Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৩৬

কাজলরেখা পর্ব ৩৬

কাজলরেখা পর্ব ৩৬
তানজিনা ইসলাম

প্রায় চারঘন্টা ধরে চাদনী আকিব শিকদারের কোলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। আকিব শিকদার আগলে রেখেছেন ওঁকে। মাঝে মাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ওনার বাহুতেই মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলো ও। ঘাড় ব্যাথা হবে বলে, আকিব শিকদার ওর মাথা কোলে নিয়েছেন। ব্যাগ থেকে বের করে আরো শাল পেঁচিয়ে দিয়েছেন ওর গায়ে যাতে ঠান্ডা বাতাস না লাগে। রাতের বেশ লাগলো বিষয়টা। ও অনেক্ক্ষণ ধরেই আকিব শিকদারের গতিবিধি খেয়াল করছে। একটা বাচ্চার মতো করে আগলে রাখছেন তিনি চাদনী কে। রাতের ভালো লাগার পাশাপাশি আফসোস হয়। হৃদয়ে জমে কারো প্রতি তীব্র অভিমান। ওর ছোটবেলা টা বাবা ছাড়ায় কেটে গেছে। অন্যদের বাবা যখন ওঁদের ভালোবাসে ওর কিভাবে যে হিংসে হয়! তবে আজ ওর শ্যামাঙ্গীনির প্রতি হিংসে হলো না। বাচ্চা একটা মেয়ে! কি যেন নাম? রাত খেয়াল করলো ও আবার চাদনীর নাম ভুলে গেছে।

-“আপনার হাঁটুতে ব্যাথা করছে না আঙ্কেল??”
রাতের প্রশ্নে আকিব শিকদার তাকালো ওর দিকে। অনেক্ষণ পর রাত কথা বললো।ছেলেটা একটুও নিজ থেকে কথা বলে না।
-“ব্যাথা কেন করবে?”
-“ও অনেক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছে। এবার জাগিয়ে দিন ওঁকে। এখন হয়তো টের পাচ্ছেন না, পরে কিন্তু ঝিম ধরে যাবে। হাঁটতে পারবেন না।”
-“ওওও, না সেটা কোনো বড় সমস্যা না। বাবা হয়ে এটুকু করতে পারবো না!মেয়ের একটা সুন্দর ঘুমের জন্য একটু না-হয় হাঁটু ব্যাথা করলাম।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাত মলিন হাসলো। চট্টগ্রামে পৌঁছাতে আর বেশি দেরি নেই। আকিব শিকদার টুকটাক কথা বললের রাতের সাথে।
রাত নিজ থেকে তেমন কথা বলছিলো না। তবে আকিব শিকদারের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো। ছেলেটা বয়সের তুলনায় বেশি ম্যাচিউর। সবকিছু নিয়ে ভালোই ধারণা ওর। আকিব শিকদারের বেশ ভালো লাগছিলো ওর সাথে কথা বলতে। কেমন একটা বিজ্ঞ বিজ্ঞ ব্যাপার আছে ওর মধ্যে। জীবনের উত্থান পতন নিয়ে এই বয়সেই যার এতো অভিজ্ঞতা সে নিশ্চয়ই জীবনে কম যুদ্ধ ফেইস করেনি! আকিব শিকদারের খুব কৌতুহল জাগলো রাতের ব্যাপারে। কিন্ত জিজ্ঞেস করার আর সুযোগ হলো না।ছয়ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেন এসে থামলো চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে। আকিব শিকদার ঘুম থেকে জাগালেন চাদনীকে। ছয়ঘন্টা এই মেয়ে টানা ঘুমিয়েছে। চাদনীর এই এক সমস্যা, ওর যানবাহনে উঠলেই খালি ঘুম পায়। রাত তেমন ব্যাগপত্র আনেনি ওর সাথে৷ শুধু একটা কাঁধ ব্যাগ ছিলো ওর সাথে। তবে চাদনী বড় বড় দু’টো লাগেজ নিয়ে এসেছে। একটা ও নিলো, আরেকটা আকিব শিকদার নিলেন।এতো রাতে কুলি পাওয়া সম্ভব না। রাত আকিব শিকদারের থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলো।বললো

-“আমি নিচ্ছি, আসুন।”
আকিব শিকদার খুব খুশি হলেন। ট্রেনের বাইরে এসে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বললেন
-“ধন্যবাদ তোমাকে বাবা।”
-“ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই আঙ্কেল। আমার বাবা থাকলে আমি তাকে কিছু নিতেই দিতাম না।”
চাদনী রাত কে দেখে অবাক হচ্ছে খালি। এই অ্যারোগেন্ট ছেলেটা এতোটা নরম ব্যবহার করছে কি করে ওর বাবার সাথে! এর তো অহংকারে মাটিতেই পা পরে না। সেখানে ওর বাবার সাথে কতটা আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। রাতের গাড়ি চলে এসেছে। ও গাড়িতে ওঠার আগে আকিব শিকদারকে বললেন

-“চলে যাচ্ছি আঙ্কেল।গাড়ি এসেছে আপনাদের?”
-“চলে আসবে। একটু অপেক্ষা।তুমি যাও।আবারো দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।”
-“দেখা হবে?”
-“হতেই হবে। অনেক আলোচনা বাকি থেকে গেছে। আবার হবে কোনো একদিন।”
রাত বিদায় নিয়ে চলে গেলো।আকিব শিকদার চাদনীর দিকে তাকিয়ে বললেন
-“ছেলেটা খুব ভালো তাই না আম্মা!”
চাদনী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো
-“ভালো হলেই কী? আমার তো অহংকারী মনে হলো।”
-“একদমই না। কি অমায়িক ছেলে টা!”
-“হু, তোমার তো সবকিছুতেই বেশি বেশি প্রশংসা।”

রোদেলা এহসান ফুলের বাগানে হাঁটছিলেন। রাত বাজে একটা। ওনাদের বাড়িতে রাতের খাবারটা সবসময় দেরি করেই খাওয়া হয়। তবে আজ তার খাওয়া হয়নি। সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষায় মসগুল তিনি, কখন আবরার আসবে। ওনার মনে হলো এবারেও বোধহয় তিনি ধোঁকা খেয়েছেন। প্রতিবারই আবরার তাকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়, সে আসবে। ওনি পুরোদিন অপেক্ষায় থাকেন কিন্তু আবরার আসেনা। এবারও বোধহয় ধোকাটা খেলো সে। ওনার পিছু পিছু দু’জন সার্ভেন্ট হাঁটছেন৷ ওরা দু’জন সবসময় ওনার পিছু পিছু হাঁটে। কি লাগবে না লাগবে খবর নেয়। ওদের পুরোদিনের দায়িত্ব রোদেলা এহসানের সেবা করা, সুবিধা অসুবিধা দেখা।সারাক্ষণ ওনার পায়ে পায়ে ঘোরা। এ বাড়িতে ওনি রাণীর মতো থাকেন আর পুরো দিন ওনার রাজপুত্রের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু সে রাজপুত্র আর আসে না৷ জীবনে তার একমাত্র দুঃখ এটাই।

অনেকগুলো জোনাকি পোকা এসে ভীড় জমিয়েছে বাগানে।
রোদেলা এহসান জোনাকি পোকাগুলো ধরতে চাচ্ছেন। কিন্তু সেগুলো তার হাতে ধরা দিচ্ছে না, হাত ফস্কে পালাচ্ছে। কোনোটা ওনার হাতের সাথে লেগে খিলখিল করে হেঁসে উঠছেন।
রোদেলা এহসান মনোযোগ দিয়ে জোনাকি পোকা দেখছিলেন। তক্ষুণি কেও পেছন থেকে ডাকলো ওনাকে
-“মাম্মা!”
পরিচিত কন্ঠ কানে আসতেই দ্রুত বেগে পিছু ফিরলেন তিনি। রাত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।রোদেলা এহসান কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে দেখলেন ওকে। রাত যে সত্যিই এসেছে সেটা বিশ্বাস করতে কিছুটা কষ্ট হলো। পরক্ষণেই দৌড়ে এসে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলেন তিনি রাতকে। তাল সামলাতে রাত দু’পা পিছিয়ে গেলো।তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে বললেন
-“তুমি, তুমি এসেছো! তুমি সত্যিই এসেছো। আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!”
রাত হাসলো ওর মায়ের বাচ্চামো দেখে। বাচ্চাদের মতো করে বললো

-“চিমটি কেটে দেখো!”
রোদেলা এহসান সত্যিই চিমটি কাটলেন ওর হাতে। দেখলেন রাত ভ্যানিশ হয়ে গেলো না। এবারে শিউর হলেন তিনি। এতোক্ষণের শঙ্কা কাটলো ওনার। ত্রস্ত হাতে ওর মুখে হাত বুলিয়ে বললেন
-“আই মিস ইউ। আই মিস ইউ সো মাচ।তুমি জানো আমি তোমার জন্য কতো কেঁদেছি! কতো! তুমি, তুমি যাবে না তো আমাকে ছেড়ে আর। বলো, বলো যাবে না।”
-“আর কক্ষনো যাবো না।”

-“মিথ্যুক! সবসময় আমাকে আশ্বাস দিয়ে চলে যাও।তুমি জানো না আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না! একটুও কেয়ার করো না আমার তুমি৷ একটুও ভালোবাসো না।”
-“তুমি ছাড়া ভালোবাসার আর কে আছে। আমার বলতে আর কেও তো নেই তুমি ছাড়া।”
রোদেলা এহসান রাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো। যেন ছেড়ে দিলেই ওনার আবরার চলে যাবে ওনাকে ছেড়ে। এ টা যে উনি কতটা ভয় পান ছেলেটা জানে না।ওনার কিভাবে যে মন পুড়ে, কান্না পায় সেটা যদি আবরার জানতো কক্ষনো ওনাকে ছেড়ে যেতে পারতো না।

আকিব শিকদার আর চাদনী যখন এলো তখনও শিকদার বাড়ির সবাই জেগে ছিলো। বাড়ির সবাই একটু দেরি করেই ঘুমায়। চাদনী আকিব শিকদার থেকে শুনেছিলো অর্পিতা ফিরে এসেছে বাড়িতে। তবে ও যে ওর স্বামী সহ বাড়িতে এসে উঠেছে সেটা চাদনী এসে মাত্রই দেখলো। বাড়ির সবাই কি অবলীলায় মেনে নিলো ওঁদের। একজনের দোষের ভাগীদার আরেকজনকে বানিয়ে দিয়ে, আরেকজনের জীবন জাহান্নাম বানিয়ে বাড়ির সবাই আসলেই ভালো ছিলো।ওর খুব করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিলো অর্ণব শিকদার থেকে, ওর আসলে দোষটা কোথায় ছিলো? কেন ওর বাড়িতে জায়গা হলো না? ও তো শুধু ওর বাবা আর বড়বাবার কথা রেখেছিলো। ওঁদের কথা ফেলতে পারেনি। কিন্তু যে বাড়ির সম্মানের কথা একবারো ভাবলো না, তাকে ঠিকই সবাই নিজের কাছে রাখলো।
তবুও নিজের দুঃখ নিজের কাছে চেপে রেখে সবার সাথে ভালোভাবেই কথা বললো চাদনী।
কিন্তু অর্পিতার সাথে কথা বলার রুচি হচ্ছিলো না ওর। অর্পিতা নিজ থেকেই কথা বলতে এলো। কোনো সাক্ষাৎ, ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করা ব্যাতিতই এসে প্রশ্ন ছুড়লো

-“তোর না-কি আধার ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে?”
-“হ্যাঁ হয়েছে। তোমাকে না পেয়ে সবাই আমাকে বলি দিয়েছে!”
-“বলি কেন দেবে? তোরই তো লাভ হলো। আমি তো তোর সুবিধে করে দিলাম। তোর অকাতের বাইরে জামাই পাইয়ে দিলাম তোকে। নয়তো তোর মনে হয়, মাইনকার চিপায় না পরলে আঁধার ভাই তোকে বিয়ে করতো? নেহাতই আমি পালিয়েছিলাম…
-“ফিরে এসেছো কেন?”
-“আমার বাড়ি! ফিরে আসতে কারো পারমিশনের দরকার নেই। তোর না-হয় কোনো দাম নেই এ বাড়িতে।কিন্তু আমার ব্যাপার তো এমন না।”

-“হ্যাঁ, তাই তো। তুমি তো সবার আদরের।”
-“জানিসই যখন প্রশ্ন করছিস কেন? আঁধার ভাই তোকে মেনে নিয়েছে? তোকে তো সহ্যই করতে পারতো না!”
-“তোমার জেনে লাভ?”
-“কোনো লাভ নেই। তারপরও আমার ভালো লাগছে না, বাড়ির সবাই তোকেই পেয়েছিলো আঁধার ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে। দুনিয়াতে আর মেয়ে ছিলো না! বেচারা! ইশ! আমার জন্য তোর মতো মেয়েকে বিয়ে করতে হলো। গিল্ট ফিল হচ্ছে। ভাই কখন আসবে জানিস? মাফ চাইতে হবে। ফোন করেছিলাম অনেকবার, রিসিভ করেনি।”
চাদনী বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো

-“ফোন কেন করেছো? আরেকজনের জামাই কে ফোন করো লজ্জা করে না?”
-“জামাই? কার? তোর!কীসের এতো বড়াই করছিস! সেটাও তো আমার দান।”
-“তোমার কেন এতো ফাটছে অর্পিতা আপু বলবে আমাকে। নিজের ইচ্ছাই তো পালিয়েছিলে কেও তো জোর করেনি। কীসের এতো আফসোস হচ্ছে তোমার?”
-“আঁধার ভাইকে না পাওয়ার আফসোস। তবে সেটা অতোটা গাঢ় না, আসল আফসোস হচ্ছে তোর মতো রূপহীন একটা মেয়ে তাকে পেয়েছে। যোগ্যতার চেয়ে বেশি পেয়ে গেছিস। অথচ আমার নখর যোগ্য না হয়েও তুই আমার চেয়ে বেটার কাওকে পেয়ে গেলি।”

চাদনী আর কথা বললো না ওর সাথে। সোজা হাঁটা দিলো নিজের কক্ষে। ওর কক্ষ টা তালাবদ্ধ ছিলো।বর্ষা বেগম এসে খুলে দিলেন। রাগে ক্ষোভে হাত পা কাঁপছে চাদনীর। বেয়াদব একটা! নিজেই পালিয়েছে। নিজের দোষেই সব হারিয়েছে। এখন নিচু করছে ওঁকে।কোন হে রূপবতী সে! কিসের এতো অহংকার! কাল সকালে ওর জামাই থেকে একবার অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে সে সকাল বিকাল তার বউয়ের রূপ ধুয়ে পানি খায় কি-না। নয়তো রূপ নিয়ে এতো অহংকার আসে কোত্থেকে।

আঁধারের দেওয়া আইফোন টা আনেনি চাদনী। বাড়িতে ওর একটা ফোন আছে। এছাড়াও আঁধারের দেওয়া সবকিছুই রেখে এসেছে ও। যখন মানুষ টাকে রেখেই চলে এলো, তখন তার দেওয়া জিনিস এনে লাভ কি! ড্রয়ার থেকে খুঁজে নিজের ফোনটা বের করলো চাদনী। এ ফোনটা আকিব শিকদার ক্লাস টেনে থাকতে দিয়েছিলো ওঁকে। ঢাকা চলে যাওয়ার দিন অতি কষ্টে ভুলক্রমে রেখে গিয়েছিলো। তখন চিন্তায় বুদ ছিলো যে, কি করে আকিব শিকদারকে ছাড়া থাকবে! অথচ এখন এসে খারাপ লাগছে।চার্জে দিয়ে নিজের ফোন অন করলো চাদনী। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে নিজের আইডি লগইন করতেই আঁধারের মেসেজ এলো, পৌঁছে একবার জানাস তো। ফোনটাও রেখে গেছিস। চাদনী জানালো না। মেসেজ সিন করে ব্লক মেরে দিলো। আর আঁধারের কথা ভাববে না ও। কক্ষনো না। আঁধারের সাথে সবকিছু শেষ করে এসেছে ও। এতো অপমান, অবজ্ঞা আর গায়ে সয় না। বারংবার মানুষ ওর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যোগ্যতা থেকে বেশি পেয়ে গেছে চাদনী।ও আসলে এতোটা ডিজার্ভ করে না। যখন ডিজার্ভ করেই না, তখন আর চ্যাচড়ার মতো পরে থেকে লাভ কি! কোনো লাভ নেই। এবার থেকে আর আধারের কথা ভাববে না একটুও। নিজেকে ওর সাথে সম্পর্কিত সবকিছু থেকে গুটিয়ে নেবে, দূরে রাখবে। ভালো থাকুক সে। চাদনীও নিজের মতো ভালো থাকবে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে চাদনী আঁধার কে কতটা মিস করছে, সেটা ও টের পেলো পরেরদিন থেকে। যখন থেকে ও নিজের পরিবার, কাছের মানুষ সবাইকে নিজের আশেপাশে দেখতে পেলো, কিন্তু ওঁকে উঠতে বসতে অপমান করা একটা সত্তা কে দেখতে পেলো না। আঁধার সবসময় ওর গা ঘেঁষে থাকতো। কথা বলার চেষ্টা করতো। আবার কথাও শোনাতো। অভ্যাস হয়ে গেছিলো বুঝি চাদনীর এসব।নয়তো ও ভালো থাকবে বলেও কেন ভালো থাকতে পারছিলো না। সবাই আছে আর ওর সাথে। তবুও কেও যেনো নেই। চাদনী একা! বাড়িতে আসার যতটা তাড়া, আকাঙ্খা ছিলো ওর, এসে যেন সে জোশটা পেলো না ও।আকিব শিকদার ওর জন্য অফিসে গেলেন না। চাদনী সবসময় চায়, সে অফিসে না গিয়ে একটু চাদনীর সাথে থাকবে। সময কাটাবে, গল্প করবে।

মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য তিনি অফিসে গেলেন না। অথচ চাদনী তার সাথে কথায় বলতে পারলো না তেমন একটা। ও সবার ভীড়েও একটা মানুষকে ভুলতে পারছিলো না কোনোমতেই।বাড়ির সবার সাথে হাসিখুশি কথা বলার কথা থাকলেও, ও সারাক্ষণ উদাস হয়ে বসেছিলো নিজের কক্ষে। কিছু একটা যেন ভাবছিলো সারাক্ষণ। আকিব শিকদার খালি খেয়াল করছিলেন ওঁকে। ঢাকা থেকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করা মেয়েটা আর ফিরে আসার পর উদাস হয়ে বসে থাকা মেয়েটার মধ্যে অনেক পার্থক্য! উনি মিল পাচ্ছিলেন না কোনোমতেই। চাদনীর কাকে এতো মনে পরছে? যার থেকে এতোদিন ছুটতে চাচ্ছিলো তাকেই? তাহলে এতো অভিযোগ আঁধারের বিরুদ্ধে কেন করলো ও?

দুপুরে খাবারের পর ঘুমিয়েছিলো চাদনী। সে ঘুম ভাঙলো ওর সন্ধ্যায়। কোনোমতে চোখ দু’টো টেনে খুলে উঠে বসলো ও।কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো চারপাশে তাকিয়ে দেখলো কিছুটা আলো আধারের সংমিশ্রণ ঘরময় জুড়ে!যেমনটা সন্ধ্যায় থাকে। জানালা আর বেলকনির দরজা খোলা।তা দিয়ে নিভু নিভু আলো প্রবেশ করছে।ক’টা বাজে এখন?সন্ধ্যা হয়ে গেছে? চাদনী বিছানা হাতড়ে নিজের ফোন হাতে নিলো। সন্ধ্যা পাঁচটা বেজে পয়ত্রিশ মিনিট। এখন শীতের সময়। পাঁচটা পেরোতেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে নেমে কক্ষের দরজা খুললো চাদনী।
নিচ থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে।ড্রইংরুমে মিটিং বসেছে বোঝা যাচ্ছে। চাদনীর মনে হলো অনেকগুলো কন্ঠের আড়ালে আঁধারের কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে ও। ঘুমের ঘোরে হয়তো। নয়তো ওর ভ্রম।আঁধার কোত্থেকে আসবে? ওর তো এক্সাম। এখান থেকে অনেক যোজন যোজন দূরে ও। চাদনী চাইলেই ওর কন্ঠ শুনতে পারবে না। উফ! কি যে জালা! ভালোবাসার এতো জালা কেনো? এতোটাই ভাবছে ও আঁধারের কথা যে ভ্রম হচ্ছে ওর। কল্পনায় আঁধারের কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে। দেটস নট ফেয়ার। এটা তো অন্যায়। চাদনী কেন ওই শয়তান ছেলেটার কথা ভাববে! নাহ আর ভাবা যাবে না।

কাজলরেখা পর্ব ৩৫

চাদনী মুখ ধুয়ে এলো। ধীর পায়ে বারান্দা ধরে হাঁটতে লাগলো। তবে যতোই ও ড্রইংরুমের কাছাকাছি যেতে থাকলো, ততোই ওর মনে হতে থাকলো আঁধারের কন্ঠটা গাঢ় হচ্ছে।এবার চাদনীর মনে হচ্ছে এটা কল্পনা বা ভ্রম না। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? আঁধার কী করে আসতে পারে এখানে? চাদনী মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো ওর কথা। ড্রইং রুমে সোফার উপর, ওর বড় বাবা, মেঝ বাবা আর বাবা বসে আছে। আর সিড়ির কাছের সোফায়টায় কে? চাদনী উঁকি দিয়ে চেয়ে চেয়ে নিচে নামলো। কিন্তু অর্ধেক আসতেই
চাদনীর পা থেমে গেলো। সোফার উপর কে বসে আছে? আঁধার ভাই। এতোটা স্পষ্ট তো কল্পনা হয় না। ওর দিকে চোখ পরতেই চেচিয়ে বললো
-“এসেছিস! বাপরে, তোর ঘুম! ফাইনালি ভাঙলো!নিচে আয়, জলদি।”
-“আঁধার ভাই।”

কাজলরেখা পর্ব ৩৭

1 COMMENT

Comments are closed.