কাজলরেখা পর্ব ৪৬
তানজিনা ইসলাম
আঁধার যাওয়ার পর মুহুর্তেই একটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেলো। অর্পিতা চিৎকার করে কান্নাকাটি করা শুরু করলো।সকলের সামনে এতো বিশ্রী অপমান! যেখানে ওর মা-বাবা কখনো ওঁকে ধমক পর্যন্ত দেয়নি সেখানে আঁধার সবার সামনে থাপ্পড় মেরেছে ওঁকে। চুল ছিঁড়ে দিয়েছে।এ অপমান কী করে সইবে ও। জবা বেগম হুড়োহুড়ি করে আরমান শিকদার কে ফোন করা শুরু করলেন। অপূর্ব শিকদারও বাসায় নেই।রাফিয়া বেগম নিজের কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। এসেই ঘটনার অদ্যোপান্ত না জেনে দোষারোপ করা শুরু করলেন বর্ষা বেগম কে। বর্ষা বেগম নিজের কক্ষে চলে গেলেন। এ মহিলার ক্যাটক্যাট আর ভালো লাগে না। এমনিতেই সকাল থেকে তিনি অসুস্থ। হতে পারে, একটা খুব সামান্য ঘটনা নিয়ে শিকদার বাড়িতে এই অগ্নোৎপাত।তবুও এ ঝগড়া টা বাঁধারই ছিলো।আঁধার সুযোগ খুঁজছিলো অর্পিতাকে শায়েস্তা করার। জবা বেগম সুযোগ খুজছিলো বাড়ি ভাগ করার। চা বানানো টা তো শুধু বাহানা ছিলো।
চাদনীর কক্ষের দরজা বন্ধ। আঁধার সর্বশক্তি দিয়ে বাড়ি দিলো।
-“চাঁদ!এই দরজা বন্ধ করেছিস কেন তুই?”
ভেতর থেকে উত্তর আসে না। আঁধারের রাগটা আরো বেড়ে যায়। আশ্চর্য! সব নখরামি খালি চাদনী ওর সাথেই করতে পারে। অথচ ওঁদের মুখ ফুটে একটা উত্তর দিতে পারে না। এ কেমন বৈষম্য!
আঁধার রাগে কিড়মিড়িয়ে বললো
-“ধুর বা*ল! দরজা খোলতো।এতো আবেগের কী আছে? ওরা কখনই বা তোকে মাথায় তুলে বসে থাকে?বাড়ির মেয়ে না বলে যে আবেগে শেষ হয়ে যাচ্ছিস। ওই, খোল না দরজা। ব্যাপারটাকে এতো বড় করে কেন দেখছিস! তুই চাচ্চুর মেয়ে, আমার বউ। এটা কী যথেষ্ট নয়? খোন বাল-ছাল এসে কী বললো সেসব কানে নিবি কেনো? এই চাঁদ। দরজা খুলবি না, ভেঙে ঢুকবো?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কোনো উত্তর আসে না। আঁধারের মনে ভয় ঢুকলো। মেয়েটা এতো আবেগী!আবেগের একটা জার আছে ওর কাছে। মুহুর্তে মুহুর্তে উতলে পরে। ছোট্ট একটা বিষয় নিয়েও কেঁদে ফেলে। আর সেখানে তো এতো বড় একটা বিষয়, যতই আঁধার বলুক মাথায় না নিতে। ওর পরিচয় টায় তো মিথ্যে হয়ে গেলো। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিচয় টা ও আঁধারের বউ, এটা তো মিথ্যে না। বাকি সব মিথ্যে হলেও কী?
-“সম্পত্তি নিয়ে চিন্তা করছিস তুই? আরে ওই বা*লটার চেয়ে বেশি সম্পত্তি পাবি তুই। যা আমার ভাগের সম্পত্তিও তোর। তারপরও দরজা খোল।
-“এই চাদনী এই, একদম নখরা দেখাবি না৷ কথা বলছিস না কেন তুই? দরজা খোল। দরজা খোল বলছি।”
আঁধার দু’হাতে দরজা ধাক্কাতে থাকলো। চাদনী বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছিলো। দরজার দিকে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে কান্নার শব্দ আটকালো। এই ছেলেটা ওঁকে
শান্তিতে একটু কান্না পর্যন্ত করতে দেবে না। এমন অসহ্য একটা মানুষই জুটতে পেলো ওর কপালে।
আঁধারের দরজা ভাঙার প্রস্তুতি নিলো। ধাক্কাতে যাবে তার আগেই চাদনী দরজা খুলে ফেললো। আঁধার নরম দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।
চাদনীর চোখ জ্বলজ্বল করছে। নাকে, গালে লাল আভা। চোখ ফুলে গেছে। মাত্র কিছু সময়ের মধ্যে অবস্থা খারাপ করেছে ফেলেছে।
-“কী চাই?”
-“তোকে।”
-“যাও এখান থেকে। মন মেজাজ ভালো নেই।”
-“আমারও। দেখি সর।”
চাদনীকে ঠেলেঠুলে ওর কক্ষে ঢুকলো আঁধার।বালিশের অবস্থা দেখে, পিছু ফিরে ওর দিকে তাকিয়ে বললো
-“বাহ! কিছুক্ষণের মধ্যেই বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছিস! কোথায় ওই অজাতের চুল ছিড়ে দিব তা না। কেঁদে কেটে সমুদ্র বানিয়ে ফেলছে।”
-“কেন এসেছো? একা থাকতে দাও আমাকে।”
-“তোর সাথে থাকবো বলে এসেছি।”
চাদনী সে কথা কানে না নিয়ে, ক্ষীণ স্বরে বললো
-“আমার তো রক্তের ঠিক নাই, জন্মের ঠিক নাই। আমার সাথে কেন থাকতে যাবা তুমি?”
আঁধার বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো।পাঁংশুটে মুখে বললো
-“কেন বলছিস এসব? ওই অর্পিতার জন্মপরিচয়ই ভুলিয়ে দেবো আমি, অপেক্ষা কর।আমার এসব নিয়ে একটুও মাথা ব্যাথা নেই। জানি অনেক কষ্টের একটা বিষয় এসব তোর জন্য। এতোবছর পর এসে এসব জানা…
-“তুমি আমাকে আগে জানাতে পারতে। গায়ের রং নিয়ে খোঁটা দেওয়ার সময় এটাও বলে দিতে পারতে যে, আমার জন্মপরিচয় ঠিক নেই বলেই আমি তোমার যোগ্য না।আমি তো শিকদার বাড়ির মেয়ে না। তুমিই যতই আমাকে আমার গায়ের রং নিয়ে খোঁটা দাও না কেন, অন্তত এটা জেনে আমার একটা সাহস থাকতো আমি শিকদার বাড়ির মেয়ে। তুমি আর আমি তো একই। হয়তো গায়ের রং দিয়ে তোমার যোগ্য না আমি, কিন্তু আমাদের বংশপরিচয় তো এক। কিন্তু এখন… এখন আমি কীসের অহংকার করবো? কীভাবে তোমার সাথে লড়বো? আমার তো আর নিজের বলতে কিছু রইলো না, আঁধার ভাই।”
আঁধার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকলো চাদনীর দিকে। ওর দু’হাতে শক্ত করে মুঠো করে ধরে বললো
-” আমি আছি না তোর! আমি আছি, চাচ্চু আছে। তোর কত্তোগুলো বন্ধু আছে।আর পরিচয়! কাবিন নামায় কী নামে সাক্ষর করেছিলি চাদনী! আমার নাম তো তোরই। আমার পদবীও তোর। আর কী লাগবে বল! সব এনে দেবো তোকে। কে বলেছে তোর কিছু নেই, আমার সবকিছুই তো তোর।”
চাদনী বিষাদ হাসলো।
-“ওই যে, জন্মের ঠিক নেই সেটা?”
আঁধার ওর গাল চেপে ধরলো।
-“চাদনী, আমি তোকে কিছু বলেছি জান? এ বাড়ির কারো সাথে তোর সম্পর্ক নেই, আমার তো আছে। সবকিছুর উর্ধ্বে তোর পরিচয়, তুই আমার বউ।শুধু এটুকু জেনে নে। আর সবকিছু মিথ্যে ভেবে নে।”
-“নাহ, এ বাড়ির কারো সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।তোমার সাথেও না।”
আঁধার অপ্রকৃতস্থভাবে ওর গালে হাত রেখে বললো
-“প্লিইইজ, শোন আমার কথা।
চাদনী হঠাৎই রেগে গেলো৷ওর ভালো লাগছে না কিছু। কোনো কারণ ছাড়ায় রাগ হচ্ছে। ও চিৎকার করে বললো
-“বেরোও এখান থেকে। যাও, চলে যাও৷ এতো ভালো সাজছো কেন? কী কী করেছো আমার সাথে, ভুলে গেছি ভেবেছো! অমানুষের মতো আচরণ করেছো।অপমান করেছো, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছো। কিচ্ছু ভুলিনি।
সারাজীবন সবাই আমার সাথে যা তা ব্যবহার করে আসছো৷ বুঝ হওয়ার পর থেকে সবার কটুক্তি শুনেছি। আমার কোনো জন্মপরিচয় নাই,আমি এ বাড়ির মেয়ে না। এজন্য আমার সাথে যা তা ব্যবহার করা যায় তাই না! আমি তো মানুষ না। তোমাদের মতো বাড়ির আদরের বাচ্চাও না। আমার কষ্ট পাওয়া না পাওয়া তে কী যায় আসে?”
চাদনী কাঁদছে।কান্নার তোড়ে কাপছেও।আধার কী করবে বুঝতে পারলো না। মেয়েটা এভাবে কেন রিয়েক্ট করছে? কথা তো শুনিয়েছে ওরা। ওর সাথে এমন করছে কেন?”
আঁধার ওঁকে ঝাপ্টে ধরে বললো
-“আমার কথাটা শোন না। তুই এমন কেন করছিস
চাদনী?”
-“তোমার চাচা কেন আমাকেই নিয়ে আসলো? দেখেনি আমি কালো? এতো সুন্দর সুন্দর মানুষের মাঝে আমারদকে মানায়? এডপ্টেড-ই তো। তোমাদের যোগ্য কাওকে আনতে পারেনি? সবাই অন্যায় করেছো আমার সাথে। আমি আজকে বুঝলাম, ঢাকা যাওয়ার পর কেনো তোমার চাচা একবারও দেখা করতে গেলো না আমার সাথে। কেন সবাই মিলে, আমাকেই বলির পাঠা বানালো। কারণ আমি তোমাদের নিজের কেও না। তোমার চাচার নিজের মেয়ে না। আমার সাথে যা তা করা যায়। আমার চেয়েও নিজের এই অকৃতজ্ঞ পরিবারকে বড় করে দেখা যায়। কারণ আমি তার রক্তের কেও না। আআআআ! ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে। যাও এখান থেকে। বেরোও। তোমাদের কারো সাথে আমার কোনো কিচ্ছু নেই। আজ রক্তের খোঁটাও দিয়ে দিলো ওরা আমাকে।”
-“কোথায় যাবি?”
-“যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে। তোমাদেরকে আর বিরক্ত করবো না। না, তোমাকে আর না তোমার চাচাকে। বোঝা হয়ে গেছি না, আজ সব পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে।”
চাদনীর গলা ভেঙে এলো। হাঁপাতে থাকলো ও। আঁধার ওঁকে ছাড়লো না। শক্ত করে ধরে থাকলো।
খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে চাদনী। পা দু’টো এলোমেলো ভঙিতে টেনে রেখেছে মেঝেতে। দুনিয়ার সকল অসহায়ত্ব ভর করেছে ওর আদলে। সেলোয়ারের বুকের কাছটা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। গালে জলের দাগ বসে গেছে। খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।
আঁধার গুরুতর ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চাদনীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মেয়েটা এই পরিবারটাকে অনেক ভালোবাসতো। অনেক মানে অনেক। সেটা শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না। হয়তো কারো ভালোবাসা পেতো না বলেই, সবার জন্য এতোটা টান ছিলো। ভালোবাসার কাঙাল মানুষরা সবাইকে একটু বেশিই ভালোবাসে। তারপর যখন হুট করে জানলো, এতো বছর ধরে জেনে আসা সবকিছু মিথ্যে, ভ্রম তখন মাথা খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আঁধার ডাকলো
-“চাঁদ!”
-“হু।”
-“আমরা ঢাকায় চলে যাই। এখানে থাকতে হবে না,তোকে।”
-“লজ্জা লাগবে না তোমার?এবার তো তোমার আরো লজ্জা। এতোদিন শুধু একটা সমস্যা ছিলো। আমি কালো। এখন, আমার তো জন্মপরিচয়ের ঠিক নেই। তোমার লেভেলে নেই আমি। বউ হওয়ার যোগ্য না।আরো কতো কী!”
-“চাদনী!”
চাদনী বিছানার উপর মাথা এলিয়ে দিলো।আধার উঠে গিয়ে ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসলো। ওর চুলগুলো মুখের উপর থেকে সরিয়ে বললো
-“আমার আর কোনো লজ্জা নেই চাদনী। ছেলেদের লজ্জা থাকতে নেই। তুই আমার লজ্জা কেন হবি? তুই তো আমার চাঁদ।”
-“হাহ!”
-“এরকম কেন করছিস?”
-“নিজের দিকে তাকালো খুব আফসোস লাগে জানো। এতো শূণ্যতা, কমতি নিয়ে একটা মানুষ বাঁচতে পারে?”
-“ভুলে যা ওরা যা বলেছে সব।”
-“তোমার বিষাক্ত বাণীগুলোই তো ভুলতে পারিনি। ওঁদের ঘা টা তো তাজা।”
-“এই তাজা ঘা কী করে মেটাবো, বল। আমাকে জড়িয়ে ধর। যে কান্নাটা ভেতরে আঁটকে রেখেছিস সেটা বের কর। এভাবে কান্না চেপে রাখলে, মরে যাবি। কাদঁ একটু। শব্দ করে কাঁদ। তোর অবস্থা আমার ঠিক লাগছে না।”
চাদনী অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকালো। আঁধার নিজেই ওঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। চাদনী শব্দ করে কেঁদে দিলো। আঁধার একটা বাচ্চার মতো আগলে নিলো।
আঁধার কোলে তুললো ওঁকে। পিঠের নিচে নরম বেডের অনুভূতি পেতেই চাদনীর কান্না থেমে গেলো। বুক থেকে মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকালো ও। আঁধারের চোখের ভাষা বোঝে না ও। ছেলেটার চোখের ভাষা বড্ড জটিল।
গালে, ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠলো চাদনী। চাদনীর সিক্স সেন্থ বললো, ওর সাথে অপ্রত্যাশিত কিছু হবে। যা এ মুহুর্তে ওর একটুও পছন্দ হবে না।
আঁধার মুখ নামিয়ে চুমু খেলো চাদনীর থুঁতনি তে। চাদনী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
কাজলরেখা পর্ব ৪৫
-“প্লিজ না।”
আঁধার ওর কপালের সাথে কপাল ঠেকালো। শীতল কন্ঠে বললো
-“আমি তোর কোনো কথা শুনছি না।”
-“তুমি জোর করবে আমার সাথে?”
-“ভালো কথায় না হলে আমি আর কী করতে পারি বল?আমি তো শুধু তোর ক্ষত মেটানোর চেষ্টা করছি।”
-“তুমি আমাকে আরো ক্ষতবিক্ষত করে দেবে।”
-“নতুন কী? তোকে তো আমি শুরু থেকেই ক্ষতবিক্ষত করে আসছি। এতোদিনে তো সয়ে যাওয়ার কথা। তবে নতুনত্ব কী জানিস, আজ আমি তোর ছোট হওয়ার পরোয়া করবো না। তোর কান্না আজকে আমার উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।”
