অভিসৃতি পর্ব ৫
নওরিন কবির তিশা
“তুমি কি পাগল হয়েছো, দুর্জয়?”
সাজেদা চৌধুরী ভেতরে চাপা ক্ষোভ চূড়ান্তরুপে উগড়ে দিলেও, ভাবান্তর দেখালো না দুর্জয়। গোছগাছ সম্পন্ন করে তবেই জননীর পানে চাইলো। এগিয়ে এসে আলতো পরশে মায়ের মলিন মুখশ্রী ছুঁয়ে কপালে চুমু আকলো। বড্ড নরম শোনাল ও তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর,,
“দেশের ব্যাপার আম্মা। তবে আমি চেষ্টা করব, যত জলদি সম্ভব ফিরে আসার। ততদিনে তুমি আমার জন্য করবে।”
সাজেদা চৌধুরী চাপা অভিমানে ছেলের হাতটা সরিয়ে দিতে চাইলেও পারলেন না। বিশাল বিঘ্ন হয়ে দাঁড়ালো মাতৃত্ব, তবুও কণ্ঠস্বর যথাসাধ্য শক্ত করে বললেন,,
“আবার কেন দূর্জয়? পরশু ফিরেছো তুমি।আমি তো ধরে নিয়েছিলাম অন্তত সাত দিন তোমাকে আদর করার সুযোগ পাবো।”
দুর্জয় মায়ের মলিন মুখ পানে চেয়ে মৃদু হাস্যে দীর্ঘ সুঠাম দেহটা একটু নুইয়ে মায়ের দুটো হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল,,
“আই এম আ সোলেজার, আম্মা। অফিশিয়াল ইমার্জেন্সি কি কখনো ঘড়ি মেপে আসে? দেশের সিকিউরিটির প্রশ্ন যেখানে, সেখানে তো নিজের পারসোনাল ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া চলে না। তুমিই তো শিখিয়েছ, ইউনিফর্মের মর্যাদা সবার আগে।”
সাজেদা চৌধুরীর চোখের কোণে জল ছলছল। যামিনীর নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চরাচর। ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর ছুঁইছুঁই। নিঝুম-নিস্তব্ধ শহরের বুকে এমন আকস্মিক কল অফ ডিউটি ওনার মাতৃহৃদয়কে যেন এক নিমিষে চুরমার করে দিচ্ছে। উনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন,
“সব বুঝিরে বাবা। কিন্তু কাল বিকেলে আমরা ওই মেয়েটার বাড়িতে পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা। সব আয়োজন শেষ, আর এই মাঝ রাতে তুমি এসব বলছো। কাল,ওদের কী জবাব দেব আমি?”
দুর্জয় শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“জবাব দেবে যে পাত্র ইমার্জেন্সি ডিউটিতে গেছে। উনারা নিশ্চয়ই ভালো করেই জানে যে আমি ডিফেন্সে আছি। তারপরেও যদি না মানেন তাহলে এই বিয়ে হওয়ার কোন মানে দেখি না আমি।”
সাজেদা চৌধুরী এবার ক্ষুব্ধ হয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলেন,
“কী বলছিস তুই দুর্জয়? বর না দেখে কোন মেয়ে পক্ষ বিয়ের পাকা কথায় সায় দেয়? তোর তো কোনো দায়িত্ববোধই দেখছি না!”
দুর্জয় এবার মায়ের কাঁধ দুটো আলতো চেপে ধরে চোখে চোখ রাখল। ওনার এই অবুঝ অভিমানে ওর গম্ভীর মুখশ্রীতেও এক চিলতে প্রশ্রয়ের ছায়া নামল,,
“আম্মা, শোনো। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি একজন সৈনিক। আজ রাতে ডিজি স্যার নিজে ফোন করে যে অ্যাসাইনমেন্টের ব্রিফিং দিলেন, তাতে দেশের নিরাপত্তার বিশাল ঝুঁকি জড়ো হয়ে আছে। এমন এক ক্রুশিয়াল মোমেন্টে আমি ওনাকে বলবো, আমি পাত্রী দেখতে যাচ্ছি? ইউ নো মি, আই কান্ট ডু দ্যাট।”
দুর্জয়ের এত এত যুক্তির সম্মুখে নিশ্চুপ হয়ে পড়লেন সাজেদা চৌধুরী। মাকে চুপচাপ দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল দুর্জয়, পুনরায় বলল,,
“আর রইল বাকি বিয়ের কথা—আই ট্রাস্ট ইউর চয়েস, আম্মা। তুমি যাকে চুজ করেছ, মাই ওয়ার্ড ইজ ফাইনাল। তোমরা গিয়ে যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেই আমার শতভাগ সম্মতি আছে। আই প্রমিস ইউ, মিশন শেষ করেই আমি সোজা গিয়ে মেয়েটাকে বিয়ে করে নেব। নো মোর ডিলে, হ্যাপি?”
ছেলের এমন অসংকোচ সম্মতিতে বিষাদগ্রস্ততার মাঝেও এক চিলতে স্বস্তির হাসির দেখা মিললো সাজেদা চৌধুরীর ওষ্টাধর প্রান্তে।
পৌষের আগমনী সংকেতে প্রতীক্ষাতুর রূপ ধারণ করেছে প্রকৃতি। ইস্পাতের চক্রপাতে একটানা ঘড়ঘড় ধ্বনি তুলে কুহেলির সূক্ষ্ম আবরণ ছিন্ন করে এগিয়ে চলেছে ট্রেনটা। বেলা বেড়েছে যৎসামান্য। বাড়ি থেকে এখন পলাতক আসামি কায়রা। কাঙ্খিত সিটে বসেই সে ফোনের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ব্যাগের অতল গহ্বরে চালান করে দিল ও।
বন্ধুমহল এতক্ষণ যাবৎ ওর কারসাজি দেখছিল। জানলার পার্শ্ববর্তী একটা সিটে বসেছে ওরা। সামনে ইভান, রুশাফ আর নিহার। আর তার ঠিক বিপরীতে কায়রা,তুজা আর মেধা। ইভান কায়রার এহেন কাণ্ডে ভ্রু গোটায়। কৌতুহল অবদমনে ব্যর্থ হয়ে শেষমেষ শুধায়,
“এই যে পলাতক আসামী, এবার কি কারণটা খোলসা করা যায়? সকাল সকাল আমাদের ডেকে তুলে এমন ঝড়ের গতিতে ট্রেনে উঠায় দিলি, কাহিনী কী?”
মেধাও সায় দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ রে কায়া! তুই তো ট্রেনের টিকিট কাটার সময় আমাদের ভাবটা এমন দেখালি যেন তোর পেছনে একদম সিআইএ টিম হাত ধুয়ে লেগেছে! ঘটনা কী বল তো?”
কায়রা জানালার বাইরে ধেয়ে যাওয়া সবুজ প্রান্তর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বন্ধুদের পানে চাইল; মুখশ্রীতে একরাশ ক্ষোভ ফুটিয়ে বলল,
“ইয়ার! তোরা বিশ্বাস করবি না, আজ বিকেলে আমার দেখতে আসার কথা ছিল! আই মিন, পাত্রের মানে কি আমাকে কোথায় দেখেছে, আর পছন্দ করে ফেলেছে!”
কায়রার কণ্ঠস্বর ফুঁড়ে আসা এমন বিস্ফোরক তথ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটল সিটে! ইভান মুখ খুলতেই পারল না, তার আগেই হাতে থাকা ক্যানটা হাত থেকে হাতছানি দিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। রুশাফ চূড়ান্ত বিষ্ময়ে বলল
“কী বললি? তোর বিয়ে? পাত্রী দেখতে আসছে? এই, তোকে কোন পাগল দেখতে আসছে রে?”
কায়রা মুখ কুঁচকে নিহারকে কড়া দৃষ্টি উপহার দিয়ে বলল দিল,
“মেজাজ খারাপ করা কথা বলিস না ভাই! কোথাকার কোন ছাগল, সম্বন্ধ পাঠাইছে কে জানে!”
তুজা নাক কুঁচকে বলল,,
“তুই কি পাগল? এইচএসসির পর থেকে আমার জন্য সম্বন্ধ আসছে ভাই! বিয়ে হইছে এখনো আমার? ফালতু যত্তসব! এমনি দেখতে আসতো!”
“আরে ইয়ার! ওই ব্যাডার মা পছন্দ করছে আমাকে শুনলাম।”
“হ্যাঁ, সো হোয়াট? এমন হাজারটা সম্বন্ধ আসে ভাই। তার উপর তুই সুন্দরী। আসারই ছিলো। তা বলে এভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা, এটা ঠিক হয়নি ভাই!”
“এ বা’লের জ্ঞান দিস না তো! নর্মাল প্রপোজাল হলে কোন প্রবলেম ছিল না আমার। কিন্তু..!”
এতক্ষণ সবটা চুপচাপ শুনলেও এবার অধৈর্য হয়ে উঠলো মেধা,,
“কেনরে ভাই, কার সাথে প্রপোজাল আইছে তোর জন্য? দশ বাচ্চার বাপের? নাকি বুইড়া ভামের? যে এত সিনক্রিয়েট করছিস! মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার, ভাই!”
কায়রা এবার দু’হাতে মুখ ঢেকে এক অতি নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বন্ধুদের পানে চেয়ে করুণ কণ্ঠে বলল,
“আরে ভাই! সাধারণ কোনো পাত্র হলে কি আর আমি এভাবে পালাই? প্রপোজাল আসছে এক সেনাবাহিনীর মেজরের! সেনাবাহিনীর মেজর, ভাই! তোরা তো জানিস, আর্মি-নেভি দু”চোখের বি’ষ আমার! সহ্যই করতে পারি না ওদের! তার ওপর যদি আসে এমন এক ধেড়ে মেজর—উফ, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!”
কায়রার শো’ক’বার্তা বন্ধু মহল স্তম্ভিত হলো মুহূর্তের তরে, অতঃপর পুরো কামরায় একসঙ্গে আছড়ে পড়লো এক অট্টহাসির তোলপাড়। ইভান পেটে হাত দিয়ে বলল,
“আরে বাপরে বাপ! তোর কপালে শেষে মেজর জুটল?তাও ধেড়ে!ভাইইই! সে যাইহোক, তোর মত উড়নচণ্ডীকে মেজর বেশ ভালোই টাইট দিতে পারত। রাজি হওযা ”
রুশাফও সশব্দে হেসে যোগ করল,
“একদম সত্যি কথা! মেজর সাহেব তোকে নিয়মিত প্যারেড করাবে রে কায়া! সকালে ঘুম থেকে উঠেই লেফট-রাইট, লেফট-রাইট! তুই যা বানর, তোকে সোজা করার জন্য একদম পার্ফেক্ট ব্যবস্থা!”
মেধা আর তুজাও আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। তুজা কায়রার পিঠে একটা আলতো থাপ্পড় মেরে বলল,
“তুই একটা আস্ত পাগল, কায়া! একটা মেজরের প্রপোজাল আসছে শুনে যেখানে অন্য মেয়েরা নাচতে নাচতে বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ত, সেখানে তুই বাড়ি থেকে পালিয়ে ট্রেনে চেপে বসলি? কোনো আক্কেল আছে তোর?”
মেধা হাসতে হাসতে বলল,
“আমার তো মনে হয় কায়া ভয় পেয়ে গেছে! ভাবছে বাসর রাতে যদি মেজর সাহেব রোম্যান্সের পরিবর্তে বলে-‘এটেনশন! সোজা হয়ে দাঁড়াও!’, তখন ও কী করবে!”
বন্ধুদের এমন বিরামহীন খিল্লি ওড়ানোর ভঙ্গিতে কায়রার হাস্যজ্জল মুখশ্রীতে আষাঢ়ে ঘনকালো আঁধার নামলো। ও হাত গুটিয়ে, গাল ফুলিয়ে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“হয়েছে? তোদের ট্রোলাট্রোলি শেষ হয়েছে? আমি ভেবেছিলাম তোরা আমার দুঃখের কথা শুনে একটু সমবেদনা জানাবি, আর তোরা কিনা আমায় নিয়ে ফাজিলমি করছিস! থাম তোরা, আর একটা কথাও বলবি না আমার সাথে!”
নিহার এবার হাসি থামিয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
“আহা কায়া, রাগ করিস না দোস্ত! কিন্তু তুই ভেবে দেখ, তোর ফুপুর কানে যদি একবার পৌঁছায় যে তুই মেজরের প্রপোজাল থেকে বাঁচতে বাড়ি ছেড়ে ট্রেনে চেপে সুন্দরবন রওনা হয়েছিস—তখন তোর কী দশা হবে? মেজর তো তোকে কিছু করবে না, তোর ফুপুই তোকে একদম কোর্ট মার্শাল করে দেবে!”
ইভান ধেয়ে আসা প্রবল হাসির ঝড়টা কোনোমতে চেপে বলল,
“স্যরি ম্যাডাম, আর হাসব না! তবে স্বীকার কর, তোকে সামলানোর জন্য একটা মিলিটারির লোকই পারফেক্ট। তা মেজর সাহেবের নামটা কী শুনি?”
কায়রা মুখ ভেংচে বলল,
“নাম আমি জেনে রেখেছি নাকি? চুপচাপ বসে থাক। নইলে,জানলা দিয়ে লাথি মেরে বের করে দিব একদম!”
বন্ধুরা আবার একপ্রস্থ হেসে উঠে ট্রেনের কোলাহলের সঙ্গে মিশে গেল। ট্রেনটা ততক্ষণে কুয়াশার চাদর চিরে আরও দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে অচেনা দূরত্বের পানে।
“এই তুই চুপ। বাবা হিসেবে তোরও দায়িত্ব আছে। নূরা যথেষ্ট সচেতন নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে। আমার সামনে আরো ওর দিকে একবার চোখ রাঙিয়ে তাকাবি তো!”
বড়বোনের হুমকিতে দমে গেলেন আনোয়ার ইয়াসির। তবুও, ক্রোধে জর্জরিত দৃষ্টির স্ত্রীর পানে নিবদ্ধ করে বললেন,,
“আমি কখনো তোমাকে বকাবকি করি না নূরা। তবে, মেয়েদের দেখে রাখার দায়িত্ব তোমার। ছোট দায়িত্বটুকু পালন করতে পারলে না?”
আঞ্জুমান ইয়াসির ভাইয়ের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সোফায় বসলেন। সাধারণত ননদ-ভাবীর যে চিরাচরিত তিক্ত সম্পর্ক সমাজ দেখে এসেছে, এই পরিবারে তার একদম বিপরীত চিত্র। নূরা বেগমকে উনি নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করেন, আগলে রাখেন সবসময়।আঞ্জুমান ইয়াসির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে চেয়ে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“আনোয়ার, তুই তো জানিস নূরা সারাদিন সংসার আর তোদের সবাইকে সামলাতেই ব্যতিব্যস্ত থাকে। মেয়ে দুটো ছোট থেকে তো বড় হলো, ওদের চঞ্চলতা তুই চিনিস না? কায়রা যে এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে, তা কি নূরা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেয়েছিল? এতে ওর কী দোষ বল তো?”
আনোয়ার সাহেব টেবিলের ওপর থেকে চশমাটা তুলে মুছে নিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বললেন,
“বুবু, আমি তো সেটা বলছি না। কিন্তু পাত্রপক্ষ তো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে! ওদের কাছে আমরা কী মুখ নিয়ে দাঁড়াব? একটা মেয়ে প্রপোজাল শুনে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল, এটা শুনলে সমাজে আমাদের মান-সম্মান আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে?”
“আহা, সব ব্যাখ্যার একটা উপায় থাকে আনোয়ার!পাত্রপক্ষকে সোজা সত্যিটা বলতে যাবে কেন? বলতে পারো না যে, কায়রার ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা জরুরি অফিশিয়াল স্টাডি ট্যুর ছিল, যার জন্য ওকে হঠাৎ সকালেই যেতে হয়েছে? আর তাছাড়া, আজ ভোরেই তো পাত্রর মা ফোন দিয়ে বলল, ওদের ছেলে নাকি ইমার্জেন্সি ডিউটিতে চলে গেছে, পাত্র তো নিজেও আসছে না! তাহলে আমাদের মেয়ে না থাকলেও ক্ষতিটা কোথায়?”
নূরা বেগম নিচু স্বরে বললেন,
“আপা ঠিকই বলেছেন। কিন্তু কায়রা মেয়েটা ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে! কোথায় গেল, কার সাথে গেল—আমার বুকটা যে ফেটে যাচ্ছে আপা!”
আঞ্জুমান ইয়াসির সামনে এগিয়ে এসে ভাজ করা ভাবীর হাত দুটো চেপে ধরলেন,
“চিন্তা করো না নূরা। ও ওর ওই বানর বন্ধুদের সাথেই গেছে, আমি নিশ্চিত।সুন্দরবন ট্যুরের কথা তো ইদানীং ঘরে বসেই বলছিল । কটা দিন একটু হাওয়ায় উডুক, টাকা ফুরোলে ঠিক বাড়ি ফিরবে। ওকে আমি ভালো করেই চিনি। তুমি এখন অহেতুক কেঁদে চোখ ফুলিও না, বরং মেহমানদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো। আমাদের যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।”
দেখতে দেখতে একটি দিন অতিক্রান্ত। মোংলার পার্শ্ববর্তী একটা পরিচিত রিসোর্টে উঠেছে কায়রারা। গোটা একটা দিন পুরো পৃথিবী থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ওরা।অবশ্য সেইটা কায়রার বদৌলতে। ও নিজেও ফোন রিসিভ করবে না আর না তো কাউকে করতে দেবে। পশুর নদীর অবাধ্য জল কল্ললের মাঝেই ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রলার-টা। গন্তব্য-সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত। এলাকা নাম কটকা। ঘোরাঘুরি করতে আসা নিজ ইচ্ছায় হলেও, পরিবারের সকলকে জবাবদিহিতার জন্য অল্প-বিস্তর পড়াশোনা আবশ্যিক!
সেই উদ্দেশ্যেও অনিচ্ছাকৃতভাবে ওদের এই পরিকল্পনা। অবশ্য অঞ্চলটা খারাপ না, যৎসামান্য অ্যাডভেঞ্চারও হবে বলা যায়।
থমথমে নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের কটকা অভয়ারণ্যের ঘন গহিন ম্যানগ্রোভের অভ্যন্তর। বিশেষ অঞ্চলে সুন্দরবনের ভেতরের জলপথ ব্যবহার করে একটি সশস্ত্র জলদস্যু ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালানকারী চক্র বেশ কিছুদিন ধরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে গেড়েছে। কটকার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ম্যানগ্রোভ খাঁড়িতে একটি পরিত্যক্ত ওয়াচটাওয়ার ও তার আশপাশের ঘন সুন্দরী-গেওয়া বনের ভেতর ছদ্মবেশে অবস্থান নিয়েছে তাদের পুরো সিন্ডিকেট।
পড়ন্ত বিকেল। বেলা প্রায় চারটের দিকে। ম্যানগ্রোভের অন্তরালে অত্যন্ত গোপনে নোঙর করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি অ্যাসল্ট বোটের অভ্যন্তরে চলছে ৩ এবং ৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের যৌথ অপারেশনের শেষ মুহূর্তের কৌশলগত ব্রিফিং।ক্যাপ্টেন রাফসান মানচিত্রের ওপর লাইট জ্বালিয়ে মেজর দুর্জয়কে নিখুঁত মানচিত্রের স্থানগুলো দেখাচ্ছিলেন। দুর্জয়ের পরনে অল-ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল কমব্যাট গিয়ার, চোখে নাইট ভিশন গগলস ক্যাপ্টেন রাফসান নিচু গলায় সামরিক পরিভাষায় ব্রিফ করতে লাগলেন,
“স্যার, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও কোস্ট গার্ডের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, টার্গেট সিন্ডিকেটের মূল ডেরা কটকা খাঁড়ির উত্তর-পূর্ব অক্ষাংশে। বিকেল ৪:৩০-এ জোয়ারের পানি সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাবে। ওই সময়ই ওপার থেকে অস্ত্রবাহী একটা স্পিডবোট বনের ভেতরের ছোট খালে ঢুকবে। আমাদের কাছে খবর আছে, ওদের সাথে অন্তত সাতজন ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ক্যাডার রয়েছে।”
দুর্জয়ে শান্ত দৃষ্টির অন্তরালে ইস্পাতকঠিন্য স্পষ্ট প্রতীয়মান। ও মানচিত্রের ওপর হাত রেখে বলল,
“মিস্টার রাফসান, আমাদের মুভমেন্ট সম্পূর্ণ সাইলেন্ট হতে হবে। কটকা অভয়ারণ্যের বাঘ বা অন্য বন্যপ্রাণী যেন কোনোভাবে আতঙ্কিত না হয় এবং পর্যটন এলাকার সিভিলিয়ানরা যেন আমাদের অ্যাকশনের টের না পায়। সাব-সেক্টর বি-টু দিয়ে আমরা দুটি টিমে ভাগ হয়ে এনসার্কেল করব। টিম-এ আমার লিডারশিপে ফ্রন্ট থেকে অ্যাটাক করবে, আর টিম-বি আপনি লিড করবেন উত্তর খাঁড়ির আউটলেট ব্লক করতে। রিমাইন্ড ইট, কোনোভাবেই যেন একজন দস্যুও সাগরে পালিয়ে যেতে না পারে।”
অভিসৃতি পর্ব ৪
“ইয়েস স্যার! অল পজিশনস আর লকড,”
দুর্জয় ঘড়ির দিকে তাকাল। পৌষের ম্রিয়মাণ সূর্যটা তখন কটকার ম্যানগ্রোভ বনের মাথার ওপর হেলে পড়েছে। কাদা আর খাঁড়ির শ্বাসমূলের ভেতর নিজেদের সম্পূর্ণ আড়াল করে নিঃশব্দে পজিশন নিতে লাগল কমান্ডো টিম।
