জবাই দেওয়ার পর রক্ত পঁচে গেলে দুর্গন্ধ বের হয়। ঠিক তেমন।
রুমাল দিয়ে নাক চেপে ঢুকলো। প্রতিটি জিনিসপত্র নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখলো। কুরআন শরীফের পেজ ছিড়ে রাখা তাকে। কালো পুটলি তে বাঁধা অদ্ভুত ভাষার নকশা। একপর্যায়ে সিকান্দার শরাফত উল্লাহর উদ্দেশ্য করে বলল,

“ আপনারা কি কিছু পেয়েছিলেন এখান থেকে? ”
“ জ্বি,একটা বড় পুটলি নেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষজনের ছবি আছে। ”
সিকান্দার তার হাত থামিয়ে দিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“ আমাকে দেখানো যাবে? ”
শরাফত উল্লাহ ইতস্তত করে বলল,
“ কিভাবে দেখাই স্যার। ইলিগ্যাল হয়ে যায়। ”
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ কোনো ভাবে কি একটুও দেখানো যায় না? খুব জরুরী দেখা টা। সেজন্য বলছি। ”
“ আচ্ছা বেশ চলুন তবে। ”
সিকান্দার ঐ ডেরা থেকে বের হয়ে থানায় আসলো। থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার সিকান্দার কে দেখে চিনলো। সিকান্দার সালাম দিলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে চেয়ারে বসতে বলল। সিকান্দার বসতেই শরাফত উল্লাহ বললেন,

“ স্যার উনি ঐ তান্ত্রিকের ডেরা থেকে উদ্ধার করে আনা জিনিসপত্র গুলো দেখতে চাইছেন। দেখানো যাবে? ”
একটু আগেই সিকান্দারের ছবি সে দেখেছে। আর পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই জানতে পেরেছে এটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে। বড় অবাক হয়েছিল। শরাফত উল্লাহ কে ইশারায় বেরিয়ে যেতে বললো। শরাফত উল্লাহ যেতেই তিনি একটু সিকান্দারের দিকে ঝুঁকে বলল,
“ আমি জানি তুমি কি জন্য এখানে এসেছো সিকান্দার। ”
সিকান্দার ভেতরে ভেতরে চমকালেও তা বাহিরে প্রকাশ করলো না। তিনি ইশারায় পুঁটলি টা দেখালেন। সিকান্দার খুলে একের পর একটা জিনিস বের করে খুঁজতে লাগলো। সে যা খুঁজছিলো,অবশেষে তা পেয়েও গেলো। পেয়ে যাওয়ার পর অনুভূতি টা ছিলো মারাত্মক খারাপ। ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো। তার সন্দেহ ঠিকই ছিলো!
অফিসার একটা কল রেকর্ড ও সিকান্দার কে শোনালো। সেলিম মির্জা আর তান্ত্রিকের। সেলিম মির্জা তাকে কালো যাদু করতে চেয়েছিল,এটা জেনে যতটা না আহত হলো তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি আহত হলো সিকান্দার যখন জানতে পারলো সেলিম মির্জা তাকে কালো যাদু করেছিল মূলত তাকে তার ধর্ম,আল্লাহর ছায়াতল থেকে দূরে সরিয়ে উগ্রবাদী,বেপরোয়া, নেশাগ্রস্ত, চরিত্রহীন, আধুনিক যুগের এক মানুষ বানাতে । যে কি না তার স্ত্রী কে তালাক দিয়ে সেলিম মির্জার কথা মতো চলতো। তাদের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতো।
প্রতিটি কল রেকর্ড শোনার পর সিকান্দার কেবল রক্তে রাঙা চোখে অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ আমার একটা সাহায্য করবেন? ”
“ বলো। ”
“ এই খবরটা যেন কখনো পাবলিক না হয়। আর সেলিম মির্জা যেন কখনো জানতে না পারে আমি সব জেনে গিয়েছি। ”
অফিসার দীর্ঘ এল শ্বাস ফেলে সিকান্দারের কাঁধে হাত রাখলো। বড্ড খারাপ লাগলো এই ছেলেটার জন্য তার। কোনো বাবা তার ছেলের সুখ কিভাবে নিজ হাতে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে! বেচারা সিকান্দারের ব্যাড লাক,এমন এক বাবার সন্তান হয়ে।
“ তুমি চিন্তা করো না সিকান্দার। এসব কথা কখনো পাবলিক হবে না। সেলিম মির্জা হতে দিবে না। হলে আমাদের ফায়ার করতে এক সেকেন্ড ও তিনি নিবেন না। তবে কথা দিচ্ছি তোমার বিষয়টা সেলিম মির্জা জানবে না। ”
সিকান্দার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বেরিয়ে গেলো থানা থেকে। তার শরীরে অদ্ভুত এক যন্ত্রণা হচ্ছে। শান্তি পাচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই পৃথিবীতে সিকান্দারের সবচেয়ে বেশি আপন কেবল তার রব আর তার স্ত্রী মুনতাহা। সেলিম মির্জা সেই দু’জনের থেকেই সিকান্দার কে দূরে সরাতে চেয়েছিল! কেমন লোক তিনি! সিকান্দার বারবার আল্লাহর কাছে শুধু ধৈর্য জিনিসটা চাইলো।

সে গাড়ি ঘুরিয়ে বাইতুল মাকারামে আসলো। এশার নামাজ টা আদায় করার সময় সিকান্দার আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারলো না। পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় সমস্ত পরিস্থিতিতে সিকান্দার নিজেকে শক্ত রাখতে পারলেও এই এক জায়গায়, নামাজের সেজদায় নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারে না। তার সমস্ত শক্তি পানির মতো গলে নরম হয়ে যায়। নতজানু হয়ে রবের নিকট সে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে দেয় চোখের জলে। আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। সে সেজদায় লুটে কাঁদতে কাঁদতে রবের নিকট বলল,

” ইয়া রব! এ কেমন পিতার সন্তান হিসেবে আমাকে পাঠালেন এই দুনিয়ায় । আজ এমন এক সত্যের মুখোমুখি আপনি আমাকে দাঁড় করালেন, যা সহ্য করার শক্তিও যেন আমার নেই। একজন পিতা কীভাবে এত নিচে নামতে পারে। আমি তো তারও র’ক্ত ছিলাম। তাহলে কিভাবে তিনি তার আর বাকি দুই সন্তানের থেকে আমাকে ভিন্ন আলাদা নিচ চোখে দেখে? আমাকে আর কতভাবে ভাঙার চেষ্টা করবেন তিনি, ইয়া রব? আমি তো মানুষ। আমারও ক্লান্তি আছে, কষ্ট আছে, ভেঙে পড়া আছে। আমি তো কোনো অনুভূতিহীন যন্ত্র নই। আমাকে আপনার পথ থেকে সরানোর জন্য, আমার স্ত্রীর সাথে আমার তালাক কারানোর জন্য আমাকে কালো যাদু করেছিল! এই পৃথিবীতে আপনি আর আমার স্ত্রী ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই। আমি তো চাইলেও দুনিয়ায় সেলিম মির্জা যে আমার পিতা সেটা অস্বীকার করতে পারবো না। সেই ক্ষমতা আমার নেই। এই পরিচয়টা মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য ভীষণ যন্ত্রণার ইয়া রব। আজ আমার একটা দোয়া কবুল করুন। আপনি পারেন না এমন কোনো কিছু নেই। হাশরের সেই ভয়াবহ ময়দানে যখন একে একে সবাইকে ডাকবেন, তখন দয়া করে আমাকে সেলিম মির্জার ছেলে বলে ডাকবেন না । আমি এই কলঙ্কিত পরিচয় নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়াতে চাই না । আমাকে কেবল আমার নবীর উম্মত বলে ডাকবেন । আমাকে মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মতের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিবেন । এটাই আমার একমাত্র পরিচয়, এর বাহিরে আমার আর কোনো পরিচয়ের নেই । নেই কোনো বংশের অহংকার , কোনো নামের গৌরব , কোনো রক্তের দাবিও। আমার পরিচয় শুধু এতটুকুই,আমি আপনার বান্দা, আর আমি মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত।

সিকান্দার নামাজ শেষে নিজেকে সামলিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িতে ফিরলো। দেখে একটুও মনে হলো না সে একটু আগে আল্লাহর নিকট চোখের জল ফেলে আসছে। অবশ্য মনে হবারও কথা নয়। কারন সিকান্দার ছোট থেকেই এক আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে নিজেকে কখনো দূর্বল দেখায় না, নিজের দূর্বলতাও প্রকাশ করে না। কারো সামনে কখনো কাঁদেও না। তার চোখের জল দেখার,তাকে দূর্বল দেখার,তার দূর্বলতা সম্পর্কে জানার অধিকার কেবল তার রবেরই আছে।
সিকান্দার রুমে ঢুকার সময় তার দাদিজান তাকে ডেকে উঠলো। সেলিম মির্জা নাকি তাকে ডাকছে। সিকান্দার স্বাভাবিক ভাবেই গেলো। সেলিম মির্জা একটা ফাইল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ এটা আগামী কালের মধ্যে সাবমিট করবে। খুব জরুরী। ”
সিকান্দার ফাইলটা নিয়ে জাস্ট বেরিয়ে গেলো। কোনো কথা বললো না। রুমে আসতেই দেখলো মুনতাহা ঘুমিয়ে গেছে। সিকান্দারের আর ইচ্ছে করলো না ডেকে ঘুম টা ভাঙাতে। সেজন্য টেবিল থেকে ল্যাপটপ টা নিয়ে ছাঁদে চলে গেলো। সিকান্দার চলে যেতেই মুনতাহা উঠে বসলো।
মেয়েটা তার ফেরার অপেক্ষা তেই ছিলো। একে তো কত দিন পর লোকটা বাড়ি ফিরছিলো। আর সেদিনই সেলিম মির্জা এক্সিডেন্ট করলো। আজ আসলো বাড়িতে,আর এসেই আবার বেরিয়ে, ফিরলো এই রাতে । আবার তাকে ডেকে নিয়ে গেলো। এখন আবার কাজ ধরিয়ে দিছে। একটুও শান্তি নেই লোকটার। দুদণ্ড বউয়ের পাশে বসার ফুরসত নেই। রাগ, কষ্ট,কান্না তিনটাই পাচ্ছে তার।
মুনতাহা বিছানা ছেড়ে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে সময় দেখলো। এমন সময় রুমের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো সিকান্দার এসেছে। মুহূর্তে হাসি ফুটে উঠলো। তবে তা দীর্ঘ স্থায়ী হলো না। সিকান্দার রুমে ঢুকেই মুনতাহা কে জাগনা দেখে বলল,

“ উঠে পড়েছেন আপনি! ঘুমিয়ে ছিলেন বলে আর ডাকি নি। ”
“ কাজ শেষ আপনার? ”
“ না,শেষ হয় নি। আমার ঘুমাতে একটু দেরি হবে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন,জেগে না থেকে কেমন? ”
মুনতাহার রাগ হলো। এটা বলার জন্য ব্যাটা তুই রুমে আসছস? শক্ত গলাতেই বলল,
“ আপনি রুমে আসছেন কেনো তাহলে? ”
সিকান্দার টেবিলের উপর থাকা ব্লুটুথ টা নিয়ে বলল,
“ ব্লুটুথ টা নিতে মনে ছিলো না। তাই নিতে এসেছি। ”
তারপর সিকান্দার চলে গেলো। মুনতাহার এখন হাত-পা ছুড়ে কান্না করতে ইচ্ছে করলো। মিনিট এক বাদে আবার দরজা খোলার শব্দ কানে আসলো। মুনতাহা এবারও পেছন ফিরে দেখলো সিকান্দার কে। শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৩

“ আবার কি নিতে এসেছেন? ”
সিকান্দার এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“ জরুরি একটা জিনিস নিতে ভুলে গিয়েছিলাম ।
সেটাই নিতে এসেছি । ”
মুনতাহা উল্টো ফিরে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“ তাড়াতাড়ি নিয়ে বিদায় হন । ”
অতঃপর সিকান্দার শাহ্ অনুমতি পেয়ে সাথে সাথে তার জরুরি জিনিস, তার সমগ্র পৃথিবীটাকে দু’বাহুর মাঝে আগলে নিয়ে রুম হতে বেরিয়ে যেতে লাগলো ।

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here