সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৫
Raiha Zubair Ripti
সিকান্দার মুনতাহা কে পাঁজা কোলে নিয়ে ছাঁদের দিকে হাঁটা ধরেছে। আকস্মিক এভাবে কোলে নেওয়ায় মুনতাহা অনেকটা চমকে গিয়েছিল। সিকান্দারের গলা জড়িয়ে রাখা দু হাত নাড়িয়ে বলতে লাগলো,
“ আরেহ্ কি করছেন! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? নামান আমাকে। ”
সিকান্দার একবাক্যে বলল,,
“ উঁহু। থাকুন এভাবে। ভালো লাগছে। আপনি তেমন একটা ভারী নন। অনায়াসে ১০০ তলার সিঁড়ি বেয়ে উঠা যাবে। ”
মুনতাহা লজ্জায় গুটিয়ে গেলো। নিচু স্বরে বলল,
“ আপনি আমাকে ঘুমাতে বলেছিলেন। আমি ঘুমাবো। নামান আমাকে। ”
সিকান্দার নামালো না। ব্লুটুথ নিতে এসে বউয়ের মুখে তখন ওমন শক্ত টোনের কথা শুনে কিছুটা ধারণা করেছিল বউ তার রেগে আছে। তবে কি নিয়ে রাগ সেটা ধরতে পারলো রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর। সেজন্যই তো যখন বুঝলো,ধরতে পারলো কারন টা। তখনই উল্টো ঘুরে রুমে আসলো। আর রুমে এসেই নিজের পৃথিবী টাকে নিজের সাথে নিয়ে চলতে লাগলো।
মুনতাহা তাকে নামাতে না দেখে ফের বলল,
“ কি হলো নামান। ঘুমাবো যে। ”
সিকান্দার মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আমাকে ছাড়া কিভাবে ঘুমাবেন আপনি? ঘুম আসবে? ”
মুনতাহা কিছুটা ব্যাঙ্গ শুরে বলল,,
“ আপনাকে ছাড়া কখনো কি ঘুমাই নি নাকি আমি? আজ নতুন? মনে নেই কত গুলো রাত আপনাকে ছাড়া ঘুমিয়েছি। ”
সিকান্দার মনে করার চেষ্টা করলো। মামার বাড়িতে থেকেছে,আর সিকান্দার এক সপ্তাহ বাড়ি আসে নি রাতে। সেই এক সপ্তাহ। কিন্তু মেয়েটা তো ঘুমায় নি। হয় বসে জেগে ছিলো,আর তা না হলে জায়নামাজে লেপ্টে ছিলো।
“ ঘুমিয়েছিলেন তবে সেই রাত গুলো? ”
“ তো কি জেগে ছিলাম আমি? ”
সিকান্দার মুচকি হাসলো।
“ কেমন হয়েছিল ঘুম? ফাস্টক্লাস? ”
মুনতাহা বুঝতে পারছে বেশ সিকান্দার মজা নিচ্ছে।
“ একদম ফাস্টক্লাসের উপরে কিছু থেকে থাকলে সেটা হয়েছে। আর কিছু বলবেন? নামান আমাকে। আমি যাব না আপনার সাথে। ”
“ কেনো যাবেন না? আমি কি আপনাকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছি? ”
“ তাহলে কি আদর করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? ”
সিকান্দার মুনতাহার এমন ঝাড়ি মেরে বলা কথাগুলো শুনে হাসছে।
“ আপনি চাইলে দিতেই পারি আদর। আদরে কিন্তু আমি কখনো কার্পণ্য করি না মিসেস সিকান্দার। আপনি সেটা ভালোই জানেন। ”
মুনতাহা শক্ত করে চেপে ধরলো সিকান্দারের গলা। মুখ নিয়ে গুঁজলো ঘাড়ে। হাল্কা ঠোঁটের সংঘর্ষ হলো তাতে। ঠোঁট উল্টে বলল,
“ আপনি আমাকে বুঝেন না। ”
“ আমার চাইতে বেশি আপনাকে কেউ বুঝবে না,ভালোও বাসবে না। ”
“ এই তার ভালোবাসার নমুনা? এক মুহুর্তের জন্য বউয়ের পাশে বসার সময় হয় না। এ ও ডেকে নিয়ে যায়,হাতে কাজ ধরিয়ে দেয়। আপনি কি এখন সিঙ্গেল? আপনার যে একটা বউ আছে,আপনি বিবাহিত। এটা বুঝবে না তারা? নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে আমাদের। পুরোনো অনেক দিন হলে তাও না হয় মন কে বুঝ দিতাম। শুরুতেই যদি এমন করে আরো তো দিন বাকি আছে। ”
“ আচ্ছা আচ্ছা ম্যাডাম তাদের পক্ষ থেকে আমি সরি। ”
“ আপনি কেনো সরি বলবেন? ”
“ তাহলে কে বলবে? ”
মুনতাহা সিকান্দার কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ অ্যাম সরি। ”
“ উঁহু অ্যাম সরি। ”
“ বললাম তো অ্যাম সরি। ”
“ আচ্ছা দু’জনেই সরি। হয়েছে? ”
সিকান্দার ছাঁদে এনে মুনতাহা কে নামালো। আগে কখনো আসে নি সে এই ছাঁদে। সবসময় রুম বেলকনিতেই থেকেছে। আজ আসায় দেখতে পেলো ছাঁদ টা কি সুন্দর। ফুলের গন্ধে মৌমৌ করছে ছাঁদ টা। ফুলে গাছ আছে নাকি বাগান থেকে আসছে?
মুনতাহা পুরো বাগানে চোখ বুলালো। দেখলো সাইড দিয়ে বিভিন্ন রকমের ফুলের গাছ দেখা যাচ্ছে আবছা। ফুলও ফুটেছে। ছাঁদের এক সাইডে একটা টি-টেবিল আছে। সেখানে দুটো চেয়ার। টেবিলের উপর সিকান্দারের ল্যাপটপ টা জ্বলে আছে।
সিকান্দার তাকে নিয়ে বসলো চেয়ার দুটোয়। হাত বাড়িয়ে একটা সাদা ফুল ছিঁড়ে মুনতাহার কানে গুঁজে দিয়ে বলল,
“ ফুলের কানে ফুল। নাইস কম্বিনেশন। ”
মুনতাহা হাসলো। সেও একটা সাদা ফুল ছিঁড়ে সিকান্দারের কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“ ফলের কানে ফুল। অসাধারণ, বিউটিফুল, দারুণ কম্বিনেশন। ”
সিকান্দার ফোনের ক্যামেরা বের করে নিজেকে দেখলো। শব্দ করে হাসলো দেখে। কান থেকে ফুলটা সরিয়ে টেবিলের উপর রেখে বলল,
“ ফুল জিনিসটা কেবল নারীর সাথেই যায়। কিছু জিনিস আছে যেগুলো একদম ফিক্সড। ভুল জায়গায় বসালে তা বড্ড বেমানান লাগে। লাইক মি অর ফ্লাওয়ারস। ”
“ যেভাবে বলছেন,সেরকম বাজেও কিন্তু দেখাচ্ছিল না। একদম পুকি লাগছিলো। ”
সিকান্দার মুনতাহার চেয়ার টা টেনে পাশে আনলো। ল্যাপটপের লক খুলে কিছু কাজ করতে শুরু করলো। মুনতাহা বারবার হাই তুলছিলো।
“ আপনার কাজ আর কতদূর? ”
“ এই তো আর পাঁচ মিনিট। আপনার কি খুব ঘুম পাচ্ছে? ”
“ জ্বি ভাইয়া। ”
হুট করে মনে হলো সিকান্দারের কানের ভেতর যেন গরম লোহা ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ। কিচ্ছু বললো না। তাড়াতাড়ি কাজ করে মুনতাহা কে নিয়ে রুমে আসলো। মুনতাহা বিছানায় শুয়ে আছে। সিকান্দার ওয়াশরুমে গিয়েছিল। বের হতেই মুনতাহা ডেকে উঠলো,
“ ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে হেয়ার ব্যান টা দিন তো ভাইয়া। ”
সিকান্দার চুপচাপ দিলো গম্ভীর মুখে। মুনতাহা চুল গুলো বেঁধে ঘুমিয়ে পড়লো সিকান্দার বুকের সাথে লেপ্টে।
সকালে ব্রেকফাস্ট করে সিকান্দার অফিসে যাবার পথে মনোয়ারা মির্জা মুনতাহার হাতে একটা প্রেসক্রিপশন দিয়ে বলল,সিকান্দার কে দিতে। আসার পথে ঔষধ গুলা নিয়া আসতে।
মুনতাহার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখলো সিকান্দার বেরিয়ে যাচ্ছে। শুনুন শুনুন করে ডাক দিলো। কিন্তু সিকান্দারের কানে ব্লুটুথ থাকায় শুনতে পেলো না। অগ্যতা মুনতাহা ছুটে এসে সিকান্দারের সামনে দাঁড়ালো। সিকান্দার কান থেকে ব্লুটুথ টা খুলতেই মুনতাহা বলল,
“ আপনাকে কখন থেকে ডাকছি ভাইয়া। এই নিন এটা। দাদি ফেরার পথে ঔষধ গুলো আনতে বললো। ”
সিকান্দার প্রেসক্রিপশন টা হাতে নিয়ে বলল,
“ আপনার জন্যও কি কোনো ঔষধ আনতে হবে? মনে হচ্ছে আপনিও অসুস্থ। ”
“ অসুস্থ মানে? ”
সিকান্দার অসহায় মুখ করে বলল,
“ একজন সুস্থ মানুষ কখনোই নিজের হাসবেন্ড কে এভাবে ভাইয়া ডাকতে পারে না। প্লিজ ফারদার আর ভাইয়া ডাকবেন না। এই ডাকটা আপনার মুখে একদমই স্যুট করছে না। বাজে শোনাচ্ছে, ভীষণ বাজে শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ বেসুরো গলায় উচ্চস্বরে আমার কানের কাছে এসে গান গাইছে। বিয়ের আগে তো কখনো ভাইয়া বা অন্য কোনো নামে ডাকেন নি। তাহলে বিয়ের এত গুলো দিন পর কেনো ভাইয়া ডাকছেন বলুন তো? মে’রে ফেলতে? এক মিনিট,এক মিনিট,আপনি কি আমার ভবিষ্যৎ সন্তানদের দিয়ে আমায় মামা ডাকাতে চাইছেন? এমন টা ভেবে থাকলে প্লিজ ডোন্ট ডু দ্যিস। আমি তাদের বাবা,নট মামা। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড মাই পয়েন্ট অফ ভিউ ওয়াইফি। ”
মুনতাহা হো হো করে হাসলো এই কথা শুনে। হাসি থামিয়ে বলল,
“ তাহলে কি নামে ডাকবো আপনায়? বলে দিন আপনি। ”
“ আমার নাম ধরে ডাকুন। ”
“ বড়রা বেয়াদব বলবে আমায়। অন্য নাম বলুন। ”
সিকান্দার ভেবে বলল,
“ মি.হাসবেন্ড, হানি,মাই ম্যান,জান,জানু,
বাবু,সোনা,এমন আরো অনেক নামেই ডাকতে পারেন। ”
“ সবার সামনে? ”
সিকান্দার চোখ টিপে বলল,
“ আপনি যদি সবার সামনে ডাকতে পারেন,আমি কেনো শুনতে পারবো না হু? শুধু ভাইয়া ডাকবেন না ব্যাস। ”
“ ঠিক আছে ভাইয়া। আর ডাকবো না ভাইয়া। জান বাবু সোনা, কলিজা এসব বলেই ডাকবো ভাইআআ। ”
সিকান্দারের মুখ চুপসে গেলো। সোজা হাঁটা ধরলো এবার। মুনতাহা হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেলো।
নাদিম আজ তার কলিগ দের নিয়ে দুপুরের লাঞ্চ করতে একটা রেস্টুরেন্টে এসেছে। কোনো প্ল্যানই ছিলো না। হুট করে কলিগ রা বলল,
“ নাদিম ভাই চলুন আজ বাহিরে খেতে যাই। অনেক দিন হলো আপনি কোনো ট্রিট মিট দেন না। আজ দেন। ”
মুখের উপর না বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। মানিব্যাগে ছিলো হাজার দুয়েক টাকা। ভেবেছিল তাতেই হয়ে যাবে। কিন্তু এই আখাইয়া কলিগ খেতে খেতে বিল বানিয়েছে ২৯৯৯ টাকা। ১ টাকা কম ৩০০০ বলা যায়। ঐ এক টাকা তো আর ফেরত দিবে না রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। মানিব্যাগ পকেট সব খুঁজে খুচরা টাকা মিলিয়ে ২৫০০ টাকার মতো হলো। আর ৫০০ কে দিবে? কলিগদের বাপ? বাবা কে ফোন করলো। ধরলো না। কলিগ দের সামনে বলতেও কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে যে ৫০০ টাকা কম পড়েছে। ওয়েটার টাকা নেওয়ার জন্য একদম মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নাদিম ফোন স্ক্রল করে বুদ্ধি বের করছে। মরার বিকাশে আজ একটা টাকাও নেই। কার্ডটাও বাসায়। আখাইয়াদের আর খাওয়ার সময় হলো না। আজই খাওয়া লাগবে!
কলিগরা তাকে টাকা দিতে না দেখে বলল,
“ নাদিম ভাই বিল দিবেন না? টাকা আছে তো?”
নাদিম মনে মনে দাঁত চেপে রাগ কমানোর চেষ্টা করলো। তবে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ টাকা আছে। আপনারা আর কিছু খাবেন না? শুধু এসবই খেলেন যে! ”
কলিগদের চোখ মুখ যেন খুশিতে জ্বলে উঠলো। নাদিম বলা মাত্রই তারা আরে ৫০০ টাকার খাবার অর্ডার দিলো। নাদিম পারছে না এদের পানিতে নিয়ে চুবাতে। শালার এমন হাভাতে লোক জীবনেও দেখে নি। ৫০০ টাকাই ম্যানেজ হচ্ছে না। ১০০০ কিভাবে ম্যানেজ করবে এখন?
ভাবতে ভাবতেই হুট করে পাশে তাকাতেই নাদিম দূরে ইলার মতো কাউকে দেখে যেন মরুভূমির বুকে এক ফোটা জলের সন্ধান পেলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে ইলার সামনে গিয়ে বসলো।
ইলা ভার্সিটি শেষ করে একটু খাবার খেতে এসেছিল। আকস্মিক সামনে কাউকে বসতে দেখে বলতে যাচ্ছিলো, এটা কেমন ম্যানার্স? দেখছেন না এখানে বসে কেউ খাচ্ছে?
কিন্তু বলা আর হলো না। নাদিম কে দেখামাত্রই তার কপাল কুঁচকে আসলো।
“ আপনি! ”
“ জ্বি আমি। ভালো আছেন মিস ঢিলা? ”
ইলা খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে বলল,
“ জ্বি ভালো আছি। ”
কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করলো দুজনের মাঝে। নাদিম বলল,
“ মিস ঢিলা আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেন? ”
ইলা খাওয়া থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ কিসের হেল্প? ”
“ আমার মানসম্মান টা একটু বাঁচিয়ে দিন। হাভাতে কলিগরা আজ ট্রিট চেয়েছিল। ভেবেছি যা টাকা মানিব্যাগে আছে তাতেই হয়ে যাবে। কিন্তু হাজার টাকা শর্ট পড়েছে। ”
“ তো আমি কি করবো? আমাকে কেনো বলছেন এসব? ”
“ ইয়ে মানে..আমাকে হাজার টাকা ধার দিন। ফেরত দিতে না পারলে আমাকে বিয়ে করে নিয়েন, কোনো সমস্যা নেই আমার। ”
ইলা সাইড ব্যাগ থেকে হাজার টাকার একটা নোট বের করে নাদিমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ আমার রুচি এতটা খারাপ না যে আপনাকে বিয়ে করবো। কবে ফেরত দিবেন টাকা সেটা বলুন? ”
নাদিম টাকা টা হাতে পাওয়া মাত্রই যেন মুই কি হনুরে হয়ে গেলো।
“ ফেরত কেন দিব টাকা? আমি তো এমনিতেই আপনার কাছে টাকা পাই। ভুলে গেছেন সেদিন আপনাকে কত রিস্ক নিয়ে বাঁচিয়েছিলাম। আমার বাইকের তেল খরচ হয়েছি। সেখানে এই ১০০০ টাকা তো কিছুই না। আপনার আরো বেশি দেওয়া উচিৎ ছিলো। ”
ইলা চেতে গেলো। কে বলবে এই লোক একটু আগে সাহায্য চাইতে এসেছিল?
নাদিম চলে গেলো উঠে। ওয়েটার কে বিল পে করে বাকি যে এক টাকা সে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পেতো। সেজন্য বলল,
“ আমি আপনাদের কাছে এক টাকা পাই। সেই এক টাকাটা কেটে রাখবেন মিস ইলার বিল থেকে। মিস ইলা আমার পরিচিত। তার থেকে এক টাকা কম রাখবেন। মনে থাকবে? ”
ওয়েটার মাথা নেড়ে চলে গেলো। শেষ বার ইলার দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো। ইলা মেয়েটা তার চাচাতো ভাইয়ের বউয়ের বান্ধুবী। সেজন্য একটু সাহায্য করলো। নইলে সে এত মানবদরদী নয় যে যাকে তাকে সাহায্য করবে। যাক মেয়েটার এক টাকা অন্তত সেভিংস হবে। ”
ইলা বিল পে করতে গিয়ে জানতে পারলো তার মোট টাকার ভেতরে নাকি নাদিম নামের এক লোক এক টাকা পে করে গিয়েছে। সেই এক টাকা যেন ইলার থেকে না নেওয়া হয়। কথাটা শুনেই শরীর জ্বলে যেতে লাগলো রাগে। খবিশ লোক একটা। এমন ফাত্রা লোক ইলা জীবনেও দেখে নি। এই ১০০০ টাকা নাদিম ফেরত না দিলে ইলা বদদোয়া দিবে। যেই সেই বদদোয়া না। একেবারে জীবন বরবাদ করে দেওয়ার মতো বদদোয়া। নাদিমের ব্যাটার যেন একটা প্লে গার্লের সাথে বিয়ে হয়। নাদিম কে রেখে যেন সে বাহিরে তার বসের সাথে পরকীয়া করে নাদিম কে ধোঁকা দেয়। মনে যা যা আসলো ইলা তাই বললো। বলা শেষে মন মেজাজ ফুরফুরে করে বাড়ি চলে গেলো।
সকালে সেই যে সাতটার দিকে মুনতাহা খাবার খেয়েছিল,দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো কিন্তু রেণু এখনো খাবার দিয়ে যায় নি। সিকান্দার দুপুরে ফোন করে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল খাবে একটু পর। কিন্তু আজ রেণু দেরি করছে কেনো কে জানে?
মুনতাহা নিচে নামলো। রেণু কে খুঁজলো, পেলো না। অগ্যতা নিজেই কিচেন রুমে গিয়ে খাবার খুঁজতে গিয়ে দেখে খাবার নেই। শেষ হয়ে গিয়েছে আজ! সেজন্যই কি রেণু দিতে আসে নি! ক্ষুধাও পেয়েছে সেজন্য মুনতাহা ঝটপট কিছু রান্না করে খাওয়ার জন্য গ্যাস জ্বালাতে গিয়ে দেখলো চুলা জ্বলছে না। গ্যাস ফুরিয়ে গেলো নাকি? যাহ্ তাহলে এখন খাবে কি? শুকনো খাবার আছে নাকি, তা খোঁজার জন্য উপরের ডেস্কে হাত দিয়ে খুলতে গিয়ে বুঝলো তালা মারা।
আশ্চর্য হতে লাগলো মুনতাহা। রেণু কে ডাকলো। রেণু দৌড়ে আসতেই মুনতাহা বলল,
“ আজ খাবার টা দিলে না যে দুপুরে। খাবার নিতে এসে দেখি খাবার নেই। গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। উপরের ডেস্কও তালা মারা। আগে তো ছিলো না। ”
রেণু আমতাআমতা করে বলল,
“ আসলে ভাবি,আমারে এখন রানতে দেয় না ম্যাডামে। হেয় রান্নার দায়িত্ব নিছে। আমারে বড় স্যারের দেখাশোনা করা লাগে। সেজন্য আমি আপনারে আজ খাবার দিতে যাইতে পারি নাই। ম্যাডামে আমারে এদিকে আইতে মানা করছে। ”
মুনতাহা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে রেণু কে চলে যেতে বললো।
সন্ধ্যার দিকে সাইদা মির্জা রান্না ঘরে এসে গ্যাসের পাইপ লাগিয়ে অন করে রান্না বসালো। খুবই অল্প পরিমানে রান্না করলো। যাতে চারজন খেলেই খাবার শেষ হয়ে যায়। খাবার সাইদা মির্জা, সেলিম মির্জা, মনোয়ারা মির্জা খাওয়া শেষে বাকি খাবার টুকু সিকান্দারের জন্য বেরে রেখে মুনতাহা কে ডেকে বলল,এই খাবার যেন সিকান্দার কে দেওয়া হয়। তারা চলে যেতেই মুনতাহা সব ঢাকনা উঁচু করে দেখে একটুও খাবার নেই! সাইদা মির্জা কিভাবে রান্না করেছে যে মুনতাহার খাওয়ার জন্য কিছুই নেই! অগ্যতা মুনতাহা ক্ষুধার জ্বালায় লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে সেই শরবত খেয়ে পেট কে একটু শান্তি দেয়।
সিকান্দার ১২ টার পর বাড়িতে আসে। বসার ঘরে ঢুকেই দেখলো মুনতাহা অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে খাবার টেবিলেই।
ব্যাগটা সোফায় রেখে আস্তে করে চেয়ার টেনে বসে মুনতাহা কে ডাকলো। মুনতাহা নড়েচড়ে উঠলো। মাথার চুল টেনে ধরে বলল,
“ আপনি এসে গেছেন! কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছি বুঝতে পারি নি। আপনারা খাবার বাড়া আছে। খেয়ে নিন। ”
“ ফ্রেশ হয়ে আসি আগে? ”
“ একেবারে খেয়েই ফ্রেশ হোন। বারবার উপরে যাওয়া আসার কি দরকার। বেসিন থেকে হাত মুখ ধুয়ে আসুন। ”
সিকান্দার তাই করলো। তার নিজেরও খুব ক্ষুধা পেয়েছে। হাত ধুয়ে এসে খাবার মাখাতে মাখাতে জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনি খেয়েছেন? ”
মুনতাহা জড়োসড়ো হয়ে বলল,
“ হ্যাঁ খেয়েছি। আপনি খান। ”
সিকান্দার লোখমা তুলে দিলো মুনতাহা কে খাওয়ার জন্য। মুনতাহা বাঁধা দিয়ে বলল,
“ বললাম তো খেয়েছি। আপনি খান। খাবার আর নেই। ”
সিকান্দার বলল,
“ সমস্যা নেই। আর লাগবে না। আপনি খান। ”
জোড়াজুড়ি করায় মুনতাহা খেলো। ক্ষুধায় জ্বলতে থাকা পেটটা যেন এবার ভাত পেয়ে আরাম পেলো। মুনতাহা ভয় পেলো। সিকান্দার কি বুঝে গিয়েছিল মুনতাহা না খাওয়া ছিলো? যদি জিজ্ঞেস করে খান নি কেনো? তখন কি উত্তর দিবে? মুনতাহা তো বলতে পারবে না সাইদা মির্জা তার জন্য রান্না করে নি। সব কিছু বন্ধ করে রাখে। বললেই তো অশান্তি সৃষ্টি হবে।
সিকান্দার মুনতাহা কে খাইয়ে শেষে অবশিষ্ট খাবারটা খেতে গিয়ে ভিন্ন টেস্ট পেলো। মানে প্রতিদিন কার রান্না গুলোর থেকে স্বাদ আলাদা। মোটামুটি মুখে দেওয়ার মতো। কে রেঁধেছে আজ? মুনতাহা আর রেণুর রান্নার টেস্ট তো সিকান্দার চিনে। নতুন কাজের লোক রাখা হয়েছে নাকি?
সিকান্দার খাওয়া শেষ করে রুমে এসে মুনতাহাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিনও একই ঘটনা ঘটল। গতকাল অন্তত রান্নাঘর খোলা ছিল। কিন্তু আজ দুপুরে খাবার খেতে গিয়ে দেখল রান্নাঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। অবশ্য সকালের খাবারটা রেণুই রুমে পৌঁছে দিয়েছিল।
সিকান্দার বাড়িতে থাকলে এসব সমস্যা হয় না। কিন্তু সে বেরিয়ে গেলেই মুনতাহাকে খাবারের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয়। দুপুরটাও না খেয়ে কাটাতে হলো তাকে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। পেটে এক ফোঁটা খাবারও পড়েনি তার। ক্ষুধায় মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। কয়েকবার পানি খেয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি।
রাতে রান্না হলো। সাইদা মির্জা কেবল চারজনের জন্য খাবার তৈরি করলেন। সবাই খাওয়া শেষ করার পর গরম গরম খাবার আলাদা করে প্লেটে তুলে রাখা হলো সিকান্দারের জন্য।
আর রান্নাঘরের এক কোণে পড়ে থাকা বাসি শুকনো রুটি রেখে দেওয়া হলো মুনতাহার জন্য।
সাথে বলে দেওয়া হলো,
“ সিকান্দারের খাবারে ভাগ বসাতে যেও না আবার।”
কথাটা শুনে মাথা নিচু করে রইল মুনতাহা। ক্ষুধার জ্বালায় চোখ ভিজে উঠলেও কিছু বলল না সে। রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা, বাসি রুটিই খেতে শুরু করল।
যাওয়ার সময় লাইটটাও নিভিয়ে দিয়ে গেছে তিনি। ফলে পুরো রান্নাঘর ডুবে রইল অন্ধকারে।
এদিকে রাত করে বাড়ি ফিরল সিকান্দার। বসার ঘরের লাইট নিভানো দেখে আর নিচে সময় নষ্ট করল না। সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
গতকাল দাদির ওষুধ আনতে ভুলে গিয়েছিল। আজ অফিস থেকে ফেরার পথে তা নিয়ে এসেছে।
রুমে ঢুকে মুনতাহাকে না পেয়ে দাদির ওষুধগুলো তাঁর ঘরে রেখে ফেরার সময় রেণুর দেখা পেল।
সিকান্দার জিজ্ঞেস করল,
“মুনতাহাকে দেখেছ?”
“ভাবিরে রান্নাঘরে দেখছিলাম।”
কথাটা শুনেই রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল সে।দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। ভেতরে অন্ধকার। সুইচ অন করতেই আলো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে। আর সেই আলোতেই দেখা গেল, মুনতাহা এক কোণে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছে।
সিকান্দার দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলল,
“অন্ধকারে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছেন কেন, মন?”
হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল মুনতাহা।তড়িঘড়ি করে চোখের কোণের জল মুছে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আসলে খুব ক্ষুধা পেয়েছিল তো। তাই লাইট জ্বালানোর কথাই মাথায় ছিল না। আপনি কখন আসলেন?”
সিকান্দার কোনো উত্তর দিল না। শুধু চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর দৃষ্টি গিয়ে থামল মুনতাহার প্লেটের ওপর। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। রুটিগুলো এতটাই শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে ছিঁড়তে গেলেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। পাশে এক গ্লাস পানিও নেই। কোনো তরকারি নেই।শুধু শুকনো রুটি।
“আপনি শুধু রুটি খাচ্ছেন কেন? ভাত, তরকারি কোথায়? রান্না হয় নি আজ বাড়িতে? ”
কথাটা বলেই ফ্রিজের দিকে এগোল সে। ফ্রিজ খুলতে গিয়ে দেখল তালা মারা। মুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।রুটির একটা টুকরো হাতে নিয়ে দেখল সেটাও শক্ত হয়ে গেছে। গ্যাসের চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু গ্যাসও বন্ধ। এবার কোনো কথা না বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলো। সেখানে এসে দেখল, ডাইনিং টেবিলে শুধু তার জন্য সাজিয়ে রাখা খাবারের প্লেট রয়েছে। বাকি সব খালি। সিকান্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
সে উচ্চস্বরে ডাকল,
“রেণু!”
রেণু দৌড়ে আসতেই সিকান্দার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“কী ব্যাপার? ফ্রিজে তালা কেন? গ্যাস জ্বলছে না কেন? মুনতাহা শুকনো, শক্ত রুটি খাচ্ছে কেন? খাবার কোথায়?”
রেণু কিছু বলার আগেই মুনতাহা দ্রুত এগিয়ে এলো।
“রেণু, তুমি যাও।”
রেণু চলে যেতেই মুনতাহা সিকান্দারের সামনে দাঁড়াল।
“আরে, আপনি শান্ত হন। আমি খাবার খেয়েছি রাতে। ইদানীং একটু বেশিই ক্ষুধা লাগে, একটু পরপর। তাই হাতের কাছে শুকনো রুটি পেয়েছি, ওটাই খাওয়া শুরু করেছি।”
কথাগুলো বলতে বলতে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল সে। চোখ তুলে সিকান্দারের দিকে তাকানোর সাহসও হলো না।সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, মেয়েটা কিছু একটা লুকাচ্ছে। কী লুকাচ্ছে, সেটা এখনো বুঝতে পারছে না সে। তবুও আর কিছু বলল না।
পকেট থেকে ফোন বের করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন রকম স্ন্যাকস, বিস্কুট, চকলেট, শুকনো খাবার, ফল, জুস আর আইসক্রিম অর্ডার করে ফেলল। প্রায় আধঘণ্টা পর একজন ডেলিভারি ম্যান বড় একটা বক্স এনে দিয়ে গেল।
সিকান্দার বক্সটা মুনতাহার সামনে রেখে বলল,
“নিন, এগুলো খান। যত পারেন খান। তারপরও কোনো বাসি খাবার খাবেন না। আমি কাল আরও একটা বক্স নিয়ে আসব। দরকার হলে প্রতিদিন এক বক্স করে খাবার নিয়ে আসব। তারপরও আপনাকে একটু পর পর ক্ষুধার এই কষ্ট করতে হবে না। নিচে আসতে হবে না খেতে। আপনি এগুলো খাবেন রুমে বসে।”
মুনতাহা মাথা নিচু করে রইল। ধীর স্বরে বলল,
“আচ্ছা।”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৪
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।সামান্য কয়েক টুকরো শুকনো রুটি খেতে দেখে মানুষটা এতটা অস্থির হয়ে গেল। অথচ সে যদি জানতে পারে, তাকে ইচ্ছা করেই খাবার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তাহলে কী হবে? মুনতাহা খুব ভালো করেই জানে, সত্যিটা জানলে সিকান্দার চুপ করে থাকবে না। বাড়িতে বড়সড় অশান্তি বেঁধে যাবে। আর সেই অশান্তির কারণ হতে চায় না সে।তবে মুনতাহা হয়তো জানে না, সিকান্দারের মনে ইতোমধ্যেই সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেছে।ফ্রিজের তালা, বন্ধ গ্যাসের চুলা, শক্ত হয়ে যাওয়া বাসি রুটি,এসব কোনো কিছুর সাথেই তার বলা কথাগুলোর মিল খুঁজে পাচ্ছে না সিকান্দার। সে আপাতত চুপ আছে। কিন্তু চুপ থাকা আর বিশ্বাস করে নেওয়া,দুটো এক জিনিস নয়।
