Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ৬

অভিসৃতি পর্ব ৬

অভিসৃতি পর্ব ৬
নওরিন কবির তিশা

অসময়ের ইলশেগুঁড়ি বর্ষণ মৃদু বেগে সিক্ত করছে বনাঞ্চল। বায়ুর বেগ যৎ-কিঞ্চিৎ। ফুরফুরিয়ে উড়ছে ওড়নার আঁচল। শুকনো পাতা মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে চঞ্চল হরিণী। নুপুর জোড়া শব্দ তুলছে রুনুঝুনু।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্টের বেশ অনেকটা এখন থেকে শেষ করে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকেই, কটকা অভয়ারণ্যের এই বিশেষ অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ প্রজাতি আর শ্বাসমূলের নমুনা সংগ্রহ করতে ওরা ছয়জন ছড়িয়ে পড়েছে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনায়। তবে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেয়। কেনোনা শর্ত অনুযায়ী কেউ বেশি দূর যাবে না, ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে সবাই এসে আবার মূল ট্রলার ঘাটে জড়ো হবে সবাই।
কিন্তু কায়রার অবাধ্য হৃদয় গদবাঁধা নিয়মের ধার ধেরেছে কখনো? চঞ্চল পদক্ষেপে অভ্যস্ত রমনী নবপ্রজাতিক উদ্ভিদ কিন্তু অচেনা কোনো শ্বাসমূলের সন্ধান পাওয়ার লোভে হাঁটতে হাঁটতে সে দলের বাকিদের থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বনের এই অংশটা যেন একটু বেশি ঘন, বৃক্ষলতার দাপটে দিনের আলোও কেমন জানি ফ্যাকাসে-ম্লান বলে ঠাওর হচ্ছে। বড় বড় কেওড়া আর পশুরের শিকড়গুলো কাদার ওপর খাঁজ কেটে অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। কায়রা পকেট থেকে ছোট জিপলক ব্যাগ আর কাঁচিটা বের করে একটা অচেনা ছোট লতার পাতা কাটতে যাবে।
আকস্মিক, সম্মুখে কিঞ্চিৎ দূরত্ব হতে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ কর্ণগোচর হলো ওর।চওড়া ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো মুহূর্তেই। নিশ্চিত হতে, খরগোশের কান খাড়া করে আড়ি পাতলো পুনরায়। না, কোনো বন্যপ্রাণীর সৃষ্ট আওয়াজ নয় এটা। যান্ত্রিক খসখসানি আর অদ্ভুত পদচারণার সূক্ষ্ম শব্দ। অথচ তীব্রতার পরিমাণে কানের পর্দা ছিদ্র হওয়ার উপক্রম।
খসখস শব্দটার উৎস খুঁজতে গিয়ে কায়রা কেওড়া আর বাইন গাছের নিবিড় আড়ালের দিকে নিঃশব্দে পা বাড়াল। ভিজে কাদা আর ম্যানগ্রোভের অবাধ্য শ্বাসমূলে ওর জুতো আটকে যাচ্ছে বারবার, তবু অদম্য এক কৌতূহল ওকে টেনে নিয়ে চলল সামনে। ​সামান্য কিছুটা এগোতেই দৃশ্যপট বদলে গেল এক লহমায়।

​বনের এই নির্জন কোণটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র! মাটিতে সদ্য ফোটা র”ক্ত”জবার মতো টা’ট’কা র”ক্তে’র ছোপ, ছিটকে পড়ে থাকা বুলেটের খোসা, আর দু-একটা উপড়ানো গাছের ডাল স্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে—একটু আগেই কোনো ভ”য়ং”ক”র র”ক্ত”ক্ষয়ী সংঘাত ঘটে গেছে ‌এখানে। ​কায়রার বুকের ভেতরটা আচমকা ধক করে উঠল। আতঙ্কে কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ। ঠিক তখনই এক জোড়া ভারী বুটের আওয়াজ আর ক্ষীপ্র নিঃশ্বাসের শব্দে ও চট করে একটা বিশাল সুন্দরী গাছের গুঁড়ির পেছনে আত্মগোপন করল।

​ঘন লতাপাতার ফাঁক দিয়ে নজর চালাতেই কায়রার চোখ জোড়া থমকে গেল। ​সামনে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। পরনে নিখাদ অল-ব্ল্যাক কমব্যাট গিয়ার, কিন্তু তার বাম কাঁধ আর বুকের সংযোগস্থলের গিয়ার ছিঁড়ে ফিনকি দিয়ে র”ক্ত ঝরছে। বুলেটের আঘাত প্রতিরোধী জ্যাকেট হয়তো প্রাণের ঝুঁকি কিছুটা কমিয়েছে, কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রের তীব্র আঘাতে ত্বক ফেটে অঝোরে ঝরছে র”ক্ত। লোকটির এক হাতে ধরা অত্যন্ত আধুনিক মানের মডিফাইড অ্যাসাল্ট অ্যাসল্ট রাইফেল, আর অন্য হাতে সে নিজের র”ক্তা”ক্ত ক্ষতস্থান চেপে ধরে আছে।
মুখশ্রীর কাঠিন্যে যন্ত্রণার কোনো ছাপ প্রকাশ পেতে না দিলেও, তার চোখের দৃষ্টিতে তাণ্ডব চালাচ্ছে ইস্পাতকঠিন সতর্কতা। সম্ভাব্য পলাতক অবশিষ্টাংশদের খুঁজতে আর নিজের রক্তক্ষরণ সামলাতে সে গাছের ছায়ায় নিজেকে সামান্য আড়াল করার চেষ্টা করছে।
​কায়রার ভীত সত্তা নিয়ন্ত্রণ হারালো। ভয়ে আর আতঙ্কের তাড়নায় কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ও গাছতলা থেকে এক পা এগিয়ে এল। কাদার ওপর ওর পায়ের শব্দ হতেই,​এক নিমেষের একশো ভাগের এক ভাগে ঘুরে দাঁড়াল লোকটি! ​বিদ্যুৎবেগে ডান হাতের রাইফেলটা কায়রার কপাল বরারব তাক করলো। ট্রিগারে আঙুল চেপে ধরা ইস্পাত কঠিন হাত। শিকারি চিলের ক্ষিপ্রতা আর প্রাণঘাতী সতর্কতা মিশ্রিত দৃষ্টিতে ​কায়রা হিম শীতল বরফের ন্যায় জমাবদ্ধ, চূড়ান্ত স্তম্ভিত!

হিম হয়ে যাওয়া নিশ্বাস আটকে গেল গলায়। কিন্তু রাইফেল উঁচিয়ে ধরা লোকটার নজর ওর ভয়ার্ত ফ্যাকাসে হয়ে আসা মুখশ্রী নিবদ্ধ হতেই হঠাৎ কি ভেবে রাইফেলটা নামিয়ে নিল সে। এতক্ষণে, কায়রা লক্ষ্য করল লোকটার সমগ্র মুখটাই বালাক্লাভাতে ঢাকা। শুধুমাত্র এক জোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনাবৃত। যা, তীব্র চৌম্বকার্ষনে টেনে ওর ভীতসত্তা। শুকনো ঢোক গিলে নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করতে চাইলো কায়রা, বলতে গেলো,,
“আ-আ!”
ব্যাস এতোটুকুই! কণ্ঠনালী ভেদ করে বের হলো না পূর্ণাঙ্গ বাক্যটা। তার আগেই এক চূড়ান্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো ও। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটির শক্তপোক্ত র”ক্তাভ হাতটা ওর মুখ শক্ত করে চেপে ধরল। অপর হাত দিয়ে কায়রার কোমর পেঁচিয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের চওড়া বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিল। আকস্মিক এই স্পর্শে কায়রার গোটা শরীর শীতার্ত মানুষদের মতো শিউরে উঠল।
​“উঁ… উঁম্মু!”

​কায়রা ছটফট করার চেষ্টা করতেই লোকটা অত্যন্ত সতর্ক অথচ অনমনীয় কৌশলে তাকে নিয়ে এক লহমায় ভেজা কাদা আর শ্বাসমূলের আড়ালে মাটিতে শুয়ে পড়ল। ভঙ্গিটা এমন-কায়রা নিচে চিত হয়ে শুয়ে, আর তার ঠিক ওপর নিজের বিশাল সুঠাম শরীর ঢাল বানিয়ে কায়রাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে উপুড় হয়ে রয়েছে লোকটা।
​পুরু বালাক্লাভার নিচ থেকে লোকটির তপ্ত ও ক্ষিপ্র নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে কায়রার থরথর করে কাঁপা গলায় আর গালে। জীবনে কোনো পুরুষের এতটা সান্নিধ্যে ও কোনোদিন আসেনি।পুরুষের গায়ের স্বেদকণা, বারুদ আর সদ্য ঝরে পড়া র”ক্তের এক ঝাঁঝালো সুবাস কায়রার অলিন্দে-নিলয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করল। আতঙ্কে, লজ্জায় আর অদ্ভুত এক শিহরণে কায়রার চোখ জোড়া চওড়া হয়ে আটকে রইল লোকটির সেই অনাবৃত, কুচকুচে কালো ও অতল চোখের নজরে।
​কায়রার বুকের ভেতর তখন কোনো এক পাগলাটে ঘোড়া যেন উদ্দাম দৌড় লাগিয়েছে। ও লোকটির বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে নিজের মুখ ছাড়ানোর চেষ্টা করল। ​হঠাৎ,লোকটির সেই অতল চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হলো। সে কায়রার কানের একদম কাছে নিজের ঠোঁট দুটো এনে, অত্যন্ত নিচু-ভরাট-মিহি কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,,

​“চুপ! কিচ্ছু বলবে না। ডোন্ট মুভ অ্যানি ইঞ্চ, জাস্ট ট্রাস্ট ম্যি।”
​কথাটা শেষ হতে না হতেই কায়রার একদম কানের ওপর দিয়ে বয়ে গেল এক বিকট শব্দ! ​পাশেই একটা সুন্দরী গাছের বাকল এক লহমায় উড়ে গিয়ে বুলেটের টুকরো আছড়ে পড়ল কাঁদার ওপর! আতঙ্কে কায়রা চিৎকার করে উঠতে গেলেই লোকটা নিজের শরীর দিয়ে ওকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে বিন্দুমাত্র রদেও কায়রার গায়ে আঘাত না লাগে। লোকটি একহাতে কায়রাকে নিজের বুকে সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে গুঁজে রেখে, অপর হাতে ক্ষিপ্র গতিতে মাটি ঘেষে রাইফেলটা উঁচিয়ে ধরল সামনের ঘন বনের দিকে।
​গুলির তীব্র গমগম শব্দে কটকার শান্ত ম্যানগ্রোভ বন মুহূর্তের তরে কেঁপে উঠল যেন।র”ক্ত”ক্ষয়ী এই সংঘাত আর বারুদের তীব্র গন্ধের মাঝে, অচেনা এক বীরপুরুষের বুকের উত্তাপে নিঃশ্বাস আটকে শুয়ে রইল কায়রা!

সন্ধ্যা গড়িয়েছে খানিকক্ষণ। সাঁঝের মায়াবী আলোটুকু ম্যানগ্রোভের অবাধ্য ডালাপালার জটলায় আটকে গিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। গুলির বিকট শব্দে আতঙ্কিত পশুপাখির দল ডানা ঝাপটে কোলাহল থামিয়ে যার যার আশ্রয়ে সিঁটিয়ে আছে।
লোকটা পরিস্থিতির ভয়াবহতা এক নিমেষে আঁচ করতে পারল হয়তো। কমব্যাট টিম ততক্ষণে নির্ধারিত পয়েন্টে পৌঁছে গেলেও, দুই-একজন পলাতক অ’স্ত্র’ধারী স-ন্ত্রা-সী যে এখনো কাটছাঁট দিয়ে এই ঘন বনের খাঁড়িতে লুকিয়ে আছে, তা একটু আগের বুলেটই প্রমাণ করে দিয়েছে। নিজের বাঁ কাঁধের ক্ষ’ত হতে অনর্গল র”ক্ত ঝরছে, তার ওপর হঠাৎই সামনে এসে পড়েছে এক অবুঝ বেসামরিক মেয়ে। এই পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে বেশিক্ষণ এখানে অবস্থান নেওয়ায় আর জেনেবুঝে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার এককথা।
​ও আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। কায়রার কোমরে শক্ত হাত রেখে চটজলদি ওকে মাটি থেকে এক প্রকার তুলে নিয়ে নিচু হয়ে ছুটতে শুরু করল। কায়রা তখনো আতঙ্কের ঘোরে আচ্ছন্ন। জঙ্গলঘেরা লতাপাতা, সুন্দরী গাছের ধারালো শ্বাসমূল আর পিচ্ছিল কাদার ওপর দিয়ে লোকটির কাঁধে ভর দিয়ে আধ-দৌড়ে কীভাবে যে সে ঠিক কতটা পথ অতিক্রম করে ফেলল, তার হিসাব মিলল না।

​অবশেষে কটকার মূল পর্যটন অঞ্চল থেকে বেশ অনেকটা ভেতরে, গহিন এক কেওড়া বনের প্রাকৃতিক ঝোপের আড়ালে এসে থামল ওরা। সেখানে একটি বিশাল পুরনো গাছের গুঁড়ি কাটার খালি জায়গায় কায়রাকে আলতো করে বসিয়ে দিয়ে, নিজেও দেওয়াল ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লোকটা। ক্ষ’ত’স্থানে হাত দিয়ে চেপে ধরতেই ব্যথায় ওনার সুঠাম মুখের চামড়া এক মুহূর্তের জন্য টানটান হয়ে উঠল, অথচ মুখ ফুটে একটা উফ শব্দও বের হলো না।
​কায়রা বুক ফুলিয়ে হাঁপাচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে,হৃদয়ের অবাধ্য তোলপাড় কিঞ্চিৎ নিয়ন্ত্রণে এনে,ফ্যাকাসে মুখে সম্মুখে বসা লোকটার পানে চাইলো। লোকটার কালচে কমব্যাট গিয়ার ভিজে একাকার রক্ত আর কাদায়।​কায়রা আমতা আমতা করে শুকনো গলায় বলল,
“আ-আপনি… আপনি অতটা রক্ত ঝরাচ্ছেন! আপনার শ- শরীরে তো বুলেট লেগেছে! এভাবে থাকলে তো…”
লোকটা কায়রার দিকে নিজের সেই অতল, কৃষ্ণাভ চোখের অনাবৃত নজরটা স্থির করল। বালাক্লাভার ভেতর থেকেই ওনার গম্ভীর, ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“ডোন্ট ওয়ারি। ইটস জাস্ট আ ফ্লেশ উন্ড।”
“জাস্ট আ ফ্লেশ উন্ড, মানে? ক্ষতটা কত ডিপ নোটিশ করছেন? আল্লাহ্,কি পরিমাণ র’ক্ত আসছে!”
সটানে উঠে দাঁড়ালো কায়রা। জিদ্দি সত্তাটা এতক্ষণে ফিরেছে। লোকটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ও বলল,,
“দেখুন,আমি জানি আপনি পুরুষ মানুষ। আমার সামনে নিজের যন্ত্রণা শেয়ার করতে অস্বস্তিবোধ করছেন। তাই,বলে অস্বীকার করবেন?”
এতক্ষণ যাবৎ প্রচন্ড ভীরুচিত্ত বলে মনে হওয়া মেয়েটার আকস্মিক দুঃসাহসিকতায় ভ্রু যুগল কুঁচকে আসলো লোকটার। বালাক্লাভার পেছনের গম্ভীর মুখে কিঞ্চিৎ বিস্ময় উঁকি দিল। তবে সেসবের তোয়াক্কা না করে,​কায়রা এদিক-ওদিক তাকাতেই নজরে এলো পাশে থাকা কিছু বুনো ভেষজ গাছ। ছোটবেলায় নানিকে দেখেছিল, গ্রামে কেউ কেটে গেলে এরকম গাছের পাতার রস চেপে র’ক্ত বন্ধ করত। ব্যাগ থেকে কাঁচিটা বের করে এক মুঠো পাতা কেটে নিয়ে, দুই হাতের তালুতে পিষে রস বের করে ফেলল কায়রা।
​তারপর সরাসরি লোকটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বেশ হুকুমের সুরে বলল,

“আপনার জ্যাকেটের ওই পাশটা একটু সরান। আর শার্টের বোতাম খুলুন।”
​লোকটা ‌প্রচ্ছন্ন বরফ জমা শীতল চাউনিতে এক সেকেন্ড স্থির চোখে কায়রার দিকে তাকাল; ও শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলল,
“নো নিড।”
​“আরে আশ্চর্য! নো নিড মানে কী? দেখছেন না র’ক্তে আপনার হাত ভেসে যাচ্ছে? ফালতু ইগো দেখাবেন না তো! এখন এই বনে আমি কোনো হাসপাতাল বা ব্যান্ডেজ পাব কোথায়? যা বলছি লক্ষ্মী ছেলের মতো করুন তো! নাকি গায়ের জোর খাটাব?”
​লোকটার ঠোঁটের কোণে বালাক্লাভার আড়ালেই অতি সূক্ষ্ম এক চিলতে অমায়িক হাসির রেখা ফুটে উঠতে উঠতেও গাম্ভীর্যের চাদরে ঢাকা পড়ল। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও যে মেয়েটা ওকে ‘লক্ষ্মী ছেলে’ হওয়ার পরামর্শ দিতে পারে, তার কান্ডজ্ঞান নিয়ে ওর মনে ঘোর সন্দেহ জাগল!
​তবে, সদা গম্ভীরতায় অভ্যস্ত লোকটা কথা বাড়াতে চাইলো না। বাঁ কাঁধের ছিঁড়ে যাওয়া গিয়ারের স্ট্র্যাপটা এক হাতে সরালো। কায়রা আর দেরি না করে হাত দুটো এগিয়ে নিয়ে ক্ষ”তের পাশে আলতো করে চাপ দিয়ে ভেষজ রসটুকু ঢেলে দিল। তীব্র ঝাঁজে লোকটার সুঠাম চোয়াল এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠলো বোধহয়। তবে,মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না সে।
​কায়রা ওড়নার এক কোণ কাঁচি দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে শক্ত করে বাঁধন দিয়ে দিল ক্ষতস্থানে। র”ক্তক্ষ”রণটা মুহূর্তেই কিছুটা কমে এলো। কাজ শেষ করে কায়রা নিজের কাদা মাখা হাতের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।​তারপর ঘাসের ওপর বসেই লোকটার দিকে তাকিয়ে হাত নাচিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করল,

“হুহ! ভাব মারছিলেন কত, ‘নো নিড’! আমি না থাকলে তো আজ এই গহিন বনে র’ক্ত শূন্য হয়ে পটল তুলতেন! তা এমন ভর সন্ধ্যায় বনে ফায়ারিং করছিলেন কেন শুনি? আপনারা কি কোনো সিনেমার শুটিং করছেন নাকি আসল আর্মি? আর মুখটা ওভাবে ঢেকে রেখেছেন কেন? চোর-ডাকাতদের মতো চেহারা নাকি? খোলেন তো দেখি!”
​লোকটা কায়রার বিরামহীন বকবকানি শুনে সোজা হয়ে বসল। কায়রার উৎসুক হাতটা নিজের মুখের দিকে আসতে দেখেই ও এক হাতে কায়রার কবজিটা আলতো কিন্তু শক্তভাবে ধরে ফেলল। ​কণ্ঠ আগের মতোই নিচু, ভারী-গমগমে,,
​“কৌতূহল ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত কৌতূহল এই বনে প্রাণঘাতী হতে পারে। বি কুয়েট নাউ।”
​কায়রা কবজি ছাড়ানোর বিফল চেষ্টা করে মুখ ভেংচে বলল,
“ব্যাস! অমনি আবার ভাব শুরু হলো! একটু তো ধন্যবাদ দিতে পারেন, নাকি মেজাজ দেখানোটাই আপনার আসল কাজ? আমার বন্ধুরা এতক্ষণে ঘাটে আমাকে না পেয়ে নিশ্চয়ই কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। আমার এখনই ট্রলারে ফেরা দরকার, বুঝলেন?”
​লোকটা ওয়াকিটকিটা অন করে নিচু স্বরে কোড ওয়ার্ডে মেসেজ পাঠাল,

“ক্যাপ্টেন, দিস ইজ মেজর। এরিয়া ক্লিয়ারড। সেন্ড সিভিলিয়ান এসকর্ট টু দ্য নর্থ ক্রিক।”
​ওয়াকিটকি পকেটে পুরে কায়রার দিকে চাইল। কায়রা তখনো কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে। লোকটা দৃষ্টি সরিয়ে ​কায়রার উদ্দেশ্যে শান্ত-অকাট্য স্বরে বলল,
“আপনার ট্রলার ঘাটে পৌঁছানোর ব্যবস্থা হয়ে গেছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার লোক আসবে।”
লোকটা প্রস্থানের প্রস্তুতি নিতেই কায়রা কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,,
“এই যে মিস্টার কোথায় যাচ্ছেন? নিজে গভীর জঙ্গলে এনে একা ফেলে রেখেই চলে যাচ্ছেন? এখন যদি বাঘ-ভাল্লুকে এসে আমায় খুবলে খায়? কোত্থাও যাবেন না!”
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। থমথমে দৃষ্টি ফের নিবদ্ধ হলো কায়রার পানে। এত কথা বলতে পারে একটা মেয়ে! তবে তার এমন নজরেও একফোঁটা থামলো না কায়রা। প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করতে করতে বলল,
“আচ্ছা, আপনি আসলেও আর্মি,তাই না? নিশ্চয়ই জুনিয়র কেউ? আই মিন জুনিয়র কোনো অফিসার?”
লোকটা এবারও নির্বাক। এবার একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলো কায়রার। লোকটি সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপন না করে নিজ দীর্ঘদেহ সোজা করে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই ,লতাপাতার জঙ্গল ফুঁড়ে দুই জন অস্ত্রধারী কমব্যাট সেনা অত্যন্ত চটপটে ভঙ্গিতে তাদের সামনে এসে হাজির হলো। কায়রা চমকে উঠে পেছাতে নিলে সেনাসদস্যদের একজন কায়রার উদ্দেশ্যে অভয় দিয়ে বিনম্র ভঙ্গিতে দাঁড়াল। অন্য সৈনিকটি লোকটির সামনে এসে বুক উঁচিয়ে এক নিখুঁত মিলিটারী স্যালুট ঠুকে ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,

“স্যার! অল ক্লিয়ারড। সিভিলিয়ানদের সেফটিতে ট্রলার ঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকআপ রেডি। থ্যাঙ্ক গড স্যার, আপনার কাঁধের ফায়ার ইঞ্জুরিটা ডিপ ছিল! বড় কোনো ক্ষতি হতে পারতো! অ্যাটেনশন প্লিজ স্যার, ব্যাকঅফ ক্যাম্প থেকে আপনার ফার্স্ট এইডের ট্রুপস ওয়েট করছে।”
কায়রা হাঁ করে দৃশ্যটা দেখছিল। এমন সময় কায়রাকে পৌঁছে দিতে আসা সৈনিকটি নিচু স্বরে কায়রাকে বলল,
“ম্যাডাম, আপনি প্লিজ আমাদের সাথে আসুন। বনের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আমাদের স্যার নিজে ইন্সট্রাকশন দিয়েছেন আপনাকে নিরাপদে ঘাটে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”
কায়রা একটু ইতস্তত করে পা বাড়াল। তবে কৌতুহল অবদমনে ব্যর্থ হয়ে সৈনিকটিকে ফিসফিস করে শুধাল
“আচ্ছা ভাইয়া, আপনাদের এই স্যার কি খুব জুনিয়র কেউ? বেশ তো মেজাজ দেখাচ্ছিলেন এতক্ষণ!”
বিস্মিত সৈনিকটি হেসে ফেললো, নিচু গলায় বলল,
“জুনিয়র? কী বলছেন ম্যাডাম! উনি তো ৩ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওয়ান অফ দ্য ইয়ংগেস্ট অ্যান্ড টাফেস্ট অফিসার! অ্যান্ড হ্যি ইজ আ মেজর!”

সৈনিকের মুখের ‘মেজর’ শব্দটা শোনামাত্র চুড়ান্ত বিস্মিত কায়রা হুট করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে হাঁটা সৈনিক দুটি বেশ খানিকটা এগিয়েছে। কায়রা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। কিছুটা দূরে, ঘন লতাপাতার আলো-ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে লোকটি- না, মিস্টার মেজর নিজের বাম কাঁধের ক্ষ”তস্থানটায় আরেকবার চাপ দিয়ে ধীর পায়ে উল্টো পথে প্রস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
কায়রা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বুকের ভেতর জমানো সব বিস্ময়, লজ্জা আর অবাধ্য কৌতুহল এক করে ও গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল,,
“এই যে মিস্টার, মেজাজ দেখাচ্ছিলেন যিনি! একটু শুনবেন?”
বনের বাতাসে কায়রার এই চঞ্চলা আহ্বান ময়নার কিচিরমিচিরের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বনাঞ্চলে। মেজর থমকে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল সে।কায়রা এক পা এগিয়ে এসে দূর থেকেই শুধাল,

অভিসৃতি পর্ব ৫

“নামটা জানতে পারি?”
সাঁঝের আঁধার ততক্ষণে গাঢ় হয়ে এসেছে। হাওয়ায় ভাসছে সোঁদা গন্ধ।মেজর এক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে গমগমে ভরাট কণ্ঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“দুর্জয়। দুর্জয় আহসান।”
সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েই আর এক মুহূর্ত সেখানে দন্ডায়মান রইলো না দূর্জয়, দীর্ঘ পদক্ষেপে বনের গহিন আঁধারের সঙ্গে মিলিয়ে গেল।প্রস্তরীভূত কায়রা আনমনে মৃদু হাস্যে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,,
“মেজর ‌দুর্জয় আহসান!”

অভিসৃতি পর্ব ৭