ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৫
মারিয়াম ফুল
মেহের যখন বুঝতে পারল যে সে রুদ্রকে জড়িয়ে আছে, তখন এক ধাক্কায় রুদ্রকে ঠেলে দিল। রুদ্র তাল সামলাতে না পেরে এক পা পিছলে গেল। রুদ্রর ঘোরের অবসান ঘটল।
মেহের ঘোর থেকে জেগে উঠল এবং বুঝতে পারল সে রুদ্রর বুক আঁকড়ে ধরে আছে, তখন তার শরীরের প্রতিটি কোষে এক তীব্র ঘৃণা চাড়া দিয়ে উঠল। যে মানুষটা তার অনাগত সন্তানকে ‘পাপ’ বলে গালি দিতে পারে, তার সান্নিধ্য এখন মেহেরের কাছে বিষের চেয়েও ভয়ংকর।
মেহের বিছানায় উঠে বসার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু অবশ শরীর যেন বিদ্রোহ করছে। পেটের ভেতর সেই তীব্র মোচড়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা হয়তো এক বিপদ সংকেত, কিন্তু মেহেরের কাছে তা এক জননীর টিকে থাকার মহাযুদ্ধ। সে দাঁতে দাঁত চেপে, চোখের জল আড়াল করে রুদ্রর দিকে না তাকিয়েই বলল, “সরে যান আমার সামনে থেকে। আপনার ওই বিষাক্ত হাত দিয়ে আমাকে ছোঁয়ার দুঃসাহস করবেন না।”
মেহের টলতে টলতে বিছানা থেকে নামার উপক্রম করতেই রুদ্রর হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে এল বাধা দিতে। কিন্তু মেহেরের জেদ পাহাড়প সমান। মেহেরের হাতের ক্যানুলাটা নাড়াচাড়ায় সরে গিয়ে রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। মেহের বুঝতে পারল, এই অবস্থায় একা দাঁড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব। এক চরম পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে, শরীরের শেষটুকু শক্তি এক করে সে কাঁপা কাঁপা হাতটি রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য সময়ের চাকা থমকে গেল। দুজনের দৃষ্টি স্থির। মেহেরের চোখে এক সমুদ্র অসহায়ত্ব আর ঘৃণা, আর রুদ্রর চোখে এক বিষণ্ণ বিস্ময়। মেহের ভাঙা কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট স্বরে বলল, “আমাকে সাহায্য করুন না। আমি অজু করব। আমি নামাজ পড়ব।”
রুদ্র কোনো শব্দ করল না। জীবনের প্রথমবার সে মেহেরের সেই শীর্ণ ও হিমশীতল হাতটি নিজের প্রশস্ত তালুর ভেতর নিল। রুদ্রর হাতের সেই তপ্ত ছোঁয়া মেহেরের আঙুলে যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইয়ে দিল। রুদ্র পরম যত্নে মেহেরকে আগলে ধরে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে গেল। রুদ্র বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে দিতেই মেহের দুই হাত ভরে পানি নিয়ে তার বিধ্বস্ত মুখে ঝাপটা দিল। প্রতিটি জলের ফোঁটা যেন তার অন্তরের দহনকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। রুদ্র নিঃশব্দে নিজের চোখ সরিয়ে নিল; তার কেন জানি বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে, এক ধরণের অজানা মায়া তাকে গ্রাস করছে যা তার সাথে একেবারেই যায় না।
মেহের যখন কেবিনে ফিরে জায়নামাজে বসল, রুদ্র বাইরে গেল না। সে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মেহেরের সিজদারত ভঙ্গিটা দেখতে লাগল। মেহেরের প্রতিটি আর্তনাদ তখন হাসপাতালের দেয়াল ভেদ করে আরশের দিকে ছুটে যাচ্ছিল
“হে আল্লাহ, আমার কোল খালি করো না। ওর বাবার শেষ স্মৃতিটুকু কেড়ে নিও না। এই দুনিয়া বড্ড জালিম আল্লাহ। ও না থাকলে আমি কার মুখ চেয়ে বাঁচব? আমি সারা দুনিয়ার সাথে যুদ্ধে করেছি, আর তুমি কি ওকে ফিরিয়ে নেবে?”
নামাজ শেষে মেহের যখন কাঁপাকাঁপা হাতে মোনাজাত শেষ করল, রুদ্র ধীর পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। রুদ্রর ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্যের হাসি। সে নিচু ও শীতল স্বরে বলল
“তুমি কার কাছে দোয়া করছ মেহের, যে কোনোদিন উত্তর দেবে না। তার কাছে উত্তর চাওয়া শুধু বোকামি নয়, এক ধরণের মানসিক ভ্রান্তি। দেয়ার ইজ নো গড । মহাবিশ্বকে পরিচালনা করার মতো কেউ নেই। মানুষ নিজের চরম দুর্বলতাকে ঢাকতে ঈশ্বর নামক এক কাল্পনিক রক্ষাকর্তার জন্ম দিয়েছে।”
রুদ্র একটু থামল, মেহেরের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করল, “যদি কেউ থাকত, তবে দুনিয়াতে এত বিশৃঙ্খলা আর অবিচার দেখে সে নিশ্চয়ই চুপ থাকতো না ।
মেহের হকচকিয়ে গেল না, বরং তার চোখ দুটো এক অপার্থিব শান্তিতে ভরে উঠল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে বলল, “তার মানে আপনি আল্লাহকে মানেন না? ”
রুদ্রর পাল্টা শ্লেষাত্মক প্রশ্ন,তুমি-তো মানো। “তোমার আল্লাহ তখন কোথায় ছিল মেহের, যখন তুমি চুরমার হয়ে ভাঙছিলে। চোখের পানির হিসাব রাখে যে মালিক, সে তখন কোন সিংহাসনে বসে আয়েশ করছিল”
মেহের এক চিলতে ম্লান হাসল। সে রুদ্রর চোখের গভীরের শূন্যতা মেপে নিয়ে বলল, “দুনিয়ার জীবন কোনো পুরস্কারের মঞ্চ নয় , এটা পরীক্ষার ময়দান। আমরা সবাই নির্দিষ্ট গন্তব্য নিয়ে এখানে এসেছি। আপনি বলছেন দুনিয়াতে কেন সঙ্গে সঙ্গে বিচার হচ্ছে না। আল্লাহর প্রজ্ঞা অসীম, তার বিচার করার ধরণ আমাদের ক্ষুদ্র মানবীয় বুদ্ধির অতীত। আপনি যদি ভাবেন আপনার সীমাবদ্ধ ধারণামতো তিনি প্রতিমুহূর্তে আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করবেন, তবে আপনি নিজেই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিতে আছেন।”
রুদ্রর যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক যেন এই প্রথম কোনো এক অদৃশ্য দেয়ালের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। মেহেরের এই অবিচল বিশ্বাস তাকে এক মুহূর্তের জন্য বিচলিত করে দিল। ঠিক তখনই ডাক্তার মৃদুলা রুমে ঢুকলেন। তিনি বললেন, “মেহের, আপনাকে কিছু জরুরি টেস্ট করতে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের সাথে আসুন।”
রুদ্র তখন এক প্রকার অনুভূতিশূন্য অবস্থায় হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এল। ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। মার্চের রাতের বাতাসটা আজ বড্ড গুমোট। রুদ্র হাসপাতালের চত্বরে একটা নির্জন বেঞ্চে গিয়ে বসল। সে বারবার লম্বা নিশ্বাস ফেলছে, যেন ভেতরের কোনো এক দমবন্ধ করা অনুভূতি থেকে মুক্তি চাইছে। ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। আদিল, তার বেস্ট ফ্রেন্ড।
রুদ্র ফোনটা ধরতেই আদিল ওপাশ থেকে টিটকারি মেরে বলল, “কি দোস্ত, বিবাহিত জীবন কেমন এনজয় করছিস”
রুদ্র কোনো ভণিতা ছাড়াই উত্তর দিল, “ডিসগাস্টিং ”
আদিল হো হো করে হেসে উঠল। “তুই আর চেঞ্জ হলি না। শোন, আজকের নিউজ দেখেছিস। সারাদিন তো নতুন বউ নিয়ে ঘরেই ছিলি বোধহয়।”
রুদ্রর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে বলল, “নিউজ দেখার সময় কোথায়।
কী হয়েছে”
আদিলের কণ্ঠ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। “পরিস্থিতি বড্ড ভয়াবহ । বিশ্বজুড়ে মহামারির প্রকোপ হু হু করে বাড়ছে। সরকার এইমাত্র ঘোষণা দিল, ১১ই মার্চ থেকে সারা দেশ লকডাউনে যাচ্ছে। বিশ্ব যেন এক লহমায় থমকে যাচ্ছে রুদ্র।”
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৪
রুদ্র চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল। “হোয়াট আর ইউ সিওর”
আদিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ। পরশু থেকে দেশ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হবে। তোর ফ্লাইটের কী খবর”
সে বিড়বিড় করে বলল, “কালকে আমার একটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট আছে আদিল। এমন হলে তো আমি অফিস থেকে জানতাম।” কথা শেষ করে রুদ্র ফোনটা কেটে দিল। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে এল। একদিকে মেহেরের ভেতরে এক অনিশ্চিত জীবনের স্পন্দন, অন্যদিকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এক পৃথিবী।
