Home এমপি রুশভিয়ান মির্জা এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৭

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৭

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৭
ফাতেমা তুজ জোহরা

সায়েরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আইয়ুব মির্জার দিকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না ছোট সেই ইশিতা কে পাওয়া গেছে আবার তার মেয়েও আছে একটা। সায়েরা এগিয়ে এসে বলল,” কি বললেন চাচা? সত্যি ইশিতাকে পাওয়া গেছে কই ও? আমির এগিয়ে গিয়ে আইয়ুবের ডান হাত আকড়ে ধরে ছোট বাচ্চার মতো বলল,” দাদু কই আপা, আর আপার মাইয়া কই? ডাকোনা দাদু তারে? আইয়ুব লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে প্রথম থেকে সবকিছু খুলে বলল তাদের। সায়েরা পুরো শরীর দুলে উঠলো ইশিতার মৃ*ত্যু*র খবর পেয়ে, সে পিছনে পিছিয়ে গেল, আর আমির মুখে হাত দিয়ে আপা বলে ডুকরে উঠলো ছেলেটা। আইয়ুবের চোখে ও পানি, সে অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। ইউসুফ মনের মধ্যে ভালো লাগা কাজ, সে ভেবেছিলো হয়তো তারা রা*গারা*গি করবে বা ইনান কে তাদের কাছে রাখতে চাইবে না।

কিন্তু তাদের চোখের পানি বলে দিচ্ছে তারা ইনানের যথাযথ ভাবে খেয়াল রাখবে। সায়েরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে সে বুঝতে পারছে কেন রুশভিয়ানদের পরিবারটা আর পাঁচটা পরিবারের মতো হলো না। না রুশা শান্তিতে বাঁ*চতে পেরেছে,না রাফিরুন পেরেছে। আর না তাদের সন্তানেরা সুখে এই পৃথিবীতে বাঁ*চতে পারলো। আইয়ুব হাত বাড়িয়ে আমির কে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরে ভাঙা কন্ঠে বলল,” কান্না কইরো না দাদুভাই, তোমার আপা তোমাদের লেইগা একখানা পুতুল রাইখা গেছে হের কাছে চলো”। আমির আইয়ুব কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আমি যামু না দাদুভাই, হেরে দেখলে আমার আপার কথা মনে পড়বো, আমি যামু না” বলেই কাঁদতে লাগলো।
আইয়ুব তাকে বুক থেকে সরিয়ে বলল,” আমি কোন কথা শুনবো না, চল ” বলেই আইয়ুব আমিরের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল, কিন্তু সায়েরা এগিয়ে গেল না। সে রয়ে গেল আইসিইউ সামনে, ভেতরে চিকিৎসা চলছে রুশভিয়ানের।

এই তুই এত ছ*ট*ফ*ট করিস ক্যান বলতো, আর একবার ছ*ট*ফ*ট করলে তোরে আমি ” বলেই শরীর থেকে কাপড়াটা আলগা করতে নিলেই ইনান হকচকিয়ে উঠে বসলো। সে চোখ দুটো ডলে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো না সে তো কেবিনে বসে আছে। ইনানের সারাশরীর দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে, কপাল দিয়ে ঘামের ধারা। ইনান ভ*য়া*র্ত চোখে আশেপাশে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। আলগোছে কপালের ঘাম টুকু মুছে বিরবির করে বলল,” আবার সেই স্বপ্নটা দেখলাম, এতবাজে স্বপ্ন কেন আমি দেখছি। আর এই স্বপ্ন দেখার পর আমার বুকের ভেতরটা কেন অস্থির হয়ে উঠে, মনে হয় বুকের ভেতরটা আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ” ইনান কথাগুলো বলে বুকে হাত দিলো। বুকের মধ্যে থাকা হৃদস্পদনটা জোরে জোরে ধকধক করছে এখনো। ইনান পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা কাঁপা কাঁপা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি টুকু খেয়ে লম্বা শ্বাস টানলো।
ইনান বুঝতে পারেনি এখানে বসে থাকতে থাকতে কখন চোখ দুটো লেগে এসেছে ।
সে আলগোছে ওড়নাটাকে হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে , আর তখনই কেবিনে প্রবেশ করলো ইউসুফ,আইয়ুব আর আমির। তারা মুলত দেখতে পায়নি ইনান কে, ইনান তাদের আসার আগেই ওয়াশরুমে চলে গেছে।

সম্পূর্ণ কেবিন ফাঁকা দেখে ইউসুফের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়লো, সে তো বাইরে থেকে লক করে গিয়েছে তাহলে ইনান কই গেল। সে পায়ে এগিয়ে বারান্দাটা খুঁজতে গেলেই ওয়াশরুম থেকে বমি করার শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। আইয়ুব আর আমির দূরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ইনানের আওয়াজ শুনতে পেল না, কিন্তু ইউসুফ তাদের থেকে একটু সামনে এগিয়ে আছে তাই ইনানের বমি করার শব্দ শুনতে পেল, তার মনে ভ*য় হতে লাগলো এরা আবার কোন কিছু জেনে যাবে না তো। মনে মনে ভাবলো বাচ্চাটা ন*ষ্ট করে ডাকলে হয়তো ভালো হতো কিন্তু তাকে আবার এই সপ্তাহে লন্ডন যেতে হবে রুমি কে চিকিৎসা করানোর জন্য। না নিয়ে গেলে আবার রুমির শ*রী*রি*ক অবস্থার অবনতি হবে। কথাগুলো মনে মনে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজকে কালকের মধ্যে যে করে হোক বাচ্চা গুলো ন*ষ্ট করে ইনানকে তুলে দিতে হবে তাদের হাতে।
ইউসুফ ত্রস্ত পায়ে ইউসুফের দিকে এগিয়ে এসে বলল,” কি বলুন তো ওয়াশরুমে গিয়েছে একটু বসুন চলে আসবে

” বলেই তাদের সোফাতে বসালো। ইউসুফ উদগ্রীব হয়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটা না জানি কি অবস্থায় আছে এখন।
এভাবে কিয়তক্ষন কেটে যাবার পর সেখানে উপস্থিত হলো সায়েরা বেগম। সে দেখেছে আইয়ুব মির্জাকে এই কেবিনে প্রবেশ করতে , আর ইশিতার মেয়েটা কেমন হয়েছে সেটা দেখার জন্য আরো উঠে এলেন। সায়েরা এসে আমিরের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,” ইশিতার মেয়েকে তো দেখছিনা, কই?
ইউসুফ বলল,” আসছে ওয়াশরুমে গিয়েছে!সায়েরা আর কিছু বলল না এক জায়গায় গাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
এরইমধ্যে ওয়াশরুমের দরজা খট করে খুলে গেল, সবাই মাথা তুলে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ইনান ওয়াশরুমের দরজায় ভর দিয়ে বাইরে আসলে ইউসুফ এগিয়ে গিয়ে তাকে আগলে ধরলো,ইনান ও তার মামার হাতটাকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো মাথাটা প্রচুর ঘুরছে সাথে বমি বমি ভাব। ইনান তার মামাকে ভাঙা কন্ঠে বলল,” মামা খুব ক*ষ্ট হচ্ছে আমার দাঁড়িয়ে থাকতে? ইউসুফ তাকে আশ্বস্ত করে বলল,” আয় মা সোফায় বস, ” বলেই ইনান কে নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো আমিরদের দিকে।

সায়েরা আর আমির বি*স্ফো*রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইনানের মুখের দিকে, তাদের যেন বিশ্বাস হলো না ইনান সামনে। আমির তো পুরো হা হয়ে ইনানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমির আর সায়েরা দুজনে একবার চোখাচোখি করে আবারও তাকালো ইনানের দিকে। যে মানুষটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে দেশে বিদেশে আলী আর হাবিব সে মানুষটাকে এত সহজে সামনে দেখতে পাবে তারা যেন ভাবতে পারলো না।
ইউসুফ আস্তে আস্তে করে ইনান কে সোফায় বসিয়ে দেয়। ইনান নিজেকে সামলে সোফায় বসে সামনে তাকাতেই ঘাবড়ে গেল কয়েকটা অচেনা মুখ দেখে। সে নিজেকে আরো গুটিয়ে সামনে একপল তাকিয়ে মাথা নিচু করে নেয়। সে বুঝতে পারছে না এই লোকগুলো আবার কে, আর তার মামা তাকে এদের সামনে কেন আনলো। প্রশ্নগুলো মনে আসলে ও মুখ ফুটে বলতে ব্যর্থ হলো সে। সে ওড়না শক্ত করে আকড়ে বসে রইলো। সায়েরা বেগম তো মুখের ভাষায় হারিয়ে গেছে,এখানে কি বলা উচিত সে বুঝতে পারছে না। আমির সোফায় ছ*টফ*ট করছে, তার ভাবী কেন তার সাথে কথা বলছে না এই প্রশ্ন তার মস্তিষ্কে হানা দেয়। সে আর চুপ থাকতে পারলো না সে ইনানের দিকে তাকিয়ে, ” ভা…. বেচারা এতটুকু উচ্চারণ করতে গিয়ে করতে পারলো না তার আগেই ইউসুফ হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল,” এই হচ্ছে আপনাদের ইশিতার মেয়ে ইনান তালুকদার!
সায়েরা বেগমের পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো, আর আমির তো বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলো। তার আপার মেয়ে ইনান, আবার তার ভাইয়ের বউ ও হয়। আমির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইনানের নিঁচু হওয়া মুখের দিকে। আর সায়েরা আমিরের কাঁধটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।মুখ দিয়ে কথা যেন বের হলো না তার। আমিরের ও একই দশা।

কিছু সম্পর্ক মানুষ নিজের ইচ্ছায় তৈরি করে না। ভাগ্য কখনো কখনো মানুষকে এমনভাবে একে ওপরের জীবনে এনে দাঁড় করায়, যেখানে সত্যিটা জানার পর মানুষ নিজের অতীত বর্তমান সবকিছু গুলিয়ে ফেলে। এখন যেমন আমির আর সায়েরা হারিয়ে ফেলেছে। আমিরের চোখ বারবার ইনানের দিকে গিয়ে পরছে,তখনই তার বুকটা হালকা ভাবে কম্পন ধরছে তার ভাই যে নিষিদ্ধ সম্পর্ক জড়িয়ে গিয়েছে এখন কি হবে সে বুঝতে পারছে না। ভাই যদি জানতে পারে, যাকে সে নিজের স্ত্রী হিসেবে দেখেছে , সে মেয়ে তার বড় বোনের মেয়ে।
ইউসুফ ইনানের দিকে তাকিয়ে বলল,” এগুলো তোমার মায়ের বাড়ীর লোকজন সালাম দাও?
ইনান লজ্জা অস্বস্তি নিয়ে মাথা নিচু করে বলল,” আসসালামু আলাইকুম ?
আইয়ুব তো মহাখুশি ইশিতার মেয়েকে দেখে। সে হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল,” ওয়ালাইকুম আসসালাম? বলেই ইনান। আর ইনান তো থরথর করে কাঁপছে, পায় না যে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ইউসুফ ইনান কে কাঁপতে দেখে ইউসুফ এগিয়ে এসে তার পাশে বসে হাতটাকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো । ইনান একবার মামার দিকে তাকিয়ে পুনরায় মাথা নিচু করে নেয়।

আইয়ুব বলল,” ইনান? ইনান আস্তে আস্তে মাথা তুলে তাকালো আইয়ুবের দিকে চোখে একরাশ ভ*য়, আর আ*ত*ঙ্ক নিয়ে। আইয়ুব আমিরের দিকে আঙুল তাক করে বলল,” এটা হইলো তোমার ছোট মামা, আর পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে ও হইলো তোমার নানি আর আমি তোমার হইলাম বড়আব্বু “বলেই মুচকি হাঁসলো।
ইনান সবার দিকে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল আমিরের উপরে, তার কপালে ঘাম বের হতে লাগলো সামনে বসা লোকটাকে কেন এত চেনা লাগলো সে বুঝতে পারছে না। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নেয় কিন্তু মনের মধ্যে শুরু হলো অ*স্থিরতা । শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত চলতে লাগলো তার। সে শক্ত করে ধরলো ইউসুফের হাতটাকে।
সায়েরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইনানের দিকে, মেয়েটা তাকে চিনে কিন্তু আমির কে তো চিনে সে তো জানে আমির ওর সম্পর্কে দেওর হয় তাহলে কেন কিছু বললো না। কোন রিয়েক্ট করলো না, না কোন প্রশ্ন করলো। ওই একভাবে নিজেকে গুটিয়ে বসে রইলো ” সায়েরা কথাগুলো ভেবে একটু নিচু হয়ে আমির কে বলল,” বাইরে আয়! বলেই বাইরে চলে গেল। আর আমির ইনানের মুখের দিকে তাকিয়ে বাহিরে চলে গেল।

সায়েরা অস্থির ভাবে করিডোরে পায়চারি করছে মনের ভেতরে অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে জট পেকে বসে আছে যার কোন উত্তর নেয় তার কাছে। সায়েরা হাতের সাথে হাতটাকে শক্ত করে আকড়ে ধরলো । এরইমধ্যে সেখানে আমির এলো এসেই অস্থির গলায় বলল,” এটা কি হইলো? এখন কি হইবো?
সায়েরা ঘাড় ঘুরিয়ে আমিরের দিকে তাকিয়ে বলল,” শোন আমার মনের মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন মাথাচারা দিয়ে উঠছে, আচ্ছা এগুলো কথা বাদ দে এখন বল ও তোকে তো চিনে তাই না! আমির মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ৷ বোঝালো। সায়েরা বলল, ” এটাই তো বলছি, যখন চাচা বলল তুই ওর মামা হোস তখন ওর মুখে কোন পরিবর্তন দেখেছিস? তুই তোর দেওর হোস তাহলে ও কেন কোন প্রতিবাদ করলো না এমনকি প্রথম থেকে নিজেকে কেমন করে গুটিয়ে বসে আছে যেন তোকে ও চিনে না।
আমির বি*স্ফো*রি*ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সায়েরার দিকে সে ও তো ইশিতা আপার মেয়ে এই কথা শুনে চিন্তা করছিলো এটা তো খেয়াল করেনি? সায়েরা বলল,” আমার মাথা কাজ করছে না আমির, কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না? চোখের সামনে ইনান আছে কিন্তু তোকে চিন্তে পারছে না, আবার এই ইনান নাকি ইশিতার মেয়ে । মানে সবদিক থেকে কেমন নিজেকে পা*গ*ল পা*গ*ল লাগছে “বলেই মাথাটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরলো সে।
সায়েরা পরক্ষণেই বলল,” আচ্ছা একটা কাজ কর আমির তুই গিয়ে রুশভিয়ানের আইসিইউর কেবিনের সামনে বস। আমি ভেতরে যাচ্ছি ” সায়েরা কথাটুকু বলেই ভেতরে প্রবেশ করলো। আর আমির এগিয়ে গেল আইসিইউর দিকে।

আমি আজকেই ইনান কে পাঠিয়ে দিতাম বাট ইনান একটু অ*সুস্থ হয়ে আছে। গাড়িতে ওতদূর জার্নি করতে পারবে না। তাই আমি নিজে ওকে দুইদিন পর দিয়ে আসবো … কথাগুলো ইউসুফ একনাগারে বলে থামলো।
ইনান বড়বড় চোখ করে তার মামার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে তাকে আবার কোথায় পাঠাবে সে বুঝতে পারলো না। আইয়ুব মির্জা হালকা হেঁসে বলল,” ঠিক আছে, আপনে দিয়ে আসবেন ইনানরে মির্জা মহলে।আমার কোন আপত্তি নাই” বলল
পাশ থেকে সায়েরা গম্ভীর স্বরে বলল,” কি হয়েছে ইনানের?
ইউসুফ হকচকিয়ে উঠলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হলো তার যা সায়েরা চোখ এড়ালো না। সায়েরা এবার স্ফু*লি*ঙ্গের ন্যায় বলল,” বলুন কি হয়েছে ওর আর কেনই গাড়িতে করে যেতে পারবেনা?
ইউসুফ কপালের ঘাম গুলো মুছে হালকা হেঁসে বলল,” তেমন কিছু না, জ্ব*র হয়েছে তাই বলছি আরকি। এইযে দেখুন না এখনো শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আছে আর একটু পর গা কাঁপিয়ে জ্বর চলে আসবে । গাড়িতে গেলে আবার অনেক অসুস্থ হয়ে পড়বে ”

সায়েরা কথাটা বিশ্বাস করলো, কারন তার ডাক্তারি চোখ বলছে মেয়েটা অসুস্থ ।সে আর কিছু বলল না।
আইয়ুব উঠে দাঁড়িয়ে তার গলা থেকে একটা সোনার মোটা চেন বের করে ইনানের গলায় পরিয়ে দিয়ে গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,” আমি তোমার অপেক্ষা করমু? তাড়াতাড়ি চইলা আইসো ” বলেই সায়েরার দিকে তাকিয়ে বলল,” বাড়ি যাইবে না।
সায়েরা বলল,” আপনি যান চাচা, আমার রাত হতে পারে। আপনি চিন্তা করবেন না আমি আমির কে রত্নকুঞ্জে নামিয়ে দিবো” কথাটুকু বলতে গিয়ে সায়েরার মনের ভেতরটা ভার হয়ে গেল এতগুলো মিথ্যা বলার জন্য। কিন্তু কি করবে কিছু যে করার নেই।
আইয়ুব চলে গেল তার পিছু পিছু সায়েরা চলে গেল। আর কেবিনে থেকে গেল ইউসুফ আর ইনান। ইনান এতক্ষণে মাথা তুলে তার মামার দিকে তাকিয়ে বলল,” মামা আমাকে কোথায় পাঠাবে?

ইউসুফ ইনানের মাথায় হাত রেখে বলল,” তোকে এমন একজায়গায় পাঠাবো যেখানে তুই কোনকিছুর অভাব বুঝতে পারবি না মা,ওই আইয়ুব মির্জা তোর মায়ের দাদু হয় তোকে অনেক ভালোবাসবে তিনি তুই ওখানে খুব ভালো থাকবি মা। তোকে আর তোর মামির অ*ত্যা*চা*র সহ্য করতে হবে না,কেউ আর তোকে উঠতে বসতে মারবে না” কথাগুলো বলতে বলতে ইউসুফের চোখের কোনে পানি জমলো।
ইনান চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে সে পানি গুলো মুছে বলল,” আমি যাবো না মামা,আমি লা*থি ঝাঁ*টা খেয়ে তোমার বাড়িতে পড়ে থাকবো তবুও আমাকে ওখানে যাবো না। প্লিজ মামা আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। ওখানে গেলে বাঁ*চ*তে পারবো না মামা তোমাদের ছাড়া, আমাকে নিয়ে চলো ” ডুকরে উঠলো ইনান তার মামার হাত আকড়ে ধরলো । যেন এই হাতটা ছেড়ে দিলে তার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে যাবে।
ইউসুফ কিছু বলল না, সেও তো চাই মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে যেতে কিন্তু রুমি যে তার নামে মা*মলা করেছে কিভাবে বাঁচাবে মেয়েটাকে।

ইউসুফ ধীরে ধীরে ইনানের মাথার উপরে হাত রাখলো। চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে নিচু গলায় বলল,” চুপ কর মা…. এত কাঁদিস না।
ইনান সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল। চোখ দুটো কান্নার জন্য লাল টকটকে হয়ে গেছে তার।
—তাহলে আমাকে নিয়ে চলো?
এইটুকু কথাতে ইউসুফের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো, যাতে ইনান তার চোখের পানি দেখতে না পায়, কিন্তু ইনান দেখে ফেলল।
—তুমি কাঁদছো মামা?
ইউসুফ দ্রুত চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করে বলল,” না তো …. আমি আবার কেন কাঁদবো?
ইনান তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ছিলো শিশুর মতো বিশ্বাস আর অসহায়ত্ব। ইনান নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল,”মিথ্যা বলছো

ইউসুফ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, সে এক ঝটকায় ইনান কে নিজের বুকে টেনে নিল। ইনান আর কন কথা বলল না। সে মামার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল । ইউসুফ ইনান কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো। ইউসুফ ভারী গলায় বলল,” মা…. আমার উপরে রাগ করিস না !
ইনান মামার বুক থেকে মুখ তুলে চোখ মুছে বলল,” আমি তোমার উপরে রাগ করিনা মামা, আমি শুধু তোমাকে ছেড়ে যেতে চায় না”
কথাটা শুনে ইউসুফের বুকটা ভার হয়ে গেল। সে ইনানের দুই গালে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,” তুই আমার কথা শুন মা। আমি তোকে ফেলে দিচ্ছি না। তোর মামা তোর ভালোর জন্য এগুলো করছে। যদি পারতাম তাহলে তোকে কোনদিন ও যেতে দিতাম না”।

ইনান বলল,” আমাকে কেন পাঠাচ্ছো মামা?
ইউসুফ চুপ রইলেন এই যাত্রায়, আর কিছু বলতে পারলো না সে, ইনান তার মামার হাত দুটো শক্ত করে বলল, ” বলো না মামা কেন পাঠাচ্ছো আমাকে?
ইউসুফ একঝটকায় উঠে দাঁড়ালো কোন কথা বললো। ইনান চমকে উঠলো তার মামাকে দেখে। ইউসুফ বলল,” তোকে যেতে হবে ইনান,আর কেন পাঠাচ্ছি, কিসের জন্য যাচ্ছিস এগুলো আমি আর শুনতে চাই না ” বলেই বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
আর ইনান রইলো ধোঁয়াশার মাঝে, যার চারদিকে কেবল অন্ধকার ছড়িয়ে আছে। ইনান তার মামার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো ।
ইউসুফ কেবিন থেকে বেরিয়ে বাইরে চোখের পানি মুছতে লাগলো। সেই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে সায়েরা বেগম। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইউসুফের দিকে। ইউসুফ একবার কেবিনের দিকে তাকিয়ে করিডোর দিয়ে বাইরে চলে গেল। সায়েরা যেন এটার অপেক্ষাই ছিলো সে এগিয়ে কেবিনো ঢুকতে নিলেই সেখানে উপস্থিত হলো ডক্টর অনু। সায়েরা দরজার কাছে সর্ন্তোপনে সরে গেল তাকে যেন দেখতে না পায়। অনু কিছু সময় পর ইনানকে সাথে নিয়ে কোবিন থেকে বেরিয়ে এলো।

অনু বলল,” আচ্ছা সব রেডি আছে, শুয়ে পড়ো বেডে?
ইনান বেডের দিকে এগিয়ে গেল না বরঞ্চ সাহস নিয়ে বলল,” আমার কি হয়েছে আপু? কেন আমাকে বেডে শুতে বলছেন? ইনানের কথাটা শুনে অনুর চোখের কোনে হালকা হালকা পানি জমলো। বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিক ভাবে ভার হয়ে গেল। কি করে বলবে মেয়েটাকে তার সন্তানদের শে*ষ করার জন্য এত আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবিনে প্রবেশ করলেন একজন এসেই অনুকে বলল,” ম্যাডাম দুইশো তিন নাম্বারের পেশেন্ট কেমন করছে আপনি তাড়াতাড়ি আসুন? বলেই চলে গেল। অনু ইনানের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,” ইনান তুমি বসে থাকো? আমি আসছি? বলেই বেরিয়ে গেল।
অনু বেরিয়ে যেতেই কেবিনে চুপিচুপি প্রবেশ করলো সায়েরা বেগম। সায়েরা কেবলই ঘরে পা রেখেছে এমন সময় দুজন নার্স প্রবেশ করতেই সায়েরা কেবিনের মধ্যে দরজার আড়ালে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আর তার দৃষ্টি রইলো ইনানের উপরে। ইনান বেডে বসে আছে।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৬

নার্স দুজন এগিয়ে এসে ইনান কে বলল,” ম্যাডাম শুয়ে পড়ুন এক্ষুনি ডাক্তার চলে আসবে?
ইনান অনিচ্ছায় সত্বেও শুয়ে পড়লো বেডে। সায়েরা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে ইনানের দিকে, সে বুঝতে পারছে এইখানে সব প্রশ্নের উত্তর পাবে সে, ইনানের এতটা পরিবর্তন, আমির কে না চেনা সবকিছুর উত্তর এখানে পাবে।
এভাবে কিছুক্ষন কেটে যাবার পর কেবিনে প্রবেশ করলো অনু সাথে ডাক্তার নায়েরা । ইতিমধ্যে ইনান কে ইনজেকশন দিয়ে অবচেতন করে রাখা হয়ে গিয়েছে৷ দুজনে প্রবেশ করতেই সায়েরা একটু ভিতরে প্রবেশ করলো ।
নায়েরা ইনান কে আপাদমস্তক পরোক্ষ করে বলল,” মেয়েটাতো অনেক ছোট ডক্টর তার উপরে বাচ্চা ন*ষ্ট করলে মেয়েটা বাঁচবে তো?
ডক্টরের কথায় সায়েরার পায়ের তলা মাটি সরে গেল। ইনানের পেটে বাচ্চা। আর সে বাচ্চা এই ডাক্তার গুলো ন*ষ্ট করতে এসেছে…….

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here