কালকুঠুরি পর্ব ৫১
sumona khatun mollika
সিভান চোখ খুলতেই দৃশ্যমান হলো অন্ধকার ঘর, রাত কত বাজে বুঝতে পারছে না। তবে চারদিকের অন্ধকার সামনে দুজন বসে বসেই নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে মদের বিদঘুটে গন্ধ ভেসে আসছে। সিভান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইল। মেজাজটা চরম বিগড়ে আছে!
তুলে এনেছে তো এনেছে সামনে দুটো গন্ডার বসিয়ে রেখে গেছে । সিভান চারপাশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো ঘরটায় মাত্র ১ টা জানালা। মনে হয় মুখে কিছু বাঁধা নেই কিন্তু সিভান চিৎকার করছে না। আস্তে করে হাত নাড়িয়ে দেখলো হাতটা যদি সাবধানে টানা হিচড়া করে তো ছাড়াতে পারবে৷
হাত আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খোলার চেষ্টা করতেই হাতটাখুলতে সক্ষম হয় । কিন্তু মোটকা লোকটার ঘুম ভেঙে যায় ।
চোখ ডলতে ডলতেই সিভান পাশে থাকা মদের বোতল দিয়ে ধাম করে তার মাথায় বাড়ি বসিয়ে দেয় । লোকটা কিছুসময় চারপাশে তারা দেখার পরে চোখ বড় করে তাকায়,, সিভান হাত নাড়িয়ে বলে,,
– কিরে স্মৃতিশক্তি যায়নাই?
পাতলা লোকটা তখন সিভানকে পেছন থেকে চেপে ধরে। মোটা লোকটার মাথা ফেটে রক্ত পরছে। চিকনা লোকটার কাছে থেকে নিজেকে ছাড়াতে না পেরে সিভন দুই মিনিট কিছু একটা ভাবলো সবকিছু চুপচাপ তখনি ঢুস করে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল। চিকনা লোকটা সিভান কে ছেড়ে দিয়ে ফট করে নিজের নাক চেপে ধরল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মোটকা লোকটাতো সেন্সলেসই হয়ে গেল। সেই সুযোগে সিভান দৌড়ে বাইরে যাওয়ার সময় বলল,,
“ওয়াও ” ধারালো অস্ত্রের চে বেশি কার্যকরী,, পাওয়ার অফ বায়ুত্যাগ ! ”
দড়জা বাহির থেকে লাগিয়ে দিতে পাতলা লোকটা চেচিয়ে উঠলো,,
– ছি! হরামির বাইচ্চা দরজা খোল!
– পচে মর বাঙ্গির পোলা!
চুপচাপ নিচে বেরিয়ে গোডাউন পর্যন্ত আসতেই ওই লোকটার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল যে তাকে তোলার আদেশ দিয়েছিল। তার হাতে ধারালো রাম দা! মোটা গদাইয়ের মতো কালো লোকটা দেখতে বড্ড বিদঘুটে! সিভান কে ধরে ফেলল সে। রাম দা-র ডগায় গলা রেখে বলল,,
– শালার পয়দাও হারামজাদা শালা!
-তুই হারামজাদা বাঙ্গির পোলা!
-এই!
-আ্যাই! চোখ নামিয়ে ! জানিস আমি কে? জানিস আমার কাকা কে? সামির সিকান্দার!
সামির সিকান্দার! নামটা পুরো গোডাউনের চারদেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। পাশে দাড়ানো চেলাটা কেঁপে উঠল। সামির সিকান্দার! আবার এখানে পৌঁছে না যায় ! সেও অনুরোধ করল সিভানকে ছেড়ে দিতে। সিভানের মুখ ভেংচি দেখে লোকটা আরো ক্ষেপে গেল। সিভানকে রোখ রাঙাতেই সিভান বলে উঠলো,,
” এ, কাইল্লা গদাই, চোখ নামা, বাপরে কি জঘন্য দেখতে মাইরি! ”
লোকটা তখন রাগ সামলাতে না পেরে রাম দা টা তুলে যেইনা তার দিকে কোব বসাবে কোথা থেকে এক কুকুর বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে তার ওপর ঝাপিয়ে পরল। কুকুর টাকে পেছন থেকে একজন আদেশ করল,
” ওযেট কিউটি! ”
সকলে দড়জার দিকে তাকাতেই দেখে কালো শার্ট আর নীল লুঙ্গি পড়া এক শক্তপোক্ত দেহের অধিকারী পুরুষ ! যার চোখদুটো ঝলমল করছে মোমবাতির হলুদ আভায়।
সামির স্হির চিত্তে আওড়ালো,,
” মারামারির মুডে আসিনি, এই বাঙ্গি চল বাড়ি চল! ”
” কে বে তুই? ”
পেছনে দাড়ানো চেলাটা মুখ তুলে বলে,,
– যাইতে দেন ভাই। কোবাইতে ধরলে শুয়াই ফালাইবো। হেরে চিনেন না তাই, হেয় সামির, সামির সিকান্দার ।
লোকটা বুদ্ধিমান । সামিরের চোখ দেখেই মোটামুটি ধারণা করে ফেলেছে সামিরের ভয়াবহতা। তারওপর অন্যজন যখন বলছে, তার মানে রেকর্ডেড শিওর।
লোকটা কিছু না বলেই সিভানকে যেতে দেয় । সামির রিটোকে ডেকে সিভানকে সাথে করে বেরিয়ে যায় । বাড়িতে পৌঁছতেই রাহা তাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। সিয়েরা তখনও জেগে। ইতু ঘুমিয়েছে। সিভানকে দেখে দৌড়ে কোলে চড়ে জিজ্ঞেস করে,
– তোমার কি হয়েছে ভাইয়ু?
– কিছুই হয়নি পাগলি। রাস্তা ভুলে গেছিলাম। যা গিয়ে ঘুমিয়ে পর।
– আচ্ছা ।
সাফিন হাসপাতালে । সিয়াম, নুসরাত, সাথি সবাই সেখানেই। সামির নিজের ঘরে চলে গেল । সিভান বারতি কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল।
পরেরদিন ভার্সিটিতে একটা অনুষ্ঠান ছিল। নাজিয়া অন্য ডিপার্টমেন্ট এর হযেও সামিরদের প্রোগ্রামে গিয়েছিল। স্টুডেন্ট রা এমনিতেই পিকনিক ফিক্সড করেছে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে সামিরকে গান গাইতে বলা হলে সে নাকোজ করে দেয় । কাশেম বোঝালে তাকে রাজি করা সম্ভব হয়। সামির জিজ্ঞেস করল কিসের গান গামু রে বা? রকি চেচিয়ে উঠলো,,
“ভাই, আপনের সাথে যেডি যায়, এক্কের বাঙ্গিমারা গান গাবেন। কি কস তরা? ”
স্টুডেন্টরাও সহমত পোষণ করে। কাশেম কানে কানে বলে,, ভাই মনে করেন ভাবিসাবের সাসাথে যেদিন প্রথম দেখা হয়ছিল, মনে করেন, ভাবিসাবের উদ্দেশ্যে গাইতাছেন। প্লিজ ভাই!
সামির গিটার হাতে তুলে নিয়ে, চোখটা বন্ধ করে একটু হাসলো মনে মনে দেখল দিবা সামনে দাড়িয়ে। অতপর, উচ্চৈস্বরে গাইতে ধরে,,
~যদি ভালোবাসিস আমারে তুই ময়নারে,
তোরে কিইনা দিমু খাঁটি সোনার গয়না রেএ,
তুইযে আমার ময়না মনের পিন্জিরারো পাখি,
আদর কইরা যতন কইরা পুইষা বুকে রাখি,
পাইলে তোরে করমু সুখে সংসারেএ
তোরে কিইনা দিমু খাঁটি সোনার গয়না রে,,
সামিরকে হাসতে দেখে স্টুডেন্ট এবং জুনিয়র রাও বেশ খুশি হয়েছে। তখন আবার রকি উঠে ঘোষণা করে,
” তো স্টুডেন্টস,,, তোমরা না সামির সিকান্দার রে জানাতে চাও তোমরা ছুড়িরা কেন হের ওপর টাল্লি খাওগা? ,, তো নাজিয়া বর্ষার নেতৃত্বে সামির সিকান্দার এর উদ্দেশ্যে একটু নাচ হয়ে যাক,, মেয়েরা চলে আসো,,
নাজিয়া মধ্যে আর আরো কয়েকজন মেয়েরা সঙ্গে হয়ে একটা গানে নাচতে থাকে। গানটার উদ্দেশ্য মূলত সামির সিকান্দার ! ছেলেরাও কয়েকজন নাচছে। সামির হাসিমুখে তাকিয়ে দেখছে,, মিউজিক বাজছে,,
~ হাতে বালা গলায় মালা
কানে যে নাই দুল,,লালরঙা শার্ট পরিয়া
পকেটে নাও ফুল ।
মোরগের মাথার মতো কাটিং মারো চুলে বন্ধু হে,
ম্যানহোলের ঢাকনার মতো…হাতে পড়ো ঘড়ি
পকেটে থাকেনা তোমার একটা কানাকড়ি
গলা ছিলা মুরগির মতো
গোফে মারো টান বন্ধু হে
ছেলে তোর প্রেমে পরার কারণ
তোর শ্যামলা শ্যামলা গড়ন
শ্যামলা গালের কালো দাড়ি ভাল্লাগে!!
সামির গাল টেনে একটু হাসলো। ওদের দোষ নাই। গানটা সামিরের সাথে যায়। সবাই মিলে বেশ একটা কোয়ালিটিফুল টাইম পাস করেছে। তবে মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে গেছে , সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যে নাজিয়া আর সামির সিকান্দার এর বিয়ে হবে।
ওইযে কথায় আছেনা পাব্লিক শুনবে ক রটাবে খ৷
সামিরের কান পর্যন্ত অবশ্য পৌছায়নি খবরটা। নাজিযাকে আগে যেতে বলে সামির একটা ফাইল আনতে আবারো ভার্সিটির ভেতরে চলে যায় ফেরত আসার সময় একজনের সাথে জোরসে ধাক্কা লেগে হাত থেকে ফাইরটা পরে যায় । বিরক্তিতে বলে ওঠে,
– ধের ফকিন্নির ঝি , চোখে দেখতে পাসনা!
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় সামিরের ভেতরটা দুলে ওঠে। বিদ্যুৎ গতিতে পিছে ফিরে দেখে একটা হালকা বাদামি রঙের বোরখা পড়া মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে । মুহুর্তে চারপাশ ভিরে পরিপূর্ণ হয়ে যায় । সামির হন্তদন্ত হয়ে ভিরের মধ্যেই চেচিয়ে ওঠে ,,
“””””” ও বোরখাওয়ালী মেডাম “”””””
বোরখা পড়া মেয়েটা একটু থমকে দাড়ায়। একবার ঘুরে পেছনে তাকায়,, সামিরের পুরো শরীর কেঁপে ওঠে ! সেই চোখ, দৃষ্টতে রৌদজ্জল সেই ঝলক! একি উচ্চতা, একি আবহা, একি করে সম্ভব!
সামির কিছু সময় হা করে তাকিয়ে থাকে। ভিড় ঠেলে সেই বোরখাওয়ালীটা মিশে যায় ভিড়ের মধ্যে। সামির পাগলের মতো তাকে খুঁজে বেরায় ,, শেষ পর্যন্ত পেয়েও যায় । আওয়াজ করে বলে ওঠে,,
” দাড়াও “!!
মেয়েটা শুধু দাড়ায়না ঘুরেও তাকায় , কিন্তু এটাতো সে নয় যাকে সে মাত্র দেখেছে,,
” বলছি… বলছিযে,, আপনার মতো একি বোরখা পরা অন্য কাওকে দেখেছেন, এখনি, এইতো মাত্র এখনি এখানেই ছিল, ফর্সা করে, সুন্দর জোড়া ভুরু , মোটামুটি লম্বা , এই এতোটা হবে আমার গাড় পর্যন্ত, দেখেছেন ? ”
” জ্বি না। ”
সামির আরো অনেক লম্বা সময় ধরে কাঙ্ক্ষিত বোরখাওয়ালী কে খুঁজে বেরায় কিন্তু আশাহত হয়। মাঘ বায়ুর দমকা হাওয়ায় ভেতরটা হিম হয়ে যায়। কি করে মিথ্যা হতে পারে? মাত্র নিজের চোখে দেখেছে সেই চোখ, হৃদবিধ্বংসী সেই চোখ চিনতে সামির সিকান্দার কি করে ভুল করতে পারে!
সামির দুর্বল পায়ে হেঁটে সেই বড় গাছটার নিচে গিয়ে বস । চোখদুটো এঁটে বড় করে দম ফেলে,, সাফিনের কল আসতেই , সেখান থেকে উঠে চলে যায়।
গাছের পেছন থেকে বেরিয়ে দাড়ায় সেই বোরখাওয়ালী মেডাম! তার পাশে পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে ওসি মাহাবুব উদ্দিন ।
” আপনি কি কাঁদছেন ? মাহা, ”
” না, আমি কি করে কাঁদতে পারি স্যার? ”
” কবে দেখা দিচ্ছেন নিজের আসল রূপে? এভাবে চললেতো সামির সিকান্দার কে এরেস্ট করতে আমাকে পাবনা হসপিটাল এ যেতে হবে। কবে দিচ্ছেন তাকে দেখা? ”
” সেই দিন আর বেশি দূরে নেই স্যার। অতি দ্রুতই”
মাহা চোখদুটো তুলে তাকিয়ে দেখল হতাশ হওয়া সামির সিকান্দার ধিরে ধিরে বেরিয়ে যাচ্ছে আপন গন্তব্যে!
” চলুন মেডাম, বেবির সাথে দেখা করতে যাব। ”
” চলুন ”
দিনের আলোর মতো আলোকিত এক বাগান প্রাঙ্গনে বসে আসে এক শিশুকন্যা , পাশে দাড়িয়ে লেজ নাড়াচ্ছে একটা বিড়াল। সে আমাদের ভূমি আর তিতিন! দুষ্টু বাঙ্গির ছা, সামনে মাটিতে পানি ঢেলে কাদা বানিয়েছে । ডানপাশে কিছু সাদা কাগজ! কিছুকিছুতে লেখাও দেখা যাচ্ছে! সে করছেকি,, তিতিনের সামনের দুই পা কাঁদায় ডুবিয়ে সেইসকল কাগজে পায়ের ছাপ তুলছে। আর গীত গাইছে,,
কালকে তুমি ছিলে
কানটা ছিল বিলে।
আজকে তুমি আবার এলে
কান নিয়ে গেল চিলে,
সেতু তাড়তে তাড়তে এসে চিৎকার করে উঠলো,,
– ভুমিইই!! তুই আমার পড়ার বই ছিড়ে পেপার নিয়ে এসেছিস!
– কই না তো!
ভুমি ইশারা করে আবার তিতিনকে শিখিয়ে দিচ্ছে না বলতে,,
– ভিলেনের বাচ্চা! এই বইয়ের দাম পঁচিশ শো!! হায় মাবুদ! আজকে তোকে…… ।
ভুমি ঠোঁট উল্টে চোখ বড় করে দৌড়ে পালাতে লাগলো, সেতুও তার পিছে পিছে ছুটতে শুরু করে একটু দুরে যেতেই ধরে ফেলল,,ভুমি হাতের কাদা সেতুর গালে ডলে দিয়ে বলল,,
কালকুঠুরি পর্ব ৫০
– এই থেতু,, ছাড় আমাকে ছাড়!
– ভুমি! ছিইই!
– ইই,, ইয়ই ইয়ই,,
– তুই আমাকে ভেঙচাচ্ছিস!
– তুই আমাকে ট্যাংটাটটিট!৷
– ভুমি!
– বুমি,,
সেতু তাকে ছেড়ে দিতেই সামহা তিতিনকে কোলে তুলে ভেতরে মারলো দৌড়!!
” হায় খোদা বাপ সমানই জাউরা, মাগো গা! ”
