কাজলরেখা পর্ব ৬২ (২)
তানজিনা ইসলাম
আঁধারকে আইসিউতে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। ওর খুব ক্রিটিকাল অবস্থা। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে ও। ব্রেইন হেমারেজ হচ্ছে। জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত ডক্টররা বলতে পারছেন না, অপারেশন সাকসেসফুল কি-না।
আমান আর মাহাদী চিন্তিত মুখে বসে আছে। ওরা কাচ দেওয়ালের বাইরে থেকে একঝলক দেখে এসেছে আঁধারকে। মাহাদী আমানের হাতের উপর হাত রাখলো। একে অন্যের দিকে তাকালো। আমানের চোখে পানি টলমল করছে। তটিনী বারবার কল করছে। ওঁকে আমান জানিয়েছে আঁধারের এক্সিডেন্টের কথা। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে ওরা রিসিভ করে খবরটাও দিতে পারছে না। চাঁদনী স্তব্ধ হয়ে বসে আছে চেয়ারে। অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। ও নিশ্বাস বন্ধ করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। আকিব শিকদার ওর কাঁধে হাত রাখলেন। চাঁদনী কেঁপে উঠলো। ও এতোক্ষণ বিরতিহীন কাদছিলো। এখন ওর শব্দ করে কান্নাও আসছে না। ও শুধু ভঙ্গুর হৃদয়ে বসে আছে মেঝের দিকে চেয়ে। টপটপ করে চোখের জল গড়িয়ে পরছে মেঝেতে, নিঃশব্দে।
আকিব শিকদার আঁধারকে দেখতে গেলেন। ওঁকে আইসিইউ তে শিফট করা হয়েছে। আমান আর মাহাদীও একে একে গিয়ে দেখে এলো ওঁকে।
চাদনী উঠলো না, পাথর হয়ে বসে রইলো। বিধ্বস্ত আঁধার কে দেখার শক্তি ওর নেই। সবসময় হম্বিতম্বি, চেঁচামেচি করা মানুষটা নিশ্চুপ হয়ে থাকবে, চাঁদনী তাকে কিভাবে দেখবে। তবুও আকিব শিকদার বেরোনোর পর ওর মন মানলো না। ও শুধু ঝাপ্সা চোখে তাকালো তার দিকে। আকিব শিকদার ইশারায় বললেন গিয়ে দেখে আসতে।
চাঁদনী ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো আইসিউর দিকে। কাচের দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস এসে ওর গায়ে লাগে। চাঁদনী কেঁপে উঠে। স্যালাইনের টপটপ করে পরার শব্দ হচ্ছে শুধু। পিনপতন নীরবতা কক্ষে। হার্ট রেইট মেশিনের দাগগুলো খুব ধীরে উঠানামা করছে।
চাদনীর ভেতর থেকে কান্নারা ঠেলে আসলো। চাঁদনী ঢোক গিলে হিচকি আটকালো। নার্স বলেছে টু শব্দ পর্যন্ত করা যাবে না, কান্নাতো দুর। চাঁদনী বেডের কাছে দাঁড়ালো, কিন্তু বসলো না।
নিস্তেজ, নিস্তব্ধ আঁধার ভাইকে দেখতে চাঁদনীর একটুও ভালো লাগলো না। সবসময় হম্বিতম্বি, চেঁচামেচি করা মানুষটা এতোটা চুপচাপ হয়ে গেছে। পুরো মুখ জুড়ে বেন্ডেজ। বেন্ডেজের জন্য চোখ দু’টো বাদে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চুলগুলোও কেটে ফেলা হয়েছে।
চাঁদনী কাঁপা হাত ওর বেন্ডেজে মোড়ানো মুখের উপর রাখলো। চাদনী মুখের উপর হাত দিয়ে কান্না আটকালো। ও তো চায়নি এমন হোক। ও কক্ষণো চায়নি। হ্যাঁ, ও প্রথম দিকে অনেক অভিশাপ দিয়েছে আঁধারকে। সত্যিই দিয়েছে। আঁধার তো একবার দেখেও ফেলেছিলো, ওঁকে নামাজ পড়ে কাঁদতে। চাঁদনী কথা ঘুরিয়ে বলেছিলো ওর বাড়ির কথা মনে পরছে। কিন্তু ও সৃষ্টিকর্তার কাছে আঁধারের থেকে মুক্তি চেয়েছিলো। মুখে বদদোয়া না দিলেও মন থেকে বদদোয়া এসেছিলো। কিন্তু ও এভাবে তো চায়নি। চায়নি, আঁধারের এমন অবস্থা হোক।
চাঁদনী ফিসফিসিয়ে ডাকলো,
-“আঁধার ভাই। ওই,
কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে ঢোক গিলে বললো
-“কথা বলবা না? রাগ করেছো? সরি তো।
-“তোমার মুখ যে আমি দেখতে পারছি না। তোমার এতো সুন্দর মুখটা যে ওরা সাদা বেন্ডেজ দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। আঁধার ভাই,
চাঁদনী আবার ঢোক গিললো। ওর কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপ্সা হয়ে যাচ্ছে বারবার। আঁধারের ক্যানোলা লাগানো হাত টা ও নিজের হাতে তুললো। আলতো চেপে ধরে বললো
কাজলরেখা পর্ব ৬২
-“তুমি না বলেছিলে আমাকে কখনো ছাড়বা না। মুক্তি দিবা না। আমি কোথাও যেতে পারবো না তোমাকে ছেড়ে। তাহলে এখন তুমি কেনো ছেড়ে যাচ্ছো? কোথায় যাচ্ছো আমাকে ছেড়ে? তুমি বলেছিলে না, আমার কোথাও জায়গা হবে না তুমি ছাড়া না। আমার জায়গা হবে না আঁধার ভাই। আমাকে কেও জায়গা দেবে না। এই, শোনো। যেও না প্লিজ। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি কোথায় যাবো! হারিয়ে যাইয়ো না প্লিজ। থেকে যাও৷ থেকে যাও আঁধার ভাই। আঁধার ছাড়া তো চাঁদের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার অস্তিত্ব বিলীন করে দিও না।
