অভিসৃতি পর্ব ৮
নওরিন কবির তিশা
ধেয়ে আসছে পৌষের মাতাল শিহরণ। উষ্ণ বাতাসের নরম পরশ কাটিয়ে দিগন্তজুড়ে এখন কনকনে হিমেল হাওয়ার আনাগোনা। ক্ষীণ কুহেলির শুভ্র আঁচলে মুখ ঢেকেছে রূপসী প্রকৃতি। তরুপল্লবে দানা বাঁধছে মুক্তোঝরা স্নিগ্ধতা।ভোরে শীত এসে নিঃশব্দে ছুঁয়ে দিচ্ছে চারপাশ; অথচ বেলা বাড়তেই শীতলতা মিলিয়ে চেপে বসছে তপ্ত রৌদ্রশিখা।
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ১০টার ঘর ছুঁইছুঁই। রোদের উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে শহরে। কায়রার এই সাত-সকালে বেরুনোর একমাত্র কারণ ছিল ইভানের পাঠানো পেনড্রাইভটা উদ্ধার করা।ট্রিপের বেশ কিছু জরুরি ফিল্ড ডাটা আর বায়োজিওগ্রাফির ফাইল ছিল ওটাতে। ওগুলো আজ বিকেলের ভেতর অ্যাসাইনমেন্টে না ঢোকালে ডিপার্টমেন্টে নির্ঘাত কেল্লাফতে!
পেনড্রাইভটা উদ্ধারের মিশন শেষ হতেই কায়রা সোনাডাঙ্গা পার হয়ে সোজা নিরালা আউটার বাইপাসের দিকে পা বাড়াল। অসভ্যটা, লোক মারফত পেনড্রাইভ পাঠিয়েছে নিরালার এক মোড়ের ফটোস্ট্যাটের দোকানে।দোকান থেকে পেনড্রাইভটা ব্যাগের অতল গহ্বরে চালান করে কায়রা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু রোদের যা দাপট, তাতেই ওর কপাল ভিজে বিন্দুমাত্র রেহাই মিলছে না;মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছে একদম।
দোকানের ছায়া ছেড়ে ফুটপাতে পা রাখতেই পাশ থেকে মিষ্টি, পরিচিত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
“আরে কায়রা না? তুমি এখানে?”
কায়রা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ওর থেকে ঠিক দু-কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছেন ইথিকা। পরনে স্নিগ্ধ একখানা জলপাই রঙের কামিজ, মুখে জড়িয়ে আছে পরিচিত অমায়িক হাসির রেখা। কায়রা এক মুহূর্তের জন্য বেশ চমকে গেল। চটপট নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে একটু সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ইথিকা আপু! আপনি? এত সকালে এদিকে যে?”
ইথিকাও চঞ্চল ভঙ্গিতে কায়রার দিকে দু-কদম এগিয়ে এসে বললেন,
“আমাদের তো কাছেই বাসা, নিরালা আবাসিক এলাকায়। একটা কাজে একটু রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে গিয়েছিলাম। তা তোমার খবর কী বলো? রোদ তো বেশ কড়া পড়েছে, ছাতা আনোনি?”
কায়রা কপালে জমে থাকা স্বেদকণাগুলো টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বলল।
“না আপু, তাড়াহুড়োয় বের হতে গিয়ে ছাতার কথা একদম মনেই ছিল না,”
ইথিকা কায়রার ক্লান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আর এক মুহূর্ত ভাবলেন না। হুট করে ওর একটা হাত ধরে ভালোবেসে টেনে বললেন,
“শোনো, একদম রোদের মধ্যে আর এক পা-ও এগোতে হবে না। আমার বাসা তো এই কাছেই, একদম ওয়াকিং ডিসট্যান্স। চলো, একটু ঠাণ্ডা পানি খেয়ে জিড়িয়ে নেওয়া যাক। আর আমার চাচিআম্মু তো তোমার কথা প্রায়ই বলেন!”
কায়রা মৃদু অপ্রস্তুত হয়ে চট করে হাত ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় বলল,
“আরে না আপু! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, কিন্তু আমাকে তো একটু জলদিই বাড়ি ফিরতে হবে। আজ একটু প্রবলেম আছে ঘরে…”
কথাটা মুখ দিয়ে বের হতেই কায়রার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে হঠাৎ তড়িৎ শিহরণ খেলে গেলে,‘দাঁড়াও… বাড়ি ফিরলে লাভটা কী?’আজ বিকেলেই তো ওনাদের সেই স্বঘোষিত, অযাচিত পাত্রপক্ষ দেখতে আসার কথা! আর বাড়িতে নামলেই ফুফু তাকে বাধ্য করবেন কড়া শাসনে লক্ষ্মী মেয়ের মতো শাড়ি-গয়না পরে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হতে।
কিন্তু, ও যদি এখন বাড়িই না ফেরে? যদি পাত্রপক্ষ এসে গম্ভীর মুখে ঘণ্টাখানেক বসে থেকে অপমানের একশেষ হয়ে ফিরে যায়? ‘মেয়ে ঘরেই নেই!’—একথা শুনলে তো আর কোনো আত্মসম্মানবোধ থাকা পাত্রপক্ষ এ বাড়িতে দ্বিতীয়বার পা দেবে না! কেল্লাফতে! বিয়ে তো ওখানেই ভস্মীভূত! ভাবনাটা মাথায় আসতেই বক্র হাসির রেখা ফুটলো ওষ্টাধর প্রান্তে। স্বর্গীয় সুযোগ হাতছাড়া করা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
কায়রা মুহূর্তের মধ্যে ভোল বদলে একদম নিরীহ মুখ বানিয়ে ইথিকাকে বলল,
“মানে… আসলে বলছিলাম যে আপু, আপনাকে না করার সাহস আমার নেই! আপনার বাসায় যখন দাওয়াত দিচ্ছেন, একটু জিড়িয়ে নিলে বোধহয় খারাপ হয় না!”
ইথিকা কায়রার এমন মিষ্টি চটপটে জবাবে হেসেই খুন। উনি কায়রার কাঁধে আলতো একটা চাপ দিয়ে প্রফুল্ল কণ্ঠে বললেন,
“এই তো মিষ্টি মেয়ের মতো কথা! চলো চলো, বাড়িতে আমার আম্মু,চাচিআম্মু সবাই আছেন, সব্বাই ভীষণ খুশি হবেন তোমাকে দেখলে!”
কায়রা মনে মনে মহা তৃপ্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইথিকার পাশাপাশি ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে নিজের ক্ষুরধার বুদ্ধি আর আজকের এই সময়োপযোগী কায়দাকে ধন্যবাদ দিতে ভুললো না।
নিবিড় তরুচ্ছায়া বেষ্টিত বহুতল ভবনটির আঙিনা সজ্জিত নানা প্রজাতির লতাগুল্মে। তবে, বন্য বন্য লাগে না একদম। বরঞ্চ,ইটের কড়া মেজাজ সামলে নিতে এখানে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পাতাবাহারি আর নানা প্রজাতির দুর্লভ লতাগুল্ম। আঙিনা ফুঁড়ে সোজা মূল প্রবেশদ্বারের দিকে চলে গেছে সুবিন্যস্ত কংক্রিটের ধবধবে সাদা পাথরের একটি হাঁটার পথ। দু’পাশে ছাঁটাই করা মেহেদি-কামিনীর ঝোপ হতে ভেসে আসছে মনোমুগ্ধকর সুঘ্রাণ।
শহরতলীর যান্ত্রিক কোলাহলের অন্তরালে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, ভবনটির সৌন্দর্য বিশ্লেষণে ব্যস্ত চঞ্চল মস্তিষ্কের ঘোর কাটলো ইথিকার ডাকে,
“চলো জুনিয়র, লিফটে উঠি।”
সামান্য অপ্রস্তুত হলেও ইথিকার দিকে মৃদু হাস্যে চেয়ে ঘাড় দোলালো কায়রা। দুজনে একসঙ্গে ষষ লিফটে চড়ে দোতলায় পৌঁছে গেল কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে। লিফটের ভারী ইস্পাতের দরজা খুলতেই সামনে বেশ চওড়া, মার্বেল পাথরে বাঁধানো করিডোর। ইথিকা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দোতলার ডানপাশের ভারী সেগুন কাঠের ডাবল ডোরের একটি ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে খোদাই করা ব্রাসের বেল টিপল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজাটা খুলে দিলেন এক প্রৌঢ়া গৃহপরিচারিকা। দরজার ভেতর পা রাখতেই দৃষ্টি স্থবির হলো কায়রার। সুপরিসর ড্রয়িংরুমজুড়ে রুচিশীল আসবাবের ছড়াছড়ি—ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের সোফা সেট, দেওয়ালে ঝুলছে জলরঙে আঁকা আধুনিক কিছু পোট্রেট, আর মেঝেকে আরামদায়ক করে রেখেছে পার্সিয়ান গালিচা।
বাবা মস্ত শিল্পপতি হওয়ার দরুন আভিজতের কমতি নেই তাদের বাড়িতেও। তবুও, এদের ড্রয়িং রুমটা কেন জানি ভীষণ মনে ধরল কায়রার। ইথিকা কায়রার হাত ধরে ভালোবেসে ভেতরে নিয়ে এসে সোফায় বসালো, স্বভাবসুলভ হেসে বললো,,
“তুমি একদম রিল্যাক্স হয়ে বসো জুনিয়র। আমি আম্মু আর চাচিআম্মুকে নিয়ে আসছি। চাচিআম্মু তো তোমাকে আজ হঠাৎ দেখলে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাবেন!”
ইথিকা চঞ্চল পায়ে ভেতরে করিডোর দিয়ে ভেতরের কামরার দিকে এগিয়ে গেলো। পরক্ষণেই একজন পরিচারিকাকে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখলো কায়রা। তবে শেষ হবে মনোযোগ না দিয়ে বরং নরম সোফায় শরীর এলিয়ে বসলো সে। আপাতত কিছু ঘন্টার জন্য, এখান থেকে যাচ্ছে না সে।
২ মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে? হয়েছে বোধহয়! তড়িঘড়ি, পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাট হতে, একপ্রকার ছুটে আসলেন সাজেদা চৌধুরী। কায়রা কি সোফায় বসা দেখে, দৌড়ে এসে জড়িয়ে নিলেন ওকে। খুশির চোটে বাকরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম তার,,
“কায়রা মা!”
আচমকা কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই সাজেদা চৌধুরী জড়িয়ে ধরতেই কায়রা ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। বয়োজ্যেষ্ঠ প্রৌঢ়া নারীটির শরীরে এক অদ্ভুত, শান্ত স্নিগ্ধ সুবাস—অনেকটা রোদে শুকানো সুতি শাড়ি আর চন্দনের মিশ্র সু-গন্ধের মতো। মাত্র এক বিকেলের ক্ষণিক সান্নিধ্যে যে মাতৃত্বের পরশ কায়রা অনুভব করেছিল, আজ এই আলিঙ্গনে তা যেন বহুগুণে সজীব হয়ে উঠল,,
“আন্টি?”
সাজেদা চৌধুরী কায়রার গালে দুটো হাত রেখে যেন বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে বললেন,
“কায়রা মা! তুমি সত্যি এসেছ? আমি তো ভাবতেই পারছি না ইথিকা আমাকে কোনো বানোয়াট গল্প বলছে না!”
“আরে না আন্টি! মোড়েই ইথিকা আপুর সাথে দেখা হয়ে গেল, উনি এত জোর করলেন যে না এসে উপায় ছিল না। তবে আপনাকে আবার দেখতে পেয়ে আমারও ভীষণ ভালো লাগছে।”
সাজেদা চৌধুরী কায়রার কপালে আলতো করে স্নেহের চুমু এঁকে দিলো। ঠিক তখনই ভেতর কামরা থেকে একে একে প্রবেশ করলেন আতিকা বেগম আর ইথিকা। আতিকা বেগম কায়রাকে আপাদমস্তক একঝলক দেখে নিয়ে বেশ অমায়িক গলায় বললেন,
“বুবু, এই তবে তোমার সেই পদ্মফুল প্রস্ফুটিত হওয়া মেয়ে? সত্যিই তো মাশাআল্লাহ বড্ড মিষ্টি মিষ্টি মেয়েটা!”
কায়রা লাজুক হেসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”
আতিকা বেগম সোফার অপর প্রান্তে উপবিষ্ট হয়ে বললেন,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম, মা। বোসো বোসো, একদম নিজের ঘরের মতো হাত-পা ছড়িয়ে বোসো,”
এমন সময় করিডোর দিয়ে ফুটফুটে মোমের পুতুলের ন্যায় কুহু ছুট্টে এলো।তুলতুলে দেহ গড়নটা রসগোল্লার ন্যায় লাগছে।পরনে একখানা গোলাপী ফ্রক ওর। কায়রাকে দেখেই চিনতে পেরেছে মিষ্টি মেয়েটি। দৌড়ে এসে কায়রার পা জড়িয়ে বলল,,
“কায়া আন্টি?”
কুহুকে কোলে তুলে নিতেই তার তুলতুলে গাল দুটো যেন লাল আপেলের মতো আরও মিষ্টি হয়ে উঠল। মেয়েটা কায়রার ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে নিজের গালটা কায়রার গালে ঘষে বল,,
“কায়া আন্টি! তুমি আজকে আমার সাথে খেলবে তো?”
কায়রা পরম আদরে কুহুর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“খেলবো তো সোনা।”
সোফায় বসে থাকা চার নারীর আড্ডায় প্রাণের স্পন্দন দ্বিগুণ হয়েছে তখন। সাজেদা চৌধুরী আর আতিকা বেগম কায়রার প্রতিটা সহজ, চটপটে কথা আর বাচনভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আতিকা বেগম ট্রে থেকে এক বাটি ড্রাই ফ্রুটস আর নাস্তা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“আগে একটু মিষ্টি মুখ করো দেখি মা। সকাল সকাল রোদের মধ্যে ঘুরে এলে, মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ইথিকা, রান্নাঘরে গিয়ে বল তো কায়রার জন্য একদম চিল্ড লেমন শরবত বানাতে!”
“আরে না না আন্টি! ব্যস্ত হবেন না প্লিজ, আমি একদম ঠিক আছি,”
সাজেদা চৌধুরী আরেকটু পাশে ঘেঁষে কায়রার কাছাকাছি বসলেন। পরম মমতায় ওর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বললেন,
“কোনো ব্যস্ততা নেই মা। তুমি আমাদের মেহমান, তার ওপ নিজের থেকে আমাদের বাড়গতে এসেছো। আজ কিন্তু না খেয়ে এক পা-ও নড়তে দেওয়া হবে না তোমাকে!”
কায়রা সহাস্যে মাথা দুলালো। উপচে পড়া খুশি চেপে রাখা যাচ্ছে না আর কিছুতে।পাত্রপক্ষ আসার সময় হয়ে যাচ্ছে অথচ কোণে-ই হাওয়া! নিশ্চিত তুলকালাম বাঁধবে বাড়িতে। ইথিকা শরবতের গ্লাসটা কায়রার হাতে তুলে দিয়ে কৌতূহল নিয়ে শুধাল,
“তা কায়রা, আজ হঠাৎ আউটার বাইপাসের দিকে কী কাজে এলে? আর তোমার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে মনের ভেতরে বিরাট কোনো জয়ের প্ল্যান ঘুরপাক খাচ্ছে, কাহিনী কী বলো তো?”
কায়রা শরবতে একটা বড় চুমুক দিয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর চারপাশের বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে তাকিয়ে একটু রসিয়ে বলতে শুরু করল,
“আর বলবেন না আপু! এমনিতে একটা জরুরী কাজ ছিল আর বাদবাকি! তবে ওটাকে, জয়ের প্ল্যান না, বলুন ‘অপারেশন এস্কেপ’! আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে বিরাট এক আপদ আসার কথা ছিল, সেই আপদের হাত থেকে বাঁচতেই সকাল সকাল ঘর ছেড়ে পালিয়েছি এক প্রকার!”
কথাটা শোনামাত্র সাজেদা চৌধুরী আর আতিকা বেগম একে অপরের দিকে একপলক তাকালেন। সাজেদা চৌধুরীর বেশ আগ্রহ দেখিয়ে শুধালেন,
“কীসের আপদ গো মা? কোনো ঝামেলা নাকি?”
কায়রা কুহুকে একহাতে জড়িয়ে ধরে, অন্যহাতে গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল,
“ঝামেলা মানে আন্টি? পার্মানেন্ট ঝামেলা! আজ নাকি আমাকে ‘পাত্রপক্ষ’ দেখতে আসবে! বোঝেন অবস্থা? আমি এখনও পড়ালেখা শেষ করিনি, আর অমনি আমার ঘাড়ে নাকি এক ধেড়ে জামাই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে!”
ইথিকা ঠোঁট চেপে হাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
“ধেড়ে জামাই? তা পাত্রের কি অনেক বয়স? কী করেন শুনি? সরকারি চাকুরীজীবীদের অমন বয়স হয় শুনেছি! তোমার ক্ষেত্রেও সেম কেস নাকি? অত রাগ করছ কেন?”
কায়রা মুখ ভেংচে হাত নেড়ে বলল,
“আরে না সরকারি চাকরি করে না। তবে, শুনলে আপনারা হাসবেন! পাত্র নাকি ডিফেন্সে আছে! সেনাবাহিনীর এক ধেড়ে মেজর! ওরে বাবা, ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়! মিলিটারির লোকজন তো এমনিতেই হিংস্র আর কড়া মেজাজের হয়। সারাদিন প্যারেড করাবে আর চিল্লাচিল্লি করবে! ওইসব ধেড়ে বুড়ো মেজরের সাথে আমার মতো মিষ্টি মেয়ের কোনো ম্যাচ হয় নাকি, আপনারা বলুন তো?”
কথাটা শোনামাত্র পুরো ড্রয়িংরুমে একমুহূর্তের স্তব্ধতা নেমে এলো। আতিকা বেগম চট করে নিজের আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন অলক্ষ্যে। চাপা হাসিতে কাঁধজোড়া কাঁপছে তখনও। ইথিকা সোফায় মুখ গুঁজে সশব্দে হেসে ফেলার আগেই নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল।সাজেদা চৌধুরী অবশ্য বেশ গুছিয়ে গম্ভীর মুখ করে শুধালেন,
“তা মা, ডিফেন্সের ছেলে তো ভালোই হওয়ার কথা! আর কে বলল তোমাকে যে সব মেজরই ধেড়ে আর বুড়ো হয়? এই যে আমাদের কুহুর ছোট চাচাই—মানে আমার বড় ছেলে—ও-ও তো ডিফেন্সের মেজর! কই, সে তো মোটেই বুড়ো না, বেশ তো সুঠাম আর জোয়ান!”
কায়রা এক মুহূর্তের তরে থেমে সাজেদা চৌধুরীর কথা শুনল। তারপর অবহেলার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,
“আরে আন্টি! আপনার ছেলে হয়তো ব্যতিক্রম, ভালো মানুষ! কিন্তু আমার জন্য যে সম্বন্ধটা পাঠিয়েছে, ওটা নির্ঘাত কোনো বুইড়া ভাম হবে! তা না হলে এই যুগে এসে বর না দেখে কেউ এভাবে বিয়েতে পাকা কথা বলে? আমি তো ফুফুকে সোজা জানিয়ে দিয়েছি, কোনো মেজরের কড়া শাসনের ভাত আমি খেতে পারব না!”
কায়রার এমন নিরেট- নিষ্পাপ প্রত্যুত্তরে আতিকা বেগম আর সাজেদা চৌধুরীর সহ্য ক্ষমতার বাঁধ ভেঙে গেল। ওনারা আর নিজেদের ধরে রাখতে পারলেন না। আটিকা বেগম তড়িঘড়ি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সাজেদা চৌধুরীকে ইশারা করে বললেন,
“বুবু, শোনো… কায়রার জন্য নাস্তার ব্যবস্থাটা রান্নাঘর থেকে দেখে আসি চলো। তুমি একটু এসো তো আমার সাথে!”
“হ্যাঁ,চল ! নাস্তা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে,”
কোন মতে হাসি থামিয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন তারা। তবে,রান্নাঘরের ভেতর ঢুকে দরজার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতেই সাজেদা চৌধুরী আর আতিকা বেগম অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন! সাজেদা চৌধুরী হাসতে হাসতে চোখে আসা জল সামলে আঁচল দিয়ে মুছলেন।আতিকা বেগম হাসতে হাসতে হাঁপিয়ে উঠে বললেন,
“ও বুবু! শুনলে বুবু? আমাদের দুর্জয়কে কিনা মেয়েটা ‘ধেড়ে বুড়ো’ আর ‘হিংস্র’ বানিয়ে দিল! আল্লাহ, কী মেয়ে গো বুবু! ছেলে ইমার্জেন্সি ডিউটিতে গেছে শুনে মেয়ে তো তাকে একদম বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিল!”
সাজেদা চৌধুরী একগাল হেসে চোখের কোণের জল মুছে বললেন,
“আমার দুর্জয়ের উপযুক্ত একখানা ওষুধই জুটেছে রে আতু! বাঘের ঘরে যেন খাঁটি সিংহী এসে উপস্থিত হয়েছে!”
দুজন প্রৌঢ়া নারী রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কায়রার অবুঝ চঞ্চলতার কথা ভেবে আবার মিটিমিটি হাসতে লাগলেন!
শেষ রক্ষা আর হলো কোথায়! ফুফুর ঘন ঘন রুদ্রমূর্তিসুলভ ফোনকল আর হুমকিতে শেষমেশ পালাই পালাই পরিকল্পনা মাঝপথেই ভেস্তে গেল কায়রার। নিরালার স্নিগ্ধ আতিথেয়তা ছেড়ে গজগজ করতে করতে ওকে ফিরতেই হলো নিজের আবাসে।
অপরাহ্নের বিদায় লগ্নে গোধূলি ঘনিয়ে আসছে। ঘরের কোণে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে মুখ হাঁড়ি করে বসে আছে কায়রা। কিছুক্ষণ আগেই পায়রা জোর জবরদস্তি করে ওকে একখানা ঘন নীল রঙা শাড়ি পরিয়ে দিয়ে গেছে। চুলে খানিকটা আলগা খোঁপায় কয়েকটা বেলি ফুলের গাজরা পেঁচিয়ে রাখা। ওষ্টাধরে হালকা রঞ্জকের প্রলেপ। ও বিষণ্ণ বদনে খাটের কোণে বসে নিজের কপালকে অশেষ গালিগালাজ করছিল।
আকস্মিক সেই মুহূর্তে, দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ মনোযোগ কাড়লো ওর। পরিচারিকা রহিমা খালা দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়ে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল,
“ছোটু আপা, তোমারে বাইরে আসতে কইছে।”
কায়রা বালিশে একটা ঘুষি মেরে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
“যাব না আমি! বলে দাও আমার ভীষণ মাথা ধরেছে, আমি ড্রয়িংরুমে গিয়ে কোনো ‘ধেড়ে লোক’-এর সামনে কুচকাওয়াজ করতে পারব না!”
রহিমা খালা আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল,
“আরে না আপা, ড্রয়িংরুমে তোমারে কেউ ডাকেনি। বড় বিবি কইছে, তোমারে সোজা দোতলার পেছনের ছোট স্টাডি রুমটায় যাইতে।”
কায়রা ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল,
“কেন? সেখানে আবার কী?”
“পাত্রপক্ষ নাকি সরাসরি পাত্রের লগে তোমারে আলাদা কথা কইতে কইছে। বড় আপাই তোমারে ওই ঘরে যাইতে বললেন।”
কায়রা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। পরক্ষণেই ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আরেক ছক বসে বসলো। বেশ ভালোই তো হয়েছে! পাত্রীর সঙ্গে আলাদা করে দেখা করার সুযোগ হলে, এক চান্সেই নাকচ করে দেওয়া যাবে। ও বক্র হাস্যে শাড়ির আঁচলটা কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধল।আয়নায় নিজের ক্রুদ্ধ রূপটা আরেকবার নিরীক্ষণ করে, চঞ্চল চরণে দোতলার স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়াল কায়রা।
এটাকে ঠিক কক্ষ বলা যায় না। প্রশস্ত ব্যালকনি বললে ঠিক হবে। আনাচে-কানাচে বইখাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছিল কায়রা। তবে, পাত্রপক্ষ আসার কথায় গোছানো হয়েছে এই যা।কায়রা ধুপধাপ পদক্ষেপে লোকটার পিছনে এসে দাঁড়ালো। মানুষটা, দূর দিগন্তে চেয়ে আছে। যার দরুন, পিঠ ঘোরানো কায়রার দিকে। এতে বড্ড বিরক্ত হলো কায়রা। তবুও নিজেকে সামলে নিলো। যাকে বিয়েই করবেনা, তাকে দেখে লাভ কি?
এমন চিন্তার উদয় হতেই কোনরূপ সৌজন্যের ধার ধারলো না কায়রা। কিঞ্চিত ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল,,
“দেখুন মিস্টার, এই বিয়েটা আমি করতে পারব না।”
“আর ইয়্যু ইন আ রিলেশনশিপ উইথ সামওয়ান?”
অভিসৃতি পর্ব ৭
বলতে বলতেই দুঃসাহসী নারীকায়াটি স্বচক্ষে দেখতে, পিছন ঘুরলো দুর্জয়।এদিকে,শব্দ ক’টি কায়রার কর্ণকুহরে পৌঁছানোমাত্রই ও কায়রা ভ্রু জোড়া কুঁচকে সবিস্ময়ে মুখটা সামান্য উঁচিয়ে সামনের মানুষটার পূর্ণাঙ্গ রূপের দিকে তাকাতেই-পরের মুহূর্তেই পৃথিবীর যাবতীয় শব্দ, বাতাস আর আলো যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল!
উষ্ণ অপরাহ্নের ম্রিয়মান আলো এসে পড়েছে লোকটির তীক্ষ্ণ, ধারালো মুখাবয়বে। দীর্ঘ সুঠামদেহ আবৃত নিখাদ গাঢ় নীল রঙের ফরমাল শার্ট আর কালচে প্যান্ট, সুগঠিত সুঠাম চিবুক, চওড়া ছাতি আর চোখের সেই কুচকুচে কৃষ্ণাভ, অতল চাউনি! ধরিত্রীর সকল পুরুষালি সৌন্দর্য যেন একবিন্দুতে এসে থেমেছে ওর সম্মুখে।
