অভিসৃতি পর্ব ৭
নওরিন কবির তিশা
দস্যি বন্ধুমহলের কাছে অপরাধী হলে, কি ঘটে জানেন? ওরা পারে তো, জীবন্ত মাটিতে গেড়ে দিয়ে তার উপর বিশাল বটবৃক্ষ রোপণ করে দিবে।কায়রার অবস্থাও হয়েছিল ঠিক তেমনই। ওই ঘটনার পর বন্ধুদের বকুনি আর চরম অসন্তোষের তোপে আর এক মুহূর্তও কটকায় থাকে নি ওরা। ওই রাতেই সোজা খুলনার ট্রেনে চেপে বসেছিল সবাই।
বাড়ি ফেরার পর থেকেই পরিবেশ থমথমে। পুরো বাড়িময় নীরবতার রাজত্ব কায়েম হয়েছে। প্রতিটি সদস্য স্বতঃস্ফূর্ত মৌনব্রত পালন করছেন। অবশ্য এই গম্ভীর আবহাওয়া কায়রার জন্য একপ্রকার শাপে বর-ই বলা চলে।অন্তত কড়া বকাঝকা আর দীর্ঘ উপদেশবাণীর হাত থেকে তো নিস্তার মিলেছে।
কালস্রোতে অতিবাহিত আজ তিনটি দিবস। আজকের দিনটির বিশেষত্ব-সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান্। বিকেলে কলেজের সুবিশাল মুক্তমঞ্চে নানা আয়োজন। যেহেতু এইচএসসি’র দিনগুলোতে এই প্রাঙ্গণেই কেটেছে ওদের চঞ্চলা শৈশব আর কৈশোরের সন্ধিক্ষণ, তাই প্রাক্তনী হিসেবে আমন্ত্রণের চিঠি আর বন্ধুদের তাগাদা-দুটোই ছিল ভরপুর।
হৈমন্তিক মধ্যাহ্ন;আকাশজুড়ে ফুটে আছে দিবাকরের নিভু নিভু রৌদ্রশিখা। কিঞ্চিৎ ব্যস্ততায় কায়রা আর তূজা দুজনেই রিকশার জন্য গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে খানিকক্ষণ। উভয়ের চঞ্চল নারীকায়া আবৃত বাসন্তী আর কচি কলাপাতার রঙের একখানা সুতি শাড়িতে;লালচে পাড়টা আঁচল হয়ে বাঁ কাঁধে আলতো করে ফেলে রাখা।
তবে, শাড়ি পড়ার ধরণ অভিন্ন হলেও, বাকি সাজসজ্জায় স্পষ্ট প্রতীয়মান বিস্তর পার্থক্য। তুজার চোখধাঁধানো সুবিন্যস্ত রূপের পাশে কায়রা ইয়াসিরের উপস্থিতি নিতান্তই সাদামাটা। অনাড়ম্বর তার দীর্ঘ কেশরাজ।কেবল একটা হাত খোঁপা করে তাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছে তাজা কাঠগোলাপ। দুগ্ধফেননিভ মুখশ্রীতে নেই কোনো মেকআপ প্রলেপ। কেবল, টানাটানা হরিণী আঁখিদ্বয়ে সূক্ষ্ম কাজলরেখা আর কপোলে লালচে রঞ্জকের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়।
তূজা পরণের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে কায়রার দিকে তাকিয়ে সিটি বাজানোর ভঙ্গিমাতে বলল,
“মাই গড কায়া! তোকে তো আজ একদম খাঁটি বাঙালি ললনা লাগছে রে! বিএল কলেজের জুনিয়র পোলাপানরা তো আজকে তোকে দেখে হার্ট অ্যাটাক করবে, শিওর!”
কায়রা কিঞ্চিৎ গম্ভীর হওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলল,
“ধুর ফাজিল! মারব এক থাপ্পড়! তুই নিজের ঢং সামলা আগে!”
কথা শেষ হতেই সোনাডাঙ্গা রোডের একটা ফাঁকা হলুদ হুড তোলা রিকশা এসে ওদের সামনে থামল। স্বভাবসুলভ চটপটে কন্ঠে তুজা বললো,,
“দৌলতপুর যাবেন আংকেল? বিএল কলেজে যাবো।”
লোকটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কায়রা এগিয়ে এসে বলল,,
“দুজনে একশো টাকা দিব আংকেল।”
প্রাপ্য ভাঁড়ার দ্বিগুণ দিতে চাওয়ায় আর ‘না’ করলেন না লোকটা। উনি ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিতেই তূজা আর কায়রা সাবধানে শাড়ির কুঁচি সামলে রিকশায় চেপে বসল। রিকশা চলতেই এক চিলতে মিষ্টি হাওয়া ছুঁয়ে গেল ওদের মুখাবয়ব। তূজা ব্যাগের ভেতর থেকে ছোট একটা আয়না বের করে ঠোঁটে লিপস্টিকটা আরেকবার ঘষে নিয়ে বলল,
“ভাই! আজ নতুন নতুন সিনিয়র জুনিয়র আসবে! আজকে যদি একটা পটে যায়, ভাই!”
কায়রা বিরক্তভরে বলল,,
“চুপ করবি তুই?”
তূজা কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলল,,
“এ কষ্ট তুই বুঝবি না ভাই! শা’লা,একটা লম্বা- হ্যান্ডসাম সিনিয়রের অভাবে এখনো সিঙ্গেল আমি!”
“তোর কপালে সিনিয়র আসবেনা ভাই। জুনিয়রের খোঁজ লাগা!দেখ,যদি কিছু হয়।”
তূজা কিছু বলার আগেই কায়রা রিকশাওয়ালার দিকে চেয়ে পুনরায় বলল,,
“আপনি একটু জলদি চলুন আংকেল আরো দশ টাকা বাড়িয়ে দিব।”
রিকশাওয়ালাও উৎফুল্ল হয়ে প্যাডেলে একটু বাড়তি জোর দিলেন। রিকশা ছুটে চলল সোনাডাঙ্গা পেরিয়ে দৌলতপুরের দিকে।
দৌলতপুর কলেজ মোড়ে এসে রিকশাটা থামতেই, ভাঁড়া মিটিয়ে নেমে পড়ল ওরা। রাস্তা পার হতে হবে ঠিক বিপরীত পাশে। তূজা কায়রার হাতটা শক্ত করে ধরে ব্যস্ত সড়ক পার হয়ে ওপারে ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়াল। তূজা হঠাৎ কায়রার দিকে তাকিয়ে চমকে বলল,
“আরে কায়া, দাঁড়া! তোর মাথার সুন্দর কাঠগোলাপ দেওয়া খোঁপাটা তো একদম খুলে একপাশে ঝুলছে রে!”
কায়রা নাক কুঁচকে বলল,
“ধুর! শাড়ি সামলাতে গিয়ে এই অবস্থা। শোন না, একটু ঠিক করে দে না!”
তূজা হাত বাড়িয়ে খোঁপাটা শুধরাতে যাবে, তখনই পাশ থেকে জরুরি তলপ পড়ল বেচারির। ও অপরাধীর মতো মুখ করে বলল,
“স্যরি রে কায়া! আমাকে এখনই যেতে হবে, নইলে হুলস্থুল পড়ে যাবে। তুই একটু ভেতরে গিয়ে ওয়াশরুমের আয়নায় ঠিক করে নে, প্লিজ!”
“ঠিক আছে, তুই যা। আমি সামলে নিচ্ছি,”
কথাটা কেবলমাত্র মুখেই বলল কায়রা। ওয়াশরুমের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার মত ধৈর্যশীল মেয়ে একদম নয় সে। তবুও চুলগুলো এখন ঠিক করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্পার্শ্বে নজর বোলাতে বোলাতে, সহসা ওর দৃষ্টি স্থির হলো বেশ খানিকটা অঞ্চল জুড়ে ছায়া বিদ্যমান রাখা এক বিশাল দেবদারু গাছের নিচে দণ্ডায়মান কালো রঙের গাড়িতে উপর। গাড়িটার জালনার স্বচ্ছ কৃষ্ণাভ দর্পণে স্পষ্ট দৃশ্যমান আশপাশটা।
বিপদের মাঝে মুশকিল আসানের দেখা মিলতেই প্রফুল্ল চিত্তে, এদিক-ওদিক একপলক দেখে নিয়ে গাড়িটির ঠিক সামনের ডান পাশের ড্রাইভিং সিট পাশ্ববর্তী গ্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে কাঠগোলাপটি চুলে গুঁজে দিয়ে হাতের আলতো পরশে এলোমেলো চুলগুলো শৃঙ্খলায় আনল। চুলে হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎ ওর দৃষ্টিগোচর হল ঠোঁটে রঞ্জকের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে ইতিমধ্যেই।
ততক্ষণাৎ ব্যাগ থেকে, একটি হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক বের করে অতি সাবধানে ঠোঁটের কোণে একটুখানি রঙ ছুঁইয়ে নিতে যাবে, আকস্মিক ঘটলো এক অনভিপ্রেত বিপত্তি! একদম পাশঘেঁষে দুরন্ত গতিতে একটা সাইকেল ছুটে বের হয়ে যেতেই কায়রার হাতখানি চকিতে কেঁপে উঠল সামান্য। ফলস্বরূপ ঘটলো মহাভ্রান্তি-লিপস্টিকের আলতো ছোঁয়াটি দীর্ঘরুপ নিয়ে অধরের সীমানা ছাড়িয়ে একপাশে লেপ্টে গেল সামান্য।
“ধুর ছাই!”
বিরক্তিতে লোকটা মনে মনে সহস্রাধিক গালি ছুঁড়ে কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে অতিরিক্ত লিপস্টিকটুকু মুছে নিল ও। পুনরায়,সবটা সামলে নেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পেছন হতে ভেসে এলো মেধার আহ্বান,,
“কায়া! কই তুই? জলদি আয়, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে!”
“আসছি রে!”
কায়রা তাড়া পেয়ে কোনো কিছু না ভেবেই আঙুলে লেগে থাকা সেই লালচে লিপস্টিকের দাগটুকু গাড়ির চকচকে কালো গ্লাসে এক চিলতে আঁচড় কেটে মুছে দিল! তারপর আঁচল সামলে চটপটে হরিণীর ন্যায় দৌড়ে প্রবেশ করলো কলেজের বিশাল প্রবেশদ্বার দিয়ে।
ওর প্রস্থান পরবর্তী মুহূর্তেই ধীরে ধীরে নামল জানলার কাঁচ টা। এতক্ষণ যাবৎ ওর সকল কর্মকাণ্ড সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করছিল এক জোড়া তীক্ষ্ণ নেত্র। বাবার শিক্ষকতার খাতিরে সপরিবারে এখানে আমন্ত্রিত হয়েছে আহসান’রা। দুর্জয় খুলনায় ফিরেছে ঘন্টাখানেক, আর এসেই অনুষ্ঠানের সামিল হতে এখানে এসেছিল সে। তবে ভেতরে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া হয়তো কল্পনাতেও ছিল না ওর।
মেয়েটাকে সম্ভাব্য প্রচন্ড পরিচিত লেগেছে ওর। কুঁচকে আসা ভ্রু যুগলের নিচে সু-তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,শক্ত চোয়াল তখনো প্রধান প্রবেশদ্বারে নিবদ্ধ।
উদ্ভাবনী নৃত্যের সমাপ্তি ঘটেছে কিছুক্ষণ। সম্মুখসারির আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিবৃন্দের ঠিক পশ্চাৎভাগে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনসমূহ বিন্যস্ত। বাঁদিকের পরপর ছয়টি আসনে উপবিষ্ট সেই চঞ্চল তরুণদল। তবে, তারা শুধু বসে নেই; নানাবিধ সাংগঠনিক কর্মের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু অবসর মিলছে, ততটুকু সময়ই এখানে সমবেত হয়ে আড্ডার কলতান তুলছে। কায়রা-মেধা-তূজা মূল অনুষ্ঠান উপভোগের অপেক্ষা পরস্পরের সহিত প্রগলভ বাক্যালাপে অধিক মনোযোগী।
আহসানরা সপরিবারে ডানদিকে বসলেও দুর্জয়ের জায়গা হয়নি। অগত্যা,ওকে বসতে হয়েছে ডানদিকের কিছু বিচ্চু বাহিনীর ঠিক সম্মুখে। পশ্চাৎ হতে, অবিরত ভেসে আসা কথার অনর্গল তোড়ে দুর্জয়ের ধৈর্যসীমা ক্রমেই অতিক্রান্ত হচ্ছিলো। শেষমেষ তীব্র বিরক্তিভরে সে পশ্চাদ্ভাগে তাকিয়ে কিছু বলার পূর্ব মুহূর্তেই কায়রা, মেধা ও তূজার নজর ঠেকলো তার উপর। কিন্তু মঞ্চের রঙিন আলোকছটা ও দুর্জয়ের চোখে থাকা ঘন কৃষ্ণবর্ণের সানগ্লাসের দরুন কায়রারা স্পষ্টভাবে সনাক্ত করতে অক্ষম তার মুখাবয়ব।
কায়রা ভ্রু কুঞ্জনপূর্বক বললো,,
“হ্যালো মিষ্টার! অত গম্ভীর মুখে আমাদের দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন শুনি? অনুষ্ঠান দেখতে এসেছেন, ওদিকে মন দিন! নাকি পেছন ফিরে এক্স-স্টুডেন্টদের সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করতেই টিকিট কেটেছেন?”
তূজা কায়রার কনুইয়ে আলতো খোঁচা দিয়ে বললো,
“আরে কায়া, থাম না! উনি কি কিছু বলেছে নাকি? তুই যে হারে বলছিস, তাই হয়তো তাকিয়েছে।”
কায়রা অবহেলার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে জবাব দিলো,
“ধুর! তুই চুপ থাক। আর ভাইয়া, কোনো প্রবলেম থাকলে সামনে তাকিয়ে বসুন, নইলে সোজা অন্যদিকে গিয়ে বসতে পারেন!”
দুর্জয় কায়রার স্পর্ধা ও অনর্গল বাকপটুতা শুনিয়া ক্ষণিকের তরে স্তব্ধ হলো। চোখ ধাঁধানো আলোয় দেখতে পেলো না অসভ্য মেয়েটার মুখশ্রী। তবুও, কন্ঠস্বর চিনলো হয়তো। সুদৃঢ় চিবুক কঠোর হলো মুহূর্তেই, চশমার অন্তরালে তীক্ষ্ণ নেত্রদ্বয় পলকের তরে জ্বলল তীব্র! তবে সে স্বল্পভাষী ও সংযমী স্বভাবের পুরুষ; বৃথা তর্কে জড়ানো তার রুচিসম্মত নয় একদম। তাই, কোনো কথা না বলে,কেবল এক নীরব-গম্ভীর চাউনি নিক্ষেপ করে তড়াক বেগে উঠে দাঁড়ালো।
অতঃপর এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। কায়রা তার প্রস্থানে বিজয়ের হাসি হেসে তূজাকে বলল,
“দেখলি তো? বেশি কথা বললে অমনি চম্পট দেয়! এসব গ্যাংস্টার ভাব ধরা ছেলেদের দাওয়াই আমার ভালো করেই জানা আছে।”
নিশীথ নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে চরাচর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটা বড্ড একঘেয়ে লাগছিল ও বন্ধু মহলের। তাই,মুক্তমঞ্চের রঙিন আলোকসজ্জা-মাইকের বিরক্তিকর আওয়াজ পেছনে ফেলে ওরা ছয়জন হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের কাছের এক আইসক্রিম ভ্যানের সামনে।
হাতে কোন আইসক্রিম, মুখে কথা-এই হলো ওদের সার্বক্ষণিক অবস্থা। কায়রা চকোলেট কোন আইসক্রিমে একটা বড় কামড় বসিয়ে হঠাৎই বন্ধুদের পানে চেয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,
“ইয়ার! তোরা যা-ই বলিস, কটকার ওই মেজরটা.. মাই গড! ব্যাডার পারসোনালিটি কিন্তু মারাত্মক ছিল ভাই! সত্যি বলতে, আমি মারাত্মক ক্রাশ খেয়েছি ওনার ওপর!”
ফের ফালতু কথার পুনরাবৃত্তিতে ভ্রু জড়ায় সবগুলো। ওইদিন ফেরার পর থেকে এক কথা শুনতে শুনতে কানের পোকা নড়ার উপক্রম সবগুলোর। সবার হয়ে মেধা বলল,,
“আবার শুরু হলো ফালতু কথা!”
কায়রা ওর দিকে মুখ কুঁচকে চাইতেই পাশ থেকে তূজা ওর বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“এই তোর না মেজরের সাথে বিয়ের কথা চলছিল বলে,তুই পালিয়ে গেলি। আর এখন কোথাকার কোন অচেনা এক কালশকুনের মতো চেহারার মেজর! স্যরি, তুই তো মুখও দেখিস নি। জাস্ট চোখ দেখেই এত নাটক! মাফ কর ভাই,আর নেওয়া যাচ্ছে না। প্লিজ!”
কায়রা মুখ কুঁচকে আইসক্রিমে কামড় দিয়ে বলল, “আরে বা’ল! কোথাকার কোন ধেড়ে বুইড়া মেজর তার সাথে আমার দূর্জয়ের কোনো তুলনা হয়? ”
কায়রা কল্পলোকে ভাসমান অবস্থায় বলা শেষ কথাটায় বন্ধুমহল সমস্বরে বলে উঠল,,
“তোর দূর্জয়?”
বন্ধুদের চিৎকারে কল্পলোক হতে খসে নিচে পড়লো কায়রা। পূর্বে কি বলেছে উপলব্ধি করে অপ্রস্তুত হলেও, দমে না গিয়ে বলল,,
“হ-হ্যাঁ! আমার দূর্জয়-ই তো!”
নিহার খেঁকিয়ে বললো,
“হ্যাঁ,তোর দূর্জয়-ই তো! ফালতু ক্রাশ খাওয়া বন্ধ কর,মদন। শালী দেখ গিয়ে,ঐ বেডা বিবাহিত-দুই বাচ্চার বাপ কিনা!”
রুশাফ বললো,,
“তাছাড়া কি? মেজর এই দামড়া বয়সে কি ওর মতো পাগলের জন্য বসে আছে নাকি?”
ওদের এমন কথায় কায়রা কৃত্রিম রাগ দেখি চেঁচিয়ে উঠলো,,
“চুপ কর তো তোরা!”
পরমুহূর্তেই নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলল,,
“না ভাই! ওনার বিয়ে হতে পারে না! অত হ্যান্ডসাম লোক এত তাড়াতাড়ি বিবাহিত হয়ে গেলে দুনিয়ার সুন্দর মেয়েদের কী হবে? আই মিন আমার কী হবে? ওনার বিয়ে হতে পারে না, পসিবলই না! আমি বিশ্বাস করি না!”
ওর এমন অতি নাটকীয়তায় বাকি পাঁচ সদস্য গেয়ে উঠলো,,
🎶 প্রেমের সমাধি ভেঙে….
মনের শিকল ছিঁড়ে…..
মেজর যায় উড়ে যায়…..
কায়রা’র হৃদয় ভেঙে যায়…..🎶
কায়রা বাড়ি ফিরেই শাওয়ার নিয়েছে। জলসিক্ত চুলগুলোতে টাওয়াল পেঁচিয়ে সবে দাঁড়িয়েছে দর্পণের সম্মুখে। হঠাৎ, পিছে কারো উপস্থিতি অনুভূত হতেই ও একই অবস্থানে থেকে বলল,,
“কিছু বলবি?”
পায়রা ধপ করে বিছানায় বসলো। হাই তুলে বলল,,
“ফুপি ডাকছে তোকে।”
“আমাকে? মানে এমন হঠাৎ করে কেন?”
“সে আমি কি জানি! আর,শুধু ফুপি না আব্বু-আম্মু সবাই ডাকে।”
কায়রা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ।একসঙ্গে এতজন ডাকছে,কি বলবে কে জানে? ওকে, ঘোরে আচ্ছন্ন দেখে পায়রা বলল,
“আরে ভাই জলদি যা!”
“য-যাচ্ছি!”
“হ্যাঁ,আয়।”
পায়রা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ বাদে নিজেকে গুছিয়ে বের হলো কায়রা।
খানিক বাদে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলো কায়রা;পরিবেশ থমথমে। নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করছে চায়ের কাপে চামচ ঘোরানোর শব্দ। সোফার এক কোণে বাবা আর ফুফু কি বিষয়ে জানি শলা-পরামর্শে লিপ্ত। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল কায়রা,,
“আমাকে ডাকছিলে ফুপি?”
প্রত্যুত্তরে আঞ্জুমান ইয়াসির মুচকি হাসলেন।নিজের পাশের একটা শূন্যস্থান ইশারা করে কায়রার উদ্দেশ্যে বললেন,,
“হ্যাঁ,এখানে বসো।”
আকস্মিক ফুফুর এমন নরম আচরণে ভীষণ অবাক হলো কায়রা। যেখানে সে ভেবেই নিয়েছিল কানের তুলো দিয়ে বসতে হবে। অথচ তার পরিবর্তে,আঞ্জুমান ইয়াসির চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে আলতো করে কায়রার এক হাত নিজের স্নেহার্দ হাতে টেনে নিলেন। কায়রা থমকে বসে রইল; ফুপুর এই অত্যাধিক অমায়িক ভাবসাব ওর চঞ্চল হৃদয় সংশয়ের মেঘ জমালো ফের।
আঞ্জুমান ইয়াসির মৃদু হেসে বললেন,
“কায়রা, তোমার আব্বু আর আমার একটাই ইচ্ছা-তুমি আর পায়রা ভালো কোনো পরিবারে শান্তিতে থেকো। সুখে সংসার করো।”
কায়রা আমতা আমতা করে বলল,
“আ-হাঁ ফুপি, কিন্তু হঠাৎ এসব কথা কেন বলছ?”
আনোয়ার সাহেব চশমাটা টেবিল থেকে তুলে চোখে লাগিয়ে গম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন,
“হঠাৎ না মা। যে পাত্রপক্ষ তোমাকে দেখতে আসার কথা ছিল, ওনারা অত্যন্ত সুশীল আর সম্ভ্রান্ত পরিবার। ছেলেটির মা তোমাকে এক নজর দেখেই একদম নিজের মনের মতো মনে করে পছন্দ করে নিয়েছেন। আর, আমরা সব ভেবেচিন্তে সম্মতি দিয়ে দিয়েছি।”
কথাটা শোনামাত্র কায়রার বুকের ভেতর যেন একটা বড়সড় ধাক্কা লাগল! চোখ দুটো গোল গোল করে ও সোফায় সটান হয়ে বসল,,
“মানে? সম্মতি দিয়ে দিয়েছ মানে কী, আব্বু? তোমরা আমার সাথে কোনো কথা না বলে, আমাকে না জানিয়ে এত বড় একটা ডিসিশন কীভাবে নিয়ে নিলে?”
নূরা বেগম রান্নাঘর থেকে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে এসে দাঁড়ালেন। নরম গলায় বললেন,
“আহা কায়া, এভাবে চেঁচাচ্ছিস কেন? তোদের ভালোর জন্যই তো আমরা আছি, নাকি? তুই তো আর ছোট থাকিসনি। ছেলে সেনাবাহিনীতে আছে, ভালো পোস্ট, অত্যন্ত মার্জিত পরিবার। আর কী চাই বল তো?”
“সেনাবাহিনী?” কায়রার মুখ থেকে কথাটা প্রায় চিৎকারের মতো বের হয়ে এলো;ও ফুপুর দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সুর এনে বলল,
“ফুপি! তোমরা প্লিজ এমন করো না! আমি এখন কোনো ডিফেন্সের লোককে বিয়ে করতেই পারব না! ওসব কড়া শাসনের লাইফস্টাইল আমার সহ্য হয় না! আর তাছাড়া…”
কায়রা থামতেই আঞ্জুমান ইয়াসির একটু কড়া চোখে চাইলেন,
“আর তাছাড়া কী, কায়রা? ভার্সিটিতে কটা দিন ঘুরলেই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মতো অত বড় হয়ে যাওনি তুমি। আমরা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। পাত্রের অত্যন্ত সৎ আর দায়িত্বশীল ছেলে। আগামী কালই পাকা কথা বলতে ওদের পরিবার আসছে। কোনো অযৌক্তিক অঘটন ঘটানোর চেষ্টা করবে না একদম!”
“কিন্তু,ফুপি?”
“কিন্তু কিছুই নয়। এখন তুমি আসতে পারো।”
ভেতরে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হলেও;মুখে কথা বাড়ানোর সাহস হলো না কায়রার। রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে উঠে চলে এলো ও।
আহসান কুঞ্জের দু’তলার একদম পূর্বপাশ ঘেষা ঘরটি দুর্জয়ের নিখাদ ব্যক্তিসত্তারই এক প্রতিচ্ছবি। সবকিছুই অতিরিক্ত পরিপাটি, শৃঙ্খলার এক কঠোর প্রলেপে ঢাকা।শাওয়ার নিয়ে একটা সাদার ওপর সূক্ষ্ম ছাইরঙা স্ট্রাইপের সুতি ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরে নিল সে। বিছানার ওপর ছড়ানো ড্রেসগুলো ভাঁজ করে একে একে কাঠের সুবিশাল আলমারির ভেতরে তুলে রাখছিল।
হঠাৎ ,এক কোণে রাখা একটা ছোট কাঠের অর্গানাইজারের ওপর দৃষ্টি আটকালো ওর। ধাতব একখানা জিনিস আলোর প্রতিফলনে সামান্য ঝলসে উঠছে। দুর্জয় ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নিল।
একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নরম পাতনশৈলীর সোনার চেইন। লম্বা, সুঠাম আঙুলের ওপর সোনার চেইনটি ঝুলিয়ে দুর্জয় অত্যন্ত তীক্ষ্ণ চোখে সেটির দিকে তাকাল। কুঁচকে থাকা ভ্রুর অন্তরালে ওর মস্তিষ্কের নিউরনগুলো স্মৃতির পাতায় দ্রুত গতিতে যাতায়াত শুরু করল।
কটকার সেই র’ক্তা’ভ বিকেল! বনের কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে কেওড়া ঝোপের আড়ালে বিপদ থেকে বাঁচাতে,ও যখন চঞ্চলা মেয়েটিকে একহাতে পাঁজকোলা করে তুলে নিচ্ছিল, ঠিক তখন মেয়েটির ওড়না আর গলার চেইনটি দুর্জয়ের জ্যাকেটের মেটাল ক্লিপে মারাত্মকভাবে পেঁচিয়ে গিয়েছিল। পর মুহূর্তেই টান লেগে নিঃশব্দে ছিঁড়ে এসেছিল চেইনটা। পরবর্তীতে ক্যাম্পের ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেট পরিষ্কারের সময় পকেট থেকে উদ্ধার হয়েছিল এটি।
দুর্জয়ের অনাবৃত, গভীর নেত্রে রহস্যের ঝিলিক। ও চেইনটি নিয়ে অর্গানাইজারের ভেতরের এক পাশে সরিয়ে রাখবে, ঠিক তখনই দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। চট জলদি কাঠের ড্রয়ারটা টেনে চেইনটা ভেতরে চালান করে দিয়ে আলমারির পাল্লাটা চাপিয়ে দিল দুর্জয়। দরজার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এসো, আম্মা।”
সাজেদা চৌধুরী হাসিমুখে ভেতরে পা রাখলেন; ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“ঘুমাসনি এখনো, আব্বাজান? কত ঝামেলার মধ্যে ছিলি,জার্নি করে এলি। নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত?”
দুর্জয় মায়ের পানে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“না আম্মা, অতোটা ক্লান্ত নই। কিন্তু,তুমি এত রাতে এখানে?”
সাজেদা চৌধুরী ছেলের শার্টের কলারটা একটু গুছিয়ে দিয়ে বেশ উৎফুল্ল গলায় বললেন,
“তোকে কাল বিকেলের সময়টা খালি রাখতে হবে, আব্বা। কাল আমরা আবার সেই মেয়েটার বাড়িতে পাকা কথা বলতে যাচ্ছি।”
দুর্জয় ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে বলল,
“তোমরা না তিন দিন আগেই গিয়ে ঘুরে এলে? আবার কাল কেন?”
সাজেদা চৌধুরী মৃদু হাস্যে একটু অভিমানী সুরে বললেন,
“তখন তো বর বাবাজীবন ইমার্জেন্সি ডিউটির অজুহাতে ভেগে গিয়েছিলে! আর ওদিকে মেয়েটির নাকি কিসের এক ডিপার্টমেন্টাল ফিল্ড ট্রিপ ছিল, ও-ও বাড়ি ছিল না। কাল দু’পক্ষেই পূর্ণ উপস্থিতি দরকার।তোর আব্বু নিজে কথা বলেছেন ওদের বাবার সাথে। কাল বিকেলে আমরা যাচ্ছি, অ্যান্ড দিস টাইম, নো এক্সকিউজ!”
অভিসৃতি পর্ব ৬
দুর্জয় মায়ের চেহারার উচ্ছ্বাসের দিকে একপলক তাকাল। কোনো প্রতিবাদ করার তাগিদ ও অনুভব করল না। আজ্ঞাবহ সৈনিকের মতো ধীর গলায় বলল,,
“ঠিক আছে, আম্মা। তোমরা যা ভালো মনে করো। আই উইল বি রেডি।”
