Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৪

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৪
মারিয়াম ফুল

“আমার বাচ্চা ঠিক আছে? কথা বলুন না। কেউ নেই আমার এই দুনিয়াতে। ওর বাবাও নেই। ওর বাবার বাবাকে আমি কী জবাব দেব যদি ওর কিছু হয়? ওর বাবা তো জানতেও পারল না…”
রুদ্রর সেই পৈশাচিক হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। তার হাতের চাবিটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল। সে চিৎকার করে মেহেরের দিকে এগিয়ে এল
“মেহের… মেহের! ওপেন ইয়োর আইজ হেই… দিস ইজ নট ফানি”
রুদ্র ধপ করে হাঁটু গেড়ে মেহেরের পাশে বসল। তার যে হাত দুটো হাজার ফিট উপরে প্লেনের কন্ট্রোল ধরে, সেই হাত দুটো আজ কাঁপছে। মেহেরের গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে ফিসফিস করে ডাকল,

“মেহের… মেহের! ওঠো বলছি, এসব নাটকের কোনো মানে হয় না”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। মেহেরের শ্বাস-প্রশ্বাস বড্ড ক্ষীণ। রুদ্রর হঠাৎ মনে হলো, সে কি তবে বড্ড বেশি বলে ফেলেছে? ‘পাপের বোঝা’ শব্দটা বলার সময় একবারও কি তার বুক কাঁপল না? অথচ এই মেয়েটা তারই পরিবারের পছন্দে তার জীবনে এসেছে।
মিনিট কয়েকের ঘোর কাটিয়ে রুদ্র মেহেরকে পাঁজাকোলা করে তুলে লিফটের দিকে ছুটল। কোনোমতে তাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে। মাঝেমধ্যে রুদ্রর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল।

এমার্জেন্সিতে নেওয়ার পর রুদ্র বাইরে পাথরের মতো বসে রইল। হাসপাতালের করিডোরের সেই ধবধবে সাদা আলো আর ওষুধের কড়া গন্ধ তাকে যেন পিষ্ট করছিল। নার্স দুবার ডাকার পর সে সম্বিত ফিরে পেল।
ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকা মাত্রই টেবিলের ওপাশে বসা ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, “আপনি উনার কী হন?”
রুদ্র কিছুটা ইতস্তত করে অস্ফুট স্বরে বলল, “হাজব্যান্ড।”
ডাক্তার তাকে বসতে ইশারা করে নিজের নেমপ্লেটটা ঠিক করতে করতে বললেন,

“আমি ডাক্তার মৃদুলা। আপনি রুদ্র? আমি কি ঠিক বলছি? আপনাকে টিভিতে দেখেছি, তাই চিনতে সমস্যা হয়নি। তবে এখন পরিস্থিতিএকটু জটিল।”
রুদ্র শুধু “হুম” বলে উত্তর দিল।
ডাক্তার মৃদুলা একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন
“দেখুন মিস্টার রুদ্র, আপনার ওয়াইফের প্রেগন্যান্সিতে অনেক কমপ্লিকেশন আছে। রিপোর্ট বলছে বাচ্চাটা জরায়ুতে নেই, এটি একটি ‘একটোপিক প্রেগন্যান্সি’। ৪ সপ্তাহের মাথায় এমন হওয়া মানেই জীবন-মরণের ঝুঁকি। দেরি করলে ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হতে পারে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাচ্চাকে বাঁচানো অসম্ভব হতে পারে, অন্তত মাকে তো বাঁচাতে হবে।

রুদ্রর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার নিজের কোনো সুপ্ত অতীত স্মৃতি যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। এই অনাগত সন্তানটি তার নয়, তবুও কেন এক অদ্ভুত টান অনুভব করছে সে? কেন মনে হচ্ছে এই নিস্পাপ প্রাণটাকে হারানো মানে তার নিজের কোনো পুরনো ক্ষত আবার তাজা হওয়া? সে কেবল বিড়বিড় করে বলল, “বাচ্চাটা কি আসলেই… কোনো আশা নেই?”
ডাক্তার মৃদুলা একটু থেমে বললেন, “২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখব আমরা, আপনি ধৈর্য ধরুন। তবে ওনার হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার কারণ কী? উনি কি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন? এই অবস্থায় কোনো রকম মেন্টাল টেনশন দেওয়া যাবে না।”

রুদ্র অপরাধবোধের এক বিশাল বোঝা নিয়ে মেহেরের কেবিনে ঢুকল। হাসপাতালের সাদা বিছানায় মেহের তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। কেবিনের এক কোণে রাখা সোফাটায় বসে ছিল রুদ্র। বারবার না চাইতেও তার চোখজোড়া অবাধ্য হয়ে মেহেরের শান্ত মুখটার দিকে চলে যাচ্ছিল। অসুস্থতার ফ্যাকাশে ভাব সত্ত্বেও মেহেরের চেহারায় এক অদ্ভুত মায়া লেগে আছে।
কিছুক্ষণ পর মেহেরের চোখের পাতা নড়ে উঠল। সে চোখ মেলছে দেখে রুদ্র দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলতো পায়ে মেহেরের বেডের কাছে গিয়ে পাশের একটা টুলে বসে পড়ল সে।
মেহের পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাতেই দেখল রুদ্র খুব কাছে বসে আছে। মেহের যখন চোখ মেলল, তার ক্ষীণ কণ্ঠে ঝরে পড়ল কেবল হাহাকার

“আমি এখানে কী করছি?”
রুদ্র ছোট করে উত্তর দিল, “তুমি অসুস্থ।”
মেহের হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল,
“আমার বাচ্চা ঠিক আছে? কথা বলুন না! কেউ নেই আমার এই দুনিয়াতে। ওর বাবাও নেই। ওর বাবার বাবাকে আমি কী জবাব দেব যদি ওর কিছু হয়? ওর বাবা তো জানতেও পারল না…”
নিস্তব্ধ কেবিনে মেহেরের কান্নার শব্দটা যেন দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে রুদ্রর বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছিল। মেহেরের দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে এক হাত দিয়ে নিজের পেটটা আঁকড়ে ধরে আছে, যেন পৃথিবীর সব শক্তি দিয়ে সে তার অনাগত সন্তানকে আগলে রাখতে চায়।

রুদ্র যখন শান্ত স্বরে ডাক্তার মৃদুলার বলা সেই ভয়ংকর আশঙ্কার কথাগুলো বলল “বাচ্চাটা জরায়ুতে নেই…” মেহেরের পৃথিবীটা যেন এক লহমায় ধসে পড়ল। সে পাথর হয়ে কয়েক সেকেন্ড রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই তার ভেতর থেকে এক বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
সব জড়তা, সব ঘৃণা ভুলে মেহের দুহাতে রুদ্রর কলার আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। সে রুদ্রর বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল

“আপনি… আপনি বলেছিলেন না ও পাপ? ও কোনো পাপ নয় রুদ্র! ও আমাদের ‘বৈধ’ সন্তান! আমার বয়স যখন মাত্র আঠারো, তখন আমি তাকে কবুল বলেছিলাম… আল্লাহর আরশ সাক্ষী রেখে আমি তার অর্ধাঙ্গিনী হয়েছিলাম। ও কোনো অবৈধ ভ্রূণ নয়, ও পবিত্র প্রাণ। ”
মেহেরের প্রতিটি শব্দ রুদ্রর কানে চাবুকের মতো লাগছিল। মেহেরের গলা দিয়ে যেন স্বর বের হতে চাইছিল না, কান্নার তোড়ে কথাগুলো আটকে যাচ্ছিল। সে রুদ্রর শার্টের হাতা খামচে ধরে ভাঙা গলায় বিলাপ করতে লাগল…
❝কেন ও পৃথিবীর আলো দেখবে না? ওর বাবা… ওর বাবা তো জানতেও পারল না যে তার একটা অংশ আমার ভেতরে বড় হচ্ছে।
ওর মায়ের না এই পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই। মা নেই, বাবা নেই… এমনকি বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে এমন একটা ভাইও নেই। কত বড় এই পৃথিবী, অথচ ওর মায়ের মাথার ওপর ছাদ হয়ে থাকার মতো একটা মানুষও নেই। সে আমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখালো কেন আবার? এখন এভাবে মাঝপথে আমাকে একা ফেলে ও যেতে পারে না। ওর এই অধিকার নেই…❞

রুদ্রর শরীরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। মেহেরের প্রতিটি কান্নার শব্দ যেন তার পঞ্জরাস্থিতে গিয়ে বিঁধছে। মেহেরের হাহাকার তাকে এক ঝটকায় তার অতীতের কোনো এক ধূসর স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। অনেক বছর আগে, এমন এক হাসপাতালের করিডোরে সে কি কাউকে হারিয়েছিল?
মেহেরের গর্ভের এই সন্তানটি রুদ্রর নয়, তবুও মেহের যখন তার হাত আঁকড়ে ধরল, রুদ্রর মনে হলো তার পুরো অস্তিত্ব যেন দুলে উঠছে। একটা অজানা মায়া, এক তীব্র টান সে অনুভব করতে লাগল এই অনাগত প্রাণটার প্রতি। রুদ্রর মনের কোণে প্রশ্ন জাগল কেন সে এত অস্থির হচ্ছে?

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৩

মেহের যখন বুঝতে পারল যে সে রুদ্রকে জড়িয়ে আছে, তখন এক ধাক্কায় রুদ্রকে ঠেলে দিল। রুদ্র তাল সামলাতে না পেরে এক পা পিছলে গেল। রুদ্রর ঘোরের অবসান ঘটল।
গল্পটা কেমন লাগছে সেটা কমেন্টে না জানলে কিন্তু আমি পরের পর্ব লিখতে একদম উৎসাহ পাবো না 🥺 তাই জলদি কমেন্ট করো, নইলে পরের পর্ব আসতে কিন্তু পুরো এক সপ্তাহ দেরি হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, বন্ধুদের ইনভাইট করতে ভুলো না কিন্তু… আমাদের গল্পটা সবার কাছে পৌঁছে দাও

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৫