Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৪ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৪ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৪ (২)
তানজিনা ইসলাম

আআআআ করে চিল্লিয়ে উঠে বসলো চাদনী। ওর হাত পা থরথরিয়ে কাপছে। বুকের মধ্যে কাপনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এই শীতের রাতেও দরদরিয়ে ঘামছে ও। চাদনী চোখের সামনে ঝাপ্সা দেখলো৷ চোখের পানিতে কিছুতে দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার লাগছে সব, কেমন যেন ঘোলাটে। স্বপ্ন, কল্পনা আর বাস্তবতা মাঝে অবস্থান করা চাদনী নিজের অবস্হান সম্পর্কে অজ্ঞাত।

চাদনী ব্যকুল হয়ে বিছানা থেকে নামতে যাবে তার আগেই কেও একজন চেপে ধরলো ওঁকে।
চাদনী পিছু ফিরে, চোখ তুলে তাকালো আঁধারের দিকে৷ চোখ দিয়ে অবিকল ধারায় পানি গড়িয়ে পরছে। আঁধার কিছু না বলে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো ওঁকে। চাদনী দু’হাতে ঝাপ্টে জড়িয়ে ধরলো। বুকের মধ্যে ঢুকে যেতে চায়লো যেন। চোখের পানিতে টিশার্ট ভিজে গেলো আঁধারের। আঁধার প্রশ্ন করতে থাকলো

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“চাঁদ, এই চাঁদ। কী হয়েছে তোর? চেচালি কেন?
বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?”
চাদনী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। ওর চোখে মুখে আতঙ্কিত ভাব। আঁধার কে ভয় পাচ্ছে ও। আঁধারের বুঝে আসলো না ওর ভয় পাওয়ার কারণ। মৃদু কাঁপছে ও এখনো। আঁধার দু’হাতে আজলে নিলো ওর মুখ।চটচটে ভেজা গাল চেপে ধরে বললো
-“কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন? বল আমাকে। কী হয়েছে বাচ্চা? এভরিথিং ইজ ওঁকে? ভয় কেন পাচ্ছিস? আশ্চর্য! কাঁপছিস কেন এভাবে?
চাদনী হুহু করে কেঁদে দিলো। আঁধার উতলা হয়ে একের পর এক প্রশ্ন করছে ওর থেকে।ওর আদলে রাগের ছিটেফোঁটাও নেই। কতোটা ইনোসেন্ট লাগছে ওঁকে! অথচ স্বপ্নের আঁধার ভাই কতটা ভয়ঙ্কর ছিলো!
আঁধার বারংবার প্রশ্ন করে যাচ্ছে। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে। চাদনী শান্ত হচ্ছে না। ও হিচকি তুলে কাঁদছে।

-“চাঁদ, কী হয়েছে ইয়ার বলনা! না বললে কী করে বুঝবো?”
চাদনী হিচকি তুলে বললো
-“আমি আর কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে কথা বলবো না দাদাভাই। আর কক্ষোনো কোনো ছেলের কথা বলবো না তোমাকে। নেতাসাহেবের কথাও বলবো না।”
-“আরে বাবা, কী হয়েছে? বলবি তো আমাকে। নেতা-ফেতা কোত্থেকে আসছে এখানে!”
-“না, কিচ্ছু বলবো না আমি তোমাকে। আমি তোমাকে বলবো না যে নেতাসাহেব আমার কাজিন। ওনার সাথে আমার কথা হয়েছে। বললেই তুমি আমাকে আবার শাস্তি দিবে!”
চাদনী ভয়ের চোটে উল্টাপাল্টা বকছে। ও কী বলছে ও নিজেও জানে না। আঁধার ভ্রু কুচকে তাকালো। বিভ্রান্ত স্বরে বললো

-“কে তোর কাজিন?”
-“কেও না। আমার কোনো কাজিন নেই। আমি একা!”
চাদনী বিরবির করে কি যেন বলতে থাকলো। আঁধার বুঝতে পারছে না ওর এসব পাগলামোর কারণ। একটু পর চাদনী ধরফরিয়ে বললো
-“তুমি এমন করতে পারলে? আমাকে মাটিচাপা দিয়ে দিতে তোমার একবারও বুক কাপলো না, কতটা নিষ্ঠুর তুমি! একটা জ্যন্ত মানুষকে কবর দিয়ে দিচ্ছিলে তুমি! একটু দয়া মায়া হয়নি তোমার!”
আঁধার এবার ধমক দিয়ে বললো

-“পাগল হয়েছিস? কী বলছিস নিজে জানিস। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম।উঠে দেখি, তুই আমার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছিস! এখন উঠে আবার পাগলাম করছিস! এসব পাগলামির মানে কী?”
চাদনী নিজের হাত, পা পরখ করে দেখলো। নাহ, কোনো দড়ি নেই। কক্ষের লাইট জ্বলছে। ও ঘুমের চোটে অন্ধকার দেখেছিলো।আঁধার ভাইকেও খুব শান্ত দেখাচ্ছে।
ঘড়ির কাটায়, মাত্র নয়টা বাজে। তখন তো ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিলো।যতই অন্ধকার হোক,ওদের রাতের খাবারটা খেতে খেতে বারোটা বেজে যায়। নয়টা ওঁদের জন্য মাত্র সন্ধ্যা।
আচ্ছা, এটা স্বপ্ন ছিলো?কি বাজে একটা স্বপ্ন!
আঁধার এখনো ওঁকে জড়িয়ে ধরে আছে। চাদনী গা ছেড়ে দিলো৷ বসে যাওয়া গলায় বললো

-“আমি দেখলাম, তুমি আমাকে মাটিচাপা দিয়ে দিলে।”
-“কেন? এতো বড় শাস্তির কারণ কী?”
-“জানি নাহ, শুধু বলেছিলাম নেতাসাহেব আমার কাজিন। তুমি জানো সে আমার খালাতো ভাই।”
-“জানি, চাচ্চু বলেছে।”
-“এটা কী আমার দোষ?”
আধার শান্ত কন্ঠে বললো

-“তোর দোষ কেন হবে? কাজিন হতেই পারে। পৃথিবীটা গোল। কোথাও না কোথাও আমাদের দেখা হয়ে যায়, আচমকা একটা সম্পর্কে জড়িয়ে যাই আমরা। যেমন ধর, তোর সাথে কী আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো? কিন্তু এখন তুই আমার বউ।কতগুলো মাস আমরা একসাথে আছি। স্বামী-স্ত্রীর মতো নেই, ওটা আলাদা ব্যাপার।তোকে আমি বউ বলে মানতাম না, কষ্ট দিতাম।এখনো দিই হয়তো। তবুও তোকে একপলক না দেখলে আমার কতটা অসহায় লাগে নিজেকে। সেখানে নেতাসাহেব তোর কাজিন হলেও কী? তোর তো বিয়ে হয়ে গেছে।এজন্য এটা নিয়ে এক্সাইটমেন্টেরও কিছু নেই। রেগে যাওয়ারও কিছু নেই।”
আঁধার খুব বুঝদারের মতো কথা বলছে। অথচ ও একটুও বুঝদার না। সবকিছুতেই হই হই ব্যাপার ওর। কাওকে নিয়ে চাদনী একটু উল্টাপাল্টা বললেই কেমন যেন পাগলাটে হয়ে যায় ও! সিম্পল একটা জিনিস নিয়েও খুব বাজেভাবে রিয়েক্ট করে।
চাদনী ছেড়ে দিলো আঁধার কে। একেতো ঘুমিয়ে ছিলো, তার উপর কান্নাকাটির দরুন চোখমুখ বসে গেছে ওর।

-“পাগল তুই একটা!”
চাদনী অবুঝ স্বরে বললো
-“সবকিছু একদম বাস্তব মনে হচ্ছিলো। আমার এখনো মনে হচ্ছে সব সত্যি সত্যি ঘটেছে আমার সাথে। আমার হাত,পা, মুখ বাধা ছিলো। চারিদিকে সব অন্ধকার, ভয়ঙ্কর ছিলো৷ স্বপ্ন এতোটা বাস্তব হয়?”
-“আরেকবার এসব ফালতু কথা বললে, কানের নিচে চটকানা খাবি আমার।
চাদনী মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবতে থাকলো। আঁধার ওর মাইন্ড ডাইভার্ট করার জন্য বললো
-“চাঁদ, তোর নানুবাড়ির গল্প তো বললি না আমাকে।”

-“স্বপ্নে আমি তওবা খেয়েছি আঁধার ভাই। ভুলেও তোমাকে ওই টপিকে কিছু বলবো না আমি।”
-“আচ্ছা বলিস না। একটু স্বাভাবিক তো হ।অস্বাভাবিক আচরণ করছিস। এসে ড্রেসটা পর্যন্ত বদলাসনি, এখানে ঘুমিয়ে পরলি। এখন এসব পাগলামি করছিস! একটু ফ্রেশ হয়ে নে। স্বপ্ন ছিলো রে বাবা, বোঝ একটু।”
চাদনী কিছু না বলে, ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। আঁধার খেয়াল করলো মেয়েটা এলোমেলো পায়ে হাঁটছে। খুব ভয় পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে। এখনো ভয় কাটেনি।

চাদনী চলেয যেতেই, আঁধার শয়তানি হাসলো। একেই বলে বোধহয়, সাপও মরা ,লাঠিও না ভাঙা। আজকের পর থেকে চাদনী, ভুলেও কখনো কোনো ছেলের কথা বলবে না। কারো দিকে তাকানোর সাহস করবে না। নানুবাড়ির টপিক তো ভুলেই যাবে। এ টপিকটাই মস্তিষ্কের মধ্যে ঘুরতে থাকবে সারাক্ষণ।
হিটার অন করতে হবে৷ আঁধারের পায়ে কাঁদা লেগে আছে।ধুতে হবে। শীতের রাতের কনকনে ঠান্ডা পানি গায়ে লাগানোর সাহস নেই। আঁধার হিটার অন করতে গেলো।
মজার ব্যাপার হচ্ছে তানজিনা নিজেও জানে না, আদোও ওটা চাদনীর স্বপ্ন ছিলো, না সত্যিই আঁধার ওঁকে ওর বেয়াদবির শাস্তি দিয়েছিলো!

আকিব শিকদার সোফায় বসে আছেন। আঁধার এসে ওনার পাশে বসলো। টেবিলে অর্পিতার জামাই বসে রাতের খাবার খাচ্ছে। জবা বেগম হরেকরকমের তরকারি তুলে পরম যত্নে খাওয়াচ্ছে তাকে। ইদানীং সে, বাড়ির অন্য সদস্যদের সাথে মেয়ে জামাইকে বসতে দেয় না। আজকের পর থেকে তো নিজেও বসবে না। আঁধারের মনে হচ্ছে থুব শীঘ্রই উনি বাড়ি ভাগের কথা বলবেন। আঁধার চায় না বাড়িটা ভাগ হোক। যতোই ও এ বাড়িতে না থাকুক তবুও সবার মিলেমিশে থাকাটাকে ও খুব ভালোবাসে। কিন্তু স্বার্থপর আপনজনের সাথে কী আদোও থাকা যায়? যারা শুধু নিজেদের ব্যাপারটা বোঝে আরেকজনের ভালো থাকা কেড়ে নিয়ে। যা হবে হোক, আঁধার সদা প্রস্তুত ঝামেলা বাড়ানোর জন্য।
আকিব শিকদার আঁড়চোখে দেখলেন আধারকে।আঁধার চোখমুখ কুঁচকে দেখলে অর্পিতার জামাইকে। উনি বললেন

-“কিছু বলবে?”
আঁধার না তাকিয়ে বললো
-“অর্পিতার জামাইটাকে দেখলে না,আমার খুব আফসোস হয় জানো। কী সুন্দর শ্বশুরের বাড়িতে বসে বসে আরাম করে খাচ্ছে! কতো আদর আপ্যায়ন পাচ্ছে!”
-“আমারও!”
আঁধার তাকালো এবার। উৎফুল্ল হয়ে বললো
-“সত্যি?”
-“হু। শ্বশুরবাড়ির আদর-আপ্যায়ন তো আমিও পেলাম না। ওর এতো খাতির যত্ন দেখে খুব হিংসে হয় যায় বলো।”
আঁধার পাঁংশুটে মুখে বললো

-“অন্তত একদিনের জন্য হলেও তুমি শ্বশুরবাড়ির আদর পেলে। অথচ আমাকে দেখো। এটা আমার শ্বশুরবাড়ি না চাচ্চু? কেও আমাকে এক পয়সার দাম দেয় না। তোমার উচিত না এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্হা নেওয়া!ওরা তো পারে না,ওদের মেয়ে জামাইকে মাথায় তুলে রাখতে। পারলে মেঝোবাবা ওই ষাঁড় টাকে কোলে নিয়ে কোলে বসে থাকতো! তুমি তোমার মেয়ের জামাইয়ের জন্য কিছু করতে পারলে না?”আমি কী দোষ করলাম!”
-“আচ্ছা? বলেন, আপনার জন্য কী করতে পারি আমি?”
-“তুমি কী করবে? দেখো, মেঝোমা কতো আদর-আপ্যায়ন করছে। আমার শ্বাশুরি নেই বলেই, কেও আমার কদর করছে না। এই আফসোস আমি কোথায় রাখবো বলো।”

-“তুই বলনা বাপ, তোর কী কদর চায়?”
আঁধার হাসিমুখে বললো
-“বিয়ে করে আমার জন্য শ্বাশুমা কখন আনছো সেটা বলো।”
-“কী?”
-“শ্বশুরবাবা হিসেবে তোমার কিছু দায়িত্ব আছে না? এ বাড়িতে তোমার মেয়ে জামাইয়ের কোনো কদর নেই। তার কদরের জন্য তোমার উচিত তাকে একটা শ্বাশুমা এনে দেওয়া, যাতে সে তার অধিকার অনুযায়ী কদর পায়।”
-“ফালতু কথা বলবি না আঁধার। আয় তোর কানটা ছিঁড়ে দি আমি।”
আঁধার প্রতিবাদ করে বললো

-“একদম এই টোনে কথা বলবেনা আমার সাথে। আগে যদি জানতাম, তুমি একটা সিঙ্গেল ফাদার,জীবনেও তোমার মেয়েকে বিয়ে করতাম না আমি! এভাবে সিঙ্গেল শ্বশুরবাবা দিয়ে শ্বশুরবাড়ির ফিলটা ঠিক নেওয়া যাচ্ছে না।”
আকিব শিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-“তোর বাচ্চামিগুলো শেষ হয় না কেন?”
-“বাচ্চামি?তোমার বাচ্চার দেখাশোনা করতে করতেই অর্ধেক জীবন যাচ্ছে আমার। আমার বাচ্চামি করার সুযোগ কই?”
-“সেজন্যই তো বলছি, আমার বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে যা। বড় হলে তোকে দিয়ে দেব। তখন আর দেখাশোনা করতে কষ্ট হবে না।”
আঁধার দ্রুত আকিব শিকদারের হাত ধরে ফেললো। অনুনয় করে বললো

-“না শ্বশুরবাবা না। প্লিজ তুমি আমাকে বিধবা করে দিও না। তুমি সিঙ্গেল বলে, প্রতিশোধ নিতে আমাকেও সিঙ্গেল করে দেবে এটা আমি মানতে পারবো না। পারলে তুমি আমাকে একটা শ্বাশুমা এনে দাও।”
-“শ্বাশুমা লাগবে না, তোমার শ্বশুরবাবাই যথেষ্ট তোমার জন্য। কী লাগবে আমাকে বলো।”
-“আদর-আপ্যায়ন লাগবে। ক্রেভিংস উঠেছে হঠাৎ!”
-“যেমন?”
-“আমাকে বেড়ে খাওয়াবে। যেভাবে মোঝোমা সবার আগে, মেয়ে জামাইকে যত্নআত্তি করে খাওয়াচ্ছে সেভাবে। পুরোদিন জিজ্ঞেস করতেই থাকবে আমার কিছু লাগবে কি-না। একদিন পরপর শপিং করাতে নিয়ে যাবে। বাকিগুলো মনে পরছে না, মনে পরলে জানাচ্ছি।”

কাজলরেখা পর্ব ৪৪

-“আয়।”
আকিব শিকদার উঠে দাঁড়ালেন। আঁধার পিছু পিছু উঠলো ওনার। জবা বেগম অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন দু’জনের দিকে। আঁধার চেয়ারে বসেছে। আকিব শিকদার সত্যি সত্যিই বেড়ে দিচ্ছে ওকে। আঁধার হাসিমুখে এটা ওটা বলছে। জবা বেগম মুখ বাকালেন। আঁধার ইচ্ছে করে করছে এসব,ওনাকে জ্বালাতে! কম্পিটিশন লাগতে চায় ওরা, কম্পিটিশন!

কাজলরেখা পর্ব ৪৫