Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১
তন্ময়ী তিতিক্ষা

“তুই এত মুটি কেন রে আর্শি? গেলো তো এবারের বিয়েটাও ভেঙে। একটু কম করে খেতে পারিস না?”
পুরুষালি গম্ভীর কন্ঠের তিরস্কার কর্ণগহব্বরে প্রবেশ করতেই মাথা নিচু করে নিল আর্শি। হাত মুঠো করে হজম করল বাক্যটি। সামনে থাকা যুবকটি তো ভুল কিছু বলেনি। সে তো আসলেই মোটা। পুনরায় কানে আসলো সেই একি গম্ভীর কন্ঠস্বর,

“জোকারের কতো এইসব পড়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে চেঞ্জ করে আয়।”
এবার কিছুটা কষ্ট পেল আর্শি। সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা একদিকে যেমন তার চাচাতো ভাই অন্যদিকে তেমন তার বেস্টফ্রেন্ডও। কিন্তু বেস্টফ্রেন্ডের থেকে এমন কথা কেই বা আশা করে? সেও করে না তবে তাকে শুনতে হয়। এমন কত কটুবাক্য সে হজম করেছে তার ইয়াত্তা নেই। মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্শি। পরক্ষণেই ধীরে সুস্থে পা বাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল নিজের ঘরের দিকে।
তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো এক জোড়া চোখ। দৃষ্টি সম্পূর্ণ স্থির চলে যেতে থাকা মেয়েটার দিকে। হুট করে কপাল কুঁচকে যায় মানুষটার। তারপর বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে চক্ষুদ্বয় ফিরিয়ে নিল।
বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে পুরো কক্ষজুঁড়ে। ছোট্ট একটি ছিমছাম কক্ষ। নেই কোনো আধুনিকতায় মোড়ানো ভারী আসবাব পত্র৷ তবুও মালিকের পরিপাটিভাবে সাজানোতেই যেন সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। গোসল সেরে বেরিয়ে আসে আর্শি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এখন যেন একটু ভালো লাগছে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল ছোট বারান্দার দিকে। সূর্যের নরম রশ্মি এসে আর্শির উজ্জ্বল ফর্সা গোলগাল মুখশ্রী ছুঁয়ে চলেছে অনবরত। বাইরের দিকে তাকিয়েই চিন্তায় মগ্ন হলো সে।

বাবার কল পেয়েই গতকাল ঢাকা থেকে ছু্ঁটে এসেছিল আর্শি। তখনও জানতো না হুট করে আসতে বলার কারন। তবে আজ সকালে যখন নিধি এসে পাত্রপক্ষের আসার কথা জানালো তখন পুরো ব্যাপারটা জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল তার কাছে। তখন থেকেই জানতো তাকে রিজেক্ট করা হবে। জানবে নাই বা কেন? তার মতো মোটা মেয়েকে কেই বা চাবে বাড়ির বউ করতে? এই নিয়ে মোট নয়জন পাত্রপক্ষের কাছ থেকে রিজেক্ট হয়েছে আর্শি। নিজের জন্য বড্ড মায়া হয় তার। আবার একদিক দিয়ে আনন্দও লাগে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে হারাতে হবে না ভেবে। আর্শির ভাবনায় হুট করে কিছু আসতেই একজনের উদ্দেশ্য ফোন লাগালো। ফোন রিসিভ হতেই অপাশ থেকে ভেসে এলো একজন পুরুষের কন্ঠ,

“বলো শুনছি।”
পুরুষটির কন্ঠস্বরেই যেন প্রাণ জুঁড়িয়ে গেল আর্শির। মৃদুস্বরে বলে উঠল,
“আজকেও পাত্রপক্ষ ফিরে গিয়েছে।”
“এটা আর নতুন কি? জানা কথা ফিরে যেতোই।”
কথাটুকু শুনে চুপ মেরে গেল আর্শি। মনের সুপ্তকোণে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলোকে গিলে ফেলল মূহুর্তে। দৃষ্টি বাইরের দিকে নিবদ্ধ করে বলে উঠল,
“আমায় কবে বিয়ে করবে নোমান?”
“একি প্যাচাল আর কত করবে? চাকরীরও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি? বলিনি চাকরী পেয়ে নেই আগে? তাহলে বার বার এই কথার মানে কি?”
তীব্র ধমকে আর্শি কিছুটা থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। আর্শি অতি সন্তপর্ণে ঢোক গিলল। মন খারাপ হলেও বুঝতে দিল না। শান্ত স্বরে বলে উঠল,

“রেগে যাচ্ছো কেন নোমান? জানোই তো বাসা থেকে কিভাবে চাপ দেওয়া হয়। আর ছোট মা তো উঠতে বসতে খোটা দেয় সবকিছু নিয়ে। তখন পাত্রপক্ষের সামনে কিছু না বললেও এখন গেলে বলবে। তাই তোমাকে জিজ্ঞাস করি। তুমি প্লিজ রাগ করো না।”
অপাশের মানুষটা পুনরায় রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,
“চাপ কি শুধু তোমার? আমার নেই? পরিবার চালানোর জন্য আমারও চাকরির প্রয়োজন। সারাদিন তোমার বিয়ে নিয়ে ভাবলে হবে না। নিজের পরিবারের কথাও আমার ভাবতে হবে। শুধু শুধু বিয়ের প্যাচাল করবে না। বিরক্ত ধরে যাচ্ছে আমার।”
মুখের ওপর ফোনটা কেঁটে দিলো নোমান। কান থেকে ফোন নামিয়ে এক দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো আর্শি। হুট করে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরল ফোনের স্ক্রিনে। সেদিকে তাকিয়েই আনমনেই তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল,
“কি রাজ কপাল নিয়ে জন্মেছিস রে আর্শি।”

ড্রয়িংরুমে বসে গম্ভীর মুখে বসে আছে মিসেস দিনা হায়দার। মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে প্রচন্ড রেগে আছেন তিনি। ভীতসন্ত্রস্ত মনে ধীর পায়ে নেমে এলো আর্শি। ছোট মাকে দেখে যেন ভয়টা কিছুটা বৃদ্ধি পেলো। যদিও পাত্রপক্ষের থেকে রিজেক্ট হওয়ার পিছনে তার হাত না থাকলেও এখন তাকেই কথা শুনতে হবে। তাকে দেখা মাত্রই বাবা শফিকুল হায়দার ড্রয়িং রুম ত্যাগ করল। এমনিতেই তার ছায়া দেখলেই যেন তার বাবার চক্ষে বিরক্তি ফুঁটে উঠে। মুহুর্তেই বুকে পাথর সমান ওজন অনুভব করল আর্শি। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়াতেই দিনা হায়দারের দৃষ্টি পড়ল তার ওপর। মুহুর্তে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। চিল্লিয়ে বলে উঠল,
“এসেছে মুখপুড়ি। নিজের মাকে খেয়ে শান্তি হয়নি এখন আমার রক্ত খেতে পরে আছে। বলি কম করে খেতে পারিস না? এতো মোটা হচ্ছিস দিন দিন। পাত্রপক্ষ তো এমনেই চলে যাবে।”
আর্শি মাথা নিচু করে ফেলল। ব্যথায় বিষিয়ে আছে মন। মাকে নিয়ে বলায় চিৎকার করে কান্না করার ইচ্ছা হলো৷ মায়ের খুনি হিসেবে আজও বাবা তাকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করায়। এতেই নিজের শ্বাস নিজেই বন্ধ করে মরে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে জাগ্রত হয় তার মাঝে। হুট করে চুলে তীব্র ব্যথা অনুভব হতেই চোখ মুখ খিঁচে ফেলল। কন্ঠনালি গড়িয়ে তীব্র বেরিয়ে এলো আর্তনাদ,

“ছোট মা আমার লাগছে।”
“লাগার জন্যই তো দিয়েছি। কতকাল বাপের হোটেলে বসে খাবি আর ফুলে ঢোল হবি? বাড়ি থেকে বিদেয় হচ্ছিস না কেন? আয়রারও যে বিয়ের বয়স হয়ে এসেছে দেখেছিস? তোর খাওয়া দাওয়া এখন থেকে বন্ধ। দেখি এবার কিভাবে এমন মোটা হোস তুই।”
জামা খামচে ধরল আর্শি৷ ছোটমার প্রত্যেকটা কথা তার হৃদয়টাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। সেই সাথে মাথার তীব্র যন্ত্রণায় নিঃশ্বাস আঁটকে আসতে চাইছে। আর সহ্য করতে না পেরে দিনা হায়দারের হাতটা আর্শি আঁকড়ে ধরল। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে মিনতির স্বরে বলে উঠল,
“আমার সত্যি খুব লাগছে মা। আল্লাহ আমাকে এমন বানিয়ে দিচ্ছে এতে তো আমার হাত নেই বলো। প্লিজ ছেড়ে দেও।”
হাত ধরায় তেঁতে উঠলেন দিনা হায়দার রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল,
“আমার হাত ধরিস তুই। তোর সাহস তো কম না। আজই তোকে একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।”
নিজের কথাটুকু শেষ করেই আর্শির চুলের মুঠো ধরে রান্নাঘরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। চুলা জ্বালিয়ে খুন্তিটা চুলার ওপর রাখতেই ভয়ে শিউরে উঠল আর্শি। সমস্ত শরীরে কম্পন ছড়িয়ে পড়ল ভয়ে। ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল,
“আর এমন হবে না মা। এবারের মতো ছেড়ে দেও। এমনটা করো না। তোমার পা ধরে মাফ চাইছি ছোটমা। এমনটা করো না প্লিজ।”

“চুপ কর মুখপুড়ি। আজ যদি তোকে শিক্ষা না দিই, তাহলে আর কখনো মানুষ হবি না তুই।”
গরম খুন্তিটা হাতে তুলে নিল দিনা হায়দার। খুন্তির লালচে আগুনে তাপ দেখে আর্শির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের পানি অনবরত গড়িয়ে পড়ছে। দু’হাত জোড় করে কাঁপা কণ্ঠে মিনতি করলেও মন গলল না দিনার। গরম খুন্তিটা আর্শির হাতে চেপে ধরলেন তিনি।
“আহ..!”
তীব্র চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো রান্নাঘর। যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল আর্শি। হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিলেও ততক্ষণে লালচে দাগ পড়ে গেছে ত্বকে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মেঝেতে বসে পড়ল আর্শি। চোখ দিয়ে অনবরত ঝরতে লাগল অশ্রুধারা। শরীরটা কাঁপছে অবিরাম। আর্শির চিৎকারে রান্নাঘরে ছুঁটে এলো সিতারা হায়দার। আর্শির হাতের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। তড়িঘড়ি করে আর্শির হাত পানিতে চুবিয়ে দিল। ঝাঁঝের সহিত বলে উঠল,

“কিসব করছিস ছোট। মেয়েটাকে মেরে ফেলবি নাকি। ইশশ! হাতটার কি করেছিস।”
“ওর হয়ে কথা বলতে এসো না আপা। তেইশ বছর চলছে এখনো বিয়ে হচ্ছে না। ও ভুলে গেছে ওর যে একটা ছোট বোনও আছে। তারও তো কিছুদিন পর বিয়ে দিতে হবে। দিন দিন খেয়ে খেয়ে শুধু হাতির মতো হচ্ছে।”
দিনার কথায় বিস্মিত হলো সিতারা হায়দার। কিছুটা অবাক হয়েই বলে উঠল,
“এইগুলা কেমন কথা বলছিস দিনা। আর আর্শি কোথায় এত মোটা? ওর থেকে আরও মোটা মেয়ে আছে যারা বিয়ে করে সংসার করছে। আল্লাহর হুকুম হলে আমাদের আর্শিরও বিয়ে হবে আর ও সুখী হবে দেখে নিস।”
আর্শি ফুঁপিয়েই চলেছে। হাতের তীব্র যন্ত্রণায় কথা বলতে পারছে না। দিনা হায়দার মুখ ভেঙচাল। পরক্ষণেই গমগমে কন্ঠে বলে উঠল,
“মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি। এই মেয়েকে নিয়ে আদিক্ষ্যাতা বন্ধ করো আপা। নিজে ঘাড়ে পড়লে বুঝতে। যত্তসব।”

কথাটুকু বলেই রান্নাঘর প্রস্থার করল দিনা হায়দার। সিতারা হায়দার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সামনে থাকা কন্দনরত মেয়েটার পানে। কি সুন্দর দেখতে মেয়েটা। গোলগাল মুখশ্রীতে যেন অজস্র মায়ার ছড়াছড়ি। এই মেয়ের গায়ে তো ফুলের টোকা দিতেও ভয় হয়। সেখানে দিনা কি করে এত অমানবিক আচরণ করে মেয়েটার সাথে? ব্যথার তাড়নায় কেঁদে চলেছে মেয়েটা। সিতারা বেগম এগিয়ে গেলেন। আর্শির চামড়ার দগদগে ঘা টা দেখেই মুখ পাংশুটে হয়ে গেল। আঁখিদ্বয় ভিজে উঠল সামান্য। ম্লান কন্ঠে বলে উঠল,
“দেখি উঠ। চল এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যাবো।”
“দ..দরকার নেই বড়মা। আমাকে একটু ঔষধ লাগিয়ে দেও শুধু।”
সিতারা হায়দারের মায়া হলো। কথা না বাঁড়িয়ে আর্শিকে ধরে নিয়ে গেল ড্রয়িংরুমে। সোফায় বসিয়ে আর্শিকে বসিয়ে দিয়ে ঘরের দিকে হাঁটা ধরল। বুকে হাত চেপে নিরবে কান্না করে চলেছে আর্শি। আঁখিদ্বয় ঝাপসা হয়ে আছে অশ্রুতে। বারবার মনে পড়ছে কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা। কান্নার তোড়ে শরীরের কম্পন অনুভব হচ্ছে৷ কিছুক্ষণ পর পর শরীরটা কেঁপে উঠছে। আনমনে বিরবির করে বলে উঠল,

“দেখেছো আম্মু! তোমার আর্শি কতটা ভালো আছে? কেন একা রেখে গেলে আমাকে? কেন সাথে নিয়ে গেলে না? আমি বড্ড ক্লান্ত জানো? আব্বুও আমাকে ভালোবাসে না। শুধু আয়রাকে ভালোবাসে।”
কথাগুলো বলতে যেয়ে আর্শির গালগুলো অশ্রুতে ভিজে গেল। মাথাটা নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। নিজের দগদগে হাতে তাকিয়ে হঠাৎই কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি ফুঁটে উঠল উষ্ঠের কোণে। মনে মনে বলল,
“আমার জন্ম নেওয়াটাই বোধহয় ভুল ছিল।”

পুনরায় মৃদুভাবে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। দুইতলার করিডোরের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন। একজোড়া তীক্ষ্ণ, গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে নিচে বসে থাকা আর্শির দিকে।পুরো ঘটনাটা সে শুরু থেকেই দেখেছে। সবটা মানে সবটা। হাত মুঠো বদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল মানুষটা। হুট করে চোয়াল শক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বিরবির করে বলে উঠল
“ড্রামাবাজ!”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২