Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৬
মারিয়াম ফুল

রাত ঠিক যখন দুটো বাজে, রুদ্রের নিজের ভেতরের অস্বস্তির কারণেই সে আর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে পারছিল না। ও অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দ্রুত নিচে নেমে নিজের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সোজা জিসানের ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিল….করিডোর ধরে হেঁটে জিসানের দরজার সামনে গিয়ে রুদ্র আর ভদ্রতার খাতিরে নক করার প্রয়োজন বোধ করল না। ভেতরে জমে থাকা সব রাগ আর ক্ষোভ যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো। রুদ্র জোরে একটা লাথি মারতেই কাঠের ভারী দরজাটা লকসহ ভেঙে গেল। পরক্ষণেই সে ভেতরে ঢুকে পড়ল….
হঠাৎ বিকট শব্দে দরজা ভাঙার আওয়াজে জিসান সোফা থেকে ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়াল। জিসান আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, কে? রুদ্র ? কে ওইখানে? এই মাঝরাতে—

জিসানের কথা শেষ হওয়ার সুযোগ দিল না রুদ্র। ঝাঁপিয়ে পড়ল জিসানের ওপর। প্রথম আঘাতেই রুদ্ররের শক্ত পাথরের মতো জ্যাভলিন পাঞ্চ গিয়ে লাগল জিসানের চোয়ালে। ‘কড়াত’ করে একটা শব্দ হতেই জিসান ছিটকে গিয়ে পড়ল কাচের সেন্টার টেবিলটার ওপর। টেবিলের কাচগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে ওর পিঠে আর হাতে বসে গেল।
জিসান ব্যথায় চিৎকার করে ওঠার আগেই রুদ্র জিসানের শার্টের কলার ধরে টেনে তুলল এবং পরপর দুটো লিভার শট বসিয়ে দিল। পেটের ভেতর তীব্র মোচড় দিয়ে উঠতেই জিসান হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে বমি করতে লাগল। রুদ্র জিসানের চুলে মুঠি চিপে ধরে ওর মাথাটা দেয়ালের সাথে সজোরে আঘাত করল। দেয়ালের প্লাস্টার চটে গিয়ে জিসানের কপাল বেয়ে টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।
জিসান তখন ভয়ে আর তীব্র ব্যথায় থরথর করে কাঁপছিল। রুদ্র ওর কলারটা আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে একদম বলল, “তোর হাড্ডিগোড় আমি একটা একটা করে ভেঙে এই ঘরেই পুঁতে ফেলব, যদি না এখন সত্যি কথা বলিস। বল… রিনি শেখকে কে মেরেছে? মেহেরকে কেন ফাঁসানো হচ্ছে?”
মৃত্যুভয় মানুষকে সত্যি বলতে বাধ্য করে। জিসান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ও রুদ্রর পা জড়িয়ে ধরে রক্তাক্ত অবস্থায় কেঁদে প্রাণ ভিক্ষা চাইলো,

আমা-আমাকে মারবেন না… আমি বলছি! সব বলছি…
জিসানের মুখ থেকে আসল সত্যিটা বের করে নেওয়ার পর রুদ্র ওকে লাথি মেরে সরিয়ে দিল। তখন ঘড়ির কাঁটায় ভোর পাঁচটা। শরীর রক্তাক্ত, মন ক্লান্ত, কিন্তু রুদ্ররের কাজ তখনও শেষ হয়নি। তার আর প্রমাণ চাই, শুধুমাত্র জিসানের স্বীকারোক্তি আদালত বিশ্বাস করবে না ।
ও গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত ফিরে এল ওদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। তবে নিজের বিল্ডিংয়ে না ঢুকে ও সোজা হেঁটে গেল সামনের ডমিনো বিল্ডিংয়ের দিকে। ও জানত, ওদের মেইন গেটের ক্যামেরা নষ্ট করা হলেও ডমিনো বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি ক্যামেরা ঠিকই রাস্তাটা কভার করে।
ডমিনো বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি রুমে গিয়ে রুদ্র দেখল এক বৃদ্ধ সিকিউরিটি গার্ড চেয়ারে মাথা হেলিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। রুদ্র ডেস্কে জোরে থাপ্পড় মেরে গার্ডকে ঘুম থেকে তুলল। গার্ড ধড়ফড়িয়ে উঠে রুদ্রর রক্তাক্ত শার্ট দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করতে চাইল।
রুদ্র তৎক্ষণাৎ গার্ডের মুখ চেপে ধরল। তারপর নিজের পকেট থেকে এক বান্ডিল ১০০০ টাকার নোট বের করে গার্ডের চোখের সামনে ধরল।
“চিৎকার করার চেষ্টা করো না, হলে আমার শার্টের রক্ত তোমার গায়েও লাগবে । চুপচাপ ২৩ তারিখ রাতের সিসিটিভি ফুটেজটা আমার পেনড্রাইভে কপি করে দাও, তাহলে এই ৫০ হাজার টাকা তোমার। কেউ কিচ্ছু জানবে না। বলো, কোনটা চাও?

লোভ আর ভয় দুটোর সংমিশ্রণে গার্ড আর না করতে পারল না। ও কাঁপাকাঁপা হাতে টাকাটা লুফে নিল এবং দ্রুত কম্পিউটার স্ক্রিনে গিয়ে ২৩ তারিখ রাতের ব্যাকআপ ফাইলটা বের করল। রুদ্র নিজের পকেট থেকে পেনড্রাইভটা গার্ডের হাতে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুষার শেখর সেই রাতে এই এলাকায় ঘোরাঘুরির আসল ফুটেজ পেনড্রাইভে চলে এলো।
সব প্রমাণ এক জায়গায় জড়ো করতে রুদ্রকে সারাটা রাত পাগলের মতো ছুটে বেড়াতে হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও ওর চোখের পাতা এক করার সুযোগ হয়নি। চোখের নিচে কালচে দাগ আর শরীরের ক্লান্তি নিয়ে ও যখন সকালে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরল, তখন ওর ভেতরের ঝড়টা একটু শান্ত হয়েছিল। কিন্তু সব প্রমাণ থাকার পরও মনে হল এসব সমস্যা না পড়াই তার জন্য ভালো। রুদ্র মনস্থির করলো যে সে মেহেরকে কোনোভাবে সাহায্য করবে না। তারপর সে ফ্লাইটের জন্য বের হয়ে গেল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে।

রুদ্রের গাড়ি যখন এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিল, তখনও রুদ্রর মনে মনে একটা দ্বন্দ্ব চলছিল। ও ভাবছিল—
এই ঝামেলা সামলানো তো ওর দায়িত্ব নয়। এটা মেহেরের পার্সোনাল ল -ইয়ারের কাজ। ও কেন একটা মেয়ের জন্য নিজের এত কষ্টের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে যাবে? এই ভেবেই ও নিজের পাইলটের ইউনিফর্ম পরে ফ্লাইটের বাহানায় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কিন্তু শেষ সময়ে, একদম শেষ মুহূর্তে এসে ওর অবাধ্য মন আর কোনো যুক্তি, কোনো স্বার্থ মানেনি। মেহেরের অসহায় মুখটা মনে পড়তেই ও নিজের ভেতরের টানটাকে আর অস্বীকার করতে পারেনি।
তাই বাধ্য হয়েই আদালতের সব নিয়ম-কানুন আর ডেকোরামের তোয়াক্কা না করে, সিকিউরিটির সব বাধা উপেক্ষা করে হাতে থাকা মেটালিক পেনড্রাইভ আর জিসানের জবানবন্দি নিয়ে এজলাসের ভেতরে প্রবেশ করেছেন রুদ্র। ভেতরে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে ও নিজের বাবা হামজা চৌধুরীকে কল দিয়ে বলেছিল, ও আসা পর্যন্ত যেন যেকোনো উপায়ে রায় ঘোষণা আটকে রাখা হয়। কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টো, ছেলের ফোন পেয়ে হামজা চৌধুরী তড়িঘড়ি করে আদালত কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন।

মেহের এতক্ষণ ক্লান্তি আর ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে গাড়ির সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিল। কিন্তু ওর অবাধ্য মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না। রুদ্রর এই অপ্রত্যাশিত রূপ, মেহেরকে বাঁচানোর জন্য ওর এই ব্যাকুলতা… সবকিছু যেন মেহেরের ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল।মনের ভেতরের এই উথালপাথাল ভাবটা কাটাতে ও ধীরে ধীরে চোখ মেলল। তারপর আলতো করে মাথাটা ঘুরিয়ে জানালার ডান দিকে তাকালো । বাইরে স্নিগ্ধ বাতাস বইছিল তখন, উইন্ডো সিট থেকে দেখা যাচ্ছিল ছোট ছোট পাহাড় একটার গা ঘেঁষে আরেকটা দাঁড়িয়ে আছে । মেহেরের কোনো ধারণাই ছিল না যে গাড়ির বাঁ পাশে রুদ্র বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎই মেহেরের চোখ বাঁ দিকে পড়ল। তাকাতেই দেখল, রুদ্র জানালার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহের কাচের ওপাশে রুদ্রকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে গাড়ির জানালার কাচের ওপর আলতো করে দুবার টোকা মারল। টোকার সেই মৃদু শব্দে রুদ্রর যেন হুঁশ ফিরল। ও কাচের ওপাশ থেকেই মেহেরের চোখের দিকে তাকাল।কাচের ওপাশ থেকে রুদ্রর সেই অতর্কিত দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই মেহেরের বুকের ভেতরটা আচমকা কেঁপে উঠল। ও জানালার কাচটা আরও খানিকটা নামিয়ে দিয়ে কিছুটা কাঁপা গলায়, জড়তা মিশিয়ে বলে উঠল,

—“আপনি… আপনি এসেছেন?”
—-“আমি আসব না তো কে আসবে? কার জন্য অপেক্ষা করছিলে শুনি? অন্য কেউ আসার কথা আছে নাকি এখানে?”
রুদ্রর জবাবে মেহের মুহূর্তেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও নিজের অস্বস্তি লুকাতে দ্রুত দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, “না… মানে, তেমন কিছু না।”
কথাটা বলেই মেহেরের দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল রুদ্রর পরনের পোশাকের ওপর। ও ভীষণ অবাক হয়ে খেয়াল করল, রুদ্র এই অল্প সময়ের মধ্যে নিজের পরনের সাদা শার্ট আর ফর্মাল প্যান্টটা চেঞ্জ করে ফেলেছে।
রুদ্র এখন যে ধরনের কস্টিউম পরে আছে, তা কোনো সাধারণ পোশাক নয়। মেহের ভালো করেই জানে, সাধারণত প্রফেশনাল রেসিং কম্পিটিশনগুলোতে রেসাররা এই ধরনের আঁটসাঁট স্পোর্টস গিয়ার বা রেসিং স্যুট পরে থাকে। মেহেরের মনে পড়ে গেল, এর আগেও ও রুদ্রকে বহুবার এরকম পোশাক পরে রেসিং ট্র্যাকে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে দেখেছে।
মেহেরের এমন অপলক এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টি রুদ্রেরে নজর এড়াল না। ও নিজের পোশাকের দিকে একবার তাকিয়ে মেহেরের দিকে চোখ ফেরাল।তারপর জ্যাকেটের চেইনটা ঠিক করতে করতেই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

কী দেখছ ওভাবে? অমন হা করে দেখার মতো কী হলো? আই নো আই অ্যাম আ হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ম্যান। কিন্তু এভাবে দেখতে থাকলে তো তুমি খুব দ্রুতই আমার প্রেমে পড়ে যাবে, মিস অ্যারোফোবিয়া ”
রুদ্রর মুখে এমন কথা শুনে মেহেরের পুরো মুখ-চোখ মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। রুদ্রর কথা শুনে মেহের মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো।বললেই হলো নাকি? সে কেন রুদ্রর প্রেমে পড়তে যাবে? রুদ্রর মতো পুরুষ মেহেরের মোটেও পছন্দ নয়।
মেহেরের চেহারার পরিবর্তন দেখে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে মেহেরের ভাবভঙ্গি দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বলল, “কী ব্যাপার? এত ভাবছ কেন মনে মনে? নিশ্চয়ই ভাবছ যে তুমি কেন আমার প্রেমে পড়বে, তাই না?”
রুদ্রর মুখে নিজের মনের ভেতরের কথাটা শুনতে পেয়ে মেহের চমকে উঠল। ও তড়িৎ গতিতে রুদ্রর দিকে নিজের মাথাটা ঘোরাল। ওর চোখ দুটো তখন বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে। ও অবিশ্বাস্য গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আপনি… আপনি কীভাবে জানলেন ?”
রুদ্র নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে কপালের ওপর এসে পড়া অবাধ্য, চুলগুলো আলতো করে একপাশে সরিয়ে দিল। এতক্ষণ সেই এলোমেলো চুলের কারণে ওর চোখ দুটো কিছুটা আড়ালে ছিল, কিন্তু চুলগুলো সরাতেই তার সেই সম্মোহনী চোখ দুটো মেহেরের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। রুদ্রর সেই চাহনি এতটাই গভীর আর তীব্র ছিল যে মেহেরের নিঃশ্বাস যেন আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।
মেহের নিজের বুকের ভেতরের ধকপকানি আর তীব্র হাঁসফাঁস ভাবটা লুকাতে পারল না। ও একটু অস্থির হয়ে, এলোমেলো গলায় আচমকাই বলে উঠল, “এরকমভাবে… এরকমভাবে যদি আমি বলি, উল্টো আপনিই আমার প্রেমে পড়ে যাবেন ?”

কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই মেহেরের যেন হুঁশ ফিরল। মেহেরে নিজে ও বুঝতে পারল না যে ও চরম অস্বস্তির মুখে দাঁড়িয়ে রুদ্রকে সে কি বলে ফেলেছে ,নিজের বলা কথার তীব্রতায় মেহের নিজেই লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। ও দ্রুত নিজের চোখ দুটো নামিয়ে হিজাবের কোণটা আঙুলে শক্ত করে পেঁচাতে লাগল।
রুদ্র মেহেরের এই কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হয়ে গেল। মেহের এমন কিছু বলবে, সেটা সে নিজেও ভাবেনি। কিন্তু পরক্ষণেই রুদ্রের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। ও গাড়ির দরজাটা এক ঝটকায় পুরোটা খুলে মেহেরের একদম কাছে ঝুঁকে গেল।
রুদ্রকে আচমকা নিজের এত কাছাকাছি আসতে দেখে মেহের ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ওর হৃদস্পন্দন যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। ও আতঙ্কে আর লজ্জায় নিজের চোখ-মুখ একদম শক্ত করে খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। ও কাঁপা কাঁপা, জড়তা জড়ানো গলায় প্রায় তোতলামি করে বলে উঠল,“কী… কী করছেন আপনি? সরুন এখান থেকে ”

রুদ্র মেহেরের এই অতিমাত্রায় ভয় পাওয়া দেখে মনে মনে হাসল, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ করল না। ও মেহেরের শরীরের ওপর দিয়ে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে মেহেরের সিটের পাশে থাকা সিটবেল্টটা টেনে নিল। তারপর খুব সাবধানে সিটবেল্টটা মেহেরের শরীরের সাথে লক করে দিল। কাজটা শেষ করে ও মেহেরের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা রেখেই একদম শান্ত গলায় বলতে লাগল, “ডোন্ট ওরি, মিস অ্যারোফোবিয়া। আই নেভার ফল ফর এনিওয়ান। আই হ্যাভ নেভার বিন ইন আ রিলেশনশিপ ইন মাই এন্টার লাইফ।”
রুদ্রের গায়ের পারফিউমের মৃদু সুবাস মেহেরের নাকে এসে লাগছিল। রুদ্র সিটবেল্টটা ঠিক করে, ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা সোজা করে নিল। তার উপস্থিতির চাপটা কমতেই মেহের চোখ খুলল।সে বুক ভরে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যেন এতক্ষণ ধরে আটকে থাকা একটা অদৃশ্য ভার হঠাৎ করে কেটে গেছে। খাঁচার ভেতর বন্দি কোনো প্রাণ মুক্ত হাওয়ায় ফিরলে যেমন লাগে, মেহেরের ভেতরটাও ঠিক তেমনই হালকা হয়ে গেল।
রুদ্রর বলা কথাগুলো মেহেরের কানে তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ও কিছুটা ধাতস্থ হয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা অবিশ্বাসের হাসি ফুটিয়ে তুলল। আচ্ছা! আপনি বলবেন যে আপনি কোনোদিন কোনো রিলেশনে যাননি, আর আমি খুব সহজ-সরল মেয়ের মতো সেটা বিশ্বাস করে নেব? এটা আপনি আশা করেন আমার কাছে?

রুদ্রর ঠোঁটের কোণে আবার সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফিরে এলো।সে মেহেরের এই অবিশ্বাসটা বেশ উপভোগ করছিল। রুদ্র নিজের কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি জানি যে কেউ এটা সহজে বিশ্বাস করবে না। কারণটা খুব সিম্পল… বিকজ আই অ্যাম টু হ্যান্ডসাম ফর দিস ওয়ার্ল্ড, ইভেন ফর দিস ইউনিভার্স……এত সুন্দর একটা ছেলে কোনোদিন রিলেশন করেনি, এটা হজম করা একটু কঠিনই বটে।”
“আমি এটা একদমই অস্বীকার করছি না যে আপনি দেখতে সুন্দর। কিন্তু আপনার এই কথাটা আসলে কোনোভাবেই বিশ্বাস করার যোগ্য নয় যে আপনি কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে কোনো সম্পর্কে জড়াননি।”
রুদ্র ততক্ষণে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এসে বসে পড়েছে। ও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিপুণ হাতে গাড়িটা স্টার্ট দিল। তারপর খুব দক্ষতার সাথে ব্যাক গিয়ার চেপে গাড়িটা কিছুটা পেছনে নিল এবং এক ঝটকায় স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাঁ দিকের একটা সরু পাহাড়ী মোড় পার হয়ে মূল রাস্তার দিকে গাড়ি চলতে লাগল।
রুদ্র সামনের রাস্তার দিকে চোখ রেখেই, মেহেরের দিকে না তাকিয়ে একদম শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “তা এই অবিশ্বাসের পেছনের আসল কারণটা কী, মিস অ্যারোফোবিয়া? তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে যে আমার অতীতে অনেক সম্পর্ক ছিল?”

মেহের এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে রুদ্রর দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসল।
“কারণটা আপনি নিজেই খুব ভালো করে জানেন। আপনি আমার চোখের সামনে দু-দুটো মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছেন! শুধু তাই নয়, আপনি সেদিন ড্রাঙ্ক অবস্থায় নিজের মুখে বলেছিলেন যে আপনার পাস্টে নাকি অনেক গার্লফ্রেন্ড ছিল। এমনকি… এমনকি আপনার কো-পাইলট নিদিতার সাথেও আপনার…”
বলতে বলতে মেহের হঠাৎ করেই মাঝপথে আটকে গেল। ওর গলার স্বরটা কেমন যেন একটু ভারী হয়ে এলো। ও বাকি কথাটুকু আর মুখ ফুটে বলতে পারল না।
মেহেরের মুখে নিদিতার নামটা শুনে রুদ্র হুট করেই স্টিয়ারিং থেকে নিজের চোখ জোড়া সরিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল। রুদ্রর চোখের চাউনিটা তখন কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাল। আসলে রুদ্র সেদিন অতিরিক্ত ড্রিংক করেছিল, যার কারণে নেশার ঘোরে মেহেরকে ও ঠিক কী কী বলেছিল, তার অনেক কিছুই ওর এখন স্পষ্ট মনে নেই। ও ভ্রু কুঁচকে মেহেরকে জিজ্ঞেস করল, “নিদিতার সাথে আমার কী? কী বলেছিলাম আমি সেদিন?”
রুদ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ একটা তীব্র যান্ত্রিক শব্দে ওদের গাড়িটা একটা রেড লাইনের সামনে এসে ব্রেক কষে দাঁড়াল। মেহের এই সুযোগে রুদ্রর চোখের দিক থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ও অস্বস্তি কাটাতে গাড়ির জানালার বাইরে চারপাশের পরিবেশটার দিকে তাকাল।

বাইরে চোখ পড়তেই মেহের মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ও দেখল, ওদের গাড়ির আশেপাশে আরও অনেকগুলো স্পোর্টস কার এবং মডিফাইড গাড়ি এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন আর তেলের তীব্র গন্ধ চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলছে। গাড়িগুলোর ভেতরে থাকা ড্রাইভারদের পরনেও রুদ্রর মতোই রেসিং স্যুট। চারপাশের এই , উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ দেখে মেহেরের বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না যে এরা সবাই এখানে কোনো সাধারণ ট্রাফিকে দাঁড়ায়নি, বরং সবাই একটা প্রফেশনাল রেসিং কম্পিটিশনের জন্য স্টার্টিং লাইনে এসে দাঁড়িয়েছে….

চারপাশের এই দৃশ্য দেখে মেহেরের বুকের ভেতরটা আচমকা এক আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। ও হঠাৎ করেই খুব ভয় পেয়ে গেল। রুদ্র যে একজন প্রফেশনাল রেসার এবং ও যে প্রায়ই এই ধরনের বিপজ্জনক রেসিং কম্পিটিশনে অংশ নেয়, তা মেহের এতদিন ধরে রুদ্রর অ্যাপার্টমেন্টে থাকার সুবাদে খুব ভালো করেই জেনে গেছে। ও কতবার রুদ্রকে এই পোশাক পরে ট্র্যাকে যেতে দেখেছে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ আলাদা
মেহের আতঙ্কিত হয়ে রুদ্রর দিকে ফিরল। মেহেরের কণ্ঠস্বর ভয়ে কাঁপতে লাগল। ও রুদ্রর হাতটা খামচে ধরে প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “রুদ্র! আপনি… আপনি এখন আমার এই অবস্থায় এখানে কী করছেন? আপনি কি এখন এই পাহাড়ী রাস্তায় রেসিং করবেন?”
রুদ্র মেহেরের এই চরম আতঙ্কিত রূপ দেখেও নিজের জায়গায় একদম স্থির রইল। ও সামনের ট্রাফিক লাইটের কাউন্টডাউনের দিকে চোখ রেখে ভাবলেশহীন গলায় বলল, “হুম।”
রুদ্রর এই এক লাইনের শান্ত উত্তর মেহেরের ভেতরের ভয়টাকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। ও নিজের সিটে ছটফট করতে করতে বলল, “আমাকে… আমাকে এই গাড়ির ভেতরে বসিয়ে রেখে আপনি রেসিং করবেন?”

রুদ্র এবারও নিজের দৃষ্টি না সরিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “হুম।”
মেহেরের মাথা যেন এক মুহূর্তে কাজ করা বন্ধ করে দিল। ও আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। মেহের সিটবেল্টটা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে কান্না জড়ানো গলায় চিৎকার করে উঠল, “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আমি মরে যাব! আমি সত্যিই মরে যাব! দয়া করে আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিন। আপনি কি জানেন না যে আমি… আমি প্রেগন্যান্ট?”
মেহেরের চেহারায় আতঙ্ক আর কান্নার ভাব দেখে রুদ্রর ভেতরের নিস্পৃহ ভাবটা এক পলকে উধাও হয়ে গেল। ও বেশ শক্ত গলায় মেহেরকে ধমক দিয়ে উঠল,
“চুপ! একদম চুপ! মেহের, আমি তোমাকে একটা কথাও বলতে বারণ করেছি না? শান্ত হয়ে বসো। আমি থাকতে তোমার বা তোমার বাচ্চার কিচ্ছু হতে দেব না। জাস্ট ট্রাস্ট মি ”
মেহের রুদ্রর এই ধমক শুনে আরও বেশি কেঁদে ফেলার মতো করে বলল,

“আপনি একটা আস্ত পাগল, ক্যাপ্টেন সাহেব….আপনি একদম সাধারণ মানুষের মতো চিন্তা করতে পারেন না। আমি এখন আট মাসের প্রেগন্যান্ট! এই অবস্থায় কেউ এভাবে রেসিং কারে বসে?”
রুদ্র এবার মেহেরের দিকে নিজের চোখ দুটো ফেরাল।
“আই নো মেহের, আমি খুব ভালো করেই জানি যে তুমি এইট মান্থস প্রেগন্যান্ট। কিন্তু তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো আছি। কোনো সমস্যা হলে সেটা দেখে নেওয়ার দায়িত্ব আমার।কয়েক ঘণ্টা আগেও না আদালতে দাঁড়িয়ে তোমার মনে হচ্ছিল যে তুমি একটা দমবন্ধ, বন্দি জীবন কাটাচ্ছ? তাহলে এখন এই মুক্ত বাতাস উপভোগ করো। জাস্ট ট্রাস্ট মি, অ্যারোফোবিয়া গার্ল! এটা তোমার লাইফটাইম একটা এক্সপেরিয়েন্স হতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে তুমি যখন বুড়ো হবে, তখন নিজের নাতিনাতনিদের কাছে গল্প করতে পারবে যে ….তুমি প্রেগন্যান্সি অবস্থায় একটা রেসিং কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছিলে এবং জিতেছিল ”
মেহের রুদ্রর এই অদ্ভুত আর পাগলাটে যুক্তি শুনে পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ও চোখ বড় বড় করে বলল, “কিন্তু রুদ্র… এই অবস্থায় যদি কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়?”

রুদ্র মেহেরকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। ও মাঝপথেই মেহেরের কথায় বাধা দিয়ে কড়া সুরে বলল, “কোনো কিন্তু নয় মিস মেহের। জাস্ট সিট ব্যাক অ্যান্ড রিল্যাক্স।” রুদ্র মেহেরের বসার ভঙ্গি আর সিটবেল্টটার দিকে শেষবারের মতো একপলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “পারফেক্ট।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সিগন্যালের লাল বাতিটা নিভে সবুজ বাতি জ্বলে উঠল এবং বাতাসে একটা ফাঁকা বন্দুকের গুলির বিকট আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো—যা ছিল রেস শুরু হওয়ার অফিশিয়াল সিগন্যাল।
গুলির শব্দটা হওয়ার সাথে সাথেই রুদ্রর গাড়িটা এক তীব্র গতিতে সামনের দিকে ছুটে গেল। ইঞ্জিনের গর্জনে মেহেরের বুকটা যেন কেঁপে উঠল। ও ভয়ে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সিটের হাতলটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
পাহাড়ের সেই উঁচু-নিচু, বিপজ্জনক এবং এঁকেবেঁকে যাওয়া পিচঢালা রাস্তার ওপর দিয়ে একের পর এক রেসিং কার একে অপরকে টেক্কা দিয়ে ছুটে চলতে লাগল। রুদ্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে, ঠাণ্ডা মাথায় গাড়িটা ড্রাইভ করছিল। ও লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে দেখল বাকি গাড়িগুলো ওদের কতটা পেছনে আছে। নিজের পজিশনটা দেখে রুদ্র দাঁত চিপে একটা তৃপ্তির হাসি হাসল।
গাড়ির এই তীব্র গতি আর পাহাড়ী বাঁকগুলোর ঝাঁকুনির মাঝেই রুদ্র হঠাৎ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেহেরকে আবার প্রশ্ন করল, “ওহ হ্যাঁ, ভালো কথা… নিদিতাকে নিয়ে যেন কী একটা বলছিলে? কথা শেষ করলে না যে?”

মেহের এই চরম উত্তেজনার মাঝে রুদ্রর এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো। ও কীভাবে এখন এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রুদ্রকে বলবে যে—যে রুদ্র সারাটা রাত নিদিতার সাথে কাটিয়েছিল!
রুদ্র মেহেরের কোনো উত্তর না পেয়ে আবার ওর দিকে এক পলক তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ডান দিক থেকে একটা স্পোর্টস কার অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রুদ্রর গাড়িকে প্রায় ঘেঁষে, পাশ কাটিয়ে এক চুল দূর দিয়ে সামনে চলে গেল। মেহের সেই দৃশ্য দেখে ভয়ে নিজের সিটের সাথে পুরো লেপ্টে গেল। ও সিটের কভারটা এত শক্ত করে খামচে ধরল যে ওর হাতের আঙুলের নখগুলো সাদা হয়ে গেল।
রুদ্র মেহেরের এই নীরবতা আর আড়ষ্টতা দেখে আবার তাগাদা দিল, “টেল মি, মিস অ্যারোফোবিয়া। আই অ্যাম ওয়েটিং।”

মেহের এবার নিজের ভেতরের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, আপনি সেই রাতে নিদিতার সাথে ছিলেন! আপনি ওর সাথে সারাটা রাত কাটিয়েছেন”
রুদ্র মেহেরের কথা শুনে শুনে একটুও বিচলিত হলো না। ও খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “হুম, কাটিয়েছি তো। আমি তো মিথ্যা বলিনি।”
রুদ্রর মুখে এত সহজে এই সত্যটা স্বীকার করতে দেখে মেহেরের বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু মুচড়ে উঠল। “তার মানে… তার মানে নিধিতার কথা সত্যি ছিল? আপনি সত্যিই ওর সাথে…”
রুদ্র মেহেরের কথার মাঝখানেই নিজের নির্লিপ্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, সত্যি। আমাদের জবের খাতিরে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একই ফ্লাইটে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল করতে হয়েছে, একই হোটেলে থাকতে হয়েছে। তাহলে তো কথা যেটা বলেছ, সেটা এক দিক থেকে সত্যি-ই।”
রুদ্র মেহেরের এই বিভ্রান্ত আর নিষ্পাপ মুখটা দেখে এবার হুট করে হেসেই উঠল। ও গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই বলল, “তুমি বড্ড বোকা, মিস অ্যারোফোবিয়া। আসল সত্যিটা হলো নিদিতা আমাকে পছন্দ করে, ও আমাকে ভালোবাসে। আমি সেটা খুব ভালো করেই জানি এবং বুঝি। কিন্তু আই ডোন্ট কেয়ার, আমি ওকে ওভাবে কোনোদিন পাত্তাই দিই না।”

মেহের রুদ্রর কথা শুনে নিজের মুখটা একটু ঘুরিয়ে, বাতাস থেকে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল, “হলেও হতে পারে। কিন্তু ওই যে বাকি মেয়ে দুটো… যাদের আপনি সেদিন জড়িয়ে ধরেছিলেন?”
“ওরা তো জাস্ট আমার ফ্রেন্ড ছিল, মেহের। ইউএসএ-তে ছেলে-মেয়ের মধ্যে এরকম ফ্রেন্ডশিপ থাকাটা খুব কমন একটা ব্যাপার। যদিও এখন বাংলাদেশেও এটা বেশ কমন।”
মেহের রুদ্রর দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলল, “তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনি কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে অন্য কোনো গভীর সম্পর্কে জড়াননি? সবটাই আপনার কাছে জাস্ট ফ্রেন্ডশিপ?”

রুদ্র এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না। কারণ ঠিক তখনই পাহাড়ের একটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও খাড়া বাঁকে ওদের গাড়িটা হুট করে একটা বড় ঝাঁকুনি খেল। রুদ্র দুর্ঘটনা এড়াতে হঠাৎ ব্রেক কষল।
মেহের এই আকস্মিক ঝাঁকুনিতে সিটবেল্ট থাকা সত্ত্বেও সামনের ড্যাশবোর্ডের দিকে ছিটকে যাচ্ছিল।রুদ্র তৎক্ষণাৎ নিজের বাম হাতটা স্টিয়ারিং থেকে এক সেকেন্ডের জন্য সরিয়ে মেহেরের সামনে শক্ত একটা দেওয়ালের মতো ধরে ফেলল—যাতে মেহের কোনোভাবেই সামনের ড্যাশবোর্ড বা কাচের সাথে ধাক্কা না খায়। মেহেরকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে রুদ্র নিজের শরীরটা মেহেরের দিকে অনেকটাই ঝুঁকিয়ে দিয়েছিল।
গাড়িটা যখন একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে অবশেষে পুরোপুরি স্থির হলো, তখন মেহেরের চোখ গিয়ে সরাসরি থমকে গেল রুদ্রর চোখের ওপর। মেহেরের বুকের ভেতর তখন হৃদপিণ্ডটা যেন কামারের হাতুড়ির মতো পিটছিল। রুদ্রকে এতটা কাছাকাছি দেখে মেহের অজান্তেই ঢোক গিলল।
রুদ্র মেহেরের চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল। রুদ্রের চোখের ক্ষুরধার ভাবটা এই এক মুহূর্তের জন্য যেন কোথায় হারিয়ে গেল। কিন্তু ও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে মেহেরের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে সোজা হয়ে বসল। ও মেহেরের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “দুনিয়ার কোনো মেয়েই কোনোদিন আমার এতটা কাছে আসতে পারেনি মেহের, এখন আমি যতটা তোমার কাছে আছি। সো, আই হোপ তোমার সব ডাউট এখন ক্লিয়ার হয়েছে?”

মেহের রুদ্রর এই কথার কোনো পাল্টা জবাব খুঁজে পেল না। ও লজ্জায় নিজের মুখটা ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। এরপর ওদের দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। পুরো গাড়ির ভেতর এক নীরবতা নেমে এলো—
মেহের জানালার কাচ দিয়ে গভীর মনোযোগে বাইরের রেসের পরিস্থিতি দেখতে লাগল। ও দেখল, রুদ্রর গাড়িটা কখনো অন্য গাড়িগুলোকে পেছনে ফেলে অনেক দূর আগে চলে যাচ্ছে, আবার কখনো পাহাড়ী বাঁকের কারণে অন্য কোনো গাড়ি ওদের পাশ কাটিয়ে আগে চলে যাচ্ছে। রেসের এই চরম উত্তেজনা মেহেরের ভেতরের সমস্ত ভয়কে যেন এক মুহূর্তে উধাও করে দিয়েছিল। ও এখন মনে মনে রুদ্রর জয়ের জন্য দোয়া করছিল….

রেসের একদম শেষ প্রান্তে এসে রুদ্র নিজের দুই হাত দিয়ে স্টিয়ারিংটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ওর চোখ দুটো তখন শিকারী বাঘের মতো স্থির। দূর থেকে রেসের ফিনিশিং লাইনটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু রুদ্রর ঠিক এক ইঞ্চি সামনে অন্য আরেকটা রেসিং কার পুরো ট্র্যাকটা ব্লক করে ছুটে চলছিল। মেহেরের দেখে মনে হচ্ছিল, রুদ্র হয়তো এবার আর পারবে না, ও বোধহয় হেরে যাবে। ওর বুকটা দুরুদুরু কাঁপতে লাগল।
কিন্তু রুদ্র কখনো হারতে শেখেনি। ও একদম শেষ সেকেন্ডে, চোখের পলক ফেলার আগেই এক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় গাড়ি গিয়ার চেঞ্জ করল এবং নিখুঁত একটা স্লাইড নিয়ে সামনের গাড়ির একদম পাশ ঘেঁষে ফিনিশিং লাইনের রেড লাইনটা প্রথম গাড়ি হিসেবে ক্রস করল!
রুদ্রর গাড়ি লাইন ক্রস করার সাথে সাথেই চারপাশের অন্ধকার হয়ে আসা আকাশে একের পর এক রঙিন আতশবাজি ফুটে উঠতে লাগল। আতশবাজির আলোয় পুরো পাহাড়ি এলাকাটা এক নিমেষে ঝলমল করে উঠল।ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। রুদ্র প্রতিবারের মতো এবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

রুদ্র গাড়িটা থামিয়ে এক চিলতে বিজয়ের হাসি হেসে গাড়ি থেকে নেমে গেল। রুদ্র গাড়ি থেকে নামতেই রেসিং ট্র্যাকে উপস্থিত ওর বন্ধুবান্ধব আর ভক্তরা এক চরম উল্লাসে ফেটে পড়ল। ওরা চিৎকার করতে করতে রুদ্রর দিকে এগিয়ে এল এবং রুদ্রকে সবাই মিলে কাঁধে তুলে নিল। রুদ্রকে শূন্যে তুলে ওরা ওপরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিল আর আবার লুফে নিচ্ছিল। চারপাশের এই বাঁধভাঙা উল্লাস আর জয়ধ্বনি মেহেরকে গাড়ির ভেতর আর বসিয়ে রাখতে পারল না।
মেহের ধীর পায়ে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। ও গাড়ির সামনের বনেটের কাছে এসে দাঁড়াল এবং দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে রুদ্রর এই বাঁধভাঙা আনন্দ উল্লাস দেখতে লাগল।
ঠিক তখনই রুদ্রর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরের ওপর। মেহেরের মুখের সেই স্নিগ্ধ হাসিটা দেখে রুদ্রর ভেতরের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে তার কাঁধে তুলে রাখা বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে হাত উঁচিয়ে বলল,

“ওয়েট! স্টপ ইট গাইজ! সবাই একটু থামো।”
রুদ্রর কথা শুনে সবাই কিছুটা অবাক হয়ে উল্লাস থামাল। সবাই কৌতূহলী চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে ভাবল এখন আবার কী হলো? রুদ্র সবার কাঁধ থেকে নিচে নেমে সোজা রেসিং ক্লাবের এক ক্রুকে ডেকে বলল, “এই, জলদি একটা সাউন্ড বক্স নিয়ে আসো ”
রুদ্রর কথা শুনে তড়িঘড়ি করে একটা বড় সাউন্ড বক্স স্টেজের সামনে এনে সেট করা হলো। মেহের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রুদ্রর এই কাণ্ড দেখে ভীষণ অবাক হচ্ছিল। ও মনে মনে ভাবছিল রুদ্র এখন এই অসময়ে সাউন্ড বক্স দিয়ে কী করবে?
রুদ্র সবার সামনেই নিজের গায়ের রেসিং জ্যাকেটটা টেনে এক ঝটকায় খুলে ফেলল। তারপর সেই জ্যাকেটটা রুদ্র নিজের কোমরের চারপাশে বেঁধে নিল। এখন রুদ্রর পরনে রয়েছে কেবল একটা ধবধবে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর রেসিং ট্রাউজার। ওর সুগঠিত, পেশীবহুল শরীরটা সেই পোশাকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
রুদ্র সাউন্ড বক্সের রিমোটটা নিজের হাতে নিয়ে একটা গান প্লে করেল। গানে স্পিকারে বাজতেই রুদ্র নিজের কোমরের দুই পাশে হাত দিয়ে, মাথা দুলিয়ে শোরগোল করতে করতে নাচতে শুরু করল…..

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৫ (২)

“ওহই ওহই অইও… ওহই ওহই অইও!
হাজার দর্শক মন মজাইয়া,
নাচেগো সুন্দরী কমলা…
হাজার দর্শক মন মজাইয়া,
নাচেগো সুন্দরী কমলা!
প্রেমিক পুরুষ আরে রহিম মিয়া,
রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া…
রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া!
রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া…
রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া!”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৭