Home এমপি রুশভিয়ান মির্জা এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৫

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৫

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৫
ফাতেমা তুজ জোহরা

কেটে গেল আর পাঁচদিন,,, ইনানের মামা ইনান কে তার মামার কাছে পাঠাতে চেয়েছিলো কিন্তু তাকে বিজনেস মিটিংয়ের জন্য তাকে আমেরিকা যেতে হয় তাই আর ইনান কে নিয়ে যাওয়া হয়নি রুপনগরে। অনু অবশ্যই কিছু বলেনি, তার সাথে ইনানের বেশ ভালোই লাগছে।এদিকে ইনানের নিয়মিত সবধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে এমন এক সত্য সামনে এলো, যার জন্য অনু মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। সেদিন আগে ইনানকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে নিয়ে গিয়েছিলো হাসপাতালে । কয়েক দিন ধরে তার শরীর দূর্বল হয়ে পড়ছিলো, মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরছিলো তার, সাথে অতিরিক্ত ব”মি হচ্ছিল । অনু প্রথমে ভেবেছিলো দীর্ঘদিন মা”ন”সি”ক চাপ আর দূ”র্ঘট*নার দখলের কারনেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু রি*পোর্ট হাতে আসার পর অনুর বুকটা কেঁপে উঠলো। সে কাঁপা কাঁপা হাতে রি*পোর্ট গুলো হাতে নিলো, চোখের সামনে রি*পোর্টের লেখা গুলো ঝাপসা হয়ে আসছিলো তার। অনু একবার রি*পোর্টের দিকে আরেকবার বেডে অ*ব*চেতন পড়ে থাকা ইনানের দিকে তাকালো। তার মনে হচ্ছিল সে ভুল দেখছে, হয়তো রি*পোর্টে কোন ভুল আছে, হয়তো অন্য কারে রি*পোর্ট ভুল করে হাতে চলে এসেছে। কিন্তু নামটা তো স্পষ্ট ইনান তালুকদার, আর রিপোর্টের ফলাফল ও একেবারে পরিষ্কার । ইনান তালুকদার দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা , আর একটা বেবি না ইনানের ছোট পেটে টুইনস বেবি আছে।

অনুর হাত থেকে প্রায় রি*পোর্ট পড়েই যাচ্ছিল সে শক্ত করে আকড়ে ধরে বসে রইলো কিছু বলতে পারলো না। তার মাথার ভেতর যেন হঠাৎ করে অসংখ্য প্রশ্নের ঝ*ড় তুললো। ইনানের তো বিয়ে হয়নি, তার মামার কথামতো ইনান দশদিন হারিয়ে ছিলো? তখন কোন খা*রা*প কিছু হয়নি তো তার সাথে। অনু বিশ্বাস করতে পারছিলো না, একজন চিকিৎসক হিসেবে রি*পোর্টের অর্থ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে সত্যিটা মেনে নেওয়ার মতো তার মা*ন*সি*ক অবস্থা ছিলো না। অনু আরেকবার ইনানের দিকে তাকালো, ইনানের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে, চোখের নিচে এই কয়েকদিনে কালির আস্তরন পড়ে আছে।

সে যখন জানতে পারবে তার জীবনের সাথে আরো দুটো প্রান বেড়ে উঠছে তখন কি করবে মেয়েটা ” অনু কথাগুলো ভেবে চোখ বন্ধ করতেই তার মনে আরেকটা প্রশ্ন উদিত হলো একমাস আগে ইনানের সাথে কি এমন হয়েছে ?কিন্তু এগুলো কে বলবে সে সব ভুলে গিয়েছে। অনু চোখ খুলে পাশে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নেয়। এতবড় কথা ইনানের মামাকে জানতে হবে। অনু তার মামার নাম্বারে ফোন দিলো, কয়েকবার বাজতে বাজতে কেটে গেল। অনু হাল ছাড়লো না, সে আরেক বার কল দিলো এইবার ইউসুফ রিসিভ করে বলল,” হ্যালো ডাক্তার, ইনান কেমন আছে? ইউসুফের কন্ঠে ছিলো উৎকন্ঠা । অনু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। সে বুঝতে পারলো না কিভাবে কথাটা বলবে। কিভাবে একজন মামাকে জানাবে তার ভাগ্নি দেড়মাসের গর্ভবতী অথচ তার বিয়ে হ”য়নি?
অনু শুকনো ঢোক গিলে বলল,” ইউসুফ সাহেব কোথায় আছেন? ইউসুফ অস্থির হয়ে বলল,” আমি বাড়িতে আছি,ইনানের কিছু হয়েছে? অনু চোখ তুলে তাকালো ইনানের দিকে। ইনান বেডে নি*স্তে*জ হয়ে পড়ে আছে, মাথাটা একপাশে হেলে পড়েছে তার। তাকে দেখে মনে হচ্ছে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছে তার। অনু উঠে এসে ইনানের মাথাটা বালিশে ঠিক ভাবে রেখে শান্ত কন্ঠে বলল,” ইনানের কিছু পরীক্ষা করেছিলাম, তার রিপোর্ট এসেছে?

ইউসুফ তাড়াহুড়ো করে বলল,” কি এসেছে রিপোর্টে? ওর শরীর কি খুব খারাপ” অস্থির হয়ে বলল!
অনু গভীর শ্বাস নিলো। তারপর খুব ধীরে, যেন প্রতিটি শব্দ উচ্চারন করতে গিয়ে বুকটা ফে*টে যাচ্ছে , অনু বাইরের জানলার দিকে তাকিয়ে বলল,” ইনান…. দেড় মাসের গর্ভবতী? কথাটা বলে অনু নিজেই স্ত*ব্ধ হয়ে গেল।
ফোনের ওপাশ থেকে কোন উত্তর এলো না। এক সেকেন্ড, দু সেকেন্ড পরও ইউসুফ কোন কথা বললো না। অনু বুঝতে পারলো মানুষটা হয়তো তার কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে । অনু আবার ডাকলো, ” ইউসুফ সাহেব? কোন উত্তর নেই, ওপাশে শুধু ভারী নিঃশ্বাস শোনা গেল। তারপর খুব কাঁপা গলায় বলল,” আপনি,… আপনি নিশ্চিত ?
অনু বলল,” জি
ইউসুফ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। তার চোখের সামনে একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগলো।
ইনানের নি*রু*দ্দে*শ হয়ে যাওয়া, রকির খু**ন। আবার রাস্তা থেকে তাকে উদ্ধার করা। আর এখন ইনান প্রেগনেন্ট।

তাহলে দশদিনে ইনানের সঙ্গে ভ*য়ং*ক*র কিছু ঘটেছিলো?কেউ তাকে আটকে রেখে অ*ত্যা*চা*র করেছে?তার অস*হা*য়*ত্বের সুযোগ নিয়েছে? প্রশ্ন গুলো একের পর এক ইউসুফের বুকের ভেতর ছু*রি হয়ে বিঁ*ধ*তে লাগলো। তিনি ইনান কে মেয়ে না হলেও মেয়ের মতো দেখেছে। অথচ সে যখন বড় বি*প*দে*র সামনে পড়েছিলো তখন তাকে রক্ষা করতে পারেনি। সে জানতেই পারেনি তার ভাগ্নিটা কতটা ভ*য়া*ব*হ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে আছে। ইউসুফের বুকের ভেত*রটা ফে*টে যেতে লাগলো। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল,” না, না এটা হতে পারে না?
অনু বলল,” আপনি এখানে আসুন, ইনানের সঙ্গে আমরা এই বিষয়ে কথা বলবো, তবে চা*প দেওয়া যাবে না, ওর শা*রী*রিক মা*ন*সি*ক অবস্থা খুবই দূর্বল!
ইউসুফ বলল,” আমি আসছি ডাক্তার? বলেই ফোন কেটে দেয়। অনু ইনানের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারে রিপোর্টের দিকে তাকালো। কাগজের কয়েকটি লাইন যেন এই মেয়েটার পুরে জীবনকে নতুন করে বদলে দিয়েছে। ইনানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্ধকার আর এখন আর শুধু তার নয়।, তার গর্ভে বেড়ে উঠা অনাগত সন্তান গুলো এই অন্ধকারের অংশ। যাদের জন্মের আগেই তার চারপাশে জমে উঠেছে ভ*য়,লজ্জা,অ*প*রা*ধ, আর অন্ধকার রহস্য।

সেদিন রাত দশটার পরে থেকে রুশভিয়ানের কেবিনটায় অদ্ভুত নিরবতা নেমে ছিলো। নার্স নিয়মিত ওষুধ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমির কোন জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিলো। সায়েরা বেগম পাশের ঘরে নামাজ পড়ছিলেন। কেবিনে কেউ ছিলো না, কেবল নিয়ম মেনে মনিটরের পর্দা উঠানামা করছিলো সবুজ রেখা, আর নিদিষ্ট বিরতিতে ভেসে আসছিলো মৃদু বিপ বিপ শব্দ । রুশভিয়ানের বুকটা ধীরে ধীরে উঠানামা করছে, নাকের সঙ্গে অক্সিজেনের নল, হাতে ক্যানুলা, পাশে সালাইনের বোতল। হঠাৎ করে রুশভিয়ানের হাতের আঙুলটা সামান্য কেঁপে উঠলো। মনিটরের সবুজ রেখাটা এক মুহূর্তের জন্য দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো, তারপর আবার স্থির। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর রুশভিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো। যেন কোন গভীর অন্ধকারের মধ্যে থেকে সে আলো খুঁজে পেয়েছে। ঠোঁট দুটো সামান্য নড়লো। কিন্তু কোন শব্দ বের হলো না। বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাস ক*ষ্ট করে বের করলো সে। রুশভিয়ানের হাতের আঙুল আবার নড়াচড়া করতে লাগলো। এবার কাঁধটা সামান্য কেঁপে উঠলো, চোখের পাতায় দেখা মিললো অদ্ভুত এক কম্পন। দীর্ঘ একমাস পর, অন্ধকারে ডুবে থাকা তার চেতনা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগলো,। প্রথমে সে কিছুই বুঝতে পারলো না। বুকের ভেতর অনুভব করলো ভারী চাপ। তারপর হঠাৎ চোখ দুটো খুললো। চোখ মেলতেই তীব্র সাদা আলো তার দৃষ্টিকে ঝলসে দিলো। কয়েক মুহূর্ত সে চোখ কুচকে নিলো। চারপাশটা ঝাপসা,মাথার ভেতর অ*স*হ্য ভার,শরীরের প্রতিটি হা*রে যেন কেউ পাথর বেঁধে রেখেছে।

রুশভিয়ান সামান্য নড়াচড়া করতেই বুকের মধ্যে তীব্র ব্যা*থা ছড়িয়ে পড়লো। রুশভিয়ান আবার চোখ বন্ধ করলো।
কোথায় সে? কেন এত শরীর ভারী? কেন গলায় কথা আটকে যাচ্ছে তার? রুশভিয়ান কপালে ভাঁজ পড়লো, সে আবারো চোখ খুললো, এবার তার চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেল। আর আগের মতো ঝাপসা হলো না। চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো সাদা দেয়াল,পাশে ছড়িয়ে থাকা মেশিন? হাতে লাগানো নানা ধরনের নল,। এসবের কোন কিছু তাকে বিচলিত করলো না, তৎক্ষনাৎ তার মস্তিষ্কে হানা দিলো ইনানের মুখ। হঠাৎ তার বুকের ভেতর অজানা এক আ*ত*ঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো, সে মনে করার চেষ্টা করলো? রুশভিয়ান চোখ বন্ধ করতেই দেখতে পেল অন্ধকার রাস্তা,তীব্র আলো,বি*ক*ট শব্দ, তারপর সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসলো। এরপর ইনান কোথায়? সে কি নিরাপদে আছে? রুশভিয়ান চোখ দুটো লাল হয়ে গেল, শুকনো ঠোঁট নেড়ে কর্কশ গলায় বলল,” ই…ইনান! শব্দটা এতটাই ক্ষীন ছিলো যে মনিটরের বিপ বিপ শব্দের মধ্যে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে আবার চেষ্টা করে বলল,” ইনান, এবার শব্দটা একটু স্পষ্ট হলেও কিন্তু ভাঙা, দূর্বল কন্ঠে জর্জরিত।

রুশভিয়ান মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। দরজা বন্ধ কেউ নেই চারপাশে। রুশভিয়ান অস্থির হয়ে উঠলো, সে হাত তুলতে গিয়ে হাতে লাগানো ক্যানুলার টান অনুভব করলো সে, মুহূর্তেই হাতের ব্যা*থা*য় চোখ মুখ কুচকে গেল তার। পরক্ষণেই তার কপালে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। নিজের শরীরের দূর্বলতা সে মেনে নিতে পারছিলো না। সে মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে উঠে বসলো। একঝটকায় টেনে ফেলল ক্যানুলা, সাথে সাথে ফি*ন*কি করে র*ক্ত গড়িয়ে পড়লো তার। সে দিকে তার ভ্রুক্ষেপ হলো না। বিছানা থেকে একপা নিচে রাখতেই এতক্ষণের শক্তিটুকু ক্ষীন হয়ে এলো তার কাছে। চোখের সামনে ধরা দিলো ঘোর অন্ধকার। রুশভিয়ান বেডের হাতল ধরে বসে পড়লো । এক মাস শুয়ে থাকার পর যেন তার পা দুটো শরীরের ভার বহন করতে ভুলে গেছে। হাঁটু ও দূর্বল হয়ে এসেছে তার। কয়েক মুহূর্ত স্থির ভাবে বসে রইলো। শরীর কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, তবুও তার চোখে ছিলো অদম্য, সাহস আর এক দৃঢ়তা।

রুশভিয়ান গভীর শ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেল, আর তার হাত থেকে গড়িয়ে পড়ছে র*ক্ত টাইলসের মেঝেতে। পা টলছিলো তার, শরীরের ভার*সাম্য হারাচ্ছিলে রুশভিয়ান কিন্তু থামলো না। তার ইনান কেমন আছে সেটা তাকে জানতে হবে। প্রায় পাঁচমিনিট পর রুশভিয়ান কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে দরজার হাতলে শক্ত করে চেপে ধরলো । বাইরের করিডোর থেকে ভেসে আসছে মানুষের পায়ের শব্দ , দূরের নার্সদের কথাবার্তার আওয়াজ, ভেসে আসছে ট্রলি টানার শব্দ সবকিছু তার কানে এসে লাগছে, কিন্তু কাউকে ডাকার মতো তার শক্তি নেই। রুশভিয়ান আরো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দেখলো দুজন মেয়ে বসে আছে বেঞ্চে।রুশভিয়ান আশেপাশে তাকিয়ে তাদের দলের একটা লোককে ও খুঁজে পেল না ।

রুশভিয়ান করিডোরে পা রাখতেই পড়ে যেতে নিলেই সায়েরা এসে তার ভঙ্গুর শরীরটাকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো। সায়েরা বেগম এতবড় শরীর ভার বহন করতে পারলো না, তাই সে আস্তে আস্তে করে রুশভিয়ানকে নিয়ে বসে পড়লো হাসপাতালের মেঝেতে। এদিকে রুশভিয়ানের শরীরটা হঠাৎ করে নিস্তেজ হয়ে গেল,চোখের পাতা দুটো আপনা আপনি ভারি হয়ে এলো, আর কোনো শক্তি রইলো না সে আস্তে আস্তে সায়েরার কোলে ঢলে পড়লো। সায়েরা চি*ৎ*কা*র করে বললেন, ” আব্বু? সায়েরা রুশভিয়ানের গালে চাপড় দিতে লাগলো। তার চোখ দুটো হঠাৎ আটকে গেল রুশভিয়ানের গলায় কাছে, কানের মধ্যে দিয়ে উষ্ণ র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে ঘাড়ে। সায়েরা আঁ*ত*কে উঠলো। সে রুশভিয়ানের মাথাটা শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে আ*র্ত*না*দ করে বলল,” ডাক্তার! কেউ ডাক্তার ডাকেন? আমার আব্বুর র*ক্ত পড়ছে ” বলেই ডুকরে কেঁদে উঠলো ।
সায়েরার চি*ৎ*কা*রে করিডোরে থাকা নার্স ও চিকিৎসকেরা দ্রুত ছুটে এলেন। একজন নার্স তাড়াতাড়ি রুশভিয়ানের মাথাটা সামলে নিলো। চিকিৎসক চোখের পাতা তুলে পরীক্ষা করতে লাগলো তারপর নির্দেশ দিলো, ওকে তাড়াতাড়ি কেবিনে নিয়ে যাও? সাবধানে মাথা যেন চাপ না পড়ে। রুশভিয়ানকে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো। আর পিছনে পড়ে রইলো সায়েরা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো তার যাওয়ার দিকে।

ইউসুফ প্রায় দৌড়ে অনুর কাছে পৌঁচ্ছালেন। অনু তখনও ইনানের কেবিনে বসে ছিলো। হুট করেই ইউসুফ কেবিনে প্রবেশ করলেন। ইউসুফ কে আসতে দেখে অনু একটু নড়েচড়ে বসলো। কিন্তু ইউসুফের মুখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল । ইউসুফ এগিয়ে গেল ইনানের, ইনান তখনও গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। আর ঘুম ভাঙবে কি করে তাকে কড়া ডোজের ইনজেকশন যে দেওয়া হয়েছে।অনু পাশ থেকে বলল,” ইনান এখন অ*বে*চতন? তবে বি*প*দ*মু*ক্ত আছে?ইউসুফ পাশ ফিরে অনুর দিকে তাকিয়ে রইলো। অনু নিঃশব্দে হাতের কাছে থাকা রিপোর্ট গুলো বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,” রিপোর্টে দুটো ভ্রু*নে*র উপস্থিত স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে ? আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার পরীক্ষা করিছি কিন্তু বারবার একই রিপোর্ট এসেছে।

ইউসুফের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে আকড়ে ধরলো রিপোর্ট গুলো। এই সামান্য ফাইলের ভারটা আজকে ইউসুফের কাছে একটা পাথরের মতো লাগলো, যা তার বুকে গিয়ে সরাসরি আ*ঘা*ত করলো। এতদিন মেয়েটাকে তার স্ত্রীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি কিন্তু ভেবেছিলো তার মামাদের হাতে তাকে তুলে দিবে কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটবে সেটা সে কল্পনা করতে পারেনি।
ইউসুফ চোখ বন্ধ করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরের বলল,” ডাক্তার আমি আগে বলেছিলাম, ইনান দশদিন নিঁ*খোজ ছিলো, ওই সময় ওর সঙ্গে খারাপ কিছু…. বাকি টুকু বলতে পারলো না ইউসুফ তার কন্ঠ রোধ হয়ে এলো। তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। নিজের মুখে এতবড় লজ্জার কথা কিভাবে বলবে।
অনু চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বলল,” আমি ইনানের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছি। ওর জ্ঞান ফেরার পর আমি যতটুকু জানতে পেরেছি ওর ওই দশদিনের কথা কিছুই মনে নেই!
ইউসুফ চমকে উঠলো, সে মাঝে মাঝে আসতো ইনানের সাথে দেখা করতে কই তাকে দেখে তো মনে হতো না সে কিছু ভুলেছে।

অনু ইনানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ” আপনি হয়তো এই ছোট ছোট বিষয় গুলো খেয়াল করেননি? কিন্তু আমি ওর কথাবার্তা সবকিছু ভালো ভাবে খেয়াল করেছি। আপনার ভাষা মতে ইনান আর রকি বের হয়েছে আট তারিখ বাড়ি থেকে। কিন্তু ইনান তার উল্টোটা বলছে, ও বলছে ও নাকি বাড়ি থেকে বের হয়েছে সতেরো তারিখে। আর এই টুকু বলেছে ও নাকি রকির হাত থেকে নিজেকে বাঁ*চাতে পালিয়ে এসেছে, কিন্তু মাঝে যে কতদিন ছিল কোথায়, এগুলো কিছুই মনে নেই তার।
ইউসুফ বি*স্ফো*রি*ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অনুর দিকে তাকালো।এই বাচ্চাগুলো কার সেটাও বলতে পারবে না। ইউসুফের মাথা চ*ক্ক*র দিয়ে উঠলো। ভেবেছিলো ইনানের সাথে কথা বলবে, কিন্তু সে পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে কিয়তক্ষন কেটে যাবার পর ইউসুফ বলল,” ইনান জানে বাচ্চার ব্যাপারে?
অনু শান্তস্বরে বলল,” না, ও গর্ভবতী এগুলো জানে না? আমি ওকে কিছুই বলিনি?
অনুর কথা শুনে ইউসুফ যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। ইউসুফ ব্যাতিব্যাস্ত কন্ঠে বলল,” ডাক্তার …… বাচ্চাগুলোকে ন*ষ্ট করে দেন?

কথাটা শুনে অনুর বুক কেঁপে উঠলো। তবে মুখের কোন পরিবর্তন হলো না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো ইউসুফের মুখের দিকে। ইউসুফ নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল,” এই দুইটা বাচ্চা থাকলে ইনানের জীবন শে*ষ হয়ে যাবে? ওর এখনো বিয়ে হয়নি, এই বাচ্চাগুলোর কি পরিচয় দিবে ও সমাজে।সবাই ওকে চরিত্র হী*ন বলবে। আর ওর মামাদের কে কি বলবো আমি তারথেকে আপনি এই বাচ্চাগুলোকে ন*ষ্ট করে দিলে ইনান বাঁচতে পারবে। নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে। কিন্তু বাচ্চা দুটো থাকলে সারাজীবন তাকে ক*ল*ঙ্কে*র বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে” কথাগুলো শেষ করতেই তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে। সে আশ্বাসের অপেক্ষা তাকিয়ে রইলেন অনুর দিকে ।
কিন্তু অনু নিশ্চুপ, তার কানে একটা কথায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাচ্চাদুটো ন*ষ্ট করে দিন। এই কথাটা শুনে অনুর সারা শরীরে কাঁ*টা দিয়ে উঠলো । সে তাকিয়ে রইলো ইনানের ফ্যাকাশে মুখের দিকে। তার ভেতরে দুটি অনাগত প্রান বেড়ে উঠছে যার অস্তিত্বের কথা তারই জানা নেই।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৪

অনুর মনের মধ্যে আরেকটা প্রশ্নে জেগে উঠলো, যদি ইনান জানতে পারে তার গর্ভে দুটো বাচ্চা আছে, সে যদি তাদের রাখতে চাই। অনু চোখ দুটো বন্ধ করলো। বুকের ভেতর চাপা ব্যা*থা অনুভব করলো। তার মনে হলো,সামনে শুধু একটা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নয় , এটি একটি মেয়ের ভবিষ্যতে, তার অজানা অতীত,তার সম্মান অধিকার, এবং দুটি অনাগত জীবনের ভাগ্য দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ইউসুফ সাহেব ও তো ভুল কিছু বলছে না, মেয়েটার সারাজীবন পরে আছে এখন সমাজের লোক জানতে পারলে তার জীবন টাকে দূ*র্বি*ষ*হ করে তুলবে, টিকতে দিবে না এই সমাজে। অনু চোখ খুললো সবকিছু ভাবনার মাঝে অনু যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে৷ কি করবে না করবে ভাবতে পারছে না।
ইউসুফ এগিয়ে এসে বলল, ” ডাক্তার, আমার কথাটা রাখেন? আপনি বিবেচনা করে দেখুন ?
অনু কিছু বলল না, কি বলবে সে খুঁজেই পেল না……

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here