Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৫

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৫

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৫
সেঁজুতি আক্তার

-গাড়ীর মধ্যে পিনপতন নীরবতা। শেহরান গম্ভীর মুখে বসে ফোন স্ক্রল করছে। পাশেই মাইরা বসে অস্থির হয়ে উঠেছে। কিছু বলার জন্য। কিন্তু শেহরান মাইরার কথা শুনবে না বলে, কানে হেডফোন গুঁজে বসে আছে।
-মাইরা একবার শেহরানের দিকে বিরক্তি চোখে চাইল। শেহরান যেন ইচ্ছা করেই ফোনের মাঝে ডুবে আছে। মাইরা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে দেখল। রাস্তার ধারে এক লোক হাওয়াই মিঠা বিক্রি করছে। হাওয়াই মিঠা দেখে, মাইরার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সাথে সাথে চিল্লিয়ে বলল, এই, গাড়ি থামান। সাথে সাথে ড্রাইভার গাড়ির ব্রেক মারলো। শেহরান একটু সামনে ঝুঁকে গেল। হাত থেকে ফোনটা আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। বিরক্তি ভরা চোখে মাইরার দিকে তাকালো। কি সমস্যা তোমার? স্টপ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারো না? ইডিয়েট! শেহরান ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলল।

-ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতে নিলেই, মাইরা চিল্লিয়ে বলল, একদম গাড়ি স্টার্ট দিবেন না। শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি হাওয়াই মিঠা খাবো।
-শেহরান মাইরার দিকে তাঁকালো, কপাল কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে বলল, কি খাবে?
-মাইরা রাস্তার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলল, ওই যে, ওই লোকটা হাওয়াই মিঠা বিক্রি করছে। আমি ওইটা খাবো।
-শেহরান রাস্তার দিকে একবার তাকালো। মাইরার দিকে তাকিয়ে হেয়ালি করে বলল, খাবে তো খাও, আমাকে বলছো কেন?
-মাইরা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, তো জান কিনে আনুন, তারপরে তো খাব।
-এক্সকিউজ মি! শেহরান অবাক হয়ে বলল, কি! আমি কিনে আনবো? ইম্পসিবল।
-মাইরা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, যাবেন না তো আপনি? আচ্ছা, তাহলে আমি যাচ্ছি। বলেই গাড়ি থেকে নেমে যেতে লাগলো।

-শেহরান মাইরার দিকে শান্ত চোখে তাকালো। চোখে ছিল না কোন রাগ। বলল, এই মেয়ে, কোথায় যাচ্ছ? আমি নিয়ে আসছি, ওয়েট করো। বলে হেডফোন খুলে, গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল। মাইরা দুষ্টু হাসলো। দেখুন এবার কেমন লাগে, আমাকে চুপ করিয়ে রাখবেন।
-মাইরা জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলো, শেহরান রাস্তার ধারে ওই হাওয়াই মিঠা ওয়ালার কাছ থেকে তিনটা হাওয়াই মিঠা নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। মাইরা সোজা হয়ে বসলো। শেহরান গাড়ির গ্লাসের পাশে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করল। মাইরা না শোনার ভান করে বসে রইল। শেহরান বিরক্তি নিয়ে অপর পাশের গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসলো। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল। শেহরান মাইরার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, নাও, ধরো তোমার হাওয়াই মিঠা। মাইরা মুচকি হেসে তিনটা হাওয়াই মিঠাই নিয়ে নিল। শেহরান অদ্ভুত চোখে চাইল মাইরার দিকে। এই মেয়ে কি রাক্ষস?
-মাইরা শেহরানকে পাত্তাই দিল না। একে একে তিনটা প্যাকেটে ছিঁড়ে খেতে লাগলো। একবার শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, খাবেন? খেলে একটুখানি দিতে পারি।
-শেহরান গম্ভীর কণ্ঠে ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল, তুমি খাও, ভালো করে। তোমার তো সব আনহেলদি ফুড বেশি পছন্দ।
-মাইরা শেহরানের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচালো। খাটাশ লোক, আপনি কিভাবে বুঝবেন এটার স্বাদ? বলেই আপন মনে খেতে লাগলো।
-শেহরান একবার আড় চোখে মাইরার দিকে তাকালো। ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি খেলে গেল।

-সায়রা আজকে ভার্সিটি যায়নি। মাইরারা বেরিয়ে যেতেই সায়রা নিজের রুমে এসে শুয়েছে। লিনা আজ কিছুদিন ধরে বাসায় আসে না। সেদিন লাবনী বেগম লীনাকে নিয়ে গেছে, লীনা আর আসেনি। সায়রা বিছানায় বসে ফোন স্ক্রল করছিল। হঠাৎ একটি নোটিফিকেশন আসলো। সায়রা ভ্রু কুঁচকে নোটিফিকেশনটি অন করতে, ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলে গেল।
-নীলাদ্রি নীল নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে, একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে ফেসবুকে। ছবিটার ক্যাপশন দেওয়া, একাকী মন আজ তোমার অনুভবে।
-সায়রা পর দুই তিনটা ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দিল। হঠাৎ সায়রার মেসেঞ্জার টুং করে একটি মেসেজ আসলো। মেসেজটি সিন করতে দেখলো, লেখা। আমি জানি আমি সুন্দর। কিন্তু কোন মেয়ে যখন পরপর দুই তিনটা ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দেয়, তখন নিজেকে নিয়ে আরো গর্বিত মনে করি। যাই হোক, মানতে হবে আমি আসলেই হ্যান্ডসাম কিউট বয়। সাথে একটি বাঁদরের ইমোজি।
-মেসেজটি দেখে সায়রা ফিক করে হেসে ফেলল। এই ছেলেটা না, আজব একটা মানুষ। অদ্ভুত।

-দীর্ঘ জার্নির পরে অবশেষে শেহরানের গাড়িটা, মাইরার মামাবাড়ির সামনে এসে থামলো। গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনে ইমন দৌড়ে আসলো। মাইরা গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে ইমনকে জড়িয়ে ধরল। কেমন আছিস ভাই?
-আমি ভালো আছি আপু, তুমি কেমন আছো?
-আমিও ভালো আছি সোনা, কতদিন তোকে দেখিনি?
-মাইরা ইমনকে আদর করতে লাগলো।
-মাইরার মামা বাড়ির মধ্যে থেকে দৌড়ে আসলেন। পিছনে পিছনে মামীও আসলো। রফিক মিয়া এসে শেহরানকে গাড়ি থেকে নামালেন। শেহরান গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ধারে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে একে একে সমস্ত জিনিস ড্রাইভার বাড়ির ভেতরে দিয়ে আসলো। শেহরান ড্রাইভারকে বলল গাড়ি নিয়ে চলে যেতে। শেহরানের কথা মতো ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।
-কেমন আছো বাবা? রফিক মিয়ার কথা শুনে শেহরান গম্ভীর কণ্ঠে বললো, জী আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি?

-আমিও ভালো আছি বাবা। কথাটা রফিক মিয়া হাসতে হাসতে বললেন। মাইরার মামি শেহরানকে দেখে এগিয়ে এসে মন্দ জিজ্ঞাসা করলেন। শেহরান দুই একটা কথার উত্তর দিল। এতে মামি বেশ রাগ করলেন। কিন্তু প্রকাশ করলেন না।
-গ্রামে বড় গাড়ি আসতেই, বাড়ির পাশে কিছু পাড়া-প্রতিবেশী ছুটে আসলো দেখার জন্য। মাইরাকে দেখে সবাই একটু ঠেস মেরে জিজ্ঞাসা করল, কিরে মাইরা কেমন আছিস? শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, কিরে এটা তোর স্বামী নাকি?
-মাইরা হাসতে হাসতে বলল, আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তোমরা কেমন আছো মামী?
– আমরা ভালো আছি রে। তা তুই তো ভালই হইছিস। মনে হচ্ছে একটু আগের থেকে মোটা হয়েছিস।

-মাইরা শুধু একটু হাসলো, কিছুই বলল না। শেহরানের দিকে তাকালো। শেহরান মহিলাগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত সব মানুষজন। রফিক মিয়া শেহরানকে নিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পিছে পিছে আফিয়া বেগম এগিয়ে গেলেন। ইমন মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু দুলাভাই কেমন রে?
-মাইরা মুখটা গম্ভীর করে বলল, ভালো। চল ভাই, বাড়ির ভেতরে চল। ইমন বোনের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
-বাড়ির ভেতরে আসতেই রফিক মিয়া শেহরানকে বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দিলেন। শেহরান আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, বাড়ির চারদিকে দেওয়াল। বিশাল বড় উঠান, একটা গ্রামের বাড়ি যেমন হয়। রফিক মিয়ার বাড়িটা চারদিকে পাকা, কিন্তু সিলিং রঙিন টিন দেওয়া। বাড়িটা বেশ গোছালো। বিয়ের দিন শেহরান সেই ভাবে দেখেনি।

-মাইরা আসতেই রফিক মিয়া ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করে, মাইরাকে বললেন শেহরানকে রুমে নিয়ে যেতে। যেই রুমে বিয়ের আগে মাইরা থাকতো। শেহরান একবার আড়চোখে মাইরার দিকে চাইল। মাইরা, ওর মামার সাথে কথা বলছে। হঠাৎ পকেটে রাখা ফোনটা বেঁজে উঠলো। শেহরান ফোন রিসিভ করে উঠানের দিকে নেমে গেল।
-মাইরা মামার কথা শুনে শেহরানের দিকেই যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে আফিয়া বেগম মাইরার হাত ধরে টানতে টানতে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন।
মাইরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মামীর দিকে তাকিয়ে আছে। আফিয়া বেগম মাইরার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপরে উঠানে দাঁড়ানো শেহরানের দিকে একবার তাকিয়ে, চোখ ফিরিয়ে নিলেন। ধীর কণ্ঠে বললেন, এই মাইরা, সত্যি করে বলবি।
মাইরা চোখ ছোট ছোট করে মামীর দিকে তাকালো। আফিয়া বেগম বলা শুরু করলেন। তোর শশুর বাড়ির লোক কি খারাপ ব্যবহার করে?

-মাইরা সাথে সাথে ডানে বামে মাথা নাড়ালো, না না মামী একদম না। ওনারা খুব ভালো মানুষ। আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেন।
-আফিয়া বেগম সরু চোখে তাকালেন। বললেন, আর শেহরান?
-মাইরা মাথা একটু নিচু করে ফেলল। তারপরে শেহরানের দিকে একবার তাকালো। দেখলো শেহরান কথা শেষ করে আবার চেয়ারে গিয়ে বসলো। মাইরা এবার মামীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, উনিও ভালো। খুব ভালোবাসেন আমায়।
-সত্যি?
-মাইরা ওপর নিচ মাথা নাড়ালো, হুম।
-আচ্ছা যা, শেহরানকে নিয়ে তোর রুমে যা। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।
-আচ্ছা।
-আফিয়া বেগম চলে গেলেন। মাইরা মামির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শেহরানের দিকে এগিয়ে গেল।

-শেহরান বসে ফোন স্ক্রল করছে। মাইরা এগিয়ে এসে শেহরানের সামনে দাঁড়ালো। শেহরান মাথা তুলে মাইরার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। মাইরা সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল। চোখ এদিক সেদিক করে বলল, চলুন রুমে চলুন। বলেই হাটা ধরল। শেহরান কপাল কুঁচকে মাইরার পিছু পিছু রুমের দিকে এগিয়ে গেল। মাইরা দরজা খুলে রুমে ঢুকলো। রুমটা গোছানো, হয়তো মামি গুছিয়েছে। ভেবেই মুচকি হাসলো। শেহরান চারপাশে তাকিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো। মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাদের গ্রামের লোক এত বাজে কেন? মাইরা অবাক চোখে শেহরানের দিকে চাইল। শেহরান আবার বলা শুরু করল, এসব মানুষদের কি কোন খেয়েদেয়ে কাজ নাই। অন্যের বিষয়ে এত কথা বলতে পারে এরা। আজব মানুষজন সব।

-শেহরানের মুখের রিঅ্যাকশন আর কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে, মাইরা ফিক করে হেসে ফেলল।
-শেহরান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, কি সমস্যা? হাসছো কেন?
-কিছু না, এমনি।
-শেহরান মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ফ্রেশ হবো, ওয়াশরুমটা কোন দিকে?
-মাইরা গম্ভীর কণ্ঠে বললো, ওয়াশ রুম।
-হুম।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৪

-মাইরা দুষ্টু হেসে বলল, ওয়াশরুম তো পাবেন না। কিন্তু বাথরুম পাবেন।
-শেহরান অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। ওয়াশরুম পাব না মানে?
-জি, এখানে কোন ওয়াশরুম নেই। ইমারজেন্সির জন্য বাথরুম আছে। গোসল করতে হলে পুকুরে যেতে হবে।
-হোয়াট!
-আজ্ঞে, জি।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৬