Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৭

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৭

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৭
মারিয়াম ফুল

কোর্টরুমের সেই গম্ভীর, খুনে চাউনির ক্যাপ্টেন সাহেব যে এভাবে মাঝমাঠে স্যান্ডো গেঞ্জি পরে কোমর দুলিয়ে নাচতে পারেন, তা মেহেরের কল্পনারও বাইরে ছিল। ও নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে মনের সমস্ত কবাট খুলে খিলখিল করে প্রাণখুলে হাসতে লাগল। রুদ্রর এই পাগলামি, এই বুনো উল্লাস দেখে মেহেরের মনে হচ্ছিল সে রুদ্রকে যেন একদম নতুন করে চিনছে। কোর্টরুমের সেই গম্ভীর মানুষটার ভেতরেও যে এমন একটা ছটফটে, নিয়ম না-মানা কিশোর লুকিয়ে আছে, তা ওর ধারণার বাইরে ছিল।
কিন্তু পরক্ষণেই মেহেরের হাসি থেমে গেল, যেন কেউ আচমকা তার আনন্দে লাগাম টেনে ধরেছে। মেহের নিজের হাত দুটো মুখ থেকে সরিয়ে একটু থমকে গেল। মেহেরের মনে হঠাৎ একটা ইতস্ততবোধ তৈরি হলো। ও হাসছে? তাও আবার এই রাইহাম চৌধুরীর কাণ্ডকারখানা দেখে? ওর মনে এতখানি স্বস্তি আর আনন্দ কোত্থেকে আসছে, কেনই বা আসছে ? রুদ্রের খুশি দেখে?

মেহের চট করে নিজের মুখের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
নাচের মাঝখানেই রুদ্ররের রেসিং ক্লাবের একজন ছেলে হঠাৎ বলে উঠল,
“আরে ভাই, টুডে দেয়ার ইজ সামথিং নিউ! কিছু একটা তো নতুন আছে।”
তার পাশে থাকা আরেকজন ক্রু মেম্বার একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল, “নতুন আর কী দেখলি রে বোকা? রাইহাম চৌধুরী তো এই ট্র্যাকে প্রতিবারই আসে আর প্রতিবারই জেতে। এতে নতুনত্বের কী আছে?”
প্রথম ছেলেটি মাথা চুলকে কাউন্টার দিল,
ধুর ডাফার! ও প্রতিবার আসে, রেস জেতে আর চলে যায়। ওরে কি এর আগে কোনোদিন এভাবে সেলিব্রেট করতে দেখছিস? হি নেভার সেলিব্রেটস বিফোর! এত বছর ধরে ওরে আমরা দেখে আসতেছি, ও ট্র্যাকে নামলে মনে হয় কোনো রোবট ড্রাইভ করতেছে। আজকের এই পাগলামি কারণ কি?”
চারপাশের শোরগোলের মাঝেও পাশে থাকা ছেলেদের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল রুদ্র। মুহূর্তেই যেন তার পায়ের গতি থেমে গেল। সত্যিই তো, সে এখানে কী করছে? যে মানুষটা বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিগুলোকে শিকল পরিয়ে রেখেছিল, আজ সেই মানুষটাই কেন এত বেহিসেবি হয়ে উঠেছে? কার জন্য?

রুদ্রর চোখের মণি দুটো চট করে ঘুরে গিয়ে সোজা স্থির হলো গাড়িতে হেলান দিয়ে থাকা মেহেরের ওপর। মেহেরও তখন বিভ্রান্ত চোখে ওর দিকেই চেয়ে ছিল। রুদ্ররের মুখের হাসিটা এক পলকে মিলিয়ে গেল। ও এক ঝটকায় কোমর থেকে নিজের রেসিং জ্যাকেটটা নিয়ে আবার গায়ে পরে নিল, যেন নিজের ভেতরের আলগা রূপটাকে ও আবার জ্যাকেটের নিচে বন্দি করে ফেলল। ও অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বড় বড় পা ফেলে মেহেরের দিকে এগিয়ে গেল।
কাছে এসেই কোনো ভূমিকা না করে রুদ্র একদম কাঠখোট্টা গলায় বলল, “গাড়িতে বসো।”
রুদ্রর এই হঠাৎ মুড সুইং আর আদেশের সুর মেহের প্রথমে ঠিক ধরতে পারল না। ও একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, হুম? কিছু বললেন?
রুদ্র এবার তার সেই চেনা রাগি চোখদুটো মেহেরের মুখের ওপর স্থির করল,কোনো কথা না। ও শুধু চোখের ইশারায় আর চিবুকের ঝাঁকুনিতে গাড়ির ভেতরের সিটটা দেখিয়ে দিল যার পরিষ্কার অর্থ, এখনই গাড়িতে বসো।
মেহের আর রুদ্রর কথার ওপর কথা বলল না। ও চুপচাপ গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে বসল। তবে ওর মনের ভেতরের কৌতূহল আর বিস্ময় উথলে উঠছিল। ও মনে মনে বলতে লাগল… এই লোকের মগজের স্ক্রু কি আসলেই ঢিলে? এই মাত্র দেখলাম খুশিতে গদগদ হয়ে স্যান্ডো গেঞ্জি পরে নাচছে, আর এক মিনিট পার হতে না হতেই আবার সেই রাক্ষসের মতো মুখ করে বলছে গাড়িতে বসো। মানুষের রূপ এত দ্রুত বদলায় কীভাবে?

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রুদ্র প্রায় বেশ কিছুক্ষণ একনাগাড়ে ড্রাইভ করল। পাহাড়ি খাড়া রাস্তাগুলো পেছনে ফেলে গাড়ি যখন সমতলের হাইওয়ের দিকে নামল, তখন রাস্তার পাশে একটা বেশ বড়সড়, জমজমাট হাইওয়ে ঢাবা দেখে রুদ্র ব্রেক চাপল। মেহের জানালার বাইরে ঢাবার চকমকে নিওন সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলো। ও রুদ্রর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, এখানে কেন থামলাম আমরা?
রুদ্র এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করল না। ও সিটবেল্টটা আনলক করতে করতে স্রেফ দুটো শব্দ ছুড়ে দিল, “বের হও”
মেহের নিজের পেটে হাত রেখে একটু থতমত খেয়ে বলল, “আমি?”
রুদ্র এবার মেহেরের দিকে আড়চোখে চেয়ে বলল, “হ্যাঁ, তুমি। আসলে এই পাহাড়ি ঢাবাগুলোতে কিডনি, লিভার, ফুসফুস পাচারকারীরা ওত পেতে থাকে। তুমি তো এমনিতেও আমার কোনো কাজে আসছ না। তাই ভাবলাম তোমাকে এখানে ধরে বিক্রি করে দিয়ে যে টাকাটা পাব, তা দিয়ে নিজের কোনো একটা কাজের ব্যবস্থা করব, এই পাইলট গিরি আর ভালো লাগছে না ।”
“ও আচ্ছা! তা আপনি কি ইদানীং মানব পাচারকারীদের সাথেও গ্যাং খুলেছেন নাকি? এ পর্যন্ত কতজনকে চালান করেছেন শুনি?”

রুদ্র গাড়ির দরজা খুলে নামতে নামতে জবাব দিল, “হুম… আজ তোমাকে দিয়ে সংখ্যাটা শুরু হবে, দেখা যাক তুমি আমার জন্য লাকি কিনা? নাকি ব্যবসায় লাল বাতি ধরিয়ে দিবে?”
মেহেরও গাড়ি থেকে নেমে রুদ্রের পিছু পিছু ঢাবার ভেতরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “শুনলাম তো! তা দাম কত পাবেন ? কত টাকা হাঁকিয়েছেন?”
রুদ্র ঢাবা একটা কাঠের টেবিল টেনে চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “মহতারমা, আপনিই আমার প্রথম কাস্টমার। মার্কেট প্রাইস জানি না। অনেক বড় রিস্ক। তাই নিজের ঘর থেকেই শুরু করলাম।”
মেহের ওর ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসতে বসতে নিজের হিজাবটা একটু টেনে সোজা করল। ওর চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, বরং রুদ্রর এই অদ্ভুত রসিকতায় ওর নিজের ঠোঁটের কোণেও একটা চাপা হাসি ফুটে উঠেছে।
“ওহ! তাহলে তো বলতে হয়, এই কাজের জন্যই বুঝি আজকে আদালতে অত নাটক করে আমার জানটা বাঁচালেন? যাতে শেষমেশ নিজেই আমার কিডনি, লিভার বিক্রি করে নিজের কার্যসিদ্ধি করতে পারেন, তাই তো?”

রুদ্র মেনু কার্ডটার ওপর চোখ বুলাতে বুলাতে নিস্পৃহ গলায় বলল, “হুম, তোমাকে যদি ঠিকঠাক পাচার করা যায়, তবে দুনিয়ার যেকোনো মানুষকে লাইনে আনা যাবে। এখন চুপচাপ বসো।”
রুদ্রর কথায় মেহেরের মোটেও রাগ হলো না, বরং কোথাও না কোথাও ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে রইল। ঠিক তখনই ঢাবার একজন কম বয়সী ওয়েটার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। সে মেহেরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, কী খাবেন?”
মেহের আলতো করে মাথা নেড়ে বলল, না, আমি কিছু খাব না।
আসলে এত ঝড়ের পর ওর পেটের ভেতরটা কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে আছে, মুখে কোনো রুচি নেই এমনিতেই নেই । মেহেরের বেশ খিদে পেয়েছিল কয়েক ঘন্টা আগে , কিন্তু পেটের খিদের কথা ও নিজেই ভুলে গিয়েছিল। আদালতের ওই দমবন্ধ করা পরিবেশ আর তারপর পাহাড়ি রাস্তায় এই ঝড়ের গতির রেসিং কারের ঝাঁকুনি—সব মিলিয়ে ওর শরীরের ভেতরটা এতটাই ওলটপালট হয়ে ছিল যে তার যে ক্ষুধা পেয়েছে সে, সেটা গুরুত্বই দেয়নি।

ওয়েটার এবার রুদ্রর দিকে ফিরতেই রুদ্র মেনু কার্ডটা একপাশে সরিয়ে রেখে এক টানে একের পর এক আইটেমের নাম বলতে শুরু করল, “কালাই রুটি, হাঁসের মাংস, গরুর মাংস, চিকেন চাপ আর কলিজা ভুনা।”
মেহের চোখ বড় বড় করে রুদ্রর দিকে তাকাল। এই লোক একা এত খাবার খাবে? রুদ্র মেহেরের সেই বিস্মিত চাউনিটা একবার দেখে নিয়ে আবার ওয়েটারের দিকে চোখ ফেরাল। তারপর একটু বাঁকা হেসে বলল, “ভালো জিনিস দেখেও কেউ কেউ নাক সিটকায়। তাতে অবশ্য ভালো জিনিসের মূল্য কমে না। কারণ সবার জন্য সবকিছু নয়। যাও, তুমি এইগুলো নিয়ে আসো। আর সাথে দুই গ্লাস ঘন লাচ্ছি নিয়ে আসবে।”
ওয়েটার চলে যেতেই মেহের নিজের দুই হাতের কনুই টেবিলের ওপর ভর দিয়ে রুদ্রর দিকে একটু ঝুঁকে বসল। ও রুদ্রকে এতদিন ধরে দেখছে, কিন্তু কোনোদিনও ওর মনে হয়নি যে রুদ্র একবারে এত খাবার খেতে পারে।একজন পাইলট মানুষ, যে সবসময় নিজের ফিটনেস নিয়ে এত সচেতন, সে এক বসায় আস্ত একটা ভোজের আয়োজন করে ফেলল….
মেহের এবার মৃদু হেসে নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো কোলের ওপর জড়ো করে বসল। সে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,

“ক্যাপ্টেন সাহেব! সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি আসলেই একা এতগুলো খাবার খেতে পারবেন ? নাকি শুধু অর্ডার দিয়ে টেবিল সাজিয়ে রাখার জন্য আনছেন? আর যদি এটা ভেবে থাকেন, মাইন্ড গেম খেলে আবারও আমাকে খাইয়ে ফেলবেন, তাহলে ভুল ভেবেছেন। আমি কিন্তু সত্যিই কিছু খাব না। আমার একদম ভালো লাগছে না। তখন না হয় চা-টা খেয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু এখন আমি এক ফোঁটা পানিও খেতে পারব না।”
রুদ্র টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে করতে মেহেরের চোখের দিকে তাকাল। “ কে বলল আমি তোমার জন্য এত খাবার আনছি? মোটেও না। আর খাবার নষ্ট করার অভ্যাস চৌধুরী বাড়ির ছেলেদের নেই, মিস অ্যারোফোবিয়া। আর যখন সামনে একজন আস্ত ডাফার বসে থাকে, তখন খাওয়ার এনার্জি এমনিতেই দ্বিগুণ হয়ে যায়।”
রুদ্রর খোঁচা মারা কথায় মেহের কিছুটা লজ্জা পেল। মনে মনে নিজেকেই ধমক দিতে লাগল। আগ বাড়িয়ে এই লোকটার সঙ্গে তর্ক করতে গেলই বা কেন? তবে সেই লজ্জাবোধের সামান্য ছাপও রুদ্রর সামনে প্রকাশ করল না সে। বরং নিজের হিজাবের কোণটা হাত দিয়ে সামান্য ঠিক করতে করতে চিবুক উঁচিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কাকে ডাফার বললেন?”

“যিনি নিজে না খেয়ে উপোস করে নিজের বাচ্চারর ক্ষতি করার ধান্দা করছেন, তাকে।”
রুদ্রর এই এক লাইনের সোজাসাপ্টা কথায় মেহের চুপ হয়ে গেল। আসলেই তো, বাচ্চাটার কথা একবারও মাথায় আসেনি তার। এতক্ষণ ধরে কিছু না খেয়েই আছে ও। নিজের জন্য না হোক, অন্তত বাচ্চাটার জন্য হলেও কিছু খাওয়া প্রয়োজন।এমন সময় ওয়েটার এসে টেবিলভর্তি খাবার এনে সাজিয়ে রেখে গেল।প্লেট থেকে চর্বি আর চড়া মশলার একটা তীব্র গন্ধ মেহেরের নাকে এসে লাগতেই ওর পুরো শরীর গুলিয়ে উঠল। মোটেও এই খাবারের গন্ধটা ওর পছন্দ হচ্ছিল না। রুদ্র অবশ্য মেহেরের এই পরিবর্তনের দিকে তখন খেয়াল করেনি। ওর নিজের তখন ভীষণ খিদে লেগেছিল, তাই ও মনোযোগ দিয়ে খেতে শুরু করল।
মেহের আর এক সেকেন্ডও সেই টেবিলের সামনে বসে থাকতে পারল না। গন্ধটা ওর মাথা ধরিয়ে দিচ্ছিল। ও রুদ্রকে কিছু না বলেই হঠাৎ টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল এবং ঢাবার পেছনে একটা খোলা জায়গার দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল।

রুদ্র বেশ কিছুটা খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ প্লেট থেকে মুখ তুলল। ও সামনের চেয়ারটার দিকে তাকাতেই দেখল—মেহের আশেপাশে কোথাও নেই! ও ভ্রু কুঁচকে চারপাশের ঢাবার ভেতরটা দেখল, কিন্তু কোথাও মেহেরকে নজরে পড়ল না। রুদ্রর বুকের ভেতরটা আচমকা ছ্যাৎ করে উঠল। এই অচেনা লাগছে জায়গাতে মেহের তো কোনোদিন আসেনি! ও একা একা কোথায় যেতে পারে?
ঠিক তখনই ঢাবার এক কোণের টেবিলে বসা কয়েকজন উঠতি বয়সী বখাটে ছেলে নিজেদের মধ্যে হাহা-হিহি করে হেসে উঠল। তাদের মধ্য থেকে ৩/৪ জন ছেলে রুদ্র আর মেহেরের টেবিলের এই পাশটায় এগিয়ে আসছিল। তাদের হাঁটার ভঙ্গি আর চোখের চাউনি মোটেও সুবিধার ঠেকল না।
চারপাশের এই পরিস্থিতি আর মেহেরের নিখোঁজ হওয়া—সব মিলিয়ে রুদ্রর মাথার চারপাশের রগগুলো রাগে আর আতঙ্কে ফুলে উঠল। ও চেয়ার ছেড়ে ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকল, “মেহের! মেহের!”
রুদ্রকে ওভাবে পাগলের মতো খুঁজতে দেখে ওই বখাটে ছেলেদের একজন বাঁকা হেসে কুরুচিপূর্ণভাবে টিপ্পনী কাটল, ” দেখ দেখ, লায়লা চলে গেছে…মজনু এখন লায়লাকে খোঁজতেছে?”

কথাটা শুনে বাকি ছেলেগুলো আরও জোরে হেসে উঠল। রুদ্রর মাথায় তখন রক্তের গতি চড়ে গেছে। ও এই ইয়ার্কি এক বিন্দুও সহ্য করতে পারল না। ও বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ছেলেটার শার্টের কলার দুই হাতে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। রুদ্রর সেই খুনে চাউনি আর পেশীবহুল হাতের মুঠি দেখে ছেলেটার মুখের হাসি এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। ও ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
রুদ্র দাঁত চিপে হিংস্র গলায় গর্জে উঠল, “কোথায় ও? কোথায় গেছে ও?”
ছেলেটা ভয়ে তোতলামি করতে করতে বলল, “আ-আমি জানি না ভাই! আমি তো এমনিই ইয়ার্কি করে বলেছি। মাফ করে দেন ভাই, আমরা সত্যিই কিছু জানি না!”
রুদ্র ওর কলারটা আরও জোরে ঝাঁকিয়ে বলল, “আই সেড, আমার ওয়াইফ কোথায়? কোথায় দেখেছিস ওকে যেতে?”

আরেকটা ছেলে কাঁপতে কাঁপতে পেছনের একটা অন্ধকার গলির পথ দেখিয়ে বলল, “ও-ওই দিকে… ওনাকে ওদিকে যেতে দেখছি । আমরা সত্যি কিছু করি নাই স্যার, আমরা জাস্ট এমনি মজা নিচ্ছিলাম।”
ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ আর চোখের আতঙ্ক দেখে রুদ্রর মনে হলো না তারা মিথ্যা বলছে। তাহলে মেহের ওদিকে কেন গেল? রুদ্র এক এক ঝটকায় ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে আবার হন্যে হয়ে খুঁজতে যাবে, ঠিক তখনই সেই টেবিলে খাবার দেওয়া ওয়েটার ছেলেটা দৌড়ে এসে বলল, “স্যার! আপনার সাথে যে ম্যাডাম এসেছিলেন, ওনার শরীর বোধহয় বেশি খারাপ করেছে। ওনাকে ঢাবার পিছনের টিউবওয়েলের পাড়ে যেতে দেখলাম।”

রুদ্র আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়াল না। সে ঝড়ের গতিতে ঢাবার পেছনের অন্ধকার কোণটার দিকে ছুটে গেল। সেখানে গিয়ে ও দেখল, মেহের একটা দেয়ালের পাশে ভীষণ ক্লান্ত আর অবসন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহেরকে অক্ষত এবং নিজের চোখের সামনে অক্ষুণ্ণ দেখে রুদ্র এতক্ষণে বুক ভরে একটা দীর্ঘ শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো, এতক্ষণ ওর বুকের ভেতর যে বিশ মন ওজনের একটা অদৃশ্য পাথর চেপে বসে ছিল, কেউ যেন এক টানে সেটা সরিয়ে দিল। আসলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আর ওই বখাটে ছেলেদের হাসি দেখে রুদ্রর মাথায় এক নিমেষে হাজারটা কুৎসিত আর ভয়ঙ্কর চিন্তা ভর করেছিল। মেহেরকে সুস্থ দেখে ওর ধকপকানিটা একটু কমল।
মেহের দূর থেকে রুদ্রকে হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে নিজের এক হাত সামনে বাড়িয়ে দুর্বল গলায় বলল, “আপনি… আপনি ওখানেই থাকুন। দয়া করে এদিকে আসবেন না।”
কিন্তু রুদ্র ওর কোনো বারণ শুনল না। ও বড় বড় পা ফেলে মেহেরের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই মেহের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মেহের দেয়ালটা এক হাতে শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করে তীব্র বেগে বমি করতে শুরু করল। এই মরণাপন্ন অবস্থায় মেহেরের শরীরটা এত বেশি কাঁপছিল আর নড়বড়ে লাগছিল যে এ সময় কেউ ওকে শক্ত করে ধরে রাখলে খুব সুবিধা হতো। ও যেন যেকোনো সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।

রুদ্র মেহেরকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য এক পা এগিয়ে যেতেই এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল। মেহেরের পেটের ভেতরের সমস্ত গুলিয়ে ওঠা বমি ছিটকে এসে সরাসরি পড়ল রুদ্ররের জ্যাকেট আর ট্রাউজারের ওপর…কিন্তু রুদ্র নিজের দিকে একবারও নজর দিল না। যেন কিছুই হয়নি,এটা তার কাছে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার।সে মেহেরকে ধরার জন্য হাত বাড়িয়েও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু ও মেহেরকে স্পর্শ করল না। ও আলতো করে নিজের চোখ দুটো নিচে নামিয়ে নিল, যখন বুঝতে পারল যে মেহেরের হিজাবটা সরে গেছে মেহেরের শরীরের একপাশ থেকে।

মেহেরের বমি করা শেষ হতেই ও যখন নিজের চোখ মেলল এবং খেয়াল করল যে ও কি কাণ্ডটা ঘটিয়ে ফেলেছে—ক্যাপ্টেন সাহেবের কাপড়ের ওপর ও বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে!
মেহেরের ভেতরটা লজ্জা আর সংকোচে ভারী হয়ে উঠল, সে অপরাধীর মতো মুখ করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। মনে মনে ভাবল, রুদ্রর মতো একজন শুচিবায়ু আর মেজাজী মানুষ এখন নিশ্চয়ই ওকে বকাঝকা করবে, রাগ দেখাবে।
কিন্তু মেহেরকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে রুদ্র কোনো রাগ দেখাল না, কোনো বকাঝকা করল না, এমনকি ঘেন্নায় নিজের নাকটুকুও কুঁচকাল না।ও বরং নিজের পোশাকের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে অত্যন্ত অস্থির আর ব্যস্ত গলায় মেহেরকে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল,
“আই অ্যাম সো সরি, মিস অ্যারোভোবিয়া! এখানে তোমাকে নিয়ে আসাটা আমার একদম ঠিক হয়নি। পানি খাবে? একটা চেয়ার এনে দেব? খুব গরম লাগছে? শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি কোনো ডেক্টর ডাকব?”

মেহের একদম বোকার মতো চোখ বড় বড় করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। এই খামখেয়ালী লোকটা একই সাথে এতগুলো প্রশ্ন করছে, এত যত্ন ? তাও আবার নিজের পুরো গা বমিতে মাখামাখি হয়ে থাকার পরেও! মেহের ভেবেছিল রুদ্র হয়তো ঘেন্নায় ওখান থেকে সরে যাবে, কিন্তু রুদ্ররের চোখে এখন কেবলই মেহেরের জন্য এক তীব্র উদ্বেগ আর আকুলতা দেখতে পাচ্ছি মেহের।
মেহের নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনে মৃদু গলায় বলল, “আপনি… আপনি একটু শান্ত হোন, ক্যাপ্টেন সাহেব। আমি অ্যাপার্টমেন্টে যাব। আমি এখন মোটামুটি ঠিক আছি। তার আগে… তার আগে দয়া করে আমাকে একটু পানি দিন।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৬

রুদ্র তৎক্ষণাৎ ওয়েটারকে ডেকে পানি আনাল। তারপর ধাবার ভেতর থেকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে নিজের হাতে মেহেরের বসার জন্য পেতে দিল। মেহের চেয়ারটায় বসে একটু পানি মুখে দিল এবং চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করল।
পানি খাওয়ার পর রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি গাড়িতে যাও, আমি আসছি দুই মিনিট।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮