কিশোরী কন্যা পর্ব ৫০
হামিদা আক্তার ইভা
চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর জুড়ে। তাহসিনের সেই বিশাল ঘরে এক ছোট্ট বাচ্চা হাউমাউ করে কাঁদছে ভয়ে। ময়ূরী দেয়াল হাতড়ে নরম গলায় বলে,
“বাবা, এভাবে চিৎকার করো না। বাবা শুনলে মাকে বকবে।”
বাচ্চাটা বোধহয় মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়নি।এমন সময় হাতে ফোনের লাইট অন করে চোয়াল শক্ত করে প্রবেশ করল তাহসিন। ছেলেকে মেঝেতে বসে চিৎকার করতে দেখে রাগী চোখে ময়ূরীর দিকে তাকাল। ময়ূরী লাইটের আলোয় ছেলেকে কোলে তুলে নিতেই তাহসিন বলল,
“তোমার আক্কেল নেই ময়ূরী? ছেলেকে একা রেখে বাইরে গিয়েছিলে কেন?”
ময়ূরী গাল ফুলিয়ে বলল,
“নিচে রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কুসুমের শ্বশুর বাড়ির মানুষ এই এলো বলে।”
এমন সময় কারেন্ট চলে এলো। ময়ূরীর কোলে আড়াই বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। দেখতে পুরো মায়ের মতো হলেও, গায়ের রং হয়েছে বাবার মতো চাপা। সে ভেজা চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে হাত বাড়িয়ে দিল।
“উ বাবা, কুলে নিবা না?”
তাহসিন ছেলেকে কোলে নিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। বলে,
“আম্মা আপনাকে একা রেখে গিয়েছিল আব্বু?”
ছেলের নাম রাখা হয়েছে তৌহিদ সওদাগর। নামটা রেখেছে মাহতাব। তাদের ঘরেও এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে। বাচ্চাটার নাম মাহিম সওদাগর। কয়েক মাসের ছোট বড় ওরা। দুই ভাই মিলে পুরো বাড়ি মাথায় উঠিয়ে রাখে। ছোট্ট ছোট্ট বুলি দিয়ে সবাইকে পাগল বানিয়ে ছাড়ে। পুতুল এমন সময় দৌঁড়ে ঘরে এলো। তৌহিদকে বাবার কোলে দেখে লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“ও কাঁদছিল কেন বাবা?”
তাহসিন বলল,
“আপনার ভাইকে একা রেখে কোথায় গিয়েছিলেন আম্মা? ভাই তো একা একা ভয় পাচ্ছিল।”
ছোট্ট পুতুল ঠোঁট উল্টে বলল,
“মামার সাথে খেলছিলাম বাবা। ভাই কী খুব বেশি ভয় পেয়েছে?”
তাহসিন মাথা নাড়ায়। ময়ূরী তখন ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট সংসার দেখছিল। সেই দিন আব্বার মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েকটা বছর। তখন সে দুই মাসের গর্ভবতী ছিল। আর আজ সেই গর্ভের সন্তানের আড়াই বছর চলে। দিন কোথা দিয়ে চলে যায়, বলা বড্ড মুশকিল!
তাহসিন তৌহিদকে বিছানায় নামিয়ে দিতেই সে লাফিয়ে গিয়ে পুতুলের কোলের উপর আছড়ে পড়ল। পুতুল “উহ্” করে এক আর্তনাদ করলেও ভাইকে সজোরে জড়িয়ে ধরল। ময়ূরী ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের ছায়াটা দেখছিল। তার চোখের নিচে ক্লান্তির চেয়েও বেশি ফুটে আছে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সে তাহসিনের দিকে ফিরে মৃদুস্বরে বলল,
“আজ মাহিমও খুব কান্নাকাটি করছিল। মাহতাব ভাই ওকে নিয়ে ছাদে গিয়েছেন । আমাদের এই দুটো বাঁদর যখন একসাথে হয়, তখন মনে হয় বাড়িটা আস্ত রাখা যাবে না।”
তাহসিন পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে দেখল। রাত বাড়ছে। সে ময়ূরীর নিকট এগিয়ে এলো। ময়ূরীর কাঁধে হাত রেখে আয়নায় ওর প্রতিচ্ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“শোনো ময়ূরী, বিশৃঙ্খলা সবসময় খারাপ নয়। এই যে বাচ্চাদের চিৎকার, দৌঁড়াদৌঁড়ি—এগুলোই তো জীবনের স্পন্দন। একসময় এই বাড়িটা পাথরের মতো নিস্তব্ধ ছিল, অপমানের কালো ছায়ায় ঢাকা ছিল। আজ তৌহিদ আর মাহিমের এই আধো-আধো বুলিগুলোই সেই পাথর ফাটিয়ে হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে দিয়েছে।”
ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় তাকিয়ে থাকা তাহসিনের চোখে চোখ রাখল। সে খুব নিচু স্বরে বলল,
“কিন্তু তৌহিদ যখন বড় হয়ে ওর নানার কথা জানতে চাইবে? আমি কী ওকে সেই ভোরের গল্পটা বলব? নাকি ওকে শুধু বলব ওর নানা ওকে দেখার জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন?”
তাহসিন ময়ূরীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“মানুষের ইতিহাস সবসময় জয়-পরাজয়ের হয় না ময়ূরী, কিছু ইতিহাস গভীর মমতার হয়। তুমি ওকে সেই মমতার গল্পটাই শোনাবে।”
ময়ূরী তাহসিনের বুকে মাথা রাখল। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে মাহিমের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। মাহতাব ওকে ছাদ থেকে নিচে নামিয়ে আনছে বোধহয়। তৌহিদ তখন পুতুলের কান ধরে টানছে আর বলছে,
“আপু, লজেন দাও!”
পুতুল হেসে বলল,
“বাবা দেখো, তোমার তৌহিদ সওদাগর এখন থেকেই ডাকাতি শুরু করেছে!”
তাহসিন হেসে তৌহিদকে কোলে তুলে নিয়ে ওর গোলগাল পেটে সুড়সুড়ি দিতে দিতে বলল,
“সে তো হবেই! ও কার ছেলে ভুলে গেছেন?”
তৌহিদ খিলখিল করে হেসে উঠল। এক অময় হাসতে হাসতে নাক টেনে টেনে বলল,
“উ আল্লাহ! আমারে বাঁচাউ।”
তাহসিন ওকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে দোল খেতে খেতে বলল,
“আল্লাহর বান্দা এখন থেকেই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছেন? দাঁড়ান বাঘের বাচ্চা, আপনাকে আজ ছাড়াই হবে না।”
ময়ূরী এক পাশে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছিল। তৌহিদের হাসির শব্দে যেন তার জীবনের সব পুরনো ক্ষত মুহূর্তেই শুকিয়ে যায়। পুতুল তখন তৌহিদের হাত থেকে নিজের কান ছাড়িয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“বাবা, ও তো বড় হয়ে পুরো বাড়িটাই ওর দখলে নিয়ে নেবে। এখনই যে দাপট!”
এমন সময় নিচ থেকে মাহতাবের উচ্চস্বরের ডাক শোনা গেল। তিনি মাহিমকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন আর বলছেন,
“কইরে তাহসিন? কুসুমের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তো গেট দিয়ে ঢুকল। জলদি নিচে আয়। ময়ূরী, তুমিও একটু আসো।”
তাহসিন তৌহিদকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে ময়ূরীর দিকে তাকাল। আয়নায় ময়ূরীর প্রতিচ্ছবিটা আজ বড্ড উজ্জ্বল লাগছে। তাহসিন মুচকি হেসে বলল,
“শোনো ময়ূরী, সময় হয়তো অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু সে যখন ফিরিয়ে দেয়, তখন দুহাত ভরেই দেয়। আজ এই কোলাহল, বাচ্চাদের এই খুনসুটি—এটাই তো আমাদের সার্থকতা। ‘জীবন হলো এক বহমান নদী, যা মাঝপথে পাথর পেলেও নিজের চলার ছন্দ ভোলে না’।”
নিচে তখন মাহতাবের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কুসুমের শ্বশুরবাড়ির লোকজন গেট দিয়ে ঢুকেছে বোধহয়। মাহতাব মাহিমকে কোলে নিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ফের ডাক দিল,
“কইরে তাহসিন? নিচে আয় জলদি।”
তাহসিন পাঞ্জাবিটা ঠিক করে নিয়ে নিচে নেমে গেল। ময়ূরী তৌহিদকে একটা সুন্দর নীল রঙের জামা পরিয়ে দিয়ে পুতুলের হাত ধরে ড্রয়িংরুমে এলো। সেখানে তখন উৎসবের আমেজ। কুসুমের শাশুড়ি আর ননদ সোফায় বসে গল্প করছিলেন। ময়ূরীকে দেখেই কুসুমের ননদ শোরগোল করে উঠল,
“ওমা! আমাদের ডাক্তার ভাবি তো দেখি দিন দিন আরও সুন্দরী হচ্ছেন! আর এই যে তৌহিদ বাবা, এদিকে আসো তো দেখি।”
তৌহিদ মাহিমকে দেখেই কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে লাগল। মাহিমও তখন মাহতাবের কোল থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই ভাই মাটিতে নামামাত্রই শুরু হলো তাদের দৌঁড়াদৌঁড়ি। তৌহিদ মাহিমের কান ধরে টানছে, আর মাহিম ওর চুল খামছে ধরছে। মাহতাব হাসতে হাসতে বলল,
“এই দুই বাঁদর যখন এক হয়, তখন মনে হয় বাড়িটা কোনো সার্কাস।”
কুসুমের শাশুড়ি হাসিমুখে ময়ূরীর মাথায় হাত রেখে দোয়া করে বললেন,
“আল্লাহ তোমাদের এই সুখ বজায় রাখুক মা। কুসুম সবসময় তোমার গল্প করে।”
ময়ূরী চায়ের ট্রে হাতে সবাইকে আপ্যায়ন করতে করতে এক কোণে দাঁড়িয়ে তার এই সাজানো সংসারটা দেখছিল। কুসুমের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তৌহিদ আর মাহিমের দুষ্টুমি দেখে হেসেই প্রায় খু’ন। তাহসিন আর মাহতাব সোফায় বসে হাসিমুখে বাচ্চাদের কাণ্ড দেখছে। ভালোবাসা যখন ত্যাগের আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, তখন তার ছাই থেকেও এমন এক মায়াবী রূপকথা জন্ম নেয়, যা চিরকাল মানুষের মনে প্রশান্তির ছায়া হয়ে থাকে।
আফিয়ার শরীরটা বড্ড ভার হয়েছে বয়সের সাথে সাথে। কুসুমদের আপ্যায়ন করছেন বাড়ির কর্তিরা। ময়ূরী গুটি গুটি পায়ে বড় চাচা শ্বশুরের ঘরে এলো। সেখানে আফিয়া শ্বশুরের খাবার নিয়ে এসেছিল। ভারী শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে চেয়ারে। ময়ূরী ঘরে প্রবেশ করতেই আফিয়া বলল,
“তুই এলি কেন?”
ময়ূরী বলল,
“বড় আব্বার খাবার শেষ হয়নি?”
“হয়ে গেছে। কিছু বলবি?”
“তেমন কিছু না। কাজ হলে চলো বাইরে। সবাই ডাকছেন তোমাকে।”
আফিয়া মাথা নাড়িয়ে এটো প্লেট গুলো নিয়ে ময়ূরীর সাথে বেরিয়ে এলো। রাতে সবার খাওয়া দোয়া শেষে ময়ূরী তৌহিদকে নিয়ে মাহতাবের ঘরে এলো। মাহিমকে আফিয়া ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ময়ূরীকে দেখে আফিয়া উঠে বসল। তৌহিদ মাহিমকে দেখে চিৎকার করে বলল,
“বাই, কেলবা না?”
তৌহিদের আধো-আধো ডাক শুনে মাহিম তার ছোট্ট চোখজোড়া পিটপিট করে মেলে তাকাল। ঘুমের ঘোরটা মুহূর্তেই কেটে গেছে। তৌহিদ বিছানায় উঠে মাহিমের গায়ের উপর একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। আফিয়া বলল,
“এখন সারা রাত এই দুই বাঁদর মিলে কুরুক্ষেত্র বাধাবে!”
ময়ূরী মুচকি হেসে তৌহিদকে টেনে একটু সরিয়ে বসাল। তৌহিদ মাহিমের গাল টিপে দিয়ে নিজের ভাষায় কী যেন এক দীর্ঘ গল্প জুড়ে দিল। মাহিমও হাত-পা ছুড়ে তার প্রত্যুত্তর দিচ্ছে। ওদের এই নিজস্ব জগতের কথপোকথন দেখে ঘরের ভারী আবহাওয়াটা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল।
আফিয়া ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোর মনে আছে ময়ূরী? এই ঘরটা একসময় কেমন গুমোট হয়ে থাকত। কত রাত আমি শুধু একটা সন্তানের জন্য হাহাকার করেছি। আজ এই চিৎকার শুনলে মনে হয়, জীবন বুঝি আমাদের সব পাওনা সুদে-আসলে মিটিয়ে দিয়েছে।”
ময়ূরী আফিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“আসলে রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলোটাও তত বেশি উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয় ভাবি। এত বছরের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল বলেই আজ মাহিমের এই একটা ডাক আমাদের কাছে হাজারটা মতির চেয়েও দামী। ‘ধৈর্য যখন ইবাদতে পরিণত হয়, তখন বিধাতা নিজ হাতে তার সার্থকতা লিখে দেন’।”
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে তাহসিনের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সে মাহতাবের সাথে কুসুমের শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের বিদায় দিয়ে বারান্দায় ফিরছে। তাহসিন ঘরে উঁকি দিয়ে দৃশ্যটা দেখে দরজায় হ্যালান দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। সে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার? তৌহিদ সওদাগর কী আজ এখানেই আস্তানা গাড়বেন? অফিসার কিন্তু ডিউটি শেষ করে ঘরে একা।”
ময়ূরী দুষ্টুমি করে তৌহিদকে দেখিয়ে বলল, “আপনার ছেলেই তো যেতে চায় না। ভাইয়ের সাথে কী সব জরুরি শলাপরামর্শ করছে দেখুন!”
তাহসিন এগিয়ে এসে মাহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তৌহিদকে কোলে তুলে নিল। তৌহিদ তখন তাহসিনের পাঞ্জাবির কলার খামছে ধরে বলল,
“বাবা, বাই কেলবে।”
তাহসিন হেসে ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৪৯
“ভাই কাল খেলবে বাবা। এখন যে চাঁদের আলোয় স্বপ্ন দেখার সময়। জীবনের সব প্রাপ্তিই তো এই একটা নিস্তরঙ্গ রাতের মতো শান্ত আর সুন্দর হওয়া উচিত, তাই না বেগম সাহেবা?”
ময়ূরী উঠে দাঁড়াল। মুচকি হেসে তাহসিনের সাথে পা বাড়িয়ে একবার পিছু ফিরে আফিয়াকে বলল,
“শুভরাত্রি ভাবি।”
