কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৬
তন্ময়ী তিতিক্ষা
সূর্য ডুবেছে সেই কখন। আকাশে ছড়ানো লালিমা কেটে ঘোর অন্ধকার গ্রাস করেছে ধরনীকে। সকল কাজের সমাপ্তি ঘটিয়ে সবে কক্ষে প্রবেশ করল আর্শি। মুখখানা অভিমানে বেলুনের ন্যায় ফুলে আছে। আযরান খেয়াল করলো ব্যাপার তবুও পাত্তা না দিয়ে গেম খেলায় মগ্ন হলো। এই ম্যাচটা তাকে যেভাবেই হোক জিততেই হবে। আর্শি আঁড়চোখে চাইলো আযরানের পানে। আযরানকে আগের মতোই দেখে এবার কিছুটা রাগ হলো। হনহন পায়ে চলে গেলে ওয়াশরুমের দিকে। ফ্রেশ হয়ে কোনোদিকে তাকালো না সে। সোজা এসে বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। আযরানের ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেল আর্শির এহেন কান্ডে। কোনো মতে ম্যাচ শেষ করে শোয়া অবস্থায় উঁকি দিয়ে দেখলো মেঝেতে শুয়ে থাকা আর্শিকে। পরক্ষণেই কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
“কি সমস্যা মেঝেতে শুয়েছিস কেন?”
আর্শির কোনো জবাব নেই। আযরান পুনরায় একি প্রশ্ন করল। কিন্তু এবারও কোনো উত্তর মিলল না। মেয়েটা একরোখার মতো মেঝেতেই পরে রইলো। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আর্শির পানে। কক্ষ পুরো নিস্তব্ধ, নির্বাক। অনেকখানি সময় কেটে গেলেও আযরানের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আর্শি এবার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চাইলো। নিমিষেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়ে গেল। হকচকিয়ে গেল আর্শি। পুনরায় ঘুরে যাবে এর পূর্বেই ঠাস করে তার গায়ের ওপর আছড়ে পড়ল আযরান। আকস্মিক কান্ডে আর্শি চিৎকার করে বলে উঠল,
“আম্মুউউউ! মরে গেলাম।”
“চুপ!বেয়াদব।”
তেজী কন্ঠে আর্শি ভড়কাল। পরক্ষণেই শুকনো একটা ঢোক গিলে কম্পিত হাতে আযরানকে গায়ের ওপর থেকে সরাতে চাইল। আযরান সরলো না বরং দুইহাতে আঁকড়ে ধরল আর্শির হাত। নেত্রপল্লব বড় বড় হয়ে এলো আর্শির। আযরান কন্ঠে রাগ মিশিয়ে বলে উঠল,
“এবার বল কি সমস্যা। নিচে কেন ঘুমাতে এসেছিস?”
“আমি তোর সাথে আর ঘুমাবো না।”
“কেন ঘুমাবি না?”
ঢোক গিলল আর্শি। আযরান কথাটা বলতে বলতে মুখ একদম তার মুখের বরাবর নিয়ে এসেছে। আর্শি মনে মনে ভড়কে গেল। কিন্তু আযরানকে তা বুঝতে না দিয়ে নিজেকে শক্ত খোলসে আবৃত করে বলে উঠল,
“যে স্বামী নিজের বউকে অকারনে ভুল বুঝে সেই বউয়ের কখনোই উচিত না ওই স্বামীর সাথে ঘুমানো।”
আযরান কোনো প্রত্যুত্তর করল না। শুধু সূক্ষ্ম একটা হাসি ফুঁটিয়ে তুলল অধরকার্নিশে। হুট করে মুখ গুঁজে দিল আর্শির গলার মাঝে। আকস্মিকতায় ভরকে গেল আর্শি। অজস্র শিহরণ বয়ে গেল সর্বাঙ্গে। প্রচন্ড লজ্জায় কেঁপে উঠল সে। জানালা গলিয়ে আসা শীতল বাতাস কাঁপুনি বাঁড়িয়ে দিচ্ছে। আর্শি কাঁপা হাতে আযরানকে সরাতে চাইল। মুহুর্তে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল আযরান। ছোট ছোট স্পর্শে এঁকে দিতে থাকলো আর্শির গ্রীবাদেশে। আর্শি আর চুপ থাকতে পারল না। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“আয..আযরান স্টপ।”
আযরান থামল না। বরং স্পর্শ আরও গভীর হলো। আর্শি চোখ বুঁজে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো । গলায় একটা গভীর চুমু দিয়ে সরে এলো আযরান। দৃষ্টি স্থির করল আর্শির পানে। মেয়েটা তখনও চক্ষুদ্বয় খিঁচে রেখেছে। আযরান সেদিকে দৃষ্টি রেখেই গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“লুক এট মি মুটি।”
সময় নিয়ে পলক ঝাপটিয়ে আঁখিদ্বয় মেলল আর্শি। নিমিষেই আঁটকে পড়ল আযরানের চোখের মাদকতায়। দু’চোখে অদ্ভুত মুগ্ধতা ফুঁটে আছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না আর্শি। আযরানের গভীর দৃষ্টি। অন্তরটা কেমন ভয়ংকর অনুভূতিতে নড়ে উঠল। তখনই শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের ভারিক্কি কন্ঠস্বর,
“যত যাই হয়ে যাক কখনো আমার থেকে আলাদা থাকতে চাইবি না মুটি। আমি তোর সকল আবদার মেনে নিবো। কিন্তু আমার থেকে দূরে থাকতে চাইলো তোকে শাস্তি পেতে হবে। তাও আবার কঠিন শাস্তি।”
বাক্যহারা হয়ে গেল আর্শি। আযরানের শান্ত স্বরে দেওয়া হুমকিটাই যেন ভিতরটায় নাড়া দিয়ে উঠল। একটু মুগ্ধতা ছড়ালো কি? হবে হয়তো। মনে মনে পুলকিত হলেও বাহ্যিকভাবে বিরক্ত প্রকাশ করে বলে উঠল,
“বুঝেছি এবার সর। আমি মোটা হলেও আমার থেকে ওজন তোর বেশি শালা।”
নিমিষেই আযরান রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আর্শির ফুলো গাল দু’টো চেপে ধরল একহাতে। চক্ষুদ্বয় রাঙিয়ে বলে উঠল,
“বর লাগি তোর। শালা কিসের রে। বেয়াদব একটা। জামাইকে সম্মান দিতে হয় জানিস না।”
আর্শি দাঁত খিঁচিয়ে আযরানের হাতটা সরানোর চেষ্টা করে বলে উঠল,
“সর তো! বেস্টফ্রেন্ড থেকে জামাই হইছিস আবার সম্মানও চাস? তুই নিজেই একটা বেয়াদব। তোর সম্মানের গুষ্টি মারি।”
কথাটা শেষ হতেই আযরানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আর্শির পানে। তারপর হঠাৎই ঠাস করে কামড় বসিয়ে দিল আর্শির নাকে। আর্শি ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। পরক্ষণেই ধুমধাম কিল বসাতে থাকলো আযরানের বুকে। আযরান যেন মজা পেল এতে। স্মিত হেসে বলে উঠল,
“সুন্দরী মেয়েদের হাতের মাইরও যেন অমৃত।”
আযরানের কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। উত্তপ্ত, গরম নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে নাসারন্ধ্র হতে। উত্তাপে হাসফাঁস অবস্থা। একহাতে কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছে পুনরায় সাইকেল চালানোতে মনোযোগী হলো আযরান। দুপুরের কড়া রোদের চেয়েও যেন তাপের প্রখর প্রদাহ অপরাহ্নে। বাতাসের ছিঁটে ফোঁটাও নেই। প্রায় দশমিনিট সাইকেল চালিয়ে পৌছালো গন্তব্যে। ভীষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে দেহের প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যেঙ্গ। কোনোমতে ডেলিভারি কমপ্লিট করে পুনরায় ফিরল রেস্টুরেন্টে। এখানেও একটা অর্ডার রয়েছে।
সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। খুশি মনে বেরিয়ে এলো আযরান। আজকে তার পুরো মাসের পারিশ্রমিক হাতে পেয়েছে। কেবল আট হাজার টাকা। এই সামান্য অংকের টাকাটুকুও যেন আযরানের কাছে আজ লক্ষ টাকা সমতূল্য মনে হচ্ছে। আনন্দেরা উপছে পড়ছে মুখশ্রী জুঁড়ে। আশেপাশে একপলক চাইল আযরান। সামনে একটা চুঁড়ির দোকান থেকে এক মুঠো চুড়ি কিনে নিল আর্শির জন্য। সেগুলোর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আযরান মনে মনে বলে উঠল,
“পরিশ্রমের ফল বুঝি এতো মিষ্টি হয়? কই আগে তো লক্ষ লক্ষ টাকা উঁড়িয়েও এত আনন্দ হয়নি। যতটা এই সামান্য কটা টাকা পেয়ে হচ্ছে। ইশশ! আম্মু তুমি দেখলে না তোমার আযরান কতটা বদলে গেছে এখন।”
মায়ের কথা মনে আসতেই চক্ষুকার্নিশ জ্বলে উঠল আযরানের। কতগুলো দিন হয়ে গেল মায়ের সাথে দেখা হয় না। মা কেমন আছে তাকে ছাড়া? একদমই ভালো নেই আযরান তা খুব ভালো করেই জানে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগোলো আযরান। সে জানে আর্শিকে একদিন সবাই মেনে নিবে কিন্তু সে সময়টা আসার জন্য হলেও আযরানকে অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত কিছুতেই সে তার মুটিকে ছাঁড়বে না। একমুহূর্তের জন্যও না। আর্শির কথা মনে হতেই ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল। গতকাল রাতের রাগী মুখটা মনে পড়তেই মাথা নেড়ে অল্প হাসল আযরান। আনমনে বিরবির করল,
“মুটিটার জন্য আইসক্রিম নিলে খুশি হবে নাকি ফুচকা?
বাসের হেল্পারের ডাকে নেত্রপল্লব মেলে চাইলো আযরান। ক্লান্তিতে কখন চোখ লেগে গেছে খেয়ালই করেনি। বাসের জানালা গলিয়ে আসা মৃদুবাতাসে চক্ষুদ্বয় পুনরায় হালকা করে বন্ধ করল সে। তার গন্তব্য আসতে আর কয়েকমিনিট লাগবে হয়তো। গন্তব্যে পৌছাতেই উঠে দাঁড়ালো আযরান। ধীর কদমে এগোলো দরজার পানে। ভাড়া দিতে গিয়ে উপলব্ধি করল তার পকেটে থাকা মানিব্যাগ উধাও। কিন্তু মানিব্যাগ গেল কোথায়? আযরান স্থির হয়ে গেল। বুকের মাঝে ধাক্কা লাগলো যেন। তার টাকা গুলো মানিব্যাগেই ছিল। হেল্পারের কর্কশ কন্ঠ কর্ণে প্রবেশ করতেই হুশে ফিরল আযরান।
“ভাই ভাড়া দিয়া নামেন। গাড়ি ছাড়তে হইবো। দেরি হইতাছে।”
থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো আযরান। বাসের কোলাহল যেন তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে।আরেকবার আগের জায়গায় ফিরে এলো। কোথাও খুঁজে পেল না। কাঁপা হাতে বারবার পকেট হাতড়ে দেখল সে। না নেই। সত্যিই নেই। মানিব্যাগটা নেই। সেখানে তার পুরো মাসের কষ্টের উপার্জন ছিল। প্রতিটা ঘামের ফোঁটা, সবকিছুর মূল্য ছিল ওই টাকাগুলোতে। হেল্পার এবার বিরক্ত হলো। রাগী গলায় আবার বলে উঠল,
“ভাই নামবেন নাকি? গাড়ি আটকায়া রাখছেন ক্যান? ভাড়া দিয়া নামেন তো নামেন।”
পকেট হাতড়িয়ে যা খুচরো টাকা পেল তা দিয়েই নিঃশব্দে বাস থেকে নেমে গেল আযরান। বাসটা হর্ন বাজিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, অথচ আযরান দাঁড়িয়ে রইলো রাস্তার ধারে। হাতের মুঠোয় শুধু ছোট্ট চুড়ির প্যাকেট। আর একটা কানা কড়িও নেই পকেটে। কিভাবে কি করবে সে? কষ্টে বক্ষের মাঝে কেমন ভার হয়ে আসছে। নিজেকেই নিজের কাছে প্রচন্ড অসহায় লাগছে। আগে হাজার হাজার টাকা হারালেও পাত্তা দিত না আযরান। অথচ আজ আট হাজার টাকা হারিয়ে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটাই ফাঁকা হয়ে গেছে তার। চক্ষুদ্বয় ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করল। এই প্রথমবারের মতো অশ্রু গড়ালো আযরানের চক্ষুকার্নিশ বেঁয়ে। উপলব্ধি করল, এই পৃথিবীতে টিকে থাকা বড়ই কঠিন।
ঠিক কতটা সময় কেটে গেল আযরান জানে। আকস্মিক ফোনের রিংটোনে হুশ ফিরল তার। স্ক্রিনে ভেসে উঠল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৫
“মুটি কলিং…”
খানিকটা সময় অনুভূতিশূন্য হয়ে তাকিয়ে রইল আযরান। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আর্শির চিন্তিত কন্ঠস্বর,
“কিরে আযরান কোথায় তুই? এতরাত হয়ে গেল ফিরছিস না কেন?”
আযরান নিস্তব্ধ রইলো কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই ঠোঁট কামড়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাল। আযরানের মুখশ্রী জুঁড়ে ক্লান্তি আর বিষাদে ছেঁয়ে আছে। তবুও হালকা হাসার চেষ্টা করে বলে উঠল,
“বাসার কাছেই আছি। আসছি আমি।”
