কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৯
হামিদা আক্তার ইভা
তাহসিন দেশে ফেরার আগ অব্দি আদনান তাহসিনের বাড়িতে ছিল ময়ূরীর জন্য।কিন্তু তাহসিন ফেরার পর আদনান তার বাড়ি থাকতে নারাজ।সে বউ বাচ্চা নিয়ে ফিরে গেছে তার সেই ফ্ল্যাটে আরও বছর তিনেক আগে।কোলের বাচ্চাটা বড় হয়েছে এখন।বড্ড দুষ্টু।তাহসিন নিজের ছোট্ট পরিবার নিয়ে ফিরে এসেছে গ্রামে।ময়ূরীর প্রেগন্যান্সির খবর পাওয়ার আজ দুমাস।মেয়েটা কাউকে এখনও কিছু জানায়নি গ্রামে এসে বলবে বলে।সবার আগে বলবে তার বাবাকে।খুশিতে দিশেহারা মেয়েটা।তাহসিন তাহসিনের ঘরে উপস্থিত ছিল বউকে নিয়ে।ময়ূরীর মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছিল সে।বারান্দা থেকে বাইরে দেখা যাচ্ছে মেঘলা আকাশ।এমন এক মেঘলা দিনে তাহসিন তাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল এই বাড়িতে।ময়ূরী বাচ্চাদের মতো মন খারাপ করে বলল,
“অফিসার?”
তাহসিন কাজে মনোযোগী হয়ে বলল,
“বলো।”
“আমি আব্বার কাছে যাব।”
“যাব তো।”
“এখনই যাব।”
“ঘণ্টা খানিক আগেই গ্রামে এসেছি।এখন সন্ধ্যার আযান দিয়ে দিয়েছে।কাল সকালে যাই?”
ময়ূরীর মনে হচ্ছে আজ বাবার দেখা না পেলে আর কোনোদিন হয়তো বাবাকে দেখতে পারবে না সে।বাবাকে সে এই সুখবরটা দিলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে,তাই না?খুশিতে আত্মহারা হয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন।মাথায় আদুরে হাত স্পর্শ করে বলবেন,
“আমার ছোট্ট মেয়েটা আজ খুব বড় হয়েছে।আমি নানা হচ্ছি আবার।”
তখন ময়ূরী খিলখিল করে হাসবে।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ময়ূরী গুটি গুটি পায়ে আফিয়ার ঘরে উকি মারল,ঠিক যেমনটা এই বাড়িতে প্রথম আসার পর করত।আফিয়া বিছানা ঠিক করছিল।ময়ূরী ঠোঁট টিপে এগিয়ে গেল।আফিয়া ওকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিল।ময়ূরী বুঝল,বড্ড অভিমান হয়েছে তার।ময়ূরী পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে আদুরে স্বরে বলল,
“তুমি এখনও রেগে আছো ভাবি?আমি আজ এতদিন পর এবাড়ি এলাম,তুমি বুঝি খুশি হওনি?চলে যাব আবার?”
আফিয়া ওকে ছাড়িয়ে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল।অভিমানী গলায় বলল,
“তুই কী মানুষ?নাকি ডাক্তার হয়ে তোর ভাব বেড়েছে?”
“এমনটা কেন বলছো?আমি ডিউটির প্রথমেই ছুটি নিতে পারিনি।আবার ফাহাদ আর পুতুলের স্কুলও তো ছিল বলো?ঈদের লম্বা একটা ছুটি পেয়েছে ওরা,তাই তো এলাম আজ।”
“সর,নাটক করিস না।”
আফিয়া বিছানায় বসল আরাম করে।ময়ূরী বসল তার সামনে।হঠাৎ তার চোখ আঁটকে এলো আফিয়ার মুখের দিকে।ময়ূরী তীক্ষ্ণ নজরে আফিয়ার ফ্যাকাশে মুখ আর চোখের নিচের কালিটুকুর দিকে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার হিসেবে তার অভিজ্ঞ চোখ মিথ্যে বলছে না। আফিয়ার ক্লান্তিটা কেবল ঘরের কাজের নয়, এর পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ আছে। ময়ূরী আফিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করতে করতে মৃদুস্বরে বলল,
“ভাবি, শরীরটা কী ইদানীং খুব দুর্বল লাগে? মাথা ঘোরে মাঝেমধ্যে?”
আফিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল। মুখ নামিয়ে বলল,
“আরে না, কাজের চাপে একটু ক্লান্ত লাগে আরকি। তুই এখন এসব ডাক্তারী রাখ তো!”
ময়ূরী ছাড়ল না। সে মুচকি হেসে আফিয়ার একদম কাছে সরে এলো। ওর পেটের দিকে একবার তাকিয়ে রহস্যময় গলায় বলল,
“তুমি আমার কাছে লুকোচ্ছ ভাবি? আমি কিন্তু তোমার চোখের ভাষা পড়েই সব বুঝে গেছি। ডাক্তার হওয়ার আগে আমি তোমার সেই ছোট বোনটা, যার কাছে তুমি কোনোদিন কিছু লুকাওনি। বলো তো, কতদিন হলো তোমার পিরিয়ড মিস হয়েছে?”
আফিয়া এবার থমকে গেল। তার গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম হয়ে উঠল। চারপাশের নিস্তব্ধতায় তার হৃৎস্পন্দন যেন বেড়ে গেছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
“ত-তুই কী সব বলছিস?”
ময়ূরী ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরল আফিয়াকে।আফিয়া তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে গেল একটু।হঠাৎ ময়ূরী শব্দ করে ডুকরে উঠল।আফিয়া ভড়কে গেল খানিক।ওর পিঠে হাত রেখে বলল,
“আরে পাগলি,কাঁদছিস কেন?”
ময়ূরী আফিয়ার দুগাল চেপে ধরে চুমু খেল।আফিয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“তুই কাঁদছিস কেন?ভয় হচ্ছে আমার।”
ময়ূরী বলল,
“তুমি কেন সবাইকে এখনও জানাওনি?”
আফিয়া শুকনো ঢোক গিলে কম্পিত হাত রাখল ময়ূরীর হাতে।বলল,
“গত সপ্তায় জেনেছি।বিশ্বাস কর,আমি আমার জীবনে এত কাঁদিনি।বিশ্বাসই হচ্ছিল না,আমি যে মা হব।কিন্তু এই সংবাদ এখন অব্দি কাউকে জানাতে পারিনি ভয়ে।”
ময়ূরী চোখ ছোট ছোট করে মুখ বাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল।আফিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ময়ূরী আঁচল চেপে দৌঁড়ে গেল দরজার দিকে।আফিয়া চমকে উঠে ওর পিছু নিয়ে বলল,
“এই ফাজিল,যাচ্ছিস কোথায়?ময়ূরী থাম বলছি!”
ময়ূরী কী আর থামে?সে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় উড়তে উড়তে নিচে নেমে এলো। ওর শাড়ির আঁচল মেঝে ছুঁয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে। নিচতলায় ড্রয়িংরুমে তখন বাড়ির পুরুষেরা আড্ডায় মগ্ন। মাহতাব আর তাহসিন ঈদের বাজার নিয়ে সিরিয়াস কিছু আলোচনা করছিল। হঠাৎ ময়ূরীর পায়ের ধুপধাপ শব্দ আর হুড়মুড় করে নিচে নেমে আসা দেখে তাহসিন বিদ্যুৎবেগে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
তাহসিনের কপালে রাগের চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে ময়ূরীর পথ আগলে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“কী হচ্ছে ময়ূরী? এভাবে দৌঁড়াচ্ছ কেন? কাণ্ডজ্ঞান কী একদম লোপ পেয়েছে তোমার? কিছু হয়ে গেলে কে দায় নিত?”
ময়ূরী সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে থামল। পেছনে আফিয়া ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে।তার মুখ ভয়ে নীল হয়ে গেছে।সে ময়ূরীকে ইশারায় চোখ রাঙাচ্ছে যাতে সে মুখ না খোলে। কিন্তু ময়ূরী তো আজ আনন্দে আত্মহারা। সে তাহসিনের কড়া ধমক আর ভ্রুকুটিকে তোয়াক্কাই করল না। বরং তাহসিনের হাতটা খপ করে ধরে চিৎকার করে বলল,
“অফিসার,জানো কী হয়েছে?”
তাহসিন আজ ময়ূরীর প্রত্যেকটা কাণ্ডে অবাক হচ্ছে।বিয়ের ৯ বছরে একবারও কী এই মেয়ে তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেছে?সে শুষ্ক ঢোক গিলে মাথা নাড়ল।ময়ূরী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মাহতাব ভাইজান বাবা হচ্ছে।আফিয়া ভাবি মা হবে।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ড্রয়িংরুমটা যেন একটা স্তব্ধ পাথরের মূর্তির মিউজিয়ামে পরিণত হলো। মাহতাবের হাতের চায়ের কাপটা পিরিচের উপর ঠক করে শব্দ করে উঠল। সিতারা বেগম রান্নাঘর থেকে হাতে খুন্তি নিয়েই বেরিয়ে এলেন।তিনি ফাহাদ আর পুতুলের জন্য কিছু একটা বানাচ্ছিলেন।সবার চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া।
সবাই জানে, এই বাড়ির বড় বউ আফিয়ার কোল দীর্ঘ অনেক গুলো বছর ধরে শূন্য। কত ডাক্তার, কত কবিরাজ আর কত মানুষের কটু কথা যে এই মেয়েটিকে সহ্য করতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তারা তো একপ্রকার মেনেই নিয়েছিল যে আফিয়া কোনোদিন মা হতে পারবে না। আজ এত বছর পর ময়ূরীর মুখে এই কথা শুনে কারও যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না।
মাহতাব কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“ময়ূরী… তুমি কী ইয়ার্কি করছ? তুমি তো জানো ডাক্তাররা কী বলছিল। এত বছর পর এসব কী করে সম্ভব?”
ময়ূরী হাসতে হাসতে বলল,
“আমি ডাক্তার হয়ে কী মিথ্যে বলব? আল্লাহর রহমতের কাছে মানুষের বিজ্ঞান বড় তুচ্ছ।”
মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হলো। সিতারা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠে আফিয়াকে বুকে টেনে নিলেন। এত বছরের সেই ‘বাঁঝা’ অপবাদ আজ এক লহমায় ধুইয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। তাহসিন বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল গলায় বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ বলো ভাইয়া। আমি আবার চাচা হচ্ছি।”
মাহতাব তখন এক নজরে আফিয়ার লাজুক বদন পানে তাকাল।মেয়েটা হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে।
সবার এই বাঁধভাঙা আনন্দের মাঝে ময়ূরী এক কোণে দাঁড়িয়ে আলতো করে নিজের পেটে হাত রাখল। তার ভেতরেও তো এক আকাশ সমান সুখ আজ তোলপাড় করছে। কিন্তু সে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে ধরে রাখল। এই খবরটা সে সবার আগে তার বাবাকে দিতে চায়। কাল সকালে যখন বাবার কাছে যাবে, তখন এই আনন্দের সাথে নিজের খবরটাও যোগ করে দেবে—ভাবতেই ময়ূরীর বুকটা গর্বে ভরে উঠল।
আফিয়া সেই তখন থেকে কাচুমাচু করে বসে আছে বিছানায়।মাহতাব দুহাত পেছনে বেঁধে পুরো ঘর পায়চারী করছে মিনিট বিশেক ধরে।কপালে গাঢ় ভাঁজ।আফিয়া বিরক্ত হচ্ছে লোকটার কান্ড দেখে।শেষে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি এভাবে পায়চারী করছেন কেন?”
মাহতাব সোজা হয়ে দাঁড়াল।নিজের মাথা চুলকে আফিয়ার দিকে ফিরল।পলক পিটপিট করে বলল,
“তুমি বাবা হচ্ছ কিভাবে?”
আফিয়া নাক কুঁচকে বলল,
“আমি বাবা হতে যাব কেন?বাবা তো আপনি হচ্ছেন।”
মাহতাব থমথমে খেয়ে বলল,
“মানে তুমি প্রেগন্যান্ট হলে কিভাবে?”
আফিয়া নাক ফুলাল।লোকটার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল?এসব কেমন ধরনের প্রশ্ন? একরাশ বিস্ময় আর রাগ নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লোকটা কী খুশিতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, নাকি সত্যিই তাকে সন্দেহ করছে?
আফিয়া কড়া গলায় বলল,
“এসব কী ধরনের কথা মাহতাব? এত বছর পর আল্লাহ যখন আমাদের দিকে মুখ তুলে চাইলেন, তখন শুকরিয়া না করে আপনি এমন আবোল-তাবোল প্রশ্ন করছেন? আমি প্রেগন্যান্ট হলাম কীভাবে মানে? এটা কী আমি একা একাই হয়েছি?”
মাহতাব এবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে দ্রুত আফিয়ার কাছে গিয়ে ওর দুহাত ধরে তোতলামি করে বলল,
“আরে না না, তুমি ভুল বুঝছ আফিয়া। আমি আসলে… আমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারছি না। আমরা তো সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ ময়ূরী যখন এটা বলল, আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্নে আছি। আমি তো নিজেকে বাবা হিসেবে কল্পনা করাই ছেড়ে দিয়েছিলাম!”
আফিয়া এবার একটু নরম হলো। মাহতাবের চোখের কোণে জমে থাকা চিকচিক করা জলটুকু তার নজরে পড়ল। লোকটা আসলে এত বছরের সেই বিশাল শূন্যতার ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারছে না।
আফিয়া মৃদু হেসে মাহতাবের হাতটা নিজের পেটের উপর রাখল।
“আল্লাহ চাইলে সব হয়। দেখুন,এখানে আপনার রক্ত বড় হচ্ছে।”
মাহতাব আফিয়াকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল আফিয়ার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে।এত সুখ সুখ কেন লাগছে আজ?সব সুখ বুঝি আজ মাহতাবের ঘরে হাজির হয়েছে?
“ও মা! আমার ঘুম আসে না।”
পাশ থেকে ফাহাদ বলল,
“তুমি বকবক না করে চোখ বন্ধ করো।”
পুতুল বলল,
“মামা,তোমাকে কিন্তু মার দিব আমি।আমি কী তোমার সাথে কথা বলছি?”
ময়ূরী বলল,
“তোরা ঝগড়া না করে ঘুমা।কত রাত হলো,দেখেছিস?”
ফাহাদ মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আমি তোমার সাথে ঘুমাতে চাইনি আপা।”
ময়ূরী কপাল কুঁচকে বলল,
“আমার কাছে থাকলে কী সমস্যা?”
ফাহাদ আড়চোখে তাহসিনকে দেখে ফিসফিস করে বলল,
“দুলাবাই তোমার কাছে ঘুমাতে বারণ করেছে।”
তাহসিন তখন ফোন টিপছিল।শালার কথা শুনে বলল,
“এত ছানাপোনা চিপকে থাকলে আজ বাবা হতে পারতাম না বেগম সাহেবা।”
“আপনি চুপ করুন বেহায়া লোক।”
আজ পুতুল আর ফাহাদ ওদের সাথেই ঘুমাবে।ময়ূরীই মূলত বাচ্চাদের আজ সাথে রেখেছে।মধ্যরাতে যখন ময়ূরীর ঘুম ভাঙল,তখন পুতুল তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।ওর ভালো লাগছে না।অস্থির অস্থির লাগছে।মনে হচ্ছে মাকে একটু জড়িয়ে ধরতে।বাবার বুকে মাথা রাখতে।ছটফট করে সে উঠে বসল।বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গেল।দোতলা থেকে আপছা আলোয় গ্রাম দেখা যাচ্ছে। বারান্দার শীতল হাওয়া ময়ূরীর তপ্ত কপালে এসে লাগল, কিন্তু মনের ভেতরের অস্থিরতা কমল না। নিঝুম রাতের অন্ধকারে গ্রামটাকে আজ অন্যরকম অচেনা লাগছে। মেঘলা আকাশ চিরে মাঝে মাঝে রুপালি চাঁদের আলো উঁকি দিচ্ছে, ঠিক যেমনটা ময়ূরীর মনের কোণে ভয়ের মেঘ উঁকি দিচ্ছে। সে বারান্দার রেলিং ধরে অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কেন যেন অকারণেই কেঁপে উঠছে বারবার।
পিছন থেকে একটা চাদর ওর কাঁধে জড়িয়ে দিতেই ময়ূরী চমকে উঠল। তাহসিন কখন ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি। তার কণ্ঠস্বর রাতের বাতাসের মতোই শান্ত,
“ঘুম আসছে না? নাকি ওই দুটোর ছটফটানিতে বিছানা ছাড়তে হলো?”
ময়ূরী তাহসিনের হাতটা নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট স্বরে বলল,
“বুকের ভেতরটা কেমন জানি শূন্য লাগছে। মনে হচ্ছে, একমুঠো রোদ দেখার জন্য ছটফট করছি। জানেন, আব্বার কথা খুব মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে উনি এই রাতের অন্ধকারের ওপারে আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন।”
তাহসিন ময়ূরীর কপালে নিজের চিবুক ঠেকাল।
“আসলে রাত যখন গভীর হয়, তখন স্মৃতির জানালারাও নিঃশব্দে খুলে যায়। তোমার এই অস্থিরতা আসলে ভয়ের নয়, এ হলো এক বড় প্রাপ্তির আগের অস্থিরতা। জোয়ার আসার আগে সমুদ্র যেমন শান্ত হয়েও উত্তাল থাকে, তোমার মনটাও ঠিক তেমনই।”
ময়ূরী ধরা গলায় বলল,
“যদি খারাপ কিছু হয়? আপনি আমায় কথা দিন কাল ভোরেই নিয়ে যাবেন।”
তাহসিন ময়ূরীর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে ওর চোখে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“শোনো ময়ূরী, ভাগ্য সবসময় আমাদের মর্জিতে চলে না, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে ভাগ্যকেও হার মানানো যায়। ‘আকাশের মেঘ যদি আজ কালো হয়, তবে জানবে কালকের সূর্যটা আরও বেশি রক্তিম হবে’। তোমার আব্বার দোয়া তোমাকে ঘিরে আছে, আর আমার বিশ্বাস তোমাকে আগলে রাখবে। অহেতুক চিন্তা করে এই মায়াবী রাতটাকে কলঙ্কিত করো না।”
ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাহসিনের বুকে মাথা রাখল। তাহসিন ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে আবার বলল,
“মানুষের মন বড় বিচিত্র; সে যখন পরম কোনো সুখের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন হুট করে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তোমার ভেতরে যে নতুন প্রাণের স্পন্দন, সে হয়তো আজ তার নানার সাথে দেখা করার জন্য তোমার চেয়েও বেশি ছটফট করছে। একটু ধৈর্য ধরো, ভোর হতে তো আর বেশি বাকি নেই।”
তাহসিনের এই আত্মবিশ্বাসী উক্তিগুলো ময়ূরীর মনে স্নিগ্ধ প্রলেপের মতো কাজ করল। সে জানালার গ্রিল ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “আব্বা, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তোমার ছোট্ট মেয়েটা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রত্ন নিয়ে তোমার কাছে ফিরছে। তুমি থেকো আব্বা, তুমি থেকো।”
ঘরের ভেতরে পুতুল আর ফাহাদ তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। তাহসিন ময়ূরীকে ঘরে নিয়ে এলো। বিছানায় শুইয়ে দেয়ার সময় ময়ূরী তাহসিনের হাতটা শক্ত করে ধরল।
“কিচ্ছু হবে না তো?”
তাহসিন ওর কপালে গাঢ় এক চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“কিচ্ছু হবে না। আমাদের এই রূপকথা কেবল শুরু হয়েছে , এর শেষটা যে অনেক বেশি সোনালী হবে।”
ভোরের সেই ঝাপসা আলো-আঁধারিতে চারপাশটা বড় বেশি নিস্তব্ধ। কুয়াশার চাদরে ঢাকা মেঠোপথ দিয়ে যখন ওরা এগোচ্ছিল, তখন গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু টুপটুপ করে ময়ূরীর উপর পড়ছিল। শীতল বাতাস যেন তীরের মতো বিঁধছে শরীরে, কিন্তু ময়ূরীর মনের ভেতরের অস্থিরতা সেই ঠান্ডার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র। তাহসিন ওর হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটছে, অথচ ময়ূরীর মনে হচ্ছে তার পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আসছে। প্রতিটি কদম যেন এক একটা যুগ।
ফরাজী বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ময়ূরী যখন বারবার করাঘাত করছিল, সেই শব্দটা নিস্তব্ধ ভোরের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ময়ূরীর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। সে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগল,
“আব্বা! ও আব্বা! দরজা খোলো।”
অনেকক্ষণ পর পাশের ছোট দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। ময়ূরীর চাচি আলুথালু বেশে বেরিয়ে এলেন। ময়ূরীকে এই অসময়ে দেখে তিনি একদম হকচকিয়ে গেলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখে এক চিলতে অমলিন হাসি ফুটে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে ময়ূরীর কপালে হাত রেখে বললেন,
“আরে ময়ূরী! কাল না বললি সকালে আসবি বাড়িতে? মা রে, তোর আব্বা কাল সারাটা দিন শুধু তোর কথাই বলছিল। বলছিল—আমার ময়ূরীটা আসবে, আমার মন বলছে ও আসবে। চল ভেতরে চল, তোর আব্বা বোধহয় এখনও ঘুমে। রাতভর জেগে তোর জন্য তসবিহ পড়েছে লোকটা।”
চাচির এই সহজ হাসি আর স্বাভাবিক কথাগুলো ময়ূরীর বুকের ভেতরটা অস্থির করে তুলল। এই যে স্বাভাবিকতা, এটাই যেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। চাচি তো জানেন না যে ভেতরে কী নিস্তব্ধতা ওত পেতে আছে। ময়ূরী আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝড়ের বেগে বাবার ঘরের দিকে দৌঁড়ে গেল। চাচি পেছন থেকে বলতে লাগলেন,
“আস্তে যা, তোর আব্বা হয়তো কেবলই চোখটা বুজছে।”
ময়ূরী ধড়াস করে বাবার ঘরের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা ভ্যাপসা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এলো।ময়ূরী কাঁপাকাঁপা হাতে দেয়ালের সুইচে চাপ দিতেই পুরো ঘরটা তীব্র সাদা আলোয় ভেসে উঠল। সেই আলোয় বিছানার দিকে তাকাতেই ময়ূরী কেঁপে উঠল। বক্কর ফরাজী আধশোয়া অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন, তার দেহটা অস্বাভাবিক ভাবে কুঁকড়ে আছে।
মেয়ের পায়ের শব্দ কিংবা ঘরের ওই আকস্মিক আলো—ঠিক কোন জাদুতে কে জানে, তিনি শেষবারের মতো তার সেই রক্তাভ, ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো মেলে ধরলেন। ময়ূরীকে ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখামাত্রই তার জীর্ণ শরীরটা শেষবারের মতো কেঁপে উঠল। তার সেই লালচে ঝাপসা চোখ দুটোর কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, যেন সারারাত আজরাইলের সাথে পাঞ্জা লড়ে তিনি কেবল এই একটি মুহূর্তেরই অপেক্ষা করছিলেন—এক পলক মেয়েকে দেখার জন্য।
ময়ূরী আর্তনাদ করে ছুটে গিয়ে বিছানার পাশে আছড়ে পড়ল,
“আব্বা! ও আব্বা! আমি এসেছি!”
বক্কর ফরাজী কোনো কথা বললেন না। তিনি তখন সব যন্ত্রণার অতীত। সারারাত তিনি একাই লড়াই করেছেন কেবল এই একটি মুহূর্তের জন্য—যাতে যাওয়ার আগে তার কলিজার টুকরোটাকে একবার দেখে যেতে পারেন। বিধাতা তার সেই শেষ আকুতিটুকু কবুল করেছেন; দেখা পাওয়ার ঠিক পরক্ষণেই তিনি তার আমানত সঁপে দিয়েছেন পরম করুণাময়ের হাতে।তাহসিন আর চাচি তখন দরজার সামনে।চাচি হায়হায় করে ছুটে এলেন।তাহসিন দরজা চেপে ধরল।আব্বা কী আর নেই? তার চোখের সামনে আজ কয়েক বছর আগের সেই স্মৃতিটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে—যেদিন ময়ূরী ঠিক একইভাবে তার মায়ের জন্য হাহাকার করেছিল। তাহসিনের ভেতরে আজ এক তীব্র আত্মদহন শুরু হয়েছে। এমন করেই তো একদিন আম্মা বিদায় নিয়েছিলেন।এমন করেই তার কলিজার টুকরা স্ত্রী পাগলের মতো ছুটে এসেছিল মায়ের কাছে।সে কেন কাল রাতে ময়ূরীকে ফরাজী বাড়ি নিয়ে এলো না?কেন মনে হলো না সেই কালো অতীতের কথা?
ময়ূরীর আর্তনাদ দেয়াল ফেটে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। সে পাগলের মতো বাবার নিথর বুকটা ঝাঁকাতে লাগল। বক্কর ফরাজীর দেহটা তখনো সামান্য উষ্ণ, কিন্তু চোখের পাতা দুটো আর কোনোদিন নড়বে না।
“ও আব্বা! উত্তর দাও না কেন? কথা বলো, তাকাও আমার দিকে! একবার শুধু চোখটা মেলো আব্বা। দেখো, তোমার কলিজার টুকরা মেয়েটা কত বড় একটা সংবাদ নিয়ে এসেছে। আমি কাউকে এই কথা বলিনি,শুধু তোমায় সবার আগে এই খুশির সংবাদ জানাব বলে সারা রাত ছটফট করেছি। ও আব্বা, শোনো না আমার কথা!”
কান্নায় তার কণ্ঠ বুজে আসছে, তবুও সে থামছে না।নিজের পেটে হাত রেখে বলল,
“দেখো আব্বা, এখানে তোমার নাতি কিংবা নাতনি আছে। তুমি বলেছিলে না, ওদের নাম তুমিই রাখবে? তবে কেন আজ এমন পাথরের মতো হয়ে আছো? কেন আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছ?”
তিনি আর চোখ খুললেন না। তিনি যে পৃথিবীর মায়া চিরতরে ত্যাগ করেছেন। একবার পরকালের আহ্বানে চোখ বুজে এলে সেই চোখ কী আর কখনো খোলে? না, খোলে না। এই নিথর নিস্তব্ধতাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য।
মানুষের চোখ দুটো যখন নিভে যায়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল কিছু স্মৃতি আর একরাশ হাহাকার। যে চোখ একসময় স্নেহের পরশ বিলিয়ে দিত, আজ সেই চোখ পাথরের মতো স্থির। বিচ্ছেদই তো জীবনের শেষ গন্তব্য, যেখানে কোনো ফেরারি পথের সুযোগ নেই।
ময়ূরী তার বাবার নিথর দেহের উপর আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই তো কিছুক্ষণ আগেও বাবার নিশ্বাস বইছিল, এই তো তিনি তার প্রতীক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এখন? এখন কেবল নিস্পন্দ মাংসপিণ্ড। মৃত্যু হলো সেই চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ, যার ওপার থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে এসে কুশল সংবাদ নেয় না। বক্কর ফরাজী আজ সব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে। তার সেই মায়াবী চোখ দুটো আজ চিরতরে অন্ধকারের যাত্রী।
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৮
“জীবন বড় নিষ্ঠুর; আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিগুলো সেই মানুষটাকেই উৎসর্গ করতে চাই, যিনি সব শোনার ঠিক এক মুহূর্ত আগেই অনন্তকালের মৌনতা অবলম্বন করেন। মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের প্রস্থান নয়, মৃত্যু মানে হলো একটি জ্যান্ত মানুষের বুক চিরে তার অস্তিত্বের শিকড়টাকে উপড়ে ফেলা—যার শূন্যস্থান কোনো কাল বা কোনো মানুষের স্পর্শেই আর কোনোদিন পূর্ণ হয় না। সব আলো জ্বলে ওঠে ঠিকই, কিন্তু যার জন্য এই দীপাবলি, সেই মানুষটিই তখন মাটির ঘরের নিস্তব্ধ বাসিন্দা।”
