অভিসৃতি পর্ব ৯
নওরিন কবির তিশা
“রিজেকশনের কারণটা কি শুনতে পারি? জাস্ট ফর উইশ নাকি এনি প্রিভিওস রিলেশনশিপ?”
দুর্জয়ের অনমনীয়-গম্ভীর প্রশ্নের জবাবে কায়রা তখনো নির্বাক, নিশ্চল। স্তব্ধতার প্রলেপ জমেছে ওর আধখোলা ওষ্ঠাধরে। অক্ষিপটজুড়ে কেবল এক অদম্য বিস্ময়ের তোলপাড়। চঞ্চল মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে প্রশ্নের ঝাঁক,“কোনো পুরুষের সৌন্দর্য এতটা মোহনীয় হতে পারে?”
অন্যদিকে কায়রাকে এমন সম্মোহিত,আচ্ছন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুর্জয় চওড়া কপালে সূক্ষ্ম বিরক্তির রেখা চেপে ধীর, মন্থর পায়ে এগিয়ে এল কায়রার দিকে। পুরুষালী তপ্ত উপস্থিতি আর নামীদামি পারফিউমের ভারী সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে মুহূর্তে সজাগ করল কায়রার অসাড় ঘ্রাণেন্দ্রিয়।
মেয়েটির উচ্চতা ওর কাঁধসম প্রায়, কিংবা তার চেয়েও ইঞ্চি খানেক নিচে হয়ত। দুর্জয় সামান্য ঝুঁকে, অনাবৃত কৃষ্ণচোখের তীব্র দৃষ্টি সরাসরি নিবদ্ধ করল কায়রার বিস্ময়-স্তব্ধ নেত্রে। সেই অতল চোখের প্রচ্ছন্ন সান্নিধ্য পেতেই হুট করে ঘোর ভাঙল কায়রার। সচেতনতায় ফিরে এলো অবাধ্য চঞ্চল মন। আকস্মিক অনুভূতির তোলপাড়ে আনমনে কেঁপে উঠল ওষ্টাধর, অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এলো,,
“আ-আমি কি আপনাকে চিনি?”
দুর্জয় বাঁ-পাশের ভ্রু’টা সামান্য উঁচালো। ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গম্ভীর, মেদহীন কণ্ঠে শুধাল,
“আই আস্কড ফার্স্ট, মিস। প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। যে কারণটা প্রথমে প্রডিউস করলেন, সেটায় স্টিক করছেন তো?”
কায়রা কিন্তু এবার আর পিছিয়ে গেল না, কিংবা লোকটির কঠিন সামরিক গম্ভীরতায় ভড়কেও গেল না। বরঞ্চ,ওর কৌতূহলী চঞ্চল সত্তা বিদ্যুৎবেগে জাগ্রত হলো এবার। দুর্জয়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হুট করে আরও দুই কদম এগিয়ে এল ওর একবারে মুখোমুখি!
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর দিয়ে নিজের দেহটাকে খানিকটা উঁচিয়ে দুর্জয়ের সমউচ্চতায় পৌঁছানোর এক বিফল প্রয়াস করলো কায়রা। সুঠাম দীর্ঘদেহের সামনে ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ শাড়ির আঁচল সামলে ঘাড়টা সামান্য ব্যাকিয়ে উঁচু করে ধরল। অতঃপর নিজের কোমল ডান হাতখানা দুর্জয়ের মুখের সামনে কয়েক ইঞ্চি ব্যবধানে তুলে ধরল। হাতের পাতার আড়ালে দুর্জয়ের চিবুক, ঠোঁট আর নাকের অংশটুকু ঢেকে ফেলে-কেবল সেই অনাবৃত, গভীর চোখ দুটিকে উন্মুক্ত রাখল কায়রা।
ঠিক সেই একই চাহনি! কৃষ্ণগহব্বরের ন্যায় এক নিঃশব্দ আকর্ষণ, যা মুহূর্তেই সমস্ত চেতনাকে গহীন অতলে টেনে নিয়ে যায়। সম্মোহিত কায়রার হাত থরথর করে কেঁপে উঠল। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল বিস্ময়ে; অদৃশ্য মায়াজালের পরশে অনুচ্চ,শ্লথ কণ্ঠে কেবল আওড়ালো,
“আ-আপনি… আপনিই কি দুর্জয় আহসান?”
“ইয়েস আই অ্যাম!”
প্রচন্ড গাম্ভীর্যে মোড়া এক নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি। আর তাতেই, পূর্বের অবস্থানে থাকা কায়রা সম্পূর্ণ অচল হয়ে রইল কয়েক মুহূর্তের তরে। কিন্তু পরক্ষণে,চেতনার সব কটি দুয়ার একসঙ্গে খুলে যেতেই এক অনির্বচনীয় অনুভূতির জোয়ার এসে আছড়ে পড়ল ওর চঞ্চল সত্তায়। হাতখানা ঝট করে নামিয়ে নিয়ে, দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে দুর্জয়ের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগলো মুগ্ধ দৃষ্টিতে।
সেদিন শুধু চোখ রেখেছিল, আজ দেখলো পুরো দূর্জয়টাকে। দুর্জয়ের শুভ্র বদন,নিখাদ গাঢ় নীল শার্টের ওপর উন্মুক্ত শক্ত সামর্থ্য গ্রীবা, টানটান চিবুক, সযত্নে ছাঁটা ঘন কালো চুল, হালকা চাপ দাড়ি নিচের পাতলা দুটি ওষ্ঠাধর। দীর্ঘ ঋজু শরীর, সুগঠিত চওড়া কাঁধ আর অটল ব্যক্তিত্ব মিলে ও যেন কোনো সুনিপুণ ভাস্করের অমর সৃষ্টি। সেই রূপের তীব্র দ্যুতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার মতো অবস্থা কায়রার।
ও দুই হাতে নিজের গাল চেপে ধরে হঠাৎ এক অবিশ্বাস্য উচ্ছ্বাসে প্রায় লাফিয়েই উঠল,
“ও গড! আপনি? মানে আমার দুর্জয় আই মিন দূর্জয়? মেজর? দ্য ম্যান অন হুম আই…”
কথাটা শেষ না করেই কায়রা নিজের মুখ চেপে ধরল। ও কী বলতে যাচ্ছিল! ‘দ্য ম্যান অন হুম আই হ্যাভ আ ক্রাশ?’ ফর্সা মুখশ্রী এক লহমায় প্রস্ফুটিত র’ক্তজবার বর্ণ ধারণ করল ওর। দুর্জয় কায়রার অবাধ্য চঞ্চলতা আর বাচালতার তোড় দেখে ভ্রু সামান্য কুঁচকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
কায়রা দুই হাতে নিজের তপ্ত গাল চেপে ধরে কয়েকমূহূর্ত চোখ গোল গোল করে দাঁড়িয়ে রইল। বক্ষপিঞ্জরায় অবস্থানরত হৃদযন্ত্রটায় অদৃশ্য অশ্বের দৌড়পাল্লা আরম্ভ করেছে ইতিমধ্যেই। মনে মনে নিজেকেই নিজে ধিক্কার জানালো ও—‘আল্লাহ্! এই লোক আমারই বাড়িতে? যাকে ভেবে ভেবে রাতের ঘুম হারাম করছিলাম, ওনাকে রিজেক্ট করতে আমি আস্ত একটা দিন খুলনা শহর চষে বেড়ালাম? সুন্দরবনে পালালাম? ধেড়ে মেজর বানিয়ে কীসব বিদঘুটে উক্তি ছড়ালাম? কী কপাল রে তোর কায়া!’
তবে, চঞ্চল মনের ভেতরকার এই মহোৎসব বেশিক্ষণ গোপন রাখতে পারল না কায়রা। ও মুখ থেকে হাত সরিয়ে পরম বিস্ময়ে এক পা এগিয়ে এলো,,
“আপনি সত্যিই আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন? আই মিন… মানে, আপনিই কি আম্মুর সেই ‘ছেলে ডিফেন্সে আছে’ মার্কা সুশীল পাত্র?”
দুর্জয় হাত দুটি আবার পকেটে পুরে নিল। অনমনীয় চোয়াল সামান্য শক্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আমি আমার প্রশ্নের আন্সার এখনো পাইনি, মিস। রিজেকশনের রিজনটা ঠিক কী ছিল? ডিফেন্সের লোক পছন্দ নয়, নাকি অন্য কিছু?”
কায়রা তৎক্ষণাৎ দু’পাশে মাথা নেড়ে অবলীলায় বলে উঠল,
“আরে না না! কী যে বলেন! ডিফেন্সের লোক অপছন্দ হতে যাবে কেন? ডিফেন্সের লোক তো হেব্বি! আই মিন… তাদের পারসোনালিটি, গ্রুমিং,অ্যাটিটিউড—সব একদম নেক্সট লেভেল! আপনার এই নীল শার্টের কাটছাঁট দেখলেই তো যে কেউ একদম কুপোকাত হয়ে যাবে!”
দুর্জয়ের ডানপাশের ভ্রু আবার সামান্য উঁচিয়ে উঠল। এমন স্পষ্ট ও অনভিপ্রেত প্রশংসায় সাধারণ কোনো পুরুষ সামান্য ইতস্তত করলেও দুর্জয় আহসান ব্যতিক্রম। ও কেবল নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত কন্ঠে শুধাল,
“তাহলে একটু আগে যে ঢুকেই বললেন ‘এই বিয়ে করা পসিবল না’?”
কায়রা এবার দুই হাত বাতাসে ছড়িয়ে বলল,
“আরেহ ওটা? ওটা তো টেকনিক্যাল এরর ছিল মিস্টার ! পাত্রের নাম-চেহারা হাইড করে রাখলে এমন তো ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে, তাই না? আমি তো ভেবেছিলাম কোনো কড়া মেজাজের ধেড়ে বুড়ো মেজর আসছে, যে ড্রয়িংরুমে বসেই আমাকে লেফট-রাইট করাবে! কিন্তু আপনাকে দেখে…”
কথাটা মাঝপথে আটকে কায়রা আবার চট করে নিজের জিভ কামড়ে ধরল। লজ্জায় কানের লতি পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল ওর। দুর্জয় এবারও নিজের অতল কৃষ্ণাভ চোখের রাশভারী ভাব সামলে অতি নিচু স্বরে বলল,
“প্যারেড করানোর মতো সময় বা ইচ্ছা—কোনোটাই আমার নেই। সো, ইয়্যু আর সেফ।”
“তাই? সত্যি?তাহলে কি আমি ধরে নেব যে আগামী সপ্তাহেই বিয়ে! মানে সবকিছুর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দেওয়া যায়?”
দুর্জয় কায়রার অবাধ্য চঞ্চলতা আর বিরামহীন বকবকানি নিঃশব্দে পর্যবেক্ষণ করল; ধীর গলায় কেবল এটুকুই বলল,
“দ্যাট ডিপেন্ডস অন ইয়্যু,ইয়্যুর অ্যান্ড মাই ফ্যামিলি। অ্যান্ড ইওর ফাইনাল ডিসিশন।”
“আরে ফ্যামিলি রাজিই। শুধু আমিই বাগড়া দিচ্ছিলাম! সেই যাইহোক, এই মুহূর্ত থেকে আমার ডিসিশন হান্ড্রেডে থাউজেন্ড পার্সেন্ট হ্যাঁ!”
নিজের উচ্ছ্বাস সামলানোর উপায় না খুঁজে পেয়ে, শেষমেষ, পলানোর পথ বেছে নিল কায়রা। দুর্জয়ের দিকে চেয়ে প্রফুল্ল কণ্ঠে বললো,
“আমি… আমি একটু আম্মুদের ডেকে নিয়ে আসছি! আই মিন, নিচে যাচ্ছি!”
দুর্জয় কিছু বলার আগেই কায়রা নিজের শাড়ি কোনোমতে সামলে নিয়ে চটপটে হরিণীর মতো ঝড়ের গতিতে ঘরের দরজা পেরিয়ে এক প্রকার দৌড়ই লাগাল দোতলার সিঁড়ির দিকে! আর পেছনে, নিস্তব্ধ ব্যালকনিতে দন্ডায়মান দীর্ঘদেহী সৈনিকটি কায়রার ধেয়ে যাওয়া চঞ্চল চরণের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। ঠোঁটের কোণে অতি অলক্ষ্যে ফুটল এক চিলতে অমায়িক, নিখাদ হাসির স্পর্শ! পরক্ষণেই গম্ভীর ব্যক্তিত্বে ভারিক্কিতে চাপা পড়লো তা।
“আব্বুউউউ, ফুপিইই আমি বিয়েটা করতে চাইইই!”
প্রফুল্ল কন্ঠে বেশ চেঁচিয়ে কথাটা বলার পরমুহূর্তই কায়রার বোধগম্য হলো ড্রয়িংরুমে শুধু তার পরিবার নয় উপস্থিত পাত্রপক্ষও। অজ্ঞাত মানুষগুলোর সামনে এমন হ্যাংলামি করায় নিজেকেই নিজে ধিক্কার জানালো কায়রা। কী করছে আজকে ও? এতটা নির্লজ্জ ও কি আগে কখনো ছিলো? এক চরম অনভিপ্রেত লজ্জার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল কায়রার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। ও দুই চোখ খিঁচে বন্ধ করে প্রকাণ্ড এক অপরাধীর মতো স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সোফায় উপবিষ্ট আঞ্জুমান ইয়াসির আর আনোয়ার সাহেবের হাতের চায়ের কাপ মাঝপথে থমকে গেছে। অন্যদিকে সাজেদা চৌধুরী, আতিকা বেগম আর ইথিকা-তিনজনেই বিস্ময়ে কয়েক সেকেন্ড নির্বাক থেকে, পরক্ষণেই নিঃশব্দে মুখে আঁচল চেপে ধরলেন। আঞ্জুমান ইয়াসির চশমার ফাঁক দিয়ে কায়রার লাল হয়ে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া গলায় বললেন,
“কায়রা! এগুলো কোন ধরনের অসভ্যতা? ঘরে মেহমান বসে আছেন, আর তুমি সিঁড়ি থেকে নেমে এভাবে চেঁচামেচি করছো?”
সাজেদা চৌধুরী চাপা হেসে কায়রার উদ্দেশ্যে শুধালেন,,
“আমার বুড়ো ছেলেটাকে পছন্দ হলো তাহলে?”
প্রচন্ড উচ্ছ্বাসে মগ্ন কায়রা সম্মুখে উপস্থিত কাউকেই ভালো করে দেখেনি। আকস্মিক পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই, পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকালো ও। আর সামনেই সাজেদা চৌধুরী, ইথিকা আর আতিকা বেগমকে দেখে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লো যেনো। বিস্ফোরিত কন্ঠে বলল,,
“আন্টি? আপনারা?”
ইথিকা এবার উঠে ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল,,
“হ্যাঁ জুনিয়র! আমরাই তো। ছেলে যাদের তারাই তো আসবে, তাই না?”
“মানে?”
ফের বোকা প্রশ্ন! বিষ্ময়ে আচ্ছন্ন মস্তিষ্ক টা স্বাভাবিক জিনিসটাও ধরতে পারছে না। এবার সাজেদা চৌধুরী এগিয়ে এসে বলল,,
“মানে, তোমার ভাষ্যমতে আমার ধেড়ে বুড়ো মেজর ছেলের বউ করে নিয়ে যেতে এসেছি তোমাকে। হবে তো আমার ছেলের একমাত্র সহধর্মিনী?”
শ্রবনান্ত্রেয়কে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না কায়রার। আশ্চর্যের চূড়ান্তে অবস্থান করছে ও।
“মানে? আপনিই মেজরের আম্মু? মানে আপনি আমাকে পছন্দ করেছিলেন?”
সাজেদা বেগম মৃদু হাস্যে ঘাড় দোলালেন। অকস্মাৎ সমগ্র বিষয়টার কার্যকারণ অনুধাবন করতে পেরে বোকা বনে গেল ও। ততক্ষণে দুর্জয়ও এসে উপস্থিত হয়েছে সেখানে। দুর্জয়ের বাবা ইকবাল সাহেব চশমাটা ঠিক করে নিয়ে হাসিমুখে আনোয়ার সাহেবের দিকে চাইলেন; অত্যন্ত প্রফুল্ল কণ্ঠে বললেন,,
“আনোয়ার সাহেব, আমাদের তো কায়রা মাকে প্রথম দিন থেকেই শতভাগ পছন্দ। মিষ্টি মা’টার মতো এমন চঞ্চল, প্রাণবন্ত একটা মেয়ে আমাদের গম্ভীর বাড়িটাকে এক নিমেষে আলোয় ভরিয়ে দেবে। এবার আপনাদের আর তরুণ প্রজন্মের অভিমতটা জানা দরকার।”
বলেই তিনি ছেলের দিকে তাকালেন। আনোয়ার ইয়াসিরও ভবিষ্যৎ জামাই এর দিকে চেয়ে বললেন,,
“দুর্জয় বাবা, কায়রা আমার ছোট মেয়ে। ভাই বোনের সবার ছোট হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই ভীষণ দুষ্টু আর আদুরে ও। ওর ছেলেমানুষি তো তুমি দেখলে। তোমার কী মতামত? আমাদের মেয়েকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?”
একটা মাত্র প্রশ্ন! আর এতেই উপস্থিত সকলের স্নায়ুর চাপ বেড়ে গেল যেন দ্বিগুণ হারে। চঞ্চল হরিণীটির দৃষ্টি স্থবির হলো মুহুর্তেই। দুর্জয় সেই ডাগর নেত্রে চাইলো একপল। অতঃপর গুরুজনদের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“আমার কোনো আপত্তি নেই।”
ব্যস মুহূর্তেই শোরগোলে পূর্ণ হলো গোটা ড্রয়িংরুম। গুরুজনরা একে অপরের মুখে মিষ্টি দিলেন। ঠিক হতে লাগলো দিনক্ষণ। এদিকে,কায়রার মনে তখন শত প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ছে।
“হ্যেই আপু! আমাকে তো খুব খেপাচ্ছিলেন আমার বর বুড়ো হবে। দেখলেন তো? চোখ দুটো মেলে দেখেছেন আমার মেজর সাহেবকে? উনি যদি গ্লোবাল হ্যান্ডসাম কম্পিটিশনে অ্যাটেন্ড করতেন না, ফার্স্ট প্রাইজটা একদম সসম্মানে বগলদাবা করে নিয়ে আসতেন! কী বুঝলেন?”
রাত তখন নয়টা ছুঁইছুঁই। শুভ্র কুয়াশার চাদরে ঢাকা শহর খুলনার, কোণে কোণে শীতের নীরবতা ঘনীভূত হয়েছে খানিকক্ষণ। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে কায়রা নিজের কক্ষে না গিয়ে পায়রার কক্ষে এসেছে ওকে জ্বালাতে। পায়রা তখন ল্যাপটপে জরুরী কাজে মগ্ন। হুট করে কায়রার এমন কথায় ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ও দিকে তাকিয়ে চরম বিরক্তি ভরে ল্যাপটপটা ধাপ করে বন্ধ করে পাশে রেখে খেঁকিয়ে উঠল,
“আহা রে আমার বিশ্বের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষের বউ! একদম গলে জল হয়ে যাচ্ছিস যে!ঢং কমা কায়া! এখনো এনগেজমেন্টটাও হয়নি, পাকা কথা শেষ হয়েছে মাত্র। এত হ্যাংলামি শুরু করেছিস কেন?”
কায়রা কুণ্ঠাবোধ করার বদলে আরও একধাপ এগিয়ে এসে বিছানায় সটান হয়ে বসলো; চটপটে গলায় বলল,
“আরেহ্! এনগেজমেন্ট আর কাল-পরশুর দূরত্ব মাত্র! চাপ নিস না ব্রো! বর তো আমার কনফার্ম। আমি তো এখন শুধু তোর জন্য আফসোস করছি রে! বয়স তো বাড়ছে, অথচ কপালে একটা বুড়ো ব্যাডারও দেখা নেই। শেষমেশ কি তুই সালমান খানের ফিমেল ভার্সন হওয়ার ট্রাই করছিস নাকি? বল না ভাই, বুঝিস না তোর টেনশনের রাতে ঘুম হয় না আমার!”
পায়রা দামবার পাত্রী নয়! বোনের এমন অপমানমূলক কথা সহ্য করল না একটুও। ফুঁসে উঠে বলল,,
“তোর অত আমার বিয়ে নিয়ে ভাবতে হবে না, অসভ্য মেয়ে! তোকে আমি দেখাচ্ছি!”
কথাটি শেষ হতেই পায়রা কোলবালিশটা তুলে কায়রার গায়ে সজোরে ছুঁড়ে মারল। কায়রাও দ্রুততার সহিত বালিশটা এড়িয়ে নিয়ে বিছানার অন্য কোণে ছিটকে গেল।
অভিসৃতি পর্ব ৮
“আরেহ্! সত্যি কথা বললে এত জ্বলে কেন রে তোর? ও আম্মু দেখে যাও, সালমান খানের ফিমেল ভার্সন আমাকে মারতে আসছে!”
পায়রাও ছাড়ার পাত্রী নয়; তেড়ে গিয়ে কায়রাকে চেপে ধরে মাথার বেলি ফুলের গাজরা ছিঁড়ে ফেলে চুল ধরে টানাটানি শুরু করল।
