ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৪ (২)
মারিয়াম ফুল
মেহের রুদ্ররের কথা শুনে নরম হয়ে এলো। এক পা দু পা করে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল। রুদ্রের সেই শেষ কথাগুলো যেন বন্ধ ঘরের ভারী বাতাসে এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তৈরি করল। মেহের এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
‘মিস অ্যারোফোবিয়া’— রুদ্রর মুখে এই নামটা আজ অনেকদিন পর আবার শুনল সে মনে হলো মেহেরের। মেহের ওর জায়গায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করছে। রুদ্রের মা-বাবার প্রতি এই টান, ওদের আগলে রাখার এই আকুলতা মেহেরকে ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত দোলাচলে ফেলে দিল।
রুদ্র যা বলেছে তা তো মিথ্যে নয়। হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী এই বয়সে যদি জানতে পারেন আসল সত্যটা, তবে ওদের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাবে?
মেহের ঘরের দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
“আই অ্যাম সরি… আমার ভুল হয়েছে। আমি ওভাবে গিয়ে বাবা আর মার কাছে সব বলতে চাওয়া উচিত হয়নি।
কিন্তু আপনি, ক্যাপ্টেন সাহেব… আপনি! আমি সত্যিই আপনাকে বুঝতে পারি না। আপনার এই বারবার বদলে যাওয়া রূপগুলো আমাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। আমি যতই আপনাকে বোঝার চেষ্টা করি, ততই যেন আপনাকে লাগে, অচেনা লাগে ক্যাপ্টেন সাহেব…”
মেহেরের কণ্ঠে হঠাৎ নেমে আসা সেই কোমল সুরটা শুনে রুদ্র ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকাল। পরক্ষণেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসে স্থির হলো মেহেরের মুখে। সেই চাউনিতে ছিল গভীর অনুসন্ধান, যেন সে মেহেরের মনের অগোচর কথাগুলোও পড়ে নিতে চাইছে।রুদ্র এক মুহূর্ত নীরব থেকে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “আমাকে বোঝার চেষ্টা কোরো না, মিস অ্যারোফোবিয়া। যত না বোঝার চেষ্টা করবে, ততই তোমার মঙ্গল।”
“আপনাকে বোঝার সাধ্য আমার নেই হয়তো… কারণ আপনার মতো কাউকে আমি কোনোদিন দেখিনি, ক্যাপ্টেন সাহেব।”
মেহেরের মুখে কথাগুলো শুনে রুদ্র আবার তার দিকে ঝুঁকে এলো। নিজের দৃষ্টি আটকে দিল মেহেরের চোখে। যেন সেই চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো অদেখা রহস্যের নাগাল পেতে চাইছে সে। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে রুদ্র ধীরে ধীরে ফিসফিসিয়ে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“কারণ আমার মতো তুমি আর কাউকে খুঁজে পাবেও না… মিস অ্যারোফোবিয়া।”
রুদ্রর এত তীব্র আর এত কাছের উপস্থিতি মেহেরকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিল। মেহেরকে দুই হাত দিয়ে রুদ্রের বুকে একটা ধাক্কা মারল।
কিন্তু রুদ্র! পাহাড়ের মতো অটল সেই পুরুষকে মেহের এক আঙুলও পেছাতে পারল না। উলটো মেহেরের এই ছটফটানি আর ব্যর্থ চেষ্টা দেখে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ও একটুও পিছু হটল নানা, বরং মেহেরের একদম চোখের ওপর নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা স্থির রেখে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে পকেটে হাত গুঁজে দিল। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে, অত্যন্ত শান্ত অথচ এক অদ্ভুত মাদকতা জড়ানো কণ্ঠে ও ফিসফিসিয়ে বলল, “বড্ড দুর্বল হাত, মিস অ্যারোফোবিয়া। ক্যাপ্টেন সাহেবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার মতো জোর এখনো তোমার এই হাতে তৈরি হয়নি।”
তারপর অত্যন্ত মাপা কদমে, একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজে থেকেই একটু সরে দাঁড়াল। ওর প্রতিটি নড়াচড়ায় এক ধরনের সহজাত আভিজাত্য আর গম্ভীর শান্তভাব যেন কোনো কিছুই ওকে স্পর্শ করতে পারে না।
মেহের বিছানায় বসে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে একটা জিনিস তীব্রভাবে খেয়াল করল ….সে রুদ্রকে এখন পর্যন্ত একবারও প্রাণখুলে হাসতে দেখেনি, কোনো পূর্ণ হাসি রুদ্রের মুখে কোনোদিন ফোটেনি। যতবারই দেখেছে, রুদ্রের ঠোঁটের কোণে শুধু ওই একপাশের রহস্যময়, তাচ্ছিল্যভরা বাঁকা হাসিটাই ফুটে ওঠে। আর রুদ্র যখন ওভাবে বাঁকা হাসে, তখন ওর গালের টোল পড়া অংশটা নরম হওয়ার বদলে যেন আরও বেশি শক্ত, আরও বেশি পুরুষালি আর ধারালো হয়ে ওঠে।
রুদ্রর ওই অদ্ভুত আর পুরুষালি হাসির তীব্রতা মেহের আর সহ্য করতে পারল না। বুকের ভেতরের ধুকপুকানি লুকাতে ও তড়িৎ বেগে রুদ্রর দিক থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে নিবদ্ধ করল ।
রুদ্র এবার মেহেরের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন মুহূর্তেই জমে বরফ হয়ে গেল। ও মেহেরের মুখের ওপর কিছুটা ঝুঁকে এসে বলল , “তুমি যখন এত সত্য কথা বলতেই চেয়েছ, তাহলে আরেকটা সত্য তোমারও জানা উচিত, মিস অ্যারোফোবিয়া।”
মেহের কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। চোখে একরাশ সংশয় আর প্রশ্ন নিয়ে তাকাল,— কী?
রুদ্র মেহেরের চোখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “আমি তোমাকে কেন বিয়ে করেছি, জানো?”
মেহের এবার সামান্য মাথা নাড়ল। যেন উত্তরটা তার খুব ভালো করেই জানা। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
“আপনার ফ্যামিলির জন্য। আপনার বাবা-মায়ের জোরাজুরিতে।”
“নো, সুইটহার্ট ! নিজের জন্য।”
মেহের মুহূর্তের মধ্যে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “মানে? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?”
রুদ্র পকেটে হাত রেখেই ধীর, স্থির পায়ে মেহেরের দিকে এক কদম এগিয়ে এলো। ওর পুরো অবয়বে এক আদিম কর্তৃত্ব।
“আমি যা চাই, তা-ই করি। ইউ নো হোয়াট… আই অ্যাম আ নার্সিসিস্ট। ছোট থেকে এখন পর্যন্ত… আমার জীবনের সব হিসাব, সব সমীকরণ আমি নিজের চাওয়া অনুযায়ী মিলিয়েছি। দাদি কেন, দাদির দাদি এসেও যদি বলতেন, আমি না চাইলে তোমাকে কিংবা পৃথিবীর কাউকেই কেউ আমাকে দিয়ে বিয়ে করাতে পারত না”
মেহেরের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে খানিকটা বিরক্ত স্বরে বলল, “স্পষ্ট করে বলুন, ক্যাপ্টেন সাহেব! ধাঁধা লাগাবেন না।”
রুদ্র এবার মেহেরের চোখের মনিতে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ওর চোখের মণি দুটো যেন এই মুহূর্তে এক হিংস্র আনন্দের আভাস দিচ্ছে।
“অ্যাকচুয়ালি, আই হ্যাভ আ শাদেনফ্রেউডা’ (Schadenfreude) সহজ বাংলায়, অন্যের দুর্ভাগ্য বা কষ্ট দেখে চরম আনন্দ পাওয়া। এটা কোনো সাময়িক রোগ নয় মিস অ্যারোফোবিয়া, এটা আমার অস্তিত্বের অংশ, আমার মানসিক প্রবণতা। আমি তোমাকে বিয়ে করেছি স্রেফ আমার নিজস্ব এক ফ্যান্টাসির জন্য ”
মেহের তীব্র বিস্ময়ে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছিল। রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে ও যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা মানুষকে আবিষ্কার করছে। রুদ্র একটুও না দমে, বরং বলতে লাগল
“জানো, তুমি যদি রাজিও থাকতে আমাকে তোমার সেই সুইট লাভিং হাজব্যান্ড হিসেবে মেনে নিতে… ট্রাস্ট মি, তিন মাসও টিকত না এই বিয়ে। আমার ফ্যান্টাসি অন্য জায়গায়।”
রুদ্রর কথাগুলো মেহেরের মাথায় জটলা পাকানো কোনো এক জটিল, ধাঁধার মতো মনে হতে লাগল। ও কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই রুদ্র আবার বলে উঠল,
জানো, আমি তোমাকে বিয়ের পর পূর্ণ স্বাধীনতা দিতাম। তোমাকে আমার ভালোবাসায় অন্ধ হতে বাধ্য করতাম, তারপর হুট করে এক কোণে একা ফেলে রাখতাম। তোমার চোখে আমার জন্য সেই তীব্র কাতরতা, সেই অবহেলা সহ্য করার অসহনীয় কষ্ট দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগত। যেন এক অদ্ভুত আনন্দ পেতাম আমি!
কিন্তু তোমার নিয়তি তো আরও খারাপ, মিস অ্যারোফোবিয়া। আমাকে নিজের থেকে কিছুই করতে হয়নি। তুমি দেখো, অন্য কারও দেওয়া কষ্টেই ইতিমধ্যে কাঁদছ। বিয়ের রাতে যখন শুনলাম তুমি প্রেগন্যান্ট, আমার ভেতরের সেই ফ্যান্টাসিটা যেন এক ধাক্কায় কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল ”
“তাহলে… আপনি আমাকে এত সাহায্য করলেন, সেটা শুধুই নিজের ফ্যান্টাসি বাঁচিয়ে রাখার জন্য…?”
রুদ্র মেহেরের দিকে একপলক তাকাল। মেহেরের চোখে তখন কেবলই তীব্র অবিশ্বাস আর চরম বিস্ময়ের ছাপ , মেহের আবার প্রশ্ন করল, “আর এই সত্যটা আমাকেই বা কেন বলছেন আপনি ?”
রুদ্র এবার মেহেরের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, “মনে হলো, তাই বললাম।”
বলেই রুদ্র আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক ও দ্রুত পায়ে ঘরের কোণের ড্রয়ারটার কাছে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে কিছু দরকারি ফাইল নিয়ে মেহেরকে নিজের এই চরম বিস্ময় আর ভাবনার এক অতল সাগরে একলা ফেলে রেখে ও গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল।
রুদ্র চলে যাওয়ার পর রুদ্রকে অদ্ভুত লাগলেও মেহের আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি।রাতের অন্ধকার যত গভীর হয়েছে, মেহেরের বুকের ভেতরের শূন্যতা ততটাই ডানা মেলেছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে বহুবার ঘুমানোর চেষ্টা করেছে সে, কিন্তু ঘুম তাকে ধরা দেয়নি। সারা রাত ধরে সে ভাবছিল, সকালটা কেমন হবে।
সকালে যখন অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বের হয়ে আসছিল, তখন পা দুটো যেন কিছুতেই এগোতে চাইছিল না। পেছন ফিরে পুরো ঘরটা আরও একবার ঘুরে ঘুরে দেখল মেহের। প্রতিটি আসবাব, দেয়ালের কোণ যেন বড্ড চেনা, অথচ কত পর! মনের ভেতর একটা মোচড় দিয়ে উঠল—কে জানে, হয়তো এই চেনা চৌকাঠে আর কোনোদিন পা রাখা হবে না তার।
বর্তমানে মেহের এখন দাঁড়িয়ে আছে আদালতের কাঠগড়ায়। সায়েদ বাড়ি থেকে আজ অনেকেই এসেছে—মেঘলা, সায়েদ কামিনী আর ইমরান সাহেব। প্রত্যেকেই থমথমে মুখে সামনের সারিতে বসা। সায়েদ মির্জারও এসেছে। সায়েদ মির্জার দিকে চোখ যেতেই চোখ ফিরিয়ে নিল মেহের।
অন্যদিকে চরম অস্বস্তি আর গাম্ভীর্য নিয়ে বসে আছেন হামজা চৌধুরী। রেহানা চৌধুরীর শরীরটা আজ এতটাই খারাপ যে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারেননি, তাই তাঁর এই শূন্যতা হামজা চৌধুরীকে আরও একা করে দিয়েছে।
মেহেরকে আজ কড়া পুলিশি পাহারায় সরাসরি কাঠগড়ায় এনে দাঁড়ানো হয়েছে।আট মাসের ভারী শরীরটা নিয়ে লোহার রেলিংটা শক্ত করে ধরে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে সে।
বিচারক মহোদয় তার আসনে এসে বসতেই এজলাসের গুঞ্জন এক নিমেষে মিলিয়ে গেল।
মেহের আড়চোখে পেছনের বেঞ্চগুলোর দিকে তাকাল। হামজা চৌধুরী আর সিলেট থেকে ছুটে আসা ইমরান সাহেব পাশাপাশি বসে আছেন, দুজনের মুখই পাথরের মতো শক্ত। আর ওদিকের এক কোণায় বসে আছেন রিনি শেখের স্বামী তুষার শেখ।
মামলার কার্যক্রম শুরু হতেই রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান ব্যারিস্টার আসাদুল হক অত্যন্ত দাপটের সাথে ডায়াসের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“মাই লর্ড! গত আড়াই মাসের তদন্ত এবং গতকাল আদালতে পেশ করা সিসিটিভি ফুটেজ ও ব্যালিস্টিক রিপোর্ট পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটে মিসেস চৌধুরী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না। রিনি শেখের ঘর থেকে যে অবৈধ পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছে, তার মালিক চৌধুরী পরিবার না হলেও, ঘটনার দিন মেহের চৌধুরীর ব্যাগে এক জোড়া সার্জিক্যাল গ্লাভস পাওয়া গিয়েছিল। আসলে ওই গ্লাভস ব্যবহার করেই তিনি পিস্তলটি চালিয়েছিলেন, যাতে উনার আঙুলের ছাপ না পড়ে! সুতরাং, সমস্ত পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ এটাই নির্দেশ করে যে, মিসেস চৌধুরীই রিনি শেখের আসল খুনি। আমি মিসেস চৌধুরীর কঠোর শাস্তির আবেদন জানাচ্ছি”
মেহেরের পক্ষে থাকা আইনজীবী শাকিল হোসেন তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে জোরালো গলায় বললেন, “অবজেকশন, মাই লর্ড! স্রেফ গ্লাভস পাওয়া গেছে বলেই আমার মক্কেলকে খুনি সাব্যস্ত করা যায় না। এটার প্রমাণ কি যেটা আমার আমার মক্কেলের গ্লাভস? তাছাড়া তিনি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, উনার শারীরিক অবস্থা—”
“অবজেকশন সাসটেইন্ড!” বিচারক মহোদয় শাকিল সাহেবের কথা থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “আদালত এই মামলায় আবেগ বনাম প্রমাণের পার্থক্য বোঝে, মিস্টার শাকিল। আপনার কাছে যদি নতুন কোনো অকাট্য তথ্য না থাকে, তবে আদালত রায়ের দিকে অগ্রসর হবে।”
বিচারক মহোদয় উনার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে রায়ের জন্য ফাইলটি হাতে নিলেন। পুরো আদালত কক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা। মেহেরের মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল, চারপাশের দেয়ালগুলো যেন ওকে পিষে ফেলার জন্য ধেয়ে আসছে। নিজের অজান্তেই সে তার পেটের ওপর হাত রাখল। ভেতরের অনাগত সন্তানটা যেন মায়ের অস্থিরতা টের পেয়ে হালকা নড়ে উঠল।
ঠিক তখনই, পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা হামজা চৌধুরীর পকেটে থাকা ফোনটা আচমকা মৃদু ভাইব্রেট করে সশব্দে বেজে উঠল। নিস্তব্ধ এজলাসে শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে প্রতিধ্বনিত হলো
বিচারক মহোদয় তৎক্ষণাৎ রায়ের ফাইল থেকে চোখ তুলে অত্যন্ত বিরক্ত ও কঠোর মুখে হামজা চৌধুরীর দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
“মিস্টার চৌধুরী! আপনি আদালতের নিয়ম ভঙ্গ করছেন। এজলাস কক্ষের ভেতরে ফোন রিসিভ করা বা সচল রাখা সম্পূর্ণ নিষেধ ।”
হামজা চৌধুরী অত্যন্ত লজ্জিত ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তিনি দ্রুত আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিচারকের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বললেন, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, মাই লর্ড। আমি অত্যন্ত ক্ষমাপ্রার্থী। আমি এখনই বাইরে যাচ্ছি।”
তিনি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকানোরও সুযোগ পেলেন না যে কে এই অসময়ে কল করেছে। শুধু ফোনটা হাতে চেপে ধরে অত্যন্ত সাবধানে এজলাস কক্ষের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে করিডোরের দিকে বেরিয়ে গেলেন।
এদিকে আদালত কক্ষের ভেতরে তখন টানটান উত্তেজনা। বিচারক চূড়ান্ত রায় উচ্চকণ্ঠে পড়তে শুরু করেছেন।
“আসামি সাওয়াজ সায়েদ মেহেরের বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার খুনের অভিযোগটি সম্পূর্ণ প্রমাণিত না হলেও, সমস্ত পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে উনার পরোক্ষ উপস্থিতি এবং অপরাধ গোপনের চেষ্টা প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু আসামি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং উনার পূর্ব কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তাই মহামান্য আদালত উনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ওনাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিচ্ছে। তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে, এই আদালত আসামি মেহের চৌধুরীকে ১১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং….. ”
‘১১ বছরের কারাদণ্ড’ শব্দটা শোনামাত্রই মেহেরের চোখ দিয়ে অবাধ্য নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। ইমরান সাহেব দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন। তুষার শেখের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো।
কিন্তু বিচারক উনার রায় শেষ করার আগেই, আদালত কক্ষের ভারী কাঠের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে করে খুলে গেল…
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৪
দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে এক দীর্ঘাবয়ব পুরুষ। তার পরনে কমার্শিয়াল পাইলটের নেভি ব্লু ফুল ইউনিফর্ম, কাঁধে ক্যাপ্টেনের চারটে সোনালী স্ট্রাইপ বাহিরে থেকে আসা রোদ লেগে চকচক করছে।
ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র !
