কাজলরেখা পর্ব ৪২
তানজিনা ইসলাম
চাদনী পা ঝুলিয়ে বিছানার উপর বসে আছে। সমান তালে নাক ফুলাচ্ছে ও। আঁধার কোমড়ে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
-“এভাবে সাপেে মতো ফোঁসফোঁস করছিস কেন?”
চাদনী ফুঁসে তাকালো। বললো
-“খুব তো আমার উপর চোটপাট দেখাও।অথচ অর্পিতা আপুকে একটা কিছু বললে না। না, অর্পিতা আপুকে কিছু বলার সাধ্য নাই তোমার? আমি দুর্বল বলে সব জোরজবরদস্তি আমার সাথে?”
-“জবরদস্তি করেছি তোর সাথে? কখন? হ্যাঁ, তোর উপর সবকিছু গছিয়ে দিই মানছি। অধিকার আছে তাই। আর অর্পিতার বিষয় নিয়ে যদি বলিস, ব্যাপারটা এখনো শেষ হয়নি।সব কিছু জমা করে রাখছি। ওরে যেদিন পাকড়াও করবো না, ওর বাপও ওরে বাচাইতে পারবে না।”
-“হ্যাঁ, খালি মুখেই।”
-“কাজেও করে দেখাবে। তুই এভাবে ফোঁসফোঁস করিস না। শ্বাস আঁটকে মারা যাবি তো। অল্প বয়সে বিধবা হতে হবে আমাকে।”
-“ওটা মেয়েরা হয়।”
-“ছেলেরা কী হয়?”
-“ধুর! তোমার ফালতু কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না আমার।”
চাদনী শুয়ে পরলো। আঁধার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার উপর। চাদনী ভুল কিছু বলেনি। ওর উচিত ছিলো অর্পিতা কে ঠাস করে একটা চড় মারা। এমনভাবে যাতে সব দাঁত নড়ে যায়। বাড়ির একটা মানুষও মেয়েটাকে কিছু বলে না, অথচ চাদনীকে উঠতে বসতে কথা শোনায়। আজ যা হলো, তাতে চাদনীরও মনে হতে পারে, ও নিজেও বাড়ির অন্য সদস্যদের মতো। কিন্তু এমন তো না। ওর অর্পিতা কে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না, জাস্ট মেরে কবর দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ফালতু একটা মেয়ে! মুখ পর্যন্ত দেখতে ইচ্ছে করে না ওর।
চাদনী গুটিশুটি মেরে বিছানার এক কোণায় পরে আছে। মেয়েটা এখনো কেমন যেন বিহেভ করে ওর সাথে। ওঁদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মতো কোনো সম্পর্ক নেই। আঁধার চায়ও না। যেভাবে চলছে, সেভাবে চলুক চাদনী ওর সাথে থাকলেই হলো৷ কিন্তু মেয়েটার এভাবে দূরে দূরে থাকা আঁধার সহ্য করতে পারে না। আঁধার হাত বাড়িয়ে চাদনীর পিঠে হাত রাখলো। চাদনী সরিয়ে দিলো। আঁধার ভ্রু কুচকে বললো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“ইগনোর করছিস কেন? এদিকে ফের।”
-” ধরো না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তোমার সাথে।”
-“কোনদিন ইচ্ছে করে?”
-“কোনোদিন না!”
-“জোর করে ফেরাতে বলছিস? খুব খারাপ হবে বলছি। ইগো দেখাবি না একদম। সব এটিটিউড খালি আমার কাছে।”
-“নতুন কী? সব খারাপ তো আমার সাথেই হয়। কপালে নিয়ে এসেছি যে!”
আঁধার চাদনীকে বোঝানোর ধৈর্য কুলাতে পারলো না। ওর একহাত ধরে টেনে কাছে আনলো। ঝুঁকে পেচিয়ে ধরলো ওকে।
চাদনী ধরফরিয়ে চোখ খুলে তাকালো৷ আঁধার ওর দু-হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বালিশের সাথে চেপে ধরলো। পরপর চাদনীর ঘাড়ের উপর থুঁতনি রেখে লম্বা শ্বাস ফেললো। আতঙ্কে চাদনীর গলা শুকিয়ে এলো। নিঃশ্বাস আঁটকে এলো। বহু চেষ্টা করেও ও একটা শব্দ বের করতে পারলো না মুখ দিয়ে।
-“মনটা ভালো নেই চাঁদ। একটুও না। আমরা ঢাকা কখন যাচ্ছি?”
চাদনী ঢোক গিললো। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে চায়লো। পারলো না।
আঁধার ওর কাঁধে মুখ গুঁজে বললো
-“এমন করিস না আমার সাথে। তুই আমার কথা না শুনলে আমার অনেক খারাপ লাগে। প্লিজ! একটু বোঝ। ওই মেয়েটাকে আমার একটুও সহ্য হয় না৷ যে হাত দিয়ে আমার হাত ধরছে, ওই হাত ভেঙে দিতাম। কিন্তু এতে লাভ নেই, সিম্প্যাথি কুড়িয়ে নেবে বাড়ির সবার। ওরে আমি ওর জামাই দিয়ে শায়েস্তা করাবো। তুই দেখিস চাদনী, আমি সবকিছুর প্রতিশোধ নেবো।”
চাদনী কোনোমতে বললো
-“এতো এক্সকিউজ কেনো দিচ্ছো? আমি বলেছি তো,আমি তোমাকে ট্রাস্ট করি। কথা শেষ।”
-“ট্রাস্ট না করলেও সমস্যা নাই। তোরে আমি কোনো এক্সকিউজ দিচ্ছি না। বুঝলে বুঝ, না বুঝলে নাই।যাই বল,
তুই খুব সুন্দর প্রতিশোধ নিতে জানিস রে! কি সুন্দর খোঁচা একটা মেরে দিলি।”
-“প্রতিশোধ না শোধবোধ।”
-“একই তো। তুই যে কতোবড় ঘাড়ত্যাড়া সেটা এই কয়দিনে ভালোই বুঝেছি আমি।”
-“আগে বোঝোনি?”
-“বুঝেছি। তোকে তো ছোটবেলা থেকে দেখছি। কিন্তু ইদানীং তোর জেদগুলো এতো বেড়েছে।”
-“হাহ! আমার জেদ সহ্য করতে বলেছে কেও তোমাকে?”
-“নাহ,বলেনি কেও। তবুও তো সহ্য করতে হবে। তোরে ছাড়া যে যাইতে পারছি না এখান থেকে। তুই তো আমার সুয়ান (Swan)।”
-“মানে?”
-“রাজহাঁস। রাজহাঁসের কাহিণী জানিস! রাজহাঁস কখনো তার জুটিকে ছাড়া থাকতে পারে না। যখন তার জুটি মারা যায়, তখন সে দুঃখে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়, খুব চুপচাপ একলা একলা থাকে, ডিপ্রেশনের মতো আচরণ করে। আর একসময় একাকীত্বে মারা যায়।”
চাদনীর অস্বস্তি হচ্ছে। ওর একটুও ভালো লাগছে না। আঁধারের সাথে ওর সম্পর্কটা কেমন যেন! চাদনী এসব নিতে পারে না। খারাপ লাগে ওর,অস্বস্তি হয়। ও সবসময় চায় আঁধার ওর সাথে নর্মাল বিহেভ করুক,এভাবে কাছে না আসুক। আঁধারের কাছে আসা সহ্য করতে পারে না ও। চাদনী মিনতি করে বললো
-“আঁধার ভাই, উঠো।বালিশে ঘুমাও। প্লিজ, আমার একটুও ভালো লাগছে না।”
-“তোর মতো পিচ্চিরে বিয়ে করে এভাবে কপাল টা না পোড়ালেও পারতাম আমি!”
আঁধার উঠে বসলো। চাদনী এতোক্ষণে হাফ ছেড়ে বাচলো।
আঁধার শয়তানি হাসলো ওর দিকে তাকিয়ে। চাদনী কাচুমাচু মুখ করে ফেললো। বাচ্চাদের মতো করে বললো
-“প্লিজ তুমি এরকম করবে না। আমার অস্বস্তি হয়।”
আঁধার কপালে হাত রাখলো ওর। বেবিহেয়ারগুলো সরিয়ে বললো
-“ঘুম।”
-“তুমি বলো আর এরকম করবে না।”
-“ঘুমা।”
চাদনী চোখ বন্ধ করলো। ওর বুক ধরফর করছে এখনো। ও ঢোক গিললো। আঁধার দেখলো তা স্পষ্ট। হেঁসে ফেললো ও।
চাদনীর চুলগুলো অনেক লম্বা, কোমড় ছাড়িয়ে যায়। অনেক ঘন, কালো কুচকুচে। রূপাঞ্জেল এর মতো। কিউট! যদিও রূপাঞ্জেলের চুল সোনালী, তবুও আঁধারের এমন মনে হয়।আঁধার ওর চুলগুলো হাতে পেঁচিয়ে নিলো।
চাদনী বলে ও না-কি চাদনী কে পুতুলের মতো ট্রিট করে। আসলে এমন না।কিন্তু চাদনীকে ওর কাছে একটা পুতুলের মতোই লাগে। যাকে নিয়ে ও সারাক্ষণ সাথে সাথে ঘুরবে। যে সবসময় ওর সাথে থাকবে। ওর কথা মানবে। ও যা বলবে তা শুনবে। বেস এটুকুই তো চায় ও। যদিও তা ঠিক না, চাদনী তো মানুষ, পুতুল না! ওরও নিজের কিছু ইচ্ছে আছে। স্বপ্ন আছে। ও কেন সবসময় আঁধারের কথামতো চলবে!
কিন্তু আঁধার এটা নিজেকেই বোঝাতে পারে না।কোনোকিছু নিয়ে হুটহাট রেগে যায়। মিসবিহেভ করে।
ও রাগটা যত সুন্দর করে প্রকাশ করতে পারে, ভালোবাসাটা পারে না। মনে হয় এটা করলেই বুঝি মানুষ ওঁকে দুর্বল ভাববে। ও খুব লুকিয়ে চুরিয়ে ভালোবাসে। বিপরীত পাশের মানুষটা যাতে বুঝতে না পারে সেভাবে। তার জন্য ও ছ্যাচড়ামো করে, বেহায়া হয়ে যায়। অথচ এসব করেও কিভাবে যেন নিজের ইগোটাকে উপরে রাখতে চায়। পারে না! হেরে যায়! ইগো আর ভালোবাসা কখনো একই সাথে জিততে পারে না।ও তো অনেক আগেই হেরে গেছে চাদনীর কাছে।শুধু সেটা স্বীকার করা যাবে না। স্বীকার করলেই আঁধার হেরে যাবে। ও নিজের হেরে যাওয়া মানতে পারবে না।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চাদনী খবর পেলো, ওর নানুবাড়ি থেকে কল এসেছিলো। আকিব শিকদারের সাথে গতকাল রাতে ওর নানুভাই যোগাযোগ করেছে। ওঁদের যেতে বলেছে আজ। চাদনীর বুঝ হওয়ার পর থেকে ও নিজের নানুবাড়ি সম্পর্কে কোনোদিন কিছু শোনেনি। ওর যে আদোও একটা নানুবাড়ি আছে,সেখানে হয়তো ওর মায়ের মা-বাবা আছে সেটাও ভুলে বসেছিলো ও। কিন্তু আকিব শিকদার থেকে খবরটা পেয়ে ও কী রিয়াকশন দেবে সেটাই ভুলে গেলো।
আকিব শিকদার সোফায় বসে চা খাচ্ছেন। চাদনী সোফার উপর দুপা তুলে, বসে আছে ওনার পাশে। একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে খালি। আকিব শিকদার বিরক্ত না হয়ে উত্তর দিচ্ছেন। উনি চাদনীর প্রশ্নে কখনো বিরক্ত হন না। চাদনী সারাদিন ওনার কানের কাছে প্যানপ্যান করলেও উনি বাচ্চাদের মতো বুঝিয়ে বলবেন।
-“তোমাকে কল কখন করেছিলো?”
-“গতকাল রাতে। তোমার নানুভাইয়া কল করেছিলো। তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে সেখানে।”
চাদনী অবাক হয়ে বললো
-“আমার নানুরবাড়ি আছে বাবা? নানুভাই আছে! আর কে কে আছে?”
-“হুম আছে তো। সব আছে তোমার। তোমার নানুভাইয়া আছে, খালামনি আছে।”
-“নানুমা,মামা?”
-“মামা নেই। নানুমা মারা গেছে।”
-“ভুল বললে তো। সবাই থেকেও কেও থাকে না আমার কেমন যেন!আম্মু চলে যাওয়ার পর থেকেই সবাই এমন কেন করে আমার সাথে!”
চাদনী মলিন হাসলো। আকিব শিকদার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
-“কেন মন খারাপ করছো আম্মা! আমি আছি তো। এখন তো নানুরবাড়িও আছে।”
-“নানুভাই তো কোনোদিন একবার আমার খোঁজও নিলো না। এতোবছর পর হঠাৎ!”
-“সেটাতো আমিও বুঝতে পারছি না। এতোবছর পর কেন? কিন্তু সে কখনো আমারও খোঁজ নেয়নি। উনি কোনোদিন আমাকে মানতেই পারেনি। তোমার আম্মাকে বিয়ে করা আমার জন্য একটা অপরাধ ছিলো।”
-“কেন অপরাধ ছিলো? ভালোবাসা অপরাধ?”
-“নাহ। কিন্তু নিজের চেয়ে হাই ক্লাসের কাওকে চাওয়া অপরাধ। তোমার আম্মার সাথে আমার যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন ছেলে ছিলাম। যার সমাজে কোনো স্ট্যান্ডার্ড ছিলো না,আমি তখন স্টুডেন্ট ছিলাম। তোমার আম্মা আমাকে সেভাবে মেনে নিলেও তোমার নানুভাইয়া পারেনি। ওরা তখন অনেক বড়লোক ছিলো। ফ্যামিলির রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো। আমার মতো একটা ছেলেকে মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক নয়কি! বাট তোমার আম্মু আমার লাকি চার্ম ছিলো। ওঁকে বিয়ে করার পরই আমার সবকিছু বদলে যায়। ও অনেক ভাগ্যবতী ছিলো। জানো, আমি এখনো মানি, এই যে এতো বিজনেস, জায়গা-জমি সম্পত্তি হুট করেই হয়ে গেলো। সব তোমার আম্মুর জন্য।”
চাদনী গালে হাত রেখে মনোযোগ দিয়ে শুনলো প্রতিটা কথা।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-“ওরা আমাদেরকে যেতে বলেছে?
-“হুম। তোমার নানুভাইয়া আমাকে, তোমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে বলেছে।”
-“আমার খুশি হওয়া উচিত? না দুঃখ পাওয়া উচিত?”
-“কীরকম?”
-“খুশি কেন হবো? এতোবছর পর নানুরবাড়ির খোঁজ পেয়েছি সেজন্য। না আমাদেরকে এতোগুলো বছর ওরা একটুকু দাম দিলো না সেজন্য দুঃখ পাবো?”
-“তোমার মন কী বলছে?”
-“আমার মন বলছে, খুশিতে একটা চিল্লানি দিতে। ইশ! আমার এতোগুলো মানুষ আছে।”
-“তাহলে খুশিতে একটা চিল্লানি দাও। নিজের খুশিটা কারো সাথে ভাগ করে আসো। খুশি ভাগ করলেই বেড়ে যায়।”
-“কাকে জানাবো? বাড়ির কারো সাথেই আমার তেমন কানেকশন নেই।”
-“তিনতলায় নিজের কক্ষে যাও। কল করে নিজের কোনো ফ্রেন্ডকে বলো। বা তোমার ঝগড়ার পার্টনার কে বলতে পারো।”
-“ঘুমাচ্ছে।”
-“ঘুম থেকে টেনে তুলে, খবরটা দাও। এটা অন্যরকমই একটা মজা।’
চাদনী দৌড়ে উপরে গেলো। আঁধার তখন উপুড় হয়ে পরে পরে ঘুমাচ্ছিলো।চাদনী গিয়ে ওর বাহু ধরে টানাটানি করতে থাকলো। উদগ্রীব স্বরে বলতে থাকলো
-“আঁধার ভাই, তুমি ঘুমাচ্ছো। এদিকে জানো কী হয়েছে? উঠো, উঠো বলছি। ইশ! আমার তর সইছে না জানানোর জন্য। এই উঠো না।”
আঁধার ঘুমোঘুমো চোখ নিয়ে দেখলো ওকে।ঘুমের তোড়ে চোখের পাতা টেনে খুলতে পারছে না ও। আঁধারের ঘুমঘুম মুখ দেখে মায়া হলো না চাদনীর। আঁধার আবার শুতে গেলে বাঁধা দিলো ওঁকে। আঁধার হামি তুলে বললো
-“চোখে সব ঝাপসা দেখছি।”
-“মুখ ধুয়ে আসো, তোমাকে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলো।”
-“ধুর! পারবো না। আল্লাহ, আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে দে।”
-“না আগে আমার কথা শোনো।”
-“বল, শুনছি।”
আঁধার ঝিমোতে থাকলো। চাদনী চেঁচিয়ে বললো
-“মনোযোগ দিয়ে শুনছো না কেন তুমি?”
আঁধার বহু কষ্টে চোখের পাতা টেনে খুলে তাকালো। চাদনীর মুখ হাসিহাসি।আঁধার আবার হামি তুললো। বললো
-“হু, শুনছি।”
চাদনী খুশিতে গদগদ হয়ে বললো
-“জানো আঁধার ভাই, আজকে আমি নানুর বাসায় যাবো।”
-“ভালো তো। যা।”
-“আমি অনেক এক্সাইটেড! তোমার কী মনে হয় ওখানে আমার কাজিনরা থাকবে? বাপের গুষ্টির কোনো কাজিনের সাথে তো আমার বনিবনা নাই। ওখানে গিয়ে মনমতো কাওকে পেলে মন্দ হবে না।”
আঁধার ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে বললো
-“মনমতো মানে? কী ইঙ্গিত করলি?”
-“ধুর! উল্টাপাল্টা বোঝো খালি। নতুন কিছু মানুষ কে পাবো,ওদের সাথে ভালো বন্ডিং হবে আমার। তোমার মতো আমারও অনেক কাজিন থাকবে, যারা আমাকে ভালোবাসবে। এটা ভেবেই তো আপ্লুত হয়ে যাচ্ছি আমি।”
-“এটাকে কী বলে জানিস! গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। এতোকিছু আগেভাগে ভেবে নিলে,গিয়ে দেখবি ছোটমার আর কোনো ভাইবোনই নেই।”
-“নাহ এমন হবে না। কেও তো থাকবেই।”
আঁধার কিছুক্ষণ নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। শাসিয়ে বললো
-“থাকলেও দূরে থাকবি। বিশ্বাস কর, উল্টাপাল্টা কোনো কথা যদি আমার কানে আসে না, তোর অবস্থা আমি কী করবো আমি নিজেও জানি না! আমি ব্যাতিত তোর আর কোনো কাজিন নাই। থাকতে পারে না। থাকলেও তার কোনো ভ্যেলু নেই। কারণ সব ভ্যেলু আমার।যা, দূর হ।”
আঁধার আবার ব্ল্যাঙ্কেট মুড়িয়ে শুয়ে পরলো। চাদনী মুখ লটকে বেরিয়ে গেলো।
আকিব শিকদার সিদ্ধান্ত নিলেন, সন্ধ্যায় একবার চাদনীকে নিয়ে চারিয়া যাবেন। ওনার নিজেরই ঠিক লাগছে না বিষয়টা। এতোবছর পর, হঠাৎ করে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোত্থেকে উদয় হয়ে গেলো! কিন্তু সকাল এগারোটার দিকে ওনার শ্বশুরমশাই আবারো কল করলেন ওনাকে। বারংবার বললেন চাদনীকে নিয়ে উনি যাতে দুপুরের দিকে যায়। লাঞ্চ টা যাতে সেখানে করে। প্রথমবার তারা ওই বাড়িতে যাবে। একটু তো যত্নআত্তি করার সুযোগ দিতে হবে।বিষয়টা চাদনীকে জানালেন তিনি। দুপুর একটার মধ্যে যাতে চাদনী রেডি হয়ে থাকে।
চাদনী ঘাড় বাকিয়ে সম্মতি দিলো। আবার চিন্তিত স্বরে বললো
-“আম্মু মারা যাওয়ার পর, আমাদের সাথে একবার যোগাযোগ পর্যন্ত করেনি ওরা।তোমাকে পর্যন্ত একবার যেতে বলেনি। এখন এতো বছর পর এসে আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে বলছে। কী কারণ থাকতে পারে বাবা?
যাওয়া কী ঠিক হবে?”
-“ঠিক ভুল তো বুঝে উঠতে পারছি না আম্মা। আমার নিজেরও যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমার আম্মু বেঁচে থাকতেই যাইনি কোনোদিন। শুধু ওঁকে গেইটে নামিয়ে দিয়ে আমি চলে আসতাম।তোমার নানুভাই কখনো আমাকে ভেতরে ডাকেনি। তবুও আমি যাচ্ছি, এতো অবজ্ঞার পরও। কেন জানো? তোমার আম্মুর জন্য। বেঁচে থাকতে তার এই একটায় ইচ্ছে ছিলো, তার বাবা আমাকে মেনে নেবে। সে বেঁচে নেই, কিন্তু তার ইচ্ছে টুকু আমি বাঁচিয়ে রাখি। এটলিস্ট দেখে আসি, কেন ডাকা হচ্ছে আমাদের। তোমার মায়ের কথা ভেবে হলেও চলো।”
বাড়ির সবাই ভীষণ ভাবে অবাক হলো কথাটা শুনে।এতোবছর পর আকিব শিকদারের শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোত্থেকে উদয় হয়ে গেলো।
আঁধার ততোটা মাথা ঘামালো না। উদয় হতেই পারে। এটা এমন আশ্চর্যের বিষয় কী? অনেক বছর পেরিয়ে গেলে মানুষের মস্তিষ্কে সুবুদ্ধির উদয় হয়। সেভাবেই হয়তো ওর শ্বশুরের তার শ্বশুরের সুবুদ্ধি উদয় হয়েছে। তাই হয়তো এতোবছর পর নাতনি আর মেয়ে জামাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন। অনেক কিছুই হতে পারে।
চাদনী দুপুরে রেডি হয়ে নিচে নামলো। ওর পরণে একটা হাফ গাউন।চোখে কাজল দিয়ে,চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে।
আঁধার বড় বড় চোখ করে দেখলো ওঁকে। পাশ ঘেঁষে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো
-“মনে হচ্ছে মামারবাড়ি না, শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিস। এতো সেজেগুজে এসেছিস কেন?”
-“কোথায় সাজলাম? শুধু কাজল দিয়েছি।”
-“তোকে না কাজল দিতে মানা করেছি। এরপরও অবাধ্য হচ্ছিস তুই!”
-“বাইরে কোথাও তো যাচ্ছি না। নানুরবাড়ি যাচ্ছি, কাজল দিলে সমস্যা কী!”
-“অনেক সমস্যা। কাজল মুছে ফেল। চুল বেঁধে যা। চুলটুল খুলে নায়িকা হয়ে যাচ্ছে, আহারে! ঢং এর আর শেষ নাই।”
কাজলরেখা পর্ব ৪১ (৩)
-“হ্যাঁ। ঢং কী শুধু তুমি করতে পারো না-কি? আমিও করবো এখন থেকে ঢং।পারলে আঁটকে দেখাও।”
চাদনী হাত দিয়ে চুল সরিয়ে আকিব শিকদারের কাছে এগিয়ে গেলো।আঁধারের চোখে ওর খোলা চুলগুলো খুব বিঁধলো। চুলগুলো খোলা রাখলে চাদনীকে খুব সুন্দর দেখায়। আঁধার কখনো বলেনি।কিন্তু ওর খুব পছন্দ চাদনীর চুলগুলো। আঁধারের মন চায়লো কাঁচি এনে চাদনীর চুলগুলো কেটে দিতে। তাহলে ও আর অন্য কাওকে ঢং দেখাতে পারবে না। দিলো না। চাদনী মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদবে। আকাশ-পাতাল কেঁপে উঠবে ওর কান্নায়। তারপর ওর সাথে আর ঢাকা যাবে না। হয়তো আকিব শিকদারকে ডিভোর্সের কথাও বলতে পারে। বিশ্বাস নেই।চাদনীর কাছে আঁধারের চেয়েও ওর চুলগুলো বেশি দামী। আঁধার বুকে পাথর চাপা দিয়ে বিদায় দিলো ওঁদের কে। পুরোদিন মুখটা পেঁচার মতো করে রাখলো। যেন এই দুনিয়ায় ওর চেয়ে অসহায় মানুষ আর একটাও নেই। ও বউ ছাড়া এতিম একটা ছেলে, অচেনা একটা জায়গায় ওঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

apo part gola taratari diyo tumar pathikara w8 kre